জাহানারা পর্ব ৯২
জান্নাত মুন
একজন নারী কনস্টেবল গরাদের দরজাটা টানতেই লোহার ভারী, কর্কশ আওয়াজ কারাগারের স্যাঁতসেঁতে চার দেয়ালে আ’ঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শব্দের পুনরাবৃত্তি করল। সেই ধাতব আওয়াজে পাশের কারাকক্ষগুলোর কয়েদীরা নড়েচড়ে উঠল। সারাদিন সংশোধনাগারে অবিশ্রান্ত কাজ করায় সকলে বড্ড ক্লান্ত। সবেমাত্র রাতের অখাদ্য খাবারটুকু গিলে একটু বিশ্রামের খোঁজে চোখ বুজেছিল তারা। কিন্তু চার দেয়ালের বন্দিশালায় এমন আচমকা আওয়াজের চাবুকে অনেকের সদ্য লেগে আসা ক্লান্ত নয়নজোড়া থেকে ঘুম উবে গেল। বেশ কয়েকজন নারী কয়েদির বেজার চেহারা দেখে ভালোই বুঝা যাচ্ছে তারা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু কেউ টু-টিও উচ্চারণ করার সাহসটুকু দেখালো না। বরং নিঃশব্দে ওষ্ঠপুট নাড়িয়ে বিড়বিড়িয়ে ক্ষোভ ঝাড়ল। অতঃপর মেঝেতে একে অপরের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়ে পড়ল।
সেলের ভেতরে একখানা ছোট সাইজের খাটিয়ার উপর দু’হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরে তাতে মাথা গুঁজে থিতু হয়ে বসে আছে এক রমনী। তার পরনে অন্য সকল কয়েদীদের মতোই একখানা শ্রীহীন সাদা শাড়ি। মাথার নড়বড়ে খোঁপা থেকে কিছু অবাধ্য চুল বেরিয়ে এলোমেলো হয়ে আছে৷ নারী কনস্টেবল সশব্দে ভেতরে প্রবেশ করলেন। কয়েদি নারী কারো পদচারণের আওয়াজ শুনেও কোনো সাই দিল না। একইভাবে বসে রইল। নারী কনস্টেবল দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখলেন টোলের উপর খাবার ভর্তি থালাকানা এখনো একইভাবে রয়েছে। একটু হাতও লাগানো হয়নি তাতে। নারী কনস্টেবলের সামনের কয়েদিটির জন্য করুনা হলো। যা তার পাংশুটে মুখশ্রীর অভিব্যক্তিতে অনুধাবন করা যায়। তিনি নিচু গলায় ডেকে উঠলেন,
–“ম্যাডাম আপনি খাচ্ছেন না কেন? খাবার তো ঠান্ডা জল হয়ে গেছে। এভাবে না খেয়ে থাকলে আপনার শরীর খারাপ করবে। দয়া করে খেয়ে নিন।”
অপর প্রান্ত থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসল না। নারী কনস্টেবল বোধহয় এই নিয়ে দশ-বারো বার এসে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে গেছে। কিন্তু একইভাবে বসে থাকা রমণীর থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি। এবারও নিশ্চুপ। ওদিকে অপর পাশের একটি কারাকক্ষ থেকে একজন টিটকারি দিয়ে আরেকজনকে বলছে,
–“এমন রাজার কপাল কয়জন পায়। জেলখানাতেও কত খাতিরযত্ন! মরণদশা, মহারাণী তা গণাতেও ধরেন না।”
কয়েকজন তাচ্ছিল্যের সাথে শ্লেষাত্মক হাসল। একজন বলে উঠল,“টেকার দেমাক বুঝলে। সব টেকার দেমাক।”
ফিসফিসিয়ে বললেও সব কথাবার্তা নারী কনস্টেবল অব্ধি ঠিকই পৌঁছে গেল। তিনি পিছনে ফিরে কয়েদিদের ওপর ধমকে ওঠলেন,
–“আরেকটা শব্দ কানে আসলে থাপড়ে তোদের চেহারার নকশা বদলে দিব বেয়াদবের দল।”
সকলে রুষ্ট চেহারায় চুপ হয়ে গেল। নারী কনস্টেবল ফের অনুনয় করে বলে উঠলেন,“দয়া করে খেয়ে নিন ম্যাডাম। এমনিতেই বর্তমান সরকার ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছেড়ে পালাল। এখন আমাদের চাকরি নিয়ে টানাটানি চলছে। তারউপর আপনার কিছু হলে আমারা সত্যিই চাকরি খুঁইয়ে ফেলব।”
নারী কনস্টেবলের এত আকুল অনুনয়-বিনয়েও সামান্য টলল না সামনের রমণী। তাই হতাশার নিশ্বাস ত্যাগ করলেন নারী কনস্টেবল। এখন কি করবেন তা দিকবিদিক ভেবেও কূলকিনারা পেলেন না। অতঃপর সময় অপচয় না করে বিফল চেহারায় বেরিয়ে গেলেন। কয়েকজন কয়েদি জেগে থেকে তামাশা দেখছিল। তারাও শ্লেষাত্মক হেসে নিজেদের মেঝেতে পেতে রাখা বিছানায় শুয়ে পড়ল। তাদের কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। নুলক চৌধুরী হ”ত্যা মামলায় সেদিন ভোর রাতেই হাসপাতাল থেকে সিআইডি পলিকে গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে আসে। বাড়ির সকলে তখন নাবিলা চৌধুরী আর ইতির মৃ’ত্যুতে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য। আশেপাশে কি হচ্ছে তার কোনো হুঁশ নেই। এহেন পরিস্থিতিতে