মৌটুসী পর্ব ৪২
ঋতস্বিনী মাহবিশ
অন্যমনস্ক চিত্তে হেঁটে হেঁটে বাকি পথটা পার হয়ে এল মৌ। বাড়ির গেট পেরিয়ে উঠনে পা রাখতে না রাখতেই ঘাড় ব্যাগটায় থাকা ফোনটা বেজে উঠল। তার শব্দেই মৌ যেন সম্মোহন কাটিয়ে ফিরল। দাঁড়িয়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে আলিফের নামটা দেখতেই মনে পড়ে গেল, ছটায় আলিফের ট্রিট দেওয়ার কথা ছিল। সাড়ে পাঁচটা পার হয়ে গেছে অলরেডি। সে রিসিভ করে কানে ধরল—
— হ্যালো মৌ?
— বল।
— শোন, চড়ুই পাখিকে নিয়ে আসা যায় না? অনেক দিন দেখা হয়নি।
— না। আজকে না।
— আরে সমস্যা নেই, আমি নাহয় এখন তোদের বাড়ি গিয়ে ওকে নিয়ে আসি। আর তুই সরাসরি অফিস থেকে চলে আয়।
— বললাম তো না!
মৌটুসীর শক্ত কথাতে থতমত খেয়ে গেল আলিফ।
— আচ্ছা, আচ্ছা। অন্য একদিন দেখা করব চড়ুই পাখির সাথে। তুই তাহলে চলে আসিস।
কল কেটে ফোনটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল মৌটুসী। কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বারান্দা থেকে লালবানু বেগমকে ডেকে বলল, সে বাইরে যাচ্ছে, ঘণ্টাখানেক দেরি হবে ফিরতে। তারপর ফের উল্টো ঘুরে বেরিয়ে এল।
অরোরা টু-র বাইরে অপেক্ষা করছিল আলিফ। মৌ আসতেই একসঙ্গে ভেতরে ঢুকে দুজন জানালার পাশের একটা টেবিলে গিয়ে বসল। আশপাশের টেবিলগুলো সব ভর্তি, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। চেয়ার টেনে বসতে বসতেই আলিফ মেনুকানটা হাতে তুলে মৌটুসীর দিকে তাকাল।
— “বল, কী খাবি?”
মৌটুসী কোনো কথা না বলে ডান হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। আলিফ কয়েক সেকেন্ড হাতটার দিকে তাকিয়ে থেকে বিষয়টা বুঝতে পেরে মাথার পেছনটা চুলকে হেসে ফেলল।
— “থাক না, তুই কী খাবি বল, আমি ম্যানেজ করে নেব।”
ছিমছাম মায়াবী মুখের প্রসারিত হাসিটা যে কী সুন্দর! চুলগুলো অগোছালো হয়ে কপাল ঢেকে রেখেছে। ঠোঁট দুটি বাদামী, খসখসে। থেকে থেকে জিহবা ঠেলে ভিজিয়ে নিচ্ছে। মৌটুসী তাকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে হাতটা আরও সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জোরের সঙ্গে বলল—
— “দে তুই আগে।”
আলিফ এবার অসহায় মুখে পকেটে হাত ঢোকাল। তারপর ওয়ালেটটা বের করে মৌটুসীর হাতে দিয়ে দিল। মৌটুসী ওয়ালেট খুলে ভেতরে খুঁজতে লাগল। একটা পাঁচশ টাকার নোট। তার সঙ্গে তিনশ টাকার মতো কিছু খুচরা। আর কিছু নেই। মৌটুসী ঠুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর টাকাগুলো আবার ওয়ালেটের ভেতরে ঢুকিয়ে আলিফের হাতে ধরিয়ে দিল।
— “হ্যাঁ, বুঝেছি।”
তারপর মৌটুসী হাত তুলে ওয়েটারকে ডাকল। ওয়েটার এগিয়ে আসতেই বলল—
— “আমাদের দুইটা স্যান্ডউইচ আর দুইটা কফি দেবেন।”
আলিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— “শুধু স্যান্ডউইচে হবে? আরে, চাইনিজ দিই। তিনশ টাকা করে—হয়ে যাবে।”
মৌটুসী কটমট করে তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি দেখেই বাকি কথাটা গিলে ফেলল আলিফ। তারপর মৌটুসী আবার ওয়েটারের দিকে ফিরে ভদ্রভাবে বলল—
