শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৯
আয়েশা শেখ
রাত তখন প্রগাঢ়, নিঝুম দুটো। সারা গ্রাম ঘুমে তলিয়ে আছে। বাঁশঝাড় আর আম-কাঁঠালের ঘন পাতার ফাঁক গলে মাঝে মাঝে ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও থেকে ডেকে ওঠা দু-একটা ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে শব্দ আর রাতের পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ছাড়া চারপাশে কোনো ব্যস্ততা নেই। নিঝুম অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে পরিপাটি মাটির রান্নাঘরটিতে তখনো এক চিলতে আলোর মিষ্টি আভা ছড়ানো। উনুনের শান্ত আঁচে ফুটতে থাকা তরকারির মনোরম সুবাস ভেসে আসছে চারপাশে।
সেই উনুনের পাশটিতে বসে আছে তুরান। সদ্য আঠারোয় পা দেওয়া মেয়েটি। গায়ের রং একেবারে ধবধবে ফর্সা না হলেও চেহারায় স্নিগ্ধ মায়াবী গড়ন রয়েছে। গায়ে জড়িয়ে রাখা সাধারণ একটা থ্রি-পিস, ওড়নাটা কাজের সুবিধার্থে শক্ত করে কোমরে পেঁচিয়ে রাখা।
হঠাৎ রান্নাঘরের দরজায় কারো পায়ের শব্দ পেতেই চমকে উঠল তুরান। দ্রুত পেছনে তাকাতেই দেখল, হাত দিয়ে চোখ কচলানো অবস্থায় ঘুম-ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে আছে ছোট বোন ইরান।
ইরান দরজায় ভর দিয়ে কৌতূহল নিয়ে শুধাল,
—এত রাতে কী করছো আপু?
— রান্না করছি। তুই উঠে পড়েছিস কেন?
— এত রাতে কেন রান্না করছো আপু? তোমার কী খিদে পেয়েছে?
তুরান কড়াই থেকে বাষ্প ওঠা গরম তরকারিটা এক পাশে সরিয়ে রেখে নরম গলায় বলল,
— না রে। বড় ভাইয়ার শহর থেকে আসতে আসতে ভোর হয়ে যাবে। অতটা জার্নি করে এসে রাতের বাসি খাবার খেলে ভালো লাগবে? এখন বানিয়ে রাখলে ভোর নাগাদ খাবারটা ফ্রেশ আর গরম পাবে।
—চাচীই তো করতে পারতেন। এত রাতে একা একা তোমার কষ্ট করার কী দরকার ছিল?
—থাক না… সারা দিন চাচী কত কাজ করেন। তা ছাড়া আমার রান্না করতে ভালোই লাগে।
ইরান ঠোঁট উল্টে টিপ্পনী কাটল,
—হ্যাঁ, বড় ভাইয়ার কথা হলে তো তুমি সবই পারো!
—পাকামো না করে গিয়ে ঘুমা তো!
— তোমার রান্না শেষ হয়নি এখনো? একা একা আমার ঘুম আসে না।
— আমার এখনো একটু দেরি হবে। তুই এক কাজ কর, মাকে ডেকে নিয়ে নিজের পাশে শুইয়ে নে।
— না, ওসব হবে না। তুমি তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করো।
— পাগলামি করিস না তো, যা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। সকালে আবার স্কুল আছে তোর।
ইরান কিছুক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে থেকে অগত্যা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। তুরান আর তাড়া করল না। ধীরে সুস্থে রান্না শেষ করে উনুনের পাশেই শান্ত হয়ে বসে রইল সে। বসে থাকতে থাকতেই রাত গড়িয়ে একসময় দূর থেকে ফজরের আযানের সুর ভেসে এল। উনুনের নিভু নিভু আলোতেই অযু সেরে নিজের রুমে গিয়ে নামাজে দাঁড়াল তুরান। নামাজ শেষে এক দীর্ঘ সিজদায় ঢলে পড়ল সে। তারপর দু’হাত তুলে চলল এক দীর্ঘ নিভৃত মোনাজাত।
ইরান বিছানায় শুয়ে শুয়েই আড়চোখে আপুকে দেখছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই দীর্ঘ মোনাজাতের প্রতিটা হরফে কার নাম লুকিয়ে আছে। আর কেউ নয়, তাদের বড় চাচার ছেলে।
ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান ফটকে কড়া নাড়ার হালকা শব্দ হলো। শব্দটা কানে যেতেই তুরান চটজলদি ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেয়। কারণ বড় ভাইয়া যদি ঘরে আলো জ্বলতে দেখে, তবে এক মুহূর্তেই বুঝে যাবে যে এত রাত অবধি তুরান জেগেই ছিল। ঘরের দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সে নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। দীর্ঘ দু’টি মাস পর আজ আবার মানুষটাকে চোখের সামনে দেখছে সে।
আঁধার ঢাকা করিডোর দিয়ে যুবকটি নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল। একটু পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে তুরানের রান্না করা গরম খাবার গুলো নিজের হাতে খাবার বেড়ে নিয়ে খেতে বসল।
ইরান পেছন থেকে ফিসফিস করে ডেকে উঠল,
—আপু, এবার তো অন্তত ঘুমাও…
তুরান দরজার ফাঁক থেকে সরে এসে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল ছোট বোনের পাশে।
———
ইরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের কোলের ওপর রাখা ঝিলমিলের চুলগুলো থেকে হাত সরাতেই ঝিলমিল চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠল,
— তারপর? থেমে গেলি কেন?