পলি নিজে খুনের রো’মহর্ষক স্বীকারোক্তি দেয় সিআইডিদের কাছে। তৎকালীন সিআইডি হেড অফিসার আরাজ থাকায় বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাকি অফিসাররা সাময়িক সময়ের জন্য পলিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কিন্তু পলি নিজেই নিজেকে অপরাধী প্রমাণ করে হাজতে পড়ে আছে। বাড়ির কারোর মন মানসিকতা ভালো নেই। তারমধ্যে পলির বিষয়টি ইনানই সামলে যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজেকে হাজতে বন্দিনী করে রাখতে চায় সেখানে কেই বা কি করবে! তারউপর পলি প্রমাণ প্রাপ্ত একজন খু’’নের আ’সামি।
তারপর থেকে প্রতিটি দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক দিন এই কারাগারের স্যাঁতসেঁতে চার দেয়ালের সংকীর্ণ অন্ধকারের ভেতরই কেটেছে মেয়েটার। চৌধুরীদের ক্ষমতার অদৃশ্য ইশারায় তাকে জেলের ভেতরই বিশেষ ভিআইপি সেবা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই রাজকীয় বন্দিত্ব তাকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রয়োজন ছাড়া আজকাল তার মুখ থেকে একটা অতিরিক্ত শব্দও নিঃসৃত হয় না। প্রতিটি মূহুর্ত বেখেয়ালি মলিন চেহারায় আনমনে অনবরত কিছু একটা ভেবেই চলে। কখনো বা তার হাতে একটা ডাইরি দেখা যায়। ডাইরিটা ইমরানের ছিল। সেই ডায়েরির যে কটা পাতায় কালির আঁচড় লেগে আছে, তার প্রতিটিতে জুড়ে রয়েছে শুধুমাত্র পলিরই বিচরণ। পলি তাচ্ছিল্যের বিষাদমাখা হাসির সাথে এই ডাইরির প্রতিটি পাতা পড়ে। কেন পড়ে, কোন মোহে এই অক্ষরের বুকে নিজের অতীতকে খোঁজে তা সে নিজেও জানে না! তবুও অবাধ্য এক নিয়মে বারবার সেই পাতাগুলোতেই চোখ বুলিয়ে যায়। শুধু শেষের দিকে একটা পৃষ্ঠাতেই তার চেহারায় আধার নামে। সেই পাতায় কয়েকটি লাইনের বাক্যে ইমরানের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি,
–“মানলাম পৃথিবীর সবচেয়ে নি’কৃষ্ট আমি। স্বীকার করলাম আমার সকল পাপ। তারপরও বুকে জ্বা’লা অনুভব করেছিলাম যখন জানলাম আমার সন্তান জন্ম দিবে না বলে পরপর দুবার গ’র্ভপাত করলে। তাদের হ’’ত্যা করেই খ্যান্ত হলে না। বরং সারা জীবনের মতো আমার বাবা হওয়ার অধিকার কেড়ে নিলে। সব জেনেও আমি নিশ্চুপ ছিলাম। যেখানে আমার র’ক্তকে হ’’ত্যা করার অ’পরাধে নিশ্চয়ই সেই দুর্বোধ্য হ’’ত্যাকারীর কঠিন শাস্তি পাওনা ছিল। তাহলে কেন তুমি নামক সেই হ’’ত্যাকারীকে শান্তি তো দূর কোনো অভিযোগও করতে পারলাম না? তবে বল বউজান, তোমার প্রতি আমার এই দূর্বলতার কি নাম দিবে?”
সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেনি রমণীর। সে এখন অনুভূতিহীন জড় পাথরের ন্যায় সর্বদা নিশ্চুপ, স্থির। আজকাল তার ভাবনাগুলো এলোমেলো ছন্নছাড়া। চেহারা বড়ই উদাসী।
হঠাৎ করেই একটু আগের নারী কনস্টেবলটি ফের গরাদের সামনে এসে থামলেন। তেছরা চোখে অবলোকন করলেন খাবারের থালাখানা। এখনো স্পর্শবিহীনভাবেই অবেলায় পড়ে আছে। তিনি হাঁপ ছেড়ে পলির উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,“আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।”
পলি নিরুত্তর। অনড়ভাবে ঠায় বসে রইল। নারী কনস্টেবল নিষ্প্রাণ নয়নে কিছুক্ষণ বন্দিনীকে দেখে প্রস্থান করলেন। পর মূহুর্তেই গরাদের সামনে এসে দাঁড়াল জিয়াদ। হাতে একখানা টিফিনবক্স। ব্যথাতুর নেত্রে ভেতরের রমণীর পানে চেয়ে মোলায়েম কণ্ঠে ডেকে উঠল,
–“অনু।”
খুব পরিচিত গলায় নিজের আদুরে ডাক নাম শুনে কিঞ্চিৎ নড়ল রমণী। অতঃপর ধীরলয়ে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিগোচর হলো এক হেংলা-পাতলা গড়নের সুউচ্চ যুবক। যার পরনে অফ হোয়াইটের মধ্যে চেকচেক রঙা শার্ট। শার্টের সবগুলো বোতল খোলা থাকায় অভ্যন্তরের গাঢ় মেরুন রঙা টি-শার্টটি দৃশ্যমান। মাথা ভর্তি ঘন কালো উষ্কখুষ্ক চুল। মুখ ভর্তি খুঁচা খুঁচা দাড়ি। তার শান্ত মুখাবয়ব যেন কালো মেঘের আড়ালে ডাকা। নিজের দিকে পলিকে নিস্প্রভ নয়নে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিয়াদ ফের অস্ফুটে ডেকে উঠল,
–“অনু!”
