Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৭

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৭

কেয়ারা আচমকা ভ্রু কুঁচকে রাগ নিয়ে বললো,
“আপনাকে একটা থাপ্পড় মারি?”
কথাটা শুনে ইয়াশ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারে না, এই মেয়ে ছোটবেলায় ওর জন্য কতটা পাগল ছিল! অথচ এখন বড় হয়ে ওকে যেন চোখেই দেখতে পারে না। মনে মনে ভাবলো, নিজের বরকে কেউ এভাবে মারতে চায় নাকি? ছিহ ছিহ! একদম একটা বেয়াদব বউ হয়েছে।
ইয়াশ নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ক্ষোভের সুরে বললো, “একটু চুমু খেতে চেয়েছি বলে এমন ব্যবহার করবি আমার সাথে?”
কিয়ারা মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, “আমার পরিবারের কেউ এখনও এই বিয়ের কথা জানে না। তাই হুট করে আমি এসব করতে পারবো না।”
“ঠিক আছে, আমি নিজেই সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি আমাদের বিয়ের কথা,”
ইয়াশ তৎক্ষণাৎ জবাব দিল। কিয়ারা এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে আকুতি ছড়ানো গলায় বললো, “না, এখনই না প্লিজ! পাপা খুব অসুস্থ। আমি সময় সুযোগ বুঝে ঠান্ডা মাথায় সবাইকে বলবো।”
ইয়াশ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে কিয়ারাকে নিজের কাছে টেনে নিল এবং তার বুকে একটা গভীর চুমু এঁকে দিল। তারপর কিয়ারার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম চিবিয়ে চিবিয়ে শাসানোর সুরে বললো, “শোন, ওই ছেলের দিকে যদি এবার চোখ তুলেও তাকাস, তাহলে তোর ওই চোখ দুটো আমি নিজে উপড়ে ফেলবো!”
কিয়ারা পুরোপুরি আকাশ থেকে পড়লো। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোন ছেলে? কার কথা বলছেন?”
ইয়াশ কুটিল এক টুকরো হাসি হেসে বললো, “যাকে আমি আজ বাইক এক্সিডেন্ট করিয়েছি!”
কথাটা শোনামাত্র কিয়ারা চমকে উঠলো। বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠলো তার। বিষ্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় করে সে বললো, “কিহহহহ? আপনি… আপনি শুদ্ধকে এক্সিডেন্ট করিয়েছেন?”
‘শুদ্ধ’ নামটা শুনতেই ইয়াশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় কিয়ারার মুখটা চেপে ধরলো। তার চোখের মনিতে তখন তীব্র হিংস্রতা। কিয়ারার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে ইয়াশ ফিসফিস করে কঠোর গলায় বললো, “ওর নাম উচ্চারণ করছিস কেন? আজ থেকে আর ভুলেও ওর নাম মুখে আনবি না তুই!”
দুই হাতে শক্ত হাতকড়া পরা থাকায় কিয়ারা শত চেষ্টা করেও ইয়াশের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছিল না। ছটফট করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে সে অসহায় চোখে তাকালো ইয়াশের দিকে। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তীব্র ঘৃণায় মুখটা কুঁচকে কিয়ারা বললো, “আপনি এতটা নিচ মানসিকতার মানুষ? কি ক্ষতি করেছিল ও আপনার? কেন ওর সাথে এমন একটা জঘন্য কাজ করলেন?”
“ক্ষতি করেনি বলছিস?!”
ইয়াশ এবার আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলো না। ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো সে, ” ও তোকে বিয়ে করতে চাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে, ইডিয়ট!”
ইয়াশের চোখ দুটো তখন রাগে লাল হয়ে আছে। সে কিয়ারার একদম মুখোমুখি এসে আবার গর্জে উঠলো, “আর তুই? তুইও অনায়াসে রাজি হয়ে গেলি? একবারের জন্যও আমার কথা ভাবলি না? আমি যে তোকে এখনও জ্যান্ত পুঁতে ফেলিনি, এটার জন্য আল্লাহর কাছে দিনরাত শুকরিয়া আদায় কর!”
কিয়ারা স্তব্ধ হয়ে গেল। কাল রাতের ঘটনার পর এই মানুষটার প্রতি তার মনে যে সামান্য একটু নরম অনুভূতির ছোঁয়া জেগেছিল, তা এক মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে মাথা নেড়ে অত্যন্ত যন্ত্রণার সুরে বললো, “আমি ভেবেছিলাম কালকে রাতে আপনি আমাকে ওভাবে বাঁচিয়েছেন, আপনি হয়তো সত্যিই ভালো মানুষ। আসলে তা না! আপনি একটা আস্ত পাষাণ, একটা আস্ত শয়তান লোক!”
