প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫৪
রোজ ও রুশা
অতঃপর , অতঃপর! হেরা তার নিজের গোলাপ ফুল, প্রাণপ্রিয় বান্ধবী রুপি বোনের জন্য, রোজের কোনো ক্ষতি হতে পারে—এই সামান্যতম বিপদের আশঙ্কার কথা ভেবে নিজের প্রাণের পরোয়া করেনি। আবহাওয়া ভীষণ খারাপ জেনেও নিজের জীবন বিপন্ন করে সে দিশেহারা হয়ে বাইরে ছুটে গিয়েছিল। সম্পর্কের কত রূপই তো থাকে, কিন্তু নিজের জীবনের সমস্ত ঝুঁকি একপাশে সরিয়ে বন্ধুর সামান্য সুরক্ষার জন্য এভাবে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটাই প্রমাণ করে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব আসলে কতটা গভীর আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
কিন্তু বাইরে গিয়ে রোজের কোনো সন্ধান না পেয়ে হেরা যখন হতাশ হয়ে উল্টো পথে ফিরছিল, ঠিক তখনই নেমে এল ভয়াবহ বিপর্যয়। লাল মাটির বিশাল পাহাড়টা বিকট শব্দে ধসে পড়ল! সরাসরি হেরার ওপর না পড়লেও, ঠিক তার গা ঘেঁষেই ঝরে পড়ল মাটির বিশাল চাপ। আলগা লাল মাটির তীব্র চোরাটানে হেরা ক্রমশ নিচের গভীর খাদের দিকে তলিয়ে যেতে লাগল। এর আগেই মুনিমিয়া তাকে একবার টেনে নিরাপদ দূরত্বে এনেছিল, কিন্তু এবার আর রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না।
মাটি ধসের সেই বিকট আওয়াজে হেরার সুপ্ত অতীত হঠাৎ তীব্র আলোড়নে জেগে উঠল। পাহাড়ের বিভীষিকার মুখে দাঁড়িয়ে অতীতে নাভানের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আর নাভানের ব্যাকুল মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। নাভান তার জীবনে কতটা জুড়ে ছিল, তার সেই অবুঝ পাগলামি আর ভালোবাসার কথা মনে পড়তেই হেরার বুকফাটা কান্না আর বাঁধ মানল না। চোখ থেকে অবাধ্য অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল, আর বাতাস চিড়ে সে আকুল হয়ে চিৎকার করে উঠল
“হেরান ভাইয়া!”
হেরার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল আর অতীতে হারিয়ে যাওয়ার এই মুহূর্তটা এতটাই জীবন্ত, যা পড়তে পড়তে পাঠকের বুকটাও এক অজানায় মুচড়ে উঠবে, মনে হবে দৃশ্যটা যেন একদম চোখের সামনেই ঘটছে।
অন্যদিকে, অন্ধকার জগতের রাজপুত্র নিলয় এর আগেই পাগলের মতো চারপাশ চষে ফেলে হেরাকে খুঁজছিল। হঠাৎ দূর থেকে সে দেখল—লাল মাটির পাহাড় ধসে পড়ছে আর হেরা সেই মাটির চোরাটানে তলিয়ে যাচ্ছে! দৃশ্যটা দেখা মাত্রই নিলয়ের পুরো বুকটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। সে তার লোকদের নিয়ে পিশাচের মতো ছুটে গেল সেই মৃত্যুর মুখে।
পাহাড়ের সেই প্রাণঘাতী লাল মাটির সামনে পৌঁছাতেই অর্জুন আর দলের লোকেরা আঁতকে উঠল। নিলয়কে বাঁচাতে তারা সবাই মিলে তাকে একযোগে চেপে ধরল, কারণ ওখানে যাওয়া মানে নির্ঘাত মৃত্যু। কিন্তু নিলয় ঝটকা মেরে সবাইকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল।
জগৎ হয়তো নিলয়কে চিনবে এক নিষ্ঠুর, অনুভূতিহীন ভিলেন হিসেবে—যার হাতের এক ইশারায় রাজ্য কেঁপে ওঠে, যার হৃদয়ে দয়া-মায়ার কোনো ঠাঁই নেই। কিন্তু সেই বিষাক্ত অন্ধকারের গভীরে কেবল হেরার জন্যই জমা ছিল এক সমুদ্র ভালোবাসা। জগত যাকে ধ্বংসের দেবতা ভেবে ভুল করে, আজ সেই মানুষটাই নিজের সমস্ত অপরাধ আর অন্ধকারের আড়ালে থাকা অনুরাগের রূপটা উন্মোচিত করে দিল।
চোখের কোণে বিষন্নতা আর চরম জিদ নিয়ে সে ফুসে উঠল—-
“তোরা ভাবছিস এই পাহাড়ের ধস আমাকে ভয় দেখাবে? সারাজীবন পাপের সাগরে সাঁতার কাটা নিলয়কে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই! হেরার গায়ে যদি একফোঁটা আঁচড়ও লাগে, তোদের কাউকেও আমি জ্যান্ত রাখব না! ছাড় আমাকে!”
সিয়াম ভয়ে চিৎকার করে উঠল—
“নিলয়, তুই সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছিস! মাটির ধসে তুই নিজে ধ্বংস হয়ে যাবি!”
নিলয় উন্মাদের মতো ভয়াল কিন্তু করুণ এক হাসি হাসল। স্বগতোক্তির মতো ফিসফিস করে বলল, যার প্রতিটি শব্দ উপস্থিত সবার মনের গভীরে গিয়ে বিঁধে, সিয়াম অশ্রুসিক্ত চোখে তাকায় তার দিকে কানে তার ফোন, সদ্য বিয়ে করে সিয়াম বিয়ের রাতে বউকে ছেড়ে সে বন্ধুর কাছে এসেছে বন্ধুর আহাজারি শুনে।
“যে মানুষটার আত্মা হেরা নামের মেয়েটার ভেতরে আটকে থাকে, সে তো বহুকাল আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে রে। এই পৃথিবীর কাছে আমি খারাপ হতে পারি, কিন্তু ওই মেয়েটার এক ফোঁটা নিঃশ্বাসের দাম আমার কাছে পুরো পৃথিবীর চেয়েও বেশি! আজ নিজের রক্তে ভেসে গেলেও ওই মাটির গভীর থেকে আমি আমার ভালোবাসাকে বের করবই!”
একজন নিষ্ঠুর ভিলেনের বুকফাটা ভালোবাসা যে কতটা বেপরোয়া আর অন্ধকারচ্ছন্ন হতে পারে, তা নিলয়ের এই উন্মাদ ব্যাকুলতাতেই ফুটে উঠছে বার বার। নিজের শরীর ক্ষতবিক্ষত হওয়া কিংবা মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া—কোনো কিছুকেই সে তোয়াক্কা করল না। সিয়ামকে সমস্ত শক্তি চূর্ণ করে দিয়ে সে এক উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই ধসে পড়া লাল মাটির দিকে।
পাহাড়ের চূড়ায় সাজেক এখন যেন একখণ্ড রহস্যময় বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাইরে কাপ্তাই হ্রদের দিক থেকে ধেয়ে আসা ঝোড়ো হাওয়া আর মেঘের গর্জন মিজোরাম সীমান্তের পাহাড়গুলোকে যেন গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। বাঁশের তৈরি কটেজগুলো তীব্র বাতাস আর প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। জানালার কাচে আছড়ে পড়া বৃষ্টির জলের শব্দ আর বাঁশ-কাঠের মড়মড় আওয়াজ মিলে এক ভয়ঙ্কর সুর তৈরি করেছে চারপাশে।
পাহাড়ে এমন দুর্যোগের রূপ সচরাচর দেখা যায় না। ভোররাত থেকেই আবহাওয়ার অবস্থা চরম খারাপ হতে শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পাহাড়ের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে বিধিনিষেধ আর ট্রাফিক রেস্ট্রিকশন জারি করা হয়েছে, যাতে এই দুর্যোগে কেউ বের হওয়ার সাহস না করে। আজ সকালে সবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যাত্রা স্থগিত করতে হয়েছে। যেহেতু পথঘাট বন্ধ আর বের হওয়ার কোনো উপায় নেই, তাই আপাতত নিশ্চিন্ত হয়ে সবাই যার যার রুমে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমাচ্ছে—আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তবেই ঢাকার পথ ধরা যাবে।
সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমালেও সবার মনের ভেতরের চিত্রটা এক নয়। মেঘ আর বৃষ্টির এই রূপ রূপালী পর্দায় বা বইয়ের পাতায় অনেকের কাছেই রোমাঞ্চকর লাগতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সবার জীবনে বৃষ্টি বা ঝড় সবসময় সুখ কিংবা আনন্দ বয়ে আনে না। বিশেষ করে পাহাড়ে আটকে পড়া এই চরম আবহাওয়ায় কারও কারও ভেতরে চেপে বসে এক অজানা বিষাদ আর অনিশ্চয়তা।
বাইরের তাণ্ডব দেখে বাকিরা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তখন মন ভালো না থাকায় রিসোর্টের এক কোণে একা দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল রোজ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে রুমে ফিরে আসতেই তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল—রুমের ভেতরে হেরা নেই!
প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কটেজের আশেপাশেই কোথাও আছে। কিন্তু দেখতে দেখতে ৩০ মিনিট পার হয়ে গেলেও হেরার কোনো খোঁজ মিলল না। কালবৈশাখীর গর্জন আর চারপাশে নিশ্চুপ মানুষের মাঝখানে এক ভয়ঙ্কর ভয়ে কাঁপতে লাগল সে। ব্যাকুল হয়ে এদিক-সেদিক খুঁজতে খুঁজতে চিৎকার করে উঠল রোজ—
“হেরা! কোথায় তুই? কোথাও তো তোকে দেখা যাচ্ছে না! এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় গেলি তুই!”
বাইরে যেমন প্রলয়ঙ্করী ঝড় বইছে, ঠিক তেমনই কি তাদের শান্ত জীবনটাকেও তছনছ করে দিতে অন্য কোনো ঝড় ধেয়ে আসছে?
আজ সকাল থেকেই রোজের বাঁ চোখটা বারবার লাফাচ্ছে। ছোটবেলায় বিন্দু মাসি বলতো, বাঁ চোখ লাফালে নাকি কোনো গভীর বিপদের ছায়া নেমে আসে। এ জাতীয় কথা সে কোনোদিন মানেনি, কিন্তু আজ কেন যেন বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। গত কয়েক দিনে নিজের জীবনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তাকে মানসিকভাবে একদম তছনছ করে দিয়েছিল। তার ওপর এই দুর্যোগময় সকালে হেরা উধাও!
আধা ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন হেরার দেখা মিলল না, তখন নিজেকে আর সামলাতে পারল না রোজ। সে অস্থির হয়ে কটেজের সবাইকে একে একে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। কিন্তু কারও কাছেই কোনো উত্তর নেই। ঘণ্টাখানেক কেটে গেল, কিন্তু হেরার কোনো হদিস মিলল না। রিসোর্ট জুড়ে শুধু এক দমবন্ধ করা থমথমে নীরবতা।
খবরটা হঠাৎ গিয়ে পৌঁছায় অধীরের কানে। খবরটা শুনেই সে চিন্তিত হয়ে পড়ে। সেও প্রায় ২০ মিনিট ধরে রিসোর্টের আনাচে-কানাচে, গলি আর ক্যাফেটেরিয়ার চারপাশে খুঁজে কোনো কুলকিনারা পেল না। এর মধ্যে জাওয়াদ খান, অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান, তৌহিদা এবং জিহান তালুকদার—সবাই হন্নে হয়ে খুঁজতে লাগে হেরাকে।
অধীর আর কোনো উপায় না পেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে যায় নাভানের রুমের দিকে। গলার স্বর আতঙ্কে কাঁপিয়ে অধীর বলে ওঠে—
“ভা… ভা… ভাই! কিউটি পাই বনুকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না!”
