Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২২ (২)

অভিসৃতি পর্ব ২২ (২)

অভিসৃতি পর্ব ২২ (২)
নওরিন কবির তিশা

ঘোর তমসাচ্ছন্ন রজনী; অম্বরের বক্ষস্থলে নিভু নিভু আলো জ্বেলে নীরব প্রহরা দিয়ে চলেছে এক ফালি অর্ধচন্দ্র। পার্শ্ববর্তী পরিবেশ হতে ঝিঝিঁ পোকার গুঞ্জন ভেসে আসছে ক্ষণে ক্ষণে। নামাজরত ও কায়রার উপস্থিতি ব্যতীত,রিসর্টে কক্ষগুলো আপাতত ফাঁকা। বন্ধু মহলের প্রত্যেকেই নামাজ সেরে নিচে গিয়েছে। কালকে ওরা প্র্যাকটিকাল ফিল্ড ওয়ার্কের চূড়ান্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করবে।
বিগত দুটি দিন পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় জারি থাকা রেড অ্যালার্টের দরুন সমস্ত কার্যক্রম রুদ্ধ হয়েছিল, ফলে ঘরের চার দেয়াল ছাড়া গতি ছিল না। আজ নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতেই কালকের যাত্রা চূড়ান্ত হয়েছে। আর পরশুই আবার খুলনার চেনা আঙিনায় ফেরার তোড়জোড়।

এই শেষ রাতেই বন্ধুরা মিলে রিসোর্টের খোলা প্রাঙ্গণে চিকেন বারবিকিউ পার্টির উৎসবে মেতে উঠেছে। কলহাস্যে মুখরিত নীচের প্রাঙ্গণ। নামাজের পাটি গুটিয়ে ত্বরিত পদে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল কায়রা।নৈশ পবনের কনকনে স্পর্শে ওর চাদরখানা ঈষৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। অপার কৌতূহল ও বুকে চেপে থাকা প্রকাণ্ড উদ্বেগের অবসান ঘটাতে মুঠোফোনের ডিসপ্লেতে দুর্জয়ের নম্বরে স্পর্শ করল ও।
দুর্জয়ের প্রচন্ড চাপ থাকায় দুটো দিন কেটে গেলেও প্রিয় মানুষটির সাথে তত একটা বাক্যালাপ ঘটেনি ওর। অবশ্য, দুর্জয় ঠিকই নিয়মমাফিক প্রতিদিন দু’বার ফোন করতো। কিন্তু, সময়সীমা ছিল মাত্র পাঁচ মিনিট। রিং হওয়ার স্বল্পক্ষণের মধ্যেই অপর প্রান্ত হতে ভেসে এলো দুর্জয়ের সেই গম্ভীর, ভরাট ও প্রচ্ছন্ন স্নেহে জড়ানো কণ্ঠস্বর,,
“ঘুমাওনি এখনো?”
দুর্জয়ের কণ্ঠ শোনামাত্র কায়রার হৃদয় আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো নিমেষে অপসৃত হলো। ব্যালকনির রেলিং ধরে নিচু স্নিগ্ধ স্বরে বলল,
“নামাজে ছিলাম।”
দুর্জয় ঘড়ির কাঁটায় চায়। সাড়ে দশটা বাজতে চলেছে।
“এত দেরিতে?”
“জ্বী আসলে, আমি একটু বিজি ছিলাম। তারপর আম্মু কল করেছিল, এজন্যই।”
“আচ্ছা!”
“খুলনায় কবে ফিরছেন, মেজর?”

টেবিলে প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে প্রত্যুত্তর করলো দুর্জয়,,
“এখানে সিকিউরিটি চেকিং আর পেপারওয়ার্কের বেশ কিছু ঝামেলা এখনো পেন্ডিং। অলমোস্ট টু অর থ্রি উইকস লেগে যাবে ব্যাক করতে।”
কথাটা শুনতেই কায়রার বক্ষপিঞ্জরে সহসা এক প্রকাণ্ড শূন্যতা নেমে এলো। মৃদু আফসোস উগড়ে,ও ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
“কালকে কি একবার দেখা করা পসিবল হবে আপনার পক্ষে? আসলে… আমরা তো পরশুই খুলনায় ব্যাক করছি। আর কালকে আমাদের লাস্ট প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডওয়ার্ক। আপনি যদি একবার আসতেন…”
কায়রার আকুল আবদারে দুর্জয় ‌স্তব্ধ রইল ক্ষণকাল । সামরিক দায়িত্বের প্রকাণ্ড শৃঙ্খল আর ভালোবাসার এই স্নিগ্ধ আকুতির দোলাচলে ও কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই কক্ষের বাইরে হতে অধস্তনের ভারী বুটের শব্দ আর সশব্দ করাঘাত শোনা গেল,

