Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৭
মুশফিকা রহমান মৈথি

কাঠের দরজার উপর সোনালী রঙ্গের নেমপ্লেট। ইটালিক ফন্টে লেখা “Alex Matthiew”। মিডিয়া স্ট্যাডিস এন্ড জার্নালিজমের গেস্ট এসিসট্যান্ট প্রফেসর। অ্যামেরিকা থেকে এসেছেন গত মাসে। আগামী এক বছর তিনি গেস্ট টিচার হিসেবেই থাকবেন। ক্লাসে প্রবেশ করতেই আবদুল্লাহ তাকে জানালো,
“তোকে মিডিয়া ডিপার্মেন্টের নতুন স্যার খুঁজছিলেন!”
কাঞ্চন অবাক হলো। মিডিয়া ডিপার্টমেন্টের স্যার তাকে খোঁজার কোনো কারণ নেই। সে তো ফার্মাসীতে পড়ে। আরোও অবাক হলো যখন জানতে পারলো তাকে বিগত পাঁচদিন গেস্ট স্যার খুঁজছিলেন।
কাঞ্চন দরজায় কড়া নাড়লো। ভেতর থেকে একটা মোলায়েম ভারী স্বর ভেসে এলো,

“ইয়েস?”
“মে আই কাম ইন স্যার?”
“কাম ইন!”
দরজাটা ঠেলে মাথাটা কিঞ্চিত প্রবেশ করালো কাঞ্চন। গদি কালো চেয়ারে বসে আছেন এলেক্স। মোটা সোনালী ফ্রেমে ঢাকা চোখজোড়া তুলে সে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন ইতস্তত স্বরে শুধালো,
“আমি পারিজাত পটনভী। আমাকে খুঁজছিলেন স্যার!”
এলেক্স খুব শান্ত স্বরে বললেন,
“ও ইয়া! প্লিজ কাম এন্ড সিট”
কাঞ্চন ধীর পায়ে এগিয়ে এলেক্সের সামনের চেয়ড়ে বসলো। বুক ধুকপুক করছে। বিস্ময় আর কৌতুহলে মুখ ভোঁতা হয়ে আছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সামনে বসা মানুষটি নাগরিকত্ব অনুসারে অ্যামেরিকান। কিন্তু তার চেহারা, গঠনে অ্যামেরিকান ভাব নেই। বরং তাকে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের মতোই লাগছে। পাকিস্তানি এবং বাঙ্গালী একটা ভাব রয়েছে।

এলেক্সের চেহারাতে বয়সটা আন্দাজ করতে পারছে না কাঞ্চন। চুলে সাদা রঙ্গ ধরলেও সেটা বয়সের ছাপ বলা যায় না। শুভ্র চামড়া টানটান, ধারালো চোয়াল। সে খুব ই ফিট। মাথার একগাছা সাদাকালো মিশ্রিত ঘন চুল।
এলেক্সের লম্বাটে মুখশ্রীর সবথেকে আকর্ষণীয় বস্তুটি হলো তার চোখ। বাদামী রঙ্গের চোখ থেকে কোনো ভাবেই দৃষ্টি সরাতে পারছে না কাঞ্চন। ভাসা ভাসা চোখের স্থিরতাটা খুব আপন লাগছে, মোলায়েম লাগছে। যেন বহু বছরের চেনা মানুষ তার। অথচ লোকটিকে এই প্রথম দেখছে সে। বুকের ভেতর অজানা কারণে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। সেই ব্যথার কারণটা জানা নেই।
এলেক্স খুব শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কাঞ্চনের দিকে। তার দৃষ্টি কোমল। ঠোঁটে হাসি নেই। অথচ লোকটিকে খুব রাগী মনে হচ্ছে না। এলেক্স একটা ফাইল বের করলো। ফাইলে অনেকগুলো ছবি। তার মধ্যে কাঞ্চনের তোলা চারটে ছবি। ক্যাম্পাসের অনেক ছবি সে তুলেছে। এই ছবিগুলো তার ইন্সটাগ্রাম থেকে নেওয়া। এলেক্স ভারী স্বরে বললো,

“আমি তোমার এই চারটে ছবি ম্যাগাজিনের জন্য চ্যুজ করেছি!”
কাঞ্চন চমকালো। এলেক্সের বাংলা খুববেশি শুদ্ধ। বলে বিস্ময় চাপতে না পেরে বলেই ফেললো,
“আপনি বাংলা জানেন স্যার?”
এলেক্স হাসলো মৃদু। গা এলিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“অবাক হলে বুঝি!”
“না, আসলে সবাই বলছিলো আপনি এদেশীয় নন।”
“ঠিক বলেছে! কিন্তু আমি বাংলা বলতে পারি।”
কাঞ্চন খেয়াল করলো এলেক্স হাসলে তাকে আরোও বেশি কোমল দেখায়। হাসিটাও স্বচ্ছ। কাঞ্চনের বুকের ব্যথাটা বাড়লো যেন। লোকটির চোখে সে কি মমতা খুঁজছে। অথচ এই খোঁজ বড়ই অবান্তর। অহেতুক স্থানে মমতা খোঁজার মতো মেয়ে কাঞ্চন নয়। তবুও কেন যেন ইচ্ছে হচ্ছে, এই মানুষটি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তার খুব শান্তি লাগতো।
এলেক্স অমায়িক স্বরে বললো,

