Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২২ (৩)

অভিসৃতি পর্ব ২২ (৩)

অভিসৃতি পর্ব ২২ (৩)
নওরিন কবির তিশা

মৃদু বেগে সম্মুখে ধাবমান গাড়ির মধ্যে নিঃস্তব্ধতার রাজত্ব , দুর্জয়ের মনোযোগের প্রতিটি কণা কেবল সামনের পিচঢালা রাস্তায় নিবদ্ধ। কায়রা এতক্ষণ জানালার কাচে নিজের অলস দৃষ্টি মেলে রেখেছিল। কিন্তু হঠাৎই তার মনে এক অদ্ভুত অনুপস্থিতির অনুভূতি জেগে উঠল। দুর্জয় কি একবারও তার দিকে চেয়েছে? এত যত্ন করে, এতখানি সময় নিয়ে যে রূপের আয়োজন, তা তো কেবল একটিমাত্র দৃষ্টির প্রত্যাশাতেই সার্থক হওয়ার কথা ছিল!
হ্যাঁ, গাড়িটা ওঠার আগে একবার একটুখানি প্রশংসা দিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকেই নীরবতার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে মনোযোগ অন্যদিকে স্তুপীভূত করে রেখেছে দূর্জয়।

“এমম.. শুনছেন?”
দুর্জয়ের দৃষ্টি সরালো। পূর্বের অবস্থানে থেকেই বলল,,
“হুম?”
কায়রার আবেগি হৃদয় দোলা দিল। সার্বক্ষণিক পরিপক্ক থাকার চেষ্টা করলেও, এই মানুষটার সামনে এসে সবকিছু ন্যাকামিতে রূপান্তর হতে চায়। বারবার, বাচ্চাদের মতো আহ্লাদ পেতে চায় মন।তাই, অবহেলা সহ্য হলো না কিছুতেই। ও অভিমানমিশ্রিত তীক্ষ্ণ গলায় বললো,,
“গাড়ি থামান!”
দুর্জয় এবারাও কায়রার দিকে না তাকিয়ে, সমান দক্ষতায় স্টিয়ারিং ধরে রেখে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“কেন? কী হলো হঠাৎ?”
কায়রার ভেতরের রাগের পারদ ততক্ষণে আরেকটু চড়ে গেছে। সে ক্ষুব্ধ গলায় পাল্টা বলল,
“কী হয়েছে মানে? এতক্ষণ ধরে গাড়িতে বসে আছি, অথচ আপনি একবারও আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। কেন?”
দুর্জয় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে স্টিয়ারিংয়ে নিজের দখল শক্ত করলো, অত্যন্ত ধীর শান্ত গলায় জবাব দিল,
“কারণ, আমি এখনই কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করতে চাই না, কায়রা।”
কায়রা ভ্রু কুঁচকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়,,
“অ্যাক্সিডেন্টের সাথে আমার দিকে তাকানোর কী সম্পর্ক, শুনি?”

দুর্জয় এবার গাড়িটা আস্তে করে রাস্তার একপাশে থামাল। ইঞ্জিন বন্ধ করে, অপরিসীম মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে কায়রার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে ফিরে কায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“স্ট্রিট রুলস খুব স্পষ্ট-চোখ সরালেই বিপদ। অথচ, হৃদয়টা প্রথম বেহায়া হয়ে, নিয়মের বালাই ভুলে একজনের দিকে তাকিয়ে, গোটা পৃথিবী থমকে যাচ্ছে। গতিশীল গাড়িতে পৃথিবী থমকে দাঁড়ালে, অ্যাক্সিডেন্টর সম্ভাবনা ১০০%।”
প্রখর যুক্তিপূর্ণ কথায় এই প্রথম ফ্লার্টিংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পায় কায়রা। সীমাহীন লাজুকতা বেষ্টন করে ওর চারিধার। আড়ষ্টনেত্রে শির নত করে তৎক্ষণাৎ। দুর্জয় মুচকি হেসে, গাড়ি এগিয়ে নিয়ে চললো কাঙ্খিত গন্তব্যে।