“মেজর দুর্জয়, স্যার! হেডকোয়ার্টার্স থেকে জরুরি বার্তা এসেছে, কর্নেল স্যার আপনাকে ইমিডিয়েটলি ডেকেছেন!”
জরুরি এই তলবে দুর্জয়ের প্রখর চোখদুটি মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে উঠল। কায়রাকে উত্তর দেওয়ার ন্যূনতম সময়টুকুও রইল না আর। ও অত্যন্ত তড়িঘড়ি ও নিচু গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমাকে এখনই যেতে হবে।বাই,আর টেক কেয়ার অফ ইউরসেলফ, মাই লাভ!”
কথাটা শেষ হওয়ামাত্রই,ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কায়রা স্তব্ধ হয়ে মুঠোফোনের নিথর ডিসপ্লের পানে চেয়ে রইল। মনের গহীনে জমে থাকা আশার আলো নিভে গেল ধপ করে। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকেই মনে মনে ভর্ৎসনা করল ও,এমন ব্যস্ত আর জরুরি পরিস্থিতিতে লোকটাকে অযথা এই ফালতু অনুরোধটুকু করতে গেল কেন? ওনার ওপর তো পুরো দেশের সুরক্ষার দায়, অত সহজে কি আর আসা সম্ভব?
মন খারাপেরাও ওকে আসতে-পিষ্টে বেঁধে রাখতে চাইলেও পাত্তা দিল না ও। স্ত্রী হিসেবে এতোটুকু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে যে! চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে, নিচে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো ও।

নিচের পরিবেশটা জমে বেশ সরগরম। খোলা চত্বরের চতুর্পার্শ্বে বারবিকিউয়ের ধোয়াটে গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে পরম দক্ষতায় চিকেন বারবিকিউ করছে ইভান। ছোটবেলায় মা চলে যাওয়ার পর শিক্ষক বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে একা একা বড় হওয়ার দিনগুলোতেই ইভান এই স্বাবলম্বী হওয়ার কাজগুলো শিখে ফেলেছিল। ওর হাতের রান্নার প্রশংসা বন্ধুদের মাঝে সর্বজনবিদিত।
পাশের ছোট প্লাস্টিকের টেবিল ঘিরে রুশাফ, নিহার আর মেধা হাসিখুশি গল্পে মেতে আছে। কায়রাকে আসতে দেখে মেধা একগাল হেসে জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,
“আরে কায়া! এতক্ষণ পর নামলি? ইভুর মাস্টারপিস চিকেন বারবিকিউ একদম রেডি, জলদি আয়!”
কায়রা স্মিত হেসে ওদের পাশে গিয়ে বসল। অথচ একটু দূরে চেয়ারে হেলান দিয়ে নীরব হয়ে বসে ছিল তুজা। ওর মনটা জুড়ে কেবলই মেধার দেওয়া সেই ভালোবাসার সংজ্ঞাটা অনবরত ঘুরে মরছে। মস্তিষ্কে তোলপাড় চালাচ্ছে গুটি কয়েক প্রশ্ন,

“কে ওকে এত প্রায়োরিটি দিত? কোন মানুষের ভালোবাসা আর স্পেশাল কেয়ার ও সবসময় নিঃশব্দে পেয়ে এসেছে অথচ কখনো বুঝে ওঠেনি?”
অথচ মিলছে না উত্তর। ইভান প্লেটে গরম গরম চিকেন বারবিকিউ তুলে ওদের সামনে এনে রাখতে রাখতে হালকা মেজাজে বলল,
“নিন ম্যামরা, গরম গরম খেয়ে টেস্টটা কেমন হয়েছে জানাও। কায়রা, তুই একটু বেশি নে বইন, বরের অভাবে তোকে তো শুঁকিয়ে কাঠ মনে হচ্ছে!”
রুশাফ হা হা করে হেসে উঠে বলল,

