Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৮
আয়াত বিনতে নূর

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফারিস এসে হাজির হলো নিশিতার সামনে—তবে যেন একটু ভিন্ন রূপে।
গায়ে জড়ানো লাল-সাদার মিশেলে তৈরি পরিপাটি ও মার্জিত একটি পাঞ্জাবি। পোশাকের সরলতার মাঝেও তার ব্যক্তিত্বের সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য একটুও কমেনি। বরং আজ যেন তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। এক হাতে চুলগুলো ধীরে ধীরে ব্যাক ব্রাশ করছিল সে। আঙুলের ফাঁক গলে চুলগুলো পেছনে সরে যাচ্ছিল, আবার বাতাসের মৃদু দোলায় কয়েক গোছা চুল এসে কপালের কাছে নেমে পড়ছিল।
নিশিতার দৃষ্টি সেখানেই আটকে গেল।
কেন জানি হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল তার।
নিশ্বাস নেওয়ার কথাটুকুও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল নিশিতা। ছোট্ট হৃদয়টা অকারণে দ্রুত ছন্দে ধুকপুক করতে শুরু করেছে। এতটা দ্রুত কেন? নিজেই বুঝতে পারছে না সে।
এমন তো নয় যে ফারিসকে আজই প্রথম দেখছে।

এই মানুষটাকে সে এর আগেও অসংখ্যবার দেখেছে। প্রতিদিনের চেনা মুখ, চেনা চোখ, চেনা গম্ভীর অভিব্যক্তি। অথচ আজ কেন তাকে এতটা আলাদা লাগছে?
নিশিতার গাল দুটো অজান্তেই লাল হয়ে উঠল। শরীরের ভেতরটা কেমন উষ্ণ হয়ে আসছে। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়ছে, যার কোনো ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেই নেই।
আর তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে থামছে ফারিসের গলার কাছে। গম্ভীর মুখাবয়ব, শক্ত চোয়াল আর গলার স্পষ্ট রেখা—সবকিছু মিলিয়ে আজকের ফারিস যেন নিশিতার চোখে নতুন করে ধরা দিয়েছে।
মনের ভেতরকার দুষ্টু সত্তাটা যেন তাকে বারবার উসকে দিচ্ছে—
‘এতটা সুদর্শন হওয়ার কী দরকার ছিল মানুষটার?’
নিশিতা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।
মাথাটা নিচু করে বসে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। অথচ যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছে, ততই বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা যেন বেড়ে যাচ্ছে।

ঘরের পিনপতন নীরবতা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল।
অন্যদিকে ফারিস নীরবে নিশিতার এতক্ষণকার প্রতিটি কর্মকাণ্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছিল। চোখ সরিয়ে নেওয়া, অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসা, লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা গাল—কিছুই তার নজর এড়ায়নি।
নিশিতার প্রতিটি অভিব্যক্তি যেন ফারিসকে ভেতর থেকে অদ্ভুত এক প্রশান্তি দিচ্ছিল।
অধরের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি।
তবে মুখ দিয়ে টু শব্দটুকুও বের করল না সে।
শুধু আড়চোখে বউয়ের ভাবভঙ্গি দেখতে লাগল।
বউটা যে দিন দিন তার প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেটা বুঝতে ফারিসের আর খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হলো না। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর এক ধরনের বিজয়ী আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।
এটাই তো চেয়েছিল সে।
নিশিতা তাকে ভালোবাসুক। শুধু ভালোবাসুক নয়—গভীরভাবে ভালোবাসুক। এমনভাবে, যাতে তার অস্তিত্বের সঙ্গে ফারিসের অস্তিত্বও মিশে যায়। তার প্রতিটি অনুভূতিতে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন ফারিসের উপস্থিতি অনুভূত হয়।
এই ভাবনাটাই ফারিসকে অদ্ভুত এক তৃপ্তি দেয়।

কিন্তু হঠাৎ নিজের চিন্তার ভেতর থেকেই যেন তার টনক নড়ল।
না।
আজ এসব নয়।
আজকের দিনটা শুধু তার আর তার নীলাম্বরীর।
অন্য কোনো চিন্তা, অন্য কোনো হিসাব আজকের এই সুন্দর সময়টাকে স্পর্শ করবে না।
ফারিস ধীর পায়ে নিশিতার একেবারে কাছে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন এক ধরনের শান্ত অথচ নেশাময় দৃষ্টি।
নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—কেমন লাগছে আমাকে, জান? পছন্দ হয়েছে তোর?
নিশিতা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
এই মুহূর্তে সত্যি বলতে ফারিসের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকাটা তার জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কতদিন পর এভাবে তাকে দেখছে সে! অথচ পুরুষ মানুষের সৌন্দর্য যে এতটা দৃষ্টি কাড়তে পারে, তা যেন আজ নতুন করে আবিষ্কার করছে নিশিতা।

