মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩৩
ফারহানা নিঝুম
“আমরা কোরিয়ায় কবে ফিরব?”
আব্রাহামের কর্মব্যস্তর মাঝখানে এসে দাঁড়ালো জুঁই। ল্যাপটপে কিছু কাজ করতে ব্যস্ত আব্রাহাম। ল্যাপটপের পর্দায় সারি সারি ফাইলপত্র , ব্যবসায়িক হিসাবনিকাশ আর অন্তহীন মেইলের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝেই এক টুকরো বিষণ্ণতা নিয়ে উপস্থিত হয় কন্যা। আব্রাহামকে কাজ করতে দেখে মুখখানি ম্লান হয়ে এলো কন্যার!
আব্রাহাম কন্যার প্রশ্নে ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি টেনে বলল,
“কেন? বোকা জুঁইফুলেল কি এখানে ভালো লাগছেনা?”
এই দেশ তার জন্মভূমি হলেও আজ যেন বড় অপরিচিত মনে হয়। জেসমিন বাদশাহ এবং আব্রাহাম দুজনেই কাজের চাপে নিমগ্ন। মিটিংয়ের পর মিটিং, আলোচনা, চুক্তি সব মিলিয়ে সময় যেন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
আর সে?সে যেন একা।সিউলে থাকলে অন্তত ঝুমঝুমের অদ্ভুতসব কাণ্ড, রিমঝিমের অবিরাম কথাবার্তা কিংবা শয্যের গম্ভীর মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র আচরণগুলো তাকে ব্যস্ত রাখত।
জুঁই ম্রিয়মাণ কন্ঠে বলে ওঠে,
“সত্যি আমার এখানে ভালো লাগছেনা!”
আব্রাহাম অবাক না হয়ে থাকতে পারল না। মেয়েটা ঠিক কতটা অবহেলিত ছিলো যার দরুন নিজের দেশ থেকে যাওয়ার জন্য এতটাই অস্থির হয়ে আছে!
আব্রাহাম ল্যাপটপ রেখে ধীর পদে এগিয়ে এলো জুঁইয়ের নিকটে! কন্যাকে সন্তর্পণে টেনে নিল নিজের বাহু বন্ধনে! আবদ্ধ করল ঘোর আবেশে!
পরিচিত সেই উষ্ণ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হতেই জুঁইয়ের সমগ্র সত্তায় সূক্ষ্ম এক কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। হৃদয়ের গভীরে অজানা এক প্রশান্তি ধীরে ধীরে স্থান করে নিল।
আব্রাহাম আপন নাজুক রমণী কে জড়িয়ে ধরেই তার মোলায়েম কেশরাশির ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে শুধোয়,
“এখানে ভালো লাগছেনা জুঁই ফুলের?”
জুঁই ডানে বায়ে মাথা নাড়িয়ে না জানায়।
“আমি মাশা, রিমঝিম ওদের কাছে যেতে চাই। এখানে ভীষণ একা লাগছে! তাছাড়া যে কাজে এসেছিলেন তা তো হয়নি!”
আব্রাহাম ভ্রু উঁচু করে শুধোয়,
“কোন কাজ?”
জুঁইয়ের মোমের মতো শরীরটা বুকের সাথে চেপে আছে আব্রাহাম। মেয়েটা অস্বস্তিতে গাট হয়ে শুধোয়,
“ওইযে বাবার বিজনেস রিলেটেড কিসব করতে এসেছিলেন!”
আব্রাহাম শুনলো। কিন্তু এই মূহুর্তে এই পুরুষের অন্যকিছুর প্রতি আগ্রহ নেই যতটা কন্যার ঠোঁট দুটোর দিকে। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় টকটকে ঠোঁট দুটো অকস্মাৎ আঁকড়ে ধরল। কন্যাকে যেন দ্রবীভূত শক্তিতে বশ করে নিয়েছে ক্ষণিকের মধ্যে!
