Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৫
মেহজাবিন নাদিয়া

জেবার স্তদ্ধ হওয়ার মাঝেই হঠাৎ ড্রয়িং রুমে দরজায় কলিং বেল বেজে উঠে। আরিশান মৃধা জেবাকে কিচেনে রেখেই চলে আসে দরজা খুলতে, যাওয়ার সময় কিচেন এফ্রোন টা খুলে যায়। দরজার বাহিরে দাড়িয়ে ছিলো আলভি। হাতে তার বেশ কিছু ফাইল। আরিশান মৃধা দরজা খুলতেই, আলভি তাকে দেখে সাথে সাথে সালাম জানায়।
“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
“ওয়ালাইকুম সালাম, ভেতরে এসো।”
ওনি সালামের উওর নিয়ে আলভিকে এসে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসার জন্য ইশারা করেন। আলভি সোফায় বসতেই, আরিশান মৃধা তার পাশের সোফায় বসে পড়ে। তখনি জেবা কিচেন ছেড়ে বের হয়। কে এসেছে দেখার জন্য। আলভিকে সাতসকালে এখানে দেখে একটু অবাক হয়। এগিয়ে আসে তাদের দিকে।আলভি জেবাকে দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এইটুকুনি মেয়ে এখন বসের সৎ মা। যাই হোক মা তো মা ই হলো। হিসেব অনুযায়ী আলভির তাকে আন্টি বলে ডাকতে হবে।আরিশান মৃধা আলভির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। “কেমন আছো?”
আলভি হাসি ফুটিয়ে বলল। “জ্বি আঙ্কেল।আলহামদুলিল্লাহ ভালো। স্যার কিছু ফাইল আপনাকে পৌছে দিতে বলেছে।”

“কিসের ফাইল?”
আলভি হাতে থাকা ফাইলগুলো আরিশান মৃধার নিকট এগিয়ে দিয়ে বলল। “এগুলো সংসদ থেকে সবে পাশ হওয়া কিছু বিল। যেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে কাজ করতে যাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রনালয়। স্যার বলেছেন ওনি না আশা অব্দি আপনি এগুলো একটু হ্যান্ডেল করেন।”
আরিশান মৃধা ফাইল গুলো হাতে নিয়ে ভালোভাবে পযবেক্ষন করলেন। জানালেন। “আমি দেখে নিবো এগুলো। তুমি কিছু নিবে কফি বা চা?”
আলভি মানা করে বলল। “আগ্গে বলার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি বাসা থেকে চা খেয়ে এসেছি।”
জেবা দাড়িয়ে দাড়িয়ে এতোক্ষন তাদের কথা শুনছিলো। এবার এগিয়ে এসে বসলো সে সোফায়। আরিশান মৃধা আড়চোখে একবার দেখলেন তাকে। আলভি যেই ভাবছিলো উঠার জন্য প্রস্তুতি নিবে। অমনি জেবা তাকে থামিয়ে দিলো।

“আপনি বসুন আলভি ভাই। আপনার সাথে আমার কথা আছে।”
আরিশান মৃধা বুঝে পেল না এই মেয়ের কি কথা আছে। আলভি শুকনো গলায় কাশি উঠার উপক্রম জেবার মুখ থেকে ভাই ডাক শুনে। মনে মনে একাই বিরবির করলো। “জামাই লাগে আঙ্কেল, বউ ডাকে ভাই। কি আজব ফ্যামিলি এটা।”
জেবা আলভির দিকে তাকিয়ে বলে উঠে। “আলভি ভাই, সারিম ভাই আর অরি কোথায় গেছে আপনি কি কিছু জানেন?”
আরিশান মৃধা জেবার কথা শুনামাএ আলভিকে দ্রুত তাড়া দিয়ে বলল। “আলভি তুমি এবার আসতে পারো।”
জেবা থামিয়ে বলল। “না আগে আমার উওর দিবে যাবেন।”
আরিশান মৃধা হতাশ হয়ে দীঘশ্বাস ফেলেন। আলভি বেচারা পড়েছে মহা বিপাকে। একদিকে সরাস্ট মন্ত্রীর আদেশ তাকে যেতে বলছে। আবার মন্ত্রীর বউ উওর দিয়ে তারপর যেতে বলছে। দুজনের কথা শুনে আলভির নিজেরি মাথা ফাটাতে মন চাচ্ছে।জেবা তাড়া দিয়ে বলল। “কি হচ্ছে কিছু জিজ্ঞেস করলাম উওর দেন।”
আলভি একবার আরিশান মৃধার দিকে তাকালো। তাকে চুপ দেখে ভাবলো বলে দিবে। সেজন্য বলে দিলো সারিম আর অরির কথা জেবাকে।