মেঘমল্লার পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক টুকরা স্বর্গ রাজ্য যেন বান্দরবানের নীলাচল। অভূতপূর্ব সৌন্দর্যে মানব হৃদয়ে আচ্ছন্ন হয় মুহূর্তেই। পুঞ্জে পুঞ্জে শুভ্র মেঘের ভেলায় ভাসতে চায় অবচেতন মন। খানিকবাদে গাড়ি থামিয়ে, দুর্জয় নেমে এসে কায়রার পার্শ্ববর্তী দরজাটা খুলে দিলে চঞ্চল পদে নামলো কায়রা। আর পরক্ষণেই, আশ্চর্যান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সম্মুখে। মৃদুমন্দ পবন শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিতেই, ও মুগ্ধ কন্ঠে বলল,,
​“ওয়াও! ড্যাম বিউটিফুল! এত সুন্দর কী করে হতে পারে!”
​দুর্জয় কায়রার বিমোহিত মুখ পানে চাইলো; অতঃপর মৃদু হাস্যে নিজের সুগঠিত ডান হাতটি কায়রার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

​“যাওয়া যাক?”
​কায়রা এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে পরম ভরসায় দুর্জয়ের হাতটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। দুজনে একসঙ্গে সামনের দিকে পা বাড়াল। ​কিছুদূর এগোতেই কায়রার নজর গিয়ে পড়ল নীলাচলের সেই বিখ্যাত দোলনাটার ওপর। যা একেবারে পাহাড়ের খাঁজে, অগাধ শূন্যতার মুখে তৈরি। দোলনায় বসলে মনে হয় যেন সোজা মেঘের দেশে ভেসে যাওয়া যাবে। তা দেখেই কায়রা বাচ্চার মতো উৎফুল্ল হয়ে দুর্জয়ের হাত ধরে একটু ঝাঁকিয়ে বায়না ধরে বলল,
​“শুনছেন, আমি ঐ সুইংটাতে উঠব! আমাকে প্লিজ ঐ দোলনাটায় নিয়ে চলুন না!”
​দুর্জয় খাদ আর শূন্যতার গভীরতা দেখে খানিকটা শঙ্কিত হলো;ভ্রু যুগল সামান্য কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
​“না কায়রা, ইটস টু ডেঞ্জারাস! অত উঁচুতে খালি শূন্যতার ওপর ঝুলবে, একদম না।”
​কায়রা ছাড়ার পাত্রী নয়। সে দুর্জয়ের বাহু জড়িয়ে ধরে অভিমানী মুখে চোখ দুটো বড় বড় করে চাইল,
​“প্লিজ! নীলাচলে এসে সুইংয়ে উঠব না, তা হয় নাকি? আমি খুব কেয়ারফুল থাকব, প্রমিস! আপনি পাশে থাকবেন তো, তাহলে আর কিসের ভয়?”
​প্রিয়তমার এমন আবদার আর নিষ্পাপ চোখের চাহনি এড়িয়ে যাওয়া দুর্জয়ের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। যদিও শঙ্কায় ভ্রু কুচকে আসছে তবুও আদুরে বিড়াল ছানার আবদার রক্ষা করতে হবে তো? ও অলক্ষ্যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো,,

​“অকে, ফাইন! কিন্তু, অনলি ফর ফাইভ মিনিটস। ওকে?”
কায়রা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই,​ দুর্জয় ওকে সাথে নিয়ে দোলনার দায়িত্বে থাকা লোকগুলোর কাছে গেল। পাহাড়ি শূন্যতায় সুরক্ষার জন্য শুরু হলো নিখুঁত প্রসেসিং। কায়রা আর দুর্জয়ের কোমর ও কাঁধে মজবুত সেফটি বেল্ট ও হার্নেস শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো, মাথায় পরিয়ে দেওয়া হলো সুরক্ষামূলক হেলমেট। কারাবিনার ক্লিপগুলো যখন লোহার রশির সাথে শক্ত করে লক করা হলেও দূর্জয়ের স্বস্তি মিলল না। নির্ভীক সৈনিকের বক্ষ কাঁপছে দুরুদুরু এই মেয়েটাকে নিয়ে কোনরকম রিক্স নিতে পারবে না ও। চাইলেই কি, হৃদপিণ্ড কারো হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব?
অর্থাৎ চূড়ান্ত অবাস্তব এ কাজে মস্তিষ্কের সম্মতি না পাওয়ার সত্ত্বেও অপর প্রান্তের কোমল হৃদয়িনীকে কষ্ট দেওয়ার সাধ্য নেই তার। শেষমেষ উপায়ন্ত না পেয়ে,‌দুর্জয় আয়োজকদের কাছে গিয়ে কিঞ্চিৎ গম্ভীর স্বরে শুধাল,
“দোলনাগুলো তো বেশ সংকীর্ণ। কিন্তু আমরা দুজনে একসঙ্গেই উঠতে চাই। এমন কোনো ব্যবস্থা কি করা সম্ভব? আমি ডাবল পেমেন্ট করবো।”

