ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৯
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়তা। তার পেছনে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পেছনের বিশাল শিকদার বাড়ি। গুমোট আবহাওয়ায় চারপাশটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে পুকুরের পানে তাকিয়ে রইলো প্রিয়তা। পুকুরের কালচে জল একটু পর পর রহস্যময় ভঙ্গিতে নড়ে উঠছে। বাতাসে আর্দ্রতা না থাকায় ভ্যাপসা গরম আর চাপা উৎকণ্ঠা চারপাশটাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছে।
— “আমাকে ডেকেছিলেন ছোট আপামনি?”
— “হ্যাঁ!”
ছোট্ট উত্তর প্রিয়তার। কণ্ঠের শীতলতা চারপাশের গরম হাওয়াকেও যেন জমিয়ে দেয়।
— “জ্বী বলুন।”
প্রিয়তা পাশ ফিরে মুখোমুখি হলো রহমান চাচার। সরাসরি তাকালো বৃদ্ধ মানুষটির চোখের দিকে। একদম চুপ করে থাকলো দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড। মুখের সামান্য কোনো অভিব্যক্তিও পাল্টালো না।
প্রিয়তার এমন আজব চাহুনি দেখে রহমান চাচা রীতিমতো ভড়কে গেলেন। চাকর হয়ে মালকিনের চোখে চোখ মেলানোটা বেমানান, এমন দৃষ্টতা তিনি কদাপি করতে চান না—এই ভেবে নিজের মাথাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নত করে নিলেন। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামের ফোঁটাটা টপ করে খসে পড়ল সিঁড়ির ওপর।
এই বাড়ির প্রতিটি সন্তানকে জন্ম থেকে একটু একটু করে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন তিনি; সবার নাড়ি-নক্ষত্র তার মুখস্থ। তাই বাড়ির সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল সদস্যটির এমন ভরাট, অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টি তাকে ভীষণভাবে অপ্রস্তুত ও আতঙ্কিত করে তুলছে।
— “আপনি এই বাড়িতে কত বছর কাজ করেন রহমান চাচা?”
আচমকা প্রশ্নটা ছুড়ে দিল প্রিয়তা। পুকুরের পানির কোথাও যেন একটা মৃদু শব্দ হলো, কিন্তু সেদিকে কারো নজর নেই।
রহমান আলী মাথা তুললেন না, নিচু কণ্ঠে জবাব দিলেন—
— “জ্বী ৪৫-৪৬ বছর হবে হয়তো আপামনি, ঠিক খেয়াল নাই।”
— “আচ্ছা, আপনি তো অনেক বছর ধরে কাজ করছেন আমাদের বাড়িতে। তাহলে আমাদের পরিবারের অন্ধকার অধ্যায়গুলো কি আপনার অজানা? নিশ্চয়ই আমার বাপ-চাচাদের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানেন আপনি?”
কোনো রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন প্রিয়তার। রমণীর কণ্ঠস্বর অসম্ভব শান্ত, কিন্তু এই শান্ত স্বরই সামনের মানুষটির হাড় কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হঠাৎ করা এই প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলেন রহমান আলী। ভয়ার্ত চোখে তাকালেন প্রিয়তার দিকে, অতঃপর ভীতিগ্রস্ত চিত্তে দ্রুত চারপাশে একবার নজর বুলালেন। এসব কথা অন্য কেউ শুনে ফেললে আজকেই হয়তো তার শেষ দিন হবে—এই ভয়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। চাপা কণ্ঠে আমতা আমতা করে বললেন—
— “এই সব কী কথা বলেন আপামনি! আপনাদের মতো প্রভাবশালী পরিবারের নিকট আমাদের মতো তুচ্ছ মানুষদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। আপনারা গরিবদের সমাজের কীটপতঙ্গ মনে করেন। এ সব প্রভাবশালী মানুষদের কাজ নিয়ে আলোচনা করা কি আমার শোভা পায়?”
— “আপনি তো জানেন তারা খারাপ, তারপরেও আপনি কী তাদের অনুগত?”
— “জ্বী আপামনি, তাদের নুন খেয়েছি। চাইলেও বেঈমানি করতে পারব না।”
— “তাহলে এত বড় একটা কথা গোপন করলেন কেন?”
— “মানে?”
— “একদম নাদান সাজার চেষ্টা করবেন না রহমান চাচা, আপনি সব জানেন। আপনি সেদিনটার একমাত্র সাক্ষী, আপনি নিজের চোখে সব দেখেছেন!”
কথা বলতে বলতে প্রিয়তার মুখাবয়ব আরও কঠিন হতে শুরু করল। তার চোখের মণি দুটো যেন কুঁচকে একাকার হয়ে গেছে।
প্রিয়তার কথার ধার দেখে রহমান আলী থতমত খেলেন। না চাইতেও তার মুখের আদলে আতঙ্ক স্পষ্ট ফুটে উঠতে লাগল। আগের প্রিয়তা হলে হয়তো এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটুকু তার নজরেই পড়ত না, কিন্তু এখন সময় বদলেছে—মেয়েটি আর আগের মতো নেই।
চেহারা আরও থমথমে করে কণ্ঠের গাম্ভীর্য পুরোপুরি বজায় রেখে ফের প্রশ্ন ছুড়ে দিল প্রিয়তা—
— “আপনার চোখ-মুখ আপনাকে নির্দোষ বলছে না রহমান চাচা! আমি আপনাকে ছোট থেকে দেখেছি, কখনো কাজের লোক মনে করিনি; নিজের আপন ভেবেছি, পরিবারের একজন ভেবেছি। তাই এখনো খুব ভালোমতো জিজ্ঞেস করছি—কাদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন আপনি? সেদিন কারা এসেছিল বাড়িতে?”
আতঙ্কে কাচুমাচু হয়ে সিঁড়ির রেলিংটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন রহমান আলী। প্রিয়তার কণ্ঠে এমন এক অচেনা পাথুরে দৃঢ়তা ছিল, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। রহমান আলীও আর পেরে উঠলেন না।
— “কোন দিন?”
— “ওই যে সেদিন… যেদিন বড় আব্বু, বড় আম্মু, ভাইয়া, ভাবি—কেউ বাসায় ছিল না। ১৩ আগস্ট। পুরো বাড়ি ফাঁকা, থমথমে। সব কাজের লোক ছুটিতে, একমাত্র কেয়ারটেকার হিসেবে আপনি একা ছিলেন ওই দিন। আমাদের বাড়িতে কারা এসেছিল? কেন এসেছিল? কী করেছে? সবটা আপনি জানেন।”
রহমান আলী ভয় পেলেন ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়ানো বছর বিশেকের এই তরুণীর দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। চিরচেনা আদরের মেয়েটাকে আজ বড্ড অচেনা ঠেকছে তার কাছে।
— “বলুন চাচা!”
আর লুকিয়ে থাকতে পারলেন না রহমান আলী। মনের কোণে শুধু এইটুকু বিশ্বাস টিকিয়ে রাখলেন যে, এই মেয়েটি আর যাই হোক, তাকে প্রাণে মারবে না।
অবশেষে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন রহমান আলী। চোরা চোখে চারপাশটা আরও একবার ভালোমতো দেখে নিলেন। দম আটকে থাকা কণ্ঠে, ফিসফিস করে বললেন—
— “জ্বী আপামনি, আপনি ঠিকই জানেন… সেদিন অনেক মানুষ এসেছিল।”
— “কত জন?”
— “প্রায় পনেরো-বিশ জন তো হবেই! সেদিন এত অচেনা মানুষকে হুট করে একসঙ্গে দেখে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম, আপামনি।”
— “সবাই অচেনা ছিল?”
ভয়ংকর শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল প্রিয়তা।
রহমান আলী পুরোপুরি চুপ হয়ে গেলেন। তার কপাল বেয়ে লবণাক্ত জলের এক ফোঁটা টপ করে গড়িয়ে পড়ল পুরোনো প্লাস্টার খসা সিঁড়িতে।
তিনি ভয়ার্ত চোখে মাথা তুলে একবার তাকালেন প্রিয়তার দিকে। মেয়েটার চোখ জোড়া শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত রূপের গভীরেই যেন লুকিয়ে আছে হাড় কাঁপানোর মতো এক ঝড়।
রহমান আলী মিনমিন কণ্ঠে জবাব দিলেন—
— “সবাই অপরিচিত ছিল না, আপামনি।”
— “কয়জনকে চিনতেন?”
— “দুই জন।”
— “ওই পনেরো জনের সকলেই কি ডুবুরি ছিল, তাই না চাচা?”
— “জ্বী আপামনি… তারা প্রত্যেকেই দক্ষ ডুবুরি ছিল। এসেই এই পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পুরো পুকুরে তোলপাড় চালিয়ে খোঁজাখুঁজি করেছে প্রায় চার ঘণ্টা! তার পরে… কী যেন একটা ভারী জিনিস তারা পেয়েছিল।”
— “ওই দু’জন ব্যতীত আর এমন কেউ ছিল, যাকে আপনি চিনতেন?”
— “না, আপামনি। তবে…”
— “তবে? তবে কী?”
