প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭০
জান্নাত নুসরাত
আহান শ্বশুর বাড়িতে এসে ফেঁসে গেছে। তাদের দাদা বাড়ি না কোথায় ধরে নিয়ে আসছে তাকে। চারিদিকে শুধু ছনের তৈরি ঘর। ঘর দিয়ে তার সমস্যা নেই, কারণ যেকোনো জায়গায় থাকার মতো তার মন মানুসিকতা আছে,কিন্তু এখানে থাকার বিন্দুমাত্র মানুসিকতা তার ভেতর নেই। অপরিস্কারের উপর যেটা থাকে এরা এদের ছাড়িয়ে গেছে।
শহরে আমিরার বাবা থাকার জন্য আমিরারা সেখানে বড় হয়েছে। তাদের দাদা বাড়ির লোক প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন। বয়স্ক নাকি নাত জামাই দেখার খায়েশ করেছেন, তাই তাকে ধরে নিয়ে আসছে আহসান, হাসান। প্রথমদিকে এটা ভাবলেও এই চব্বিশঘন্টায় সে টের পেয়েছে আসলে সেজন্য নিয়ে আসেনি তাকে। তরপানোর জন্য এনেছেন দু-শালা তাকে। বোনকে ফুসলিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মেয়ে নিজেই তো তার সাথে গিয়েছে, আহানের এখানে দোষ কোথায়! সে তো তুলে নিয়ে যায়নি। একে তো জঘন্য জায়গা, ওয়াশরুম ও বাহিরে, তার মধ্যে আবার শ্যাওলা পড়া। আজকাল কাদের বাথরুম বাহিরে থাকে? গোসল করার কোনো প্রাইভেসি নেই।
পুকুরে গোসল করতে হয়। ছেলেরা আগে পানিতে নামে পরে মেয়েরা। সাঁতার জানে না সে, পানিতে নামবে কীভাবে? আশ্চর্য… এজন্য রাতে গোসল করছে। দিনের বেলা এ-বাড়ির, ও বাড়ির নানি দাদি সম্পর্কে হোন তারা এসে তার ধারে বসে থাকেন। মহিলাদের মুখে কোনো লাগাম নেই, উল্টাপাল্টা, নোংরা, বিশ্রী কথা বলতেই থাকেন। সে ব্যাটা মানুষ হয়েই লজ্জা পায় এসব শোনে। তিক্ত বিরক্ত হয়ে উঠেছে সবার উপর। প্রকাশ না করতে চাইলেও এবার প্রকাশ করতেই হচ্ছে। এখানে আসার পর তাকে যে রুমে দেওয়া হয়েছে ওই রুমে বাহির থেকে গরুর গোবরের গন্ধ আসছে। এরা, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী সব একসাথে পালন করে। মুরগী তার বিষ্ঠা, হাঁস তার বিষ্ঠা সারার কাজ সাড়ে এসে বারান্দায়, কয়েকটা তো রুমে চলে এসেছে। এখানে কোনো পরিবেশই নেই। মানুষ যে থাকে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। ঘরে জামাই আসছে আপ্পায়ন করবে তা না মুরগীর পিছু পিছু মহিলারা ছুটছে। শাড়ি এমনভাবে পরেছেন শরীর দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ। একটু শালীনতা বজায় রেখে কাপড় পরা যায় না? চোখে এসব দেখতে না পেরে রুমের দরজা আটকে বসে ছিল সে। আমিরা এখানে আসার পর থেকেই নাড়ে নাড়ে ঘুরতে। মামাতো বোনদের সাথে হিহি হা হা করেই চলছে। পাশের রুম থেকে তার শব্দ আসছে।
খাবারটা ও ঠিক মতো খেতে পারেনি সে। দুপুরের খাবার খেতে বসল যখন তখন নখরত এসে গেছে ভেতরে। আল্লাহর দানার প্রতি এমন মনোভাব আনা ঠিক না, তবুও অবচেতন মন এসব ভাবনা আনছে৷ যে হাত দিয়ে মুরগীর খোঁপ পরিস্কার করছে আমিরা মামানীরা ওই হাত দিয়ে ভাত বেড়ে দিচ্ছে তাকে। এটা ভাবতেই পেটের ভেতর গুলিয়ে উঠল। সেই সময় গরুর গোবরের গন্ধ এসে নাকে লাগল। গরুর গোয়াল মানুষ বানায় বাড়ির পেছনে, এরা বানিয়েছে সামনে। তা ও আবার মুখের সামনে। আহান একবার মুখ ঘোরাল। সবাই খাচ্ছে স্বাদ করে। একমাত্র সেইই পারছে না। আহসান, হাসান, তাদের নানা, মামা, বাচ্চা কাচ্চা মাটিতে মাদুর পেতে বসে গান্ডেপিন্ডে গিলছে৷ একটু ঘৃণা লাগছে না এদের? আহান উঠে যেতে চাইল খাবার রেখে, শরীর খারাপ বলে, কিন্তু তাকে জোর করে খাওয়ানো হলো।
সারাদিনে ক্লান্তিতে শেষ হয়ে যাচ্ছিল সে তাই বিছানা গা এলিয়ে দিল। গা এলাতেই দেখে রুমের ভেতর সিলিং ফ্যান নেই। দুপুরেই তো ছিল। উঠে বসতেই আমিরার সাথে চোখাচোখি হলো। দূরে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যখন কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বুঝে গেল মেয়েটা। দ্রুত জানালা খুলে দিল। বলল,”আপনি প্লিজ চ্যাঁচাবেন না, বুঝতেই তো পারছেন?