“স্যার আর ম্যাম। হানিমুনে গেছেন দেশের বাহিরে।”
“দেশের বাহিরে?”
জেবা ক্ষানিক অবাক হলো, সে তো আরো ভেবেছিলো তারা হয়তো আশেপাশের মধ্যে দেশেই কোনো সুন্দর রিসোর্টে ঘুরতে গেছে। অথচ বান্ধবী তার তলে তলে টেম্পু চালাবে কে জানতো। তাকে না জানিয়ে হানিমুন। একবার ফোনে জানালোও না মেয়েটা তাকে। কতবড় সেয়ানা হয়েছে। নিশ্চই জামাই নিয়ে এখন সুন্দর সুন্দর দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
“বাহিরে কোথায় ঘুরতে গেছে আলভি ভাই?”
“আলভি তুমি এবার যেতে পারো। বাকিটা আমি বলে দিচ্ছি।”আরিশ মৃধা হঠাৎ বলে উঠে। “না ওনি আমাকে না বলে কোথাও যাবে না। সামান্য একটা কথা বললে কাজের এমন কোনো বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে না। আলভি ভাই আপনি বলে তার পর যান।”
আলভি এবার না পেরে আরিশান মৃধার কথাকে অমান্য করে। বাধ্য হয়ে বলে দেয়। “জ্বি, আফ্রিকান মহাদেশে অবস্থিত দেশ, উগান্ডা গেছে স্যার ম্যামকে নিয়ে ঘুরতে।”
কথাটা বলেই আলভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। এদের স্বামী-স্ত্রীর টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে সে নিজেই ক্লান্ত। “আমি আসি আঙ্কেল” বলে দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল।
আলভি যেতেই বিশাল ড্রয়িং রুমটা হঠাৎ করে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও এখন জোরে শোনা যাচ্ছে।
জেবা সোফায় পাথরের মতো বসে আছে। চোখ দুটো বড় বড়, মুখ হা হয়ে আছে। যেন আকাশ থেকে কেউ তাকে ধরে মাটিতে আছাড় মেরেছে। অবাকের চোটে মনে হচ্ছে মুখে এখন একটা আস্ত মুরগিও অনায়াসে ঢুকে যাবে।
আরিশান মৃধা ঘাড় ঘুরিয়ে জেবার দিকে তাকালেন। মেয়েটার এই হাঁ করা অবস্থা দেখে তিনি চোখের সামনে তুড়ি বাজালেন।

“হ্যালো? পৃথিবীতে ফিরে আসো।”
জেবা চমকে উঠে সরু চোখে তার দিকে তাকালো। “এটা… এটা কি সত্যিই?”
“হ্যাঁ।” আরিশান মৃধার গলা একদম স্বাভাবিক। যেন উগান্ডা যাওয়াটা নস্যি ব্যাপার।
পরের সেকেন্ডেই জেবার মুখে খুশির ঝিলিক। সে এক লাফে উঠে এসে আরিশান মৃধার দুই হাত নিজের মুঠোয় পুড়ে নিল। চোখে হাজারটা স্বপ্ন।
“তাহলে চলুন না হানি, আমরাও যাই উগান্ডা! তারা যেতে পারলে আমরা কেন পারবো না? সাফারি দেখবো… প্লিজ প্লিজ প্লিজ!”
আরিশান মৃধা কপাল কুঁচকে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিলেন। “না।”
জেবার মুখটা সাথে সাথে চুপসে গেল। “কিন্তু কেন?”
“আই হেভ নো ইন্টারেস্ট। আর আমার হাতে প্রচুর কাজ।”
“আপনার জীবনে কাজ ছাড়া আর ছিলোই বা কি?” জেবা অভিমানে ঠোঁট ফুলালো। “এবার না হয় কাজকে কয়েকটা দিনের জন্য ছুটি দিন। একটু ঘুরে আসি আমরা।”

