দাহশয্যা পর্ব ৯৯
Raiha Zubair Ripti
ভোর হওয়ার পর থেকেই খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। বাংলাদেশের খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল কোথাও যেন আর অন্য কোনো খবর নেই। শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠোপথ, এমনকি রাস্তার ধারের ছোট্ট টঙের দোকানেও একই আলোচনা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কেউ অবাক হয়ে বলছে, কেউ ক্ষোভে গাল দিচ্ছে, কেউ আবার নিজের মতো করে ঘটনার ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে।
বাশার সুলতানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর এখন আর গোপন কিছু নয়। মানুষ জেনে গেছে। আর এতদিন যে মানুষটাকে সবাই ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী আর ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করত, সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টা করেছে।
তবে মরেনি। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছে।রাতের সেই দৃশ্যটা বারবার মেহরিনের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। হুট করে একটা বিকট শব্দ আর চিৎকারে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। ঘুমজড়ানো চোখে বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নিচের বাগানে কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখেছিল।
প্রথমে বুঝতে পারেনি কী। পিচঢালা পথের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল একজন মানুষ। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল অন্ধকার। দূর থেকে শুধু বোঝা যাচ্ছিল, লোকটার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে পড়ে আছে। তারপর মাথার এক পাশ থেকে রক্ত গড়িয়ে পিচের ওপর ছড়িয়ে পড়তে দেখেছিল মেহরিন।
আর এক মুহূর্তও ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি সে। দরজা খুলে দৌড়ে নিচে নেমে এসেছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির কয়েকজন কর্মচারীও ছুটে এসেছিল। সবার আগে এগিয়ে গিয়েছিল সোলেমান।
লোকটাকে ঘিরে সবাই যখন দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সোলেমান তখন নিচু হয়ে পড়ে থাকা মানুষটার শরীরটা সোজা করার চেষ্টা করেছিল।
মুখটা দেখা যেতেই চারপাশের সবাই থমকে গিয়েছিল।বাশার সুলতান! মেহরিনের বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতাটা তখনই খানিকটা কমে এসেছিল। সোলেমান এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। গার্ডদের সাহায্যে বাশার সুলতানকে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। তারপর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে, মেহরিন ঠিকমতো কিছু বুঝে ওঠার সুযোগই পায়নি। শুধু একটা বিষয় তার চোখ এড়ায়নি। সোলেমানের মুখ। এত বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। তার নিজের চাচা চোখের সামনে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। অথচ সোলেমানের মুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল না। কান্না ছিল না। অস্থিরতাও ছিল না।
স্বাভাবিক ছিল সে। অদ্ভুত রকম স্বাভাবিক। রাত পেরিয়ে সকাল হয়েছে। সকাল পেরিয়ে দুপুর। এতক্ষণ হাসপাতালেই ছিল সোলেমান।
ডাক্তাররা জানিয়েছিল, বাশার সুলতানের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। ভেতরে রক্তক্ষরণও হয়েছে। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে একটা সময়ের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন তারা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এমনকি কোমায় চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সোলেমান হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতে বাড়ির সামনে তখন সাংবাদিকদের ভিড়। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, একের পর এক প্রশ্ন। কেউ জানতে চাইছে বাশার সুলতানের বর্তমান অবস্থা। কেউ জানতে চাইছে, আত্মহত্যার কারণ কী। কেউ আবার সোলেমানের কাছ থেকেই তার চাচার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য চাইছে।
সোলেমান কাউকে এড়িয়ে যায়নি। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই বলেছে। তার বেশি কিছু নয়। তারপর বাড়ির ভেতরে ঢুকে সোজা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
মেহরিন এতক্ষণ বসেই অপেক্ষা করছিল। সোলেমান ঘরে ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
” আপনার চাচার অবস্থা এখন কেমন? মরেছে নাকি বেঁচে আছে? ”
সোলেমান ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে বলল,
” মরলে অবশ্য খবর পেতে। তবে ডাক্তার বলেছে এখনো আশঙ্কামুক্ত না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরলে ভালো। না ফিরলে কোমায় চলে যেতে পারে।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
” উনি এটা কেন করলেন? ”
সোলেমান জুতো খুলতে খুলতে বলল,
” সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন। উনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাবে। ”
” উনি আত্মহত্যা করার মতন মানুষ না। আপনি তখন খুব স্বাভাবিক ছিলেন। কোনো ভাবে কী আপনি…
মেহরিন বাকিটা শেষ করল না। সোলেমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
” স্বাভাবিক না থাকার মতো কী হয়েছিল? আর কোনো ভাবে আমি কী? কী মিন করতে চাইছো তুমি? ”
মেহরিন উত্তর দিল না। সোলেমান পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে খেল। মেহরিন এবার একটু কাছে এসে দাঁড়াল।
” সাংবাদিকরা কী বলছিল?”