মনে মনে বিরক্ত হলো সে।
কেন তাকে এতটা সুদর্শন হতে হবে?
একটু কম সুন্দর হওয়া যেত না?
ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা দেহ, বলিষ্ঠ গড়ন, মুখজুড়ে গম্ভীরতার ছাপ—সবকিছুর মাঝেও ফারিসের বাদামী চোখ দুটোই যেন তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেয়। সেই চোখে এমন এক অদ্ভুত মাদকতা আছে, যার সামনে বেশিক্ষণ স্থির থাকা নিশিতার পক্ষে কঠিন।
ঘাড় ছুঁইছুঁই চুলগুলো যখন হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে নেয়, তখন তো নিশিতার বুকের ভেতরটা আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
তার ওপর পাঞ্জাবির নিচে স্পষ্ট হয়ে থাকা বলিষ্ঠ শরীরের গড়ন।
নিশিতা আর কতক্ষণ নিজেকে সামলায়!
অবশেষে এক ধরনের মুগ্ধতা মেশানো কণ্ঠে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনাকে বড্ড বেশি সুন্দর লাগছে, ফারিস ভাই। আমার খুব হিংসে হচ্ছে।
ফারিস ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
নিশিতার কথার মানে যেন ঠিক বুঝতে পারল না।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
নিশিতা এবার নিজের কথাটাই একটু পরিষ্কার করে বলল,
—পুরুষ মানুষের এত সুদর্শন হতে নেই। নাহলে আমার মতো নারীরা যে আপনার মাদকতায় জ্ঞান হারাবে!
কথাটা বলেই নিশিতা নিজেই চোখ নামিয়ে ফেলল।
ফারিস কিছু বলল না।
শুধু নীরবে তার কথাগুলো শুনল।
আর কখন যে তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো মুচকি হাসি ফুটে উঠেছে, সে নিজেও টের পেল না।
সেটা নিশিতার প্রশংসায়, নাকি নিজের বিজয়ের আনন্দে—তা বোঝার উপায় রইল না।

বাড়িতে তখন তেমন কেউ ছিল না।
সবাই যে যার প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে বেরিয়েছে। বিশাল বাড়িটা তাই অস্বাভাবিক রকমের নীরব ও ফাঁকা লাগছিল।
রিয়া সম্ভবত কলেজ থেকে ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আফিয়া চৌধুরী ও আমেনা চৌধুরী এই সময়টায় সাধারণত নিজেদের ঘরেই থাকেন।
এই সুযোগেই ফারিস কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়েছিল নিশিতাকে নিয়ে।
অবশ্য নিশিতা একাধিকবার বলেছিল কাউকে অন্তত জানিয়ে যেতে। পরে তাকে খুঁজে না পেলে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়তে পারে—এই ভয়টাই ছিল তার।
কিন্তু ফারিস সেসব কথার একটাও কানে তুলল না।
তার কাছে বিষয়টা একেবারেই সহজ।

সে তার বউকে নিয়ে কোথায় যাবে, কখন যাবে—তার জন্য অন্য কারও কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন সে অনুভব করে না। নিশিতা তার স্ত্রী। তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও সে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।
নিশিতা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল ঠিকই।
কিন্তু ফারিসের একবারের অগ্নিদৃষ্টিতেই তার সব কথা থেমে গিয়েছিল।
নিশিতা জানে, না মানলেও শেষ পর্যন্ত ফারিস তাকে নিজের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করবেই।
তাই আর কথা বাড়ায়নি সে।