আরিশান মৃধা উঠে দাঁড়ালেন। ফাইলগুলো হাতে নিতে নিতে গম্ভীর গলায় বললেন, “ছেলেমানুষি বন্ধ করো জেবা। তুমি প্রেগন্যান্ট। এই সময় ট্রাভেল করা উচিত না।”
জেবা হাল ছাড়লো না। সেও উঠে দাঁড়িয়ে তার পথ আটকালো। একদম ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল, “এমন করছেন কেন! একটু ঘুরতেই তো যেতে চাচ্ছি। তাছাড়া অরিও তো প্রেগন্যান্ট, ও যখন যেতে পারছে তখন আমি গেলে সমস্যা কোথায়? প্লিজ মানা করবেন না।”
“এমন পাগলামি কেন করছো জেবা?” আরিশান মৃধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “যেটা আমি করতে পারবো না সেটা নিয়ে জোর করবে না। ব্রেকফাস্ট করতে আসো, জলদি।”
বলেই তিনি আর দাঁড়ালেন না। সোজা কিচেনের দিকে হেঁটে গেলেন টেবিল সাজাতে।
জেবা ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। লোকটা কখনো তার ইচ্ছেগুলোকে গুরুত্ব দেয় না। সবসময় নিজের নিয়মে চলে। খুব অভিমান হলো। কিন্তু যেই মানুষটা অভিমানের মানেই বোঝে না, তার উপর অভিমান করে লাভ কি?

অগত্যা সেও পা টেনে টেনে ডাইনিং টেবিলে গেল।
আরিশান মৃধা ততক্ষণে প্লেটে স্যান্ডউইচ, অমলেট, সালাদ সাজিয়ে রেখেছেন। জেবা চেয়ারে বসে খাবারের দিকে তাকাতেই পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এই মুহূর্তে কোনো কিছুর গন্ধই তার সহ্য হচ্ছে না।
আরিশান মৃধা ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হলো? খাচ্ছো না কেন? খাবার পছন্দ হয়নি?”
জেবা জোর করে হাসলো। লোকটা কষ্ট করে রান্না করেছে। এখন না বললে আবার কেমন দেখায়। “না… পছন্দ হয়েছে। খাচ্ছি তো।”
বলেই প্লেট থেকে স্যান্ডউইচ তুলে দুই কামড় দিল। সাথে সাথেই গা গুলিয়ে এলো।
আরিশান মৃধা তার মুখের অবস্থা দেখেই বুঝে গেলেন। আর দেরি না করে দ্রুত এসে জেবার দুই বাহু ধরে তাকে ওয়াশরুমের বেসিনের কাছে নিয়ে গেলেন।”হলো তো? জোর করে খেতে হবে?”
জেবা কিছু বলার আগেই হরহর করে বমি করে দিল। বমি করতে গিয়ে খোপা খুলে চুলগুলো মুখে এসে পড়ছিল। আরিশান মৃধা এক হাতে শক্ত করে তার চুলগুলো মুঠো করে ধরলেন, আরেক হাতে পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

বমি শেষে জেবা দুর্বল হয়ে এলিয়ে পড়তে চাইছিল। আরিশান মৃধা তাকে শক্ত করে ধরে ফেললেন। তারপর পাশ থেকে ভেজা তোয়ালে দিয়ে আলতো করে জেবার মুখ মুছিয়ে দিলেন।জেবা ক্লান্ত চোখ বন্ধ করে তার বাহুতেই মাথা রাখলো। আরিশান মৃধা কয়েক সেকেন্ড নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আঙুল দিয়ে মেয়েটার গালটা একবার ছুঁয়ে দিলেন। জেবা টেরও পেলো না।
পরমুহূর্তেই তাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা উপরের রুমে চলে এলেন। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এসির তাপমাত্রা একটু বাড়িয়ে দিলেন।এরপর কি ভেবে যেন রুম ছেড়ে বেরুলেন।
দশ মিনিট পর হাতে গরম সুপের বাটি আর এক গ্লাস দুধ নিয়ে ফিরলেন। দেখলেন জেবা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।তিনি সেগুলো বেডসাইড টেবিলের উপর রেখে। বিছানার পাশে গিয়ে বসলেন।
“জেবা, উঠো।” গালে আলতো চাপড় দিয়ে ডাকলেন।
প্রথমবার সাড়া নেই। আবার ডাকলেন, “জেবা, উঠো বলছি। খালি পেটে থাকা যাবে না।”

