Home এই অবেলায় এই অবেলায় শেষ পর্ব

এই অবেলায় শেষ পর্ব

এই অবেলায় শেষ পর্ব
সুমনা সাথী

কলরব আর নিযানা সেদিন রাতটা অভিকের বাসায় কাটালো। তালুকদার বাড়িতে ফিরলো সকালে৷ ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই থমকালো কলরব৷ বাসার ঘরে সবাই মোটামুটি উপস্থিত। নিযানার ডান হাতে হাত রেখে হাতটা শক্ত করে ধরলো কলরব৷ কেউ কিছুই বলছে না। সবার মুখই গম্ভীর। কলরব নিচু গলায় বলল,
‘আই অ্যাম স্যরি আব্বু৷ কিন্তু আমার কিছু করার ছিলো না৷ আমি নিযানাকে ছাড়তে চাইনা আর নাতো ও আমাকে ছাড়তে চাই৷ আশা করি তোমরা সবাই বুঝবে৷ আর যদি তোমাদের অসুবিধা থাকে তাহলে ওকে নিয়ে আমি এখনি বাড়ি থেকে চলে যাব৷’
আরশাদ তালুকদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গম্ভীর গলায় বলল,
‘সারারাত কোথায় ছিলে?’
কলরব এমন প্রশ্ন আশা করেনি। ভেবেছিলো এখনি বোধহয় আরশাদ তালুকদার তেড়ে আসবেন তাকে মারার জন্য৷ হতভম্ব কলরব তড়িৎ গলায় উত্তর করলো,

‘অভিকের বাসায়৷’
আরশাদ তালুকদার বললেন, ‘বসো। কিছুক্ষণের মধ্যে আনতাসারা চলে আসবে।’
কলরব চাইলো নিযানার পানে। সবকিছু এতটা শান্ত কেনো? সবাই এমন চুপচাপ৷ তার কিছুই মাথায় ঢুকছে না৷ তাহলে কী সত্যি কোনো ঝামেলা হবেনা? নিযানা মৃদু স্বরে বলল,
‘মামু আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই৷’
আরশাদ তালুকদার বললেন, ‘ঠিকআছে।’
নিযানা আর কলরব দুইজনেই বসলো। মৌনিতা আর ঊর্মি রান্নাঘরে চলে গেল। কাব্য আগেই চলেগেছে৷ কায়েফ ও চলে গেল। দিব্য আরশাদ তালুকদারের পাশেই বসে আছে৷ অলেখা ওদের দুজনের জন্য নাস্তা সেখানেই নিয়ে এলেন৷ সামনের টেবিলে রেখে বললেন,
‘খেয়ে আসিসনি নিশ্চয়ই? এত তাড়াতাড়ি চলে আসলি৷ খেয়ে নে দু’জনে।’
কলরব অবাক চোখে চাইলেও কিছু বলল না৷ অলেখার মুখটা ও গম্ভীর। নিযানাকে ইশারা করতেই ও খাওয়া শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নওয়াজ চৌধুরী আর আনতাসা এলো৷ সাথে তিনজন পুলিশ৷ দিব্য অবাক হয়ে বসা থেকে উঠে পড়লো। চমকেছে নিযানাও৷ দিব্য রুক্ষ গলায় বলল,
‘আমি তো আপনাকে বলেছিলাম, আপনার মেয়েকে সুস্থভাবেই আপনার কাছে ফেরত দেব৷ তাও আপনি পুলিশ নিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতে এলেন?’
নওয়াজ চৌধুরী বললেন, ‘আমার যেটা সঠিক মনে হয়েছে আমি করেছি। অফিসার, ওই যে ছেলেটা৷ অ্যারেস্ট করুন ওকে।’

কলরব হতবাগ হয়ে তাকালো। দিব্যর মস্তিষ্কে যেন রক্তক্ষরণ হলো। শরীর জ্বলে উঠলো ওর৷ বলল,
‘আপনার কী মাথা খারাপ হয়েগেছে? অ্যারেস্ট করবে মানে?’
আরশাদ তালুকদার বললেন, ‘দিব্য শান্ত হও৷’
কলরব বসা থেকে উঠে পড়লো৷ বলল, ‘কীসের জন্য অ্যারেস্ট করবে? আমি কী চুরি ডাকাতি করেছি? নাকি কাউকে খুন করেছি?’
নওয়াজ চৌধুরী বললেন, ‘তুমি আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করেছো। তাও আমার বাড়ি থেকে।’
নিযানা অবাক চোখে বাবার পানে চাইলো৷ কলরব দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করলো৷ দিব্য রেগেমেগে কিছু বলার আগেই আরশাদ তালুকদার বললেন,
‘অফিসার নিয়ে যান ওকে। আর যাদের মেয়ে তাদের কাছে সুস্থ অবস্থায় ফেরত দিন। দিব্য চলো আমার সাথে। এটা আমার নির্দেশ। যদি আমাকে বাবা বলে ডাকতে চাও তো৷’