— “তবে ওই দু’জনের সাথে আরও একজন ছিল, যে ডুবুরি ছিল না… বড় পদের কেউ একজন হবে।”
— “আচ্ছা… ওই দু’জন কি সেই দু’জন, যারা আমাদের বাড়ির নতুন বন্ধু, নতুন সদস্য?”
রহমান আলী আর কথা বাড়াতে পারলেন না। শুধু ওপর-নিচ মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে প্রিয়তার চোখের মণিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। ঘাড় আর কপালের রগগুলো ফুলে ফেঁপে উঠল। তার দুই হাত আপনাআপনি শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল—নখগুলো হাতের তালুতে বসে গেল প্রায়।
— “আপনি চুপ ছিলেন কেন?”
— “আমাকে ওই আপামনি হুমকি দিয়েছে… আমি যদি কাউকে কিচ্ছুটি মুখ ফুটে বলি, তাহলে নাকি আমাকে পাকাপাকিভাবে অন্ধকার কোনো গরদের ভেতরে কাটাতে হবে!”
— “আপনি যান চাচা।”
রহমান আলী হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রিয়তার এই ভয়ংকর রূপ দেখে আর সাহস পেলেন না। সুরসুর করে মাথা নিচু করে সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন তিনি। পুকুরের কালচে জলটা তখনো কেমন যেন এক রহস্য নিয়ে ছলাকলা শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
শিকদার বাড়ির পরিবেশ গুমোট, থমথমে। কোণে কোণে ভূতুড়ে নিরবতা বিরাজমান। বাড়িটা আর আগের মতো প্রাণোচ্ছল নেই। আগের মতো আর বাচ্চাদের উল্লাসের শব্দ আসে না।
বাড়ির কোনা কোনা থেকে হাসির ঝংকার শোনা যায় না।
যেনো কোনো পিশাচের অভিশাপ লেগেছে।
শুধু কান্না আর হাহাকার।
বিছানার এক কোণে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন অনন্যা বেগম। দীর্ঘ ৩৫ বছরের সংসার জীবনে তিনি যেনো এক মৃতপ্রায় গাছের শিকড়ের মতো জীবন যাপন করেছেন। কোনো ভালোবাসা ছাড়া, জল-পানি ছাড়া, জোর-জবরদস্তি মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। অথচ গাছটা কবেই মরে গেছে।
গুনগুন শব্দে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন অনন্যা বেগম। চিৎকার দিয়ে কাঁদার চেষ্টা করছেন, যেনো এটাই হয় জীবনের শেষ কান্না।
হঠাৎ দরজা খোলার ঝনঝন আওয়াজ হয়। সাথে সাথেই চুপ হয়ে যান অনন্যা বেগম। দুই হাতে চোখের জল এতো দ্রুত মুছেন যেনো কিছু হয়ইনি।
সাজিদ শিকদার অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ঘরের মাঝখানটায় এসে দাঁড়ান।
লজ্জা, জড়তা আর অপরাধবোধের মিশেলে তিনি অনন্যা বেগমের মুখোমুখি হতে পারেন না। চোখে চোখ রাখতে পারেন না বিধায় কথিত স্ত্রী নামক মানুষটাকে এড়িয়ে যথাসম্ভব।
মানুষের বিবেক হচ্ছে মনের আয়না। সেই আয়না তো কবেই ঝাপসা হয়ে গেছে। তাই অপরাধবোধ ঢাকতে পালিয়ে বেড়ান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।
স্ত্রী হলেও তার সাথে শেষ কবে স্ত্রীর মতো থাকা হয়েছে মনে পড়ে না। হবে হয়তো বছর বিশেক আগে।
সাজিদ শিকদার মাথা তুলে বিছানার দিকে তাকালেন। অনন্যা বেগম শাড়ির আঁচলটা গায়ে ভালো মতো জড়িয়ে সাজিদ শিকদারের সম্মুখে দাঁড়ালেন।
উনার শারীরিক প্রতিক্রিয়া এমন যেনো তিনি কোনো পরপুরুষের সম্মুখে দাঁড়িয়েছেন।
সাজিদ শিকদার সামনে দাঁড়ানো অসম্ভব মায়াবী, চরম লাবণ্যময়ী নারীটির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেন না। তার রূপ সৌর রশ্মির মতো তেজস্বী, দীপ্তিময়। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকলে চোখের মণি ঝলসানোর সম্ভাবনা থাকে। আরো একটি সমস্যা—ভীষণভাবে পুড়ায়, চরম দ্বিধা তৈরি হয় মনে।
মায়া লাগতে শুরু করে। মায়া যে বড্ড বেহায়া অনুভূতি। মায়ার ছলনায় পড়ে বহুবার পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন তিনি। পড়ে মন মানানো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়ে। নিজেকে আটকাতে পারেন না দ্বিচারিতা করার থেকে।
বয়সটা চল্লিশ পেরিয়েছে, কিন্তু চেহারার লাবণ্য এখনো উপচে পড়ে। যেনো বয়সটা আটকে আছে ৩২-৩৩-এর কোঠায়।
— “আসসালামু ওয়ালাইকুম।”
ধীরে সালাম দিলেন অনন্যা বেগম।
মৃদু আওয়াজে ভাবনাচ্ছন্ন হন সাজিদ শিকদার।
এই বুড়ো বয়সে এসেও নিজের এমন বেহায়া স্বভাবের জন্য লজ্জিত হন নিজের কাছে।
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম।
কিছু বলবে, অনন্যা?”
বাহির থেকে নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করা রমণীর ভেতরটা হুড়হুড় করে ভেঙে পড়ছে। দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চরম পীড়া অনুভূত হচ্ছে।
না চাইতেও চোখ দুটো ভরে আসে অনন্যা বেগমের।
টলটলে অক্ষিযুগল তুলে তাকান সাজিদ শিকদারের চোখের পানে।
সাজিদ শিকদারের বুকের খুব গভীরে কেমন মোচড় দেয়। কেনো দেয় বুঝতে পারেন না সাজিদ শিকদার।
নিজেকে দ্রুত সামলান অনন্যা বেগম।
সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ধীর স্বরে বলেন—
— “হ্যাঁ, বলবো বলেই ডেকেছি। অনেক তো হলো, এবার সমাধানের পালা।”
— “কিসের সমাধান?”
সাজিদ শিকদার প্রশ্নভরা চোখে তাকালেন।
— “হ্যাঁ, সেই সমাধানটা যেটা ঝুলে আছে বিগত ৩৪ বছর ধরে। আমি এতই হতভাগা, জানেন? নিজের জন্য প্রতিবাদের সাহসটুকু জোগাতে পারলাম না জীবনে।
কী করবো বলেন? প্রতিবাদের ভাষা আমার জানা ছিলো না। বাবা-মায়ের খুব বাধ্য সন্তান ছিলাম।
বিশ্বাস করুন, আপনার আমার ওরকম দৃষ্টি কোনোদিনও ছিলো না। আমি তো সবসময় আপনাকে আমার বড়ো দুই বোনের দেবর বলেই জানতাম। বড়ো ভাইয়ের মতো সম্মান করতাম। কিন্তু একদিন স্কুল থেকে ফিরে জানতে পারি—নাহ্, আমার বিয়ে! তাও আমার বড়ো আপার দেবরের সাথে। কোন দেবর জানতাম না, ইচ্ছাও করেনি জানার। জানেন, আমার বিয়ে? অথচ কেউ একটাবারের জন্য জানতে চায়নি আমি এই বিয়েটা চাই কিনা, আমি এই বিয়েতে রাজি আছি কিনা, আমার কোনো পছন্দ আছে কিনা। শুধু বললো—আজ তোর বিয়ে। ব্যাস। সেদিন থেকে আমার ভাগ্যই বদলে গেলো। আমি কোনোদিন জমিদার বাড়ির বউ হতে চাইনি। এতো টাকা-পয়সা, এতো বিলাসিতা আমি চাইনি। তবুও ভারী ভারী শাড়ি-গয়না জড়িয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলো আপনার সংসারে।
খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, জানেন। মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতাম একজনকে। সেও খুব ভালোবাসতো। কিন্তু বাবার পছন্দ হলো আপনাকে। আপনার বাবা-ভাইয়েরাও ঠিক সেই সময় বিয়ের প্রস্তাব দিলো। ব্যাস। প্রেমিকের কাছ থেকে উপাধি পেলাম—লোভী, বিশ্বাসঘাতক, আরো কতকি।
খুব ভালোবাসত। বিয়ের পরও বহু বছর আমার পিছু পিছু ঘুরেছে আর মিনতি করেছে একটাবার তার কাছে চলে যাওয়ার জন্য। ছেলে হলো, মেয়ে হলো, তখনও বলেছে আমার সন্তানদের নিজের সন্তানের মতো দেখবে, তাদের নিয়ে হলেও চলে যেতে। কিন্তু আমি পারিনি।
নিচু মানসিকতা ছিলো তো। ভাবতাম মেয়েদের বিয়ে বুঝি একবারই হয়। আর আমি সত্যি আমার অতীতকে পিছে ফেলে তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই বুঝে গেলাম—স্বামীর সুখ বুঝি আমার ভাগ্যে নেই। তবুও একটা পুরনো আসবাবপত্রের মতো আপনার ঘরের এক কোণে পড়ে রইলাম।
অথচ আপনি আমাকে একটাবারের জন্যও বলেননি আপনি অন্যত্র বিবাহিত। শুধু উপেক্ষা করে গেলেন। কেবল মাঝে মাঝে কেমন হয়ে যেতেন, অনেক ভালোবাসা দেখাতেন, পুরুষত্বের অধিকার মিটিয়ে নিতেন, তারপর আবার যেই কি সেই।
এভাবে চললো ১২-১৪ বছর। তারপর আপনি পাকাপাকিভাবে পর হয়ে গেলেন।
আর আমি পড়ে রইলাম আগের মতোই। অযত্নে ফেলে রাখা জিনিসের উপর যেমন ধুলো জমে, আমারও তেমন অবস্থা হলো। আমি জানতাম আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। তবুও মায়ায় পড়ে গেছিলাম। একটা সময় তো ভালোবেসে ফেলেছিলাম। ঐ যে কথায় আছে না—মেয়ে মানুষের অতীত থাকতে নেই। আমার অতীতকে আমি বাক্সবন্দি করে ফেলে দিয়েছিলাম। তবুও আপনার সংসার করতে করিনি। স্ত্রী তো হলাম, কিন্তু ঘরণী হতে পারিনি।
বহু বছর পেরিয়ে গেলো। তারপর একদিন জানলাম—আমার একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে বিয়ে হয়েছিল। সে কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি। অন্য নারীতে মগ্ন। সে—আমিই তৃতীয়।”
মাথাটা নীচু হয়ে গেলো সাজিদ শিকদারের।
— “অনন্যা—”
— “থাক, শিকদার সাহেব। আজ আর নাই বা বললেন। ৩৪ বছরের হাতে গুনে কয়েকবার সংসার হয়েছে আমাদের। আমি সমাজের স্বীকৃতি পেয়েছি, কিন্তু স্বামীর ভালোবাসা পাইনি। এই বয়সে এসে আর চাইও না।
এখন আপনি শুধু শেষ একটা উপকার করুন। আমার আপনার উপর কোনো অভিযোগ নেই। আমি আপনাকে ঘৃণাও করি না। কী বলুন তো? আপনার প্রতি আর কোনো অনুভূতিই আসে না।
আমার তিন সন্তানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।
তবে আপনার সম্পর্কের ভার আমি আর বইতে পারছি না।”
— “মানে?”