দৃষ্টি ঘুরিয়ে যুবেকের চোখে চোখ স্থির করল রমণী। মিলিত হলো দুটো ভ্রমর কালো অক্ষিপট। জিয়াদের বুক কেঁপে উঠল রমণীর ব্যথাতুর চাহনির কবলে পড়ে। যেই মেয়েটার ঠোঁট থেকে কখনো হাসি সরত না আজ তারই মুখাবয়ব শান্ত নদীর ন্যায় স্থির। সেখানে লুকিয়ে আছে না বলা হাজারও কথা। জিয়াদটা জায়ান ভাইয়ের মতো বড্ড নরম মনের মানুষ। শিমুল তুলোর ন্যায় কোমল হৃদয়। অল্পেই তা হিমবাহের মতো গলে পড়ে। তাই প্রেয়সীর এহেন শ্রীহীন দশা দেখে ভেতরে কেঁদে ওঠেছে তার মন। চোখ দুটো ছলছল করছে। সে লোহার গরাদের ভেতর হাত বাড়িয়ে তরল সিক্ত গলায় ডেকে উঠল,
–“অনু, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি।”
এবার ভিজে উঠল রমণীর নেত্রপল্লব। ছলছলে নয়নে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখল যুবকের বাড়িয়ে দেওয়া হাতখানা। অতঃপর নিশ্চলা দেহটা নিয়ে এগিয়ে এলো। গরাদের শিকে ধরে মুখোমুখি দাঁড়াল। জিয়াদ তৎক্ষনাৎ শিকের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছুয়ে দিল রমণীর মলিন গাল। এ কদিনে রমণীর চোখের নিচের কালি পড়েছে। যার কালচে ছায়ায় তার একদা কোমল চেহারাখানা আজ বড্ড ফ্যাকাশে আর প্রাণহীন ঠেকছে। জিয়াদ রমণীর মুখের উপরে পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো হাত বুলিয়ে সরিয়ে দিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাঙা গলায় বলে উঠল,
–“সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো।”
বলতে গিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। গড়িয়ে পড়ল চোখের অশ্রু। তা দেখে পলির চোখের অশ্রুও বাঁধ ভাঙল। অবাধ পেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
রুমের বিশালাকার আভিজাত্যে ঘেরা ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে বসে আমি আপনমনে সামনে টেনে আনা মেঘবরণ দীর্ঘ চুলে চিরুনি চালাচ্ছি। আমার সমগ্র রুম মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন। পুরো রুম জুড়ে ফেইরী লাইটের বহর। যেন অন্ধকারের বুকে একঝাঁক জোনাকির মেলা। তাদের বর্ণিল দ্যুতির সাথে পাল্লা দিয়ে জ্বলছে শতাধিক মোমবাতির কম্পমান শিখা। ব্যালকনির ওপার থেকে আসা চঞ্চল হাওয়ায় ঘরের ধবধবে সাদা মখমলের পর্দাগুলো অবাধ্য ঢেউয়ের মতো দোল খাচ্ছে। ফুলদানিগুলোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাজা ফুলেরা, যাদের সুমিষ্ট সুবাসে চারপাশের বাতাস ম ম করছে। রঙিলা ঝলমলে আলোয় ড্রেসিং টেবিলের থকথকে স্বচ্ছ কাচের অভ্যন্তর আমার প্রতিচ্ছবি ভেসে আছে। আমার পরনে নীল রঙা একখানা ভারী কারুকাজের শাড়ি। যার পরতে পরতে লেপ্টে আছে সহস্র নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে দামী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর। শাড়ির এই সূক্ষ্ম বুনন এতটাই নজরকাড়া যে, এক পলকেই এর আকাশচুম্বী মূল্যের আভাস পাওয়া যায়। তা তো পাওয়া যাবেই বটে। এটা যে খোদ মাফিয়া বস নিজে বিশ্বের সর্বসেরা ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার দ্বারা তৈরি করিয়েছে। শাড়িটি আজকালকার নয়। বহুদিন হয়েছে। বিয়ের কয়েক মাস পর ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরার সময় ইফান নিয়ে এসেছিল। তখন আমি এটা খুলেও দেখিনি৷ অবেলায় কাবার্ডের কোথাও একটা ফেলে রেখেছিলাম। কারণ ইফানের সবকিছুই ছিল আমার কাছে বড় তুচ্ছ, মূল্যহীন।
এই পুরোনো অবহেলার স্মৃতি মনে আসতেই আমার হাস্যোজ্জ্বল চেহারাখানা খানিকটা মলিন হলো। পরক্ষণেই মাথা থেকে এসব ঝেড়ে ফেললাম। আজকের মতো এত বিশেষ একটি দিনে এসব বেরঙা অতীতের কথা ভেবে সময়টা নষ্ট করব না। আগামীকাল জুনের দুই তারিখ। অর্থাৎ আজ রাত বারোটা বাজে ইফানের জন্মদিন। আজকে জন্মদিন উপলক্ষে তাকে সারপ্রাইজ দিব। অতীত ভুলে নতুন করে ওকে নিয়ে জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু করব। অজানা সুখের আভাস পেতেই আচমকা চোখ দু’টো নোনা জলে জ্বালা করতে শুরু করল। আমি নিজেকে তড়িঘড়ি করে সামলে নিলাম। আয়নায় নিজেকে অবলোকন করলাম। অধরযুগল র’ক্তিম বর্ণে রাঙা হয়ে আছে। আজ বহু বছর বাদে আমার ডাগরডোগর চোখদুটোকেও নিজ হাতে সাজালাম। চোখের পাতায় লেপ্টে আছে নীলচে আভা। নাসাগ্রে শোভা পাচ্ছে নীল ডায়মন্ডের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা একটি নথ, যা আমার চেনা অবয়বকে এক অপার্থিব জৌলুসে ফুটিয়ে তুলেছে। নিজেকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। আসলেই আমি এত সুন্দর!