” ফালতু মজা করবি না অধীর, সবসময় নাটক ভালো লাগে না, বের হ রুম থেকে!
” ভা ভাই আমি স সত্যি বলছি!
নাভান প্রথমে বিশ্বাসই করতে চায়নি। ভেবেছিল অধীর হয়তো বরাবরের মতোই কোনো বাজে ফাজলামো করছে। কিন্তু একটু পরেই যখন তুষার, ঝিনুক আর সৃজন বিষণ্ণ মুখে এসে দাঁড়াল, নাভানের ভেতরের সুপ্ত আতঙ্কটা একমুহূর্তে অগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল।
নাভান সোজা সৃজনের দিকে তাকিয়ে চরম উত্তেজনায় তার শার্টের কলার চেপে ধরে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল—
” এর নাটক বন্ধ করবি দুই মিনিটে ,তা নয়তো মেরে ফেলবো আমি!
বাইরে তখন মেঘের প্রলয় নৃত্য চলছে। বাতাসে বাঁশের কটেজগুলো কড়কড় শব্দে কেঁপে উঠতেই নাভানের রূঢ় কণ্ঠস্বরে ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। কলার ছেড়ে দিয়ে ঝটকা মেরে সে সৃজনকে পেছনে ঠেলে দিল। তারপর ঘরের সবাইকে একপলক রুক্ষ চোখে দেখে চরম কর্কশ আর উগ্র কণ্ঠে গর্জে উঠল—
“নাটক বন্ধ কর তোরা! সবাই মিলে আমার সাথে নাটক সাজিয়েছিস তাই না? ফালতু ফাজলামো বন্ধ কর আর সোজা বল ও কোথায়, কই লুকিয়ে আছে! বাইরের আবহাওয়া ভালো না। ওকে যদি অন্য কোথাও পাঠিয়ে থাকিস, আই সোয়্যার খুন করে ফেলবো একেকটাকে!”
সৃজন ধাক্কা সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠে—
“আমরা সত্যি বলছি নাভান, হেরাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না! প্রায় ২ ঘণ্টার মতো ও মিসিং!”
নাভান এবার আরও হিংস্র হয়ে তেড়ে গিয়ে গর্জে ওঠে—
“এগেইন! আবার? আবার আমার সাথে নাটক করছিস? সত্যি করে বল, আমার অক্সিজেন কোথায়?!”
সৃজন এবার দুই হাত বাড়িয়ে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কাঁপা গলায় বলল—
“সত্যি বলছি নাভান, আমরা কেউ জানি না! হেরা সত্যিই নিখোঁজ!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ আর রুশা তখন থেকে একনাগাড়ে আকুতি করে কত কিছু বলে যাচ্ছে, কিন্তু নাভানের কানে কোনো কথা পৌঁছাচ্ছে না। তার কান ততক্ষণে যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, মাথায় শুধু একটা শব্দই প্রলয়ংকারী ঝড়ের মতো ঘুড়পাক খাচ্ছে—‘হেরা নেই’।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন জাওয়াদ খান। শক্ত, গাম্ভীর্যপূর্ণ এই মানুষটার মুখে আজ স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। তিনি অত্যন্ত গুরুতর মুখে ভারী গলায় বললেন—
“কথাটা সত্যি শেহতাজ! আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না, কিছু একটা করো! সব জায়গায় খোঁজ করা শেষ!”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের সব আলো যেন নিভে গেল নাভানের চোখে। তার মাথার ভেতরের রগগুলো লাফাতে লাগল। সে বাবার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রুক্ষভাবে বলে ওঠে—
“তুমিও ওদের সাথে নাটক করছো? আর কত নাটক করবে বাবা? এসব শুনতে আমি ইন্টারেস্ট নই, তুমি—”
নাভানকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এডভোকেট কাজল খান এগিয়ে এসে দৃঢ় গলায় বলে উঠেন—
“শেহতাজ! তোমার বাবা, এবং আমরা সবাই সত্যি বলছি। হেরাকে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
“হোয়াট?!”
একমুহূর্তও আর দাঁড়াল না নাভান। উন্মাদের মতো সে ঘরের বাইরে ছুটে বের হলো। করিডোর দিয়ে একপ্রকার উন্মাদের মতো দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে হেরার রুমের দরজা খুলে ফেলল। কিন্তু ভেতরের দৃশ্য তার বুকের ভেতরটা এক লহমায় ফাঁকা করে দিল—রুমটা একদম খালি। আলমারি খোলা, বিছানার চাদর একটু দোমড়ানো, কিন্তু কোথাও হেরা নেই!
“মিসাইল গার্ল, মিসাইল গার্ল ”
—পাগলের মতো কটেজের এদিক-সেদিক খুঁজেও যখন তাকে পাওয়া গেল না, তখন নাভান একপ্রকার বাধ্য হয়েই রিসোর্টের রিসেপশনের দিকে দৌড়াতে লাগল। সবাই নাভানের পিছু নিলো।
সবাই গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইল। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি আর ভোররাতের পাহাড়ী ঝড়ের তাণ্ডবে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জেনারেটরও অকেজো। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো নিথর, কালো হয়ে পড়ে আছে।
সিসিটিভি বন্ধ দেখে নাভানের মাথার ভেতরের শেষ নিয়ন্ত্রণটুকুও যেন চুরমার হয়ে গেল। উন্মাদের মতো রাগে সে সোজা রিসোর্টের দায়িত্বরত স্টাফের গেঞ্জির কলার শক্ত করে চেপে ধরল। টেনেহিঁচড়ে তাকে কাঠের কাউন্টারের সাথে ধাক্কা মেরে বিকট গলায় গর্জে উঠল—
“একটা জলজ্যান্ত মেয়ে সকাল থেকে উধাও হয়ে গেছে, আর আপনারা কোথায় ছিলেন?! কী করেন আপনারা এখানে?! ফাস্ট বল আমার মিসাইল গার্ল কোথায়, নাহলে এই কটেজ শুদ্ধ আমি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেব!”
স্টাফটি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করতে লাগল। কিন্তু অন্ধ নাভান তখন আর মানুষ চেনার অবস্থায় নেই। পাহাড়ের বাইরে যেমন তাণ্ডব বইছে, নাভানের ভেতরেও তখন শুরু হয়ে গেছে এক রক্তাক্ত ধ্বংসলীলা।
বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব আর ভেতরে নাভানের উন্মাদের মতো আচরণে পুরো রিসেপশন রুমের পরিস্থিতি তখন চরম উত্তপ্ত। রিসোর্টের যে স্টাফটিকে নাভান কাউন্টারের সাথে চেপে ধরেছিল, সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো তিতির। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে মনের গহীনে এক কুটিল চাল লুকিয়ে রেখেছিল সে। বাইরের লাইন বন্ধ থাকা বা সিসিটিভি অকেজো হওয়ার পেছনে যে তারই হাত ছিল, তা সেখানে উপস্থিত কারও কল্পনাতীত। নিজের অপরাধ ঢাকতেই অতি চালাকের মতো গলার স্বর কিছুটা মোলায়েম আর চিন্তিত বানিয়ে তিতির নাভানের কাছে এসে বলল—
” জি ম্যান , প্লিজ নিজেকে শান্ত করো! স্টাফদের ওপর চড়াও হয়ে লাভ কী বলো? ওদের কী দোষ? রাতেই তো সবাইকে নিষেধ করেছে রিসোর্ট থেকে যাতে বের না হয় কেউ। ভোররাতে তো প্রবল ঝড় ছিল, আর হেরা তো বাচ্চা মেয়ে নয়। এমনও তো হতে পারে সে নিজের ইচ্ছাতেই বাইরে কোথাও গেছে ? কাল রাতেও তো ওকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। আর কাল কি সব উদ্ভব কথা বলে ফেলেছিলো মনে নেই তোমার? দেখো নিজেকে ফ্রেস করছে হয়তো। হয়তো কিছুক্ষণ পর নিজেই ফিরে আসবে।”
তিতিরের এই বানিয়ে বলা যুক্তি শুনে ভয়াতুর স্টাফটি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ পেল। সে দুই হাত জোড় করে নাভানের সামনে দাঁড়িয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল—
“হ্যাঁ… স্যার, ম্যাম একদম ঠিক বলছেন! বিশ্বাস করুন, আমরা সত্যি কিছু জানি না। আবহাওয়ার পরিস্থিতি এত খারাপ হওয়ায় আমরা আগেই সব অতিথিকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যেন কেউ ঘরের বাইরে না যান। কিন্তু ম্যাম কখন কীভাবে বাইরে বেরিয়ে গেছেন, আমরা কেউই দেখতে পাইনি স্যার! আমাদের মাফ করে দিন!”
তিতিরের মুখে এমন অযৌক্তিক কথা শুনে নাভানের চোখের দৃষ্টি আরও হিংস্র, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল। তিতির যে পরিস্থিতি হালকা করার নাটক করছে এবং নিজেকে ভালো সাজাতে চাইছে, সেটা নাভানের তীক্ষ্ণ নজর এড়ালো না। রক্তচক্ষু মেলে তিতিরের দিকে একপা এগিয়ে গেল নাভান। তার কণ্ঠস্বর তখন হিংস্র কোনো পশুর গজড়ানির মতো শোনালো—
“নিজের ইচ্ছায় বাইরে গেছে মানে? তিতির, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো , নাকি তোমার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে?! এই ঝড়ের মধ্যে, রাস্তায় ভূমিধস হচ্ছে এই অবস্থায় হেরা নিজের ইচ্ছায় ‘ঘুরতে’ যাবে, নিজেকে ফ্রেস করতে যাবে ?! তোমার কি মনে হয় ও অবুঝ আর নির্বোধ?!”