— “মানে আমি মুক্তি চাই। এই সংসার-সংসার খেলা আর আমার দ্বারা হচ্ছে না। আই ওয়ান্ট ডিভোর্স।”
চমকে উঠলেন সাজিদ শিকদার।
‘ডিভোর্স’ শব্দটা মনের কোথাও একটা আঘাত করলো। তবে একটিবারের জন্যও দ্বিমত করলেন না তিনি। বরং এতো বছর পর অনন্যা নিজেকে বেছে নিয়েছে—এটাই আনন্দের।
মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন সাজিদ শিকদার।
পেপার্স রেডি করাই ছিল। অনন্যা বেগম কোর্ট পেপারটা বাড়িয়ে দিলেন সাজিদ শিকদারের হাতে। অতঃপর আরেকটা বিষাক্ত সম্পর্কের ইতি।
বাইরে বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দ, আর জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটার আছড়ে পড়ার উন্মাদনা। পরিবেশটাকে সজীব ও মোহময় করে তুলেছে।
ঘরের ফিকল এলইডি লাইটটা মৃদু কাঁপছে। কুলিং ফ্যানের একটানা ঘ্যানঘ্যান শব্দের মাঝেও ল্যাপটপের স্ক্রিনের মনোযোগ গেঁথে তাকিয়ে আছে ইরফান। উহু, শুধু তাকিয়ে নেই—অসুর নিধনের উপযুক্ত বান প্রস্তুত করছে। ল্যাপটপের পাশের ফোন স্পিকার থেকে ভেসে আসছে এক আগ্রাসী নারীকণ্ঠ—
— “আমি সব ফাইলগুলো আপনাকে মেল করে দিয়েছি। আমি কি নিজের কর্তব্য ঠিকঠাকমতো পালন করতে পেরেছি, সিনিয়র ইনচার্জ?”
নারীটির কণ্ঠের ক্ষিপ্ততা স্পষ্ট। নিজের আন্ডারে থাকা একজন ট্যালেন্টেড অফিসারের এমন স্বল্প ধৈর্য দেখে হতাশ হয় ইরফান।
— “কামন প্রিয়স্মিতা, এভাবে বলছ কেন? It’s our responsibility to do this, please be professional.”
— “প্রফেশনাল বলেই তো দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করেছি।”
তোমাকে আরো ধৈর্যশীল হতে হবে। কনসিসটেন্সি বজায় রাখতে জানতে হবে। তবেই তুমি একজন দক্ষ অফিসার হতে পারবে। সামান্য ছোটখাটো বিষয় রেগে যাওয়া It’s very unprofessional.
— “সরি।”
নিজের ভুলটা বুঝতে পারে প্রিয়স্মিতা। সিনিয়র অফিসারের তিক্ত কথায় সে পুরো ঘেঁটে গিয়েছিল।
— “হুম, তুমি আমার বোন, বাড়িতে ফ্যামিলিতে—কিন্তু কর্মক্ষেত্রে আমি তোমার সিনিয়র। আর বুঝই তো, আমাদের কাঁধে কত বড় দায়িত্ব! আমাদের সব ফোকাস এখন ওদিকে রাখা উচিত। এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য করার সময় এটা নয়।”
— “হুম, বুঝতে পেরেছি। সরি এগেইন। আপনি সব কিছু রেডি করে রেখেছেন তো? কালকেই কিন্তু বোমাটা ফাটাতে হবে As soon as possible, আর একটা দিনও দেরি করা যাবে না। আর রিস্ক নিতে পারব না আমরা, ASR-এর চ্যাপ্টার কালকে ক্লোজ করতেই হবে।”
ফোনের ওপারে ইরফানের দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শোনা গেল—
— “আশাবাদী প্রিয়স্মিতা, তবু আমার ইরিটেশন হচ্ছে। মনে হচ্ছে এতো সহজ হবে না সবটা। কিছু একটা হবে… কিন্তু আমায় আমার লক্ষ্যে অটুট থাকতেই হবে। যাই হোক, কালকে বিশ্ববাসীর সামনে সত্যের উন্মোচন করতেই হবে।”
— “তুমি কি শংকিত?”
— “কেন, তুমি শংকিত নও?”