সহসা একঝাঁক লাজুকতা এসে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করল, যার ছোঁয়ায় আমার দু’গালে হানা দিল লাজুক র’ক্তিম আভা। আয়নার সেই মোহময় প্রতিবিম্বের পানে যেন আর চেয়ে থাকা যাচ্ছে না, বুকের ভেতর নিশ্বাস বড্ড ভারী হয়ে আসছে। হৃদয়ের এই চঞ্চলতা সামলাতে আমি কানে পরে নিলাম নীল পাথরের এক জোড়া ভারী ঝুমকো। দু’হাত ভরে জড়িয়ে নিলাম রিনঝিন শব্দ করা কাশ্মীরি কাচের চুড়িগুলো। অতঃপর নিজের দু’হাত চোখের সামনে তুলে ধরে অপলক চেয়ে রইলাম। এই চুড়িগুলো ইফান আমাকে মেলা থেকে কিনে দিয়েছিল। আজই প্রথমবার সেগুলোকে নিজের অঙ্গে জড়ালাম। ইশশ, কাচের নীলিমায় হাত দুটো আমার কী চমৎকারই না লাগছে! বিবাহবার্ষিকীতে ইফানের দেওয়া ডায়মন্ডের রিংটিও আমি আঙুলে গরিয়ে নিলাম। অতঃপর হাতের আঙুলের ডগায় একটি নীল রঙা পাথুরে টিপ তুলে নিয়ে অপ্রস্তুত, লাজুক চেহারায় নিজের প্রতিবিম্বের পানে তাকালাম। অত্যন্ত আলতো ছোঁয়ায় কপালের ঠিক মধ্যিখানে বসিয়ে দিলাম টিপটি। এ যেন অমাবস্যার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় হলো! আমার চেহারার উজ্জ্বলতা যেন এবার এক লহমায় আরও কয়েক ধাপ বেড়ে গেল।
আমার অধরকোণে লাজুকমাখা হাসিটা আরও প্রসস্থ হয়েছে। আবারো নিজেকে মন দিয়ে অবলোকন করতে লাগলাম। আমার কানে গুঁজা ইফানের বার্থডে ফ্লাওয়ার। অর্থাৎ তিনটি টকটকে লাল গোলাপ। যা আমার এই নীলিমার মাঝে এক চিলতে রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। দীর্ঘ মেঘবরণ কেশরাশিকে আলতো করে বুকের ওপর টেনে এনে রেখেছি। আমার সারা অঙ্গ জুড়ে ইফানের প্রিয় রঙ নীলের ঝলকানি। আপন মনে নিজের কেশরাশি ছুয়ে দিতে লাগলাম। হঠাৎ আমার দৃষ্টি থমকাল। আমার মধ্যে কিছু একটা খালি খালি লাগছে। উদ্বিগ্ন মুখাবয়বে নিজেকে পরখ করতেই দৃষ্টি স্থির হলো নিজের নিরাভরণ, খালি গলার ওপর। ত্বরিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এগিয়ে গিয়ে কাবার্ডের ভেতর থেকে গহনা রাখার একটি ছোট্ট রাজকীয় সিন্দুক বের করে আনলাম। তক্ষুনি ফেইরী লাইটের আলোয় ঝলঝল করে উঠল সিন্দুকটি। কারণ নকশা করা সিন্দুকটির গায়ে গেঁথে আছে মূল্যবান বেশ কিছু রত্নপাথর। আমি সিন্দুকটি ড্রেসিং টেবিলের সামনে রেখে ফের টোলে বসলাম। পাসওয়ার্ড চেপে সিন্দুকটির ঢাকনা উপরে তুলতেই ভেতরে রাখা গাঢ় নীল হোপ ডায়মন্ড থেকে চতুর্দিকে চোখ ধাধানো টকটকে লাল বর্ণের জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ল। যার স্থায়িত্ব ছিল বেশ কয়েক সেকেন্ড। যা আর কোনো নীল হীরকের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এর এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের জন্যই পৃথিবীর সকল হীরকের থেকে এটি শ্রেষ্ঠ মূল্যবান। আর এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাচীনকালে মানুষ একে অলৌকিক বা অভিশপ্ত মনে করত। সত্যিই কি অভিশপ্ত!
কি বিচিত্র বিষয়রে বাবা! আমি বিস্ময় ভরা নয়নে গাঢ় নীল হীরকটির পানে তাকিয়ে আনমনে আওড়ালাম। অতঃপর অতি সন্তর্পণে হোপ ডায়মন্ডের নেকলেসটি সিন্দুক থেকে বের করে গলায় পড়ে নিলাম। এক লহমায় আমার রূপের জৌলুস যেন হুড়মুড়িয়ে কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেল! নিজের প্রতিবিম্ব থেকে নিজেরই চোখদুটো কিছুতেই সরাতে পারছি না। নিজের প্রতিবিম্বটা যেন কোনো রুপকথার রাজ্যের নীল পরী!
লজ্জায় আমার গাল দুটো তপ্ত হয়ে ওঠল। কত রাজা-মাহারাজা, রাণী-মহা রাণীর অঙ্গে রাজত্ব করা ৩৪০ বছরেরও বেশি পুরনো এই ঐতিহাসিক হীরক কিনা আমার গলায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে! সারা দেহে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেলে। আমি ড্রেসিং টেবিলের এক পাশে যত্ন করে রাখা রক্ত গোলাপটি হাতে তুলে নিলাম। আলতো করে ছুঁইয়ে দিতে লাগলাম রক্তিম বর্ণ পাপড়িগুলো। মনের সুপ্ত বাসনাগুলো বারংবার আমাকে লাজে রাঙা করছে। আমি কুণ্ঠিত দৃষ্টি দেয়াল ঘড়ির দিকে স্থির করলাম। রাত এগারোটার কাটা ছুঁইছুঁই। ভ্রুকুটি করলাম আমি। লোকটা কই আছে এখন! রাত তো ভালোই হলো বলে। কখন আসবে আমার সাবেব? ভেবেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলাম।