ইরান মৃদু কণ্ঠে বলল,
—তুই তো বারবার ঘুমিয়ে যাচ্ছিস।
— তারপর কী হয়েছিল বল না? তুরান আপুর দোয়াগুলো কি কবুল হয়েছিল? তুরান আপু আর তোর সেই চাচাতো ভাই নিশ্চয়ই এখন গ্রামে সুখে সংসার করছে, তাই না? আমাকে নিয়ে যাবি তোর গ্রামে?
ইরান আরও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—বাকি গল্প অন্য আরেক দিন বলব। এখন চুপচাপ উঠে কিছু খেয়ে নে তো।
ঝিলমিল এবার বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসল। ইদানীং দিনগুলো খুব বাজেভাবে কাটছে তার। একে তো কলেজের সেই জঘন্য ঘটনা আর অপবাদ, তার ওপর গত পরশু দিন লোকটার গালে চ”ড় মেরে আসা! বয়সে লোকটা তার চেয়ে কত বড়—ঝিলমিল কীভাবে পারল কাজটা করতে?
কিন্তু এমন না করে আর উপায়ই বা কী ছিল? লোকটার বেপরোয়া ভাব আর জেদের কারণেই তো আজ দুটো পরিবার এভাবে সবার সামনে ছোট হলো, তার সাথে ঝিলমিলের নিজের জীবনটাও বিষিয়ে উঠল। যা করেছে একদম ঠিক করেছে! পারলে লোকটার গালে আরও একটা চড় মারা উচিত ছিল! দুদিন ধরে এভাবেই কাটছে ওর। থা”প্পড় মারার জন্য একবার আফসোস হচ্ছে; আবার মনে হচ্ছে ঠিক করেছে।
ঘরে এসে হাজির হলো মেহরাজ। দরজায় দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে সে সোজা তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। তারপর বেশ উগ্র সুরে ইরানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এই মেয়ে, তোমাকে বলেছি না ওকে নিয়ে নিচে আসার জন্য? আর এখন তুমিই উল্টো এখানে বসে আছো!
ইরান সঙ্গে সঙ্গে তেঁতে উঠে জবাব দিল,
— আমি কী আপনার হুকুম মানতে এসেছি নাকি যে আপনার সব কথা শুনতে হবে?
— বড়রা কিছু বললে সেটা বিনা বাক্যে পালন করতে হয়, মুখে মুখে তর্ক করতে হয় না।
— বড়দের সম্মান বড়দের মতো আচরণ করলেই পাওয়া যায়।
মেহরাজ ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
— দেখেছিস তোর বান্ধবী কেমন বেয়াদব?
ইরান তড়িৎ গতিতে বলে উঠল,
— আপনিও তো কম নন!
— ‘আহা, থামো তো এবার! এমনিতেই মেজাজ ভালো নেই, ভালো লাগছে না।’ ঝিলমিল মাথা চেপে ধরে ওদের থামিয়ে দেয়।
মেহরাজ ইরানের দিকে একবার শক্ত নজরে তাকাল। তারপর ঝিলমিলের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল,
— নিচে চল ঝিলমিল, ভাইয়া ডাকছে।
ঝিলমিল ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
— কেন?
— আমাকে কিছু বলেনি, গিয়ে শোন।
নিচে নেমে আসতেই বসার ঘরে বিষণ্ণ মুখে বসে থাকতে দেখা গেল সবাইকে। আলতাফ চৌধুরী ধীরকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
— ঝিলমিল, তুমি তোমার আব্বুকে কতটা ভালোবাসো মা?
পাশে নূরজাহান বেগম চুপচাপ বিষাদগ্রস্ত মুখে বসে আছেন। বাবার এমন আচমকা প্রশ্নে ঝিলমিল বেশ অবাক হলো। বিস্ময় নিয়ে বলল,
— এ কেমন প্রশ্ন আব্বু? তোমাকে ভালোবাসার পরিমাপ আমি কীভাবে দেব? এ তো অপরিমাপযোগ্য!
— আমি জানি মা, তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো। আর এটাও জানি, তুমি কখনো তোমার বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না।
ঝিলমিল আশ্বস্ত হয়ে হাসিমুখে মাথা নাড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই টি-টেবিলে রাখা সাদা কাগজগুলোর দিকে চোখ পড়তেই ওর মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
আলতাফ সাহেব কলমটা তুলে দিয়ে বললেন,
— নাও, এটায় সাইন করে দাও।
কাগজের ওপরের লেখাগুলোর দিকে নজর পড়তেই ঝিলমিলের চোখজোড়া বড় হয়ে গেল,
— আব্বু! এটা তো… ডিভোর্স পেপার!