ক্লান্তিতে কপালে হাত ঠেকাল ইরফান। তার নিশ্বাস ভারী। কয়েক পল নিরব থাকলো প্রিয়স্মিতা, অতঃপর রহস্যময় কণ্ঠে বলল—
— “নাহ্, একদম টেনশন ফ্রি থাকো। আমার কাছে খবর আছে। আবরার শিকদার প্রণয় নাকি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে জীবনের শেষ ঘুম। আর একটা কথা ভুললে চলবে না—সব কটা প্রুভ কিন্তু আমরা নিজেরা সংগ্রহ করিনি। ইনফ্যাক্ট, প্রণয় শিকদার না চাইলে তাকে ধরবে বা এক্সপোজ করবে কার বাপের সাধ্য? এখানে আমাদের ভাগ্যটা দুর্দান্ত সহায় ছিল। আমার আর শুদ্ধের যখন বিয়ে হয়, তখন প্রণয় শিকদার আমার সত্যটা জানতো না বিধায় নিজের জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলছিল। তখন সে স্বেচ্ছায় এমন অনেক কিছু আমাদের দিয়েছে যেটা আজ আমাদের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র। আর এখানে আমার ভূমিকা কিন্তু সর্বোচ্চ।”
ল্যাপটপের কিবোর্ডে তর্জনী ঘষতে থাকে ইরফান। গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
— “পরিস্থিতি এখন খুব বিপদজনক। জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। সরকার থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য মিটিং, মিছিল, অনশন, ধর্মঘট, আত্মহত্যা—সব করছে লোকজন। সরকারি জিনিসপত্র ভাঙচুর করেছে। পুলিশের উপর আক্রমণ করছে। জনগণের আক্রোশ সামলানো যাচ্ছে না। তাদের একটাই দাবি—কেনো তারা এখন ন্যায়বিচার পাচ্ছে না? কেন তারা জাস্টিস পাচ্ছে না? তাদের এই ক্ষয়ক্ষতির ভরপাই কে করবে? সরকার কী করছে? তারা সুবিচার চায়। শহরগুলো জ্বলছে, প্রিয়স্মিতা! সরকারকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। এখন অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে।”
— “কিন্তু আমি শুনেছি, এএসআরের এক পক্ষ থেকে সব দুই নাম্বারি বিজনেস, সব ট্রাফিকিং চক্র নাকি টোটালি অফ হয়ে গেছে গত এক সপ্তাহ ধরে। মাদকের বাজারে প্রভাব পড়েছে ব্যাপক। তার সব অনৈতিক বিজনেস ধীরে ধীরে কোলেপস করছে। চলতে থাকে তার কোম্পানিও খুব তাড়াতাড়ি ব্যাংকরাপ্ট হয়ে যাবে।”
— “তাতে কী হবে? অতীতের নয় বছরের বিভীষিকাকে পাল্টে যাবে? নয়টা বছর ধরে সাধারণ মানুষের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যে মানুষগুলো প্রাণ হারিয়েছে, যে মেয়েরা, যে শিশুগুলো—তারা ন্যায়বিচার আশা করে না? এই টেরোরিস্ট দলের জন্য বড় বড় দেশের ইকোনমি অনেকবার ডাউন খেয়েছে। কানাডা, ইউএস, ইতালি, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি—উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশে যে ওরা যে কথা, যে অপরাধ বিস্তার করেছে—এক এএসআর গুটিয়ে গেলে কী সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে? মানুষের মনে যে ক্ষোভ, যে ঘৃণা—সেটা কি মুছে যাবে? সে মানুষ নয়, প্রিয়স্মিতা, একটা পিশাচ! তাকে যারা সাপোর্ট করে, তারা অন্ধ। নিজের বিবেক আর মনুষ্যত্ব বেছে দিয়েছে। এই নিকৃষ্ট কিটের জায়গা কোনো সুন্দর দুনিয়াতে নয়, বরং নরকের কোনো অন্ধকার দুর্গন্ধযুক্ত গলিতে। শাস্তি তাকে পেতেই হবে, প্রিয়স্মিতা। আমি তো বলি, সরকার মৃত্যুদণ্ড দিতে চায়, কিন্তু এই ধারার মানুষগুলো কি সত্যিই এত সহজ শাস্তি ডিজার্ভ করে? এএসআরকে মেরে ফেললে সত্যি কী ওর প্রাপ্য শাস্তি পাবে? এএসআরের উপযুক্ত শাস্তি—একা একটা কালকুঠুরিতে বন্দি করে রাখা, অবশ্যই কোনো অবস্থাতেই মরতে না দেওয়া। ও যাকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারে না, তার থেকে যোজন যোজন দূরে রাখা। তবেই শাস্তি হবে, বিচার হবে, ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। অপরাধীর প্রাণ প্রত্যেকটা সেকেন্ডে মরণযন্ত্রণায় ছটফট করবে, মৃত্যুর ভিক্ষা চাবে, কিন্তু মরবে না।”
— “কিন্তু আইন আমাদের এতটা নৃশংস হওয়ার অনুমতি দেয় না। দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধীকেও মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের মানুষ হিসেবেই দেখতে হয়। আর একজন মানুষ হিসেবে তাকে সবচেয়ে কম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দেওয়াই আমাদের কর্তব্য। তাই শান্ত হও।”
— “আচ্ছা, সেসব বুঝতেছি। কিন্তু কাল সকালে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত রিস্ক আছে—খুব বড় রিস্ক। একটা উড়ো খবর পেয়েছি।”
— “কী খবর?”
— “জানি না কতটুকু সত্যি, কিন্তু এখন ছোট থেকে ছোট রিস্কও লং টার্মে ভয়ংকর সাব্যস্ত হতে পারে।”
— “মানে?”
ভ্রু কুঁচকে যায় প্রিয়স্মিতার।
— “মানে, খবর আছে নতুন কারও উদয় হয়েছে। কেউ একজন আছে যে এএসআরকে প্রটেক্ট করার চেষ্টা করছে আপ্রাণ। আমাদের ডিজিটাল ফাইল হ্যাক হয়ে গেছে—সে তো আমাদের ভাগ্য যে সবকিছুর অনেকগুলো কপি ছিল, না হলে কী হতো…”
— “হোয়াট?!”
— “হ্যাঁ, আ…”
কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল ইরফান। আচমকা তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল! তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে—পেছনে কেউ আছে, একদম তার পিঠ বরাবর দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
কারো উপস্থিতি টের পেলেও সামান্যতম উত্তেজিত হলো না ইরফান, পেছন ফিরেও তাকাল না। অত্যন্ত সাবধানে টেবিলের ওপর থাকা গানটা বন্দুক খপ করে চেপে ধরল শক্ত মুঠোয়। ঘামে ভেজা হাতের তালুতে রিভলবারের ঠান্ডা লোহা আরও আঠালো হয়ে বসল।
চোখের পলকে পেছনে ফিরে শ্যুট করে দিল ইরফান! বিষয়টি এত দ্রুত ঘটে গেলো যে বাতাসের পক্ষেও ব্যাপারটা বুঝে ওঠা মুশকিল ছিল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বুঝে গেল সামনের ব্যক্তিটি। পুরো কার্যক্রমে হয়তো সময় লেগেছে আধা সেকেন্ডের। তবে এই সময়ের মধ্যেই সামনের ব্যক্তিটি ঠিক ডাইভ দিয়ে সরে গেল।
ট্রিগার চাপার সাথে সাথে বিকট আওয়াজে কেঁপে উঠল পুরো কক্ষ। কানের পর্দা ফাটানো সেই শব্দের রেশ কাটতে না কাটতেই, দূরে থাকা কাঁচের ছোট্ট অ্যাকোয়ারিয়ামটা গুলির আঘাতে ভেঙে চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে গেল। পানির প্রবল তোড়ে মেঝে ভেসে গেল, সেই স্বচ্ছ পানিতে খেলতে থাকা সোনালী রঙের মাছগুলো মেঝেতে পড়ে পানির অভাবে ছটফট করতে করতে মরতে লাগল।
বাতাসে পোড়া বারুদের কড়া ও ভারী গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। পিনপতন নীরবতার মাঝে ফোনের ওপার থেকে প্রিয়স্মিতার অনবরত “হ্যালো! হ্যালো!” আর্তনাদ ভেসে আসছে। প্রিয়স্মিতা হয়তো গুলির আওয়াজ পেয়েছে, হয়তো উদ্বিগ্ন হয়ে কিছু বলছে—সেদিকে সামান্যতম খেয়াল নেই ইরফানের।
তার সমস্ত মনোযোগ এখন এসে ঠেকেছে সামনের হঠাৎ উড়ে আসা আগন্তুকের ওপর। ইরফান এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। বিদ্যুৎগতিতে তেড়ে গিয়ে সটান বন্দুক চেপে ধরল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কপালে। ঠান্ডা নলটি ছোঁয়া সামনের ব্যক্তির উপর কী প্রভাব ফেলল, তা বোঝা গেল না।
ব্যক্তিটি ভীষণ মিস্ট্রিয়াস। চোখের মণি সরু হয়ে এল ইরফানের। অভিজ্ঞ পেশাদার দৃষ্টিতে আগন্তুকের মাথা থেকে পা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলাল।
মুখ ঢাকা কালো চাদর গায়ে। শারীরিক গঠনে ও বাহ্যিক অবয়বে পুরুষ বলে মনে হলো না ইরফানের—তার মানে কোনো নারী! ব্যাপারটা মাথায় হিট করতেই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল, তড়িৎ বেগে আরও কয়েকগুণ সতর্ক হয়ে গেল ইরফান।
রিভলবারটা হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল, ট্রিগারে তর্জনী রেখে কৌতূহলী ও কঠোর কণ্ঠে শোধালো—
— “কে আপনি?”
আগন্তুক টু শব্দটিও করল না। পিনপতন নীরবতার মধ্যে কেবল ভুতুড়ে ছায়ামূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল।
ইরফান পুনরায় দাঁতে দাঁত চেপে শোধালো—
— “কে আপনি? মুখ খুলুন!”
এবার আর কালক্ষেপণ করল না মেয়েটি। মাথার উপর থেকে চাদরটা এক টানে সরিয়ে দিল। হাই-পাওয়ারের এলইডি লাইটের উজ্জ্বল আলোয় জলমল করে উঠল মেয়েটার ফর্সা ত্বক।
মুখের গঠন ও দেহের গড়ন চোখের পলকে চিনে নিলো ইরফান। হাতের বন্দুকটা ঢিলে হয়ে গেল সহসা, হাত থেকে খসে পড়ার উপক্রম হলো! বুক চিরে বেরিয়ে আসা হৃদস্পন্দন যেন কান দিয়ে শোনা যাচ্ছে। চোখ দুটিতে ভারী অবিশ্বাসের চাপ, কাঁপা অস্পষ্ট বাক্যে আড়াল—
— “প্রি–প্রিয়স্মিতা…?”
মেয়েটার নীল চোখের কালো মণিতে এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলে গেল। ইরফানের ভুল সংশোধন করে দিয়ে সে বরফশীতল কণ্ঠে বলল—
— “ওহুহ, তনয়া শিকদার প্রিয়তা।”
বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেল ইরফানের। সে যে কতটা বাকরুদ্ধ ও অবাক হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
— “তুমি এখানে?”
— “হ্যাঁ, আমি এখানে! কেন, দেখে ভীষণ অবাক হয়েছেন বুঝি, সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার মিস্টার ইরফান শেখ?”