“তোমার মধ্যে ছবি তোলার একটা অস্বাভাবিক গুণ আছে, তুমি জানো সেটা?”
“গুণ কি না জানি না, তবে আমি মুহূর্তগুলোকে বন্দি করতে ভালোবাসি!”
“এমনটা কেন?”
এলেক্সের কণ্ঠে কৌতুহল। কাঞ্চন মাথাটা হালকা চুলকে বললো,
“খুব আধ্যাত্মিক বা ফিলোসোফিক্যাল কারণ নেই। তবে আমার মনে হয় আমার স্মৃতি সময়টাকে আটকে রাখতে পারে না। আজ যেই বিকালটা আমার কাছে চমৎকার লাগছে, বছর বাদে সেই বিকালের মুগ্ধতা আমার মস্তিষ্ক আমাকে অনুভব করাবে না। আমি ছবি তোলার সাথে ওই মুহূর্তটাকে, ওই অনুভূতিটাকে, ওই মুগ্ধতাটাকেও বন্দি করি। যেন যখন ইচ্ছে সেই জগতে যেতে পারি!”

এলেক্স স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে। এভাবে করে সে কখনোই তার কোনো ছাত্রছাত্রীর দিকে তাকায় না। তবে মেয়েটির প্রতি মমতা অনুভূত হচ্ছে। গোলগাল শুভ্র মুখ, শান্ত মুখশ্রীর আড়ালে একটা দুষ্টুমির ছাপ আছে। তবে চোখগুলো মায়া মায়া। তার চঞ্চলতার মধ্যেও বিষাদ লুকিয়ে আছে। এলেক্স সূক্ষ্ণ একটা টান অনুভূত হচ্ছে। মেয়েটির মধ্যে সে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে কি! বড্ড চেনা চেনা লাগছে মেয়েটিকে। যেন কোথাও দেখেছে। এমনটা কেন মনে হচ্ছে? এলেক্সের মানুষের মুখ মনে থাকে না। সে কখনো কাউকে আগ্রহ ভরে দেখেও না। তার কাছে সবারকে এক রকম মনে হয়। এই প্রথম কাউকে সে খুব আগ্রহ ভরে দেখছে। মেয়েটিকে তার পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথায় দেখেছে?
কাঞ্চনের অস্বস্তি লাগছে। সে কিঞ্চিত নার্ভাস। নার্ভাসনেসে কানের নিচটা চুলকাচ্ছে। ফলে হাত চলে যাচ্ছে সেখানে। ব্যাপারটাকে নিশ্চয় এলেক্স স্যার আনস্মার্ট বলে আখ্যা দিবেন। তিনি তাকিয়েও আছেন। নীরবতার পতন ঘটালো পিয়ন। সে কফির কাপ হাতে প্রবেশ করলো। এলেক্স নিজের চশমাটা ঠিক করে বললো,

“ফটোগ্রাফি ক্লাবে আছো?”
“না স্যার, আমি শখের বশে ফটোগ্রাফি করি।“
“শখের বশে বলে বিষয়টা নিয়ে হেলাফেলা করাটা উচিত হবে না। তোমার ছবিগুলো সুন্দর। লাইটিং এর একটা নলেজ তোমার মধ্যে আছে। ভিডিওগ্রাফিও করা হয়?”
“খুব একটা নয়, টিকটক-রিলস টাইপের।“
এলেক্সের দৃষ্টি আরোও গভীর হলো। মেয়েটির প্রতি যেন তীব্র আগ্রহ জন্মেছে তার। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে শুধালো,
“হোয়াটস ইউর ড্রিম?”
“ড্রিম?”
“আই ডোন্ট নো, বাট তোমাকে খুব এম্বিসিয়াস লাগছে না আমার। অন দ্যা আদার হ্যান্ড আমার মনে হচ্ছে তুমি খুব ড্রিমি।“