জেবা পিটপিট করে চোখ খুললো। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। উঠে বসেই হঠাৎ বলে উঠলো, “আমি বাড়ি যাবো।”
আরিশান মৃধা অবাক হলেন, বললেন। “বাড়িতেই তো আছো।তাহলে কোথায় যেতে চাও?”
“যেখানে গেলে আপনাকে আর আমাকে ডিস্টার্ব করার মতো কেউ থাকবে না। আমি সেই বাড়িতে যেতে চাই।”
আরিশান মৃধার কপালে ভাঁজ। “এখানে ডিস্টার্ব করছে কে?”
“আপনার কাজ।” জেবা সরাসরি জবাব দিল। “খুব বেশি জেলাস ফিল করি আমি আপনার কাজকে। যেগুলো আপনাকে খুব ব্যাস্ত করে রাখে আমার আছে আসা থেকে। ওগুলো ছেড়ে-ছুড়ে সারাজীবনের জন্য আমার কাছে চলে আসুন না প্লিজ।”
আরিশান মৃধা জেবার কথা শুনে মুখ টিপে হাসলেন। মেয়েটার অবুঝপনা ওনি বেশ ভালোই ইনজয় করছেন।
“তাহলে আমরা এখন কোথায় আছি?”
“জাহান্নামে।” জেবা ফট করে বলে দিল।
আরিশান মৃধা চোখ ছোট করলেন। “এসব কি ধরনের কথাবার্তা?”
“এটাই ঠিক।” জেবা মুখ ঘুরিয়ে নিল। “আপনি এত কাজ কিভাবে করেন বলুন তো? আপনার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম জানেন?”

“কি করতে?” সুপের বাটিটা হাতে নিয়ে চামচ নাড়তে নাড়তে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“এত সুন্দর একটা বউ নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতাম। এই ব্যস্ততার জীবনকে লাথি মেরে।”
আরিশান মৃধা এক চামচ সুপ জেবার মুখে তুলে দিয়ে বললেন। “তুমি এখনো বাস্তবতা শেখোনি জেবা। তাই এসব ফ্যান্টাসি ভাবছো। এগুলো শুধু আশা দেয়, কিন্তু পূরণ করতে গেলে বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হয়।”
জেবা বিরক্ত হয়ে মুখ সরিয়ে নিল। “হয়েছে হয়েছে। আর জ্ঞান দিতে হবে না। আপনি আপনার কাজ নিয়েই থাকুন। আমি আর বলবোও না, চলুন ঘুরে আসি।”
আরিশান মৃধা আর কিছু বললেন না। চুপচাপ পুরো সুপটা জেবাকে খাইয়ে দিলেন। তারপর দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। জেবা অর্ধেক খেয়ে রেখে দিল।খাওয়ানো শেষ করে প্লেটগুলো নিয়ে তিনি নিচে নেমে গেলেন।
জেবা বিছানায় একা শুয়ে রইলো। লোকটার যত্নে শান্তি লাগে, আবার তার গাম্ভীর্যে অশান্তিও লাগে। দুটো মিলেই বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে।

অন্ধকার এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঘেরা ঘরটি। চার দেয়ালের মাঝে যেন বিষাক্ত নীরবতা জমাট বেঁধে আছে। ইন্টারোগেশন রুম।এই বিশেষ কক্ষটিতে সাধারণ আলো প্রবেশ করে না, মাথার ওপর ঝুলতে থাকা কেবল একটি মাত্র সাদা বাতি মেঝের ওপর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় তীক্ষ্ণ আলো ফেলে রেখেছে। সেই আলোর বৃত্তে কাঠের একখানা টেবিল আর মুখোমুখি দুটো চেয়ার।