আহান আমিরার মুখের দিকে তিক্ত চোখে তাকিয়ে থাকল। সারাদিনের ক্লান্তি, বিরক্তি ক্ষোভে পরিণত হলো। খ্যাক করে ওঠে বলল,”কী বুঝব? হ্যাঁ? এসেছি থেকে অশান্তিতে আছি? আমার বাড়িতে কেউ তোমাকে এভাবে অশান্তি দিয়েছে? মানুষ সামান্যতম পরিস্কার হয়, তোমার নানাবাড়ির লোক এত নোংরা কেন? এত খাচ্চর কেন? খাবার খায় কীভাবে? আগে এটা বলো, এরা যে গরু, টরু পালে এসব বললে না কেন? তুমি কী প্ল্যান করে আমাকে নিয়ে আসছ? শাস্তি দেওয়ার জন্য?
“আশ্চর্য! চ্যাঁচাচছেন কেন? দয়া করে, গলার আওয়াজ নিচে নামান। সবাই শুনতে পাবে।
আহান খ্যাঁকিয়ে উঠার আগেই আমিরা দৌড়ে তার কাছে এসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে শুরু করল,”দয়া করে, দয়া করে, চ্যাঁচাবেন না। বুঝতে পারছি আপনার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু একটু বুঝুন। আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বলতে ওরা গরু পালে।
আহান এমনভাবে তাকাল যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে তাকে। কাচুমাচু করে উঠল মেয়েটা৷ হাত পাখা দিয়ে মাথার কাছে বাতাস দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,” এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? আমি কি করেছি?
আহান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,”তুমি কিছু করোনি, আমি করেছি৷
“চ্যাঁচাচ্ছেন কেন? আমি তো বললাম, মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।
কথাটা শেষ করে মুখ গোঁজ করল সে। আহান আঙুল তুলে শাসাল,”মাথা থেকে বের হবে কেন এসব? ভাই-বোনদের সাথে তো হাহা হিহি করতে মাথা থেকে বের হয় না, খিলখিলিয়ে হাসতে ভুলে যাও না, তাহলে এটা ভুললে কেন?
আমিরার চেহারা আরেকটু ঝুঁকে গেল। কালো ছায়া নামল। আহান নিষেধ করল,”একদম মুখ গোঁজ করবে না। স্ট্রেইট দাঁড়িয়ে থাকবে।
আমিরা সোজা হয়ে গেল। মিনমিন করে বলল,”একটু ঠান্ডা পানি মাথায় দিয়ে দিব?
“তোমার কী মনে হয়, আমার মাথা গরম? পানি দিলে ঠান্ডা হবে?
আমিরা দু-পাশে মাথা নাড়াল। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল,” একদম না, একদম না। আপনার মাথা গরম, সেটা আমি কখন বললাম?
“তাহলে বললে না কেন?
আমিরার মুখ দেখার মতো হলো, চোয়াল ঝুলে পড়ল। ঠোঁট দিয়ে শব্দ বেরোল না। এটা কেরে বাবা? মাথায় পানি দেওয়ার কথা বললে বলে মাথা গরম না। গরম না বললে বলে ঠান্ডা কেন বললে। আশ্চর্য, আমিরা যাবে তো যাবে কোথায়। আহানের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল সে। ধমক ও খেল,”এখন এভাবে তাকিয়ে আছো কেন, যাও পানি নিয়ে আসো।
আমিরা তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে দু-বার উষ্টা খেল, তবুও ছুটল। পেছন থেকে খ্যাঁকানো স্বর ভেসে আসছে,”ছুটছ কেন? পাগল কুত্তা তাড়া করেছে তোমাকে? আমি তোমাকে কিছু বলেছি, যে এভাবে দৌড়াচ্ছ?
আমিরা শুনল তবুও থামল না। পাগল কুত্তা তাড়া না করলে ও স্বয়ং একটা পাগলা কুত্তাকে বিয়ে করে নিয়েছে সে, এখন তো ছুটতেই হবে।
বাল্টিতে করে পানি নিয়ে আসলো কয়েক মিনিটের ভেতরি। এমন মেন্টাল পিস কোথা থেকে তার ভাগ্যে এসে পড়ল সে ভেবে পেল না! চুপচাপ পানির বাল্টি এনে রাখতে যাবে আহান বলে ওঠল,”তোমাকে আমি বলেছিলাম পানি আনতে?
আমিরা হতবিহ্বল চোখ তুলে তাকাল। বলে কী, এই না বলল পানি আনতে। তার গোল গোল চাহনির ভেতরই আহান উঠে দাঁড়াল৷ বলল,”পুকুরে চলো, কথা শেষ হওয়ার আগেই আগেই ছুটলেই তো এসব হবে, বেয়াদব। আমার কথা শেষ হওয়ার পর তো যাওয়া উচিত ছিল।
কথা শেষ করে পায়ে জুতো পড়ল। আমিরার হাতটা সংকোচ বিহীন নিজের আঙুলের ভাঁজে পুরে নিল। হাঁটা ধরল পুকুরে। আমিরা শুধাল,”পানিগুলো কী করব?
“আমার মাথায় ঢালো, স্টুপিড।
মুখ গোঁজ করার সুযোগ পেল না, তাকে নিয়েই পুকুর পাড়ের দিকে হাঁটা ধরল। সে আবারো জিজ্ঞেস করল,”এখন পুকুরে কী করবেন?