“ইভান ভাই, তোর এই কুইক শেফ অবতারের জন্য কিন্তু একটা আলাদা পার্টি পাওনা থাকে!”
কায়রা ইভানের প্লেট থেকে এক টুকরো বারবিকিউ মুখে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল,
“সত্যি ইভান, তোর হাতের এই বারবিকিউয়ের কোনো তুলনা হয় না!”
প্রাঙ্গণের আনন্দ কোলাহলের মাঝে তুজার সেই দূরবর্তী, উদাসীন অবস্থান বন্ধুমহলের চোখ এড়ালো না। ইভান আলতো ইশারায় মেধাকে প্লেটটা দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“তুজাকে প্লেটটা একটু দিয়ে আয় তো।”
মেধা আবেশে বারবিকিউর কামড় বসিয়ে কুঁড়েমি মাখানো কণ্ঠে মুখ বাঁকাল,
“না রে ভাই, এই কাঁপানো ঠান্ডায় আমি একবার যেখানে বসেছি, আর উঠতে পারব না! তুই গিয়ে দিয়ে আয় না!”
ইভান চোখ রাঙিয়ে মেধার দিকে তাকালেও মেধা গোঁ ধরে প্লেটটা ঠেলে দিল। অগত্যা একপ্রকার বাধ্য হয়েই ইভান প্লেটটি হাতে নিয়ে তুজার দিকে পা বাড়াল। তুজার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনাসক্ত ভঙ্গিতে প্লেটটি বাড়িয়ে দিয়ে সংক্ষিপ্ত রুক্ষ কণ্ঠে বলল,

“ধর।”
স্বপ্নের ঘোর ভাঙার মতো চকিতে চকিত হয়ে মুখ তুলল তুজা। সম্মুখে সুঠাম অবয়বে নইভানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চটজলদি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে তোতলে বলল,
“আরে… তুই আসতে গেলি কেন? আমাকে একটা ডাক দিলেই তো পারতি!”
ইভান কোনো জবাব দিল না। প্লেটটি তুজার কোলে রেখে এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে পিছন ফিরে চলে যেতে চাইল। ঘটনার আকস্মিকতায় তুজা ত্বরিত হাত বাড়িয়ে খপ করে ইভানের হাতের কবজি আঁকড়ে ধরে থমকে দিল ওকে! ইভান থমকে দাঁড়িয়ে এক অতল, প্রখর দৃষ্টিতে তুজার বাঁধনের দিকে চাইল। পরম অসন্তোষে হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বরফশীতল স্বরে বলল,
“হাতটা ছাড়, তুজা! তামাশা করিস না!”
তুজা নিজের মুঠো আর একটু শক্ত করল। ব্যাকুল ও অশ্রুসিক্ত নয়নে ইভানের কাঠখোট্টা চেহারার পানে চেয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,

“ছাড়ব না! তুই এভাবে রোজ আমার থেকে পালিয়ে যাবি কেন, ইভান? তুই আমাকে একটু শান্তিতে কথা বলতেও দিবি না?”
ইভান প্রবল ঝটকায় হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বললাম তো হাতটা ছাড়! শুধু কেন সিন ক্রিয়েট করছিস? অন্তত বাকিদের সামনে নিজের আর আমার রেসপেক্টটা নষ্ট করিস না!”
“সিন ক্রিয়েট আমি করছি, নাকি তুই?”তুজা আসন ছেড়ে সোজা ইভানের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে গেল। ওষ্ঠাধর কামড়ে আকুল হয়ে বলল,
“সামান্য একটা ফান, একটা ফালতু কথার জের ধরে তুই এতটা বদলে যাবি? চারটে বছর ধরে ছায়ার মতো পাশে ছিলি, আর আজ আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিস? ইভান, প্লিজ আমার সাথে এমন করিস না!”
কৃত্রিম আলোক বিচ্ছুরণে ইভান লক্ষ্য করলো তূজার চক্ষু কার্নিশ চকচক করছে। হঠাৎ উপলব্ধি করলো,সত্যিই মেয়েটাকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শাস্তি দিয়ে ফেলেছে।তবু,অন্তরের প্রভাব মুখে না ফুটিয়ে নির্লিপ্ত বদনে বললো,,
“ওকে,ফাইন।আর এমন ইয়ার্কি করিস না কখনও।”
শ্রবণান্দ্রেয়কে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না তূজার। দৃষ্টি তুলে পুনরায় শুধালো,,
“সত্যি?স্যরি,মেনেছিস?”
“হ্যাঁ।”
বলেই জলদি পদে প্রস্থান করলো ইভান। আর,সে পথে চেয়ে বহুদিন বাদে প্রশান্ত অনুভূত হলো আর,মুখে ফুটলো মিষ্টি হাসি।