নাভানের শরীরের রগগুলো কামড়ের মতো ফুলে উঠছে। ভেতরের প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা আর অশুভ আতঙ্ক তাকে এক আস্ত হিংস্র দানবে রূপান্তর করেছে। নাভান রিসোর্ট এর স্টাফ ও ম্যানেজারদের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে বিষাক্ত কন্ঠের সাথে চরম হুমকি দিয়ে বলল—
“যদি আমার হেরার আঁচড়টুকুও লাগে, যদি ওর কোনো ক্ষতি হয়—তবে মনে রাখিস তোরা, এই পাহাড়ের বুক থেকে তোদের কাউকে আমি আস্ত রেখে যাব না। তোদের একেকটাকে আমি নিজ হাতে শেষ করে দেব! আমাকে তোরা চিনিস না!” আমি সি আই ডি অফিসার শেহেতাজ খান নাভান।
নাভানের সেই চোখ ঢাকা উগ্রতা আর হিংস্র রূপ দেখে তিতিরের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা জাওয়াদ খান, কাজল খান এমনকি বাকি বন্ধুরা পর্যন্ত নাভানের এই বিধ্বংসী রূপ দেখে থমকে গেল। সে শুধু একজন প্রেমিক বা বন্ধু নয়, হেরা নিখোঁজ হওয়ার সাথে সাথে সে যেন এক মৃত্যুপরোয়ানা হাতে নেওয়া উন্মাদ বেক্তি হয়ে গেছে ।
কিন্তু সবাই যখন ভাবছিল এই তীব্র ঝড়ের মাঝে হেরা কেন আর কীভাবে বাইরে গেল, তখন কারোরই জানা ছিল না যে নেপথ্যে সাজানো হয়েছে এক সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর চক্র।
এই চরম সত্যের সূচনা হয়েছিল ঠিক আগের রাতে।
সৃজনের সঙ্গে ঝগড়া আর তার মায়ের মুখ থেকে ভেসে আসা নির্মম অপমানজনক কথাগুলো রোজ কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। সে কখনোই চায়নি তার ব্যথার ভারী বোঝা অন্য কারও ঘাড়ে চাপুক, কিংবা তার জন্য সবাই চিন্তায় পড়ুক। তাই বুকের ভেতর জমানো সমস্ত কষ্ট সে একা একাই সয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে, নাভানও যখন নিজের পরিচয়ের ব্যাপারে একপ্রকার ধোঁয়াশা বজায় রাখছিল, তখন সেই অভিমান আর রাগের আগুনে হেরা দূরত্ব বজায় রেখেছিল নাভানের থেকে। সেই রাতে কৌশলে হেরা রোজকে নিজের রুমে নিয়ে আসে এবং একপ্রকার জোর করেই তাকে আটকে রাখে, যাতে নাভান কোনোভাবেই সেখানে আসতে না পারে।
হেরার ঘরটি ছিল পরম শান্ত ও পরিপাটি। কাঠের আসবাব, হালকা ধূপের সুবাস, আরামার দায়ক বিছানায়, হেরা যখন ঘুমে মগ্ন তখন গভীর রাত, আধো-ঘুমের মাঝে হেরা হঠাৎ শুনতে পায় কার যেন ফুঁপিয়ে কান্নার ব্যাকুল শব্দ। চোখ মেলতেই দৃশ্যটা হেরার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দেয়।
ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারানো এতিম মেয়েটা—রোজ, জায়নামাজে বসে দু’হাত তুলে হাউমাউ করে কাঁদছে। জীবনের চরম ব্যর্থতা আর ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ছলনা। অবহেলার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে রোজ আল্লাহর কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করছিল। চোখের জলে ভেসে সে আকুতি জানাচ্ছিল—যেন এই কষ্টের জীবন থেকে তাকে চিরতরে মুক্তি দেওয়া হয়, যেন আজ রাতে সে আর বেঁচে না থাকে! যদি সে কষ্ট সহ্য না করতে পারে তবে নিজেকেই শেষ করে দিবে।
বোনসমতুল্য রোজের মুখ থেকে নিজের মৃত্যু চাওয়ার এই ভয়াবহ আকুতি শুনে বিছানায় ঘুমাচ্ছান্ন শুয়ে থাকা হেরার মন শিউরে উঠেছিল। তার গহীন মনে এক গভীর আর অজানা আতঙ্কের জন্ম হয়েছিল—রোজ যদি সত্যি নিজেকে শেষ করে দেয়?
পরদিন সকালে চতুর তিতির হেরার ভেতরের ঠিক এই দুর্বলতা আর ভয়টাকেই নিজের অশুভ চাল হিসেবে ব্যবহার করে। খুব কৌশলে সে হেরার কাছে গিয়ে একটা মিথ্যা খবর রটায়—রোজ নাকি চরম হতাশায় আর থাকতে না পেরে পাহাড়ি খাদের পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক রাস্তার দিকে একা হেঁটে চলে গেছে!
খবরটা শোনামাত্রই হেরার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাল রাতে জায়নামাজে বসে রোজের সেই কান্না আর মৃত্যু চাওয়ার করুণ দৃশ্য। রোজ হয়তো সত্যিই খাদে ঝাঁপ দিয়ে নিজের ক্ষতি করে ফেলবে—এই এক আতঙ্কে হেরার সমস্ত বুদ্ধি-বিবেচনা এক মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যায়। বাইরের হুহু ঝোড়ো হাওয়া আর প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টির চরম বিপদকে একটুকুও তোয়াক্কা না করে, সে ছুটে বেরিয়ে যায় পাহাড়ি বিপজ্জনক রাস্তার দিকে।
অথচ সত্যটা ছিল নিষ্ঠুরভাবে উল্টো।
রোজ তো কোথাও যায়ইনি! সে তো মন খারাপ নিয়ে রিসোর্টেরই এক নিরাপদ কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ‘বৃষ্টি বিলাস’ করছিল। তিতিরের সেই সুচতুর ও কাল্পনিক খবরের ফাঁদে পা দিয়েই, বান্ধবীকে বাঁচানোর তাড়নায়, আজ সাজেকের এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগে হেরা নিঃশব্দে এক ভয়ংকর চক্রান্তে হারিয়ে গেল!
হঠাৎ করে নাভান আর একমুহূর্তও কটেজের ভেতরে দাঁড়াল না। উন্মাদের মতো ঝড়ের তোয়াক্কা না করে রিসোর্টের প্রধান দরজা ঠেলে সোজা বাইরে ঝোড়ো বৃষ্টির মধ্যে ছুটে বেরিয়ে গেল!
পিছন পিছন ব্যাকুল হয়ে ছুটে এলো অধীর, সৃজন, তুষার, ঝিনুকসহ বাকি সবাই। কারণ ততক্ষণে রিসোর্টের চারপাশের উঁচুনীচু পাহাড়ি গলি, কটেজের পিছনের জঙ্গল আর ক্যাফেটেরিয়ার কোণগুলো খোঁজা শেষ, কিন্তু হেরার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বাইরে তখন আকাশ চিরে মুষলধারে বৃষ্টি আর হাড়কাঁপানো বাতাসের তাণ্ডব। বৃষ্টির তোড়ে কয়েক গজ দূরের পথও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
কিছুদূর এগোতেই রাস্তা যেন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। পাহাড়ের ওপর থেকে ভেসে এলো এক ভয়ংকর বিদীর্ণ আওয়াজ! আছড়ে পড়ল বিশালাকার পাহাড়ি ঢল আর বিশাল মাটির ধস! কাদা, বিশালাকার পাথর আর উপড়ে পড়া শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি এসে মূল পথটি পুরো আটকে দিয়েছে। চারদিক থেকে তখন আর্তচিৎকার ভেসে আসছে। স্থানীয় পাহাড়ি মানুষজন কান্নাকাটি করছে, কাদার স্তূপ থেকে অনেকে তাদের নিজেদের স্বজনদের টেনে বের করার চেষ্টা করছে। একটু দূরে এক পাহাড়ি পরিবার তাদের স্বজনের রক্তাক্ত নিথর দেহ চট দিয়ে ঢেকে রেখে ডুকরে কাঁদছে। চারদিকে কেবল অন্ধকারের ঘেরাটোপ, কাদামাটির দুর্গন্ধ আর প্রকৃতির ভয়াল রূপ।
পাহাড়ের সেই বিধ্বংসী ধসের সামনে দাঁড়িয়ে নাভানের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই থমকে গেল। বৃষ্টির অবিরাম ধারা তার সারা শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু নাভানের শরীরের প্রতিটি লোমকূপ তখন এক তীব্র ভালোবাসার দহনে জ্বলছে। কাদার স্তূপ, পাথর আর ভেঙে পড়া গাছপালার সেই ধ্বংসলীলা দেখে উপস্থিত বাকি বন্ধুদের চোখে তখন জল, তারা মৃত্যুর অশুভ ছায়া দেখতে পাচ্ছে সেখানে। কিন্তু নাভানের চোখে কেবল একটা দৃশ্য—হেরার নিষ্পাপ হাসিমুখ।
“না! না! আমার অক্সিজের কিচ্ছু হতে পারে না!
—নাভানের এই চিৎকার যেন ঝড়ের গর্জনকেও ছাপিয়ে গেল। সে সামনে আগাতে যায়, যেখানে নিশ্চিত বিপদ রেড মার্ক করা। নাভান ছুটছে আর একেক জনকে জিজ্ঞেস করছে?
” আ আমার অক্সিজেনকে দেখেছেন,লম্বা চুল অনেক সুন্দর দেখতে থুতনি কাটা,অনেক সুন্দর দেখেছেন?
” একটা পাহাড়ি ছেলে নাভানের উন্মাদের ব্যাবহারে ভয়ে ভয়ে বলে উঠে —
” একটা সুন্দর আপারে জাইতে দেখছি স্কাট পড়া আছিলো নিল,আর সাদা,চুল অনেক লম্বা,বৃষ্টির ভিতর দৌড়াইতাছিলো,আমি মানা করছি কিন্তু হোনে নাই,টাইগার টিলার অইদিকে গেছে,আর রোজ ফুল কইয়া ডাকতাছিলো।
মুহুর্তে সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। অধীর ফোন বের করে বললো–
” দে দেখুন তো এ কি না!
ছেলেটি ফোনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে —
” হ ভাইজান এই আপারেদেখছি।
কথাড়া বলতে দেড়ি নাভান টাইগার টিলার দিকেছুটে যায়। অনেক টা পথ দেখেও হেরার হদিস পায় না কেউ। সামনে আরো দুর্গম পথ সামানে আগাতে , তুষার আর সৃজন দুই পাশ থেকে এসে নাভানকে জাপটে ধরার চেষ্টা করল, তাদের চোখে তখনো ঘোর আতঙ্ক। সৃজন আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠে —
“নাভান, যাস না! ওদিকে আবার ধস নামবে! বিপদ হবে ভাই, নিজেকে সামলা!”
নাভান যেন তখন কোনো মানুষ নয়, বরং এক আদিম হিংস্র শক্তির আধার। এক ঝটকায় তুষার আর সৃজনকে ছিঁটকে কাদার ওপর ফেলে দিয়ে সে গর্জে উঠল—
“ছাড় আমাকে! তোরা আমাকে ছাড়বি কি না বল?!”
অধীর তখন কাদার মধ্যেই হাঁটু গেড়ে বসে তার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—
“ভাই, প্লিজ ওদিকে যাস না! ওদিকে সাক্ষাৎ মৃত্যু! তুই কি চাস হেরার সাথে সাথে আমরা তোকেও হারাই ?”
“এই ইডিয়ট! হেরা হারিয়েছে মানে কী? ও কোথাও হারায়নি, আর আমি ওকে হারাতে দেবও না। তুই এই কথা বলেছিস কেন? ও কই হারিয়েছে?”