— “আপনি স্যান্ডউইচ আর কফিই কনফার্ম করুন।”
ওয়েটার মাথা নেড়ে চলে যেতেই মৌটুসী টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল—
— “হ্যাঁ, আজকে আটশ টাকা দিয়ে আমাকে ট্রিট দিবি। তারপর বাকি মাস আবার আমার কাছ থেকেই ধার নিয়ে চলবি। শোন, তোকে আর এক পয়সাও ধার দিতে পারব না আমি।”
আলিফ আলতো হেসে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিল।
— “হিসাব করে রাখ। প্রথম বেতন হাতে পেলেই আগে তোর সব টাকা পরিশোধ করে দেব।”
মৌটুসী মুখ ভেঙচিয়ে বলল—
— “হুম আসছে আমার চাকুরিজীবী! এই যাবৎ তুই আমার থেকে যত টাকা ধার নিয়েছিস, তা হিসাব করতে গেলে তোর একমাসের বেতনের দ্বিগুণ হবে। তার ওপর বেতন হাতে পেতে এখনো দুই তিন মাস। এর মাঝেই যে কয়বার হাত পাতবি তারও ঠিক নাই।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার চলে এল। দুজনেই স্বাভাবিকভাবে খেতে খেতে নানা কথা নিয়ে গল্প করতে লাগল। তারই একপর্যায়ে হঠাৎ আলিফ কেমন করে ডেকে উঠল—
— “মৌ।”
মৌটুসী কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকাল।
— “হুম?”
আলিফ হালকা কেশে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিল। এরপর বলল—
— “আমার জয়েনিংয়ের প্রথম মাস থেকেই পঞ্চাশ হাজার টাকা স্যালারি।”
মৌটুসী খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা নেড়ে বলল—
— “হুম, ভালো তো।”
আলিফ কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
— “দেখ, দিব্যি চলে যাবে আমাদের।”
মৌটুসী থমকাল। সন্দिহান চোখে তাকাল আলিফের দিকে।
— “প্লিজ, মৌ… আমার কাছে চলে আয়। তুই, আমি, চড়ুই পাখি। আমরা তিনজন একসাথে অনেক ভালো থাকব…. প্লিজ।”
মৌটুসী অপলক সরু চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। এরপর থমথমে কণ্ঠে বলল—
— “তুই কি আমাকে বিভ্রান্ত করতে ডেকেছিস এখানে?”
— “না, আমার ভালোবাসার কথা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে ডেকেছি।”
মৌটুসী কিছুক্ষণ আলিফের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে দৃষ্টি নামিয়ে আনল টেবিলের ওপর।
আর কিছুদিন আগেও আলিফ যদি এভাবে আবার তাকে ভালোবাসার কথা বলত, মৌটুসী হয়তো এতক্ষণে ইচ্ছেমতো ঝেড়ে দিত। বারবার একই ভুল করার জন্য রাগারাগি করত। খুব অভিমান করত। কিন্তু আজ… আজ কেন যেন তা পারছে না। কারণ, ভালোবাসা নামের এই অদ্ভুত অনুভূতিটার সঙ্গে আজ সে নিজেও পরিচিত। এমন এক জালে অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছে, যার টান থেকে মুক্ত হওয়ার কথা ভাবলেও বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। তাই আলিফের চোখের ভেতরের অপেক্ষাটুকু আজ আর তার কাছে হাস্যকর, ছেলেমানুষী লাগল না। বরং বুকের কোথাও মৃদু একটা ব্যথা অনুভব করল। ভালোবাসা তো দোষের কিছু নয়। তবু কখনো কখনো ভুল মানুষকে ভালোবেসে মানুষ অজান্তেই দোষী হয়ে যায়। আর তাদের চাইতে হতভাগা পৃথিবীতে দুটো নেই।
মৌ কিছুই বলল না। একেবারে নির্লিপ্ত মুখে খেতে লাগল। আলিফ কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ডাকল—
— “মৌ… কিছু বলবি না?”