কথাটা বলে আরশাদ তালুকদার গটগট পায়ে সেখানে থেকে চলে গেল। অলেখা রান্না ঘর থেকে ফুপিয়ে উঠলেন৷ দিব্য দোটানায় পড়ে গেল৷ অদ্ভুত দ্বিধা। অফিসার কলরবের দিকে এগোতেই নিযানা সামনে এলো৷ বলল,
‘আপনারা কী করতে চাইছেন? ও আমাকে কিডন্যাপ করেনি৷ আমি নিজ ইচ্ছাতে ওর সাথে গিয়েছিলাম৷’
নওয়াজ চৌধুরী বললেন, ‘অফিসার, আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? ও আমার মেয়েকে ম্যানিপুলেট করেছে। নিযানা সরো। উনাদের কাজ করতে দাও।’
অফিসার নিযানাকে পার করে কলরবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কলরব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। নিযানার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তপ্ত গলায় বলল,
‘আব্বু তুমি এসব কেনো করছো? দিব্য ভাইয়া, তুমি উনাদের আটকাও না৷ ওরা কেনো কলরবকে ধরছে৷ কলরব আমাকে কিডন্যাপ করেনি। আমি নিজ ইচ্ছায় ওর সাথে গিয়েছি। কেউ কী বুঝতে পারছো না আমার কথা?’
দিব্য সহ্য করতে পারলো না৷ নিযানা কে উপেক্ষা করে চলে গেল সেখান থেকে। কলরব পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো৷ বাপ, ভাইয়ের আজকের ব্যবহারটা তাকে ব্যতিত করেছে৷ কোনো কিছুর পরোয়া না করা কলরবের আজ মনটা কেমন ভার হলো। হারিয়ে বসলো কিছু বলার শক্তি৷ বাড়ির অন্য কেউ সেখানে এলোও না৷ আরশাদ তালুকদারের কড়া নির্দেশ৷ অফিসার বললেন,

‘দেখুন ম্যাডাম আপনার আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷ আপনাকে যে ভয় দেখানো হয়েছে আমরা বুঝতে পারছি। নিজ ইচ্ছায় গেলে আপনি পায়ে হেঁটেই যেতে পারতেন৷ সিসিটিভিতে স্পষ্ট আমরা দেখেছি। আপনাকে উনি কিডন্যাপ করেছেন৷ এখন আপনি আপনার আব্বু-আম্মুর সাথে বাসায় যান৷’
নিযানার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো৷ কেউ কেনো তার কথা বুঝতে পারছে না? ও আর কিছু বলার পূর্বে কলরব ওর একটা হাত ধরলো৷ কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতেই চোখ দুটো বুঁজে নিলো নিযানা৷ পাপড়ীর ভারে চোখে জমা অশ্রু ঝরঝর করে পড়লো ওর গাল বেঁয়ে। কলরব ওর মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলল,
‘আপাতত তুই যা। সাবধানে থাকবি। আমি খুব শীগ্রই চলে আসবো৷ কাঁদছিস কেনো পাগল? আমি কী কোনো অন্যায় করেছি নাকি? তুই তো সব জানিস।’
নিযানা ওকে জড়িয়ে ধরলো। মিশে যেতে চাইলো ওর সাথে৷ পরোয়া করলো না আশপাশের কারোর। শব্দ করে কেঁদে উঠলো৷ কলরব ওকে জোর করে সরিয়ে দিলো৷ আনাতাসা ওকে সরিয়ে নিলো জোর করে। নিযানা ছটফট করছে। কলরব নিজেই হেঁটে চলে গেল৷ পেছনে তাকাচ্ছেনা। পুলিশ কয়জন তার পেছনে। নিযানার বুকটা ফেটে যাচ্ছে৷ কী করবে? কেউ কেনো তার কথা বুঝছে না? কেনো শুনছে না৷ ছটফট করলো আনতাসার থেকে ছোটার জন্য৷ চিৎকার করে বলল,

‘মাম্মা ছাড়ো আমাকে। আমিও ওর সাথে যাব৷’
নওয়াজ চৌধুরী ধমকে উঠলেন, ‘জাস্ট শাটাপ নিযানা। পাগলামি বন্ধ করো এবার, আর চুপচাপ বাড়ি চলো। তুমি সমস্ত সীমা পার করে ফেলেছো। আমি তোমাকে কাঁটার ঝোপ থেকে ফুলের বাগানে নিয়ে যেতে চাইছি, আর তুমি? স্বইচ্ছায় কুয়ায় ঝাপ দিতে চাচ্ছো?’
নওয়াজ চৌধুরী ওকে জোর করে নিয়ে যেতে লাগলেন। নিযানা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আব্বু আমার কথাটা একবার শোনো। তুমি ভুল করছো।’
নওয়াজ চৌধুরী কড়া গলায় বললেন, ‘কীসের জন্য এত পাগল হয়েছো নিযানা? ওই ছেলেটার করা কাজ গুলো এত সহজে ভুলে গেলে? পাগলামি বন্ধ করো আর চুপচাপ চলো৷ নয়তো এখন তো শুধু জেলে দিয়েছি। তুমি এমনই করতে থাকলে, পৃথিবী থেকে সরাতে বাধ্য হব৷ তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না ওর কোনো ক্ষতি হোক?’
নিযানা বিস্মিত চোখে বাবার দিকে তাকালো৷ বিশ্বাস করতে পারলো না সে ঠিক শুনেছে৷ ওকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে সামান্য বিব্রতবোধ করলেন বোধহয় নওয়াজ চৌধুরী। কড়া গলায় পুনরায় বললেন,
‘আমি কিন্তু চাইলে সবকিছু করতে পারি৷ বিশেষ করে তোমার ভালোর জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি। সেখানে অন্যকারো জীবন নিতে পারবো না? এটা সহজ৷’
নিযানা ক্ষীণ গলায় বলল, ‘নাহ, তুমি পারোনা৷ তুমি পারোনা আব্বু।’