“আমার সুখ খুঁজতে ভালো লাগে। আমার একটাই লক্ষ্য টু বি হ্যাপি।“
কাঞ্চনের মধ্যকার জড়তাগুলো ধীরে ধীরে যেন উবে গেলো। এলেক্স গদি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। কোমল চোখে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। নরম গলায় শুধালো,
“ইউ আর কোয়াইট ইন্টারেস্টিং। কিছু খাবে? তোমার মুখটা শুকনো লাগছে।“
“না না স্যার। আমি কিছু খাবো না।“
“আচ্ছা তুমি সুখ কি করে খুঁজো? চাইলেই কি সুখী হওয়া যায়?”
এলেক্সের প্রশ্নে কিছুটা ভড়কালো কাঞ্চন। সে তো সুখী তো হতে চায় কিন্তু চাইলেই তো সুখী হওয়া যায় না। সুখ কি করে খুঁজে পাওয়া যায় সেটাও একটা রহস্য কাঞ্চনের কাছে। ফলে বিষন্ন স্বরে উত্তর দিলো,

“চেষ্টা তো করাই যায়।“
“একারণেই মোমেন্ট ক্যামেরাবন্দী কর?”
“হয়তো হ্যা।“
এলেক্স কফিটা শেষ করলো। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
“তুমি আগে আমার ক্লাস করেছো?”
কাঞ্চন মাথা দু পাশে দুলিয়ে বললো,
“না, স্যার!”
“তোমাকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে।”
কাঞ্চনের বুকটা ভার হয়ে গেলো। কিছুসময় চেয়ে রইলো এলেক্সের দিকে। এলেক্স হাসলেন মৃদু। সোনালি ফ্রেমটা খুলে বললেন,

“বয়সের প্রভাব হয়তো।“
কথাটা মিথ্যে। বয়সের প্রভাব নয়। তবুও মিথ্যেটা বলা প্রয়োজন। কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে সে খুব ধীর গলায় বললো,
“তুমি বলছিলে তুমি শর্টস বানাও। আর ইউ ইন্টু কন্টেন্ট ক্রিয়েশন?”
“হালকা পাতলা। খুব এক্সপার্ট বলবো না। কিন্তু ট্রাই করি।“
“কি ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েশন? ব্লগিং?”
কাঞ্চন ইতস্ততবোধ করলো। সে যা বানায় সেটাকে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বলা উচিত নয়। এলেক্স যেন ধরতে পারলো তার অস্বস্তি। কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললো,
“তোমার ছবিগুলো মোবাইলেই তোলা তাই না?”
“জ্বি স্যার।“
“ক্যামেরা, ড্রণ এগুলো?”
“না স্যার, আমি ওসবে কাজ করতে পারি না।“
“শিখবে?”
এলেক্সের প্রস্তাবে চকচক করে উঠলো কাঞ্চনের চোখ। গোলগোল চোখগুলোর মধ্যে একটা জ্বলজ্বলে ভাব চলে গেলো। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এলেক্সের মনে হলো একটা ছোটো খরগোশ তার পছন্দের গাজর খুঁজে পেয়েছে। মেয়েটির প্রতি মমতার পরিধি আরেকটু বাড়লো যেন। এলেক্স খুব মোলায়েম স্বরে বললো,

“ইউ ক্যান জয়েন ফটোগ্রাফি ক্লাব। আমি ওখানের এডমিন।“
“আমি তো অন্য ডিপার্টমেন্টের।“
“ডাজেন্ট ম্যাটার। প্রতি মঙ্গলবার পাঁচটায়। ভিডিওগ্রাফিতে আরেকটু এক্সপার্ট হলে ইউ ক্যান ক্যাটার নিউ অডিয়েন্স।“
এলেক্সের কথায় দ্বিগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কাঞ্চনের মুখ। তবে পরমুহূর্তেই ভোঁতা মুখে বললো,
“আমার ক্যামেরা নেই।“
“লাগবে না। আই উইল প্রোভাইড দ্যা ইক্যুইপমেন্ট।“
“ওকে স্যার। আমি জয়েন করবো।“
এলেক্স আবারোও হাসলো। কাঞ্চন ঘড়ির দিকে একবার চাইলো। তার ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে। এখন ই ক্লাসে যেতে হবে। “আসছি” বলেই দরজার কাছে চলে গেলো কাঞ্চন। দরজা খুলার সময় আবার পেছনে ফিরে তাকালো এলেক্সের দিকে। এলেক্সের দৃষ্টি এখনো মমতাময়ী। সে স্নেহভরে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফলে কাঞ্চন ছোট করে বললো,
“থ্যাংকিউ স্যার।“