নাভানের চোখ রাগে অন্ধকার হয়ে উঠল।
“ও আছে। আমার সাথেই আছে। শুধু আমার ওপর অভিমান করেছে। তাই জবান সামলে কথা বল—আমার হেরা হারিয়েছে বলার সাহস আর একবার করিস না।”জেন্ত কবর দিবো।
কিন্তু নাভানের কাছে তখন পৃথিবীর সব যুক্তি অর্থহীন। সে অধীরকে সরিয়ে দিয়ে সোজা গিয়ে নামল হাঁটু সমান পিচ্ছিল কাদা আর পাথর ছড়ানো সেই মৃত্যুপুরীতে। তার দামী ছাই রঙা শার্ট কাদা-পানিতে মাখামাখি, আঙুলের ডগা দিয়ে রক্ত ঝরছে কোনো এক গাছের লতা পাতা কাটার সাথে বিধে। সে ধসের ওপর দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দিল—যেন গোটা পাহাড়টাকেই সে জড়িয়ে ধরতে চাইছে তার অক্সিজেনের খোঁজে।
“মিসাইল গার্ল… অক্সিজেন কোথায় তুই?! শোন, তোর সেই অসভ্য, বেপরোয়া গিটার ওয়ালা আজ এই পাহাড় চূড়ায় এসে একা দাঁড়িয়ে আছে রে! চারপাশের এই পাহাড়টা ভেঙে পড়ুক, এই আকাশ থমকে যাক—আমি এখান থেকে এক পা-ও লড়ব না! তুই দেখতে পাচ্ছিস না আমি বরফের মতো ঠাণ্ডা বৃষ্টির ভেতর দাঁড়িয়ে আছি?! তুই কি দেখতে পাচ্ছিস না!
বল না, আর কত বড় পাহাড় ডিঙালে তোকে পাওয়া যাবে? এই প্রবল বৃষ্টির ঝাপসাতেও আমি শুধু তোকেই খুঁজে যাচ্ছি রে! তুই না বলতিস আমি হার মানলে তুই আমাকে টেনে তুলবি? দেখ, আজ যে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না, অক্সিজেনের অভাবে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে মিসাইল গার্ল!
আমার আর কিচ্ছু চাই না রে… কিচ্ছু না! তুই শুধু এই মেঘের আড়াল থেকে একবার বেরিয়ে এসে বল যে তুই আছিস! তুই না এলে এই পাহাড়ের গর্ভেই শেষ হয়ে যাবে তোর অসভ্যটা গিটার ওয়ালা .. কোথায় তুই?! আমাকে একটুখানি অক্সিজেন এনে দে, নয়তো একবারে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মেরে ফেল!” অক্সিজেন!
এমন সময় ঝিনুক নাভানের কাছে এসে অত্যন্ত আকুল কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে উঠল—
”ঠান্ডা মাথায় আমাদের খুঁজতে হবে হেরাকে। প্লিজ দোস্ত তুই শান্ত হ। মাথা গরম করে কিছু হবে না, প্রকৃতির ওপর আমাদের কোনো হাত নেই।” আমি ফোর্স লাগিয়েছি,বড় বাবা,মামনি সবাই ফোর্স লাগিয়েছে। তুই প্লিজ শান্ত হ!
ঝিনুকের এই হঠাৎ স্পর্শ আর ব্যাকুল মিনতিটুকু যেন নাভানের মাথার ভেতরের চড়ে থাকা উত্তপ্ত রগগুলোকে এক মুহূর্তের জন্য শিথিল করে দিল। বৃষ্টির জল জমে মুখে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে, আর সেই ভিজে যাওয়া রক্তচক্ষু মেলে নাভান ঝিনুকের দিকে তাকাল। সে নিজেও ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারল—এমন উন্মাদের মতো এদিক সেদিক গেলে লাভ নেই, কিংবা ফোর্সের ওপর চিৎকার করলে হেরাকে ফিরে পাওয়া যাবে না। এখন প্রতিটা সেকেন্ড মূল্যবান, আর সিদ্ধান্ত নিতে হবে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত কৌশলে।
নাভান তার কাঁপা হাত দুটো কাদা থেকে তুলে নিয়ে নিজের দুই পাশে শক্ত মুষ্টিবদ্ধ করল। তার চোখের হিংস্র রূপটা মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে সেখানে নেমে এলো এক থমথমে, বিপজ্জনক নীরবতা।
”ঠিক বলছিস…” নাভান ভারী, নিচু ও গুমোট গলায় বিড়বিড় করে উঠল—
“ঠান্ডা মাথা… আমাকে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে।”
নাভান যতই হেরাকে অস্বীকার করুক বন্ধুর যে প্রানভ্রমরা হেরা তা সবাই আরো বুঝে গেছে।
সে সিআইডি প্রধানের মতো চোখ দুটো বন্ধ করে এক সেকেন্ডের জন্য সাজেকের ম্যাপ আর চারপাশের পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থানটা মনে মনে এঁকে নিল। কিন্তু তার এই বাহ্যিক শান্ত রূপটা যে কেবলই ঝড়ের আগের এক নীরবতা, তা সেখানে উপস্থিত সবাই খুব ভালো করেই টের পাচ্ছিল। সে নিজেকে কতক্ষণ শান্ত রাখতে পারবে, তা কেবল সময়ের ওপর নির্ভর করছে।
সাজেক ভ্যালির সেই প্রলয়ঙ্করী সকাল। আকাশের বুক চিরে নেমে আসা কালো মেঘের আস্তরণ আর বৃষ্টির অবিরাম তাণ্ডব প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর সৌন্দর্য তৈরি করেছে। পাহাড়ের চূড়ায় সাজেক যেন এক চিরস্থায়ী অমাবস্যার কবলে। এই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে নাভান—একজন পুরুষ, যার বাহ্যিক রূপ আজও যেকোনো নারীর হৃদয়ে ধুকপুকুনি ধরিয়ে দেয়। তার পরনের সাদা শার্টটি বৃষ্টির জলে ভিজে দেহের সাথে লেপ্টে আছে, কোথাও কোথাও ছিঁড়ে ঝুলে পড়েছে। সেই ভেজা পোশাকের আড়ালে তার সুঠাম দেহ ও রাজকীয় শরীরের বাঁধনগুলো এক অস্থির শিল্পের মতো ফুটে উঠছে। নাভান এখন কেবল একজন সুদর্শন সিআইডি অফিসার নয়, সে এক ধ্বংসের অবতার।সমস্ত ফোর্স তল্লাশি চালানো শেষ করেছে, কিন্তু সবার মুখেই পরাজয়ের গ্লানি। নাভানের সামনে এসে যখন প্রতিটি টিম লিডার একে একে মাথা নিচু করে দাঁড়াচ্ছে, তখন সকালের সেই মলিন আলোয় পাহাড়ের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
নাভানের বাবা জাওয়াদ খান—দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী—এবং তার মা, দেশের বিখ্যাত অ্যাডভোকেট কাজল খান এগিয়ে এলেন ছেলেকে শান্ত করতে। তাদের উপস্থিতিতে নাভানের চোখের আগুন যেন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে রূঢ় স্বরে বলে উঠল—
“বাবা, কিসের ক্ষমতা তোমার? তুমি তো মন্ত্রী, এই দেশের সব নিয়ম তোমার হাতে! আর মা, তুমি তো দেশের বাঘা বাঘা ক্রিমিনালদের জেলে ডুকিয়ে দাও , তোমার আইনের মারপ্যাঁচে বড় বড় কেস ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আজ সেই আইনের ক্ষমতা কোথায়? কেন আমার অক্সিজেনকে তুমি খুঁজে এনে দিতে পারছ না?”
পাহাড়ের সেই বিপজ্জনক খাদের দিকে জাওয়াদ খান আর অ্যাডভোকেট কাজল খান পা বাড়াতেই আর্মি অফিসাররা আর স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। তারা চেনে এই পরিবারটিকে—একজন দেশের প্রতাপশালী মন্ত্রী, অন্যজন নামজাদা অ্যাডভোকেট, আর তাদের ছেলে স্বয়ং দেশের পাওয়ারফুল সিআইডি অফিসার। এই ভিআইপি ব্যক্তিত্বদের দুর্গম, ধসে যাওয়া বিপজ্জনক পথে নামতে দেওয়া মানে আরেকটা নতুন প্রাণঘাতী বিপর্যয় ডেকে আনা। অফিসাররা হাত জোড় করে, বিনয়ের সাথে কিন্তু অত্যন্ত কঠোরভাবে বাধা দিয়ে বলল—
“স্যার, ম্যাম! আপনারা সামনে যাবেন না, রাস্তা অত্যন্ত বিপজ্জনক! আমরা ধাপে ধাপে, সাবধানে এগোচ্ছি। আমাদের সময় দিন, টিম কাজ করছে।”
আর্মি অফিসারদের এই তথাকথিত ‘নিয়ম’ আর ‘ধীরগতির আশ্বাস’ শোনামাত্রই নাভানের রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। যে ভালোবাসার মানুষটা ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে, তাকে বাঁচানোর মাঝে এই সামাজিক মর্যাদা আর আভিজাত্যের বর্ম যেন এক চরম উপহাস!
নাভান এক লহমায় সেনা অফিসারদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো শান্ত সিআইডি অফিসারের ছাপ নেই—সেখানে জ্বলছে এক অন্ধ, হিংস্র উন্মাদনা। সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে এক ভয়ংকর, বিষাক্ত ও শীতল অট্টহাসি দিয়ে উঠল।
”দেখেছো বাবা? ওরা তোমাকে থামাচ্ছে! কারণ তুমি ‘মাননীয় মন্ত্রী’! মা-কে থামাচ্ছে, কারণ উনি দেশের নামিদামি ‘অ্যাডভোকেট কাজল খান’! এই ক্ষমতার শিকলই তো আমাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছে, তাই না?”
নাভান পা বাড়িয়ে জাওয়াদ খানের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নাভানের পরনের ছিঁড়ে যাওয়া শার্ট থেকে জল তখনো টুপ টাপ করে পরছে। থমথমে গলায় বলে উঠল—
”আমি নিজেই সিআইডি অফিসার, বাবা। দেশের জটিল সব কেস আমার আঙুলের ইশারায় সমাধান হয়। দেশের বড় বড় অপরাধীরা আমার নাম শুনলেই খাঁচায় বন্দি হতে ভালোবাসে। আমি আজ আমার সর্বোচ্চ ফোর্স, সব ক্ষমতা, সব টেকনিক্যাল টিম এই পাহাড়ে অ্যাপ্লাই করেছি। কিন্তু এই পাহাড় আমার কোনো কথাই শুনছে না! এই পাথর, এই কাদা আমার আদেশ হাসিমুখে পায়ে ঠেলে দিচ্ছে! এরা আমাদের ভিআইপি ট্যাগ দেখে পথ আটকে বলছে— জলদি কাজ চালাচ্ছি অপেক্ষা করুন ! আমার অক্সিজেন কি ওখানে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বসে আছে?!”
নাভানের কন্ঠস্বরে তখন নেমে এলো এক প্রলয়ঙ্কারী অন্ধকার। সে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সব অফিসারদের দিকে এক রক্তচক্ষু হানল, তারপর আবার বাবার চোখে চোখ রাখল—
”এসব ক্ষমতার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? নেই বাবা! এই ক্ষমতা থেকে বিন্দুমাত্র লাভ নেই! যে ক্ষমতা আমার ভালোবাসাকে দ্রুত খুঁজে এনে দিতে পারে না, যে ক্ষমতা পাওয়ার পর আমাকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়—সেই ক্ষমতা একটা আবর্জনা ছাড়া কিচ্ছু নয়! তুমি আজই মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়াবে বাবা, আর মা তুমিও তোমার এই ভণ্ড আইনব্যবস্থাকে ছুড়ে ফেলে দাও! আমিও… আমিও আজ থেকে সিআইডির এই রক্তচোষা ব্যাজ খুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেব! সব ক্ষমতা আমরা ছেড়ে দেব! কারণ এই ক্ষমতা আমাদের প্রাণ বাঁচাতে পারে না, শুধু আমাদের লাশকে সম্মান দিতে জানে!