“মানুষ পুকুরে কী করে?
“গোসল করে।
“ জানো যখন জিজ্ঞেস করছ কেন?
“আমি ভেবেছি আপনি…
আহান কেটে দিল কথা। বলল,”তুমি ভেবেছ আমি পানিতে নেমে হাডু ডুডু খেলব?
“এটা কখন বললাম?
আহান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল আমিরার দিকে। বলল,” বলোনি?
কোনো কথা বলল না মেয়েটা। এই মেন্টাল পিসের সাথে কথা বলে লাভ নেই। ইচ্ছে করল পেছন বরাবর একটা লাথি বসাতে। কী বেয়াদব! বদমাইশ! তার সাথেই দুনিয়ায় বদমাইশি করবে, আর বোনদের দেখলেই আপু আপু বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলবে। খবিসের খবিস।
আমিরা ভেবে পায় না তার এত ভালো শ্বাশুড়ি, এত ভালো ননদ, দেবর, ভাসুর, শ্বশুড়দের ভীরে এটা কীভাবে এমন খারাপের খারাপ হলো। কথা শুনলেই ইচ্ছে করে লাথি মেরে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিতে, শুধু সাহসের অভাবে পারে না। কিন্তু মনে মনে পশ্চাৎদেশে কতটা কিল ঘুষি লাথি মারে তা আহান হিসেব করতে পারবে না।
একটা কথা মাথায় আসতেই আমিরার ঠোঁট হাসি ফুটল। চোখের সামনে টেলিকাস্ট হলো বহুদিনের পুরোনো দৃশ্য। আহান ঘুমিয়ে ছিল তার পাশেই৷ সারাদিন ধমকা ধমকি করে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমিরার সুখ কেড়ে নিয়ে নিজে সুখে শান্তিতে ঘুমাবে? সেটা এটা মেনে নিবে এত সহজে? মানবে না।। তাই উঠে বসে হাত নাড়াল চোখের সামনে। যখন বুঝল গভীর ঘুমে। কষে গাল বরবার একটা জোরাল চড় বসাল। এতদিনের সকল ক্ষোভ উগলে দিল এক থাপ্পড়ে। আহান ধড়ফড় করে উঠে বসে তার দিকে তাকাল আহম্মকের মতো। তাকে দেখতেই কপাল কুঁচকাল নিমেষেই। যেন জন্মের শত্রুতা আমিরার সাথে। খ্যাঁক করে উঠে বলল,”কী হয়েছে এমন বসে আছো কেন মৃত মানুষের মতো?
এটা কোনো কথা হলো? তবুও ভদ্র মেয়ে আমিরা চুপচাপ সয়ে নিল। কারণ মাত্র একটা চড় মেরেছে, এবং সেই চড়ের দাগ ও বসে গেছে গালে। আহান গালে হাত দিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠল,’জ্বালা করছে কেন?’আমিরার দিকে তাকাতেই সে আমতা আমতা করে বলে উঠল,’মশা কামড়েছে।’আহানের ওই সময়কার মুখটা মনে হতেই আবারো অট্টস্বরে হেসে ওঠল সে। ভুলে গেল সামনেই দাঁড়ানো আহান। হাসতে হাসতে গায়ে ডলে পড়ল। আবারো দু-একটা গায়ে ধাক্কা দিয়ে বসল। যখন হুঁশ ফিরল কটমট করে আহানকে তাকিয়ে থাকতে দেখল। তড়িঘড়ি করে সরে যেতে নিয়ে উষ্টা খেল আবারো। আহান সেদিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,”হে হে করা শেষ?
উপর নিচ মাথা দোলাল ভদ্র মেয়েটি হয়ে। মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলল। থুতনি ঠেকল গলার সাথে। আহানের তিরিক্ষি স্বর,”সব পাগল ছাগল কেন আমার ভাগ্যে খোদা?
“কারণ বড় পাগল আপনি…”
মিনমিন করে বলায় কথা কানে গেল না আহানের, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,”মিনমিন করে কী বলছ?
আমিরা দু-পাশে মাথা দোলাল। বলল,”কিছুই বলিনি।
আহান বলল,”কম কথাই বলা ভালো। কম কথা বলবে।
বাধ্য স্ত্রীর মতো মাথা নোয়াল সে। ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ল এক আকাশসম ক্ষোভে। কিড়মিড়িয়ে উঠে বলল,”কম কথা তোর পেছন দিয়ে ভরে দিব, শালার পু শালা!
মুখে ভেংচি কাটতেই আহান জিজ্ঞেস করল,”অ্যাই, ভেংচি কেটেছ কেন? মনে মনে গালি দিচ্ছো?