— হ্যাঁ, তোমার আর বারিশের ডিভোর্স পেপার।
— আব্বু!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরাজ আর ইরানও ততক্ষণে পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছে। মেহরাজ বলল,
— ভাইয়া, এসব কী বলছ? যা বলছ বা করছ, ভেবেচিন্তে করছ তো?
— আমি যা করছি, অনেক ভেবেচিন্তেই করছি। মেহরাজ, তুমি চুপ থাকো!
আলতাফ সাহেবের গলার জোর দৃঢ়।
— কিন্তু ভাইয়া, ঝিলমিল সাইন করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বারিশ তো এই কাগজে কখনো সাইন করবে না, আমি ওকে খুব ভালো করেই চিনি!
— ওর দিকটা ঝর্ণা শেহরিয়ার সামলাবে। তোমাকে তা নিয়ে ভাবতে হবে না।
ঝিলমিলের মাথায় যেন দ্বিতীয় বজ্রপাতটা ঘটল বাবার পরের সিদ্ধান্ত শুনে। আলতাফ চৌধুরীকে বেশ শান্ত গলায় বলতে শোনা গেল,
— ঝিলমিল চেনে ছেলেটাকে। ওরই কলেজের টিচার ফাহিম। খুব ভদ্র ছেলে। সে-ও ঝিলমিলকে খুব পছন্দ করে। তাই ডিভোর্সের ঝামেলাটা চুকে গেলেই ওর সঙ্গে এঙ্গেজমেন্টটা সেরে ফেলব। তারপর ঝিলমিল এইচএসসি দিলে বিয়েটা হবে।
বাবার মুখের বাক্য গুলো যেন ধারালো তীরের মতো এসে বিঁধল ঝিলমিলের বুকে। ফাহিম স্যার তাকে পছন্দ করে?! আর কেউ বাকি ছিল না এই দুনিয়ায়? ঝিলমিল বাবার দিকে তাকিয়ে সরাসরি কঠিন কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
— আমি বিবাহিত, আব্বু! আর তুমি কিনা ইতিমধ্যেই আমার জন্য ডিভোর্স পেপার আর নতুন পাত্র দুটোই রেডি করে রেখেছ?
আলতাফ সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন,
— এই লোকদেখানো বিয়ের কোনো অর্থ নেই। তোমার দাদীমার বোকামির জন্য এসব হয়েছে। এতসব ঘটে যাওয়ার পরও তুমি কি এখনও সেই ছেলের কাছে ফিরে যেতে চাও?
— ফিরে তো যাচ্ছি না, কিন্তু হুট করে ডিভোর্স আর আরেকটা বিয়ে…
— চুপচাপ সাইন করো, ঝিলমিল! আমাকে আর রাগিও না।
ঝিলমিল এবার অসহায়ত্ব নিয়ে মেহরাজের দিকে তাকাল। মেহরাজ বলল,
— ভাইয়া! মানছি বারিশকে তোমার পছন্দ নয়। কিন্তু এত বড় একটা সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নিয়ে নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? আমি বারিশকে বোঝাব, ওকে তুমি যেমন চাও তেমন করে গড়ে তুলব। তুমি প্লিজ এখন এসব করো না!
— নিজের বন্ধুর পক্ষে ওকালতি করা বন্ধ করো। ভাতিজির সাথে এত বড় কাণ্ড ঘটে যাওয়ার পরও তুমি কোন মুখে ওর হয়ে সাফাই গাইছ?
মেহরাজ আর কোনো কথা না বলে চুপ হয়ে গেল। আলতাফ চৌধুরী মেয়েকে আবারও সাইন করার জন্য বলতে লাগলেন। ঝিলমিল একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে ভাঙা গলায় বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে একটু সময় দাও।
— সময় নাও, তবে সাইন করতে যেন আমাকে আর দ্বিতীয়বার বলতে না হয়। কাল ফাহিমের পরিবার আসবে, ওর সঙ্গে আমার সব কথা হয়ে গেছে। কাল একদম সুন্দর করে সেজেগুজে তৈরি থাকবে। দীঘির মতো কোনো পাগলামি যেন করতে না দেখি! মায়ের থেকে একটা ভালো শাড়ি নিয়ে সেটা পরবে।
ঝিলমিল এক পা পিছিয়ে শক্ত গলায় সোজা না করে দিল,
— না! আমি এখন কাউকে বিয়ে করতে পারব না। আর যার কথা বলছ, তাকে আমি কোনোদিনও অন্য নজরে দেখতে পারব না।
আলতাফ চৌধুরী চোখ সরু করে মেয়ের দিকে চাইলেন,
— তার মানে তুমি বাবাকে ভালোবাসো না?
ঝিলমিল অবাক হয়ে বলল,
— আমি এটা কখন বললাম?
— আমার কথা শুনবে না মানেই তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
—‘ আব্বু আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ কাঁপল ঝিলমিলের গলা।
— যদি নিজের বাবাকে ভালোবেসেই থাকো, তাহলে এই মুহূর্তে ডি*ভোর্স পেপারে সাইন করো। তবেই বুঝব তুমি আমার বাধ্য মেয়ে।
ঝিলমিল কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বাবার মুখের দিকে চেয়ে রইল। দীঘি নেমে এলো উপর থেকে। লিভিং রুমে সবাইকে এমন গম্ভীর অবস্থায় দেখে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল,
— কী হয়েছে এখানে?