দেশের সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে আজ চারদিন। দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্যের বিস্তার সৃষ্টি হয়েছে। নেই কোনো আইন, নেই কোনো বিচারব্যবস্থার বালাই। ইতোমধ্যে হাজত থেকে দাগী সব আসামীরা পালিয়েছে। এসব অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখ্যোম সুযোগ লুপে নিচ্ছে প্রভাবশালী অপরাধী গ্যাং’রা। জেগে ওঠেছে শহরের কিংবা অলিগলির নিষিদ্ধ নীল ক্লাব, মা”দকের অ’বৈধ চোরাচালান, জমজমাট হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে জু’য়ার আসরগুলো।
উত্তরায় চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ হতে একটি বিলাসবহুল অত্যাধুনিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছিল কয়েকবছর আগে। যার মালিকানা ইফান চৌধুরীর নামে। বর্তমানে এখানে গড়ে ওঠেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুউচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাসিনো। এখানে চলে লক্ষ কোটি টাকার জমজমাট জু’য়ার আসর। ক্যাসিনোর মধ্যস্থলটি ঠিকরে পড়া রাজকীয় আভিজাত্য ও জাঁকজমকপূর্ণ আলোয় সজ্জিত। দেশ-বিদেশের বড় বড় অ’পরাধ জগতের পার্টনাররা এখানে নিয়মিত পা রাখছেন। বাজি ধরার এই উন্মাদনাময় খেলাকে আরও উল্লাসময় আর বুঁদ করে রাখতে সঙ্গে যোগ হয়েছে দামি ম’দের ফোয়ারা আর হেভি ড্রা”গসের তীব্র নেশার ঝোঁক।
ক্যাসিনো জুড়ে ঝলমল করছে লাল-নীল আলো। সাউন্ড বক্সে বেজে চলেছে উন্মাতাল ডিজে গান৷ সেই তালে একদল সুন্দরী তরুণীরা কোমর দুলিয়ে উদ্দাম অঙ্গভঙ্গিতে নেচে যাচ্ছে। সেই তালে নিজেদের ধরে রাখতে না পেরে মাতাল অবস্থায় তরুনীগুলোকে ঘিরে উল্লাসে মেতে ওঠেছে একদল পুরষ। চারপাশে তীব্র শব্দ দূষণ। তাতে কারো কোনো হুশগোল নেই। কেউ বাজি ধরে দাবার বোর্ডে চাল চালছে, কেউ মেতে উঠেছে ক্যারাম, ব্ল্যাকজ্যাক, পোকার কিংবা ব্যাকারা-র মতো সব সর্বনাশা জু’য়া খেলায়।
ভিআইপি জোনের এক বিলাসবহুল কাউচে পায়ের ওপর পা তুলে চরম আয়েশি ভঙ্গিমায় বসে আছে খোদ মাফিয়া বস। ক্ষণে ক্ষণে মৃদু দোল খাচ্ছে তার তুলে রাখা পা’টা। দেহ তার সবসময়ের মতো অশুভ রঙায় আবৃত। ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল কালো চশমার আড়ালে ঢাকা। তীক্ষ্ণ ব্লেডের ন্যায় ধা’রালো চোয়াল। একহাতে ধরে রাখা ওয়ানেই গ্লাস আর জ্ব’লন্ত সি’গারেট। অপর হাতে তাস। ইফানের এক পাশে কলের পুতুলের মতো নিস্পৃহে দাঁড়িয়ে ইনান। অপর পাশে ইফানের গা ঘেঁষে শান্তশিষ্ট শিশুর ন্যায় বসে আছে ব্রুনো। ভাবটা তার বেশ রাজকীয়। তাদের সামনেই বসে আছে বেশ কয়েকজন বিলেতি পুরুষ, বংশভূত আমেরিকান। তাদের চেহারায় তীব্র ক্ষো’ভ, কিছুটা ভীতি। ইতোমধ্যে ইফানের কাছে তাস খেলে তিন কোটি টাকার দুইটি ম্যাচ হেরেছে। এখন তৃতীয় রাউন্ড চলছে। ইফানের মুখাবয়ব হিমবাহের ন্যায় শীতল, অনুভূতিহীন।
ইতোমধ্যে একজন একজন করে খেলা থেকে হেরে সরে গেছে। বর্তমানে দুজন খেলোয়াড় টিকে আছে। একজন মাফিয়া বস, আরেকজন আমেরিকার ড্রা’গ ডিলার মিস্টার হেনরি। ইফান সি’গারেটে আরেকটি টান দিয়ে সামনের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছাড়ল। সি’গারেটে পোড়া ব্রাউন অধরে ওয়াইনের গ্লাস ছুঁইয়ে ছোট্ট সিপ নিল। সামনের লোকটা ইফানের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসছে। যেন এই রাউন্ডে সেই জিতবে। হেনরি একটি টাকা ভর্তি কালো সুটকেস টেবিলের ওপর খুলে রাখল। অতঃপর শ্লেষাত্মক হেসে বলল,
–“টুয়েন্টি-ফাইভ মিলিয়ন।”
ইফান স্বভাবসুলভ বাম ভ্রু উঁচিয়ে ভ্রুর নিচে আলতো চুলকাল। ইনান ইফানের মুখের দিকে তাকিয়ে। ইফান ইশারায় অভয় দিতেই সে টাকাগুলো চেক করল। অতঃপর ইশারায় ইফানকে বলল সব ঠিক আছে। হেনরি ফের তাচ্ছিল্যের সাথে ক্রুর হাসল। অতঃপর গমগমে গলায় বলল,
–“শো।”
শব্দটি আওড়েই নিজের হাতের তাসগুলো সকলের সামনে টেবিলে উপুড় করে রাখল। ইফান সেদিকে দৃষ্টি ঘুরাল। হেনরি এখনো ক্রুর হাসছে। কারণ সে এই রাউন্ডে অতি বিচক্ষণতার সাথে দান চেলেছে। ইফান জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে কিছুক্ষণ তাসগুলো দেখল। অতঃপর তার ব্রাউন অধরকোণে বাঁকা হাসির রেশ উদয় হলো। বাম গালে সৃষ্টি হলো সুক্ষ্ম খাঁজের। ইফান ঝুঁকে তার হাতের তাসগুলো টেবিলের উপর রাখল। উৎসাহী হয়ে হেনরি ঝুঁকে দেখল। সঙ্গে সঙ্গেই তার চেহারার রঙ বদলে গেল। তীব্র ক্রোধে চিৎকার করে ওঠে দাঁড়াল,
–“ইউ সান অভ আ বি’চ, ইউ’আর আ চিটার!”
ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করল ইফান। তবে হেনরির বিপরীতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ইনান চোয়াল শক্ত করে হেনরিকে সতর্কবার্তা দিল,
–“ওয়াচ ইয়োর মাউথ, মিস্টার হেনরি। অর এলস!”