আমিরা দু-পাশে মাথা দুলিয়ে বলল,”একটা ও গালি দিই নাই।
চোখা নয়ন ফিরিয়ে নিয়ে পানির দিকে অগ্রসর হলো আহান। বলল,”খেয়াল রেখো, দেখিও তোমার নানিরা না আবার এসে বসে যায়।
খেয়াল রাখবে জানাল আমিরা। আহান ঘাটে নেমে কিছুক্ষণ পানিতে পা ভিজিয়ে বসল। একটা ঘটনা মনে কড়া নাড়ছে৷ জায়িন ভাইদের নানাবাড়িতে পানিতে যখন সবাই ধপাস ধপাস করে পড়েছিল তখন কী ভয়ই না লাগছিল ? এখন মনে হলে হাসি পায়৷ তাদের সবার মধ্যে বিচ্চু ছিল নুসরাত, কিন্তু পাঁচ বছরে তা কমে গেছে। সময়ের আবর্তনে কত কী কমে যায়৷ মানুষ বদলে যায়৷ ভালোবাসার রঙ বদলায়। তাদের সব ভাই বোনের ভালোবাসা কী বদলেছে? দিন দিন তা তীব্রতর হচ্ছে একে অন্যের প্রতি। আহান পানিতে নামতেই আমিরা একসাথে অনেক গুলো ভেংচি কাটল। ডুব দিয়েছে দেখেই চ্যাঁচিয়ে উঠল,”নিজে হে হে করলে সমস্যা নেই, আমি করলেই সমস্যা। রাজাকারের নাতী। শালার পু শালা, আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতদিনে পশ্চাৎদেশে একটা লাথি দিয়ে ফেলে যেত। আমি, আমি বলে, তোকে এখনো সহ্য করছি। আরেকদিন যদি তোকে পন্ডিতি করতে দেখি, লাথি দিয়ে পানিতে ফেলে দিব৷ বুইড়া দামড়া সাঁতার জানে না, আবার স্টাইল কত।
আমিরা কথা শেষ করে সামান্যক্ষণ ভাবল কীভাবে লাথি দিয়ে আহানকে ফেলবে পানিতে। ভাবতেই হাসি ফুটল ঠোঁটে। দীর্ঘ হাসি শেষ করে শ্বাস ফেলতেই পারল না, আহান মাথা তুলে তাকাল। নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে কিছুক্ষণ। আমিরা গুটিয়ে গেল। ঢোক গিলে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, বাতাসে হিমশীতল গলার স্বর বারি খেল,”সব শুনেছি। আমি শালার পু শালা? আমার বাপ তোমার শালা হয়? আমি বুইড়া দামড়া?
প্রশ্নের বানে জর্জরিত হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল সে। কথা বলার জন্য শব্দের যথেষ্ট অভাব বোধ করল মেয়েটা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে ঢোক গিলল। আহান যে শোনে ফেলবে তা তার মাথায় একটুও ছিল না। কী বলবে বুঝে পেল না। চোখের পাতা ফেলে নিজের দিকে থাকা দৃষ্টির সংযোগ ভঙ্গ করতে চাইল, সম্ভব হলো না। চেয়ে রয়েছে এখনো এক দৃষ্টিতে। ওই নজরে কী ছিল আমিরা জানে না, সে নড়তে পারল না নিজের জায়গা থেকে। পালাতে চাইল স্থান ছেড়ে, তবুও সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বিড়বিড় করল,”আমি কিছু বলিনি। আপনি ভুল শুনেছেন।
নাছির মঞ্জিলে রাতের খাবার খাচ্ছেন মমো, নাছির সাহেব, নাজমিন বেগম। ঝর্ণা বেগমের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছেন। কোথায় ঘুরেছেন, কোথায় কী করেছেন সেসব জানাচ্ছেন। সুফি খাতুন বিছানায় শুয়ে আছেন পায়ের উপর পা তুলে। রাতের বেলা রুমের ভেতর সানগ্লাস লাগিয়ে। ঝর্ণা বেগমে কবার তাকালেন তার দিকে, গলা আওয়াজ ধীমি করে বললেন,”আপা তুমিই বলো, রাতে কে সানগ্লাস পড়ে? উনার নাকি চোখে ট্যান পড়ে যাবে? সারা মুখ রেখে চোখে পড়বে?
নাজমিন বেগম কিছু বললেন না, শুধু হাসলেন। মমো ডাকল,”সেঝ মামানী?
জবাব দিলেন,”হ্যাঁ!
“বিষয়টা ছোট মামানীকে বলো।
ঝর্ণা বেগম, রুহিনী বেগমের কথা বলতে গিয়ে হেসে ফেললেন,” ওরে বলব ছোট ফুপি এসব করছে, ও বলবে এই মেন্টাল মহিলাকে বলেছিলাম নিয়ে যেও না, আমার কথা না শোনে নিয়ে গিয়েছিলে কেন? এবার নিজেরা ঠ্যালা সামলাও। আমি বাবা কিছু জানি না।
কথা শেষ করে হাসতে লাগলেন নিজেই। তারপর মমোকে জিজ্ঞেস করলেন,”নুসরাত কোথায়, দেখতে পাচ্ছি না যে?
ঝর্ণা বেগমের রুমের দরজা আনলক হলো। ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল সৌরভি আর ইরহামকে। দু-জনে এসে ধপাস করে শুয়ে পড়েছে। ইরহাম মায়ের হাতে মাথা দিয়ে হাত পা ছড়িয়েছে। মমো খাবার খাওয়া শেষ করে হাত সিঙ্কে ধোয়া শেষে উত্তর দিল,”ও বাড়িতে।
ইরহাম ঘাটাল না, চোখ বন্দ করে শুয়ে রইল। ঝর্ণা বেগম বললেন,”হঠাৎ, ও বাড়িতে কেন?
মমো অবাক হয়ে বলল,”ওমা তুমি জানো না, ছোট মামানী, ছোট মামা ডেটে গিয়েছেন। এজন্য রান্না করে দিতে গিয়েছে নুসরাত।
চোখ মুখ কুঞ্চিত করে ইরহাম উঠে বসল। সৌরভি তাকে খুঁচিয়ে সোজা করে বসিয়েছে।। কানে কানে কিছু একটা বলায় তার নিজের ও টনক নড়েছে।
“নুসরাত রান্না করে দিতে গিয়েছে?