দায়িত্বে থাকা যুবকটি ক্ষণকাল ইতস্তত করে বলল,
“স্যার, সাধারণত একজন করেই ওঠার নিয়ম। তবে আপনাদের সেফটি বেল্ট ও ডাবল কারাবিনার ক্লিপ দিয়ে বিশেষভাবে লক করে দিলে দুজনকে একসঙ্গেই দোলানো যাবে। এতে কোনো বিপদ নেই।”
দুর্জয় কেও ওখানে বসার ব্যাবস্থা করায় কায়রার চোখেমুখে যেন আনন্দের জোয়ার ভেসে উঠল। তবে পর্বতগাত্রে হেলান দিয়ে থাকা সেই অসীম শূন্যতার দিকে তাকাতেই তার অবচেতন মনে ভয়ের এক হালকা আভা ছড়িয়েছে বৈ কি। নিখুঁতভাবে সুরক্ষা কবচ পরিধানের পর, দুজনে একসঙ্গে দোলনায় উপবিষ্ট হতেই, জোরালো পাহাড়ি হাওয়ায় দোলনাটি শূন্যে দুলতে শুরু করল।
মুহূর্তের মধ্যেই পায়ের তলায় অফুরন্ত মেঘের রাজত্ব আর নিচে অতল খাদ দেখে কায়রার বুক ভয়ে কেঁপে উঠল।ও আঁতকে উঠে দু চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, অবলীলায় দুর্জয়ের শক্ত ছাতি আঁকড়ে ধরে নিজের মুখটা তার বুকে লুকিয়ে ফেলল। কায়রার ক্ষিপ্র কম্পন অনুভব করতেই দুর্জয়ের বাহু দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আরও গভীর আবেগে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল। কায়রার কানের কাছে মাথা নামিয়ে, দুর্জয় অত্যন্ত কোমল ও আর্দ্র কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,

“চোখ খোলো, কায়রা… ভয় পেয়ো না। আমি তো আছি, একদম আঁকড়ে ধরে আছি তোমাকে। দেখো, মেঘের অপার সৌন্দর্য আমার একান্ত পৃথিবীটাকে দেখার অপেক্ষায়।”
দুর্জয়ের বুকে কান পেতে তার ধুকপুক শব্দ আর সুদৃঢ় আশ্রয়ের উষ্ণতা পেতেই কায়রার ভয় যেন নিমেষেই উবে গেল। ধীরে ধীরে সে নয়ন উন্মীলন করল। চারিপাশের ভেসে চলা পুঞ্জীভূত শুভ্র মেঘের সাম্রাজ্যে বিলীন হলো দু’জনে।কায়রা সে অপরিসীম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দূর্জয়ের বুক ছেড়ে কাঁধে মাথা রেখে আনমনে বলল,,
“আমি আজীবন এভাবেই উড়তে চাই মেজর!”
দুর্জয় মুচকি হেসে, কাঁধে রাখা কায়রা আর মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ালো, সম্মতি জানিয়ে বলল,,
“ওকে,চলো একসাথে উড়বো!”

“তুমি ফিরবে কবে,উজান?”
ইথিকার উদ্বিগ্ন ভরা প্রশ্নের জবাবে অপারগতা স্বীকার করলো উজান,
“এখনই নিশ্চিত বলতে পারছি না,ইথি। অফিসের প্রেজেন্টেশনটা রি-শিডিউল হয়েছে, নতুন কিছু ডেভেলপমেন্টস সামলাতে হচ্ছে। কাজগুলো প্যাক-আপ করতেই আরও দু-একদিন লেগে যাবে।”
ইথিকা নিঃশ্বাস ফেলে অসন্তোষ প্রকাশ করলো,
“সিরিয়াসলি উজান? মাত্র এক সপ্তাহের কথা বলে গেলে, আর আজ প্রায় দু’সপ্তাহ হতে চললো! ঘর-সংসার বলে কিছু কি তোমার মনে আছে, নাকি কাজের আড়ালেই দিনরাত কাটিয়ে দেবে?”
উজান শান্ত কণ্ঠে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, জানু! ইচ্ছা করে তো আর দেরি করছি না। পরিস্থিতিটা হঠাৎ করেই একটু কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে।”
কথাটা শেষ হতেই পাশ থেকে কুহু প্রায় ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল,,