মানুষ বিচিত্র। বিচিত্র বলেই তাদের চিন্তাগুলোও বিচিত্র। মানুষের মন পৃথিবীর জটিলতম সমীকরণ। সেই সমীকরণের উত্তর দেওয়া শুধু কঠিন-ই নয় দূর্বিষহ। তবুও মানুষের অন্যের মন বোঝার দায় ঘাড়ে নেয়। অন্যদের বোঝার জন্য এতোটাই বিবশ হয়ে পড়ে যে নিজের হৃদয়কেই বোঝার চেষ্টা করে না। রিদমের অবস্থাও তেমন। নিজের মনের জটিল সমীকরণ নিতে তার মোটেই মাথা ব্যথা নেই। বর্তমান মাথা ব্যথা পারভেজ পটনভী নামক ব্যক্তিটি। যে বর্তমানে পটনভী পরিবারে সে “দ্যা জেন্টালম্যান” বলে খ্যাত। পটনভী মঞ্জিলের সবাই তাকে বেশ স্নেহ করছে। যা চক্ষুশূলের মতো লাগছে রিদমের কাছে।
মুখে বললেও রিদমের তীব্র বিশ্বাস ছিলো পারভেজ পটনভীর সাথে পৃথুলার বিয়ে হবে না। পারভেজের মতো মানুষ কখনোই পৃথুলাকে বিয়ে করবে না। একজন পুরোদস্তর ভিন্ন সভ্যতায় বড় হওয়া ছেলে কখনোই পৃথুলার মতো আগাগোড়া বাঙ্গালীয়ানা মেয়ের প্রতি দূর্বল হবে না। পৃথুলার মধ্যে মেয়েলি ধরণের আচারণ থাকলেও তা সে প্রকটভাবে প্রকাশ করে না। সুতরাং পারভেজ বোর হয়ে যাবে। কিন্তু তার ধারণাকে সম্পূর্ণরুপে মিথ্যে প্রমাণিত করে দিলো পারভেজ। সে পৃথুলাকে বিয়ে করতে শুধু আগ্রহী-ই নয়, সে রীতিমত পৃথুলা এবং বাকিদের পটানোর পরিকল্পনাও করেছে। বিষয়টা উপলব্ধি হলো সকালে।

রাতে পৃথুলার জ্বর বাড়লো। পারদের স্থানাঙ্কে তা একশত তিন ছাড়ালো। জ্বরের ঘোরে পৃথুলা জ্ঞানশূণ্য। আবোল তাবোল কিছু বলছে কিন্তু অঞ্জনার পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। সে ভীত সন্ত্রস্ত ছুটলো বাবার কাছে। মেহেদী পটনভী অবস্থার অবনতি দেখে দ্রুত কিছু টেস্ট করানোর চিন্তা করলো। এক বোতল স্যালাইন এবং নাপাও তাকে ক্যানোলাতে দেওয়া হলো। পৃথুলার এমন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ভীত এবং চিন্তিত দেখালো রিদমকে। পৃথুলার এমন বিক্ষিপ্ত অবস্থার জন্য কোথাও না কোথাও তার দোষও রয়েছে। মেয়েটির শুষ্ক মূর্ছিত মুখখানা দেখাটাও তার কাছে ব্যথার কারণ। রিদমের জীবনের সবথেকে বড় ব্যথাই পৃথুলা।
দুপুর বারোটার পর পৃথুলার জ্বর একটু হলেও কমলো। ততসময়ে টেস্টের রিপোর্ট চলে এসেছে। মেহেদী পটনভী হাফ ছাড়লেন। চিন্তার কোনো কারণ নেই। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এমনটা হয়েছে। ইলিয়াস পটনভী মেয়ের অসুস্থতা তেমন গুরুতর নয় বিধায় হাফ ছাড়লেন। তবে রিদমের নিঃশ্বাস এখনো গলাতেই আটতে রইলো। পৃথুলার মলিন, বিষন্ন, ফ্যাকাশে মুখখানা যতবার দেখছে তার হৃদয়ের মধ্যিখানে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা হচ্ছে। সেই যন্ত্রণা ঘি লবণ ঢাললো পারভেজ। পৃথুলার কিছু খেতে পারছে না বিধায় সে রীতিমত পৃথুলার জন্য স্যুপ বানিয়েছে। পৃথুলা সেটা খেয়েছে খুব ভদ্রমেয়ের মতো। পটনভী মঞ্জিলের নারীদের মতে পারভেজের মতো ছেলেই পাওয়া ভার। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলো না সে, তাকবীর এবং ইকরামের সাথেও বেশ খাতির করার চেষ্টায় সে লিপ্ত। পৃথুলার সাথে রিদমের কথা বলাটাও যখন দুষ্কর, তখন এই মহাশয় তার অকথিত স্বামী বনে ঘুরলো। সীমা অতিক্রম তখন হলো যখন সে নিজেই রিদমকে বলল,