কথাটা মায়ের হাত থেকে মোবাইল নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল সে। কপালে হাজারটা ভাঁজ পড়েছে। বলল,”একবার ওর হাতের রান্না খেয়ে রাস্তার দুটো কুত্তা উধাও হয়ে গিয়েছিল, আর ও রান্না করতে গিয়েছে।
মমো হেসে ফেলল উচ্চ স্বরে। ঝর্ণা বেগম ধপাস করে চাপড় বসালেন তার পিঠে। ইরহাম চোখের ইশারায় কিছু একটা শুধাল, মমো উত্তর দিল,”এক মিনিট, রুমে গিয়ে জানাচ্ছি।
ঝর্ণা বেগম তাদের ইশারা আশারা টের পেলেন, তাই নিজের ব্যাগ থেকে আরেকটা মোবাইল বের করে সেটা নিয়ে বসলেন। তাদের কথায় কান দিলেন না। তবুও ফুসুরফাসুর কথা ভেসে আসছে কানে,”ওরে আটকালি না কেন?
মমো বলছে,”আটকাব কীভাবে, মেঝ মামানী ঠেলে ধাক্কিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
কথা বলতে বলতে ছেলে মেয়ে রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ঝর্ণা বেগম কে সুফি খাতুন শুধালেন,”কী গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করছে ওরা?
উনি কাঁধ ঝাঁকালেন,”ওরা ওদের মতো কথা বলছে, আমি জানি না, ফুপি।
সুফি খাতুন আর মাথা ঘামালেন না, নিজের চশমা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে গেলেন। মমোকে সৌরভি বলল,”তুমি রুমে যাও।
মমো নাজমিন বেগমের হাতে হাত কাজ এগিয়ে দিয়ে রুমে গেল। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নরমাল কথাবার্তা চলল। রুমে ঢোকেই দরজা লাগাতেই, ইরহাম বলল,”আজ রাতে বাড়ি আসবে?
“মনে হয় না।
“ কখন গিয়েছে?
“চার পাঁচ ঘন্টা হয়ে যাচ্ছে।
স্বামী স্ত্রী দু-জনেই মাথা দুলিয়ে খিকখিক করে হেসে উঠল৷ মমোর সাথে আরো দু-একটা আলাপ সেড়ে মোবাইল রেখে দিল। সৌরভি জিজ্ঞেস করল,” জ্বালাবে?
“কেন জ্বালাব না? ও দুনিয়ার সবাইকে জ্বালিয়েছে। ওকে জ্বালানোয় দ্বায় আমার৷
“তুমি কিছু বললে যদি পরে তোমাকে কিছু বলে?
“ তোমার কী মনে হয়, আমি বললে কথার জবাব না দিয়ে ও ছেড়ে দিবে?
“ছেড়ে দিবে কীভাবে? ভাই বোন তো দু-জনেই সমান।
ইরহাম মায়ের মোবাইলটা বিছানায় রেখে দিয়ে আঙুলের ভাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে নিল৷ খালি পায়ে রুম হতে বের হয়ে বলল,”চলো একটু বাহিরে হেঁটে আসি।
সৌরভি বুঝল ওই বিষয়ে আর কথা বলবে না এখন। বাহিরে যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করল না বলল বোঝা গেল না, সৌরভিকে জুতো পরে বের হতে দিল না, ঠিকঠাক নাকি এতে ফিল পাবে না। বাহিরে বের হতেই বাতাসের ছোঁয়া পেল তারা। মৃদু বাতাস বইছে চারিদিক হতে। সৌরভি শুধাল,”আমি যদি তোমাকে বিয়ে না করতাম, তাহলে তুমি কাকে বিয়ে করতে?
“ভেবে দেখিনি।
অবাক হয়ে শুধাল,” কেন?
“কখনো ভাবনাতে আসেনি এই কথা।
“তাহলে কী আসত?
ইরহাম হেসে ওঠে। চোখ পিটপিট করে তাকায় সামনে। বলে,“চোখ বন্দ করলেই তোমার মুখ ভেসে উঠত। তোমার কথা মস্তিষ্কে চলাচল করত।
“প্রথমে আমার কথা মাথায় আসেনি কেন?
“ এসেছিল, আমি সাময়িক সময়ের ঝোঁক ভেবেছিলাম। নুসরাত বুঝে গিয়েছিল। নিষেধ করেছিল, তোমাকে নিয়ে কোনো ধরনের ছেলেখেলা চলবে না।
“ছেলেখেলা বলতে?
ইরহাম কাঁধ ঝাঁকাল। বলল,”অন্য মেয়েদের মতো কয়েকদিন ডেট করে ছেড়ে দেওয়া, এটাই।
“আমি যদি মেনে যেতাম?
“তুমি যদি মেনে যেতে, তাহলে তুমি সৌরভি শিকদার, আজ এই ইরহাম শোহেবের স্ত্রী হতে না।
নাক টেনে দিয়ে বলল,”বুঝেছ?
মাথা দোলাল সৌরভি। বলল,”এখন আমার প্রতি তোমার পছন্দের মাত্রা কেমন? আগের থেকে বেশি নাকি কম?