“পাপা,কবে আসবে তুমি?”
মেয়ের কন্ঠে কষ্টের পাল্লা ভারী হলো উজানের তবুও নিজেকে সামলে বলল,,
“দ্রুতই চলে আসবো মাম্মা।”
কুহু বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে বললো,, “আমার চকলেট আনবে কিন্তু।”
“ওকে মাম্মা। এবার,তোমার মাম্মার কাছে দাও তো।”
কুহু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে,ফোনটা মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল,,
“পাপা কথা বলবে।”
ইথিকা হাত বাড়িয়ে নিতেই কুহু কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো,
“হ্যালো, জানু। প্লিজ আপসেট হয়ো না।আমি দ্রুতই ফিরব,আসলে।”
“থাক,প্রব্লেম নাই।তোমার সময় অনুযায়ী এসো।”
খট করে ফোনটা কেটে যেতেই উজান প্রলম্বিত শ্বাস টেনে পাশ্ববর্তী টেবিলে সেটি রেখে, ল্যাপটপের উজ্জ্বল পর্দার দিকে পুনরায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। অফিসের এক বার্তা বাহক কক্ষে প্রবেশ করে সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যার, বস আপনাকে এখনই তাঁর কেবিনে ডেকেছেন।”
মুহূর্তেই উজানের হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বেগপ্রাপ্ত হয়ে,অহেতুক আশঙ্কার হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল ওর সমস্ত শিরা-উপশিরায়, ললাটে দেখা দিল সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু। নিজেকে অত্যন্ত কায়দা করে সামলে নিয়ে, মেকি গাম্ভীর্য বজায় রেখে সে উঠে দাঁড়িয়ে বসের কেবিনের দিকে ধীর পায়ে অগ্রসর হলো।

“উমমম…. নীলগিরি যাবেন মেজর? আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আজ বৃষ্টি নামবে না। আর নামলেও ক্ষতি কি? শীতের বৃষ্টিতে একটু ভিজলাম না হয়! শুনেছিলাম, ভালোবাসা গাঢ় হয়!”
এ পর্যায়ে চঞ্চল নারীকায়ায় পূর্ণদৃষ্টি হানলো দূর্জয়। লালচে ধূসর ঠোঁটদ্বয়ের কিঞ্চিৎ ফাঁক হতে, মৃদু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঘন্টাখানেক আগের, মধ্যাহ্ন এখন অপরাহ্ণের শেষ লগ্নের অপেক্ষা করছে।
“অলরেডি ৩ টে বাজে,আর এখন থেকে নীলগিরি যেতে অলমোস্ট ৫ টা বেজে যাবে।ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা।”
“তো?”
“তো, অনেক সন্ধ্যা হয়ে যাবে ওখানে যেতেই।”
দুর্জয়ের চিন্তার বিপরীতে, কায়রা আবদারের সুরে নিজের বক্তব্য পেশ করল,
“সন্ধ্যা হয়ে যাবে তো কী হয়েছে? আপনার শক্তিশালী জিপগাড়ি তো আছেই! ওটা নিয়ে রওনা হলে বড়জোড় এক ঘণ্টা পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমরা নীলগিরি পৌঁছে যাব। পাহাড়ি সন্ধ্যার সূর্যাস্ত দেখার আনন্দটাই যে আলাদা! প্লিজ, না করবেন না!”

দুর্জয় কিছুক্ষণ অনড় দাঁড়িয়ে রইল। আগের মতই কায়রার কাজলকালো চোখের এই আকুল আবেদন উপেক্ষা করা কঠিন। ও নিজের কপালে আঙুল ঘষে এক অপরিসীম প্রশ্রয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“ঠিক আছে, চলুন। কিন্তু এটাই শেষ গন্তব্য, এরপর আর কোনো বাহানা চলবে না।”
জিপের দিকে পা বাড়াতেই কায়রার দৃষ্টি আটকে গেল পথের ধারের একটি ছোট্ট পাহাড়ি ঝুপড়ি দোকানে। বাঁশের ডালায় সাজানো টাটকা ফল আর পাহাড়ি বিশেষ এক মুখরোচক খাবারের ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে আসছে। কায়রা বারবার সেদিকে আড়চোখে তাকাতে লাগল, লোভাতুর দৃষ্টি কাটতেই পারছে না। কিন্তু মাত্রই একটি আবদার পূরণ করিয়েছে বলে আর নতুন করে কিছু বলতে সাহসে কুলাচ্ছে না।
অথচ কায়রার এই দ্বিধাচ্ছন্ন দৃষ্টি এড়ালো না ‌দুর্জয়ের তীক্ষ্ণ নজর। ও কায়রাকে গাড়ির পাশে দাঁড়াতে বলে নীরব পদক্ষেপে নিজেই দোকানে গিয়ে হাজির হলো। মুহূর্ত কয়েকের মধ্যে সেই বিশেষ খাবারের ঠোঙাটি কিনে এনে কায়রার দিকে বাড়িয়ে দিল,