‘কেনো পারিনা?’
নিযানা চিৎকার করে উঠলো, ‘তুমি একজন বাবা হয়ে আরেকটা বাচ্চার থেকে তার বাবাকে কেড়ে নিতে পারোনা৷ যে এখনো পৃথিবীতে আসেনি, তার আসার আগেই তার থেকে তার বাবাকে কেড়ে নিতে পারোনা৷ তুমিও তো একজন বাবা৷ বলো বুক কাঁপবে না তোমার? হাত কাঁপবে না? বলো? পারবে নিজের মেয়েকে জীবন্ত অবস্থায় মেরে ফেলতে?’
‘কীহ?!’
নওয়াজ চৌধুরী থমকে দাঁড়ালেন৷ অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন, মেয়ের বলা কথাটির অর্থ। বিস্ময়ে তার চোখমুখ বদলে গেল। রান্না ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন অলেখা সহ বাকি সবাই। আনতাসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘তুমি এসব কী বলছো বেবি? তুমি? মানে সত্যি!?’
নিযানা মাথাটা নুনিয়ে ফেলল। মৃদু গলায় বলল, ‘হ্যাঁ! আইম গোয়িং টু বি আ মাদার।’

সময় যেন স্রোতের মতো বয়ে যায়। মির্জা গালিব ঠিকই বলেছেন, জীবন বড় বিচিত্র। সন্ধ্যা কাটতে চায় না, অথচ চোখের পলকেই কেটে যায় বছরের পর বছর। তেমনি দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে কয়েকটি মাস। চিন্তায় দিব্যর মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে। কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। উৎকণ্ঠায় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে তার। নবনীর ডান হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে রেখেছে সে। স্থান হাসপাতালের ওটি। চারপাশে ব্যস্ততা, অথচ দিব্যর কাছে যেন সবকিছুই থমকে আছে। সকাল দশটা নাগাদ নবনীর প্রসববেদনা উঠেছিল। সময় নষ্ট না করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানালেন, স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই সন্তান জন্ম দিতে হবে। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ওটিতে নেওয়া হয়েছে। নবনীর পাশে থাকার অনুমতি পেয়েছে দিব্যও। ভয়ে কাঠ হয়ে আছে নবনী। গলা শুকিয়ে এসেছে। চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। দিব্য তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অস্থির কণ্ঠে বলল,
‘তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে? বলো? খুব কষ্ট হচ্ছে? আর একটু… প্লিজ। আর কিছুক্ষণ।’
নবনী চোখ দুটো বুজে নিল। ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। দিব্য অস্থির দৃষ্টিতে কাব্যর দিকে তাকাল। কাব্য মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করল। তবু দিব্যর বুকের ভেতরকার অস্থিরতা কমল না। সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীর হয়ে গেছে। অবশেষে বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই কক্ষের চারপাশ মুখরিত করে এক নবজাতকের কান্নার শব্দ ভেসে এলো। কাব্য হেসে উঠল।

‘ওরে বাবা! এত জোরে কেউ কাঁদে?’
দিব্যর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স ছোট্ট শিশুটিকে নবনীর বুকের ওপর আলতো করে শুইয়ে দিল। নবনী ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আর্দ্র চোখে তাকাল নিজের সন্তানের দিকে। আগেই জানা ছিল, তাদের ছেলে হবে। তবু প্রথম দেখার অনুভূতিটা যেন কোনো পূর্ব প্রস্তুতিই মানে না। নবনীর দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীরটাও যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। তবু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। কাঁপা হাতে ইশারা করল, দিব্যকে যেন শিশুটাকে দেওয়া হয়। দিব্য কম্পিত হাতে দুহাত বাড়িয়ে নিজের সন্তানকে তুলে নিল। ছোট্ট, নরম শরীরটা বুকের কাছে টেনে নিতেই তার সমস্ত অস্থিরতা যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। ঝুঁকে গিয়ে নবনীর কপালে দীর্ঘ এক চুমু এঁকে দিল সে। তারপর চোখ গেল শিশুটার মুখের দিকে। দিব্য স্থির হয়ে গেল। এ যেন তারই শৈশবের প্রতিচ্ছবি। ছোট্ট মুখ, নাকের গড়ন, কপাল, হুবহু যেন ছোট্ট দিব্য তালুকদার। অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল তার সমগ্র শরীরে। পুরুষালি কঠিন চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। এতদিনের অভাব, শূন্যতা, অপেক্ষা, সবকিছু যেন এই ছোট্ট মানুষটার আগমনে অর্থ পেয়ে গেল। বিস্ময়ে কাঁপা গলায় দিব্য বলল,

‘নবনী… ও আমার? মানে… আমাদের?’
নবনী কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইল তাদের সন্তানের দিকে। দিব্য শিশুটার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর নবনীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
‘তোমাকে ধন্যবাদ, নবনী। এই অবেলায় আমার জীবনে আসার জন্য। আমার জীবনটাকে আবারও খুশি আর আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। একজন রিক্ত মানুষকে এতটা ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য।’
কণ্ঠটা ক্রমশ ভারী হয়ে এলো তার। ‘আর… আমি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই আমাকে গ্রহণ করার জন্য।’
নবনীর চোখের কোণে আবারও অশ্রু জমল। দিব্য ভেজা চোখে হাসলো। এরপর নবনী যখন পুরোপুরি হুঁশে এলো। তখন ওর প্রথম কথা ছিলো,
‘দিয়া কোথায়?’