ইরহাম কিছুক্ষণ ভাবল। সময় নিল। তারপর বলল,”সাহিত্যিক কথা বললে তুমি হাসবে। মজা উড়াবে। তাই সাধারণ কথা বলি। যেহেতু আমি সাধারণ মানুষ, আমি তোমাকে পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি পছন্দ করি।
সৌরভি হেসে ফেলল। হো হো করে হেসে উঠল তাকে নিয়ে। বলল,”আচ্চা, এসব বাদ দাও। শুনতে কেমন যেন লাগে। নুসরাতের সাথে আগে তো তোমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল, এখন সাপে নেউলে পরিণত হচ্ছে কেন? তুমি সিও পদে বসার জেদ ধরেছ কেন?
“ধূর, আমাকে কেউ দিবে ওই পদ তোমার মনে হয়? সবার আগেই তো আব্বু আমাকে একটা লাথি দিবে। বলবে কিছু জানো তুমি? নুসরাতকে চ্যাতানোর জন্যই ওই পদ চাই। ও বোঝে আমার আচরণ তাই তো নিজেও পাল্লা দিয়ে ঝগড়া করে।
কথা শেষ করতেই দেখতে পেল শোহেব সাহেব হাতে কিছু খাবারের ব্যাগ নিয়ে আসছেন৷ ইরহাম আর সৌরভিকে এভাবে খালি পায়ে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন,”খালি পায়ে কেন দু-জন?
তারা উত্তর দিল না, দু-জনে দু-পাশ থেকে বাহু আঁকড়ে ধরল। সৌরভি ইশারায় শুধাল,”শ্বাশুড়ি মায়ের জন্য এসব?
শোহেব সাহেব ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে চোখা নয়নে তাকালেন। বললেন,”কেন? আমার স্ত্রীর প্রতি জেলাস তুই?
“ওমা,আমি জেলাস হবো কেন?
শোহেব সাহেব বললেন,”তোর শ্বাশুড়ির হ্যান্ডসাম, সুন্দর, কেয়ারিং একটা স্বামী আছে, তোর তা নেই, এজন্য।
সৌরভি খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল,”আমার শ্বাশুড়ি মায়ের অতি হ্যান্ডসাম, কেয়ারিং একজন হাজবেন্ড থাকলেও অতি হ্যান্ডসাম কোনো শ্বশুর নেই।
শোহেব সাহেব এলিভেটর এ ঢোকে ছেলেকে ধমকে উঠলেন,”বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বোতাম কে টিপবে? আমি নাকি সৌরভি?
ইরহাম মুখ বাঁকিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে বোতাম টিপল। সৌরভি আর শোহেব সাহেবের খুনসুটির শব্দ আসছে৷ হাতের খাবার এর ব্যাগ থেকে খাবার বের করে আগেভাগেই তার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ইরহাম হাত বাড়াতেই চাপড় বসিয়ে বললেন,”তুই নিচ্ছিস কেন? তোর মা এখনো খায়নি।
মিনমিন করে বলল,”ওকে যে দিলে?
শোহেব সাহেব কপালে দ্বিগুণ ভাঁজ ফেলে বললেন,”ও আর তুই কী এক?
“এক না?
“ নাহ্..!
ইরহাম কথা বাড়াল না, দু-জনকে পেছনে ফেলে ধুপধাপ পায়ে চলে গেল। নির্বিকার চিত্তে আসলো শ্বশুর বৌমা। পেছন থেকে হিহি করে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ইরহাম তাদের বিশেষ পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা করল, দু-জন এক হলেই এভাবে অপমান করে। তার কোনো মান নেই নাকি ওদের কাছে? আশ্চর্য… এত অপমান, এত অপমান, সে মেনে নিবে কীভাবে!
খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে রুমের মেঝেতে। এসি চালানো থাকলেও রুমটা তেমন একটা ঠান্ডা নয়। চারিদিকে কুস্তুরীর সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার শব্দ আসছে বেডের ওপর থেকে। শরীর কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে দেখা গেল বিছানার মধ্যে নুসরাতকে। বাহিরে বৃষ্টি আসার তোড়জোড় চলছে খুব করে। বাতাস বইছে ঝড়ের ন্যায়। আরশ কাউচে হাত পা ছড়িয়ে বসা। উদোম গায়ে। শাওয়ার নেওয়ায় পানি পড়ছে চুল থেকে।
কাউচ থেকে উঠে বিছানার দিকে যেতে ইচ্ছে হলেও বসে থাকতে হলো। নুসরাত হুশিয়ারী দিয়েছে তার আশপাশে দেখলে লাথি মারবে। এই মুহুর্তে তাকে ঘাটানো আর আহত বাঘিনীকে খোঁচানো একই ব্যাপার। ক্ষোভে হিসহিস করছিল। পারলে চুল টুল ছিঁড়ে ফেলত। শুধু পারেনি বলে। হয়তো তাকে ছাড় দিয়েছে। নাহলে আগের নুসরাত নাছির হলে তক্তা বানিয়ে রেখে দিত। আরশের বসে থাকার ভাবনা স্থায়ী
হলো মাত্র কিছুক্ষণ। উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে বিছানার দিকে যেতে নিয়ে থেমে গেল। জ্বালাতে ইচ্ছে হলো না মেয়েটাকে৷ ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। আবারো ফিরে গিয়ে বসে গেল কাউচে। ভদ্র ছেলেটি হয়ে চুপটি করে বসে রইল, কিন্তু ভেতরের খচখচ থামল না। হাত, পা, সহ সমগ্র শরীর নিশিপিশ করে উঠল জ্বালানোর জন্য। বসে থাকা গেল না আর তার দ্বারা। উঠে দাঁড়াল ধড়াম করে। পঁচিশ বছর কম তো ঘুমায়নি, এখন একটু কম ঘুমালে কোনো কিছু হবে না। আঙুল দিয়ে ঠুকা দিল গায়ে,”এই,এইইইই নুসরাত…
নুসরাত গা থেকে হাত সরিয়ে দিল। বলল,”সরুন, ঘুমাতে দিন।
“পরে ঘুমাবি, ওঠ৷
চোখ খুলে পিটপিট করে তাকাল। কপালে ভাঁজ পড়ছে। বিরক্তিতে যে তিতিয়ে উঠছে তা বোঝাই গেল চেহারা দেখে। চোখ বন্দ করে আবার মেলে শুধাল,”কী হয়েছে আপনার? ঘুমাতে দিবেন না?