ঝিলমিল কাগজটা দেখাল। চোখে না চাইতেও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। দীঘি প্রথমে হাতের কাগজটা দেখল, তারপর কিছুক্ষণ চেয়ে রইল ঝিলমিলের বিষণ্ন মুখের দিকে। এরপর বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল,
—মেয়েকে ডিভোর্সি করার এত শখ কেন তোমার?
উত্তরে আলতাফ সাহেব বললেন,
— স্বাধে করাচ্ছি না। ভুলে যাস না, তোর জন্যই এইদিন এসেছে।
— কথায় কথায় আমার দোষ দেবে না! যার কপালে যে ছিল,সে-ই জুটেছে।
—এসব অহেতুক কথা বাদ দিয়ে ওকে বলো দ্রুত সাইন করতে।
আলতাফ চৌধুরী অধৈর্য হয়ে উঠলেন। দীঘি আবারও ঝিলমিলের দিকে তাকাল। কাছে এসে ধীর গলায় বলল,
—তোকে আমি ডিভোর্স পেপারে সাইন করতেও বলব না, নিষেধও করব না। শুধু বলব—নিজের মন যেটা চায়, সেটাই কর। আবারও বলছি, নিজের ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দে।
ফুপির কথাগুলো ঝিলমিলের মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। সে আর কারো দিকে না তাকিয়ে ডিভোর্স পেপারটা আঁকড়ে ধরে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। দরজা লক করে কাগজটা ছুড়ে ফেলল মেঝের ওপর।
কিসের এত শত্রুতা তার বাবা আর বারিশের মধ্যে? কেন বাবা তার এতটা কঠোর হচ্ছেন? সেদিন লোকটার গায়ে হাত তুলে ফেলেছিল ঝিলমিল, তারপর থেকে অপরাধবোধে ভেতরে ভেতরে পুড়ছে সে। এখন কীভাবে এই কাগজে নিজের স্বাক্ষর বসাবে? আর কীভাবে ফাহিমকে বিয়ে করবে–যার কাছে সামান্য প্রাইভেট পড়ার অনুমতিটুকুও একসময় লোকটা দেয়নি!
ঝিলমিলের সত্তা যেন চাবুক মেরে বলছে, ‘বিয়ে তো করেছিলি নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে, তবে এখন এত নাটক কিসের? বাইরের একটা ছেলের জন্য নিজের বাবার বিরুদ্ধে যাবি? যে বাবা তোকে রাজরানীর মতো করে বড় করেছেন?’
কিন্তু হৃদয়ের অন্য কোণ থেকে প্রতিবাদ ভেসে আসে, ‘নিজের স্বার্থের জন্য একটা মানুষকে এভাবে ব্যবহার করলি? অথচ সেই লোকটাই তো সেদিন ভরা কলেজে তোকে নিজের স্ত্রী বলে সবার সামনে স্বীকৃতি দিয়েছিল! তা না হলে এত বড় অপবাদ তুই সহ্য করতি কীভাবে?’
ক্লান্তি আর মানসিক অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে ঝিলমিল একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। ঘুম যখন ভাঙল, তখন মাঝরাত। ধড়ফড় করে উঠে বসল ঝিলমিল। দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল বেলকনিতে। পাশের ভিলার বারিশের ঘরটা আজও ঘোর অন্ধকারে ডুবে আছে। ঝিলমিল সেখান থেকে চলে আসার পর একটা রাতের জন্যও সেই ঘরের আলো জ্বলতে দেখেনি।
চারপাশটা নিঝুম, বুকের ভেতর এক নিঃশব্দ শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল। রুম থেকে বেরিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে ছাদে উঠে এলো ঝিলমিল। সেখানে গিয়ে দেখা মিলল আরেক বিষাদময়ী তরুণীর। ছাদের রেলিং ধরে একা দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে নিরবে চোখের জল ফেলছে দীঘি।
— ফুপি?
চোখ না সরিয়েই দীঘি জবাব দিল, –‘বল।’
— কেন কাঁদছ ফুপি?
— কেন, আমার কি কান্নাকাটি করা বারণ?
— তাহসিন আঙ্কেলের জন্য কাঁদছ?
দীঘি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— জানি না। এত রাতে তুই জেগে আছিস কেন?
— ঘুম ভেঙে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
ঝিলমিল আস্তে করে বলল। দীঘি এবার চোখ ফিরিয়ে ভাতিজির দিকে তাকাল। নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো একটা মলিন হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। নিচু গলায় বলল,
—ভেতরটা ভীষণ পুড়ে যায়, তাই না রে? মনে হয় কোনো এক অদৃশ্য বিষাক্ত কাঁটা বুকের গহীনে চিনচিন করে বিঁধছে। অথচ কাউকে ডেকে সেই পোড়াটুকু দেখানো যায় না!