অভিনবের সাথে কুহুর বিয়ের কথাবার্তা চলছিলো বেশ অনেকদিন ধরে৷ আজকে সন্ধ্যায় বিয়েটা ছোটখাটো ভাবে সেরে ফেলা হবে৷ আপাতত কুহু এই দেশে থেকে এইচএসসি অব্দি পড়বে৷ এরপর অনুষ্ঠান করে তাকে একেবারের জন্য শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো হবে। বিয়ের কাজ মিটতে মিটতে প্রায় এগারোটা বাজলো।আজকের রাতটা অভিনবরা এবাড়িতেই কাটাবে। তাই হইহট্টগোলে মূলত দেরি হয়েছে। নিযানা আগেই ঘরে এসে বসেছিলো। ইদানিং বাড়ন্ত পেটটা নিয়ে তার হাঁটাচলা করতে খুব অসুবিধা হয় তার৷ কলরব ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। তবে নিযানাকে বিছানায় পেল না৷ ব্যালকনিতে উঁকি দিয়ে দেখলো সে সেইখানে দাঁড়িয়ে৷ কলরব এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো৷ কাঁধে চিবুক ঠেকিয়ে বলল,
‘তোর কিন্তু এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিলো।’
নিযানা বলল, ‘ঘুম আসছেনা৷ কুহুর জন্য কষ্ট হচ্ছে ও কতদূরে চলে যাবে৷’
‘এইজন্যই তো বলছিলাম ওই বলদ টার সাথে বিয়ে না দেওয়ায় উত্তম হতো। শুধু শুধু আমার একমাত্র বোনটা এতদূর চলে যাবে।’
নিযানা হেঁসে বলল, ‘তোমার সমস্যা কী বলোতো? অভিনবকে তোমার পছন্দ নয় আমি জানি৷ তাই বলে বারবার এভাবে বলবে? তখন ও ছেলেটার সাথে ঠিক করে কথা বললে না। ও খুব ভালো ছেলে৷ আর বড় কথা ও কুহু কে ভালোবাসে৷’
‘এইজন্য তো বিয়েটা হচ্ছে৷ শালা, আমার বউকে না পেয়ে বোন পটিয়ে নিয়েছে৷’
নিযানা কেমন করে জানি কলরবের পানে চাইলো৷ অথচ ওর হাসার কথা ছিলো। কলরব সন্দিহান চোখে চাইলো৷ বলল,

‘তোর কী শরীর খারাপ লাগছে?’
নিযানা মাথা নাড়ে৷ অতঃপর কলরবের দিকে নিজের হাতটা বাড়ায়৷ মুষ্টি খুলতেই কলরব চমকায়। সেদিনকার সেই ভাঙা কাঁচের চুড়ির টুকরো গুলো৷ সে রেখে দিয়েছিলো৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলল কলরব৷ এটাও দেখে ফেলেছে। নিযানা ভুরু কুঁচকে চেয়ে বলল,
‘তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে না৷ তাহলে এগুলো কেনো নিজের কাছে রেখেছো?’
কলরব আমতা আমতা করে বলল, ‘তাতে তোর বাপের কী?’
‘কলরব!’
মুখ ফুলালো নিযানা। কলরব হাসলো। বলল, ‘কে বলেছে ভালোবাসতাম না? ভালোবাসতাম বলেই ভালো চেয়েছিলাম৷ আমি চাইনি আমার জন্য তোর স্বপ্নে ভাঙুক। তোর পড়াশোনা বন্ধ হোক৷ এই বাড়িতে থাকলে তোর পড়াশোনা করা হতো না৷ আম্মু বলেছিলো।’

‘কবে থেকে ভালোবাসতে?’
নিযানা আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলো৷ কলরব বলল, ‘সে অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে এক…!’
‘ফাজলামি কোরো না তো৷ তুমি আমাকে চাইতে, আবার দিনে কয়েকবার করে ডির্ভোসের কথা ও বলতে? সিরিয়াসলি কলরব?’
কলরব নিযানার ফোলা গালে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খেলো। ওকে আরেকটু নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘উঁহু! তোকে পাওয়াটা এতটায় অসম্ভব ছিলো যে, আমি কখনো চাওয়ার দুঃসাহস করতে পারিনি৷ কিন্তু তোকে পাওয়ার পরেও কয়েকদিন আমি যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতাম আর ভাবতাম, এই বুঝি দেখবো, সবটায় স্বপ্ন৷’
নিযানার চোখে বিস্ময়। অবাক গলায় বলল, ‘ঠিক বুঝলাম না। পাওয়ার পর মানে?’
‘তোর সব বিষয়ে পিএইচডি কেনো করতে হবে? থাক না কিছু বিষয় অজানা। এমন বিশেষ ক্ষতি তো হচ্ছেনা। এতকিছুর পরেও এই যে তুই আমার বুকে, এটায় সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
নিযানা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘ভালোবাসলে প্রকাশ করতে হয়৷ হুট করে যদি ভালোবাসার মানুষটা না থাকে, তখন কী করবে?’