ইনানের কথায় কান দিল না হেনরি। সে চিৎকার করে অ”শ্রাব্য ভাষায় ইফানকে গা’লি-গা’লাজ করতে লাগল। আশেপাশে মানুষ ভয়াতুর দৃষ্টিতে মাফিয়া বসের শান্ত মুখশ্রীর পানে চেয়ে রইল। ইফান তখনও ভাবলেশহীন। ওয়াইনের গ্লাসে সিপ নিচ্ছে আর ব্রুনোর মাথায় আদুরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। ব্রুনো বেশ বি’রক্তবোধ করছে হেনরির চেঁচামেচিতে। তাই ক্ষণে ক্ষণে তেছরা চোখে সেদিকে তাকাচ্ছে। এদিকে হেনরি ইফানের গা-ছাড়া ভাব দেখে আরও রেগে গিয়ে বলে উঠল,
–“ইউ বা’স্টার্ড। আই’ল নেভার লেট ইউ গো..।”
আরও কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। তার আগেই ইফানের ভাইব্রেট করা ফোনের স্ক্রিনে ঝলঝল করে ভেসে উঠল ইংরেজি অক্ষরে লেখা বুলবুলি। ইফান টেবিল থেকে ফোন হাতে তুলতে যাবে অমনি হেনিরর কু’রুচিপূর্ণ কথা ইফানের কর্ণদারে ধাক্কা খেল,
–“শিজ ইয়োর গার্ল, রাইট? আই’ল স্ন্যাচ দ্যাট বি’চ অ্যান্ড ফা’’ক হার।”
ইফান সেদিকে না থাকিয়েই দাঁতে দাঁত পিষল। এক লহমায় চারপাশের আবহাওয়া শীতল আর থমথমে হয়ে গেল। অজানা শঙ্কায় সকলে অনবরত ভীতসন্ত্রস্ত। ইফান নির্জীব নেত্রে দৃষ্টি ঘুরাল সামনের দিকে। কালো চশমার আড়ালে ইফানের ধূসর বাদামী অক্ষিযুগলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কারো দৃষ্টিগোচর হলো না। চোখের নিমিষেই ইফানের চোয়ালের কাঠিন্যে মিলিয়ে গেল। তার এক হাত তখনও ব্রুনোর মাথায়। ইফানের আঙুলগুলো ধীরলয়ে ব্রুনোর মাথায় নড়াচড়া করল। মূহুর্তেই ব্রুনোর জিহ্বা লকলক করে উঠল। চোখদুটো যেন খুশিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠেছে। ব্রুনো কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই মিস্টার হেনরির উপর ঝাপিয়ে পড়ল। কা’মড়ে ধরল হেনরির অ’ন্ডকোষ। সহসা হেনরির চিৎকারের আওয়াজে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠল। হেনরির গার্ডরা সহ উপস্থিত কেউই নিজ স্থান থেকে এক ইঞ্চি নড়ার সাহসটুকুও পেল না। কারণ ভেনম গার্ডরা সশ’স্ত্র হাতে চারপাশ ঘিরে রেখেছে। এমনকি হেনরির গার্ডদের মাথায় তারা ব’ন্দুক তাক করে ধরেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রুনো কামড়ে ছিন্নভিন্ন করে দিল হেনরির অ’ন্ডকোষ। ইফান সি’গারেট শেষাংশ পায়ের নিচে পিষে ফের আয়েস ভঙ্গিমায় বসল। ওয়াইনের গ্লাসে ছোট্ট সিপ তুলার আগে ক্রুর হেসে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
–“দেট’স মাই বয়।”
ততক্ষণে ব্রুনো কা’মড়ে হেনরির না’ড়িভুড়ি অব্ধি টেনে বের করে ফেলেছে। হেনরির পরানপাখি উড়েছে সেই কখন। ব্রুনো বের করে আনা না’ড়িভুড়ি নিয়ে খেলা শুরু করছে। চারপাশ তরল লাল র’ক্তে ছড়াছড়ি। এহেন বি’ভৎস দৃশ্য দেখে উপস্থিত সকলের গা গুলিয়ে ওঠেছে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ফলে পুরো ক্যাসিনো নিস্তব্ধতায় শুনশান হয়ে পড়েছে। ইফান পুরো দৃশ্যটি যখন উপভোগ করতে ব্যস্ত তখনই ফের তার ভাইব্রেট করা ফোন বেজে উঠল। বুলবুলি নামটা দেখে মুচকি হাসল। অতঃপর একহাত দিয়ে নেকটাই লুজ করতে করতে ফোন রিসিভ করে কানে ধরল। সহসা ওপাশ থেকে ভেসে এল আহ্লাদমাখানো মেয়েলি কণ্ঠস্বর,
–“কয়টা বাজে এখন?”