জুঁই ঠকঠক করে কেঁপে উঠলো।তার কম্পন অনুভব করল পুরুষটি। সন্তর্পণে কোলে তুলে এগিয়ে গেল বিছানার সম্মুখে।
বন্ধ পাতা জোড়া খুলতেই নিজের সামনে আব্রাহামের স্নিগ্ধ মুখাবয়ব দেখতে পেলো! নিজেকে পেলো নরম শয্যায়!
শুষ্ক ঢোক পাকস্থলীতে নেমে গেল!
আব্রাহাম ওষ্ঠোদ্বয় বাড়িয়ে আবারো পেলব কপোলদ্বয় সিক্ত করে! অতঃপর কন্যার নরম আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল গুঁজে দিয়ে বলে,
“অনুমতি আছে?”
পুরুষটি কিসের অনুমতি চাচ্ছে তা জানতে বাকি নেই বোকা জুঁই ফুলের! দুর্বা ঘাসের ন্যায় নুইয়ে পড়ে।
“যদি বলি না, তাহলে?”
মুচকি হাসলো আব্রাহাম,
“তাহলে এই অদম নিঃশেষ হয়ে যাবে!”
জুঁই চমকে ওঠে।এই পুরুষ ছাড়া এমনিতেই তার গতি নেই। আজ হোক কাল হোক তাকে এই পুরুষটি আপন করে নিতে হবে। তাছাড়া জুঁই নিজেও তার প্রতি অনূভুতি অনুভব করে। তাহলে কিছু ঘটতে ক্ষতি কি?
জুঁইয়ের এই লাজুক মুখখানি দেখে সম্মতি পেয়ে গেল আব্রাহাম।
অতঃপর ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে পুরুষটির! হৃদয় জুড়ে কম্পন অনুভব করানোর ন্যায় পুরুষটির অবাধ বিচরণ চলল!
বড্ড অস্থির সেই স্পর্শে। বাইরে জোৎস্নার আলোয় সিক্ত হয়ে উঠেছে দুজনেই। একটুখানি শীতল বাতাস ছুঁয়ে যায় তাদের। জানান দেয় প্রণয়ের ঘোর রাত! পবিত্র মিলনের মূহুর্ত!
ঝুমঝুম নিভু নিভু চোখে তাকায় ওই অদ্ভুত চোখের দিকে। শয্যের নেশাতুর কন্ঠে বলা কথাটা শুনে শীতল হাওয়া যেনো অঙ্গ ছুঁয়ে যায় রমণীর।
ফোনটা নিয়ে পিছনে ঘুরতেই সর্বাঙ্গ অসাড় হয়ে আসছে ঝুমঝুমের।
চোখ দুটো কৌটা থেকে এই বুঝি বেরিয়ে এসে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাবে। মেরুর রঙের একটা টিশার্ট তার সাথে মিল রেখে ট্রাউজার প্যান্ট পরেছে শয্য। অগ্নিদগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে ঝুমঝুমের দিকে। এক পা দু’পা করে যত এগিয়ে আসছে ততই রেলিংয়ের সাথে চেপে যাচ্ছে ঝুমঝুম। ইতিমধ্যেই কান থেকে ফোনটা নামিয়ে এনেছে,ওপর পাশে প্রণয় নিজের বকবক করতেই বড় ব্যস্ত।
করিডোরজুড়ে গাঢ় নীরবতা নেমে এসেছে। রাতের নিস্তব্ধতা যেন সব শব্দ গিলে রেখে শুধু তাদের দুজনকে আলাদা করে রেখেছে। ঝুমঝুমের বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শ্বাস প্রশ্বাস ভারী, টানটান উত্তেজনায় ভেতরটা মরূভূমির মতো শুকিয়ে গেছে বক্ষঃস্থল।
