প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৪
সাইদা মুন
রাত বাজে একটার ও বেশি। সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে তখনও বসে আছে সব ছেলে-মেয়ে। বাড়ির মহিলারা অবশ্য এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভোরে উঠতে হবে, কাজের তো আর শেষ নেই। মেহমানরাও ঘুমিয়ে গেছে নাচগান হাসিঠাট্টা করে ক্লান্ত সকলেই। বাইরে বাড়ির কর্তারা ব্যস্ত বিয়ের আয়োজন নিয়ে। রান্নার লোকজনকে সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কোন রান্না কখন বসবে, কীভাবে কী করতে হবে, এসব নিয়েই চলছে ব্যস্ততা। এখন সবকিছু কেটেকুটে রাখছে। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই রান্না বসবে। কম রান্না তো নয়, কত রকমের পদ। দুপুরের মধ্যেই আবার মেহমান আসা শুরু করবে।
অন্যদিকে ড্রয়িংরুমে চলছে তুমুল ঝগড়া,
—শেষ কথা তোমরা চিটিং করে জিতছো। কোনো ডেয়ার-ফেয়ার আমরা মানতে পারব না।
রাফি এতক্ষণ সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। এবার সোজা হয়ে বসে মুখ ঝামটা মেরে বলল,
—হপ! বেশি কথা কয়। তোদের মাইয়ামানুষদের এক লাইনের কথা দশ লাইন না বললে চলে না?
রাফা সঙ্গে সঙ্গে তেতে উঠল,
—এই! কথায় কথায় আমাদের অপমান করবেন না।
রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে চেহারা বিকৃত করে বলল,
—একশোবার করব। কী করবে?
রাফা রাগে আঙুল তুলে কিছু বলতে গিয়েও শেষমেশ হাত নামিয়ে ফেলল। তারপর অসহায় চোখে চাইল তাহিয়ার দিকে৷ তাহিয়া চাইল ভাইয়ের দিকে ঠোঁটটা উল্টে বলল,
—ভাইয়া, দেখো না। ওরা চিটিং করেও এখন বলছে ডেয়ার দেবে।
সঙ্গে সঙ্গে ফারিস বলে উঠল,
—চিটিং হতো যদি তোমরা আমাদের ভালো গান দিতে। তোমরাও উল্টাপাল্টা গান দিয়েছো, আমরাও দিয়েছি। সো, হিসাব বরাবর। এবার পারফরম্যান্সের কথা ধরো, এদিক দিয়ে তোমরা নাচতে পারোনি, কিন্তু আমরা পেরেছি। সো, জিতেছি আমরাই।
তালহা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। এবার ঠোঁট চেপে একটু ভেবে বলল,
—ফারিসের কথা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
—ভাইয়ায়ায়া! তুমিও ওদের দলে?
রিশাদ হেসে বলল,
—আচ্ছা, তোদের বেশি কঠিন কোনো ডেয়ার দেব না। শুধু আমাদের সবার জন্য মজা করে চা আর সঙ্গে কিছু বানিয়ে নিয়ে আয়। এটুকু তো পারবিই।
কথাটা শুনতেই মেয়েদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাহিয়া লাফ দিয়ে উঠে বলল,
—চা তো এমনিতেই বানাতে যেতাম। যেহেতু ডেয়ার দিয়েই দিয়েছ এক্ষুণি যাচ্ছি।
বলেই তাহিয়া, তনিমা, ফারিন, রাফা আর ফারিহা পাঁচজন একসঙ্গে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। রান্নাঘরে ঢুকেই শুরু হয়ে গেল কর্মযজ্ঞ। একজন চায়ের পানি বসাল, একজন আলু ছাড়াতে শুরু করল। দুজন মিলে আলু কুচিকুচি করে কাটতে বসল। আরেকজন চায়ের কাপগুলো ধুয়ে গুছিয়ে রাখছে। চায়ের সঙ্গে হবে আলুর বড়া।
মেয়েরা যে যার কাজে ব্যস্ত। এর মধ্যেই মেহরীনও রান্নাঘরে এসে হাজির হলো। সে বসে থাকার পাত্রী নয়। আলু কাটা শেষ হতেই লবণ, বেসন, হলুদ, মরিচ আর টেস্টি সল্ট দিয়ে আলুগুলো মাখিয়ে দিল সে। সঙ্গে দিল সামান্য ধনেপাতা কুচি। তাওয়ায় তেল গরম হতেই একে একে ছোট ছোট গোল গোল করে আলুর মিশ্রণ তেলে ছাড়তে শুরু করল মেহরীন। তাহিয়া পাশে দাঁড়িয়ে সেগুলো উল্টেপাল্টে দিচ্ছে। রান্নার পাশাপাশি চলছে তাদের জমজমাট গল্প-আড্ডাও। ওদিকে চায়ের পানি ফুটে উঠতেই ফারিন চাপাতা দিয়ে দিল। রাফা একে একে দুধ আর চিনি বের করে দিতেই তনিমা সেগুলো মিশিয়ে রাখল। লিকার তৈরি হলেই তাতে ঢালা হবে।