‘ভালোবাসার মানুষটা না থাকুক ভালোবাসাটা থাকবে৷ আমি ভালোবেসে যাব। যতদিন পৃথিবীতে থাকবো শুধু তোর থাকবো। তোকে ভালোবাসবো।’
কলরব হাসছে। নিযানা আজকাল কথায় পারেনা ছেলেটার সাথে। অদ্ভুত কথা বলা কলরব ও এত সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। কয়েকমাসে ছেলেটার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা৷ তবুও নিযানা কী কম যায়? সে এত সহজে তো হার মানবে না৷ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলো,
‘আচ্ছা কলরব, তোমার প্রথম ভালোবাসা কে?’
‘গিটার!’
‘আর সেকেন্ড ভালোবাসা?’
‘বাইক!’
নিযানা তপ্ত শ্বাস ফেলল। ছেলেটাকে কিছুতেই কথার জালে ফাঁসানো যাচ্ছেনা। এক্সের কথা তো সে বের করেই ছাড়বে৷ আবারও আদুরে গলায় বলল,
‘আর শেষ ভালোবাসা?’
‘তুই!’

নিযানা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখটা গম্ভীর হয়েগেছে ওর৷ কলরব তা দেখে মনে মনে হাসলো। মেয়েটা কথায় কথায় তাকে ইরাকে নিয়ে খোঁচা দেয়৷ অকারণে রাগ করে৷ নিযানা খাটের দিকে যেতে বলল,
‘আমার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে। সাথে আবার পা দুটো তে কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে।’
কলরব বলল, ‘এই অধম এখনি আইসক্রিম নিয়ে এসেই, আপনার পা ম্যাসাজ করে দিচ্ছে, বেবি।’
কলরব চলে গেল। নিরাশ হলো নিযানা। আজ কিছুতেই ছেলেটাকে উসকানো যাচ্ছেনা। কিছুক্ষণ পর কলরব দুটো আইসক্রিম নিয়ে আসলো। একটা চকোবার অন্যটা কোণ। জিজ্ঞেস করলো,
‘কোনটা নিবি? এখান থেকে একটা নিতে হবে৷ আরেকটা আমি খাব। আমার ও খেতে ইচ্ছা করছে৷’
নিযানা দ্বিধায় পড়ে গেল। তার তো দুটোই খেতে মন চাইছে। তবুও মনে পাথর রেখে চকোবার আইসক্রিম টা নিলো। কলরব ওর সামনে বসে কোণ আইসক্রিম টা খুলতে লাগলো৷ নিযানা নিজের আইসক্রিম খাওয়ার পাশাপাশি কলরবের দিকে চেয়ে রইলো। মৃদু বিরক্তি দেখিয়ে বলল,
‘তুমি খাবে তো আমার পা কে ম্যাসাজ করে দিবে?’
কলরব একহাতে আইসক্রিম ধরে অন্য হাতটা নিযানার পায়ে রাখলো। আইসক্রিমে একটা কামড় বসাতেই নিযানা বলল,

‘আমি ওটাও খাব৷’
কলরব বিনাবাক্য আইসক্রিমটা বাড়িয়ে দিলো। অবশ্য এর অপেক্ষাতেই ছিল। এতদিনে এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। নিযানার কোনটা কখন চাই, কোন কথার আড়ালে কী আবদার লুকিয়ে থাকে, সবই এখন তার প্রায় মুখস্থ। নিযানার চোখেমুখে মুহূর্তেই আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে হাসিমুখে কলরবের আইসক্রিমে কামড় বসাল। কলরব এক গালে হাত রেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। এই মেয়েটা তার হবে বা হতে পারে এটা কি সে কখনো ভেবেছিল? এতটা ভালোবাসবে এটাও ভাবেনি৷ হঠাৎ দু চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো ওর। চোখের কোণে জমে উঠল কয়েক ফোঁটা আনন্দাশ্রু। ইশ! নিযানা দেখে ফেললে আবার কত প্রশ্ন করবে! দ্রুত মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে চোখটা মুছে ফেলল। তারপর স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে তাকাতেই দেখল, নিযানা তার দিকেই চেয়ে আছে। কলরব মৃদু হাসল। নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে চাইলো। নিযানা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কী হয়েছে?’

কলরব মাথা নাড়ল। তারপর দুহাতে নিযানার পা আলতো করে ম্যাসাজ করতে করতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘কিছু না। তুই খা। লাগলে আরও নিয়ে আসব।’
নিযানা হাসলো। কলরব ও ভেজা হাসলো। খাওয়া শেষ হতেই নিযানা আবারও কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
‘তোমার প্রথম ভালোবাসা গিটার কে দিয়েছো। সেকেন্ড ভালোবাসা বাইককে দিয়েছো৷ মনটা নিশ্চয়ই এক্সকে দিয়েছো? তাহলে আমার জন্য কী রেখেছো?’
কলরব অসহায় চোখে চাইলো। নিযানা মুখটা ভার করে ঘুরিয়ে নিলো। কলরব হাসলো। কাছে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালো। নিযানা মুখ ঘুরিয়ে নিলো৷ কলরব ওর মুখটা দু’হাতের তালুতে নিয়ে গুনগুন করে গাইলো,
‘মনটা সবাই দিতে পারে….’
আমি তোমায় প্রাণটা দিতে চাই।
ও জান আমার জান
তুমি ছাড়া জীবন’ই তো নাই….’