কুহেলির আস্তরণ ঠেলে, খানিক তপ্ত রোদ্দুরের দেখা মিলেছে বহুদিন বাদে। হাড় কাঁপানো শীতের আমেজ আজ বড্ড ফিকে লাগছে। তাই চাদর জড়ানোর প্রয়োজন বোধ করলো না কেউ। জিপ ছেড়েছে কিছুক্ষণ। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে, সম্মুখে ধাবমান সেটি। ছাদখোলা জিপে অবস্থানরত বন্ধু মহল, শেষ দিনটাকে ব্যাপকভাবে উপভোগ করতে চায়।তাই, ওরা না বসে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাড়ির ভেতরেই। তবে সবাই একসঙ্গে উঠছে না। বিশৃঙ্খলা হওয়ার শঙ্কায়।
প্রায় অর্ধ ঘণ্টার ব্যবধানে গন্তব্যস্থলে পৌঁছায় সকলে। যথারীতি, পরীক্ষণের কাজে তৎপর হয় ওরা। বেশ সকালে যাওয়ার দরুন, এগারোটার মাঝে সমস্ত কার্যক্রম চুকিয়ে ফিতে পেরেছে ওরা। আজ যেহেতু শেষ দিন তাই, একটু ঘোরাঘুরি করারও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেটা, দুপুরের পর।

সময়টা মধ্যাহ্ন। খাওয়াদাওয়ার পর্ব সাঙ্গ করে সকলে জিড়িয়ে নেওয়ার তোড়জোড় করছে। কাল রাতের পর থেকে দুর্জয়ের আর কোনো খবর নেই। সামরিক কাজের ঝুলন্ত ব্যস্ততা কায়রার খুব চেনা, তাই সে যে নিজে থেকে ডায়াল করে মানুষটাকে বিরক্ত করবে, সে সাধ্যও ওর ছিল না। তবে, আবেগী হৃদয় যে সে যুক্তি মানতে নারাজ। ক্ষণে ক্ষণে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে তা।
ও তুজাদের সাথে অনাসক্ত মনে গল্প করার ভান করছিল ঠিকই, কিন্তু মন পড়েছিল এক অজানা অধীরতায়। হঠাৎই পাশের টেবিলে পড়ে থাকা ফোনটা কম্পিত হলে অবহেলাভরে স্ক্রিনের দিকে চাইতেই কায়রার হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি বৃদ্ধি পেলো সহস্রগুণ। ও এক প্রকার রুদ্ধশ্বাসে রিসিভার কানে চেপে আলতো করে বলল,
“হ্যাঁ…”
অপর প্রান্ত হতে ভেসে এলো দুর্জয়ের অতি পরিচিত ভরাট আওয়াজ,
“বিশ মিনিটের ভেতর রেডি হয়ে নিচে এসো। আমি আসছি।”
চঞ্চল কায়রা এক মুহূর্তের তরে নিঝুম হলো। নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ দুটি বড় বড় করে তোতলে উঠল,