“খেতে ইচ্ছা করছিল যখন, বললে না কেন?”
কায়রা কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত হেসে নিচু স্বরে জবাব দিল,
“আপনিই তো বললেন আর কোনো আবদার না করতে! তাই…”
দুর্জয় কায়রার শিশুসুলভ যুক্তিতে মাথা নেড়ে মৃদু হাসল।
“আমার কাছে আবদার না করলে কার কাছে করবে?”
কায়রার ঠোঁটের কোণে ভালোবাসার এক ফালি মিষ্টি হাসি ফুটলো; দুর্জয়ের চোখের দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার কাছে তো মুখে ফুটে আবদারও করা লাগে না, আপনি না চাইতেই সব বুঝে যান!”
অতঃপর দুর্জয় গাড়ির দরজা খুলে দিলে কায়রা চটপটে ভঙ্গিতে ভেতরে গিয়ে বসল। অতঃপর, নীলগিরির সর্পিল পাহাড়ি পথ ধরে মেঘের রাজত্ব চিরে এগিয়ে চলল তাদের জিপ।

শৈল চূড়ায় সাঁঝের আধার ঘনিয়ে আসছে। শীতের দিন হাওয়ায়, দুর্জয় যত সম্ভব দ্রুত গাড়ি চালিয়েছে প্রিয়তমার কাঙ্ক্ষিত আবদার পূরণের লক্ষ্যে। সেই হিসাবেই নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা আগে এসে পৌঁছেছে তারা। অতঃপর সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত স্তরে দাঁড়িয়ে বড্ড কাছ থেকে মেঘেদের সৌন্দর্য উপভোগে লিপ্ত কায়রা। যেন হাত বাড়ালেই, শুভ্র মেঘের ভেলায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে ও। হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বেগপ্রাপ্ত হয়ে, শিশুসুলভ আবেগ কাজ করছে কায়রার মাঝে।
কায়রার আপ্লুত ক্ষণে দুর্জয় নিঃশব্দে ওর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। কায়রাকে স্বীয় বক্ষপঞ্জরের উষ্ণ আশ্রয়ে আগলে রেখে সে রেলিংয়ের ওপর কায়রার ডান ও বাম হাতের ওপর নিজের সুগঠিত দুটি হাত পরম মমতায় রাখল। কায়রা সামান্য পিছালেই এখন তার মাথা ঠেকবে দুর্জয়ের চওড়া বুকে।
সামনে দিগন্তবিস্তারী পাহাড়ি খাঁজ আর রক্তিম গোধূলির আলোছায়ায় মায়াবী হয়ে উঠেছে কায়রার আনন।ও আনমনে ফিসফিস করে বলে উঠল,,

“পৃথিবীটা কত সুন্দর, তাই না?”
দুর্জয় কায়রার ঘাড়ের কাছে মাথা নামিয়ে অত্যন্ত কোমল ও আর্দ্র কণ্ঠে বলল,,
“সমগ্র পৃথিবীর সৌন্দর্যের সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করাবো আমি। শুধু তোমার, এই সুখটা আজীবন ধরে রাখতে।”
প্রিয়া হৃদয়ে অনুরাগের সুতীব্র স্পন্দন জাগল। কায়রা ক্ষণকাল থমকে থেকে পেছনে ঘুরল। দুর্জয় ওকে এমনভাবে আগলে রেখেছিল যে, ঘোরার সাথে সাথেই ওর মুখখানি এসে স্থির হলো দুর্জয়ের সুদৃঢ় বক্ষের একেবারেই কাছাকাছি। দুর্জয় অসীম ভালোবাসায় অবনত হয়ে পাহাড়ের প্রান্তভাগে দাঁড়িয়ে কায়রার ললাটে এঁকে দিল এক গভীর, উষ্ণ ললাটচুম্বন।

অভিসৃতি পর্ব ২২

সেই স্পর্শে প্রকম্পিত কায়রা ক্ষণমাত্র দ্বিধা না করে স্বীয় বাহুডোরে দুর্জয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখখানি তার চওড়া বুকে গুঁজে দিয়ে চঞ্চল বিড়ালছানার মতো আলতো করে নাক ঘষল। হৃদপিণ্ডের তোলপাড় করা স্পন্দন অনুভব করতে করতে আবেশঘন কণ্ঠে বলল,,
“অতঃপর আপনাকে ভালোবেসে বুঝলাম, ভালোবাসা কেন এত পবিত্র,কেন এতটা সুন্দর!”

অভিসৃতি পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here