মৌটুসী খাওয়া থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড প্লেটের দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মুখ তুলে আলিফের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে রাগের ছিটেফোঁটাও নেই, বরং একরাশ গভীর অসহায়ত্ব। কারণ আজ, প্রথমবারের মতো, ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়টা সে নিজেও বুঝতে পারছে।
— “কী বলব, আলিফ? একই কথা আর কতবার বলব তোকে? আমি তোকে ভালোবাসি না। কখনোই ভালোবাসিনি, বাসতে পারিনি। ভালোবাসা কি জোর করে হয়? এখন কি নিজের প্রতি জুলুম করতে বলছিস আমায়?”
আলিফ ধীর গলায় বলল—
— “না।”
— “তাহলে বারবার একই জায়গায় এসে দাঁড়াস কেন? প্রতিবার তোর চোখের দিকে তাকিয়ে আমাকে একই কথা বলতে খারাপ লাগে আমার। যখনই আমি আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে দেখতে চাই, তখনই তুই পরিস্থিতি বিগড়ে দিস। জানিস, অতীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে হয়তো আমি তোর সঙ্গে বন্ধুত্বটাই করতাম না। আমাদের বন্ধুত্বটা সুন্দর ছিল। কিন্তু আমি জানতাম না, একদিন সেই বন্ধুত্বের বোঝা এত ভারী হয়ে যাবে। আমাকে অপরাধী করে তুলছিস তুই।”
একটু থেমে এবার একটু নরম হয়ে এল মৌটুসী—
— “ঘোর থেকে বেরিয়ে আয় আলিফ, তাকিয়ে দেখ, আমার মতো হাজার হাজার মেয়ে আছে বাংলাদেশে। একটু চেষ্টা করলেই ভালোবাসার অভাব হবে না তোর জীবনে। ভেবে দেখ, তোকেও যখন কেউ তোর মতো করেই তীব্রভাবে ভালোবাসবে তখন তোর পৃথিবীটা কেমন হবে! আমি একজন মেয়ের আগে একজন মা। তাই আমাকে সব সিদ্ধান্ত একজন মায়ের মতোই নিতে হয়। কী করলে আমার সন্তানেরা সর্বোচ্চ ভালো থাকবে সেটাই করতে হয়। তাই প্লিজ তুই আমার মায়া থেকে বেরিয়ে আয়, আলিফ। দোহাই লাগে। জানি কষ্ট হবে, সাধ্য থাকলে ম্যাজিকের মতোই তোর সেই কষ্টগুলো ভ্যানিস করে দিতাম। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো আমরা সব করতে পারি না, তাই না?”
আলিফ মাথাটা সামান্য নুইয়ে বসে আছে। কথাগুলো তার কাছে নতুন নয়, তবু প্রতিবারই যেন নতুন করে কোথাও আঘাত করে। ভালোবাসার দেশে সে অসহায়, যে অনেক চেষ্টা করেও নিজের হৃদয়কে বোঝাতে পারেনি—এই মানুষটা তার জন্য নয়। কিছুক্ষণ একই ভাবে বসে থাকার পর আলিফ ধীরে ধীরে মাথা তুলে মৌটুসীর দিকে তাকাল। কী করুণ সেই দৃষ্টি! ধীর কণ্ঠে বলল—
— “কী করলে তোর কঠিন হৃদয়ে আমার ভালোবাসার একটু সুবাস ছড়িয়ে দিতে পারব মৌ?”