দিনগুলো ঊর্মির জন্যও যেন স্বপ্নের মতো কাটছিল। আজকাল এ বাড়ির সবাই তাকে ভালো চোখে দেখে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যে মানুষটির, সে হচ্ছে কায়েফ। সে সব পরিস্থিতিতে শক্তভাবে তার পাশে ছিলো বিধায় সবাই তাকে বাধ্য হয়ে হলেও মেনে নিয়েছে৷ আর এই বাড়ির কায়েফের বর্ননার থেকেও সত্যি ভালো। সেদিন কায়েফের ঘরে ফিরতে খানিকটা দেরি হয়ে গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। পা দুটো যেন দরজাতেই আটকে গেল তার। চোখের সামনে ভেসে উঠল এমন একটা দৃশ্য, যা মুহূর্তেই তাকে পাথর করে দিল। মাজহার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ঊর্মি। মাজহা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। দুজনের মাঝে কী নিয়ে যেন গল্প চলছে। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে হাসির শব্দ। কায়েফকে দেখেই মাজহা কথা থামিয়ে দিলেন। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
‘কায়েফ, তুই চলে এসেছিস? দেখ না, মেয়েটার কাঁদতে কাঁদতে কী অবস্থা! তাই ওর মাথায় একটু তেল দিয়ে দিচ্ছিলাম।’

হতভম্ব কায়েফ নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। এই বাড়িতে যে মানুষটি একসময় ঊর্মিকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করতেন, আজ তিনিই যেন মেয়েটাকে চোখে হারান। কীভাবে যে এই মেয়েটার মায়ায় পড়ে গেলেন, কে জানে! এমনিতেই মাজহা নরম মনের মানুষ। আজকাল নিজের হাতে ঊর্মির প্রতিটি বিষয়ের খেয়াল রাখেন। কায়েফ বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকে বলে এসব তার অজানাই থেকে যায়। আজ হঠাৎ দৃশ্যটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য সে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো তার। মনে হলো, সে বুঝি কোনো অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কাঁদছেন কেন?’
মাজহা ঊর্মির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ‘ওর দাদুর কথা খুব মনে পড়ছে। তুই একটু সময় করে ওকে একবার গ্রাম থেকে ঘুরিয়ে আনিস না কেন? যতই হোক, ছোটবেলা থেকে তো ওখানেই থেকেছে।’
কায়েফের মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। ‘আম্মু, আই অ্যাম সরি। কিন্তু আমি ওই গ্রামে আর পা রাখতে চাই না।’
মাজহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তাহলে ওর দাদুকে এখানে আনার ব্যবস্থা করে দে।’
কায়েফ এবার আর কোনো আপত্তি করল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মাজহা ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘এবার খুশি তো?’

ঊর্মি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। মাজহাও হাসলেন। তারপর হঠাৎ নিজের পুরোনো দিনের গল্প শুরু করে দিলেন।
‘তুমি জানো, আমার বিয়ের পরেও আমি কোনো মতে তিন দিন শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়েই কান্না জুড়ে দিতাম বাপের বাড়ি যাব! তোমার শ্বশুর পড়তেন বিপদে।’
বলেই হেসে উঠলেন তিনি। ঊর্মিও হাসল। এরপর মাজহা তার বিবাহিত জীবনের কতশত গল্প বলতে লাগলেন।পুরোনো দিনের কথা, শ্বশুরবাড়ির গল্প, নিজের অভিমান, কত কী! গল্পগুলো কি সত্যিই এত মজার? হয়তো। নয়তো দুজন মানুষ এভাবে হাসে কেন? কায়েফ যেন আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার কানে শুধু ভেসে আসছে ঊর্মির হাসির শব্দ। কী অদ্ভুত সেই হাসি! নিজেকে স্বার্থক বলে মনেহলো কায়েফের। ধীরে ধীরে বিছানার পাশে মেঝেতে বসে পড়ল ও। গালে হাত রেখে নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল সেই দৃশ্যটার দিকে। মনে হলো, এই মুহূর্তটা একটু থেমে থাকুক। কিছুক্ষণ পর মাজহার চোখে পড়ল ছেলেটাকে।
‘নিচে বসেছিস কেন? উপরে আয়।’
কায়েফ মৃদু হাসল। ‘তুমি কন্টিনিউ করো। আমার এখানে বসেই ভালো লাগছে।’
মাজহা কিছু না বলে মুচকি হাসলেন। আর কায়েফ? সে চুপচাপ বসে রইল। তার সামনে তার দুই প্রিয় মানুষ গল্প করছে। হাসছে। আর সে শুধু দেখছে। কখনো কখনো সুখকে ছুঁয়ে দেখতে হয় না। চোখের তৃপ্তিই যতেষ্ঠ। কায়েফের মনে হলো এই তো, জীবনটা বোধহয় এমনই হওয়ার কথা ছিল।

তালুকদার বাড়ির পেছনের বাগানে পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। সবাই একসাথে হইহই করে রান্না করলো। দুপুরের খাওয়াদাওয়াও করলো একসাথে৷
‘হ্যাঁ, আমার জামাইয়ের নামেই করো। ভবিষ্যতে আমার সবকিছু সেই তো দেখবে।’
নওয়াজ চৌধুরীর গলা কানে এলো কলরবের। তারাও আজকে এ বাড়িতে এসেছে। তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। সে ভ্রু কুঁচকে নিযানার পানে চাইলো। নিযানা একটা চেয়ারে বসা। কলরবের চাহনি দেখে হেঁসে ফেলল। কলরব বলল,
‘গিরিগিটির বাবা গিরগিটি।’