” যা বলার তাই। খবর পেয়েছে,প্রমাণ পেয়েছে, প্রশ্ন করছে। ”
” আপনি কী বলেছেন?”
” সত্যিটাই।”
” মানে?”
সোলেমান এবার তার দিকে তাকাল। কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই।
” উনি যদি অন্যায় করে থাকেন, রাষ্ট্রের আইন আছে। তদন্ত হবে। প্রমাণ থাকলে শাস্তি হবে। আমি তার পরিবারের মানুষ বলে উনার কাজের দায় আমার ওপর আসবে না। যার যার কর্মের ফল সে সে পাবে। ”
মেহরিন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
” আপনার খারাপ লাগছে না?”
সোলেমান এবার একটু থামল। তারপর স্বাভাবিকভাবেই বলল, ” হু লাগছে। ”
মেহরিন যেন এমন উত্তর আশা করেনি। ” তাহলে মুখে বোঝা যাচ্ছে না কেন? ”
সোলেমান মৃদু হেসে বলল, ” এখন কী খারাপ লাগা বোঝানোর জন্য কপালে মুখে লিখে দিতে হবে? ”
মেহরিন আর কিছু বলল না। ঘরটা কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। বাইরে তখনও সাংবাদিকদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন বাজছে। টেলিভিশনের পর্দায় বারবার একই সংবাদ প্রচার হচ্ছে।
বাশার সুলতান নিজের পাপের বিচার থেকে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু মানুষ যত দূরেই পালাক, নিজের কাজের ছায়া থেকে পালাতে পারে না।
সোলেমান জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
” দুপুরে কিছু খেয়েছ? ”
মেহরিন মাথা নাড়ল। ” না। ”
” যাও। কিছু খেয়ে নাও। ”
” আপনার? ”
” আমারও খেতে হবে। রফিক কে বলো বিরিয়ানি রাঁধতে। বিরিয়ানি খাওয়ার ক্রেভিংস জেগেছে। ”
মেহরিন অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে গেল যেন। হাসপাতালে চাচার ওমন অবস্থা আর সোলেমান এখন বিরিয়ানি খেতে চাইছে! নাকি এই স্বাভাবিকতার আড়ালে এমন কিছু আছে, যা সে এখনো জানে না?
মেহরিন রুম ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ালে সোলেমান রক্ত মাখা শার্ট টা গা থেকে খুলতে খুলতে বলল,
” যেই প্রমাণ গুলো চাচা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল। সেই প্রমাণ গুলো মিডিয়া পুলিশ অব্দি গেলো কী করে মেহরিন? ”
মেহরিন যেন বরফের মতো জমে গেল। আমতাআমতা করে বলল,
” স…সেটা আমি জানবো কী করে? প্রমাণ কোথায় কিভাবে আছে তা তো আপনারাই জানতেন। আমাকে তো কখনো বলেন নি। ”
সোলেমান বা হাত দিয়ে চুল গুলো নাড়াচাড়া করে বলল,
” কথায় লজিক আছে। আচ্ছা ব্যপার না। আমি জেনে নিব। তুমি আসতে পারো এখন। গো। ”
মেহরিন চলে গেল। সোলেমান শিস বাজাতে বাজাতে তোয়ালে কাঁধে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
অথচ বোকা মেহরিন হয়তো জানেই না,সে খেলোয়াড় হলেও তার উপরেও একজন মাস্টামাইন্ডার আছে। যে কী না সব কিছুর কন্ট্রোল করে। তার ইশারা ছাড়া একটা নথিপত্র এদিক ওদিক নড়ে না। সেখানে ইয়াসিন তাকে সেই নথিপত্র গুলো এত সহজে দিয়ে দিলো!