ইফান ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল। হাত সামান্য নাড়িয়ে চোখের সামনে ধরল। হাত ঘড়িতে সময় দেখে হাস্কি স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
–“ইটস ইলেভেন, সুইটহার্ট।”
আমি মেকি রাগ নিয়ে বলে উঠলাম,“রাত বারোটার আগে বাড়ি ফিরা চাই, হু।”
নিজের বলা শেষ হতেই অপর প্রান্তের ব্যক্তির কথা শুনার প্রয়োজনবোধ করলাম না। তাই মুখের উপর ফোন কেটে দিলাম। ইফান চোখের সামনে ফোন ধরে আরেকটা ওয়াইনের গ্লাসে সিপ তুলার আগে অস্ফুটে আওড়াল,
–“অ্যাজ ইউর উইশ, বেইব।”
রুমে বসে আমি ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়েছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বারোটা বেজে যাবে। অথচ যার জন্য এতো আয়োজন তার কোনো খেয়াল নেই। আমি বারবার উদগ্রীব চোখে দেয়াল ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলাম। অভিমানে আমার চেহারাটা মলিন হয়ে গেছে৷ সামনের আয়নায় এক পলক তাকিয়ে দেখলাম। এবার নিজের এই নিখুঁত সাজগোছ দেখে নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল। যার জন্য নিজেকে এভাবে নীল পরী বানিয়ে সাজালাম, তারই যদি কোনো ভ্রুক্ষেপ না থাকে, তবে এ রূপের কী মূল্য! ব্যালকনি দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় মোমবাতিগুলোর শিখা লকলক করছে। সাদা পর্দাগুলো অনবরত দোল খাচ্ছে। আমি পাশেই টেবিলে সাজিয়ে রাখা ইফানের বার্থডে কেকটার দিকে এক পলক চেয়ে গাল ফুলিয়ে হাতের গোলাপ ফুলটার একটা একটা পাপড়ি ছিঁড়তে লাগলাম।
আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘড়ির কাটা রাত বারোটার ঘরে পৌঁছাবে। তক্ষুনি চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা খুলে গেল। লিভিং রুম মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় আশপাশটা আবছা দৃশ্যমান। টালমাটাল অবস্থায় অন্দরে পা রাখল ইফান। এক হাত দিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে দেহের কোটটি। পরনের শার্টটির উপরের তিনটি বোতাম খুলা থাকায় দৃশ্যমান ঢেউখেলানো পেশিবহুল বক্ষ। যা ঘামে জবজবে হয়ে আছে। ইফানের এক হাতে অ্যা’লকোহলের হিপ ফ্লাস্ক। সেখান থেকে অ্যা’লকোহল পান করছে। নে’শায় এতটাই আচ্ছন্ন যে নিজের বিশালকার দেহের ভারটুকু ঠিক করে সামাল দিতে পারছে না। বারবার তাল হারিয়ে হেলেদুলে পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিচ্ছে। এতে সে নিজেই অধর কামড়ে নিঃশব্দে হাসছে। ইফান কোনো মতে সিঁড়ি অব্ধি পৌঁছাতেই ফের হিপ ফ্লাস্কে চুমুক দিল। টালমাটাল অবস্থায় উপরের দিকে উঠতে উঠতে মাদকীয় হাস্কি কণ্ঠে গাইতে লাগল,
Fckin’ Robitussin
I don’t know why this sht got me lazy right now, yeah
Can’t do Percocets or Molly
I’m turnin’ one, tryna live it up here
right, right, right…
আচমকা রুমের দরজা খুলে যেতেই চকিতে দৃষ্টি ঘুরলাম। ফেইরী লাইটের ঝলমলে বর্ণিল আলো পড়তেই ইফানের চেহারা দৃষ্টিগোচর হলো। সহসা আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার রাঙা অধরযুগল প্রসারিত হয়ে ওঠল। ওদিকে দরজা খুলতেই আচমকা আমায় এমতাবস্থায় দেখতে পেয়ে থমকে গেল ইফানের সমগ্র অস্তিত্ব। রুদ্ধ হয়ে গেল গাইতে থাকা গান। ইফানের এহেন চাহনিতে আমার সর্বাঙ্গে শিহরণ বয়ে গেল। বুকের ভেতর অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে। তল পেটে রঙবেরঙের প্রজাতিরা ডানা মেলেছে। তক্ষুনি দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ জানান দিতে লাগল এখন রাত বারোটা বাজে। আমি কুণ্ঠিত কন্ঠে বলে উঠলাম,
–“হ্যাপি বার্থডে, মি মাফিয়া। হ্যাপি বার্থডে।”
ইফানের ব্রাউন অধর জুড়ে অদ্ভুত সম্মোহনী হাসির রেশ। আমার কণ্ঠ কি তার কানে আধও পৌঁছাতে পেরেছে কি-না বলা বাহুল্য। ইফান আমার দিকে অপলক চেয়ে থেকে ঢোক গিলল। কাঁধের কোট অবেলায় মেঝেতে ফেলে নেশার ঘোরে টালমাটাল ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর এই বেগতিক দশা দেখে ভ্রুকুটি করলাম আমি। অধরকোণে লেপ্টে থাকা হাসির রেশ এক লহমায় উবে গেল। ইফান প্রায় আমার সন্নিকটে। সে হাতের উল্টো পিঠ নাকে ঘষতে লাগল। অত্যাধিক ড্রা’গস নেওয়ায় ওর ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল অস্বাভাবিক রকম র’ক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ইফান আমার সর্বাঙ্গ নেশাক্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করতে করতে হাস্কি স্বরে আওড়ালো,
–“রেয়ার বিউটি! কিলার বিউটি!”
অ্যা’লকোহলের ঝাঁঝালো গন্ধে আমি নাক সিটকালাম। ঘৃ’ণিত নয়নে চেয়ে রইলাম অমানুষটার পানে। ইফান সন্নিকটে এসে এক হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। অপর হাতের উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে আলতো করে ছুয়ে দিল আমার পেলব গাল। ঘৃণায় চোখ খিঁচে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। এসবের ধার ধারল না লোকটা। বরঞ্চ আমার ঘাড়ে মুখ নিয়ে জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম ওর একটি হাত আমার পিঠের দিকে বিচরণ করছে। আমার উন্মুক্ত পিঠের উপর গুচ্ছকারে ঝুলে থাকা ব্লাউজের ঝুমকোগুলোর ফিতায় হঠাৎ টান পড়তেই ইফানের ইস্পাতের ন্যায় শক্ত বুকে দু হাতে সজোরে ধাক্কা দিলাম। ইফানের এত ভারী দেহ তাতে বিন্দুমাত্রও টলল না। বরং তাল হারিয়ে আমিই উল্টো ড্রেসিং টেবিলের সাথে ধাক্কা খেলাম। ডান হাতটা গিয়ে পড়ল টেবিলে রাখা গোলাপগুলোর উপর। সহসা হাতের আঙুলে কাটা ফুটতেই আহ্ আওয়াজে গো’ঙ্গিয়ে উঠলাম। ইফান তৎক্ষনাৎ আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিল। আমার গাল ছুঁইয়ে উদগ্রীব গলায় শুধালো,
–“বুলবুলি, ইট হার্ট টু মাচ! দেখি! দেখি!”