নিযানা কলরবকে ইশারা করে বলল, ‘এটা বাদঁড়৷ আর আমার পেটে বাঁদড়ের বাচ্চা বাঁদড়৷’
কলরব হাসলো। অভিনব বলল, ‘কলরব তুমি হাসছো কেনো? আমি কি এত বাজে গাই?’
কলরব মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। অভিনব এতক্ষণ গান করছিলো। কলরবের খেয়াল হতেই বলল,
‘তোমার গানে আমি হা হা রিয়াক্ট দিয়েছি৷ এটা কোনো গান হলো? মুরগীর বাচ্চার মতো চিঁ চিঁ করছো৷’
নিযানা গরম চোখে চেয়ে বলল, ‘কলরব। বেশি হচ্ছে কিন্তু।’
কলরব চুপ করে গেল। কাব্য বলল, ‘দেখেছিস? দেখেছিস, মুখের কথা বন্ধ হয়েগেছে। কে জানি বলছিলো, বিয়ের পরেও বউকে ভয় পাবেনা৷ খালি আমিই বউকে ভয় পাই?’
কলরব বলল, ‘হ্যাঁ, তো আমি ভয় পাই নাকি? সম্মান করি৷’

মৌনিতা সাই মিলিয়ে বলল, ‘সেটাই৷ সবাই সবটা বুঝে না ভাইয়া। তুমি এসব মশা মাছির গুনগুনে কান দিও না৷’
নবনী ছেলেকে কোলে নিয়ে এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। একটানা কেঁদেই চলেছে শিশুটি। কান্নার তীব্রতায় কৃষ্ণবর্ণ ছোট্ট শরীরটা ক্রমশ লাল হয়ে উঠেছে। বাচ্চাটার গায়ের রং অবিকল দিব্যর মতো। নবনী মাঝেমধ্যেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার সন্তানের দিকে। একটা সময় এই গায়ের রংটাই তার চোখে ছিল তাচ্ছিল্যের কারণ। অথচ আজ?আজ তার কোলে থাকা এই ছোট্ট শিশুটা, কিংবা একটু দূরে বসে থাকা ওই মানুষটা। দুজনই তার পৃথিবীর সবচেয়ে আপন। কই, এখন তো তাদের অসুন্দর লাগে না! বরং এই রঙের মাঝেই সে খুঁজে পায় প্রশান্তি। দিব্য কলরবদের সঙ্গেই বসে ছিল। বাচ্চাটার একটানা কান্না শুনে সে উদ্বিগ্ন চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘নবনী, ও এত কাঁদছে কেন?’

নবনী অসহায় মুখে মাথা নাড়ল। ‘বুঝতে পারছি না।’
কলরব কিছুক্ষণ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ যেন তার মনে কিছু একটা পড়ে গেল। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট একটি প্যাকেট বের করল সে। তারপর নবনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ভাবি, তোমার জন্য একটা গিফট আছে।’
নবনী অবাক চোখে তাকাল। ‘আমার জন্য গিফট?’
কলরব মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ‘হ্যাঁ। তোমার মনে আছে? তোমার বিয়ের পরের দিন যখন তুমি নিজের হাতে সবার জন্য রান্না করেছিলে, আর সবাই তোমাকে উপহার দিয়েছিল? তখন আমিই শুধু তোমাকে কিছু দিতে পারিনি। বলেছিলাম, নিজের ইনকামের টাকা দিয়ে একদিন তোমাকে কিছু দেব। এই কয়েক মাসে নিজের উপার্জন থেকে একটু একটু করে জমিয়েছি। খুব বড় কিছু না। সামান্য একটা উপহার। তবে এটা আমার নিজের টাকায় কেনা।’
নবনী প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। উপহারের চেয়েও কথাগুলো যেন তার হৃদয়ে গিয়ে লাগল। কলরব মৃদু হেসে বলল,

‘নাও ভাবি। সেদিনের ঋণটা আজ একটু হলেও শোধ করি।’
নবনী এগিয়ে এলো। দিব্য নিজেই উঠে গিয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিল। কলরব ইদানীং বেশ মন দিয়ে কাজ করছে। ব্যস্ততার মাঝেও যেন নিজের দায়িত্বগুলো নিখুঁতভাবে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে। নবনী লাল রঙের বাক্সটা হাতে তুলে নিয়ে খুলতেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল তার । ভেতরে রাখা একটি স্বর্ণের চেইন। সূক্ষ্ম নকশার চেইনটা দেখতে ভীষণ সুন্দর। নবনী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
‘ধন্যবাদ।’
মৌনিতা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘কই, সবাইকে দেখাও।’
নবনী চেইনটা তুলে সবার সামনে ধরল। সবাই প্রশংসা করলো। ততক্ষণে বিকেল নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। তার সোনালি রশ্মিগুলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। সারাদিনের উত্তাপ পেরিয়ে প্রকৃতিও ধীরে ধীরে শীতল হতে শুরু করেছে। বাতাসে সন্ধ্যার আগমনী বার্তা। সবাই গোল হয়ে বাগানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অলেখা আর মাজহা নানা রকম নাস্তা নিয়ে এসে সবার সঙ্গে যোগ দিলেন। কিছুক্ষণ পর আরশাদ তালুকদার আর আফতাব তালুকদারও এসে বসলেন। হঠাৎ দিব্য কলরবের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘কলরব, তোর গিটারটা নিয়ে আয় তো। একটা গান শুনি।’
চমকে উঠল কলরব। বিস্মিত চোখে তাকাল ভাইয়ের দিকে। দিব্য নিজেও কেমন যেন ইতস্তত করছিল। কারণ, সেদিনের পর আরশাদ তালুকদারের সঙ্গে কলরবের আর তেমন কথা হয়নি। শুধু বাবার সঙ্গেই নয়, একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল দিব্য আর কলরবের মাঝেও। কলরব কয়েকবার আড়চোখে আরশাদ তালুকদারের দিকে তাকালো। দুজনের চোখাচোখি হলো। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। প্রথমবারের মতো আরশাদ তালুকদারই চোখ নামিয়ে নিলেন। কলরব নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকায় দিয়া উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠল,
‘চাচ্চু, নিয়ে আসো না!’
কলরব কোনো উত্তর দিল না। অফিসে জয়েন করার পর থেকে গিটারটায় আর হাত দেওয়া হয়নি তার। একসময় যে গিটারটা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী, একজন ভালো ছেলে, ভালো স্বামী আর ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টায় কখন যে নিজের সেই শখটাকেই দূরে সরিয়ে রেখেছে তা আর মনে নেই। কায়েফ ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘নিয়ে আয় যা।’