নাভানের এই বিস্ফোরক কথা শুনে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেনা অফিসার থেকে শুরু করে সিআইডির প্রতিটি সদস্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, এই উন্মাদ প্রেমিককে ক্ষমতার বর্ম বা নিয়মের শিকল দিয়ে আর এক মুহূর্তও আটকে রাখা সম্ভব নয়।
” শেহেতাজ বাবা সব ঠিক হয়ে যাবে আল্লাহ আছেন আমাদের সাথে।
নাভান তার বাবার দিকে এক কদম এগিয়ে গেল। তার ভেজা শার্টের ছিঁড়ে যাওয়া অংশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। সে আঙুল তুলে পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করল।
“তুমিও কি আমাকে বোঝাতে এসেছ, বাবা? তোমরা কি দেখছ না এই পাহাড়টা আমার অক্সিজেনকে আটকে রেখেছে?
নাভানের কণ্ঠস্বর তখন কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। রক্তাক্ত আঙুল দিয়ে বারবার নিজের নাক-মুখ মুছছিল সে, অথচ চোখের পানি থামছিল না। কথা বলতে গেলেই গলা আটকে আসছিল—মনে হচ্ছিল, ভয় যেন তার কণ্ঠনালিতে হাত চেপে ধরেছে।
হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় ছুটছে—এত জোরে, যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। ভালোবাসার মানুষটা বিপদে আছে—এই একটামাত্র চিন্তা নাভানের শরীরের প্রতিটি শিরায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ঠান্ডায় ভেজা শরীরটা কখন যে উত্তাপে জ্বলে উঠেছে, সে নিজেও টের পায়নি। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট কাঁপছে, হাত-পা কাঁপছে অবিরত।
তার চোখে তখন শুধু একটাই ভয়—
যদি তার ভালোবাসার মানুষটার কিছু হয়ে যায়?
এই একটা চিন্তাই নাভানের সমস্ত শক্তি, সমস্ত যুক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল।
“আমি চাইনা তোমাদের ক্ষমতা দিয়ে ওকে বাঁচাতে, আমি চাই আমার ভালোবাসা দিয়ে আমার অক্সিজেনকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে । কিন্তু আজ যদি ওর বিপদ হয় , তবে তোমাদের এই ক্ষমতার সিংহাসন আমি নিজের হাতে ভেঙে চুরমার করে দেব! তোমরা আমাকে বাঁচাতে পারবে না, তোমরা আমাকে সুখ দিতে পারো নি কখনো —তোমরা শুধু আমাকে যন্ত্রণা দেখতে শিখিয়েছ, দুরুত্ব শিখয়েছো, কিন্তু আমি যে বড্ড ক্লান্ত বাবা, বড্ড ক্লান্ত!”আমি আর দূরে থাকতে পারবো না। অক্সিজেন কে এনে দাও আমার এঞ্জেল কে এনে দাও, আমার পরি বউ কে এনে দাও বাবা প্লিজ, এবার দয়া করো আমার উপর।
এরপর অফিসারদের দিকে ফিরে সে গর্জে উঠল অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে —
“তোরা কি মনে করছিস আমি এখানে নাটক করতে এসেছি? আমার অক্সিজেন এর ওই একটা হাসির সামনে এই পুরো পাহাড়ের কোনো দাম নেই! আমার অক্সিজেনকে যদি তোরা এখান থেকে খুঁজে বের করে দিতে না পারিস, তবে তোদের এই ইউনিফর্ম আর ফোর্সের কোনো দাম আমার কাছে নেই। আমি জানি তোরা অনেক দক্ষ, আমি জানি তোরা পারিস—কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তোদের এই পেশাদারিত্বের চেয়ে আমার ভালোবাসাটা আমার বেচে থাকাটা বড়
। কেন থামালি? ভয় পাচ্ছিস? আমি মরে যাবো। আজ যদি আমার হেরার কিছু হয়, তবে এই সাজেকের মাটি থেকে তোদের কাউকে আমি আস্ত ফিরতে দেব না।
তার এই আচরণে এক অদ্ভুত সম্মোহন ছিল। একজন নামিদামি সিআইডি অফিসার, যার আভিজাত্যে সবাই মুগ্ধ হয়, সে আজ কাদার ভেতর নিজের আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে লড়ছে। তার এই রক্তভেজা রূপেও সে এক অজেয় পুরুষ। সে থামছে না, কারণ এই দুর্যোগময় সকালটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ফুটে উঠছে একজন প্রেমিকের সেই উন্মাদনা, যা পুরো পাহাড়ি এলাকাকে এক করুণ পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নাভান তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হেরাকে খুঁজতে থাকবে—হোক না তা পাহাড়ের খাদে, হোক না তা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
নাক মুখ দিয়ে হালকা হালকা রক্তের আবছা বল দেখতে পেয়ে সিআইডি অফিসার লাবনীর সামনে এসে বলে ওঠে।
চলো সেই তাজ আগে মাথা ঠান্ডা করো আমরা দেখছি এরা কি আমরা বের করবোই যে কোন মূল্যে। তুমি এখন আমাদের সাথে চলো।
“আই আমার পরি বউ কে ছাড়া কোথাও যাবো না।আমি।তাকে ছাড়া একা জাবো না।
পিচ্ছিল কাদায় পা পিছলে নাভান বারবার আছড়ে পড়তে লাগল ধারালো পাথরগুলোর ওপর। হাঁটু ও কনুই কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল, শার্ট ছিঁড়ে একাকার হলো, কিন্তু ব্যথার অনুভূতি হারিয়ে গেছে হেরাকে হারানোর চরম আতঙ্কের কাছে।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক পাহাড়ি আরেক ছেলেকে কান্না করা অবস্থায় দেখে নাভান উন্মাদ হয়ে তার জামার কলার চেপে ধরে ঝাঁকাতে লাগল—
“এই এই ! তুই ওকে দেখেছিস?! কোনো মেয়েকে এই পথ দিয়ে যেতে দেখেছিস?!”
পাহাড়ি ছেলেটা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হাত নেড়ে না বলল। নাভান তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আবার এদিক সেদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। যেন নিজ হাতে পুরো পাহাড়ের ধস সরিয়ে সে তার ভালোবাসাকে খুঁজে বের করবে! নাভান ছুটে উঁচু একটা পাহাড়ে উঠে। যেখান থেকে সহজে সব দিক দেখা যাবে।
এরই মধ্যে খবর পেয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় বড় অফিসাররা। দুর্গম সাজেকে আটকে পড়া সেই সিনিয়র অফসিাররা নাভানের এই পাগলামি দেখে এগিয়ে এলেন। তারা জোর করে নাভানকে টেনে তোলার চেষ্টা করে বললেন–
” শেহতাজ, নিজেকে সামলাও! এই পাহাড়ি ধসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আত্মহত্যার সামিল! ফোর্স নামানো হয়েছে, তারা আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। বৈঠক করছি আমরা। তুমি পেছনে সরো!”
বড় অফিসারের কলার চেপে ধরে নাভান গর্জে উঠে —
“কিসের ফোর্স?!”
নাভান অফসিারদের দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকাল।
“আমার অক্সিজেন কোথায় আটকে আছে, কি অবস্থায় আছে তাকে না নিয়ে আপনারা আমাকে ব্যাক করতে বলছেন? আপনাদের কোনো বৈঠক, কোনো ফোর্সের ওপর আমার ভরসা নেই!”
বৃষ্টি আর ঝড়ের তোড়ে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। নাভানের দুই নাক আর মুখ দিয়ে রক্ত এসে থুতনিতে জমছে, সাদা দাঁতের ফাঁকে তা তাজা জমাট রক্তে লাল। প্রতিটা শ্বাসের সাথে বুকের হাঁপানির ঘড়ঘড় শব্দে মনে হচ্ছে ফুসফুস চিরে যাচ্ছে। চোখ দুটি রক্তজবার মতো লাল, দৃষ্টি প্রায় ঝাপসা। তবুও সামনের দিকে পশুর মতো বুকে ভর দিয়ে এগোতে এগোতে তার বুকভাঙা চিৎকার—
“তোদের পায়ে পড়ি… আমায় থামাস না! তোদের এই আইনি নিয়ম, এই ফোর্সের দয়া আমি পায়ে দলে পিষে দেব! আমার অক্সিজেন কোন গর্তে নিঃশ্বাস না পেয়ে ছটফট করছে, আর তোরা আমাকে সুশীল সেজে ব্যাক করতে বলিস?! কতোটাবছর…ধরে বুকের ভেতর একটা জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে বেঁচে আছি রে! প্রতিটা রাতে স্বপ্নে দেখেছি তুই আমায় বাঁচাও বলে চিল্লাচ্ছিস, আমার কাছে আসতে বায়না করছিস। আর আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে শুয়ে ছিলাম পরিবারের টানে ! তোর সেই কান্না সেই দহন আমি প্রতিদিন সয়েছি … প্রতিদিন!এঞ্জেল, অক্সিজেন আমার … শোন রে! তোর অসভ্য গিটার ওয়ালা,তোর লাভান বরের বুক ফেটে রক্ত বের হচ্ছে রে, দেখতে পাচ্ছিস না?! ফুসফুসটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, রক্তে মুখ ভেসে যাচ্ছে… আমার আর নেওয়ার ক্ষমতা নেই রে! আর একটা সেকেন্ডও সহ্য হচ্ছে না এই যন্ত্রণা! তুই কি সত্যিই শুনবি না আমার ডাক? তোর হেরান ভাইয়ার কসম, তুই যদি আজ না আসিস… তোর এই হেরান ভাইয়ার রক্তে এই পাহাড়ের মাটি লাল হয়ে ভাসবে! তুই এসে শুধু আমার লাশটা পাবি! অক্সিজেন… দে না রে একটু অক্সিজেন… আমায় আর এক ফোঁটা নিঃশ্বাস দে… নয়তো তোর কোলেই নিয়ে আমায় একবারে মেরে ফেল…!”