মেয়েটার কণ্ঠ বরফের মতো জমানো, কিন্তু প্রতিটা শব্দের ভাঁজে ঝাঁজ আছে চূড়ান্ত।
এমন তো হওয়ার কথা নয়! চরম ভাবনায় পড়ে গেল ইরফান। এই মেয়েটাকে তো সে কতো কতবার দেখেছে, প্রতিবার নিষ্পাপ-পবিত্র মনে হয়েছে; অথচ এখন এই মুহূর্তে মেয়েটার চোখ-মুখে কেমন অলুক্ষুনে ও অশুভ ছায়া!
— “কী ভাবছেন অফিসার, আমি এখানে কীভাবে ঢুকলাম?”
ইরফানের হতভম্ব মুখের জবাবের অপেক্ষা করল না প্রিয়তা, নিজেই ব্যঙ্গাত্মক হেসে জবাবটা দিয়ে দিল—
— “আমি এখানে কীভাবে ঢুকেছি, চিন্তা করে পাওয়া তো দূর অস্ত, আপনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবেন না।”
— “কী বলেতে চাও? তোমাকে কেমন রহস্যময় লাগছে? তুমি আসলে যেমনটা দেখাও, তেমনটাই নাকি তুমিও!”
চোখে রহস্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল প্রিয়তা, কণ্ঠের শিহরন ধরে রেখে নিচু অথচ স্পষ্ট স্বরে জবাব দিল—
— “জাতের জাত, বীজের কলা। পাকলে কলা চুলকায় গলা। অবশ্যই আমিও তেমনি হবো যেমন আমার রক্ত? রক্ত পিশাচের বংশের জন্মে আমি নিশ্চিত কোনো মহীয়সী হবো না। হ্যাঁ, তবে আপনি আমায় ভুল চিনেন নি—আমি তেমনও; আবার আমি এমনও! সময় আর পরিস্থিতি অনুযায়ী সুইচ হয়ে যাই। আমি ইচ্ছাদারী ছিলাম নাহ্, রূপ পাল্টানো আমার ধাঁচে নেই। কিন্তু কী করবো, বাধ্য যে। তবে নিজেকে পুরোপুরি ভুলে যাইনি, কেবল অস্তিত্বকে দুটো ভাগে ভাগ করে দিয়েছি।”
— “ওয়াট? মানে কী এসবের? তুমি এখানে কেন এসেছ? তুমি আসলে কী চাও? কী উদ্দেশ্য তোমার?”
— “ঠিক সেই উদ্দেশ্যে, যে উদ্দেশ্যে আপনি আমার বাড়িতে ঢুকেছিলেন।”
ইরফান হতবম্ব হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে তাকে কথার নিজের ঝালে ফাঁসাতে শুরু করলো প্রিয়তা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাইন্ড ড্রাইভ হয়ে গেল ইরফানের। এই এক মুহূর্তের অন্যমনস্কতার সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগাল প্রিয়তা। চোখের পলকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা মারাত্মক ঘুষি বসিয়ে দিল ইরফানের নাক বরাবর!
অন্যমনস্ক ছিল বিধায় আঘাতটি সরাসরি গিয়ে লাগল, হাত থেকে ছিটকে গানটা দূরে পড়ে গেল ইরফানের। তবে আঘাতের তীব্রতা ততটা ও জোরালো ছিলো নাহ্।
তবে নিজেকে সামলানোর সুযোগ পেলো নাহ্ ইরফান, সে বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুৎগতিতে মাটিতে পড়ে থাকা বন্দুকটা কুড়িয়ে নিল প্রিয়তা।
আতকে উঠলো ইরফান, কিছু একটা বলতে যাবে, তবে তার আগেই নিঝুম কক্ষজুড়ে ‘ঠাস ঠাস’ করে মাত্র দুবার শব্দ হলো! সাথে সাথেই আবারও মৃত্যুপুরীর মতো নীরবতা নেমে এল চারপাশজুড়ে।
কেবল ভারী একটা দেহ পড়ার ‘ধপাস’ শব্দ নীরবতার মোটা চাদর গুড়িয়ে সশব্দে আঁচড়ে পড়লো ধবধবে টাইলসের মেঝেতে। কোনো কথা নেই, কোনো কোলাহল নেই, কেবল মৃত্যুর স্থিরতা। মাথার খুলি ভেদ করে তরতর করে বেরিয়ে আসতে লাগল উষ্ণ স্রোত। সাদা টাইলসের মেঝে মেখে গেল মুহূর্তেই।
মৃতদেহটার পাশে হাঁটু মুড়ে বসল প্রিয়তা। নিথর লাশটার দিকে তাকিয়ে শূন্য ও নির্জীব কণ্ঠে বিড়বিড় করল—
— “তোমার সাথে আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, তোমাকে মারার কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না আমার; কিন্তু কী করব, বলো? তোমার এই তুচ্ছ জীবনের থেকে আমার প্রণয় ভাইয়ের ভালোবাসা আমার কাছে অনেক বেশি অমূল্য! কারো জন্যই স্বার্থটা আমি ত্যাগ করতে পারবো না। তাকে ধরে রাখতে এমন শত শত প্রাণ উৎসর্গ করতে আমার দ্বিধা নেই। সমাজ আমাকে স্বার্থপর ভাবতে পারে, অসুবিধা নেই—তবে অসহায় যেনো দেখে না। এই তো সবে শুরু, ধীরে ধীরে আরও অনেক লাশ পড়বে। এক প্রণয় ভাই ব্যতীত আমার আর কারো কোনো প্রিয়জন নেই, কোনো প্রয়োজন নেই। যারা যারা পিঠে ছুরি মারতে চায়, এক এক করে সবার ক্লাস নেবো—কেউ বাদ যাবে নাহ্, নিশ্চিত। চলো, একটা উইকেট পড়লো। এবার পালা মেহেরিমা শিকদার প্রিয়স্মিতার।”
সচেতন দৃষ্টিতে ঘাড় বাঁকিয়ে চারদিক পরখ করলো প্রিয়তা। চট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এই অব্দি পৌঁছতে তাকে অনেক হ্যাপা পোহাতে হয়েছে।
এখন টাইম মিশন কমপ্লিট করার। প্রিয়তা হাতের রিভলবারটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল, অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল ঘরের চার কোণে লাগানো চারটা সিসিটিভি ক্যামেরার লাল আলোর দিকে।
হাতের বন্দুকটা দিয়ে নিজের কপালেই নিজে আলতো করে বাড়ি মারল প্রিয়তা, ঠোঁটে এক ফালি বাঁকা হাসি ঝুলালো—
— “চারটা চোখ এখনো তোকে দেখছে প্রিয়তা, তুই কীভাবে ওদের ইগনোর করে চলে যাচ্ছিলি?”
মুখের কথা ফুরায় না প্রিয়তার, আচানক ‘ঠাস ঠাস ঠাস ঠাস’ করে বিকট চারটা গুলিতে চারটা ক্যামেরা উড়িয়ে দিল!
ছোঁ মেরে টেবিলের ওপর থাকা ইরফানের ল্যাপটপটা তুলে নিলো প্রিয়তা। কন্ট্রোল রুমে গিয়ে দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজের হার্ডড্রাইভটা বের করে নিলো। সব কিছু নিয়ে যে পথে এসেছিল সেই পথে পালাতে গেল, পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠের বজ্রধ্বনি শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রিয়তা। পা দুটো সেটে যায় মেঝের সাথে।
— “আর এক পা সামনে বাড়ালে ভুলে যাবো যে তুই আমার বোন! তখন এক সেকেন্ড লাগবে তোর সমস্ত জারিজুরি থামিয়ে দিতে। তাই থাম, বাধ্য করিস নাহ্ আমায়!”
প্রিয়তার দিকে নল তাক করে ধারালো তীরের ফলার ন্যায় কথাগুলো ছুড়ে দিল প্রিয়স্মিতা। একদম পাথুরে কণ্ঠ তার, স্বরে আবেগের বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটাও নেই।
প্রিয়তা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, সরাসরি চোখ রাখল প্রিয়স্মিতার চোখের ওপর। দুই জোড়া শপথধারী নীল চোখ যেন ভয়ানক সংঘর্ষের ন্যায় একে অপরের দৃষ্টিতে বিদ্ধ হলো। চোখ দুটোর গভীরে রক্তক্ষয়ী ও অমোঘ লক্ষ্য পূরণের নিরব যুদ্ধ চলছে। দেখতে অবিকল একই রকম, কিন্তু দুজনেই চরম ধ্বংসাত্মক মুদ্রায়!