সোলেমান এজওয়ানকে ফোন করে বাশার সুলতানের খবর জানায়নি।
এজওয়ানের কাছে বাংলাদেশের খবর এমনিতেও খুব একটা পৌঁছায় না। তার ফোনের নিউজ ফিডজুড়ে অস্ট্রেলিয়ার খবর রাজনীতি, ব্যবসা, আবহাওয়া, খেলাধুলা সবকিছুই যেন সেখানকার। বাংলাদেশ নিয়ে কোনো খবর তার সামনে আসে কদাচিৎ। নিজে থেকে সার্চ না করলে দেশের কোনো খবর তার চোখে পড়ার সম্ভাবনাও কম।
আর একটা ব্যাপারে এজওয়ানের বিশ্বাস অটুট। ভাইজান আর বাশার সুলতানের মধ্যে যদি সত্যিই বড় কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে তাকে জানানো হবে।
সে কারণে নিজের জীবনের ঝামেলা নিয়েই ব্যস্ত ছিল এজওয়ান। ঊর্মি আর ইব্রাহিম তুরস্কে চলে যাওয়ার পর বাড়িটাও বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কিন্তু এজওয়ানের জীবন কখনোই ফাঁকা থাকার সুযোগ দেয় না।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। দুপুরের দিকে সে চলে এলো নিজের জিম রুমে।
বিশাল ঘরটায় আধুনিক সব জিম সরঞ্জাম। একপাশে আয়না, অন্যপাশে কালো চামড়ার সোফা। ঘরের ভেতর এসির ঠান্ডা বাতাস চললেও ব্যায়ামের কারণে এজওয়ানের শরীর তখন ঘামে ভিজে গেছে। মেঝেতে পড়ে আছে তোয়ালে আর পানির বোতল।
এজওয়ানের শরীরে কোনো শার্ট নেই। পরনে শুধু কালো ট্রাউজার। টাউজারের ভেতরে কোমরের কাছে ঠোঁট ইমোজি বসানো কালো আন্ডারওয়্যারের লাল বর্ডারটা সামান্য দৃশ্যমান। দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম করার পর সোফায় এসে বসল সে।
কিছুক্ষণ মাথাটা পেছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল।তারপর পকেট থেকে ফোন বের করল।
ক্যামেরা অন করে নিজের একটা হট ছবি তুলল,গলা থেকে পা অব্দি। যেখানে উন্মুক্ত আকর্ষণীয় শরীর আর লাল আন্ডারওয়্যার টা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ছবিটা একবার দেখে এজওয়ানের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল। তারপর নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে দিল। যেখানে ফলোয়ার ৮ মিলিয়ন। সাথে ক্যাপশন দিলো,
“I was never meant to be the good guy.”