ফারিহা এর মধ্যে গুনে দেখে নিয়েছে মোট কতজন আছে। সেই অনুযায়ী দুটো ট্রেতে কাপ সাজিয়ে রাখল। আরেকটা ট্রেতে নিল বিস্কুট আর চানাচুর। এভাবেই হাসি-ঠাট্টা আর হাত লাগিয়ে বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল তাদের নাস্তার আয়োজন। একেকজন একেকটা ট্রে হাতে করে ড্রয়িংরুমে ফিরতেই ছেলেদের মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠল। চায়ের ট্রে টি-টেবিলে রাখা হলো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ছেলেদের কেউই কাপ হাতে নিচ্ছে না!
তা দেখে তনিমা কোমরে হাত রেখে বলল,
—কী ব্যাপার? এত কষ্ট করে, গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়ে আনলাম আমরা। আপনারা চা নিচ্ছেন না কেন?
তাহসান পায়ের ওপর পা তুলে বেশ গম্ভীর মুখে বসে ছিল। নির্বিকারভাবে বলল,
—তো আমাদের পরিবেশন করো।
তনিমার চোখ কপালে উঠল,
—কিইই? এখন পরিবেশনও করতে হবে?
তুর্য সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—আবার জিগায়। ফাস্ট করো।
রাগে নাকের পাটা ফুলিয়ে একে একে সবাইকে চা দিতে শুরু করল মেয়েরা। রাফা দাঁড়িয়ে ছিল রাফির ঠিক সামনে। ইচ্ছে করেই একটা কাপ তুলে রাফির সামনে ধরল। রাফি যেই না কাপটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছে, অমনি রাফা সেটা পাশের জনকে দিয়ে দিল। রাফি ভ্রু কুঁচকাল। কিছুক্ষণ পর আবার একটা কাপ নিয়ে তার সামনে ধরল রাফা। রাফি এবারও নিতে হাত বাড়াতেই সে সেটাও অন্যজনকে দিয়ে দিল। তিনবার একই কাণ্ড করার পর রাফি এবার রেগেমেগে বুকের ওপর হাত গুঁজে বসে রইল। ত্তা দেখে রাফা ফিক করে হেসে ফেলল।
মেহরীন তখন তালহার পাশে বসে সব দেখছিল। সেখান থেকেই হেসে বলল,
—আমার বন্ধুটাকে আর অপমান করো না। এবার কিন্তু কেঁদেই ফেলবে বেচারা।
সঙ্গে সঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। রাফির মুখটা আরও ফুলে গেল। শেষমেশ রাফা একটা কাপ তার সামনে ধরল। রাফি এবারও নিল না। রাফা বলল,
—আরে নেন নেন। এবার আপনাকেই দিচ্ছি।
রাফি মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
—লাগবে না। আমি যার-তার হাতের চা খাই না।
কথাটা শুনে রাফার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সরু চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কেটে বলল,
—তাহলে খেতে হবে না চা।
বলেই কাপটা নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু রাফি ছোঁ মেরে তার হাত থেকে কাপটা নিয়ে নিল। এক চুমুক দিয়ে খুব আস্তে করে বলল,
—তবে তোমার হাতের চা বলে খাচ্ছি।
চারপাশে তখন সবাই খাওয়া-দাওয়া আর গল্পে ব্যস্ত। কারও কানে কথাটা গেল না। শুধু একজনের কানে গেল, রাফার। সে যেন হঠাৎ জায়গাতেই থেমে গেল। ধীরে ধীরে একপলক তাকাল রাফির দিকে। রাফি তখন ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটা টেডি স্মাইল নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ রাফার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কিছু না বলে দ্রুত সরে গিয়ে তাহিয়ার পাশে বসে পড়ল সে। আর রাফি? বেশ আয়েশ করে নিজের হাতে ধরা সেই চায়ের কাপে আরেক চুমুক দিল।
সকলে তখন গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর চা-নাস্তায় মেতে আছে। খাওয়াদাওয়ার একেবারে শেষ পর্যায়ে আচমকাই ফারিস উঠে দাঁড়াল। তালহার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তালহা, মে আই?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তার পিঠে চাপড় মেরে বলল,
—তালহা কী? তালহা ভাই ডাকবি, ভাই!