টেবিলের একপাশে মাথা নিচু করে বসে আছেন আনতারা মৃধা।চোখ মুখ কিছুটা মলিন। দুই হাতে হ্যান্ডকাফ। যা সামান্য নাড়াচাড়া করতেই ধাতব এক যান্ত্রিক শব্দ সৃষ্টি করছে।চেহারায় এতদিন ধরে দেখে আসা সেই রূপ কিংবা হিংস্রতা যেন সাময়িকভাবে উধাও।দু চোখের গভীরে এখনও কুটিল চিন্তাভাবনা খেলা করছে।
দরজার ভারি লক খোলার শব্দ হলো। ধীর পদশব্দে ঘরে প্রবেশ করলো আয়ুশ।পরনে অফিশিয়াল পোশাক, চেহারায় কঠিন পেশাদারিত্বের ছাপ।ভেতরের পরিবেশটা এতই ভারী যে আয়ুশের প্রবেশের সাথে সাথে বাতাসের ঘনত্ব যেন আরও বেড়ে গেল।

আয়ুশ কোনো কথা না বলে আনতারা মৃধার ঠিক উল্টোপাশের চেয়ারটিতে এসে বসলো। টেবিলের ওপর নিজের দু-হাত শক্ত করে রাখলো সে। বেশ কিছুক্ষণ কোনো সংলাপ হলো না। কেবল মাথার ওপর ঝুলতে থাকা বাল্বটার হালকা গুঞ্জন আর দুজনের শ্বাসের শব্দ।
আয়ুশ গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় নীরবতা ভাঙলো, “সো… আনতারা মৃধা। শেষ পর্যন্ত এই চেয়ারেই বসতে হলো, তাই তো? যা যা ভেবেছিলেন, তার একটাও মিলল না। অথচ কত বড় নেটওয়ার্ক ছিল আপনাদের!”
আনতারা মৃধা ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।মুখে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল।যা এই অবস্থায় স্বাভাবিক কোনো মানুষের মুখে দেখা যায় না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “হার-জিত তো খেলারই অংশ, অফিসার। কিন্তু তোমরা মনে করছো খেলা শেষ হয়ে গেছে? ভুল ভাবছো।”

আয়ুশ চিবুক সামান্য ওপরে তুলে বললো, “ধৃষ্টতা এখনও কমেনি দেখছি! আপনার গোটা নেটওয়ার্ক এখন পুলিশের জালে। দেলোয়ার, অনুপমা-সবাই কাস্টডিতে। আন্তর্জাতিক চক্রের মূল হোতা লুকা গ্রেপ্তার। আর আপনার নিজের হাতের রক্ত মোছার আগেই আইনি ফাঁসি নিশ্চিত। এরপরও কোন খেলার কথা বলছেন?”
আনতারা মৃধা নিজের জখম হওয়া। ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে তাকালেন, তারপর টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে আয়ুশের চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে চকচক করে উঠল।”আইন ফাঁসি এসব বড় বড় শব্দ শোনাবে না। আমি অনেক জীবন দেখেছি, অনেক উত্থান-পতন পার করেছি। তবে একটা কথা কী জানো? মানুষ যতই নিজেকে শক্তিশালী বা পেশাদার মনে করুক না কেন, তার ভেতরে একটা ভীষণ দুর্বল জায়গা থাকে। আর সেই জায়গাটা হলো অনুভূতির।”
আয়ুশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাঁর শক্ত চেহারায় সামান্য বিরক্তির ছায়া পড়ল, “অনর্থক কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না, আনতারা মৃধা। আপনার জবানবন্দি রেকর্ড করা হবে। সোজা প্রশ্ন করব, সোজা উত্তর দেবেন।”