বলেই রক্তের একটা দলা গলার ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। নাভান ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, দাঁতে দাঁত চেপে রক্তমাখা আঙুলগুলো কাদার ওপর আঁচড় কাটতে থাকে। আবার শরীরের শক্তি জোগিয়ে উঠে দাঁড়ায় নাভানের পিছু সবাই।
পাহাড়ের সেই দুর্গম পথগুলোতে নাভান উন্মাদের মতো একা দৌড়াতে লাগল। বিপদসংকুল খাদের কিনারে গিয়ে ঝুঁকে দেখতে লাগল যদি হেরা কোথাও আটকে থাকে। একটা দুপুর এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলল এক পাগল প্রেমিকের হাহাকার। বৃষ্টি যেনো থামার নাম নেই আজ সাজেক ঢেকে গেল ঘোর অমাবস্যার মতো নিকষ অন্ধকারে—তবু হেরার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
একসময় প্রচণ্ড মানসিক চাপ, ক্লান্তি আর শরীরের রক্তক্ষরণে নাভানের দেহ ভেঙে পড়তে শুরু করল। দুর্গম খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে যখন সে “হেরা…” বলে আবার চিৎকার দিতে চাইল, ঠিক তখনই তার নাক আর কান দিয়ে রক্তের ধারা নেমে এলো। চোখের সামনে সবকিছু ঘুরতে লাগল। প্রচন্ড রক্তচাপের ভারসাম্যহীনতায় নাভানের চোখের পাতা বুজে এলো, আর সে বিশাল এক কাদার স্তূপের ওপর সেন্সলেস হয়ে আছড়ে পড়ল।
উদ্ধারকারী আর্মি অফিসার আর বন্ধুরা মিলে অচৈতন্য নাভানকে ধরাধরি করে রিসোর্টে ফিরিয়ে আনল। কটেজের ঘরে তাকে শুইয়ে দিয়ে দেখা গেল তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। নাক-মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে । দ্রুত চিকিৎসক ডেকে তুষার আর ডাক্তার মিলে তার হাতে স্যালাইনের ড্রিপ গুঁজে দেয় ।
পরপর তিন ঘণ্টা নিথর হয়ে পড়ে রইল নাভান। সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পরেছে,কেউ থেমে থাকে নি, হেরাকে তখনো খুজে চলছে সবাই।দুই ঘণ্টা পর যখন নাভানের হালকা জ্ঞান ফিরল, সে চোখ মেলেই ঘরের ছাদের দিকে তাকাল। তার পরেই মুহূর্তের মধ্যে সকালের সেই প্রলয় আর হেরার নিখোঁজ হওয়ার কথাটা মস্তিষ্কে আঘাত হানল।
এক অমানুষিক আক্রোশে নাভান তার হাতে থাকা স্যালাইনের নলটা নিজের চামড়া ছিঁড়ে এক টানে টেনে বের করে ফেলল! হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে গিয়ে পড়ল সাদা বিছানার চাদরে।
সে উন্মাদের মতো বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।
সৃজন, তুষার আর অধীর ঘরেই বসে ছিল। তারা আঁতকে উঠে নাভানকে ধরতে গেল, কিন্তু নাভান হাত দিয়ে তাদের দূরে ঠেলে দিল। রক্তভেজা মুখ আর হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে সে চিৎকার করে উঠল—
“তোরা এখনো এখানে আরামে বসে আছিস?! তোরা স্যালাইন দিচ্ছিস আমাকে?! আমার অক্সিজেন কোথায়? তোরা এখনো ওকে খুঁজে পাসনি?!”
“নাভান, শান্ত হও ! তোমার শরীর থেকে রক্ত পড়ছে!”—তুষার আকুতি করে উঠল।
“মরে যাইনি তো এখনো!”
নাভান গর্জে উঠে। টলমল পায়ে দেয়াল ধরে ধরে সে আবার ঝড়ের মধ্যে বাইরে বের হতে চাইল। তার নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়া লাল রক্ত চোয়াল আর গলা ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার চোখে কেবল হেরাকে খুঁজে পাওয়ার এক অন্ধ, প্রলয়ঙ্করী উন্মাদনা।
সকালের সেই তাণ্ডবের পর কেটে গেছে আরও কয়েকটি দীর্ঘ, বিষাক্ত ঘণ্টা। বিকেল গড়িয়ে সাজেকের আকাশে তখন নেমে এসেছে এক থমথমে, রক্তিম-ধূসর আবহাওয়া। সূর্যের আলো পাহাড়ের মেঘে ঢেকে গিয়ে চারপাশকে বানিয়ে তুলেছে এক মায়াবী কিন্তু অভিশপ্ত ক্যানভাস। সকালে ধসের সামনে নাভান উন্মাদের মতো চিৎকার করার পর যখন তার অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ক্লান্তি আর ক্ষত স্থান থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শরীর ভেঙে পড়েছিল—অফিসাররা আর বন্ধুরা মিলে তাকে ধরাধরি করে কটেজে ফিরিয়ে এনেছিল। চিকিৎসকরা তাকে কড়া সেডেটিভ আর স্যালাইনের ড্রিপ দিয়ে কটেজের বিছানায় নিথর করে ফেলে রেখেছিল।
টানা তিন ঘণ্টা অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল নাভান। কিন্তু তার মস্তিষ্কের ভেতরে চলা প্রলয়ঙ্করী ঝড় শান্ত হয়নি। তিন ঘণ্টা পর বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নাভানের চেতনা ফিরল। চোখ মেলেই হেরার শূন্য স্থানটুকু দেখে তার ভেতরে এক অন্ধ হিংস্রতা জেগে উঠল। হাতে থাকা স্যালাইনের চ্যানেল সে উন্মাদের মতো এক টানে ছিঁড়ে ফেলল! ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ল কটেজের কাঠের মেঝেতে। হাজারো পুলিশ ফোর্স, সেনা সদস্য আর বন্ধুরা ঘরে পাহারা দিচ্ছিল তাকে আটকানোর জন্য, কিন্তু এক আহত, উন্মত্ত সিংহকে কিসের শিকল দিয়ে আটকে রাখা যায়?
নাভান কাউকেই কিছু বলার সুযোগ দিল না। এক ঝটকায় তিন-চারজন অফিসারকে ছিটকে ফেলে দিয়ে, রক্তাক্ত হাতে দরজার লক ভেঙে সে বেরিয়ে গেল রিসোর্ট থেকে! কেউ তাকে আটকাতে পারল না। হাজার হাজার ফোর্সের নিরাপত্তা বেষ্টনী চূর্ণ-বিছুর্ণ করে সে একাই ছুটে চলল সাজেকের একদম দুর্গম, বিপজ্জনক আর নির্জন রাস্তাগুলোর দিকে। তার পরনে আর কোনো অফিসারি ভাব নেই, শার্ট ছেঁড়া, শরীর রক্তে মাখামাখি, কপালে লেপ্টে থাকা চুলে কাদা জল—কিন্তু তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুধুই হেরাকে খোঁজার এক তীব্র ব্যাকুলতা।
বিকেলের ঝাপসা আলোয়, পাহাড়ি নির্জন পথগুলোতে উন্মাদের মতো হাঁটতে হাঁটতে সে ফিসফিস করে, পরম আকুতিতে বলতে লাগল—
”তুই কোথায় পরী বউ?! প্লিজ আমার সামনে আয়… আমি সব সত্যি বলে দিব! সিরিয়াসলি, আজ আমি সব সত্যি বলে দিব! আমাকে আর ভয় দেখাস না… প্লিজ কাম, মিসাইল গার্ল! ২৪ ঘণ্টা হয় নি তো, আমি সত্যি বলে দিব। প্লিজ কাম হেয়ার। আমি যে এই লুকোচুরি খেলায় ক্লান্ত… প্লিজ অক্সিজেন, ফিরে আয় আমার বুকে!”
প্রায় ১০ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেল। পাহাড় ডিঙিয়ে, বৃষ্টির জমা জল আর হাঁটু সমান কাদা ঠেলে নাভান এদিক-সেদিক ছুটছে। তার পায়ের জুতো কোথায় খুলে পড়ে গেছে তার খবর নেই, ধারালো পাথরের আঘাতে পায়ের পাতা কেটে রক্তে কাদা লাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নাভানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
হঠাৎ রাস্তার ওপর জমে থাকা পাহাড়ের বিধ্বংসী ধসের ঠিক সামনে গিয়ে নাভানের চোখ আটকে গেল! একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ যেন তার পুরো মেরুদণ্ড চিরে নেমে গেল।
ভেজা কাদামাটিতে অর্ধেক ডুবে আছে হেরার পছন্দের একজোড়া নূপুর! বিকেলের শেষ আলোয় নূপুরের রুপোলি ঝিলিকটুকু রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। একটু সামনে পা বাড়াতেই নাভানের বুকটা যেন চিরতরে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল—একটু দূরে পাথরের ধারালো কোণে আটকে থেকে ভেঙে পড়ে আছে হেরার হাতে পরা সেই প্রিয় ব্রেসলেটটা!
নাভান আর সহ্য করতে পারল না। তার হাঁটুর ভেতরের জোর যেন একমুহূর্তে হারিয়ে গেল। সে ধপাস করে হাঁটু মুড়ে ধসে পড়ল সেই পিচ্ছিল কাদামাটির ওপর। কাদা মাখা হাতে ব্রেসলেট আর নূপুরটা বুকের একদম গভীরে চেপে ধরে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার তাকানো তখন সামনে জমে থাকা বিশালাকার মাটির স্তূপের দিকে। নাভানের মন চিৎকার করে বলে উঠল—
হেরাকে কি এই ধস গিলে খেয়েছে?
আমার পরী বউ কি তবে মাটির নিচে বন্দি?!
না… নো, নো, নো! এটা হতে পারে না!
পরোক্ষনেই চিৎকার করে উঠে নাভান —
”কেউ আমার হেরাকে খুঁজে দাও! প্লিজ… কেউ আমার পরী বউকে ফিরিয়ে দাও! ও অন্ধকারকে ভয় পায়… ও একা থাকতে পারে না…!”
নাভানের কন্ঠ চিরে বেরিয়ে আসা হাহাকার তখন সাজেকের প্রতিটা পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। সে দুই হাতে উন্মাদের মতো মাটি খুঁড়তে শুরু করল। ধারালো পাথরে তার নখগুলো উল্টে গিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল, কাদায় মিশে সেই রক্ত একাকার হতে লাগল, কিন্তু তার হাত থামছে না।
”অক্সিজেন… শুনতে পাচ্ছিস? আমি এসেছি… তোর অসভ্য গিটার ওয়ালা এসেছে! তুই একবার শুধু আমার নাম ধরে ডাক অক্সিজেন… আমি এই পাহাড় ভেঙে, এই মাটি চিরে তোর কাছে চলে আসব!”
দুই হাতে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে নাভান আহাজারি করতে থাকে। নাভানের কান্না যেন বজ্রপাতের মতো পাহাড়ের বুকে আছড়ে পড়ছে বারবার! যে মেয়ের জন্য এত কিছু করল নাভান, যে মেয়েকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে সঅবকিছু দিয়ে আগলে রেখেছে—সেই মেয়ের এই ভয়াবহ বিপদে সে ব্যাকুল হয়ে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক!
”না! আমি বিশ্বাস করি না… আমার হেরা এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না! আল্লাহ… আমার জীবন নিয়ে নিন, কিন্তু আমার পরী বউকে ফিরিয়ে দিন! ও ছাড়া আমার পৃথিবী শূন্য…!”
বিকেলের ধূসর আলো ততক্ষণে সন্ধ্যার ঘনীভূত আঁধারে রূপ নিতে শুরু করেছে। নির্জন, দুর্গম সাজেকের সেই খাদের পাশে একা হাঁটু গেড়ে বসে থাকা রক্তাক্ত নাভান তখন শুধুই কাদা আঁচড়ে চলেছে। তার চোখের জল, শরীরের রক্ত আর আকাশের নামা শিশির-বৃষ্টি মিলে মিশে একাকার হয়ে তৈরি করছে এক অমর, বেদনাবিধুর —যেখানে এক ক্ষমতাধর প্রেমিক তার সর্বস্ব হারিয়ে কেবল পরম করুণাময়ের কাছে তার ভালোবাসার ভিক্ষা চাইছে!