বলেই নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তাদের পিছু পিছু তাহসানও উঠে গেল। তাদের চলে যাওয়ার দিকে সবাই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। কী নিয়ে কথা বলল তারা, কেউই বুঝতে পারল না। এর মধ্যেই মেহেদি কোথা থেকে যেন মাঝারি আকারের একটা লাল গোলাপ ফুলের তোড়া এনে ফারিসের হাতে ধরিয়ে দিল। ফুলের তোড়াটা তার হাতে দেখতেই তাহিয়ার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। মুহূর্তেই যেন শরীরটা জমে গেল তার। আন্দাজ করতে পারছে কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই যদি সেটা ঘটে, তাহলে কীভাবে সামলাবে নিজেকে? অস্থিরতায় সে ওড়নার একাংশ খামচে ধরল। তারপর আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে চাইল না, দ্রুত উঠে দাঁড়াল। এই জায়গা থেকে চলে যেতে পা বাড়াল।
কিন্তু পা বাড়ানোর আগেই পেছন থেকে ফারিসের ডাক এলো,
—তাহিয়া..
তাহিয়ার পা থেমে গেল। আর এগোতে পারল না। চারপাশটাও মুহূর্তে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই বুঝে-শুনেই যেন ফারিসকে সুযোগ করে দিল। ফারিস এবার আরও নিচু স্বরে বলল,
—এদিকে ফেরো…
তাহিয়া নড়ল না। বরং আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফারিস এবার মৃদু হেসে বলল,
—তুমি কি চাচ্ছো তোমার চাচ্চুরা এসে এসব দেখুক? ওরা কিন্তু যেকোনো সময় ভেতরে চলে আসতে পারেন।
চাচাদের কথা শুনতেই তাহিয়া দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। আর ঘুরেই থমকে গেল। ফারিস এক হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তাহিয়া ফিরতেই ফারিসের মুখে ফুটে উঠল মিষ্টি এক হাসি। তাহিয়া এমন পরিস্থিতিই ভেবেছিল কিন্তু এতটা ভাবেনি। ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে তোতলানো গলায় বলল,
—ক…কী?
ফারিস ধীরে ধীরে ফুলের তোড়াটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল,
—আমি তোমাকে আমার ঘরে তুলতে চাই, তাহিয়া।
তাহিয়া দুহাত শক্ত করে জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর অস্থিরতা যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কথাটা শুনতেই কান গরম হয়ে উঠেছে। মুখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে এর আগে কখনো পড়েনি সে,তাও আবার এতজনের সামনে। অসহায় চোখে মেহরীনের দিকে তাকাল। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মৃদু হেসে বলল,
—ফুলটা নে, তাহিয়া।
তার সঙ্গে সঙ্গে একে একে বাকিরাও বলতে লাগল,
—নে ফুলটা।
—ফুলটা নে তাহু!
অবশেষে কাঁপা হাতে ফুলের তোড়াটা নিল তাহিয়া। তখনই ফারিস পকেট থেকে একটা ছোট রিংবক্স বের করল। বক্সটা খুলে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
—উইল ইউ ম্যারি মি?