শয্যের খুব ধীরে, অব্যর্থ নিশ্চুপ পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে তার দিকে। যতটা সে ঝুঁকে আসে, ঝুমঝুম ততটাই পিছিয়ে যায়, পিঠ দেয়ালের সঙ্গে লেগে যায় অবশেষে। তার হাতে ধরা ফোনটা শয্য এক ঝটকায় টেনে নিলে , ঝুমঝুমের সারা দেহে কেঁপে ওঠে।
শয্য ফোনটা কানে ধরে।
অপর প্রান্তে প্রণয় উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে ওঠে।
“তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ, ঝুমঝুম,,,তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ ভাবতেই ভালো লাগছে। তাছাড়া আমার অনেক কথা বলার আছে তোমাকে।”
কথাগুলো শুনে শয্যের চোখ দুটো সংকুচিত হয়ে ওঠে। ঠাণ্ডা আ’গুনের মতো দৃষ্টি নিয়ে সে আরো ঝুঁকে পড়ে ঝুমঝুমের মুখের দিকে। তাদের মধ্যে থাকা সেই ক্ষুদ্র দূরত্ব প্রায় বিলীন এক মুহূর্তে ঘুচে গেলে ঠোঁট মিলিয়ে যাওয়াটাই অবধারিত।
শয্য ফোনটা কানে রেখেই গাঢ়, ভারী কণ্ঠে গর্জে ওঠে।
“নেক্সট টাইম ইউ কল, আই উইল কিল ইউ।”
আর কোনো শব্দের সুযোগ না দিয়ে ঠাস করে ফোনটা বন্ধ করে দেয়। করিডোরের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে দু’জনে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। শয্যের গরম নিঃশ্বাস ঢেউ তুলছে ঝুমঝুমের মুখজুড়ে প্রতিটি শ্বাসে সে আরও অসহায়, আরও দিশাহারা। নিজেকে স্থির রাখতে ঝুমঝুম ডান হাতটি নিচের দিকে দেয়ালের গায়ে চেপে ধরে রেখেছে তবুও শরীরের ভেতরের আলোড়ন থেমে নেই।
শয্য মগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তার সুশ্রী, স্নিগ্ধ মুখের দিকে একটা ঘো’রলাগা নীরবতা ভাসছে তার দৃষ্টিতে।
শয্য অদ্ভুত রুক্ষ গলায় বলল।
“তুই কি চাস, আমি খুব বাজে কিছু করি?”
ঝুমঝুম দু’দিকে দ্রুত মাথা নাড়ল, নিঃশব্দে জানিয়ে দিল তার আপত্তি তার অস্বস্তি, তার ভয়, তার অনিশ্চয়তা সবই স্পষ্ট। শয্য কিছু করলে স’হ্য হবে না ঝুমঝুমের , বাঁধন হারা সমাজের চিন্তা নেই যার তার দ্বারা ভয়ংকর কিছু আশা করে সে। কিন্তু অক্ষরা তো সমাজের চিন্তা করে আর পরিবারেরও চিন্তা আছে মাথায়। ছোট হলেও কি হবে এতটা বুঝে তার পরিবারের সবাই কতটা কষ্ট পাবে জানলে শয্য এসব করছে!
শয্য ধীরে, আরও গভীর সুরে বলল।
“তাহলে এমন করছিস কেন? হোয়াই?”
ঝুমঝুমের দৃষ্টি নিচে নেমে গেল। শয্যের খরখরে ঠোঁটের রেখা, সেই নজর এসব কিছুই তার শরীরের ভেতর কাঁপন তুলছে। গায়ের লোমে শিহরণ নামে।
ঝুমঝুম প্রায় অস্ফুট, ভাঙা ভাঙা স্বরে আওড়াল।
“আ,,আপনি প্লিজ সরে দাঁড়ান, শয্য ভাইয়া!”