কিয়ারার এই তীব্র অপমানে ইয়াশের রাগ তো বাড়লোই না, উল্টো তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক অদ্ভুত, বাঁকা হাসি। সে যেন কিয়ারার এই অসহায় রাগটা বেশ উপভোগ করছে। বুক ফুলিয়ে হাসতে হাসতেই সে বললো, ” তোর ধারণা ও নেই আমি ঠিক কতোটা খারাপ, তুই আমাকে যতোটা খারাপ ভাবছিস আমি তার থেকেও খারাপ”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে কিয়ারার বাবার গলার আওয়াজ ভেসে আসলো। কিয়ারা ছটফট করে উঠে ইয়াশকে উদ্দেশ্য করে বললো, “আমার হাত খুলে দিন! পাপা ডাকছে আমাকে।”
ইয়াশ এবার এক দুষ্টু হাসিতে মুখটা ভরিয়ে ফেললো। হাতকড়া খোলার আগে সে হুট করেই কিয়ারার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। কিয়ারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়াশ মুখ নিচু করে তার পেটে আস্তে করে একটা কামড় জড়ানো চুমু দিল। চুমু খেয়েই ঝটপট হাতকড়াটা আনলক করে কিয়ারাকে ছেড়ে দিল সে। মুক্ত হতেই কিয়ারা রাগে-অপমানে গাল দুটো ফুলিয়ে ইয়াশের দিকে তাকালো। ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললো, “ইসস! কফির মধ্যে বিষ মিশিয়ে কেন যে আপনাকে দিলাম না! দিলে আজ আর এই দিন দেখতে হতো না।”
কথাটা বলেই কিয়ারা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না, রাগে পা দাপাতে দাপাতে ঘর থেকে চলে গেল। আর পেছনে দাঁড়িয়ে ইয়াশ তার পিচ্চি বউ-এর রাগ দেখে হাহা করে হাসতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো এবং হাসতে হাসতে জোরেই বলে উঠলো, ” ছোট দেড় ব্যাটারির চার্জ নেই শরীরে, কিন্তু মুখের জোর ভালোই আছে”
কিয়ারা চলে যাওয়ার পর ইয়াশ আস্তে আস্তে হেঁটে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিল সে। ধোঁয়ার শেষ অংশটুকু বাতাসে উড়িয়ে দিতেই ইয়াশের চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনেক বছর আগের এক চেনা ঘটনা।
সে মনের অজান্তেই ডুব দিল অতীতে—ঠিক ১৫ বছর আগের এক সোনালী অতীতে।
অতীত…
তখনকার ছোট্ট কিয়ারা ছিল পুরো বাড়ির প্রাণ। সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াত আর মিষ্টি মিষ্টি কথায় গোটা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। তার চঞ্চলতায় সারাক্ষণ মুখর থাকতো চারপাশ। একদিন দুপুরের খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে। ছোট্ট কিয়ারা খাটে পা ঝুলিয়ে খেতে খেতেই হঠাৎ তার গোল গোল চোখ দুটো তুলে বাবা আবির মির্জাকে জিজ্ঞেস করলো, “পাপা আমাল মা তই?”
প্রশ্নটা শুনেই আবির মির্জা খাওয়ার লোকমাটা মুখে তুলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হাহাকার করে উঠলো। টেবিলে বসা ইয়াশ পরিস্থিতি সামাল দিতে একটু ধমকের সুরে কিয়ারাকে বললো, “তুই আবার মাকে খুঁজছিস? তোকে না সেদিন বললাম আমি? আর মাকে খুঁজবি না!”