কাটা বিঁধে যাওয়া আঙুল থেকে ফিরিঙ্গি দিয়ে তাজা লাল র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে। রাগে ঘৃ’ণায় আমি ইফানের থেকে নিজেকে ছড়াতে চাইলেও ব্যর্থ হলাম। ইফান আমার আঙুল জোর করে নিজের মুখে পুড়ে নিল। চুষে নিল বেরিয়ে আসা রক্তটা। আমি দাঁত দাঁত পিষে চোখ খিঁচে নিলাম। এর মাঝেই ভেসে এলো ইফানের নেশাক্ত কণ্ঠধ্বনি,
–“বেইবি, আই’ম ডেসপারেটলি ক্রেভিং ইয়োর ক্লোসনেস রাইট নাউ।”
এবার আমি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলাম,“তুমি সত্যিই একটা জা”নোয়ার। আজ তোমার জন্মদিন ছিল ইফান। আজ সারাদিন আমি একা হাতে সব সাজিয়েছি।”
হাতের উল্টো পিঠে আলগোছে চোখ মুছে চারপাশে দৃষ্টি ঘুমালাম। ইফানও ঢুলুঢুলু নেত্রে দৃষ্টি ঘুরাল। অতঃপর ফের আমার দিকে দৃষ্টি স্থির করল। ওর হাবভাব দেখে আমার বুঝতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না সে যে নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন। তাই কিছুই তার নজর কাড়েনি। আমি নাক টেনে আঙুল পাশের টেবিলের দিকে তাক করে কন্দনরত গলায় বললাম,
–“দেখতে পারছ এটা? এটা আমি নিজ হাতে বানিয়েছি। শুধুমাত্র তোমার জন্য। আর তুমি..!”
বাকি কথা আর বলে উঠতে পারলাম না। কান্নার তোড়ে কথা কণ্ঠনালিতেই আটকে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। ইফান আমার কান্না দেখে নিশ্চুপ হয়ে গেল। বুকে তার জ্বালা করছে। নিজের জন্মদিন সে ঘৃণা করে। ভুলে থাকতে চায়। তাই তো তার এই দিনের কথা কখনো মনে থাকে না। ইফান আমাকে সামাল দিতে হাত বাড়িয়ে চকলেট ফ্লেভারের কেকটির উপর হাত রেখে কিছুটা কেক মুঠোবন্দি করে নিল। অতঃপর আচমকা সেটা আমার গালে লেপ্টে দিল। ঝুঁকে আমার গাল থেকে চকলেটুকু জিহ্বা দিয়ে মুখের ভেতরে টেনে নিল। আমি দাঁতে দাঁত পিষলাম। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলাম। অতঃপর আচমকা ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সপাটে আমার হাতের চপেটাঘাত পড়ল ইফানের গালে। এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ইফান।
আমি ফুপিয়ে যাচ্ছি। চোখের টলমলে জল এতক্ষণে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা কি হলো বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ইফানের। অতঃপর ধীরলয়ে মুখ তুলে আমার চোখের দিকে তাকাতেই লক্ষ করল আমার ঘৃণিত দৃষ্টির তোপ। আমি মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলাম। তবে বেশি এগোতে পারিনি। তার আগেই ইফানের শক্ত হাতের হেঁচকা টান পড়ল আমার বাহুতে। তাল হারিয়ে ছিটকে পড়লাম নরম বিছানার উপর। সহসা ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম। ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে সামলে শুয়া থেকে ওঠার চেষ্টা করতে যাব তখনই নজরে পড়ল, ইফান পরনের শার্টের বোতাগুলোতে এলোমেলো হাত চালিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি এক লহমায় কান্না ভুলে ভয়াতুর ঢোক গিললাম। ইফান নেশালো নয়নে আমার সর্বাঙ্গে দৃষ্টি বুলচ্ছে। বিছানার উপর ছিটকে পড়ায় আমার শাড়ির আচলও অলক্ষ্যে দেহ থেকে খসে পড়েছে। তাই উদর দৃশ্যমান হয়ে গেছে। ভারী নিঃশ্বাস নেওয়ার কারণে আমার সুডৌল বক্ষদেশ কম্পিত হচ্ছে। ইফান শুকনো ঢোক গিলল। কম্পিত হলো ওর পুরুষালি অ্যাডামস অ্যাপল।
ইফানের মা’দকীয় ঘোর লাগা দৃষ্টির তোপে আমি শঙ্কিত। তাই ওকে ধীরলয়ে এগিয়ে আসতে দেখে আমিও একটু একটু করে পিছিয়ে যেতে লাগলাম। নিস্তব্ধ ঘরে বিছানার চাঁদের সাথে আমার পায়ের নূপুরের ঘর্ষণে ছান্দসিক রুমঝুম আওয়াজ উঠতে লাগল। ইফান গায়ের শার্ট অদূরে ছুড়ে ফেলল। আমার ভয়াতুর দৃষ্টি দেখে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে অধর কামড়ে ধরল। বাঁকা হেসে প্যান্টের বেল্টে হাত চালিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে মাদকীয় হাস্কি স্বরে গেয়ে উঠল তখনকার অসমাপ্ত গানের পরবর্তী লাইনগুলো,
Baby, you can
Ride it, ooh yeah
Bring it over to my place
And you be like,
“Baby, who cares?”
But I know you care
Bring it over to my place
You don’t know what you did, did to me! Your body lightweight, speaks to me.
I don’t know what you did, did to me..!
আচমকা ইফান আমার এক পায়ে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের সন্নিকটে নিয়ে গেল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,
জাহানারা পর্ব ৯১
–“গো”লামের পুত, শু’’য়োয়ের বাচ্চা! ছাড় আমায়। দূরে যা আমার থেকে।”
ক্ষোভে কথাগুলো আওড়ে যেই উঠতে যাব অমনি ইফান প্যান্টের বেল্ট দিয়ে আমার দু’হাত বেঁধে এক হাত দিয়ে বিছানার সাথে চেপে ধরল। আমার উপর ঝুঁকে মাদকীয় হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,
–“এতদিন তো ছেড়েই গেলাম। আজ না হয় নাই ছাড়লাম।”