প্রিয়তা পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে গেল না; বরং লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক কুটিল রহস্যময় হাসি। হিসাব একটা যেহেতু আছে, তাহলে তুলা থাকবে কেনো—সবার আসল রূপ চেনা হয়ে গেছে।
প্রিয়তা একপা দুপা করে এগিয়ে যায় প্রিয়স্মিতার সম্মুখে। তার তাক করা বন্দুকটার দিক ইশারা করে মৃদু হেসে বলে—
— “ওটা ধরতে পারার অহংকার আমাকে দেখিও নাহ্। আমার ধমনীতেও ওই একই রক্তের স্রোত বয় যেটা তোমার বইছে। ওটার ব্যবহার আমাদের হাতে ধরে শেখাতে হয় নাহ্। ওটা আমাদের জন্মগত গুণ। চার বছরের অভিরাজও পারবে।”
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল প্রিয়স্মিতা। তার চোখের পলক পড়া স্থির হয়ে গেলো। কণ্ঠে চরম অবিশ্বাসের সুর—
— “আনবিলিভেবল! তোকে আমার বড্ড অচেনা লাগছে, প্রিয়।”
— “ভেরি সিম্পল। মানুষ চেনা ওতো সহজ নয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমার। মানুষ যখন নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করে, তখন পরিবর্তনগুলো চোখে পড়ার মতোই হয়।”
— “আই অ্যাম হাইলি ইমপ্রেসড! বড় বড় ফিলোসফির কথা ভালো শিখেছিস। কুয়োর ব্যাঙ অবশেষে বুঝি দিগন্তের সন্ধান পেলো!”
— “কুয়োতেই তো সুখী ছিলাম বেশ; কিন্তু সুখে আর থাকতে পারলাম কই? সেই তো খানদানি নোংরা ডোবায় পা চুবাতে হলো।”
ভারী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চূড়ান্ত আফসোসের সুর তুলল প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতার এই পুরো ব্যাপারটা একটুও হজম হচ্ছে না—
— “তুই এখানে ঠিক কী করছিস বল তো?”
— “সেটাই নিতে এসেছি, যেটা তুমি… উপস, তোমরা সকলে মিলে চুরি করেছ?”
— “হোয়াট রাবিশ! কী চুরি করেছি আমরা?”
কপাল কুঁচকে যায় প্রিয়স্মিতার।
— “এই যে এটা!”
হাতের ল্যাপটপটার দিকে দেখিয়ে ইশারা করল প্রিয়তা। প্রিয়তার হাতে ইরফানের অফিসিয়াল ল্যাপটপ দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল প্রিয়স্মিতা, তার চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো!
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ল প্রিয়স্মিতা। প্রিয়তার হাত থেকে ল্যাপটপটা জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় উদ্যত হলো। ভয়ানকভাবে প্যানিক করতে করতে চেঁচিয়ে বললো—
— “তুই… তুই এটা কোথায় পেলি? এটা আমাকে দে, বলছি! স্যার… স্যার, আপনি কোথায়?”
— “নেই! তোমার সেই সিনিয়র অফিসারকে আল্লাহর হাওলায় পাঠিয়ে দিয়েছি। যতই চেঁচিয়ে ডাকো, কোনো লাভ হবে না!”
মুখখানা একদম ইনোসেন্ট করে জবাব দিল প্রিয়তা। ভাবখানা এমন, যেন মশা মারার খবর বললো!
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো প্রিয়স্মিতা। কথাটা কী বললো? নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না প্রিয়স্মিতা। প্রিয়তাকে ফেলে উল্টো ঘুরে একছুটে দৌড় দিল ভেতরের কনফারেন্স রুমের দিকে।
রুমে পা রাখতেই বিভৎস দৃশ্যে পুরো শরীর শিউরে উঠল প্রিয়স্মিতার, পায়ের রক্ত যেন জমে গেল! গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে ডেকে উঠল—
— “ভাইয়া…!”
— “আপনজনকে হারানোর ব্যথায় বুক ফেটে যাচ্ছে! খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি আপু? চুচুচুচু! অথচ এই তুমিই তো চেয়েছিলে আমি যেন আমার আপনজনকে হারাই, যাকে ব্যতীত আমি নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও কল্পনা করতে পারি না। হিপোক্রেসির একটা সীমা থাকা উচিত বল।”
পেছন থেকে তীব্র ঘৃণাভরা কণ্ঠে কথাগুলো ছুড়ে দিল প্রিয়তা।
ঘাড় ঘুরিয়ে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করল প্রিয়স্মিতা। উন্মত্তের ন্যায় তেড়ে এল প্রিয়তার দিকে, প্রিয়তার বাহু চেপে ধরে কর্কশ ও কাঁপাকাঁপা গলায় চিৎকার দিল—
— “অমানুষের সাথে ঘর করতে করতে তুইও অমানুষ হয়ে গেছিস। কীভাবে পারলি আমার ভাইকে মারতে? তুই দেশের এত বড় একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিলি, তাও একটা জঘন্য ক্রিমিনালের জন্য? তুই কি হুশে আছিস, নাকি উন্মাদ হয়ে গেছিস?”
প্রিয়স্মিতাকে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিল প্রিয়তা। গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো প্রচণ্ড হাহাকার মেশানো চিৎকার—
— “হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গেছি! একদম পাগল হয়ে গেছি! একেবারে মাথা খারাপ হয়ে গেছে আমার! তোমরা আমাকে পাগল করে দিয়েছ। প্রহেলিকার কথা নাহয় বাদই দিলাম, কিন্তু তুমি? তুমি আমার নিজের বড় বোন হয়ে আমার সাজানো জীবনটা ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলে—শেম অন ইউ, আপু! তোমায় আমি অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলাম, আর বিনিময়ে তুমি—!”
— “এটা আমার দায়িত্ব প্রিয়তা! তুই একটা ভুল মানুষের মোহে অন্ধ হয়ে আছিস। দিনের পর দিন একটা পিশাচের সাথে ঘর করছিস। নিজেকে নারী বলতে তোর লজ্জা করে নাহ্? নিজে একটা মেয়ে হয়ে অন্য মেয়েদের অপরাধীকে আড়াল করছিস। আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে পারিস? লজ্জা হয় নাহ্? তোর কী উচিত ছিল নাহ্ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া? কিন্তু তুই? তুই নিজের স্বার্থে অন্ধ হয়ে গেছিস আর আমাকে বলছিস শেম অন ইউ? আমার কিসের লজ্জা? লজ্জা তো তোর পাওয়া উচিত। অন্ধের দৃষ্টি ফেরানো যায়, কিন্তু যে চোখ থাকতেও প্রতিবন্ধী তাকে? এই লড়াইটা কেবল আমার একার নয়—এই লড়াইটা ঘরের মেয়ের লড়াই, সমাজের সকল মেয়ের লড়াই।”
— “একদম একটা কথাও নয়। আমার প্রণয় ভাইয়ের সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য আমি কারোর থেকে শুনব না। কতটুকু চিনো তুমি তাকে? আমি চিনি। কী জানো তুমি তার সম্বন্ধে? আমি জানি। আমার প্রণয় ভাই খারাপ ছিল না, স্বেচ্ছায় একটাও অন্যায় করতে চায়নি। বাধ্য হয়েছিল! আমার প্রণয় ভাই খারাপ নয়, সে পাপী নয়!”
— “তোর চোখে মোহের জাল পড়েছে প্রিয়তা। কিন্তু তোর একজনের সুখের জন্য আমি গোটা দুনিয়াটাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না! এএসআরকে আমি ধরব আর উপযুক্ত শাস্তি দেবো, এটাই আমার লাইফের মিশন। এটা সম্পূর্ণ না করে মরবো না আমি।”
— “আমি বেঁচে থাকতে আমার প্রণয় ভাইয়ের এতটুকু ক্ষতিও আমি কাউকে করতে দেবো না, সাফ কথা!”
— “তাহলে তোকে মরতে হবে, আমারও সাফ কথা! আমার কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তোকে রাস্তা থেকে জাস্ট সরিয়ে দেবো। বিরিয়ানির এলাচি যেভাবে তুলে ফেলে, ওভাবে তোকে উপড়ে ফেলবো। এক তোর জীবনের বিনিময় যদি সমাজে শুদ্ধিকরণ হয়, তবে আমি তাই করবো। আপন জনের রক্তেও যদি হাত রাঙাতে হয়, আফসোস নেই—দ্বিধা করবো নাহ্ আমি। কষ্ট হলেও মেনে নেবো—আমার বোনটা কুলাঙ্গার ছিলো।”
চারপাশের পরিবেশ নিমেষেই উত্তপ্ত ও ভারী হয়ে ওঠে। দুই বোনের ভেতর চরম মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা ও বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের এই তরল কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে পৌঁছে যায়—দুজনারই হাতেই মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র!
তীব্র কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রাগের চরম মাথায় আচমকা শ্যুট করে দিল প্রিয়স্মিতা!