মৌটুসী গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিল বুকের ভেতর। তারপর অসহায় গলায় বলল—
— “আমার হৃদয় বাগান নয়, আলিফ। ইচ্ছে করলেই সেখানে সবার ভালোবাসার ফুল ফুটিয়ে সুবাস ছড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেখানে সম্পূর্ণ সয়ংক্রিয়ভাবে একটিই ফুল ফুটেছে, আর তার সুবাসেই আমাদের হৃদয় কানায় কানায় আচ্ছন্ন।”
মৌটুসীর শেষ কথাটা শুনে আলিফের চিত্ত যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চোখের দৃষ্টি বদলে গেল তার। তার মানে? এতদিন যে হৃদয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সে একটুখানি জায়গার আশায় ছিল, যেখানে তার শত চেষ্টা পৌঁছাতে পারেনি—সেখানে কি এরই মধ্যে অন্য কেউ নিজের জায়গা করে নিয়েছে? কে সেই মানুষ? কোন ভাগ্যবান পুরুষ এত সহজে পেয়ে গেল সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত অনুভূতি? অজানা এক আশঙ্কায় তার বুকটা কেমন হু-হু করে উঠল।
আলিফ একটু সোজা হয়ে বসল। গলায় চাপা উত্তেজনা, বিস্ময় আর ভয় একসঙ্গে মিশে গেল।
— “মৌ… তুই? মানে কী মৌ?”
আলিফের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মৌটুসী ধীরে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটা কাঁধে তুলে আলিফের দিকে তাকাল। এরপর দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে বন্ধুর অগোছালো চুলে ডান হাতটা ঢুবিয়ে দিল। মৌটুসীর আলতো স্পর্শে আলিফ মাথা তুলে তাকাল ওর চোখের দিকে। মৌটুসী ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বুঝানোর স্বরে বলল—
— “তুই খারাপ বলে আমি তোকে ভালোবাসি না—তা নয় আলিফ। বরং তুই খুবই ভালো প্রেমিক। শুধু… আমার তোকে ভালোবাসা হয়ে ওঠেনি। এটা আমার ব্যর্থতা। আমাদের বন্ধুত্বটা যদি বাঁচিয়ে রাখতে পারিস, আমি খুব খুব খুশি হব। আর যদি তোর জন্য সেটা সম্ভব না হয়, তাহলেও আমি তোকে দোষ দেব না। কিন্তু নিজেকে কষ্ট দিয়ে, আমাকে পাওয়ার আশায় জীবনটা আটকে রাখিস না প্লিজ।”
আলিফ আর কিছু বলতে পারল না। কেবল চুপ করে তার দিকে তাকিয়েই রইল। মৌটুসী মৃদু হেসে বলল—
— “আসছি বাই। হ্যাপি নিউ জার্নি।”
বলেই সে আর দাঁড়াল না। ধীর পায়ে টেবিলের পাশ কাটিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পথ ধরে এগিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে তার ঘিয়ে ফতুয়া আর প্রিন্টের স্কার্ট পরা অবয়বটা দূরে সরে যেতে লাগল। স্থির হয়ে বসে মৌটুসীর চলে যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আলিফ। সে কি আরেকটিবার পিছু ডাকতে পারে না? না, পারে না, ফেরারি পাখিকে পিছু ডাকা যায় না। অবয়বটা হারিয়ে যেতেই অসহায় আলিফ ঠোঁটের কোণে বিষণ্নমাখা পরাজয়ের একটা হাসি টেনে নিজের মনেই খুব আস্তে বলল—
— “তুই বন্ধু নিঠুর মনোহর। তোর থেকে দূরে যাওয়ার সাধ্য নাই, আবার তোকে নিজের করে পাওয়ারও ভাগ্য নাই। আল্লাহ আমারে এত অসহায় বানাইল ক্যান মৌ?”