হঠাৎ শয্য মুখটা আরও কাছে আনল। কানের কাছে উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া রেখে হাস্কি স্বরে বলল।
“অ্যাম নট ইউর ব্রাদার। আই অ্যাম ইউর লাভার। প্রেমিক বুঝিস? ওইটা আমি।”
ঝুমঝুমের কম্পিত আঙুলে শক্তি ফিরে আসে। শ্বাস দ্রুত হচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে যেন দমবন্ধ করা উত্তাপে বন্দী। শয্য তখন হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত কোমলতায়, গালে নিজের গাল ছুঁইয়ে দিল। সেই ঘষায় ঝুমঝুমের শরীরের ভেতর যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়।
নেশাতুর গভীর কণ্ঠে শয্য ফিসফিস করে বলল।
“এভাবে আমাকে বেসামাল করে দিস না পরে সহ্য করতে পারবি না।”
ঝুমঝুম ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আপনি,,,ভুল করছেন! আপনার এসব করা উচিত হচ্ছে না! ফু আম্মু জানতে পারলে,,,
“আই ডোন্ট কেয়ার! এসব নিয়ে আমাকে বলতে আসিস না তুই। ওগুলো সামলানোর দায়িত্ব আমার।তুই শুধু আমাকে দেখ।”
ঝুমঝুম চকিতে দৃষ্টি তুলে ওই হ্যাজেলবর্ণের চক্ষুদ্বয়ে স্থির হয়! তৎক্ষণাৎ হুমকি স্বরূপ শয্য সর্পের ন্যায় হিসহিসালো,
“আর ওই প্রণয়ের আশেপাশেও যদি তোকে দেখেছি তাহলে আমি ঠিক কতটা ডমিনেটিং পার্সন তুই দেখতে পাবি!”
অতঃপর ঝড়ের বেগে হনহন পদক্ষেপে স্থান ত্যাগ করল শয্য! থ বনে কতক্ষন দাঁড়িয়ে রইল জানা নেই ঝুমঝুমের! সেই এই লোকটার হাত থেকে কিভাবে বাঁচবে? আদেও বাঁচতে পারবে তো?
বিশালায়তন জন্মদিনের আয়োজনটিকে যেন এক টুকরো রাজকীয় উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। সিউলের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত কায়দার খানের প্রাসাদোপম ভেন্যুটি আজ ঝলমল করছে অসংখ্য কৃষ্ণবর্ণ আলোকসজ্জায়। চারপাশে কেবল ব্ল্যাক থিমের আধিপত্য কালো গোলাপ, কালো সাটিনের পর্দা, কালো ক্রিস্টাল ডেকোরেশন, এমনকি অতিথিদের পোশাকেও একই রঙের প্রাধান্য।
আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি সুরাইয়া।
গভীর কৃষ্ণবর্ণের বিশাল গাউন জড়িয়ে যেন কোনো রাজকন্যার ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সে। গাউনের উপর বসানো হীরকখণ্ডের ঝিলিক আলোয় আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে। মুখমণ্ডলে প্রত্যাশা আর একরাশ উচ্ছ্বাস।
কারণ আজ শুধুই তার জন্মদিন নয়।
আজকের দিনটিকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন বানাতে চায়। অতিথিদের আগমন ক্রমেই বাড়ছে। দেশের খ্যাতনামা ব্যবসায়ী, অভিনেতা, গায়ক, সকলের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ভেন্যু।
ঠিক এমন সময় একের পর এক তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল প্রবেশপথে।
মুহূর্তেই মিডিয়াকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল তুমুল ব্যস্ততা।
ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠল।
কারণ গাড়ি থেকে নেমে এসেছে টিম আলফা।
সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে গেল।
সবার আগে নামল জিয়ান। পরণে নিখুঁত ফিটিংয়ের ব্ল্যাক স্যুট।তারপর হিউন জে। সবশেষে নামল শয্য।
কৃষ্ণবর্ণ থ্রি-পিস স্যুটে আবৃত দীর্ঘদেহী যুবকটিকে দেখে উপস্থিত বহু তরুণী রীতিমতো নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
হ্যাজেল বর্ণের চোখদুটি স্বভাবসুলভ শীতলতায় আচ্ছন্ন।মুখমণ্ডলে কোনো আবেগ নেই।যেন এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন।শয্যকে দেখামাত্রই সুরাইয়ার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল।প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গেল সে।
“শয্য!”