এর আগেই ইহান উঠে দাঁড়াল। ‘আমি এখনই নিয়ে আসছি।’
ইভান সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘তুই একা যাস না। বাড়িতে এখন কেউ নেই। পরে ভয় পাবি। চল, আমিও তোর সঙ্গে যাই।’
দুই ভাই একসঙ্গে উঠে চলে গেল। কাব্য পাশ ফিরে মৌনিতার দিকে তাকাল। মৌনিতা মৃদু হেসে তাকে আলতো করে চিমটি কেটে বলল,
‘দেখেছো? আমার ছেলে।’
কাব্য সঙ্গে সঙ্গে ভুলটা শুধরে দিল, ‘আমাদের।’
মৌনিতার ঠোঁটের হাসিটা আরও একটু চওড়া হলো। কিছুক্ষণ পর ইহান আর ইভান গিটার নিয়ে ফিরে এলো। দিয়া ছুটে গিয়ে কলরবের কোলে বসে পড়ল। গিটারটা হাতে নিতেই কলরবের আঙুল কেঁপে উঠল। কতদিন পর! এর আগে কতবার এই জিনিসটাকে ছুঁয়েছে সে। কত রাত এর তারে আঙুল চালিয়ে নিজের ভেতরের কথাগুলো সুরে মিশিয়েছে।অথচ আজকের অনুভূতিটা সম্পূর্ণ আলাদা। মনে হলো, পুরোনো কোনো প্রিয় মানুষকে বহুদিন পর ছুঁয়ে দেখছে। আরশাদ তালুকদার কলরবের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
‘বাজাও। ভাঙব না। কী ছাতার মাথা গাও, আমরা একটু শুনি!’
আবারও চমকে উঠল কলরব। শুধু সে নয়, আশপাশের সবাইও বিস্মিত হয়ে তাকালো আরশাদ তালুকদারের দিকে। দিয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
‘পচা কথা কেন বলছো, দাদু? চাচ্চু অনেক ভালো গান করে। কত ভালো গিটার বাজায়! আমাকেও শেখায়। চাচ্চু বেস্ট!’

কলরবের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে। এর আগে কতশত মানুষের সামনে গান গাইতে গিয়েও ওর এতটা আড়ষ্টবোধ হয়নি। চোখ দুটো ও কেমন ছলছল করছে। এখন পানি চলে আসলে সবার সমানে ঝামেলা হয়ে যাবে। কলরব ধীরে ধীরে গিটারের তারের ওপর আঙুল রাখল। চারপাশে সবার মুখে হাসি। কেউ গল্প করছে। কেউ মজা করছে। কেউ আবার অপেক্ষা করছে কলরবের গানের জন্য। একসময় গিটারের তারে সুর উঠল। হাসিঠাট্টায় সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। পশ্চিম আকাশের সূর্যটা ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে। সোনালি আলো মুছে গিয়ে চারপাশে সন্ধ্যার নরম অন্ধকার নামছে। বেলা ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপস্থিত কারও মন খারাপ হচ্ছে না। সব বেলা কি সত্যিই সুন্দর? হয়তো না। তবু পাশে যদি প্রিয় মানুষগুলো থাকে, তবে এই অবেলাটুকুও মন্দ লাগে না।

এই অবেলায় পর্ব ৫৫

আচমকা দিব্যর ফোনো একটা ডেলিভারি ম্যানের কল আসলো। দিব্য সবাইকে বসতে বলে নিজে চলে গেল পার্সেল আনতে। ডেলিভারির ছেলেটা পার্সেল বুঝিয়ে দিয়ে চলেগেল। বিরাট একটা বক্স। দিব্য অবাক হলো। সে তো কিছু অর্ডার করেনি। তাহলে এটা কে দিলো। বক্সটা উল্টেপাল্টে দেখলো ও। এমন সময় দিব্যর ফোনে একটা কল আসলো।
দিব্য রিসিভ করে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে?’
‘আমি! আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? আর আমি কীনা তোর কথা ভেবে এতকিছু করলাম৷ আয়, হায় গুরু। আমি বোধহয় নির্ঘাত পাগল হয়ে যাচ্ছি৷’

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here