তাহিয়ার কানে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। হকচকিয়ে চাইল ফারিসের দিকে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকে দেখতে দেখতে ফুলের তোড়াটা শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। আঙুলগুলো দিয়ে কাগজ খামচে ধরে আছে। ফারিসের মুখের হাসি দেখে মাথা নিচু করে ফেলল। লজ্জায় মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। ফারিস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবারও নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
—উইল ইউ ম্যারি মি, তাহিয়া?
তাহিয়া এবার আরও নিচু করে ফেলল মাথা। শরীরটা হালকা কাঁপছে। এমন কিছু ধারণার বাহিরে তার। এভাবে ডিরেক্ট বিয়ের প্রপোজাল দিবে ফারিস? ভাবেনি কোনোদিন। কী উত্তর দেবে, যেন সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না। আরও কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফারিস তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
—প্লিজ, উত্তর দাও তাহিয়া…
মেহরীন এবার এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়া মেহরীনের সঙ্গে একেবারে লেগে গেল। মেহরীন ধীরে ধীরে বলল,
—এত হাইপার হচ্ছিস কেন, গাধি? তোর মনে যা আছে, সেটাই নির্দ্বিধায় বলে দে। হ্যাঁ হলে হ্যাঁ না হলে না।
তাহিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
—আম্মু আর ভাইয়া ছাড়া আমি এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না…
বাকিটা আর বলতে হলো না। ফারিস সঙ্গে সঙ্গেই মুচকি হেসে বলল,
—আমাকে কি এতই দুর্বল ভেবেছো? দড়ি শক্ত করে গিঁট দিয়েই এসেছি, ম্যাডাম।
তাহিয়া দ্রুত মাথা তুলল,
—মানে?
ফারিসের হাসিটা আরও প্রশস্ত হলো,
—তোমার বাড়ির লোকেদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই কথা হয়েছে। মেয়ে রাজি হলে তারাও রাজি, এটাই বলেছেন। তো এবার মেয়ে বলুন, আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি?
তাহিয়ার চোখ মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। অবিশ্বাস আর আনন্দ মেশানো চোখে একবার মেহরীনের দিকে তাকাল, আবার মেহেদির দিকে। বিশ্বাস করতে পারছে না তার পরিবার ও রাজি তবে। কিন্তু কথা কখন বললো সে কেন জানেনা কিছু। মেহেদি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে যেন সে কিছুই জানে না। মেহরীন ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে। তাহিয়া অবাক গলায় প্রশ্ন করল,
—তোরা..সব জানতি?
মেহরীন আমতা-আমতা করে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ফারিস বলে উঠল,
—ওদের আমিই বলতে নিষেধ করেছিলাম। এবার প্লিজ তাড়াতাড়ি উত্তর দাও। কেউ চলে আসার আগেই।
তাহিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে নিজেকে সামলে অবশেষে খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বলল,
—ক… র… ব… বিয়ে…
শব্দগুলো স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে না থাকলে এতক্ষণে হয়তো পুরো বাড়িটাই চিৎকারে মাথায় তুলে ফেলত! ফারিসের চোখেমুখেও তখন আনন্দের ঝিলিক। সে রিংটা হাতে নিল। তারপর বাম হাত বাড়িয়ে ইশারা করতেই তাহিয়া কাঁপা কাঁপা হাতটা এগিয়ে দিল। ফারিস সযত্নে তার হাতটা ধরল। ধীরে ধীরে আঙুলে রিংটা পরিয়ে দিল। তারপর আচমকাই হাতের পিঠে আলতো করে চুমু খেতেই তাহিয়া লজ্জায় এক টানে হাতটা নিজের কাছে টেনে নিল। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফারিস হেসে উঠে দাঁড়াল।
অন্যদিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা তালহা আর তাহসান এতক্ষণ নীরবে সব দেখছিল। একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল। তাহসান ধীর গলায় বলল,
—তাহিয়াটা কত বড় হয়ে গেছে, তাই না?