সন্ধ্যা নেমে এসেছে কিন্তু হেরার কোন মিলছে না
নাভানের রক্তাক্ত দুটো হাত তখন শিথিল হয়ে ঝুলছিল, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে ছিল মেঘাচ্ছন্ন ধূসর আকাশের দিকে। যেন শূন্যে ভেসে থাকা কোনো অদেখা সত্তার কাছে জীবনের তীব্রতম নালিশ জানাতে চাইছে সে। বুক চিরে বেরিয়ে আসা একটা চিৎকারের সাথে নিঃশব্দে সে প্রার্থনা করতে লাগলো তার ভালোবাসার মানুষটির যাতে কিছু না হয়। আজ হয়তো পুরো পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গেছে তার জীবনের ক্যানভাস থেকে। আজকের দিনটাতে এই বিশাল পৃথিবীর বুকে নাভানের চেয়ে নিঃস্ব, সহায়সম্বলহীন এবং অসহায় আর বোধহয় দ্বিতীয় কেউ নেই।
ভালোবাসা—শব্দটা দেখতে কত সুন্দর, কত মধুর! অথচ এর বাস্তব রূপটা যে কতটা অদ্ভুত আর নির্মম হতে পারে, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে নাভান। কথিত আছে, সত্যিকারের গভীর ভালোবাসায় আল্লাহ বোধহয় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো নেন। যে এই পরীক্ষার আগুনে পুড়ে নিঃশেষে নিজেকে ধরে রাখতে পারে, সেই কেবল বিজয়ী হয়, সেই ভাগ্যবান /ভাগ্যবতী । কিন্তু নাভান নিজেকে প্রশ্ন করে—এতটুকু একটা বয়সে সে কি কম পরীক্ষা দিয়েছে? জীবনের প্রতিটি মোড়ে যেখানে সে শুধু একটুখানি ভালোবাসার আশ্রয় খুঁজেছে, সেখানেই বারবার তাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে আগুনের কঠিন কঠিন পরীক্ষার মুখে। আর কত? নাভানের এই ছোট্ট বুকটা আর কতটা আঘাত সইতে পারে? আল্লাহর কাছে আর কত মূল্য চোকাতে হবে তার এই পবিত্র ভালোবাসার?
চোখ থেকে অঝোর ধারায় নামতে থাকা অশ্রু আর থামছে না। সে কাঁদছে—অসহায়ত্ব, হাহাকার আর ভালোবাসাকে হারানোর এক নিদারুন যন্ত্রণায়। মাটির বুকে গড়া ছোট ছোট লাল গুড়ি পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে সে যেন নিজের ভাঙা হৃদয়টাকেই দেখছিল। ভাঙা কাচের মতো ধারালো সেই লাল পাথর আর ভেজা মাটিগুলোকে দু’হাতে সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সে, যেন সেই পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেছে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্বপ্নটা, তার বাস্তবতার আলো, তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় ভালোবাসা।
পাথর সরাতে সরাতে মাংসপেশি কেটে রক্তের দাগ আরও গাঢ় হতে থাকে, কিন্তু বাহ্যিক এই কষ্টের চেয়ে তার বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ হাজার গুণ বেশি তীব্র। একপাশে নিঃস্বতার হাহাকার, অন্যপাশে নিদারুণ এক বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাত—এই দুয়ের মাঝে পিষে গিয়ে নাভানের ভেতরটা আজ ছারখার। কান্নার শব্দ যখন গলার কাছে এসে আটকে যায়, তখন প্রতিটি ফোঁটা জল মাটি ছুঁয়ে সাক্ষী হয়ে থাকে এক পবিত্র ভালোবাসার। মনের গহীন থেকে বারবার একটাই প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে তার চেতনায়—ভালোবাসা কি কেবলই ত্যাগের? সত্যিকারের ভালোবাসাকেই কেন সবসময় এত কঠিন পরীক্ষায় হার মেনে নিতে হয়? নাভান রাগে গর্জন করে উঠে —সাজেকের রক্তিম-ধূসর বিকেল ততক্ষণে ঘনীভূত সন্ধ্যার কালো ছায়ায় ঢেকে যেতে শুরু করেছে। ঘড়ির কাঁটা হিসাব করলে সকাল ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই নারকীয় তাণ্ডবের পর দেখতে দেখতে দীর্ঘ দশ-বারোটি ঘণ্টা পার হয়ে গেছে! পুরো একটা দিন কেটে গেল, অথচ হেরার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া গেল না।
এই দীর্ঘ দশ ঘণ্টায় নাভানকে কতবার যে সবাই মিলে কটেজে বা নিরাপদ আশ্রয়ে আটকে রাখার চেষ্টা করেছে, তার কোনো হিসাব নেই। প্রথমবার যখন সকালে উন্মাদের মতো বের হতে চেয়েছিল, তখন চার-পাঁচজন সেনাসদস্য আর বন্ধুরা তাকে জাপটে ধরেছিল। কটেজে ফিরিয়ে এনে স্যালাইন আর ড্রিপ দিয়ে যখন অবশ করে রাখা হয়েছিল, তখনও তিন ঘণ্টার মাথায় জ্ঞান ফিরতেই সে নিজের চামড়া ছিঁড়ে ড্রিপের নল টেনে বের করে আবার দরজার দিকে দৌড় দিয়েছিল। প্রতিবার তাকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আর প্রতিবারই সে এক আহত, উন্মত্ত বাঘের মতো শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।
কিন্তু এখন? এখন আর তাকে আটকানোর মতো সাধ্য বা সাহস কারোর নেই। কারণ এখন নাভানের ভেতরে কোনো সাধারণ মানুষ বাস করছে না; বাস করছে এক ধ্বংসাত্মক, মৃত্যুভয়হীন প্রেমিক—যে তার অক্সিজেনকে হারানোর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
নাভানের এই অমানুষিক জেদ, আত্মঘাতী উন্মাদনা আর তার রক্তের হাহাকার দেখে শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী দলও নিজেদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করল। এত বড় ঝুঁকিপূর্ণ ও মারাত্মক ধসের জায়গা, যেকোনো মুহূর্তে পুরো পাহাড়টা ধসে নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা—তবু জাওয়াদ খানের নির্দেশ, সিআইডির ফোর্স এবং লাইট ইক্যুইপমেন্ট টিম সব বড় বড় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ ঢেলে নাভানের পিছু পিছু সেই মৃত্যুপুরীতে এসে পৌঁছাল।
বিকেলের শেষ আলো যখন নিভে গেল, হ্যালোজেন লাইটের তীব্র সাদা আলো আছড়ে পড়ল ধসের কাদার ওপর। সেই আলোর নিচে হাঁটুপানি আর কাদার মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে আছে নাভান।
তার চোখের সামনে তখন কাদায় অর্ধেক ডুবে থাকা হেরার পছন্দের সেই একজোড়া নূপুর আর একটু দূরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকা ব্রেসলেটটা!
ওইটুকু চিহ্ন দেখা মাত্রই নাভানের বুকের খাঁচাটা যেন ধড়ফড় করে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এই দশ ঘণ্টা ধরে যে আশাটা সে বুকে ধরে রেখেছিল, এই নূপুর আর ব্রেসলেটটা যেন তাকে চিৎকার করে এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল—হেরা হয়তো এই শত শত টন পাহাড়ি কাদা আর পাথরের নিচেই আঁটকে আছে!
নাভান দুই হাতে নিজের নখ দিয়ে কাদা আঁচড়াতে আঁচড়াতে এমন এক বিদীর্ণ আর্তনাদ করে উঠল, যা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের চোখ থেকেও টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
”****আমার পরী বউয়ের যদি একটা আঁচড়ও লাগে, যদি তার কিছু হয়ে যায়—আমি এই পাহাড়, এই দেশের ধরণী থেকে বিলীন করে দেব! শোনো প্রকৃতি, কান খুলে শুনে রাখো! আই হেট দিস মাউন্টেন! যে পাহাড় আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিতে চায়, সেই পাহাড়-পর্বত আমি পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলব—আই প্রমিস! ও গড, আমার অক্সিজেন যেন সুস্থ থাকে… আমার অক্সিজেন যেন আমার বুকে ফিরে আসে!”
পাহাড়ি রাস্তা তখন চরম বিপজ্জনক। অ্যাডভোকেট কাজল খান, মন্ত্রী জাওয়াদ খান, সিআইডি আর আর্মির স্পেশাল টিম—সবাই হাজার চেষ্টা করেও নাভানকে এক ইঞ্চি পেছনে সরাতে পারছে না। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে নাভানের চোখের জল আর শরীরের রক্ত। নাভানের মস্তিষ্ক তখন একটাই কথা অনুধাবন করছে—হেরাকে হয়তো এই মাটির স্তূপ গিলে খেয়েছে, সে মাটির নিচে আটকা পড়ে শ্বাস নিতে পারছে না!
রুশা আর রোজ রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কাঁদছে। সৃজন ধসের কাদায় নেমে নাভানের কাঁধ ধরে উন্মাদের মতো ঝাঁকিয়ে বলল—
”নাভান শান্ত হ! ওটা শুধু হেরার গয়না রে ভাই! ওটা হয়তো পড়ে গেছে! তুই নিজেকে সামলা! কিচ্ছু হবে না বনুর, দেখিস ও বেঁচে আছে!”
কিন্তু নাভান কারো কথা শুনছে না। কোনো প্রফেশনাল যন্ত্রপাতির অপেক্ষা না করে, সে নিজের খালি হাত দিয়েই কঠিন পাহাড়ি মাটি আর কাদা সরাতে শুরু করল! মাটির নিচে থাকা ধারালো লোহা আর পাথরের ঘষায় নাভানের দুই হাতের তালুর চামড়া উঠে রক্তে কাদা লাল হয়ে গেল। কিন্তু নাভানের কোনো হুঁশ নেই। সে উন্মাদের মতো হাঁপাচ্ছে আর দুই হাতে মাটি সরিয়ে যাচ্ছে—যেন এক সেকেন্ড দেরি হলেই তার পরী বউ মাটির নিচে নিঃশ্বাস হারিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাবে!
সৃজন, অধীর, তুষার—বন্ধুর এই রক্তভেজা, পাগল রূপ দেখে নিজেদের ধরে রাখতে পারল না। তারাও হাঁটু গেড়ে কাদায় বসে খালি হাতে মাটি সরাতে লাগল।
নাভান এক পর্যায়ে কাদামাটি মাখা রক্তে রাঙা হাত দুটো দিয়ে ধসের মাটিতে মুখ গুঁজে দিল। ঠিক তখনই জাওয়াদ খান আর কাজল খান দৌড়ে ছেলের কাছে আসতেই, নাভান উন্মাদের মতো কাদায় ছেঁচড়ে গিয়ে তার বাবা-মায়ের পা দুটি চেপে ধরল। দেশের এক নামজাদা দাপুটে সিআইডি অফিসার, যার এক নজরে অপরাধীরা কাঁপে—সে আজ মা-বাবার পায়ে মাথা কুটে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—
“প্লিজ বাবা… প্লিজ মা… তোমাদের দুটি পায়ে পড়ি, আমার পরী বউকে এনে দাও! আমার ভেতরটা কীভাবে জ্বলছে তোমরা কেউ দেখতে পাচ্ছো না?! আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে মা… ফুসফুসটা যেন ধারালো ছুরি দিয়ে কেউ কুচি কুচি করে কাটছে! আমার কষ্ট হচ্ছে মা… অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে! গলার প্রতিটি রগ মনে হয় টান লেগে এখনি ছিঁড়ে ছিটকে বেরিয়ে যাবে! আমার অক্সিজেন লাগবে মা… ওই ঘাড়ত্যাড়া মেয়েটা ছাড়া যে আমার শরীরে আর এক ফোঁটা রক্তও প্রবাহিত হচ্ছে না! আমি কীভাবে বোঝাব তোমাদের? এই বুকের ভেতর কী পরিমাণ দহন হলে একটা মানুষ জ্যান্ত মরে যায়, তোমরা কি কেউ তা অনুধাবন করতে করছো?!