এরপর পরই হঠাৎ টেবিলের ওপর কনুই ঠেকিয়ে দুই হাতে মাথার চুলগুলো খামচে ধরল আলিফ। সঙ্গে সঙ্গে ডান চোখ বেয়ে টুপটুপ করে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল টেবিলের ওপর। তার মনের কোথাও নিভু নিভু জ্বলতে থাকা আশার শেষ প্রদীপটাও আজ নিভে গেল। একটুকরো আশা ছিল, বেকারত্ব ঘুচে একটা ভালো চাকরি নিয়ে মেয়েটার সামনে দাঁড়ালে হয়তো তাকে ফিরিয়ে দেবে না। এইজন্য কয়েকটা মাস সে দিনরাত এক করে পড়াশোনায় মত্ত থেকেছে, বলতে গেলে এই চাকরিটা পাওয়ার পেছনে তার থেকেও বড় অবদান মৌটুসীর, তাকে পাওয়ার তীব্র লোভ আলিফকে কেবল একটা চাকরি পাইয়ে দিয়েছে, তাকে নয়।
অথচ তার পোড়া কপাল বড্ড দেরি করে ফেলল। সে এতদিন তালাবন্ধ দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে চাবি খুঁজতেই ব্যস্ত ছিল। অথচ তার চাবি খোঁজার এই দীর্ঘ সময়ের মাঝেই কেউ একজন সেই দরজা ভেঙে অনেক আগেই ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এই আফসোস বানী সে কাকে শোনাবে? বুকের অপূরনীয় ক্ষতটুকু সে কাকে দেখাবে?
পাশের টেবিলে বসে থাকা এক মধ্যবয়স্ক দম্পত্তি দেখে গেল এক অসহায় প্রেমিকের এই নীরব হাহাকার। তাদের নিজেদের মধ্যে ফিসফিসে আফসোস ও সমবেদনা সূচক দুটো আলোচনাও হলো বটে।
এমন সময় হঠাৎই রেস্টুরেন্টের একেবারে কোনের এক টেবিল থেকে গিটার হাতে কয়েকজন তরুন কী এক নিদারুণ করুন স্বরে গেয়ে উঠল…
বোঝে না সে বোঝে না,
সে তো আজও বোঝে না।
কাঁদে মনের কথা,
প্রেম কি শুধু ব্যথা
উত্তর আজও মেলে না……
রাত গভীর। ঘরের এক কোণে জ্বলছে ছোট্ট একটা নাইট ল্যাম্প। তার ম্লান হলদে আলোয় পুরো ঘরটা অর্ধেক আলোকিত, অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। বাইরে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। জানালার ফাঁক গলে আসা রাতের বাতাসে পর্দার মৃদু নড়ছে।
বিছানার একপাশে গুটিশুটি মেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন চড়ুই আর বীর। দুজনের ঘুমের ভঙ্গিও প্রায় একই রকম। বীর তার ছোট্ট এক হাত চড়ুইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রেখেছে, আর চড়ুই ঘুমের মধ্যেই সেই হাতটা বুকের কাছে আগলে নিয়ে আছে। ছোট ছোট মুখ দুটো শান্ত। নির্ভার। বুক দুটো মৃদু ছন্দে ওঠানামা করছে।
অন্যদিকে তাদের আদর্শ, দায়িত্বশীল, মমতাময়ী মাম্মা! ঘুমানোর আগে যিনি দুজনকে পরম যত্নে বুকে জড়িয়ে শুইয়েছিলেন, ঘুমিয়ে পড়ার পর সেই মাতৃসত্তার লেশমাত্রও যেন আর অবশিষ্ট নেই। সে উপুড় হয়ে পুরো বিছানা জুড়ে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। একটা হাত বালিশের নিচে ঢুকে গেছে, অন্য হাতটা বিছানা থেকে ঝুলে আছে। একটা পা বাঁকা হয়ে পড়ে আছে আর আরেক পা লম্বা করে কম্বলের ওপর তুলে রাখা। মাথাটা বালিশের থেকে এক বিঘৎ দূরে বেডশিটের সঙ্গে লেপ্টে আছে। ঠোঁট দুটি অল্প ফাঁক, সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালার সূক্ষ্ম ধারা। মুখে রাজ্যের প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই।
হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বালিশের পাশের ফোনটা বেজে উঠল। ঘুমন্ত মৌটুসী প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাল না, বরং আচ্ছন্ন সে শুনতেই পেল না। গভীর ঘুমে সে তখনও উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ফোনটা একটানা কেঁপেই চলল। দ্বিতীয়বার রিং হতেই ভ্রূ দুটি হালকা কুঁচকে উঠল তার। মুখটা বিরক্তিতে বিকৃত করে একটু নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু চোখ দুটো খোলারও প্রয়োজন বোধ করল না। সেই আধো ঘুমের ঘোরেই এক হাতে বালিশের পাশটা হাতড়ে হাতড়ে ফোন খুঁজতে লাগল। কয়েকবার হাত এদিক-ওদিক ঘুরে অবশেষে ফোনটার নাগাল পেল। চোখ না খুলেই স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানের কাছে তুলল। একেবারে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে টেনে বলল—
— “উমম-হ্যালোওও…..”