তালহা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—হুম। খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেছে।
তালহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তাহসানও গেল। এদিকে তাহিয়া আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে একছুটে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তার পেছন পেছন বাকি মেয়েরাও ছুটল।
ফারিস কিছুক্ষণ তার যাওয়ার পানে চেয়ে থেকে অতঃপর মাথা চুলকে মেহেদি, রাফি, রিশাদদের দিকে তাকাল। সবাই টিটকারি মারা শুরু করতেই সেও লজ্জামিশ্রিত হাসল। তারপর তাদের নিয়ে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। দুদিন থেকে তারা ফারিসদের বাড়িতেই থাকছে। সিকদার বাড়িতে মানুষে মানুষে গিজগিজ। তাই ফারিসই সবাইকে নিজের বাড়িতে থাকার দাওয়াত দিয়েছে। তারাও রাতটুকু একটু আরামে থাকতে ফারিসের বাড়িতেই থাকে।
একে একে সবাই যেতেই বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে সিকদার বাড়িতে আরও একটি নতুন সম্পর্কের গল্প শুরু হয়ে গেল।
মেহরীন বউ সেজে বসে আছে আয়নার সামনে। জীবনে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বধূবেশে সাজা তার। প্রথমবারের সাজটা ছিল পরিস্থিতির, আর আজকের সাজটা… সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছের। একটু আগেই পার্লারের মেয়েরা তাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে।
গায়ে গাঢ় রক্তিম লাল রঙের ভারী লেহেঙ্গা। পুরো কাপড়জুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি জরির নকশা, তার ওপর বসানো ঝলমলে পাথরের কাজ। ঘরের নরম আলো পড়তেই প্রতিটি পাথর যেন আলাদা করে জ্বলে উঠছে। লেহেঙ্গার প্রশস্ত ঘেরজুড়ে ভারী কারুকাজ, আর কিনারাজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি নকশা। লাল দোপাট্টার চারপাশেও পাথর আর জরির ভারী বর্ডার। সব মিলিয়ে যেন রাজকীয় এক সাজ। মেহরীন আয়নায় নিজেকেই দেখছে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই লেগে আছে একচিলতে হাসি। আজকের দিনটা যেন এখনও তার কাছে স্বপ্নের মতোই লাগছে।
ভাবনার মাঝে সে টেরই পায়নি, কখন যে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তালহা। কালো কোট-স্যুটে, একেবারে ফরমাল গেটআপে দাঁড়িয়ে আছে সে। দুহাত বুকের ওপর গুঁজে পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একমনে দেখছিল নিজের বউকে। শেষমেশ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
—ম্যাম, হয়েছে আপনার?
আচমকা তালহার কণ্ঠ শুনে ধ্যান ভাঙল মেহরীনের। তড়িৎ করে পেছনে ফিরতেই চোখে পড়ল তাকে। মুহূর্তেই মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল উজ্জ্বল এক হাসি,
—এই তো, শেষ। ঠোঁটে একটু টাচ-আপ দিয়ে নিই।
বলতে বলতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর রাখা লিপস্টিকটা হাতে তুলে নিল সে। আয়নাটার দিকে একটু ঝুকে মনোযোগ দিয়ে আবারও ঠোঁটে লাল রঙটা ছুঁইয়ে দিতে লাগল। পেছন থেকে তালহা মুচকি হেসে সবটা দেখছিল। কী অদ্ভুত মনোযোগ! যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই করছে মেয়েটা। হঠাৎই ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঠিক তার পেছনে দাঁড়াল সে। আয়নার ভেতর দুজনের চোখ এক হয়ে গেল। তালহার দৃষ্টি আটকে মেহরীনের মুখে। এতটা মুগ্ধ হয়ে সে শেষ কবে কাউকে দেখেছে, তা তার নিজেরও মনে নেই। খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে সে বলল,
—একটা কথা বলি, ম্যাম?
মেহরীন লিপস্টিকের ঢাকনা লাগাতে লাগাতে আয়নার দিকেই তাকিয়ে হাসল অনুমতি দিল,
—জ্বি স্যার বলুন।
তালহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
—আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে লাল রঙটা বোধহয় আপনার জন্যই তৈরি হয়েছিল।
মেহরীনের হাত থেমে গেল। তার গাল দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল। ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে হাসল সে। চোখ সরিয়ে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৩
—এত প্রশংসা করলে কিন্তু মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে, মিস্টার সিকদার।
তালহা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—মেকআপ নষ্ট হলেও সমস্যা নেই আপনি ন্যাচারাল সুন্দরি….