প্রিয়তা ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারল না। চোখের পলকে বুলেটটা তার বুকে বিঁধে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, বাতাসে ভেসে আসা একটা বড়সড় শক্ত হাত ঝাপটা মেরে তাকে নিজের দিকে টেনে সরিয়ে নেয়। তাল হারিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে আছড়ে পড়ে প্রিয়তা তার প্রিয় নীড়ে।
গুলির প্রকাণ্ড আঘাতে দূরের ফ্লাওয়ার ভাসটা ভেঙে চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে গেলো মুহূর্তেই।
নিজের কাণ্ডে নিজেই থমকে গেল প্রিয়স্মিতা—সে এটা কী করছিল! একটু হলেই তো… কথাটা ভাবতেই বুক কেঁপে উঠল প্রিয়তার। তড়িৎ বেগে পাশে ফিরে তাকাল সে।
পরিচিত সেই সুপরিচিত বুকের ঘ্রাণ নাকে আসতেই পিলে চমকে উঠলো প্রিয়তার। ঝট করে মাথা উপরে তুলে তাকাতেই প্রণয়ের রক্তিম ও জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টির মুখোমুখি হলো সে। চোখের মণির সেই তীব্র দৃষ্টিতেই যেন ভস্ম করে দিতে চায় প্রিয়তাকে।
আক্রোশের তোপে প্রণয়ের হাতের মুঠো এমন শক্ত হয়ে আছে যে আঙুলের করগুলো সাদা হয়ে যাচ্ছে।
— “প্রণয় ভাই, আমি আসলে…”
প্রিয়তার কথা শেষ হলো না। ‘ঠাস’ করে একটা বিকট শব্দ হলো! পুরুষালী হাতের কঠোর চপেটাঘাতে বাতাস জমে গেলো। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল প্রিয়তার। নীল নীল চোখ দুটো মুহূর্তেই পানিতে টইটুম্বুর হয়ে উপচে পড়ল। তুলতুলে ফরসা গালখানাতে প্রকাণ্ড পাঁচ আঙ্গুলের লালচে ছাপ ভেসে উঠলো চোখের পলকে।
জীবনে এই প্রথমবারের মতো—হ্যাঁ, বিশ্বাস্য্য হলেও সত্যি—জীবনে এই প্রথমবারের মতো প্রিয়তার গায়ে হাত তুললো প্রণয়।
জীবনে তো কম ভুল-ত্রুটি করেনি প্রিয়তা, কত জ্বালিয়েছে, কত উত্তপ্ত করেছে—কোনোদিন একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেয়নি প্রণয়। বুক আগলে সব জ্বালাতন হাসিমুখে সহ্য করেছে সে, অথচ আজ…!
রাগে এখনো থরথর করে কাঁপছে প্রণয়। চোখ দুটো ভয়ংকর লাল, চোখের কোণায় জমে আছে উষ্ণ জলের আভা। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, বহু কষ্টে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে—নাহলে হয়তো আরও খানদশেক চড় মেরে বেয়াদব মেয়েটার দাঁত সব কটা উপড়ে ফেলত!
— “জানোয়ারের বাচ্চা! তোকে কে বলেছে এত পাকনামি করতে, হ্যাঁ? এখন যদি কিছু হয়ে যেত? যদি আমার আসতে এক সেকেন্ডও দেরি হতো? যদি গুলিটা সোজা তোর বুক ছিঁড়ে হৃদপিণ্ডে ফুটে যেতো? কী করতাম আমি? বল, কী করতাম আমি? আমার পুরো জীবনটা কি এই নিমিষে মিথ্যে হয়ে যেত, নাহ্? আমি নাহয় কিছুদিন পরেই মরতাম, কিন্তু তোর কিছু হলে…!”
নিঃশ্বাসের গতি কেমন অস্বাভাবিক হয়ে যায় প্রণয়ের।
পুরুষালী ধমকের তোরে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। সাথে থরথর করে কেঁপে উঠল প্রিয়তা ও প্রিয়স্মিতা—এত বিকট ও ভয়ঙ্কর কণ্ঠের ধমক তারা আগে কোনদিন শোনেনি।
পরমুহূর্তেই প্রিয়তার ছোট্ট নরম শরীরটাকে প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের বুকপাজরে আঁকড়ে ধরল প্রণয়। পিষে ফেলার তীব্রতা এমন যেনো প্রিয়তার হাড়গুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে মুহূর্তেই। প্রণয়ের হৃৎপিণ্ডের প্রলয়নকারী ধুকপুকানি যেনো বাহির থেকেই শোনা যাচ্ছে।
দম আটকে প্রণয়ের বুকে পড়ে রইলো প্রিয়তা। গালটা জ্বলছে প্রচন্ড। সাথে বুকের ভেতর এমন অনুভূতির জোয়ার এসেছে যেনো নিঃশ্বাস টানতেও কষ্ট হচ্ছে। হারানোর ভয়ে কেমন কুঁকড়ে গেছে প্রণয়। তার দিশাহীন অস্থির নিঃশ্বাস বলছে—আর একটু হলেই তার শ্বাস থমকে যেতো চিরতরে। এমন পাগলাটে মানুষটাকে দুনিয়ার সবাই মিলে মেরে ফেলতে চায়। সব অপরাধের আগে তার সর্বোচ্চ অপরাধ কী ছিলো? কেবল অন্ধের মতো ভালোবাসা। কথাটা ভাবতেই প্রিয়তার শরীর রক্ত টগবগ করে ফোটে ওঠে।
প্রণয়ের বুক থেকে মাথা তুলে কাঁধে মুখ গুঁজে দিল সে, আর ঠিক তখনই সতর্ক চোখে দেখতে লাগল প্রিয়স্মিতার ছটফট করার গতিবিধি।
প্রিয়স্মিতার হাবভাব একদম ভালো না—ASR-কে জীবিত ধরতে না পারলে তাকে এনকাউন্টারের কড়া নির্দেশ আছে। প্রণয় তো তখন উন্মাদ নিজের খেয়ালে মগ্ন, অথচ প্রিয়স্মিতা নীরবে নিখুঁত প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রণয়ের পিঠটা গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার!
প্রিয়তার মন তীব্র ঘৃণায় বিষিয়ে উঠল। সে কোনো ন্যায়-নীতি বোঝে না—এই দুনিয়ায় ওই একটিমাত্র মানুষ ছাড়া তার আপন বলতে আর কেউ নেই।
প্রিয়স্মিতা তক্কেতক্কে থেকে প্রণয়কে শুট করতে উদ্যত হলো। প্রিয়স্মিতা যখন নিজের নিশানা ঠিক করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেকেন্ডের ব্যবধানে পুরো পাশা উল্টে গেলো। প্রণয়ের পেটের পাশ দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে হাত উঠিয়ে ‘ঠাস ঠাস’ করে দুটো গুলি সোজা প্রিয়স্মিতার বুকে ঠুকে দিল প্রিয়তা!
এই অতর্কিত হামলার জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না প্রিয়স্মিতা। বিধায় সরে যাওয়ার সুযোগও পেল না সে…
বুক ছিদ্র করে উষ্ণ তাজা রক্তের স্রোত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। হাত থেকে গানটা পড়ে যায় প্রিয়স্মিতার। চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।
প্রিয়তার চোখে আজ কোনো অনুভূতি নেই। নেই কোনো মায়া, নেই কোনো রক্তের টান—কেবল এক দৃঢ় সংকল্প।
গুলির বিকট শব্দে চৈতন্য ফিরল প্রণয়ের। চমকে সে ফিরে তাকাল প্রিয়স্মিতার পানে। ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে মেয়েটা। মুখ দিয়ে গরগড় শব্দ বেরোচ্ছে, চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে চিরকালের মতো।
আপনজনের হাত থেকে পাওয়ার মৃত্যুর স্বাদ বুঝি এত তিক্ত হয়, তা আগে জানা ছিল না প্রিয়স্মিতার।
পা দুটো থমকে গেলো প্রণয়। নাকে এসে লাগল সদ্য বন্দুকের নল থেকে ওড়া রাসায়নিক বারুদের কড়া গন্ধ। শরীর থেকে ভারী রক্তক্ষরণ হচ্ছে প্রিয়স্মিতার। মুখ থেকে লোল পড়ছে। চোখ দুটো কাচের মতো স্থির হয়ে আসছে সময়ের ব্যবধানে। বিস্ময়ে প্রণয়ের চোখের পলক ফেলা বন্ধ হয়ে গেল।
প্রিয়তার হাতের মুঠোয় তখনও কালো বন্দুকটা ধরে আছে, যেটা দিয়ে মাত্রই সে নিজের যমজ বোনকে হত্যা করলো। বন্দুকের নল দিয়ে হালকা ধোঁয়া উড়ছে। প্রিয়তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো দেখা গেলো না। চেহারায় কোনো অনুশোচনা নেই, চোখে নেই বিয়োগের অশ্রু। সে আগের মতোই প্রণয়ের বুকে মুখ গুঁজে পড়ে রইল, যেন এই মাত্র কিছু ঘটেইনি!
— “এটা কী করলি, জান? ও তো তোর নিজের বোন!”
— “পরোয়া করি না! শুধু আপনি থাকলেই চলবে আমার। কেনো থাকবেন নাহ্?”