ঘুমের ভারে নরম হয়ে যাওয়া মৌটুসীর কণ্ঠটা এতটাই মোলায়েম ও আবেদনময়ী শোনাল যে ওপাশে বোরাক কয়েক সেকেন্ড একেবারে স্থির হয়ে গেল। সবে গোসল সেরে বেরিয়েছে সে। এক হাতে ফোন, অন্য হাতে তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছছিল। কিন্তু ওপার থেকে ভেসে আসা একটি মাত্র শব্দই যেন তার সমস্ত কাজের গতিই থামিয়ে দিল। তোয়ালেটা মাথা থেকে নামিয়ে একপাশে ছুড়ে দিল। তারপর পাশের সোফাটাতে গা এলিয়ে দিল। সোফার হাতলের ওপর মাথা ঠেকিয়ে ভেজা চুলে অন্যমনস্কভাবে আঙুল চালাতে চালাতে হিসহিসানো ভারী কণ্ঠে বলল—
— “কণ্ঠে মাদক মিশিয়েছ তুমি, আর মাতাল হচ্ছি আমি—একি অবস্থা বলো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। মৌটুসী বোরাকের কথাটার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করল বটে, কিন্তু ঘুমে আচ্ছন্ন মস্তিষ্কে কথাগুলো যেন ঠিকমতো পৌঁছালই না। চোখ দুটো তখনো বন্ধ। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা লালাটুকু মুছে নিয়ে বলল—
— “কিসের মাদক?”
তারপর হঠাৎ যেন ভয়ংকর কোনো কথা মনে পড়েছে এমন স্বরে বলল—
— “আপনি মাদক খেয়েছেন?”
বোরাকের ভ্রূ কুঁচকে এল। সে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আবার ঘুমজড়ানো আহ্লাদী কণ্ঠে বিড়বিড় করে ভেসে এল—
— “তার মানে আপনি মদ খান, হু? মদ খেয়ে এসে বউ পেটান? আআআআ……”
বোরাক বিস্ময়ে চুপ। কী আবোলতাবোল বকছে এই মেয়ে? ধুর! মুডটাই নষ্ট করে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল—
— “আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। তোমার ঘুম এখনো ভাঙেনি। ঘুমাও তুমি। রাখি, বাই।”
’রাখি, বাই’ শব্দটা শুনতেই ওপাশ থেকে যেন আচমকাই ঘুম উড়ে গেল মৌটুসীর। তড়াক করে বলে উঠল—
— “না, রাখবেন না!”
বোরাকের গম্ভীর মুখে হাসি ফুটল এবারে। ভ্রূ নাচিয়ে বলল—
— “ওহ্! তাহলে ঘুম ভাঙল ম্যাডামের?”
মৌটুসী এবারও চোখ খুলল না। শুধু বালিশটা টেনে নিয়ে গালের ওপর চেপে ধরে বলল—
— “হুম…।”
— “আচ্ছা। তাহলে যাও আগে চোখে-মুখে পানি দিয়ে আসো। আমি লাইনেই আছি।”
— “ওকে। যাবেন না কিন্তু, আসছি আমি।”
বোরাকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
— “কোথায় যাব? যাও তুমি।”
মৌটুসী এবার ফোনটা বিছানার ওপর রেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের দুপাশে নেমে এসেছে। কয়েক মুহূর্ত স্থির বসে থেকে লম্বা একটা হাই তুলল, তারপর চোখ তুলে বিছানার দিকে তাকাল। পুচকো দুটো নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। মৌটুসী হাত বাড়িয়ে দেখল, শরীর মৃদু ঠান্ডা। অগত্যা সে নকশিকাঁথাটার ভাজটা খুলে দুজনকে ঢেকে দিল। এরপর বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে রুমে ফিরে এল মৌ। চুলগুলো আঙুল দিয়ে মোটামুটি গুছিয়ে একটা কুশন বুকে জড়িয়ে সোফায় এসে আরাম করে বসল। বোরাক এখনো কলেই আছে। সে বলল—
— “হ্যালো?”