ঝিলমিল তাকিয়ে রইল ফুপির দিকে। তার ফুপি একদম ঠিক বলেছে। একদম নিখুঁত করে ফুটিয়ে তুলেছে তার ভেতরের তোলপাড়টা। শুকনো গলায় সে বলল,
— আমার আগে কখনো এমন লাগেনি।
— আগে তো কাউকে হারানোর ভয় বা পাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, তাই লাগেনি।
— আমার এখনো কাউকে হারানোর ভয় নেই, আর না আছে পাওয়ার ইচ্ছে।
এবারেও হাসল দীঘি। বোকা মেয়েটা কবে অনুভূতি বুঝবে? আবারও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— না থাকাই ভালো।
ঝিলমিল এবার দীঘিকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে উঠল। জড়ানো গলায় বলতে লাগল,
— সেদিন কেন পালিয়ে গেলে তুমি? সেদিন পালিয়ে না গেলে আজ আমার এইদিন দেখতে হতো না। শান্তিতে ঘুমাতাম, খেতাম, ঘুরে বেড়াতাম। আমি তো আগেই ভালো ছিলাম। এই লোকটা আমাকে কাছে থেকেও জ্বালিয়েছে, দূরে থেকেও পোড়াচ্ছে।
— জানি আমি…বাইরে থেকে সব শান্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সব কিছু যেন ছাই হয়ে যায়। যাকে মন থেকে মুছে ফেলতে চাইবি, রাতের এই নির্জনতায় সেই মুখটাই বারবার ভেসে উঠবে।
ঝিলমিল ভেজা চোখে গাল থেকে জল মুছে ফুপির দিকে চাইল,
— তোমারও এমন লাগে ফুপি? তুমি তো এতটা নরম নও।
দীঘির চাহনি আঁধারে ঢাকা দূর দিগন্তে থমকে রইল।
— আমরা যারা নিজেদের সবার সামনে কঠিন হিসেবে জাহির করি–দুনিয়াতে আসলে তারাই সবচাইতে বেশি অসহায়। দুর্বলরা সহজেই সবার সামনে কাঁদতে পারে। কাঁদতে পারে না কেবল তারাই, যারা নিজেদের ক্ষতকে লোকচক্ষুর অন্তরালে শক্ত আবরণে মুড়িয়ে রাখে।
হঠাৎই এক তৃতীয় কণ্ঠের আগমন ঘটল। পেছন থেকে খুব শান্ত, অথচ গভীর কণ্ঠে কেউ বলে উঠল
— আপনি একদম ঠিক বলেছেন, ম্যাম। এই যে কঠিন আবরণে ঢাকা মানুষগুলো–এদের ভেতরের ক্ষত কিংবা অসহায়ত্বটুকু কেউ কোনোদিন বুঝতে পারে না।
কথাটা শুনে দীঘি না চমকালেও ঝিলমিল চমকে উঠল। রাতের এ রকম নিঝুম নীরবতায় হঠাৎ কারও উপস্থিতি সে মোটেও আশা করেনি। দৃষ্টি ফিরিয়ে তাহসিনকে দেখল। পরনে নিতান্তই সাধারণ একটা ট্রাউজার আর টি-শার্ট। দীঘির মুখাবয়ব মুহূর্তে কঠোর রূপ নিল। গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে দীঘি বলল,
— তোমাকে না আমি বারণ করেছি আমার সামনে কখনো না আসতে?
তাহসিন মৃদু হেসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল,
— আমি তো আপনার সামনে আসিনি, ম্যাম। ছাদে এসেছি। এই খোলা ছাদ তো কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়—এখানে আপনি, আমি বা যে কেউই আসতে পারে।
দীঘি এবার তাহসিনের দিকে না তাকিয়ে ঝিলমিলের উদ্দেশ্যে বলল,
— ঝিলমিল, ওকে এখান থেকে চলে যেতে বল।
— এত রাতে এখানে কেন এসেছেন, আঙ্কেল?
— ‘তোমরা কেন এসেছ?’ উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল তাহসিন।
— আমার ভালো লাগছিল না, তাই একটু বাতাসে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। এসে দেখি ফুপিও এখানে।
— সুখের সাথীকে নিজের থেকে জোর করে দূরে সরিয়ে রাখলে মন ভালো থাকবে কীভাবে?
ঝিলমিল ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
— মানে?
— মানে খুব সহজ। ভালো তোমার লাগবেও না। যতক্ষণ না নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষটার আলিঙ্গন পাবে, ততক্ষণ বুকের ভেতরের এই অনল-দহন থেকে কিছুতেই মুক্তি মিলবে না।
ঝিলমিল আরও বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
— আমি আপনার পেঁচানো কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, আঙ্কেল!
— বোঝা কঠিন কিছু নয়। তবে তার আগে বলো, তোমার ঠিক কেন ভালো লাগছে না?
— আমি কীভাবে বলব? আমি নিজেও তো জানি না! শুধু এইটুকুই বুঝি, আমার ভেতরটা ভীষণ অস্থির লাগছে। ঘুমালেও শান্তি পাচ্ছি না, জেগে থাকলেও শান্তি নেই। এমনকি কারও সাথে কথা বললেও সেই যন্ত্রণা কমছে না।
তাহসিন ঝিলমিলের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
— যার পাশে থাকলে শান্তি মিলবে—তাকে নিজে অশান্তিতে রেখে তুমি কীভাবে শান্তি আশা করো?