তারপর ছবির সাথে mama i’m in love with a criminal গানটা এড করে আপলোড করে দিলো। পোস্ট করার পর ফোনটা সোফার ওপর ছুড়ে রেখে আবার পেছনে হেলান দিল এজওয়ান। সে জানে এখন তার ফোন নোটিফিকেশন মেসেজ কমেন্ট লাইক শেয়ারে ভরে যাবে।
মাহি বাসায় নেই। কোথায় যেন বেরিয়েছে। বের হবার আগে শুধু বলে গেল,আমি শপিংমলে যাচ্ছি একটু কেনাকাটা করতে। তারপর এজওয়ান আর পাল্টা কিছু জিজ্ঞেস করে নি।
মাহি প্রথমে শপিংমলে গিয়েছিল। টুকটাক কিছু স্কিন কেয়ার প্রডাক্ট কিনে মল থেকে বের হবার সময় একটা ফোন কল আসলো। মাহি সেটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলা হলো,
” তোমার কাজটা কতদূর? এজওয়ানের এপ্স টা আমাদের লাগবে। ”
মাহি ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ” আমি চেষ্টা করছি তার থেকে এক্সেস নেওয়ার। তবে এজওয়ান তার জিনিস নিয়ে খুবই সতর্ক থাকে। তার ইচ্ছে না হলে সে সেই কাজ করে না। ”
” তার ইচ্ছে অনিচ্ছা এসব শুনতে আগ্রহী নই আমি। আমাদের লাগবে ঐ এপ্সের এক্সেস। যেভাবে পারো এক্সেস নাও। নিয়ে আমাদের দাও। আর সেটাও তাড়াতাড়ি। ”
মাহি ফোন কেটে দিলো। শপিং মল থেকে বের হতেই সাফওয়ানের সাথে দেখা হলো। সাফওয়ানই আগে দেখে ডাক দিয়েছিল। মাহি পিছু ফিরে তাকাতেই সাফওয়ান এগিয়ে এসে বলল,
” কেমন আছো? ”
মাহি হাতের ব্যাগ গুলো চেপে ধরে বলল, ” ভালো আছি। আপনি এখনো দেশে যান নি যে? ”
” হু যাব নেক্সট উইক। ”
” গুড। গিয়ে এবার নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিন। ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে মুভ অন করুন। ”
” সেটাই তো পারি না মাহি। মুভ অন হয়তো আজীবনেও করতে পারবো না। তুমি নিশ্চয়ই পেরেছো এজওয়ানের সাথে? ”
মাহি উত্তর দিলো না। বরং প্রশ্ন টা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ” আপনি আমাকে আঁকড়ে পড়ে থাকলেও দ্বিতীয় বার আর পাবেন না। আমি ছেড়ে আসা স্থানে দ্বিতীয় বার পা রাখি না।”
” হু জানি। জানি বলেই আরো পারি না। সবাই কে যে মুভ অন করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। আমার বিষয় ছাড়ো। এখানেই থাকবে স্থায়ী ভাবে এখন? ”
” আমাকেও বাংলাদেশে যেতে হবে খুব শীগ্রই। মেইল এসেছিল কিছুদিন আগে। ”
” তাহলে দেখা হচ্ছে। ”
” হু এখন আসি। সাবধানে ফিরবেন,নিজের খেয়াল রাখবেন। ”
মাহি চলে গেল। সাফওয়ান তাকিয়েই রইলো তার যাওয়ার পানে। সেই স্থানেই ফিরার পথে আবার ফ্লোরার সাথে দেখা হলো তার। যার সাথে তার বাবা আর এজওয়ান মিলে বিয়ে ঠিক করতে চেয়েছিল। সাফওয়ান মানা করেছিল। ফ্লোরা কেমন এক দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। সাফওয়ানও এক নজর তাকালো। তখনই পাশ থেকে এক ছেলে এসে ফ্লোরার হাত ধরে চলে যেতে লাগলো। পৃথিবীতে কেউ শূন্য থাকে না। ফ্লোরার জীবনেও কেউ এসেছে। কিন্তু সাফওয়ান সেই শূন্যই রয়ে গেল। সে ফিরে গেল নিজ অ্যাপার্টমেন্টে।