“ব্রো, আই থিংক আই ওয়ান্ট টু ম্যারি পৃথুলা।“
“আর ইউ শিওর।“
“ইয়েজ, আই এম।“
রিদম একটা বড়সড় ধাক্কা খেলো। এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ের সিদ্ধান্তে চলে যাওয়াটা মোটেই আশা করে নি রিদম। রিদম পারভেজের এমন দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। উপর থেকে পারভেজ যখন বললো,
“আমি পৃথুলাকে ইম্প্রেস করতে চাই।“
রিদমের অন্তস্থলের তীক্ষ্ণ ব্যথাটা তিক্তভাবে ছড়ালো। তবুও সে হাসি মুখে বললো,
“আমি কি করে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?”
“ইকরাম বললো, যদি কেউ পারে তবে সেটা তুমি। পৃথুলাকে তোমার থেকে ভালো কেউ চিনে না। আফটার অল তোমার বোন সে।“
বোন কথাটার উল্লেখে হাত মুঠোবন্দি করে ফেললো রিদম। তবে পারভেজের বলা কথাটা একেবারে সত্য নয়। পৃথুলাকে তার থেকে ভালো কেউ চিনে না কথাটা ভুল। তবে সে যেভাবে পৃথুলাকে চিনে অন্য কেউ সেভাবে চিনে না। ফলে রিদম পারভেজের ঘাড়ে হাত দিয়ে বললো,
“আর ইউ শিওর, তুমি পৃথুলাকে ইম্প্রেস করতে চাও?”
“হ্যা।“
“তাহলে তোমাকে তাই করতে হবে যা আমি বলবো।“

মানুষে মানুষে গিজগিজ করতে থাকা গলি। সেই গলির একদম শেষ মাথায় পুরোনো প্রায় ধ্বসে পড়া একটি ভবনের চলতে ওঠা দোকান। কাঠের টেবিলগুলো খুব পুরোনো। উপরে তেল চিটচিটে টেবিল ক্লথ। ক্যাটক্যাটে রঙ। একদম শেষ টেবিলে বসলো তাকবীর, রিদম, ইকরাম। পারভেজ বসলো না। সে মুখ বাঁকিয়ে প্রথমে দেখে নিলো পরিবেশটা। পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। টেবিলে পানি পড়ে আছে। একটা সবুজ বোতলের প্লাস্টিক তুলে ফেলা হয়েছে তাতে মুখ অবধি পানি ভরা। রিদম পারভেজের মুখের করুন দশা দেখে বললো,
“ব্রো এটা তোমার উড বি পছন্দের স্পট?”
“সিরিয়াসলি?”
“ইয়াপ।“
পারভেজ বসতে বসতে বলল,
“এখানে আমাকে কেন এনেছো?”

“যেন তুমি তোমার উড বি বউকে খুব ভালো করে চিনতে পারো। দেখো, মেয়ে মানুষ খুব ইমোশনাল। তাদের ইম্প্রেস করা এতোটা কঠিন নয়। তারা এক্সপেক্ট করে তুমি তাদের পেছনে একটু ইফোর্ট দাও। তারা না বলা সত্ত্বেও তুমি যদি তার পছন্দ, অপছন্দগুলো জেনে যাও এটাই তাদের কাছে তোমার সর্বোচ্চ ইফোর্ট। এতে করে বোঝা যায় তোমার কাছে তাদের গুরুত্ব অনেক। পৃথুলা এখন প্রায় সুস্থ। তুমি অসুস্থতার সময় তার সেবা করেছো। অলরেডি তোমার জন্য একটা সফট কর্নার তার মনে রয়েছে। এখন যদি তুমি তাকে নিয়ে তার পছন্দের জায়গায় ডেটে যাও পৃথুলার কাছে তোমার স্থান এখানে হবে।“
বলেই হাত উঁচু করে ধরলো। পারভেজ দ্বিধান্বিত স্বরে বলল,
“পৃথুলা এগুলো ভালোবাসে?”
রিদম মৃদু হেসে বলল,

“পৃথুলার পছন্দ অপছন্দগুলো খুব সাধারণ। ওর ফ্যান্সি জায়গা পছন্দ নয়। ও এটেনশন চায়। তুমি ওকে বিলাসিতার থেকে একটু খানি সময় দিবে, তাতেই সে হ্যাপি। মজার ব্যাপার হচ্ছে। ওর জীবনসঙ্গীর থেকে একটাই চাওয়া, তার চোখে নিজের প্রতিবিম্ব। তুমি ওকে নিয়ে চায়ের স্টলেও ঘুরতে যেতে পারবে। শি ইজ ডিমান্ডিং, বাট ম্যাটেরিয়ালিস্টিক না। হাই মেইন্টেনেন্স নয়। তুমি ওকে হিরার গলার হারের বদলে ফুলের মালা দিলেই গলে যাবে।“
তাকবীর এবং ইকরাম একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। তাকবীর একফাঁকে রিদমের কথাগুলো রেকর্ডও করলো। রিদম টের পেলো না। একটু বাদে চারপ্লেট চটপটি এলো। উপরে ডিম দেওয়া। এক চামচ খেতেই পারভেজের সাদা মুখটা লাল হয়ে গেলো। সে মোটেই ঝাল খায় না। খেতে পারে না। কিন্তু এটা শুধু ঝাল বললে ভুল হবে। একেবারে আগ্নেয়গিরি উল্কাপিন্ড। মুখে দিতেই ধোঁয়া ছুটলো। জিভ বের করে বললো,