বিকেলের ঢাকা তখনও নিজের চিরচেনা গতিতে ছুটে চলেছে।
দুপুরের তীব্র রোদ অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। উঁচু দালানগুলোর কাঁচের দেয়ালে শেষ বিকেলের সোনালি আলো প্রতিফলিত হয়ে কখনো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো রাস্তার ওপর ছড়িয়ে দিচ্ছে মায়াবী এক আবেশ।
তবে শহরের ব্যস্ততায় তার কোনো প্রভাব পড়েনি।
প্রধান সড়কগুলো তখনও গাড়িতে ঠাসা। একটার পেছনে আরেকটা গাড়ি ছুটে চলছে। কোথাও বাসের তীক্ষ্ণ হর্ন, কোথাও সিএনজির শব্দ, কোথাও রিকশার টুংটাং ঘণ্টি—সব মিলিয়ে বিকেলের ঢাকা যেন নিজস্ব এক সুরে মেতে উঠেছে।
ফুটপাত দিয়ে মানুষ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ অফিস শেষে বাড়ি ফেরার তাড়ায়, কেউ দিনের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছে।
রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোতেও ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে কেউ গল্পে ব্যস্ত, কেউ আবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে নিজের জগতেই ডুবে আছে।
কোথাও রিকশাওয়ালা যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, কোথাও কয়েকজন মানুষ গাড়ির আশায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

বাতাসে দিনের গরমের সঙ্গে মিশে আছে ধুলোর গন্ধ। পাশের খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসছে ভাজাপোড়া আর মশলার গন্ধ। দূরে কোথাও মসজিদ থেকে ভেসে আসা মাইকের শব্দও মিশে যাচ্ছে শহরের অবিরাম কোলাহলে।
ঢাকা কারও জন্য থেমে থাকে না।
কারও অপেক্ষায় নয়, কারও গল্পের জন্য নয়।
এই শহর তার নিজের নিয়মে ছুটে চলে। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা। হাজারো মানুষের হাজারো ব্যস্ততা, স্বপ্ন, ক্লান্তি আর অজানা গন্তব্যকে সঙ্গে নিয়েই প্রতিদিনের মতো আজও ছুটে চলেছে শহরটা।
সেই ব্যস্ততার মাঝেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল ফারিস আর নিশিতা।
নিশিতার পরনে পরিপাটি শাড়ি। আঁচলটা যত্ন করে গুছিয়ে নেওয়া। লম্বা চুলগুলো খোলা না রেখে সুন্দর করে খোঁপা করা। খোঁপার পাশ থেকে বেরিয়ে আসা দু-এক গোছা চুল বাতাসের মৃদু দোলায় বারবার তার গালের কাছে এসে পড়ছে।

নিশিতা হাত তুলে সেগুলো সরিয়ে দিচ্ছে।
আবার কিছুক্ষণ পর বাতাস সেগুলোকে ফিরিয়ে আনছে।
ঠিক তখনই বিকেলের একফালি সোনালি আলো এসে পড়ল নিশিতার মুখে।
মুহূর্তেই যেন তার সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
শাড়ির কোমল সৌন্দর্য, পরিপাটি খোঁপা, বাতাসে দুলতে থাকা চুলের গোছা আর মুখের লাজুক শান্ত অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে নিশিতাকে মনে হচ্ছিল বিকেলের এই সোনালি আলোয় আঁকা কোনো নরম ছবি।
ফারিস নীরবে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
কোনো কথা নেই।
শুধু চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের গভীর মুগ্ধতা।
নিশিতা সেই দৃষ্টি টের পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।
চারপাশে তখনও ঢাকা শহরের ব্যস্ততা চলছে।
গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, হর্ন বাজছে।
অথচ তাদের দুজনের কাছে সেই কয়েকটি মুহূর্ত যেন আলাদা হয়ে গেল।

এত কিছুর মাঝেও নিশিতার মাথায় একটি বিষয় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ফারিস তাকে নিয়ে বের হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গাড়ি আনেনি কেন?
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কোথায় যাবে তারা?
কীভাবে যাবে?
প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরছিল নিশিতার।
ফারিসকে জিজ্ঞেস করবে কি না, সেটাও ভাবছিল সে।
শেষ পর্যন্ত আর বেশি না ভেবে সরাসরি তাকাল তার দিকে।

—আমরা কোথায় যাচ্ছি, ফারিস ভাই? আপনি তো গাড়িও আনলেন না। তাহলে কিসে করে যাব আমরা?
ফারিসের উত্তর এলো একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
—রিকশায় করে যাব। তোর পছন্দ না?
নিশিতা যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
রিকশায় চড়া তার পছন্দ।
কিন্তু ফারিস?
এই মানুষটা তো রিকশায় উঠতেই পছন্দ করে না। আরামদায়ক মনে হয় না তার। সামান্য অস্বস্তিতেই বিরক্ত হয়ে যায়।