“আমি সময় নষ্ট করছি না, আয়ুশ,” আনতারা মৃধার গলায় এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা খেলে গেল, যা এই মূহর্তে বেমানান। “আমি শুধু ভাবছিলাম।যে লোকটা এত সাবলীলভাবে দেশজুড়ে অপরাধীদের ধরে বেড়াচ্ছে, তার নিজের মনকুঠুরিতে কত বড় এক অশান্তির ঝড় বইছে, তা কি সে নিজে জানে?”
আয়ুশ এক মুহূর্ত থমকে গেলো, তবে দ্রুতই নিজের ভাবলেশহীন ভঙ্গি ফিরিয়ে আনলো। “আমার ব্যক্তিগত জীবন বা মনের ভাব নিয়ে আপনার মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
“প্রয়োজন আছে,” আনতারা মৃধা হালকা হেসে বললেন, “কারণ তোমার সেই গোপন অনুভূতির চাবিকাঠি হয়তো এই মুহূর্তে আমার হাতের নাগালে… বা বলা ভালো, আমার জানা। আমি জানি”
“আপনি ঠিক কি বলতে চাচ্ছেন? পরিষ্কার করে বলুন।”
“তুমি অরিকে পছন্দ করো।”

আয়ুশের শরীর এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। বুকের ভেতর একটা শক্ত ধাক্কা অনুভব করলো সে, কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি ফুটতে দিলো না।শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। “আপনি কার কথা বলছেন? অরি কে?”
আনতারা মৃধা একটু হা-হা করে হেসে উঠলেন। শুকনো, প্রাণহীন সেই হাসি নীরবতা বিদীর্ণ করল। “আহা! নিজেকে এত গুটিয়ে রাখছো কেন, অফিসার? অভিনয়টা ভালোই করছো, তবে আমার চোখে ধুলো দেওয়া এত সহজ নয়। তুমি যাকে মনে মনে ভালোবাসো,সেই মেয়েটির কথাই বলছি। অরি। মনে আছে বাদামীচুলের সেই রমনী যাকে তুমি সেদিন অদ্ভুত ভাবে লক্ষ করছিলে।”
অরি মেয়েটার নাম।শুনতেই আয়ুশের ভেতরের শক্ত বাঁধটা যেন চির ধরে গেল। বাদামী চুলওয়ালি সেই মেয়েটি।যাকে এতদিন নাম না জানা এক রাজকন্যা হিসেবে নিজের মনকুঠুরিতে ঠাঁই দিয়েছে, গভীর রাতে নিঃশব্দে যার ছবি মনে এঁকে ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি লালন করেছিলো… সে-ই মেয়েটির নাম অরি।
আয়ুশের গলার স্বর কিছুটা নিচে নেমে গেল, তবে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে বললো, “আপনি বানিয়ে কথা বলছেন। অরি নামের কাউকে আমি চিনি না।”

“সত্যিই চেনো না?” আনতারা মৃধার কণ্ঠে এবার উঁকি দিল তীব্র তাচ্ছিল্য। “নাকি মানতে কষ্ট হচ্ছে? যাকে এতদিন কোনো অচেনা শহরের রাজকন্যা ভেবে ব্যাকুল হয়ে ভালোবাসলে, সে আসলে অন্য কারও সম্পত্তি! সে আর কেউ নয়, আমার একমাত্র ছেলে সারিমের বিবাহিতা স্ত্রী! সারিম মৃধার বউ সে!”
“হোয়াট?!”
আয়ুশ নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে পড়লো। তাঁর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন হাজারটা বাজ পড়ল একসাথে।অরি সারিমের স্ত্রী। সেই স্ত্রী যাকে সারিম নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসে।এসব কিছু জানার পর আয়ুশের চোখের সামনে দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। বুকে এক অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি। প্রিয় বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো এক তীব্র অপরাধবোধ তাঁর পুরো অস্তিত্বকে চেপে ধরল। সে এতদিন যাকে ভালোবেসে এসেছে, সে সারিমের আমানত!
আনতারা মৃধা আয়ুশের এই মানসিক বিধ্বস্ত রূপটি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি জানতেন, তীর একদম সঠিক জায়গায় গিয়ে বিঁধেছে। শিকার এখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
আয়ুশ ধীরপায়ে আবার চেয়ারে বসে পড়লো। তাঁর সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে শুষে নেওয়া হয়েছে। কপালে সামান্য ঘামের বিন্দু দেখা দিল।মাথা নিচু করে রইলেন সে।