“ইতনা স্পাইসি কিয়্যু হ্যায়?”
“এটাকে ফ্লেবার বলে ভাই। তোমার বিয়ে যার সাথে হচ্ছে সে এর থেকেও বেশি স্পাইসি। আপাতত একটু আয়ত্ত কর। আর তুমি পটনভী। পটনভীরা সিংহ। এই সামান্য চটপটি তোমাকে কাবু করতে পারে না।”
রিদম তাকে সাহস জুগাতে ব্যস্ত। পারভেজ খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠলো যেন। চোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে। গলা জ্বলছে। নাক থেকে পানি পড়ছে। সে নাক টানছে। গলা ভেঙ্গে গেলো প্লেটটা শেষ না হতেই। মাথার চুল টেনে বলল,
“তুমি বলেছিলে এটা টেস্টি ফুড। দিস ইজ চিটিং। চিটিং হ্যায়, চিটিং হ্যায়!”
পারভেজের অবস্থা এমন দেখে পাশ থেকে ইকরাম গেয়ে উঠলো,

“বালাম মেরে চিটার হো গায়ে”….
রিদম কঠিন চোখে তাকালো। সাথে সাথে একটা ফালুদা অর্ডার করলো। ফালুদা আসতেই সে পারভেজের দিকে ফালুদা এগিয়ে দিলো। ব্যগ্র স্বরে বলল,
“এটা খাও। ঝাল চলে যাবে।“
পারভেজ দু বাটি ফালুদা খেলো। তবুও তার অবস্থা খুব বেগতিক। শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়ি নিয়ে এলো তারা। তাকবীর রিদমের হাত টেনে বলল,
“তুই সত্যি করে বলতো, পারভেজকে তুই হেল্প করছিস নাকি ওকে ভাগানোর ফাঁদ আটছিস?”
“ওকে ভাগাবো কেন আমি?”
“সেটা তো তুমি জানো। আমি তো অন্তর্যামী নই।“
রিদম কপালের উপর পরে থাকা চুলগুলো ঠেলে বললো,

“শোন, আমি শুধু দেখছি ওর ফিলিংস রিয়েল কি না”
“তুই শাকচুন্নীর জন্য চিন্তিত?”
“হয়তো তাই।“
খুব মৃদু স্বরে বললো রিদম। তাকবীর কথাটা শুনতে পেলো না। ফলে শুধালো,
“কি বললি?”
“কিছু না।“
পারভেজের বিদেশী পেটে চটপটি সহ্য হলো না। ফলে পেট খারাপ হলো। টানা দশ থেকে বারোবার বাথরুমে আপ ডাউন করতে হলো বেচারার। পৃথুলা বিষয়টা জানতে পেরে রিদমের ঘরে গেলো। দরজায় কড়া নাড়তেই রিদম দরজা খুললো। পরণে একটা কালো ট্রাউজার। পৃথুলার রাগী মুখখানা দেখে রিদমের বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনা কি। তবুও নির্লিপ্ত স্বরে শুধালো,

“কি হয়েছে?”
“কি হয়েছে জানিস না?”
“তোর কি হয়েছে আমি কি করে জানবো?”
“তুই নাকি পারভেজকে ঝাল চটপটি খাইয়েছিস? কেন জানতে পারি?”
রিদম কোনো উত্তর দিলো না। অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রাখলো। পৃথুলার রাগে গা কাঁপছে। তবুও নিজেকে শক্ত রেখে খুব শীতল গলায় বললো,
“রিদম, আমি জানি না তোর কিসমিসের মতো ব্রেইনে কি চলছে! কিন্তু পারভেজের থেকে দূরে থাকবি। বেচারা তোর গিনিপিগ না।“
রিদম বিদ্রুপ করে শুধালো,

“বেচারা?”
“হ্যা, বেচারা। আর যদি কখনো ওর সাথে এমন ফাজলামি করতে দেখি আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।“
বলেই পা বাড়াতে নিলে রিদম তার হাতখানা খপ করে ধরে ফেললো। এতো শক্ত করে ধরলো যে পৃথুলার মনে হলো তার হাত ভেঙ্গে যাবে। শুধু তাই নয়, হ্যাচকা টান দিতেই পৃথুলার পাতলা শরীরটা টলমলিয়ে গেলো। হুমড়ি খেয়ে পড়লো রিদমের বুকের উপর। রিদমের শক্ত হাত তার কোমড় চেপে ধরলো। তীব্র বেগে স্পন্দিত হচ্ছে হৃদয়। বুকের ভেতর তুমুল আন্দোলন শুরু হলো। পৃথুলা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতেই রিদম শীতল গলায় বলল,
“এতো দরদ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলি?”
পৃথুলা চোখ তুলে চাইলো। তার চোখ কাঁপছে। ঠোঁটের উপরে ঘাম জমেছে। রিদমের শান্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ তার মুখশ্রীতে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে খুব দৃঢ় স্বরে বললো,