অথচ আজ?
আজ সেই ফারিসই শুধু নিশিতার পছন্দের কথা ভেবে গাড়ি ছেড়ে রিকশায় উঠতে রাজি হয়েছে!
নিশিতার বুকটা হঠাৎ কেমন নরম হয়ে গেল।
চোখের কোণে জমে উঠল সামান্য জল।
দুঃখের নয়।
ভালোবাসা আর মুগ্ধতার।
ফারিসের করা এই ছোট ছোট যত্নগুলোই তো তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে এই মানুষটার আরও গভীরে টেনে নেয়।
মানুষটা তার পছন্দের জন্য নিজের কত কিছুই না ছেড়ে দেয়!
নিজের আরাম, নিজের অভ্যাস, নিজের পছন্দ—কখনো কখনো নিজের আনন্দটুকুও।
নিশিতা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ফারিস তখনও নির্বিকারভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রিকশার অপেক্ষা করছে।
কী অদ্ভুত মানুষ!

ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করতে না পারলেও কাজের মাধ্যমে যেন প্রতিদিনই বুঝিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ পর ফারিস হাত তুলে একটি রিকশা ডাকল।
রিকশাটি কাছে আসতেই ফারিস প্রথমে নিশিতাকে উঠতে সাহায্য করল। শাড়ির আঁচল যেন কোথাও আটকে না যায়, বসতে গিয়ে যেন অসুবিধা না হয়—সেদিকেও খেয়াল রাখল সে।
তারপর নিজেও উঠে বসল পাশে।
রিকশায় বসাটা তার কাছে খুব একটা স্বস্তির ছিল না।
তবুও নিশিতার পছন্দের জন্য এতটুকু অস্বস্তিকে সে পাত্তাই দিল না।
রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতেই রিকশাটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
প্রথমে চাকার ঘূর্ণন ছিল ধীর।
তারপর ধীরে ধীরে গতি বাড়তে লাগল।
রিকশার ঘণ্টার টুংটাং শব্দ পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে চলল ব্যস্ত শহরের বুক চিরে।
বিকেলের নরম রোদ রাস্তার ওপর লম্বা ছায়া ফেলেছে। সেই ছায়াগুলো রিকশার চাকার সঙ্গে সঙ্গে কখনো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, কখনো আবার পেছনে পড়ে থাকছে।

হালকা বাতাস এসে নিশিতার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে।
খোঁপা থেকে বেরিয়ে আসা চুলের গোছাগুলো বাতাসে দুলছে। শাড়ির আঁচলটাও মাঝেমধ্যে হাওয়ায় সামান্য উড়ে উঠছে, আর নিশিতা হাত বাড়িয়ে সেটাকে সামলে নিচ্ছে।
রাস্তার দুপাশের দোকানপাট একের পর এক পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে, কেউ ব্যস্ত হাতে দোকান গুছাচ্ছে, কেউ আবার পথের ধারে দাঁড়িয়ে প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষা করছে।
রিকশার চাকা নিজের ছন্দে ঘুরে চলেছে।
চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড়, গাড়ির অবিরাম শব্দ, রিকশার ঘণ্টা, পথচারীদের কোলাহল—সবকিছুর মাঝেও ফারিস আর নিশিতার চারপাশে যেন আলাদা এক নীরবতা তৈরি হয়েছিল।
দুজন পাশাপাশি বসে আছে।

কেউ কোনো কথা বলছে না।
তবুও নীরবতাটা অস্বস্তিকর নয়।
বরং অদ্ভুত শান্ত।
নিশিতা মাঝে মাঝে আড়চোখে ফারিসের দিকে তাকাচ্ছে।
আর ফারিস?
সে সামনের পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষীণ হাসিটা যেন কিছু একটা বলে দিচ্ছিল।
রিকশাটা এবার আরও দ্রুত ছুটে চলল।
বিকেলের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৭

পেছনে পড়ে রইল বাড়ি।
পেছনে পড়ে রইল পরিচিত পথ।
আর সামনে?
সামনে অপেক্ষা করছে শুধু তাদের দুজনের জন্য লেখা আরও কিছু মুহূর্ত।
হয়তো খুব সাধারণ কিছু মুহূর্ত।
কিন্তু ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে কাটানো সাধারণ মুহূর্তগুলোই তো কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here