— মানে… আপনি কার কথা বলছেন?
— চোখ দুটো বন্ধ করো। চোখ বন্ধ করে ভাবো তুমি তোমার সবচাইতে কাছের মানুষকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছ। চোখ বন্ধ করার পর যাকে তুমি দেখতে পাবে, আর কল্পনায় যাকে আলিঙ্গন করবে–ঠিক সেই মানুষটাই তোমাকে এই অস্থিরতা আর বিষাদ থেকে মুক্তি দিতে পারবে।
ঝিলমিল কোনো কিছু না ভেবেই ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। চারপাশটা নিঝুম। কয়েক সেকেন্ড পার হতেই ঝিলমিলের কল্পনার ক্যানভাসে একটা মুখ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠল। আর সেই মুখটা ফুটে উঠতেই ঝিলমিল এক ঝটকায় চোখ দুটো মেলে ধরল! বুকের ভেতরটা প্রবল বেগে ধড়ফড় করে উঠল তার। সে এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাহসিনের পানে চেয়ে রইল। তাহসিন আঙ্কেল যেন খুব সহজেই ঝিলমিলের কাছের মানুষটাকে ধরিয়ে দিয়েছে।
কল্পনায় ভেসে ওঠা সেই মানুষটা অন্য কেউ নয়–তার নিজের স্বামী! যে লোকটার হাত থেকে সে পালাতে চাইছে, যাকে সে মন থেকে মুছে ফেলার হাজারটা চেষ্টা করছে, দিনশেষে সেই বারিশই তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে জড়িয়ে আছে।
নিজের এই উপলব্ধি সহ্য করতে না পেরে ঝিলমিল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ফুপি কিংবা তাহসিন—কাউকে কিছু না বলে সেখান থেকে দ্রুত পদে ছাদ ছেড়ে নিচে নেমে গেল।
ঝিলমিলকে চলে যেতে দেখে দীঘিও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে-ও চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই তাহসিন আচমকা তার হাত চেপে ধরল। হাতের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ পেতেই তীব্র হয়ে উঠল দীঘির চোখ দুটি। সে শক্ত গলায় বলে উঠল,
— হাত ছাড়ো আমার!
তাহসিন হাত না ছেড়েই চোখ দুটো সামান্য ছোট করে শান্ত গলায় বলল,
— আপনিও একবার ট্রাই করে দেখতে পারেন, ম্যাম।
দীঘি হাত ছাড়ানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
— আমি যাকে জড়িয়ে ধরব, সে তো এখানে নেই।
চোখের দৃষ্টি থমকে গেল তাহসিনের,
— কাকে?
— রেহান।
শব্দটা উচ্চারণ হতেই তাহসিনের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এলো। হ্যাঁ, রেহান আর দীঘির বিয়েটা পাকা হয়ে গেছে। রেহানের পরিবার দীঘিকে পছন্দ না করলেও, রেহান হলো নাছোড়বান্দা! সে নাকি এখন দীঘিকে ছাড়া বাঁচবে না, বিয়ে করলে দীঘিকেই করবে। নূরজাহান চৌধুরীও এ বিষয়ে সায় দিয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে যাবে।
তাহসিন ধীরে ধীরে দীঘির হাতটা ছেড়ে দিল। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দীঘি সোজা ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। দীঘির অবয়বটা পুরোপুরি মিলিয়ে যেতেই তাহসিন পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করতেই ভেসে উঠল এক অতি সাধারণ তরুণীর ছবি, যার দিকে তাহসিন কিছু সময় অপলক চেয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত পর সে একটা নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করল। ওপাশে রিং হতে লাগল বারবার, কিন্তু প্রথমবার কলটা ধরল না। বেশ কিছুক্ষণ বাজার পর অবশেষে ওপাশ থেকে রিসিভ করার শব্দ এলো। তাহসিন তক্ষণি গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
— বউকে দিয়ে ডিভোর্স পেপারে সাইন করিয়ে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছে–আর আপনি মাত্র একটা চড় খেয়েই দেবদাস সেজে বসে আছেন?
ওপাশ থেকে কিছু একটা উত্তর আসতেই তাহসিন যোগ করল,
— কাল সন্ধ্যায় আপনার বউয়ের বাগদান সম্পন্ন হতে চলেছে। সময়মতো চলে আসবেন!
পরদিন ভোর পাঁচটা-
ঘুমের ঘোর ভেঙে ঝিলমিলের কানে এলো দরজায় একাধারে ঠকঠক করার শব্দ। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল সে। বিরক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
— এত সকালে দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন?
ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। ঝিলমিল কিছুটা অবাক হয়ে বিছানা ছাড়ল। ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে সামান্য পানির ঝাপটা দিয়ে ফিরে এসে দরজার লকে হাত দিল। লকটা হালকা খুলতেই বাইরে থেকে ঝড়ের বেগে দরজাটা হুড়মুড় করে খুলে গেল। ঝিলমিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল ঝোড়ো হাওয়া তাকে গ্রাস করে নিল যেন। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানবটা এক ঝটকায় মেয়েটার ঘাড়ে থাবা বসিয়ে নিজের বুকের কাছে টেনে এনে চোখের পলকে তার কোমল ঠোঁট দুটো নিজের অধিকারে নিয়ে নিল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল কিশোরী! সে আঁতকে উঠল, কান্নায় কাঁপল, আকুতি জানাতে চাইল–কিন্তু কোনো কিছুরই অবকাশ পেল না। বারিশ তার অধরে অধিপত্য বজায় রেখেই রুমের ভেতরে ঢুকে পেছনের এক হাতে শক্ত করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। ঝিলমিল তার সর্বশক্তি দিয়ে বারিশের চওড়া বুকে আঘাত করতে লাগল। কিন্তু বারিশকে সেখান থেকে এক ইঞ্চিও সরানো গেল না। তার এই বাঁধভাঙা চুম্বনের তোড়ে পেছাতে পেছাতে ঝিলমিলের পিঠ গিয়ে ঠেকল দেয়ালের গায়ে। অনবরত আ”ঘাত করার কারণে বারিশ এবার ঝিলমিলের দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। একের পর এক উগ্র , তৃষ্ণার্ত ,অধৈর্য ছোঁয়ায় কিশোরীর কোমল অধর জোড়ায় নিজের ধারালো দাঁতের নিবিড় প্রহার বসিয়ে র”ক্তাক্ত করে দিল বেপরোয়া পরুষ।
ক্ষ”তের নোনা রক্ত আর ঝিলমিলের অশ্রুর নোনতা স্বাদ একাকার হয়ে ঠোঁটে পেতেই বারিশ নিজেকে সামান্য সরাল। তারপর নিজের এক আঙুল দিয়ে ঝিলমিলের ক্ষ”তবিক্ষ”ত ও র”ক্তাভ ঠোঁটটা চেপে ধরে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
— যা! এখন গিয়ে দেখা তোর বাপকে—যে এটা তোর স্বামীর দেওয়া ভালোবাসার ছোঁয়া!
ঝিলমিল ক্রন্দনরত অবস্থায় একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। কেবল হু-হু করে কাঁদতে থাকল। আর বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। দীর্ঘক্ষণ দম আটকে থাকায় চারপাশটা চক্কর দিয়ে উঠছে তার। মেয়েটার নিঃশ্বাসের তীব্র হাঁসফাঁস দেখেও বারিশের শক্ত মন গলল না। সে কড়া গলায় তাগাদা দিল,
— কী হলো, যা না!
ঝিলমিল তখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। বারবার শ্বাস টানার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল সে। মাথাটা ঝিমঝিম করে আসতেই বারিশ মুহূর্তকাল না ভেবে সজোরে তার এক বাহু চেপে ধরল,
— চল আমার সাথে! অনেক দেখেছি তোদের বাবা-মেয়ের নাটক!
ঝিলমিল এক পা-ও এগোল না। সম্পূর্ণ শরীর ছেড়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে জানালার ভারী পর্দাটা আঁকড়ে ধরে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বারিশ এবার ঝিলমিলের দিকে হিং”স্র চোখে চাইল। তার সেই দৃষ্টিতে যেন আস্ত একটা প্রলয় লুকিয়ে আছে। এক ঝটকায় ঝিলমিলের বাহুতে টান মেরে সে গর্জনের সুরে বলল,
— কী হলো, তোকে যেতে বলেছি না আমি?
কিশোরীর সমস্ত শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল। বারিশের চোখ দুটো রেগে গেলে এমনিতেই লাল হয়ে যায়, কিন্তু এখন সেই চোখের কোণে জমাট বেঁধে আছে এক অস্বাভাবিক, ভয়াল র”ক্তিম আভা। ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
—আ-আপনার চোখ এত লাল কেন?
বারিশ সেই প্রশ্নের জবাব দিল না। উল্টো প্রশ্ন করল,
— ডিভোর্স দিবি আমাকে?
—কী খেয়েছেন আপনি? কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কেন?
— অন্য পুরুষকে বিয়ে করবি?
— কোথায় ছিলেন আপনি এতদিন?
— ছেড়ে যাবি আমায়?
— এত যন্ত্রণা কেন দিচ্ছেন?
বারিশ কোনো কথারই উত্তর দিল না। ঝিলমিলের কোনো প্রশ্নই যেন তার কানে পৌঁছাল না। সে কেবল নিজের ভেতরের দহন আর উগ্র মাতলামি নিয়ে ঝিলমিলের চোখে চোখ রেখে হাঁফাতে লাগল–যেন উত্তর শোনার জন্য নয়, নিজের ভেতরের প্রলয়টাকে উগড়ে দিতেই সে একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে!