আবেগপ্রবণ কণ্ঠে ডেকে উঠেই সে শয্যের অত্যন্ত নিকটে চলে এলো।এমনকি বাহু স্পর্শ করারও চেষ্টা করল। কিন্তু শয্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ স্পষ্ট ভঙ্গিতে এক কদম পিছিয়ে গেল।দূরত্ব বজায় রেখেই বলল,
“হ্যাপি বার্থডে।”
অতঃপর হাতে ধরা গিফট বক্সটি এগিয়ে দিল।
সুরাইয়ার হাসি এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সে।অন্যদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ান আর হিউন জে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে হাসি চেপে রাখল।
হিউন জে নিচু স্বরে বলল,
“সিরিয়াসলি, এই মেয়ের কনফিডেন্স লেভেল দেখেছিস?”
জিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি দমন করল।
“আমি তো অবাক হই। মানুষ এতবার ইগনোর হওয়ার পরও কীভাবে হাল ছাড়ে না?”
হিউন জে মাথা নাড়ল কারণ তারা দুজনেই জানে
শয্য কখনোই সুরাইয়াকে সেই দৃষ্টিতে দেখেনি।দেখার কোনো সম্ভাবনাও নেই।বরং আসার পুরো পথজুড়েই শয্য স্পষ্ট জানিয়েছে তার এই পার্টিতে আসার কোনো ইচ্ছেই ছিল না।শুধুমাত্র কায়দার খানের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেনি বলেই এসেছে।
সুরাইয়া তখনও শয্যের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।
আর শয্য?সে চারপাশে তাকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন কাউকে খুঁজছে। কোনো এক অনুপস্থিত মুখকে।যে মুখটি এই হাজারো আলোর মাঝেও তার সমস্ত মনোযোগ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম। আর সেই কারণেই হয়তো, সুরাইয়ার উচ্ছ্বাসে ভরা জন্মদিনের উৎসবেও শয্যের চোখে-মুখে উৎসবের লেশমাত্র নেই। বরং কোথাও এক অদৃশ্য অস্থিরতা ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে।
“কিন্তু আমার ভীষণ ভয় করছে প্রণয়!”
কুন্ঠিত গলায় বলল ঝুমঝুম! এক অজানা আতঙ্ক তাকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে! মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নেরা! বারবার মনে হচ্ছে পার্টিতে যাওয়ার পর কি যে হবে! আচ্ছা ওখানে তো সকলে অনেক বড়বড় লোক থাকবে। পরিচিতরা থাকবে। ঝুমঝুম তো কাউকে চিনে না!
প্রণয় ঝুমঝুমের অস্বস্তিটুকু বুঝতে পেরে নিজের মতো করে বলে ওঠে,
“রিল্যাক্স মাশা। এতটা চিন্তা করছো কেন?”
ঝুমঝুম ইতস্তত করে বলল,
“ওখানে তো আমি কাউকেই চিনি না, প্রণয়। হুট করে যাওয়াটা কি ভালো দেখাবে?”
প্রণয় চওড়া হেসে ঝুমঝুমের হাতটা মুঠোয় ধরে বলল,
“উফ্ মাশা, আরে তুমি আমার সাথে যাচ্ছো। আমি আছি তো পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য!”
ঝুমঝুম খানিকটা স্বস্তি অনুভব করল, কিন্তু কোথাও একটা হাঁসফাঁস লাগছে। বারবার শয্যের ওই হ্যাজেলবর্ণের চক্ষুদ্বয়ের ধারালো চাহনি মানস পটে ভেসে আসছে!