প্রণয়ের ভেতরটা হুহু করে কেঁদে উঠল। প্রিয়তার নরম গাল নিজের বড় বড় দুই হাতের মাঝে আলতো করে ধরে সে, আকুল কণ্ঠে বলে উঠল—
— “তুই এমনটা হোস নাহ্ জান। তুই আমার জান। রক্ত-মাংসের তৈরি নাহ্, মাখনের তৈরি। নিজের হাতে বড়ো যত্ন নিয়ে গড়েছি তোকে। তুই এমন কঠিন হৃদয়ের হতে পারিস নাহ্। আগের মত হয়ে যা, জনপাখি। দুনিয়া আমি দুই হাতে সামলে নেবো। সব নিষ্ঠুরতা, সব ক্রুরতা আমি দেখে নেবো তো। আমি আছি তো।”
প্রিয়তার চোখের কোটরে জল থৈ থৈ করে ওঠে। প্রিয়তা প্রণয়ের হাতের উপর হাত রাখে। হটাৎ ভেঙে পড়ে প্রিয়তা। প্রণয়ের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠে। বিলাপ করতে করতে বলে—
— “আমি আমার বোনকে মারতে চাইনি, প্রণয় ভাই। কিন্তু কী করতাম? ও আমাকে মারতে নিয়েছিল, আমি কিছুই বলিনি। কিন্তু ও আপনাকে মারতে চায়। আমি সব সহ্য করে নেবো, কিন্তু আপনার দিকে কেউ হাত বাড়ালে সামনে কে আছে আমি দেখবো নাহ্।”
— “আচ্ছা, আর কাঁদে নাহ্ বাচ্চা…”
— “চিন্তা করবেন নাহ্, প্রণয় ভাই। ভাগ্য ভালো থাকলে বেঁচেও যেতে পারে। গুলিটা অনেক মেপে ঝুপে চালিয়েছি। ওকে আমি কবেই মেরে ফেলতাম, কিন্তু কষ্ট হয় তো, বলুন। প্রাণে মেরে ফেলতে বুকে টান লাগে।”
মুখটা মলিন হয়ে যায় প্রণয়ের। প্রিয়তার ভেজা চোখের পাঁপড়িগুলোতে ঠোঁট চেপে ধরে। পরম আদরে শুষে নেয় লেগে থাকা অশ্রু ফোঁটাগুলো। ব্যাথাতুর কণ্ঠে ফিসফিস করলো—
— “পাগলী মেয়ে, এভাবে কিছু আটকানো সম্ভব নয়। আমার কথাটা মান!”
রেগে যায় প্রিয়তা। প্রণয়ের হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করা শুরু করে দেয়। ঝাঁজ দেখিয়ে বলে—
— “ছাড়ুন আমাকে!”
— “রাগ করছিস কেনো, ময়না পাখি। তুই—”
বাকি কথাটুকু সম্পন্ন করতে পারলো নাহ্ প্রণয়। টুং টুং করে মেসেজ টুনে ভরে উঠলো চারপাশ। দুজনের ফোনেই এক নাগাড়ে নোটিফিকেশন আসতে শুরু করলো। কিঞ্চিৎ অবাক হলো প্রণয়। প্রিয়তা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।
নিজের ট্রাউজারের পকেট থেকে ফোনটা বের করে আনল প্রিয়তা। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম—সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে ঝড়ের বেগে নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আইফোনও হ্যাং হওয়ার জোগাড়। প্রিয়তার বিস্ময়ের কোনো অন্ত রইল না—আবার কোন নতুন ঝড় উঠল সোশ্যাল মিডিয়ায়!
প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপটা ওপেন করল সে। সবার উপরে একটা আননোন নম্বর থেকে মাত্র দুটো মেসেজ এসেছে। প্রিয়তা মেসেজটার ওপর ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
— “Time’s up, ASR will finish tomorrow. And then you’ll be mine.”
— “ওদের দুজনকে মেরে ফেলেছো তো কী ভেবেছো? সব চাপা দিয়ে ফেলেছো? বড্ড বোকা নারী। ওসব কী চাপা দেওয়ার জিনিস? আর ওরা মরে গেছে তো কি হয়েছে? আমি নিজ দায়িত্বে ওদের অসম্পূর্ণ কাজটা সম্পূর্ণ করে দিলাম। বেচারারা অনেক কষ্ট করেছিল এগুলো জোগাড় করতে! সব তো আর পানিতে যেতে দিতে পারি নাহ্। তবে তোমার সাথে আমার হিসাব তোলা রইল। দেখা হবে আমাদের। তোমার সাথে দেখা হবে, তুমি বিধবা হওয়ার পর। উহু, সাদা শাড়িতে নয়—‘লাল শাড়িতে প্রেয়সী’। শেষ এতোটুকুই।”
লেখাটুকু পড়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেলো প্রিয়তার। পা দুটো যেনো আচমকাই অবশ হয়ে এলো। হাঁটুর বল সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললো প্রিয়তা। নার্ভগুলো নিজের কার্যক্ষমতা হারাতে ধরল ধীরে ধীরে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুরো শরীর কাঁপতে লাগলো প্রিয়তার।
ধপ করে পড়ে যেতে নিলে নিজের শক্তপোক্ত দুই হাতে ধরে ফেললো প্রণয়। জাপটে ধরে বুক টেনে নিল।
— “বলেছিলাম নাহ্, এভাবে আটকাতে পারবে নাহ্ জান।”
না–না–না, এটা হতে পারে নাহ্। প্রিয়তা কাঁপা কাঁপা আঙ্গুল দ্বারা ফেসবুকে ক্লিক করতেই মাথায় যেনো মস্ত আকাশ ভেঙে পড়লো প্রিয়তার। পায়ের নিচের জমিন সরে গেলো মুহূর্তেই। ফোনটা ফসকে পড়ে গেলো মাটিতে। প্রিয়তা কাঁপছে অসম্ভব রকমের কাঁপুনি। প্রণয় দুই হাতে ঝাপটে ধরে বসে পড়লো মাটিতে। ছোট্ট মাথাটা বুকের সাথে ঠেকিয়ে চুলে পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। উত্তপ্ত কাঁপা কাঁপা ঠোঁট চেপে ধরে বাচ্চাদের মতো করে সান্তনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল—
— “কিচ্ছু হয়নি বাচ্চা। এই তো দেখ, আমি আছি। তোর কাছেই আছি, পাশেই আছি। শান্ত হ, আমার জান। চুপ করে আমার বুকে কান পাত। মন দিয়ে শোন, আমার হৃৎপিন্ড চলছে এখনো। ধকধক করছে। এই ধুকপুকানির মধ্যে নিজের নামটা শোনতে পাস নাহ্ তুই? ভালো মতো শোনার চেষ্টা কর। আমি যাচ্ছি নাহ্ তোকে ছেড়ে কোথাও। আমি কী তোকে ছেড়ে থাকতে পারি?”
— “প্রণয় ভাই…!”
প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে প্রিয়তা। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার দম আটকে আসার জোগাড়। শরীরের সবটুকু জোর খাটিয়ে এতো শক্ত করে চেপে প্রণয়কে, যেনো সামান্য ছাড়লেই বাতাসে মিলিয়ে যাবে। মরুপথের তৃষ্ণার্ত পথিক যেমন পানির শেষ বিন্দুটুকু আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে, প্রিয়তার অবস্থাও ঠিক তাই।
প্রিয়তমার উষ্ণ চোখের পানিতে বুক ভেসে যাচ্ছে প্রণয়ের। কালো শার্টের বুকের অংশটুকু ইতিমধ্যে শিক্ত। বুকের ভেতরের নরম অংশটা টনটন করে অসহ্য ব্যাথায় ছেয়ে যায় প্রণয়ের। সে জানে, সে মিছে সান্তনা দিচ্ছে তার প্রাণপাখিকে। তার গল্পটা ফুরিয়ে এলো বলে। অন্তিম অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেছে। সমাপ্তির খুব নিকটে দাঁড়িয়ে সে। নিজেকে হারাতে ভয় পায় নাহ্ প্রণয়, কিন্তু সে না থাকলে একে কে সামলাবে? সে কিভাবে মায়া ছাড়াবে এই পাখিটার?
ফোনটার স্ক্রিনটা তখনো জ্বলছে। মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সোশ্যাল মিডিয়ার তোলপাড় হয়ে গেছে। সব জায়গায় ট্রেন্ডিং নিউজ ফিড ভর্তি কেবল একটাই চাঞ্চল্যকর সংবাদ।
ASR’s Face রিভিল!
গ্লোবাল বিজনেস আইকন PS Corp-এর ওনার, বিশিষ্ট বিজনেসম্যান আবরার শিকদার প্রণয়ই কুখ্যাত অপরাধী ASR।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৮
Epstein Files-এর মতো গোটা একটা ডকুমেন্টারি পাবলিশ হয়েছে, যেটা অসংখ্য ছবি-ভিডিওতে ভর্তি। প্রত্যেকটা কুকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। ওমেন ট্রাফিকিং, চাইল্ড ট্রাফিকিং, অর্গান ট্রাফিকিং—সবটার ফোটেজ এতো ইন্টেন্স যে পুরোটা দেখা যায় নাহ্। প্রত্যেকটা ছবি-ভিডিও এইচডি কোয়ালিটির। এই ডকুমেন্টারির নাম দেওয়া হয়েছে THE FLESH LEDGER। এছাড়াও এমনসব নৃশংসতার ভিডিও আছে যে সাধারণ মানুষ পুরোটা দেখতে পারবে নাহ্। প্রত্যেকটা অবৈধ লেনদেনের নথি, প্রত্যেকটা চুক্তি—কী নেই। মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যেই দুনিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। Epstein Files-এর থেকেও দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেছে। এবার শুরু হবে বিক্ষোভ।
“পাঁচমাস পর…”