বারিশ এবার ঝিলমিলের হাত চেপে ধরে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে দরজার দিকে নিয়ে এলো। শক্ত হাতে লক খুলে সজোরে দরজাটা টেনে ধরে একপ্রকার জোর করেই তাকে নিচে নিয়ে যেতেই তারা বাকিদের মুখোমুখি হলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঝিলমিল দ্রুত ওড়না টেনে নিজের ক্ষ”তে ভরা ঠোঁট দুটো ঢেকে ফেলল।
সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন আলতাফ চৌধুরী, নূরজাহান বেগম, নাজমা বেগম আর তাহসিন। দীঘি আর মেহরাজ তখনও ঘুমে। ঝিলমিলের চোখ হঠাৎ গিয়ে ঠেকলো তার বাবার হাতের দিকে। আলতাফ চৌধুরী নিজের পেছনে ধাতব কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছেন। সেটা আবছায়ায় দেখেই ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। নিজের ভয় চেপে বারিশকে সজোরে একটা ধা”ক্কা দিয়ে বলে উঠল,
— চলে যান আপনি! কেন এসে বারবার আমাকে বি”রক্ত করছেন? আমি কোত্থাও যাব না আপনার সাথে!
বারিশ ধা”ক্কা খেয়েও দমল না। এক পা এগিয়ে এসে র”ক্তচক্ষু তুলে গম্ভীর গলায় বলল,
— সিয়েনা, মাই ওয়াইফি— ইয়ু ওনলি বিলং টু বারিশ, ওনলি টু ফাইজান বারিশ! কী করে ভাবলে তুমি অন্য কারও সামনে যাওয়ার?
—যাব আমি! আপনার কারণেই সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে! আপনি সব এলোমেলো করে দিয়েছেন! চলে যান এখন এখান থেকে, প্লিজ!
আলতাফ সাহেব একদম নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর এই অস্বাভাবিক চুপচাপ থাকাটাই ঝিলমিলের ভয়ের আসল কারণ। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে বাবার হাতের সেই ধাতব বস্তুটার বিপদ। বারিশ ঝিলমিলের খুব কাছাকাছি হয়ে ফিসফিস করে, অথচ ভয়াল কণ্ঠে বলল,
—শুধু একবার অন্য কারও সামনে গিয়ে বসে দ্যাখ, আই সোয়্যার— হয় তোর চারপাশটা জ্বালিয়ে শেষ করে দেব, নয়তো তোর পুরো জীবন থেকে আমার অস্তিত্ব মুছে দেব! চোখের জলে সমুদ্র গড়ে তুললেও সেই সমুদ্রে আর কখনো তরঙ্গের দেখা মিলবে না!
ঝিলমিল এবার থমকে গেল। এমন লাগামহীন, পাগলাটে বারিশকে সে জীবনে কখনো দেখেনি। এই লোকটা তো তাকে ভালোবাসে না, তবে কিসের এত জেদ? কেন এই উগ্র মালিকানাবোধ? কীসের টানে এত বড় ঝুঁকি নিয়ে এই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে সে? পরিস্থিতি বিষিয়ে উঠতে দেখে নূরজাহান চৌধুরী বারিশকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—আমি নিজে তোমার হাতে আমার নাতনিকে তুলে দিয়েছিলাম বারিশ—আজ আমিই বলছি, তুমি এখন চলে যাও। অবুঝকে জোর করে অনুভূতি বুঝিয়ে লাভ নেই। যে সত্যি তোমার, সে শেষ পর্যন্ত তোমারই থাকবে। তুমি এখন যাও! দয়াকরে যাও!
আলতাফ চৌধুরী এগিয়ে এসে একহাতে বারিশের বুকে সজোরে ধাক্কা মেরে গর্জে উঠলেন,
—বের হ এখান থেকে, ইডিয়ট! নাহলে আমি এখনই পুলিশ ডাকব! পুলিশকে বলব তুই আমার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে জোরজবরদস্তি করছিস!
নূরজাহান বেগমও অনবরত বারিশকে চলে যেতে চাপ দিতে লাগলেন। বারিশ আলতাফ চৌধুরীকে একপাশে হালকা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। তারপর আর কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা ঝিলমিলের চোখের দিকে চাইল। তার কণ্ঠে ঝরে পড়ল এক অভিশাপতুল্য হুংকার,
— পস্তাবে তুমি, খুব করে পস্তাবে সিয়েনা! যখন তুমি অসহায়ের মতো আমায় ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাত বাড়াবে, অথচ স্পর্শ করতে পারবে না। যখন তোমার চোখ দুটো একনজর দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত হবে, অথচ আমার ছায়াও মিলবে না। থমকে যাবে তোমার হৃদস্পন্দন, যখন তুমি তোমার জীবনে আমার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবে না!
কথাগুলো শেষ করে ঝিলমিলের কাঁধে আলতো একটা ধাক্কা দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল বারিশ।
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৮
শব্দগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল ঝিলমিলের বুকে। থরথর করে কাঁপতে থাকা মেয়েটা অপলক চেয়ে রইল বারিশের চলে যাওয়ার পথের দিকে। দু’চোখ বেয়ে অবাধ্য শ্রাবণের মতো জল গড়িয়ে পড়ল তার। বারিশের অবয়ব মিলিয়ে যেতেই ঝিলমিল নিজের রক্তাভ চোখে বাবার দিকে চাইল। এক পা এগিয়ে গিয়ে আলতাফ চৌধুরীর হাতের পেছন থেকে রিভলবারটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল,
— কী শুরু করেছ তুমি, আব্বু? মেরে ফেলতে চাও মানুষটাকে?
— আরে, এটা তো জিহানের খেলনা পিস্তল!