ওপাশ থেকে একটু সময় নিয়ে বোরাকের কথা ভেসে এল—
— “ফিরেছ?”
মৌটুসী কুশনের ওপর থুতনি রেখে বলল—
— “হুম। তারপর বলুন, ফিরলেন কখন?”
— “এই তো, আধা ঘণ্টা খানেক হবে।”
— “খেয়েছেন?”
— “হুম, খেয়েই এসেছি।”
মৌটুসী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “আমি বুঝি না, রাতের বেলাতেও আপনাদের এত কিসের কাজ থাকে?”
— “তোমরা বুঝবেও না। পাও তো মাস গেলেই টাকা। আমাদের প্যারা কী আর বুঝবে?”
মৌটুসী মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
— “হু! মনে হচ্ছে এমনি এমনি দয়া করে টাকা দেন আমাদের? নেন তো গাধার মতো খাটিয়ে। তাও শ্রম সাপেক্ষে ন্যায্য মজুরি দেন না। আপনাদের নামে তো মামলা ঠুকে দেওয়া উচিত।”
— “আচ্ছা দিও, তাও সেই অছিলায় তারিখে তারিখে নিয়মিত তোমার আর আমার দেখা হবে কোর্টচত্বরে!”
এভাবেই চলতে থাকল মাঝরাতের আলাপচারিতা। গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়, আবার প্রেমালাপও নয়—অনর্থক, যুক্তিহীন, বেপরোয়া সব কথা। ঠিক যেমন মা-বাবার ছায়াতল থেকে সামান্য একটু বাইরে বেরোনোর সুযোগ পেলে কিশোর-কিশোরীরা কোনো কারণ ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যায়; কথা শেষ হয়ে গেলেও ফোন রাখার কারণ খুঁজে পায় না। এভাবেই একসময় প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। অথচ তাদের কারোরই যেন সে খেয়াল নেই।
ঘড়ির কাটায় যখন পুরো তিনটার ঘরে, বোরাক বলল—
— “আচ্ছা, মৌটুসী পাখি ঘুমাও তাহলে এখন। ঘুম কম হলে তোমার ওই সুন্দর চোখ দুটোর নিচে ডার্কসার্কেল পড়ে যাবে।”
মৌটুসীর বলতে ইচ্ছে করল—
— “না রাখবেন, আরেকটু কথা বলি। মন ভরে নি আমার। আমি তৃষ্ণার্থ।আকন্ঠ পান করতে দিন।”
কিন্তু কথাগুলো ঠোঁট পর্যন্ত এসেও আর বেরোল না। পরিবর্তে বলল—
— “আচ্ছা। আপনিও শুয়ে পড়ুন।”
— “হুম। রাখলাম, বাই।”
— “বাই।”
কল কেটে গেল। মৌটুসী ফোন নামিয়ে সোফার ওপর আধশোয়া অবস্থাতেই চোখ বুজে নিল। মিনিট তিনেকও পেরোয়নি, ফোনে টুং করে শব্দ হলো। বোরাক একটা অডিও শেয়ার করেছে। তার নিচে ছোট করে লিখেছে—
“গানটা সুন্দর, শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাও। Have sweet dreams!”