“যোগ্য মানুষের জন্য দেখাচ্ছি।“
“পারভেজ যোগ্য বুঝি?”
“তোর থেকে তো অনেক ভালো।“
রিদমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। কোমড়ে লেপ্টে থাকা হাতখানা সরিয়ে বলল,
“কংগ্রেচুলেশন। বিয়ে মোবারক।“
পৃথুলা বিমূঢ় চোখে তাকালো। রিদম তার কাঁধ ধরে তাকে দরজার বাহিরে দাঁড় করালো। কঠিন গলায় বললো,
“বেচারার কাছে যা। তোকে খুঁজছে মনে হয়।“

বিগত এক সপ্তাহ যাবত স্নিগ্ধ বাড়িতে নেই। লোকটি শুধু যে বাড়িতে নেই তাই নয়। তার কোনো খোঁজও নেই। না একটা ফোন, না একটা ম্যাসেজ। প্রতিদিনের মতো একবার কললিস্ট স্ক্রল করলো। না আজও লোকটা তাকে ফোন দেয় নি। কাঞ্চন যে তাকে খুব মিস করছে, ব্যাপারটা এমন নয়। সে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে খুব ব্যস্ত। এলেক্স স্যারের পরামর্শে ফটোগ্রাফী ক্লাবেও জয়েন হয়েছে। ফটোগ্রাফী ক্লাবে জয়েন হবার পর যা বুঝতে পারলো ছবি তোলা বা ভিডিওগ্রাফী করা একাগ্রতার ব্যাপার। এলেক্স স্যার খুব দক্ষ একটা মানুষ। তিনি দশবছর ফিল্ম মেকিং এর সাথে জড়িত ছিলেন। তার সাথে এগুলো নিয়ে কথা বলতেও খুব ভালো লাগে। তিনি অমায়িক মানুষ। ফলে স্নিগ্ধকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়! সে স্নিগ্ধকে নিয়ে মোটেই ভাবছে না।
এর মধ্যেই ফোনটা বেজে উঠলো। “Hubby” নামটা দেখতে চটজলদি ফোনটা ধরলো সে। ফলে ভারী স্বর ভেসে এলো,

“আমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলি বুঝি?”
এক সপ্তাহ পর এই লোকের ভারী স্বর কানে এলো। কাঞ্চন তার বুকের চাপা নিঃশ্বাসটা দমিয়ে রেখে শুধালো,
“আস্তো আছো?”
“আস্তো না থাকলে কি ভুত কথা বলছে!”
কাঞ্চন বেপরোয়া স্বরে বলল,
“তোমার বিশ্বাস নেই। দেখা যাবে ভুত হয়েও আমার ঘাড়ে চেপে বসবে! কেন ফোন দিয়েছো?”
“ওয়ার্নিং দিতে। আমি নেই বলে যেন জাতীয় পাখি হবার চেষ্টা করা না হয়। আমি না আসা পর্যন্ত উটপাখি হয়ে যেন থাকা হয়।”
“পারবো না, আর কিছু?”
আবারো নীরবতা। সেই নীরবতা বধ করে স্নিগ্ধ ধীর গলায় বলল,
“তোর সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে হচ্ছে।”

“সূর্য কি পশ্চিমে উঠলো?”
“আই নিড এনার্জি”
“আমার ঝগড়া কি ইলেক্ট্রোলাইট?”
“অমন-ই কিছু একটা।“
এর মধ্যে “উম্ম—উম্ম” একটা শব্দ পেলো কাঞ্চন। কিছু একটা সন্দেহ করে উৎকুণ্ঠিত স্বরে শুধালো,
“কিসের শব্দ?”
“কিছু না তো।“
শব্দটা মিলিয়ে গেলো যেন। আবারো ওপাশে শুধু স্নিগ্ধর গলা। কাঞ্চন চিন্তিত গলায় বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো? সত্যি করে বল।“
“আমার জন্য চিন্তা হচ্ছে ওয়াইফি?”
“আমার খেয়ে কাজের অভাব?”
“অনেক।“

“কি বোঝাতে চাচ্ছো? আমি অকর্মা?”
“সেটা সবাই জানে। কষ্ট করতে চাচ্ছি না।“
“তুমি সত্যি সত্যি আমার সাথে ঝগড়া করতে ফোন করেছো?”
“হ্যা। বিশ্বাস হচ্ছে না।“
স্নিগ্ধের কণ্ঠে কৌতুক। কাঞ্চন এবার চুপ করে গেলো। সে এই লোকের সাথে কথা বলবে না। কি আশা করেছিলো সে? স্নিগ্ধ তার খোঁজ নিবে? সে কেন এমন উটকো জিনিস আসা করে। স্নিগ্ধ এবার মৃদু হাসলো,
“কথা বলছিস না কেন? ব্যাটারি শেষ?“
“বলবো না আমি তোমার সাথে কথা।“
“আমি বলবো।“
“কি এমন বলবে শুনি?”
“এই যে আমার হাড্ডি কেমন আছে?”
কাঞ্চন থমকালো। বুকটা ধক করে উঠলো যেন। স্নিগ্ধ আবার শুধালো,