কালো সাটিনের গাউন পরে ঝুমঝুম ধীর পদক্ষেপে প্রণয়ের হাত ধরে ভেন্যুর ভেতরে প্রবেশ করল। প্রবেশমাত্রই বিশাল হলঘরের জাঁকজমক, ঝুলন্ত ঝাড়বাতির সোনালি আলো আর অতিথিদের কোলাহল তাকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিল।
এটা কোনো সাধারণ জন্মদিন নয়।এটা ছিল এক অভিজাত ব্ল্যাক-থিমড গ্র্যান্ড বার্থডে পার্টি।চারপাশে চোখ বুলিয়ে ঝুমঝুম ধীরে ধীরে সবকিছু বুঝে নিতে চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকে গেল সামনের বিশাল দেয়ালজুড়ে লাগানো একটি পোস্টারে।কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর ঝলমলে অক্ষরে লেখা,
“হ্যাপি বার্থডে সুরাইয়া।”
পাশেই সুরাইয়ার বিশাল এক ছবি, রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়ানো।ঝুমঝুমের ঠোঁট অনিচ্ছাকৃতভাবে আলাদা হয়ে গেল।মস্তিষ্ক যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল।
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তিকর শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল।
অজান্তেই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো,
“বস্তির মাইয়া,সুরাইয়া?”
প্রণয় মুহূর্তেই থমকে তাকাল।
“কি বলছো? চলো ভেতরে আসো।”
ঝুমঝুম কিন্তু নড়ছে না।তার দৃষ্টি এখনও পোস্টারের দিকেই স্থির।মাথার ভেতর চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
সুরাইয়া প্রণয়ের কাজিন?প্রণয় তাকে কখনো বলেনি!
ঠিক তখনই ভেতর থেকে এগিয়ে এলো সুরাইয়া।
পরনে সেই একই কালো গাউন, চোখে উজ্জ্বল আত্মবিশ্বাস।
সে প্রণয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে আলতোভাবে তাকে জড়িয়ে ধরল। প্রণয় হাসিমুখে বলল,
“হ্যাপি বার্থডে আপু! উইশ ইউ মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্য ডে!”
ঝুমঝুম তখনও স্থির।চোখ বড় বড় হয়ে গেছে তার।
এটা কীভাবে সম্ভব?তার মানে সুরাইয়া প্রণয়ের কাজিন সিস্টার?এই তথ্যটা তো প্রণয় কখনো দেয়নি!
আর তখনই তার মাথায় আরও একটি চিন্তা আঘাত করল।
শয্য।গতকাল ফোনে শয্য স্পষ্ট বলেছিল সে এই পার্টিতে আসছে! তারমানে সেও এখানে আছে? ও শিট!
ঝুমঝুমের দিকে তাকাতেই সুরাইয়ার মনে পড়ে গেল সে সেদিন তাকেই তো শয্যের বাড়িতে দেখেছিল!
“তুমি? তোমাকে তো আমি আগে দেখেছি! ইয়েস শয্যের বাড়িতে দেখেছিলাম!”
প্রণয় আগের ন্যায় উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,
“হ্যাঁ আপু।ওর নাম ঝুমঝুম, ঝুমঝুম বাদশাহ। জুনেদ শয্য বাদশাহর কাজিন সিস্টার!”
সুরাইয়া বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকালো ঝুমঝুমের দিকে। অতঃপর একরাশ হতাশা নিয়ে বলল,
“শয্য তো কখনো বলেনি তোমার কথা!”
প্রণয় সুরাইয়ার হাত ধরে পাশে ঠেলে নিয়ে গেল কিছু একটা বলার উদ্দেশ্য।
এদিকে ঝুমঝুম ঠকঠক করে কাঁপছে। শয্য তাকে এমনিতেই গতরাতে হুমকি দিয়েছে প্রণয়ের থেকে দূরে থাকতে। এখন যদি দেখতে পায় তারই সাথে বার্থ ডে পার্টিতে এসেছে তাহলে হয়ে গেল!
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩২
অদূরে দাঁড়ানো জিয়ান মেহবুবকে কিছু একটা বলতে ব্যস্ত। এমন সময় পিছন ফিরতেই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা খেলো! তৎক্ষণাৎ অস্থির চিত্তে বলে,
“আই অ্যাম সরি,,,আ…
দৃষ্টি ঘুরিয়ে আপাদমস্তক কন্যাকে দেখে চক্ষুদ্বয় সঙ্কুচিত হয়ে এলো জিয়ানের! বিস্তারিত নেত্রে চেয়ে বলে,
“মাশা? তুমি এখানে?”