আনতারা মৃধা এবার সামনে একটু হেলে ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, “কী হলো, অফিসার? পৃথিবীর সব সত্য সহ্য করা যায়, কিন্তু প্রিয় মানুষটিকে অন্যের বাহুডোরে দেখার সত্য সহ্য করা কঠিন, তাই না? ভেবে দেখো একবার… যাকে তুমি নিজের অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবেসেছো, সে এখন সারিমের সাথে হেসে খেলে দিন কাটাচ্ছে। সারিমের স্পর্শে সে পূর্ণ হচ্ছে। আর তুমি ?চুপচাপ সবকিছু জেনেও মেনে নিচ্ছো। হুয়াই!”
আয়ুশ শক্ত গলায় সামান্য কাঁপানো স্বরে বললো, “চুপ করুন! একদম চুপ করুন আপনি! সারিম আমার বন্ধু। ও যা পেয়েছে, তা ওর প্রাপ্য। আমি আমার বন্ধুকে ধোঁকা দেব না।”
“ধোঁকা তো তুমি অলরেডি দিয়ে ফেলেছো, আয়ুশ!” আনতারা মৃধার কণ্ঠটা বিষাক্ত সাপের গর্জনের মতো শোনালো। “তোমার মনের ভেতর অরির জন্য যে অনুভূতির জন্ম হয়েছে, সেটা কি বন্ধুত্বের প্রতি আনুগত্য? তুমি তো মানসিকভাবে সারিমের অধিকারের ওপর থাবা বসিয়েছো। তাহলে এখন অত সতীপনা দেখাচ্ছো কেন?”
“স্টপ ইট!” আয়ুশ টেবিলে প্রচণ্ড জোরে থাপ্পড় মারলো। কাঠ ফেটে যাওয়ার মতো শব্দ হলো। “আপনি আমাকে এসব বলে প্রভাবিত করতে পারবেন না! আপনি একজন অপরাধী, আর আমি একজন সৎ আইনি কর্মকর্তা!”

“আইন?” আনতারা মৃধা বিদ্রূপের সাথে হাসলেন। “আইন কি তোমাকে তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? এই যে এতদিন ধরে একা একা ছটফট করলে, একটা অচেনা মেয়েকে বুকে ধরে স্বপ্ন বুুনলে… সেই স্বপ্নের পরিণতি কী? শূন্য! সারিম এখন তাকে নিয়ে দূরে কোথাও উড়ে যাচ্ছে, তারা নতুন করে জীবন সাজাচ্ছে। আর তুমি এই জেরার ঘরে বসে বসে সারিমের দেওয়া এটো অবশিষ্ট সুখের পাহারাদারি করছো!”
আয়ুশ দু হাতে মুখ ঢাকলো। তাঁর ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সারিম আর অরির চেহারা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে।সবকিছু যেন আয়ুশকে এক গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন আনতারা মৃধা। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, একজন শক্ত মনের মানুষকে ভাঙতে হলে তার অনুভূতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটা হানতে হয়।
আনতারা মৃধার কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়ে উঠল।

“আয়ুশ… আমার দিকে তাকাও।”
আয়ুশ ধীরে ধীরে হাত সরালো। তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।
“তুমি চাইলে তোমার এই অসমাপ্ত গল্পটা পূর্ণ হতে পারে,” আনতারা মৃধা ধীরলয়ে বললেন। “তুমি যা চাও, তা তুমি পেতে পারো।”
আয়ুশ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “কী বলতে চাইছেন আপনি?”
“আমি বলতে চাইছি, তুমি আমাকে এই পুলিশের খাঁচা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করো। বদলে আমি তোমাকে এমন এক রাস্তা তৈরি করে দেব, যেখানে অরি চিরকালের জন্য তোমার হয়ে যাবে।”
আয়ুশ স্তম্ভিত হয়ে গেলো। “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আমি একজন সৎ সিআইডি অফিসার! আপনাকে পালানোর সুযোগ করে দেব? নেভার!”