“আমার হাড্ডি কেমন আছে?”
“এক সপ্তাহ পর মনে পড়লো?”
স্নিগ্ধ হাসলো। ফিঁচেল স্বরে শুধালো,
“মিস করছিলি বুঝি?”
“না, মোটেই না। আমি অনেক ভালো আছি। ঘরে কি পরিমানে শান্তি তোমার আইডিয়াও নেই।“
“তাহলে একটা ব্যাড নিউজ।“
“কি?”
“আপনার শান্তির দিন শেষ। আমি পরশু বাড়ি আসছি।“
“সত্যি?”
“হুম।“
আবারও কিছু শব্দ কানে এলো কাঞ্চনের। কাঞ্চন কিছু শুধানোর আগেই স্নিগ্ধ বললো,
“রাখছি। সাবধানে থাকিস।“

কিছু বলার সুযোগ হলো না। ওপাশের মানুষটি ফোন কেঁটে দিলো। কাঞ্চন তার দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রাখলো। ফোনের দিকেই তাকিয়ে রইলো অনেকটা সময়।
ফোন কাঁটতেই স্নিগ্ধ এক অন্য মানুষে বদলে গেলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গেলো মেঝেতে মূর্ছিত মানুষটির দিকে। সে এগিয়ে এলো। হাটু গেড়ে বসলো লোকটির সামনে। লোকটির মুখ ফুলে গেছে। চোখের নিচে কালচিটে। স্নিগ্ধ শীতল স্বরে বললো,
“বলেছিলাম, শব্দ না করতে।“
লোকটি কথা বলতে পারলো না। গোঙ্গালো শুধু। স্নিগ্ধ কন্সটেবলকে ইশারা করতেই তারা তাকে তুলে চেয়ারে বসালো। লোকটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। ঠিক তার সামনে আরেকটি চেয়ারে স্নিগ্ধ বসলো। কিছুক্ষণ পূর্বে ফোনে কথা বলা মানুষটি আর সামনে বসে থাকা মানুষটির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। তার হিম চাহনীতে লোকটির শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত বয়ে গেলো। তার সামনে সরফরাজ পটনভী বসা। সে একটি সিগারেট ধরালো। আঙ্গুলের ফাঁকে সে জ্বলতে থাকলো। অথচ দৃষ্টি সরলো না। নীরবতা চিরলো ভারী স্বর,
“এবার এক এক করে সব বলে ফেল। লাস্ট বার জিজ্ঞেস করছি, এরপর মুখে কথা বলবো না।“

রাতের খাবার হাতে পারভেজের ঘরে পৃথুলা এসেছে। মামীরা তাকে জোর করে পাঠিয়েছে। পারভেজ বেচারা শয্যাশায়ী। তার প্রতি প্রতিটা মানুষের দরদ। পৃথুলাকে দেখেই পারভেজের চোখমুখ চকচক করে উঠলো। পৃথুলা খাবারের প্লেটটা রেখে শুধালো,
“এখন কেমন আছো?”
“অলরাইট।“
পৃথুলা মুখ নামিয়ে নিলো। অপরাধী স্বরে শুধালো,
“এমন পাগলামী কেন করলে? তুমি তো জানো তোমার পেটে সহ্য হবে না।“
“আই ওয়ান্ট টু ইম্প্রেস ইউ”
পৃথুলা থমকালো। এক অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরলো। পারভেজ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গাঢ় চাহনী। সেই চাহনীকে ভেদ করা সম্ভব নয়। পৃথুলার জড়তা বাড়লো। মৃদু স্বরে বললো,
“খেয়ে নাও। আরাম পাবে।“
সে উঠে যেতে নিলেই পারভেজ তার হাত টেনে ধরলো। পৃথুলা অবাক চোখে তাকাতেই পারভেজ বলল,
“আই নিড সামথিং এলস।“
“হুম?”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৬

পারভেজ উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এলো পৃথুলার দিকে। দাঁড়ালো ঠিক তার মুখোমুখি। তার গাঢ় দৃষ্টি পৃথুলার ঠোঁটের দিকে। এই চাহনী না বুঝতে পারার মতো বোকা পৃথুলা নয়। ফলে অস্বস্তি বাড়লো আরো। পৃথুলা নিজেকে ছাড়াতে নিলে পারভেজ আলতো করে ছুঁলো পৃথুলার গাল। মৃদু গলায় বলল,
“আই ওয়ান্ট এ কিস। দ্যাট উইল বি মাই মেডিসিন। মে আই।“………

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here