“আপনি… আপনি সত্যি আসছেন? এত ঝামেলার মাঝেও?”
দুর্জয়ের গম্ভীর ঠোঁটে যেন এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটল,
“মেজর দুর্জয় আহসান কখনো মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় না, মিসেস! দ্যাট ইউ নো ভেরি ওয়েল। জাস্ট গেট রেডি, আই উইল বি দেয়ার উইথইন টুয়েন্টি মিনিটস।”
কথাটি শেষ হতেই ফোনটি কেটে গেল। কায়রার হৃদয়ে তখন সহস্র প্রজাপতি ডানা মেলতে শুরু করেছে! যে মানুষটির দেখা পাওয়ার আশা ও ছেড়ে দিয়েছিল, সেই মানুষটিই স্বয়ং তাকে নিতে আসছে! প্রবল উচ্ছ্বাসে মেধা আর তুজাকে জড়িয়ে ধরে এক প্রকার নাচতে লাগল ও।
পাগলামি সামলে চটজলদি আলমারির ড্রয়ার থেকে বের করে আনল বহু যত্নে সাথে করে নিয়ে আসা শাড়িটি। দুর্জয়ের এই ক্ষুরধার, শৃঙ্খলিত সামরিক ব্যক্তিত্বের সাথে গাঢ়, গভীর রঙগুলো বড় অদ্ভুতভাবে মানিয়ে যায়। তাই, কায়রা বেছে নিয়েছে এক অপরূপ রয়্যাল ব্লু রঙা হালকা সিল্কের শাড়ি, যার পাড়জুড়ে সূক্ষ্ম রুপোলি নকশা।এটা দূর্জয়ই গিফট করেছিল ওকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এখনো এটা জড়াতে পারেনি শরীরে। অবশ্য পড়বেই বা কার জন্য? দুর্জয়- ই তো ছিল না।

মেধাদের সাহায্যে হাত চালিয়ে শাড়িটি শায়াড় পরিধান করে নিল ও। নিজের কোমরছোঁয়া ঈষৎ লালচে আভাযুক্ত ঘন চুলগুলোকে সুন্দর একটি ফ্রেঞ্চ বেণীতে রূপ দিল, যা গড়িয়ে এনে রাখল বক্ষের বাঁ পাশে।
শাড়ির আঁচলখানা গুছিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল কায়রা। তুলির আঁচড়ে চোখের কোল ঘেঁষে টেনে দিল আইলাইনার,দু ঠোঁটে হালকা রঞ্জকের ছোঁয়া আর কপালে রূপোলি মুক্তোর মতো ছোট্ট একটি স্টোনের টিপ বসিয়ে নিজেকে বড্ড অন্যরকম রূপে আবিষ্কার করলো।
মেধা কায়রার কাধ ধরে দর্পণে ওর প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বললো,
“মাই গড কায়রা! তোকে যা লাগছে না আজ! মেজরের মাথা পুরো খারাপ হয়ে যাবে নিশ্চিত।”
তুজা একপাশে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ মুখে বলল,
“সত্যিই রে! তোকে দেখে হিংসা হচ্ছে। আজ একটা নিজের মানুষ নেই বলে এভাবে সেজেগুজে কোথায় বেরোব তারও কোনো ঠিকানা নেই!”
তূজার কথার প্রত্যুত্তরে সবে বাক্য গুছিয়ে নিচ্ছে কায়রা। হঠাৎ, ছন্দপতন ঘটিয়ে সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো বেজে ওঠা ফোনটা। কায়রা জলদি সেটা রিসিভ করে কানে চেপে বলল,,

“হ্যালো?”
“হয়েছে?”
কায়রা হৃৎস্পন্দনের দ্রুত তাল সামলে মৃদু হেসে শুধাল,
“হ্যাঁ, হয়েছে। আপনি কোথায় এখন?”
“রিসোর্টের একদম মেইন গেটের সামনে। এসো, আর হ্যাঁ কেয়ারফুলি।”