“ভেবে দেখো আয়ুশ,” আনতারা মৃধার কণ্ঠ একদম স্থির। “আইনের আনুগত্য তোমাকে আজীবন একাকীত্বের দাহে পোড়াবে। তুমি কি সারাজীবন সারিম আর অরিকে একসাথে দেখে যেতে পারবে? পারবে সারিমের পাশে অরিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিষ্টি হেসে ‘ভাবী’ বলে ডাকতে? তোমার বুক চিড়ে রক্ত বের হবে না তখন? বলো, পারবে তুমি সহ্য করতে?”
আয়ুশের নীরবতাই যেন তাঁর সম্মতির উত্তর পাচ্ছিল। আনতারা মৃধা সেই নীরবতাকে কাজে লাগালেন।
“আমি তোমাকে যা অফার করছি, তা কোনো অপরাধ নয়-তা তোমার নিজের ভালোবাসা ছিনিয়ে নেওয়ার শেষ সুযোগ। সারিম অরিকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু অরিকে পাওয়ার আসল অধিকার তোমার। কারণ তুমি তাকে কোনো স্বার্থ ছাড়া ভালোবেসেছ। তুমি যদি আমাকে এখান থেকে বের করার একটা ছোট পথ তৈরি করে দাও… শুধু একটু গোপন নজর এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা… তাহলে আমি এমন এক চাল চালব, যাতে সারিম নিজেই অরিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। আর সেই সুযোগে অরি চলে আসবে তোমার বুকে।”

আয়ুশ এক দৃষ্টিতে আনতারা মৃধার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাঁর মনের ভেতর তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। একপাশে তাঁর কর্তব্য, তাঁর নীতি, তাঁর আইনি দায়িত্ব এবং সবচেয়ে বড় কথা-সারিমের সাথে বহু বছরের অটুট বন্ধুত্ব। অন্যদিকে… তাঁর বুকের গহীনে লালন করা সেই অপ্রকাশিত, তীব্র ভালোবাসা!
“আপনি কি সত্যিই… অদ্রিজাকে আমার করে দিতে পারবেন?” আয়ুশের মুখ থেকে শব্দগুলো কেমন যেন অস্পষ্ট এবং দুর্বলভাবে বেরিয়ে এলো। তাঁর গলার স্বর বদলে গেছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর চরম এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে।
আনতারা মৃধা মনে মনে এক জয়ের হাসি হাসলেন। শিকার পুরোপুরি ফাঁদে পা দিয়েছে। প্রলোভনের বিষ এখন আয়ুশের রক্তে মিশে গেছে।
আনতারা মৃধা দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন। “আমি যা বলি, তা করি। তোমাকে শুধু আমার বের হওয়ার পথটুকু সুগম করতে হবে। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। সারিম কোনোদিন টেরও পাবে না যে এই খেলার পেছনে তুমি ছিলে। অরি তোমার হবে, আর সারিম পাবে তার ভুলের শাস্তি। ইট’স আ উইন-উইন ডিল ফর ইউ।”

আয়ুশ কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করলো। ঘরের সেই সাদা আলোটা যেন এখন তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। মস্তিষ্কের চিন্তা করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে। ভালো আর মন্দের সীমানাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। প্রিয়সীকে পাওয়ার অন্ধ লোভ, আর বন্ধুকে হারানোর ভয়-দুটোর চরম সংঘাতের মাঝে পড়ে আয়ুশ অবশেষে নতিস্বীকার করলো।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৪

সে চোখ খুললো।চোখে এখন আর কোনো পুলিশের তেজ নেই, কেবল এক পরাজিত প্রেমিকের ব্যাকুলতা।
আয়ুশ একদম নিচু স্বরে, অস্পষ্ট গলায় বললো, “তাহলে… দুই তারিখ রাত ১২টায় যখন ডিউটি চেঞ্জ হবে…”
আনতারা মৃধা তাঁর ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসির এক পূর্ণ রূপ ফুটিয়ে তুললেন। ঘরটির ভারী নিস্তব্ধতায় দুটো মানুষের মাঝখানে শুরু হলো এক গোপন আদান-প্রদান।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here