ইয়াশের ধমক খেয়ে ছোট্ট কিয়ারা তার ছোট্ট দুটো হাত গালে ঠেকিয়ে অপরাধীর মতো মুখ করে বললো, “ছলি ছলি।”
আবির মির্জা কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি নীরবে কেবল তার ফুটফুটে মাতৃহীন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনের গভীরে এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল আসলেই তো, এতটুকু মেয়ের তো মা নেই! মায়ের আদর কী, সে তো কোনোদিন জানলোই না।
এর মধ্যেই ইয়াশের খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় সে টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ইয়াশ যেতেই ইনায়া এসে কিয়ারার হাত ধরে একটু আদর মাখা ধমক দিয়ে বললো, “ওই, অনেক দুষ্টুমি হয়েছে। এবার চুপচাপ চল আমার সাথে, তোকে ঘুম পারিয়ে দেবো।”
কিয়ারা কিন্তু নাছোড়বান্দা। সে উল্টো ইনায়ার দিকে তাকিয়ে তার পাপা আবির মির্জাকে দেখিয়ে আদুরে গলায় বললো, “পাপার গুম পালিয়ে দাউও।”
ইনায়া হেসে ফেলে কিয়ারাকে বুঝিয়ে বললো, “পাপা এখন অফিস যাবে পাগলী, পাপাকে ঘুমাতে হবে না। চল, আমি তোকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো।”
এবার ছোট্ট কিয়ারা একটু অভিমান করে মুখটা ফিরিয়ে নিল। হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে ধরে জেদ ধরা গলায় বললো, “নাহ লাতবে নাহ, তিয়ারা এতাই নিজেতে গুম পালাবে।
ছোট্ট কিয়ারা রাগে মুখ ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাগ হলে তার হাঁটার ধরণটাই বদলে যায়, একদম গুটিগুটি পায়ে হেঁটে সে দোতলার শোবার ঘরের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশ যখন কিয়ারার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ভেতরের দৃশ্য দেখে তার হাসিতে পেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে পুতুলের মতো ছোট্ট কিয়ারা। সে নিজের ছোট্ট হাতটা কোনোমতে পিঠের দিকে নিয়ে আলতো করে চাপড়াচ্ছে, আর চোখ দুটো বন্ধ করে মুখে বিড়বিড় করে বলছে, “ওহ ওহ ঘুমাও ঘুমাও বাবু ঘুমাও।”
নিজের ঘুম নিজেকেই পাড়ানোর এই অদ্ভুত আর মিষ্টি চেষ্টা দেখে ইয়াশ আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না। সে দরজায় হেলান দিয়ে মৃদু হেসে ঘরের ভেতর ঢুকে রসিকতা করে বললো, “আহারে! আমার এই পুচকে মুরগির বাচ্চাটার কত কষ্ট একা একা ঘুমাতে! আচ্ছা বাবা সরি, আই অ্যাম রিয়ালি সরি দেড় ব্যাটারি। এবার রাগ ভেঙে আমার কাছে এসো তো, আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।”
ইয়াশের গলার আওয়াজ পেয়ে কিয়ারা চোখ মেলল। তার অভিমানী মনটা এক নিমেষেই গলে জল। সে বিছানা থেকে উঠে এক লাফে এসে ইয়াশের কোল জুড়ে বসল। ইয়াশ তাকে কোলে জড়িয়ে নিল এবং তার ছোট্ট নাকটার ডগায় একটা আলতো করে চুমু দিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা শোন, তুই এতটুকু ছোট কেন বলতো? কবে বড় হবি তুই?”
কিয়ারা তখন ইয়াশের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে একদম গম্ভীর মুখে আধো আধো গলায় জবাব দিল, “তালকে (কালকে)।”
কিয়ারার মুখে এই তাৎক্ষণিক উত্তর শুনে ইয়াশ হো হো করে হেসে উঠল। সে কিয়ারার গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, কালকেই বড় হয়ে যাবি?”
কিয়ারা বললো “হু তালকেই বড় হয়ে যাব”
ইয়াশ বললো।” তাহলে তোর মনে থাকবে তো বড় হয়ে তুই কাকে বিয়ে করবি?”
কিয়ারা এবার ইয়াশের গলার দুপাশে হাত জড়িয়ে ধরে পাকা বুড়ির মতো মাথা নেড়ে বললো, “আলে বাবা মনে তাকবে, তিয়ারা তোমাতেই (তোমাকে) বিয়ে তরবে।”
ছোট্ট কিয়ারার মুখে এমন বিয়ের কথা শুনে ইয়াশ সেদিন গভীর এক আনন্দে মেতে উঠেছিল এবং বেশ জোরে শব্দ করেই হেসে ফেলেছিল। সেই হাসির প্রতিধ্বনি যেন আজও তার কানে লেগে আছে।
হঠাৎ করেই হাতের সিগারেটের ছ্যাঁকায় ইয়াশের ঘোর কাটলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীতের সেই সোনালী দিনগুলো থেকে ছিটকে আবার রূঢ় বর্তমানে ফিরে এলো। ১৫ বছর আগের সেই মিষ্টি স্মৃতিগুলো এক নিমেষে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। চোখের সামনে এখন কেবল সিগারেটের ধূসর ধোঁয়া।
ইয়াশ শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক বুক কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে বলল, “তোর তো বিন্দুমাত্র মনে ছিল না বাটারফ্লাই! আমাকে বিয়ে করার সেই প্রমিজের কথা তুই এত সহজে ভুলে গেলি?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here