“পঁচিশ বছর কম তো ঘুমালি না। আজ একটু কম ঘুমালে সমস্যা কী?
“ আপনার এক্সাক্ট সমস্যা কী? আমার ঘুমানো নিয়ে আপনার সমস্যা হচ্ছে? হলে বলে দিন, আমি আমার বাড়ি গিয়ে ঘুমাব৷
আরশ নির্বিকার চিত্তে বলল,“বিবাহিত মহিলাদের বেশি ঘুমাতে নেই।
নুসরাত ত্যক্ত হয়ে উঠছে। ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না কী বলবে। আরশ ভোঁতা মুখটা দেখে বলল,”ভাষা হারিয়ে ফেলেছিস?
“তো হারাব না, আপনি কী পাগল, মানুষ এভাবে ঘুম থেকে কাউকে তুলে?
“আমার ঘুম আসছে না..”
কথা থামিয়ে দিয়ে বলল নুসরাত,”তো আপনার ঘুম আসছে না আমি কী করব? কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিব। আশ্চর্য, আরশ ভাই। আপনার কী আমাকে দেখে একটুও মায়া লাগে না?
আরশ ঠোঁট টিপে বসে রইল। নুসরাত আবারো ধড়াম করে শুয়ে পড়ল। বলল,”গুলি করব, আই স্যোয়ার, আবার খোঁচাখুঁচি করলে।
ভারিক্কি কন্ঠস্বরটা ভেসে এলো,”একবার করে শান্তি হয়নি, আবার করতে চাচ্ছিস?
“আপনাকে হাজারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে গুলি করা উচিত৷ এমন ব্যাটা মানুষকে, গুলি করেই ঠিক রাখতে হবে।
আরশ কথা বাড়াল না৷ নুসরাত ভাবল এবার বুঝি আর জ্বালাবে না। হয়তো সদয় হয়েছে তার প্রতি। চোখে ভারী ঘুম নেমে আসতেই আবারো গায়ে ধাক্কা লাগল৷ তার ভাবনাতে এই কথা আনাই ভুল হয়েছে। আরশ নিজে সজাক থেকে তাকে ঘুমাতে দিবে, এটা ভাবনায় আনলো সে কীভাবে? গড়গড় করে শ্বাস ফেলল নাক দিয়ে। চোখ খুলে তাকাতেই কেক হাতে নিয়ে দাঁড়ানো আরশের চেহারা চোখে ভাসল। রেড বেলবেট কালারের কেকটা একবার নুসরাত দেখল, একবার আরশের মুখটা দেখল। চোখ মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হবে ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। নিষ্পাপ মুখটা আগাতেই নুসরাত নিজে পিছু সরে গেল। কেকটা দেখেই খটকা লাগল তার নিকট। তবুও ধারণা করতে পারল না কেন৷ উঠে বসে চুল ঢিলে করে খোপা করল। কর্কশ কন্ঠে শুধাল,”কেক কীসের জন্য?
আরশ জিভ দিয়ে গাল ঠেলে হাসল। ভ্রু কুটি করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় নুসরাতও অনায়াসে বুঝে গেল তার হাসির কারণ। এবং যা বুঝল তা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লজ্জাজনক পর্যায়ের ইশারা। নিমেষেই ছেয়ে গেল গাল বরাবর লালিমা। ক্ষোভে অন্ধকার দেখল সে। গলার আওয়াজ অত্যন্ত ধীমি করে জিজ্ঞেস করল,” আমি যা বুঝতে পারছি, এটা কী তার জন্য?
আরশের গলার আওয়াজ নামানো। গ্রীবা বাঁকিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,”তুমি কী বুঝতে পেরেছ আমি তা বুঝতে পারছি না।
“আবারো তুমি?
চোখ পাঁকাল কথাটা বলতে বলতে। ততক্ষণে বেডের ওপর বসে পড়েছে আরশ। উদোম শরীরের দিকে একবার চোখ গেল নুসরাতের তারপর আবার তা সরিয়ে নিল। বলল,”উল্টাপাল্টা কিছু করার কথা মাথায় আনবেন না।
“উল্টাপাল্টা করার কথা কিছুই এই মুহুর্তে মাথায় আনছি না।
“ তাহলে?
আরশ হাতের কেকটা কেটে নুসরাতের মুখের দিকে এগিয়ে দিল। সে মাথাটা সরিয়ে নিল। কপালে হাত রেখে বলল,”আপনার মাথায় সমস্যা? বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই?
“বুঝে গিয়েছ তুমি?
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,”আমাকে বোকা মনে হয় আপনার?