মৌটুসী উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে ইয়ারফোনটা খুঁজে বের করল। তারপর আবার সোফায় বসে দ্রুত ইয়ারফোনটা লাগিয়ে অডিওটা প্লে করল। নরম সুরের সঙ্গে ভেসে এল—
“এই পাঁজর ভরা ভালোবাসা দুহাত ভরে নাও,
এই আধো আধো আলো-ছায়া দুচোখ ভরে নাও,
এই আমায় কিছু দাও বা না দাও নিজের করে নাও।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে,
দুমুঠো আদর ভিক্ষে চেয়েছি দরিদ্র এই দেশে।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে…”
মৌটুসী কুশনটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে চোখ বুজল। একবার না, বারবার শুনল অডিওটা। সুরটা বোরাকের নয়, সে শুধু শেয়ার করেছে। তবুও মৌটুসীর মন ভালো লাগার জোয়ারে ভাসছে। গানের কথাগুলো এত মুগ্ধকর, আবার যদি সেগুলো প্রিয় মানুষটার পক্ষ থেকে আসে, তাহলে তো সেই ভালোলাগার সীমা পেরিয়ে যাবেই!
হঠাৎ থমকে বিছানার দিকে তাকাল মৌটুসী। বীরের ছোট্ট শরীরটা ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। খ্যানখ্যন করে পাপাকে ডাকছে সে। মৌটুসী মুহূর্তেই ইয়ারফোনটা টান দিয়ে কান থেকে খুলে দৌড় দিল। বিছানায় উঠে ছেলের পাশে আধশোয়া হয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে নিল—
— “এই যে বাবা। মাম্মা আছি। আছি তো! ঘুমাও বাবা। আমার লক্ষ্মীটি!”
মায়ের শরীরের পরিচিত উষ্ণতা পেতেই বীরের খ্যানখ্যন করা আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। পিটপিট করে অল্প চেয়ে ডাকল—
— “মাম…..”
— “হ্যাঁ বাবা আমার, মাম্মা আছি। তুমি ঘুমাও।”
আবারও নিশ্চিন্তে চোখ বুজে নিল বীর। ছোট্ট হাতটা মৌটুসীর বুকের কাছের জামাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। মৌটুসী একহাতে ওকে আগলে রেখে অন্য হাতটা মাথায় ধীরে ধীরে বুলিয়ে দিতে লাগল। বীরও ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। মৌটুসী একধ্যানে ছেলের ঘুমন্ত মুখের পানে চেয়ে রইল। পুরোই বোরাক শিকদারের মিনি ভার্সন—নাক, ঠোঁট, থুতনি, চোখ প্রত্যেকটা কপি করে বসানো যেন। শুধু এখানে নিষ্পাপ ভাবটা বেশি। সঙ্গে ওভারডোজ মায়া ঢেলে দিয়ে রেখেছে আল্লাহ! দেখলেই অন্তর ছেয়ে যায়, পাগল পাগল লাগে যখন মায়াবী স্বরে মিষ্টি করে তাকে মাম্মা ডাকে। মৌটুসী ছেলের ঠোঁটের ওপর দীর্ঘ চুমু এঁকে চড়ুইয়ের দিকে চাইল। তার মেয়েটার ঘুমও ঠিক তার মতোই গভীর। একবার যে ঘুমাবে, সারারাত আর ওঠার নামগন্ধ নেই। পৃথিবী উল্টে গেলেও বোধহয় তার ঘুম ভাঙবে না। মৌটুসী মুচকি হেঁসে হাত বাড়িয়ে মেয়ের ঘুমন্ত গাল আলতো ছুঁয়ে দিল।
মৌটুসী পর্ব ৪১
মাতৃত্বের অনুভূতি সবচেয়ে সেরা, কারো সঙ্গে এর তুলনা হয় না। সন্তানদের মুখের দিকে তাকলে পৃথিবীর অন্যসকল সুখ ফিকে মনে হয়। আল্লাহ তাকে দুটো অনন্য নেয়ামত দিয়েছেন। তারা তার গর্ভে জন্ম নেওয়া না হলেও, বুকের গভীরে জন্ম নেওয়া দুটো প্রাণ।
মৌটুসী আনমনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তার পাশের একটুকরো ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকাল। এই জায়গাটা বোরাক শিকদারের দ্বারা পূর্ণ হলে মন্দ হয় না, বরং মৌটুসীর পৃথিবীটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।