মা গো তুমি তো আমাকে জন্ম দিয়েছো। কিন্তু হেরা যে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র ধমনী! আজ যদি ওর কিচ্ছু হয়ে যায়, আমি নিজের হাত দিয়ে নিজের বুকটা ছিরে ফেলব মা! আমি বিষ গিলে খাব, আমি বিষাক্ত অ্যাসিড খেয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেলব, আমি এই পাহাড়ের ওপর থেকে হাজার ফুট নিচে লাফিয়ে নিজের হাড়গোড় গুঁড়ো করে ফেলব! আমি জ্যান্ত আগুনে ঝাঁপ দেব মা, নিজের চামড়া ছিরে ছাই বানিয়ে দেব! তোমরা কি আমার কষ্ট বুঝছ না? আমাকে আমার এঞ্জেলকে এনে দাও! তাকে না এনে দিলে আমি নিজেকেই শেষ করে দিবো!
কাজল খান কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে গেলেন, কিন্তু নাভান রক্তচক্ষু মেলিয়া উন্মাদের মতো নিজেকে এক তীব্র ঝটকায় ছাড়িয়ে নিল। নিজের মা-বাবাকে ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে দিয়ে সে অন্ধের মতো ছুটে গেল বন্ধুদের দিকে।
তার দুই নাক আর মুখ দিয়ে রক্ত থুতনিতে এসে জমছে, সাদা দাঁতের মাড়ি লাল হয়ে ভেসে গেছে রক্তে। হাত দুটি কাঁপছে তীব্র উন্মাদনায়। সে সৃজন আর অধীরের গায়ের জামার কলার দুই হাতে বাঘের মতো আঁকড়ে ধরল। রক্ত আর চোখের জলে মাখামাখি মুখটা সামনে এনে, হাড়হিম করা বুকফাটা চিৎকার দিল—
”দোস্ত তোরা কি বুঝতে পারছিস না আমার কতটুকু যন্ত্রণা হচ্ছে?! মনে হচ্ছে চামড়া ছাড়িয়ে কেউ আমার গায়ে নুন ছিটিয়ে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে মাথার রগগুলো একটা একটা করে ফেটে রক্ত বের হচ্ছে! এই যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যু অনেক সহজ রে দোস্ত! আমি বলে দেব সব সত্যি… পুরো পৃথিবীর সামনে চিৎকার করে বলে দেব! ওই মিসাইল গার্লের সামনে তোরা আমাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দে! তোরা ওকে গিয়ে বল—আমিই তার সেই পাগল, গোপন প্রেমিক! আমি আর একটা সেকেন্ডও কিছু লুকাব না রে দোস্ত!ও অভিমান করেছে আমি সত্যি বলি নি এর জন্য, বলছি তো এখন, ও কি শাস্তি দিবে আমাকে তাকে মিথ্যা বলার জন্য
ও যদি আমার ওপর থুতু ছিটিয়ে দেয় আমি মাথা পেতে নেব! ও যদি চাবুক দিয়ে আমার পিঠের চামড়া তুলে ফেলে, আমি হেসে হেসে সহ্য করব! ও যদি আমার দুটো চোখ উপড়ে ফেলে হাত দিয়ে পিষে দিতে চায়, আমি নিজের হাতে চোখ দুটো উপড়ে ওর পায়ের নিচে দেব! ও যেভাবে আমি ঠিক সেভাবে চলব, গোলামের মতো ওর পায়ের জুতো হয়ে থাকব… কিন্তু প্লিজ! অক্সিজেনকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচব না রে দোস্ত! বল না একটু আমার ডাকে সারা দিতে।
তোরা দেখতে পাচ্ছিস না আমার গলার নালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে?! একেকটা টানে গলার চামড়া ছিঁড়ে আসছে! তোদের দুটি পায়ে পড়ি রে… তোরা আমার বুকের এই ধকলটা দেখ! আমি যে পাগল হয়ে যাচ্ছি দোস্ত। অই মুখ টা না দেখে। এনে দে না অক্সিজেনকে!
দশটি ঘণ্টার দীর্ঘ যন্ত্রণা, শরীরে ঝরতে থাকা রক্ত আর এক প্রেমিকের এই চরম হাহাকার দেখে সাজেকের সেই দুর্যোগময় রাতে কারো চোখ শুকনো রইল না। পাহাড়ের বাতাস যেন সেদিন নাভানের ভালোবাসা দেখে কেঁদে উঠেছিল।
বৃষ্টি এখন নেই বললেই চললে কিন্তু বাতাসের তীব্র বেগ আছে। সেই শব্দকে ফালাফালা করে সাজেকের সেই ঘটনাস্থলে এসে থামল সেনা ও সিআইডির মূল রেসকিউ টিম। চারিদিকে তখন এক নারকীয় তাণ্ডব—কাদামাটিতে লুটিয়ে থাকা রক্তাক্ত নাভান, আর তাকে ঘিরে বন্ধুদের বুকফাটা আর্তনাদ।
ঘটনাস্থলে আগে থেকেই দায়িত্বে থাকা সিআইডি ও আর্মির স্থানীয় সদস্যরা উদ্ধারকাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তাদের সব তৎপরতা থমকে গেল, যখন মূল দলটির একদম সামনের একটি কালো গাড়ি থেকে নেমে এলেন সম্পূর্ণ অচেনা দুজন মানুষ।
গাড়ি থেকে নামলেন সিভিল সিআইডি অফিসার প্রিয়ন্তী শিকদার প্রিয় এবং তাঁর স্বামী শান্ত রহমান।
প্রিয়র পরিধানে ছিল নেভি ব্লু রঙের ফরমাল শার্ট আর ট্রাউজার। পেশাদারিত্ব বজায় রেখে যতটা সম্ভব নিজেকে পরিপাটি রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি, কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা সেই চেষ্টা বানচাল করে দিচ্ছে। শার্টের কনুইয়ের কাছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছোপ, হাতায় কাদার বিশৃঙ্খলা। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর ডান হাতের কবজিতে ধারালো কিছুর এক গভীর কাঁচাকাটিন জখম, যা থেকে এখনো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে ট্রাউজারে পড়ছে। তবে শারীরিক ক্ষতের চেয়েও প্রিয়র চোখে-মুখে ফুটে উঠছিল চরম এক অস্থিরতা ও মানসিক বিধস্ততা। পাশে থাকা শান্ত রহমানের কপালেও ব্যান্ডেজ বাঁধা, জামায় কাদার দাগ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সিনিয়র সিআইডি অফিসাররা ভুরু কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকালেন। তাঁদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল— “এরা কারা? আমাদের টিমে তো এদের নাম ছিল না! অফিশিয়াল ব্রিফিংয়ে তো বলা হয়েছিল হেডকোয়ার্টার থেকে শুধু একটা রেসকিউ টিম আসবে… এরা কি তবে অন্য কোনো সিক্রেট স্কোয়াডের?”
অনুমতি বা অফিশিয়াল প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে, স্থানীয় অফিসারদের স্তম্ভিত করে দিয়ে প্রিয় সোজা কাদার ভেতর দিয়ে দ্রুত হেঁটে গেলেন। নাভান ছাড়া সেখানে উপস্থিত পরিবারের মানুষগুলোর কাছেও প্রিয় সম্পূর্ণ অচেনা। রুশা বা বন্ধুরা ভেবেছিল প্রিয় বিদেশে কোমায় চিকিৎসাধীন। তাই এক অচেনা মহিলা অফিসারকে এভাবে মরিয়া হয়ে নাভানের দিকে ছুটে আসতে দেখে তারাও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
নাভানের রক্তাক্ত ও অর্ধ-চেতন শরীরের সামনে পৌঁছাতেই প্রিয়র সমস্ত পেশাদারি খোলস ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তিনি হাঁটু গেড়ে কাদার মধ্যেই বসে পড়লেন। পরম ভালোবাসায় এক রক্তাক্ত বোন তাঁর ক্ষতবিক্ষত ভাইকে দুই বাহুতে জাপটে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। নিজের কবজির ক্ষত থেকে ঝরে পড়া রক্ত আর নাভানের গায়ের রক্ত মিলেমিশে এক হয়ে গেল।
প্রিয়র চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। নাভানের চেতনার শেষ বিন্দুতে ধাক্কা দিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন
“আই এম সরি ভাই! আমি তোর হেরাকে ওই আজমির চৌধুরীর ছেলের হাত থেকে বাঁচাতে পারলাম না… তুই আমাকে ক্ষমা করে দে ভাই! তোর হেরা জীবিত, কিন্তু নিলয় তাকে তুলে নিয়ে গেছে!”হেরা বেঁচে আছে’—এই দুটো শব্দ কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই নাভানের উন্মাদ শরীরটা একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে যেন বহু প্রতীক্ষিত এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি পুরোপুরি জবাব দিয়ে দিয়েছে।
সারাদিন ধরে পেটে এক দানা-পানি পড়েনি। সারাদিনের অনাহার, পাহাড়ি দুর্গম পথে পাগলের মতো ছুটোছুটি, একের পর এক শারীরিক আঘাত আর চরম মানসিক ট্রমা—সব মিলিয়ে শরীরটাকে সে নিংড়ে নিচ্ছিল। আগেই একবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর ভিজা কাপড়েই ফের পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে লড়াই চালিয়েছিল সে। লোহার মতো শক্তপোক্ত এই ছেলেটাকে আজ বারবার এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়তে দেখে উপস্থিত কারও চোখের জল আর বাঁধ মানছিল না
এদিকে নাভানের নিভু নিভু চোখের পাতা দুটো আর মেলে রাখার শক্তি পাচ্ছিল না। শরীরের ভেতর বয়ে যাওয়া তীব্র আতঙ্ক আর উদ্বেগে তার রক্তচাপ আচমকা আকাশচুম্বী হয়ে উঠল। গলার ও নাকের ভেতরের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো সহ্যসীমার বাইরে গিয়ে ফেটে গেল মুহূর্তে। গলগল করে তার নাক ও মুখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫৩
চেতনার শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার মুহূর্তে নাভান সেন্সলেস হয়ে কাদামাটিতে ঢলে পড়তে শুরু করল। ঠিক তখনই প্রিয় অতি যত্নে নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে তাকে আগলে নিলেন। প্রিয়র ক্ষতাঙ্কিত হাতের ওপর নিজের ভারী মাথাটি রেখে, শেষবারের মতো অস্ফুট স্বরে নাভান শুধু উচ্চারণ করল—
“আমার… পরি… বউ…” এর এক বিন্দু ক্ষতি যাতে না হয়। ওর কিছু হলে তোরা তোদের বন্ধুকে হারাবি!