কথাটা শোনামাত্রই কায়রা কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে এক ছুটে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। পর্দার আড়াল থেকে চোখ ফেলতেই আকস্মিক হৃদস্পন্দন থমকে গেলো ওর। রিসোর্টের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে একটি চকচকে কালো রঙা, দূর্জয়ের নিজস্ব ব্যক্তিগত জীপ। বনেটে হেলান দিয়ে দন্ডায়মান সুঠামদেহ আবৃত গাঢ় অলিভ গ্রীন ফরমাল শার্টে। বরাবরের ন্যায় মানানসই করে ইন করে রেখেছে সেটা। চোখে আঁটসাঁট করে এটে আছে সানগ্লাস। ফোনটা কানে চেপে রেখেছে।ও লাইন কেটে দিলো। টুটটুট শব্দ ও কানে আসতেই ধ্যান ভাঙলো ওর।
দুর্জয় এমন হঠাৎ করে ফোন কাটেনা। কিছু একটা বলেছে নিশ্চয়ই। তবে, স্বামীর সৌন্দর্যে মগ্ন মেয়েটার কর্ণকুহরে পৌঁছায়নি কিছুই।
তাই,ও আর একমুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কদমে নিচে নেমে এলো। গহীন বক্ষপিঞ্জরে তখন প্রলয়ঙ্করী উত্তেজনার দোলাচল। উন্মুক্ত চত্বরে পা রাখতেই ওর শাড়ির আঁচলখানা বাতাসে ঈষৎ উড্ডীন হচ্ছে। একটু অদূরেই নিজের কালো জিপের বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো দুর্জয়। হাতের মুঠোফোনের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ তাঁর। কায়রার মৃদু নূপুরহীন চটুল পায়ের শব্দে দুর্জয় ধীর গতিতে ফোন থেকে চোখ তুলে সামনে তাকালো—অতঃপর স্থাণু হয়ে গেলেন নিমেষে!

যেন প্রকাণ্ড এই পৃথিবীর সমস্ত গতি, সময়ের সমস্ত চাকা থমকে গিয়েছে এক নিমেষে। দুর্জয়ের কৃষ্ণচক্ষুর প্রখর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল কায়রার ওপর। রয়্যাল ব্লু সিল্কের নিখুঁত ভাঁজ, কোমর গড়িয়ে বক্ষ ছুঁয়ে থাকা সেই ফ্রেঞ্চ বেণী, কপালে ছোট্ট রূপোলি টিপ আর রূপসী প্রিয়তমার লাজুক অবনত মুখশ্রী–সব মিলে দুর্জয়ের ক্ষুরধার, ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলার দেয়াল চুরমার করে দিল মুহূর্তেই। সুদীর্ঘ সেনাজীবনে শত শত অনমনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখী হওয়া বীর সেনাপতির হৃদস্পন্দন আজ জীবনের প্রথমবার এভাবে অবাধ্য ও উন্মত্ত গতিতে লাফিয়ে উঠল!
কায়রা ধীরে ধীরে এগিয়ে দুর্জয়ের একদম সম্মুখে এসে দাঁড়াল। বক্ষপটের চঞ্চলতা গোপন করে, দু ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসির রেখা টেনে নিচু মিষ্টি কণ্ঠে শুধাল,
আমায়… কেমন লাগছে মেজর?”
দুর্জয় কায়রার দিকে এক পা এগিয়ে এলেন। অক্ষিপল্লব বিচলিত না করে, গভীর আচ্ছন্ন কণ্ঠে জবাব দিলেন,
“আমার লাগছে, একান্ত ব্যক্তিগত… সম্পূর্ণ আমার!”
কথাটি বলতেই দুর্জয়ের প্রচ্ছন্ন ভালোবাসার উষ্ণতায় কায়রার গাল দুটি রক্তিম আভায় রাঙিয়ে উঠল। লাজুক চোখে ও কেবল অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়তম পুরুষের পরম আশ্রয়ে। দূর্জয় ঘোর কাটিয়ে মাথা ঝাঁকালো। কি হয়েছে ওর? ওতো এভাবে কথা বলা মানুষ নয়। তৎক্ষণাৎ নিজের অপ্রস্তুত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে, কায়রার উদ্দেশ্যে বলল,,

“গাড়িতে ওঠো।”
কায়রা লাজুক হেসে দুর্জয়ের পাশের সিটে বসলো। দুর্জয় কাঙ্খিত স্থানে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুদূর এগোতেই, কায়রার দিকে না ফিরে শুধালো,,
“কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা আছে?”
“হুম।”

অভিসৃতি পর্ব ২২

উত্তর আগে থেকেই প্রস্তুত করা মনে হচ্ছে। দুর্জয় কায়রার দিকে চাইলো না এবারও।
“কোথায়?”
কায়রা ঘাড় ঘুরিয়ে দূর্জয়ের পানে পূর্ণদৃষ্টি মেলে বলল,,
“যেখানে আপনি নিয়ে যাবেন!”

অভিসৃতি পর্ব ২২ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here