‘“তা কেন মনে হবে, তোমার মতো শিয়ানা মেয়ে মানুষ এই পরিবারে দুটো আছে নাকি?
“ঠাট্টা করছেন?
“ঠাট্টা করব কেন?
নুসরাত কথা বাড়াল না, তার শরীর ভেঙে আসছে। ঘুমে অন্ধকার দেখছে। বিছানায় পড়ে ঘুমাতে মন চাচ্ছে, কিন্তু এই ব্যাটা যা শুরু করেছে ঘুমাতে দিবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে বলে মনে হয় না। তাই নাক দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,” আপনার বাসর উপলক্ষে কেক কাটতে হবে তো?
দু-পাশে মাথা দুলিয়ে না করে দিল। নুসরাতের কপালের ভাঁজ পড়ল আরো কয়েকটা। মাথা ব্যথায় ভোঁ ভোঁ করছে। ঝাঁঝিয়ে উঠল ভেতর।
“আপনি বাচ্চামো করছেন কেন?
“বাচ্চামো কখন করলাম?
“বুঝতে পারছেন না?
আরশ তার নাকে হালকা জরে ঠুকা দিল আঙুলের ডগা দিয়ে। কেক নুসরাতের মুখের ভেতর পুরে দিল বুড়ো আঙুলের সাহায্যে। বলল,”ইউয়ার নো লংগার আ ভার্জিন. ইট’’স বিন আ ডে নাও. দেটস হোয়ায় উইয়ার সেলিব্রেটিং দিজ.
আরশের দিকে নুসরাত কিছুক্ষণ পলকবিহীন তাকিয়ে থেকে কিছুটা কেক আরশের মুখে পুরে দিয়ে বলল,”বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই?
“না…”
“সব জলাঞ্জলি দিয়েছেন?
“ হ্যাঁ, একটু পূর্বেই..!
কথা বাড়ানোর থেকে ঘুমানো গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না তার কাছে। তাই বলল,“কেক কাটা শেষ, বাসর ও করে ফেলেছেন, নির্লজ্জতার চরম শিখড়ে পৌঁছে গেছেন, এবার… ঘুমান। চোখ দুটো দেখেছেন, ভ্যাম্পায়ার এর মতো লাগছে৷
আরশ নুসরাতের ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে দিল। কথা কানে নিচ্ছে বলে মনে হয় না। নুসরাত তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলে ওঠল,”আগামীকাল আপনাকে আপনার কাজের জন্য এওয়ার্ড দেওয়া হবে। দ্যা বিগেস্ট নির্লজ্জ, বেকার সৈয়দ হেলাল আহমেদের কনিষ্ঠ পুত্র সৈয়দ আরশ হেলাল নিজের স্ত্রীর সাথে বাসর করার খুশিতে কেক কেটে উদযাপন করেছেন। এই খুশিতে তাকে তার স্ত্রী একটা এওয়ার্ড দিবেন, খুশি?
নুসরাতের কথা শেষ হলো না, ক্ষূদার্থ হায়েনার ন্যায় তার ঠোঁটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেল আরশকে। শক্ত করে মাথার পেছন চেপে ধরে চুমু বসাল নাকে, গালে, ঠোঁটে। গায়ে ধাক্কা লাগলেও তাকে খুব একটা নড়তে দেখা গেল না৷ ঠাঁয় বসে থাকতে দেখা গেল৷ বেডের ওপর রাখা কেক লন্ডভন্ড হলো। সাদা বেড শিটে লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ল সেকেন্ডের ভেতর। নুসরাতের পুরো শরীরে লেপ্টে গেল ক্রিম। সেদিকে কোনো ধ্যান আছে বলে মনে হলো না লোকটার। উত্তাল বাতাসে পর্দা উড়িয়ে দিচ্ছে তার সাথে নাকে ভেসে আসছে তীব্র কুস্তুরীর সুবাস। নুসরাত ধাক্কা দিল বুকে,”সরুন, শ্বাস নিতে পারছি না।
কথা শেষ করে নিজেই সরে গেল দূরে। হাচ্চি দিল। আঙুল তুলে শাসাল,”মাত্র গোসল করেছি, কাছে আসবেন না৷
সেই নিষেধাজ্ঞা মানা হলো না, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে হাসতে দেখা গেল আরশকে। বাঁ-গালে ভাঁজ পড়ল সামান্য৷ অ্যাডামস অ্যাপল উঠা নামা হতে দেখা গেল, নুসরাত সরে যেতে যেতে বলল,”খবরদার, দূরে থাকুন। মোটেও গোসল করতে এই মুহুর্তে আমি ইচ্ছুক না।
আরশ গাল ঠেলল জিভ দিয়ে। ভারিক্কি স্বরে বলল,“আমি করিয়ে দিব। তোকে কষ্ট করতে হবে না।
“ আপনার তো আসলেই লজ্জা টজ্জা কিছু নেই। এইইই..”
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৯
কথা বলতে বলতে বাহিরের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় সে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে কথা শেষ করতে পারল না তার উপর দ্বিতীয় বারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেল আরশকে। ততক্ষণে বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি বেড়েছে। শব্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নুসরাতের চোখের সামনে শুধু ভাসল দুটো চোখ, এবং কানে বাজল কিছু মৃদু স্বরের গোঙানির মতো শব্দ,”স্টপ লুকিং দ্য আদার ওয়ে. কিপ আইজ অন মি, নুসরাত নাছির.. এন্ড ইঞ্জয় দিস মোমেন্ট..!”