মাহি বাড়ি ফিরতেই দেখলো এজওয়ান বাসায় নেই। বেরিয়েছে কোথাও একটা। সে শপিং ব্যাগ থেকে প্রডাক্ট গুলো বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপর সাজিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আসলো। তারপর ফোনটা চার্জে দেওয়ার জন্য হাতে নিতেই দেখলো ইন্সটাগ্রাম থেকে বেশ কয়েকটা নোটিফিকেশন এসেছে। সে ঢুকে দেখলো এজওয়ানের ছবির কমেন্টের নোটিফিকেশন তার আইডিতে এসেছে। এজওয়ান কেবল তার আইডি থেকে তাকে আর সোলেমান কে ফলো দিয়ে রেখেছে। মাহি ফলোব্যাক করে নি। তবে কেউ একজন তাকে সেই কমেন্ট বক্সে মেনশন দেওয়ার পর থেকেই এই নোটিফিকেশন আসছে। মেনশন টা আবার লম্পট সুলতান করেছিল। মেয়েরা কিসব কমেন্ট করছে। অসহ্য মেয়ে গুলো। সুদর্শন হট ছেলে দেখলেই ল্যােল ফেলায় জিহ্বা দিয়ে। ফাজিল। মেয়েদের দোষ দিয়ে কী লাভ? লম্পট সুলতান যেই ছবি আপলোড দিছে মেয়েরা তো ওসব কমেন্ট করবেই। গায়ে জ্বালা ধরে গেল। ব্লক করে রেখে দিল এজওয়ানে আইডি টা। তার কিছুক্ষণ পরেই এজওয়ানের ফোন আসলো। মাহি রিসিভ করতেই বলল,
” ইন্সটাগ্রাম থেকে ব্লক কেন করেছো আমায়? ”
মাহি কাটকাট জবাব দিলো,
” ফালতু মানুষের আইডি সামনে আসলে বিরক্ত হই। ”
” আর ইউ জেলাস? ”
” ফর হোয়াই? ”
” তোমার স্বামীর হটনেস দেখে? দেখো মেয়েরা কী সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করছে। ”
” বেলেহাজ রা আরেক বেলেহাজ কে দেখে কমপ্লিমেন্ট দিবে। এতে জেলাসের কী আছে? তা আপনি কোথায়? ”
” বারে আছি। ”
” বারে কী জন্য আছেন? ”
” মাল খেতে। খাবে? নিয়ে আসবো?”
পাশ থেকে এক নারী এজওয়ানের নাম ধরে ডাকছে। মাহি শুনলো। শোনা শেষে বলল,
” কোন বারে আছেন আপনি? নাম বলুন। ”
এজওয়ান নাম বলে ফোন কেটে দিলো। মাহি ফোনটা হাতে নিয়েই টেবিলের উপর থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে পরলো।
বাতাসির দিনকালের কোনো উন্নতি নেই। সে হোটেলে কাজ করে সেখানেই খায়। আর মাস শেষে যা পায় তা দিয়ে বাসা ভাড়া দেয়। ইয়াসিন উকিলের সাথে কথা বলেছে। তাদের ডিভোর্স পেপার রেডি হয়ে গেছ। একদিন ইয়াসিন বাতাসি কে ফোন করে বলল,
” বাতাসি তুমি সত্যি ডিভোর্স চাও তো? ডিভোর্স দিলে তুমি খুশি? ”
বাতাসি খুব স্বাভাবিক ভাবে তখন বলেছিল,
” খুশি না হয়ে উপায় আছে? তথাকথিত এক সম্পর্ক থেকে ছুটি মিলবে। দু’জন মানুষ মুক্ত ভাবে বাঁচতে পারবে। অখুশির তো প্রশ্নই আসে না। ”
ইয়াসিন তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বলল,
” বেশ। তোমার খুশিতেই আমি খুশি। বুধবার উকিলের চেম্বারে এসো। সেদিন আশা তুমি এই তথাকথিত সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাবে। ”
” জি আসবো। ”
ইয়াসিন ফোন কেটে দেয় তখন। আজ বুধবার। উকিলের কাছে যাওয়ার আগে ইয়াসিন একবার সোলেের সাথে দেখা করলো। সোলেমান শুধু বলল,
” তুই মন থেকে ডিভোর্স দিচ্ছিস বাতাসি কে? একটুও কী মায়া জন্মায় নি মেয়েটার উপর? পরে একসময় আফসোস করবি না তো এই দিনটার জন্য? ”
ইয়াসিন তখন নিশ্চুপ থাকলো। একটু পর বলল,
” বাতাসি চায় ভাইজান। ও চায় না এই তথাকথিত সম্পর্কে থাকতে। আমি তো কখনো বাতাসি কে কোনো বিষয় নিয়ে জোর করি নি। মেয়েটার বাঁচার অধিকার আছে নিজ ইচ্ছে মতো। ”
” মেয়েটার উপর সব দোষ চাপিয়ে দিস না। তোর মন কী বলছে? ”
” মন আজকাল আমার কথার উত্তর দেয় না। চুপ থাকে। আচ্ছা ভাইজান ডিভোর্স হয়ে গেলে কী পরে লোকজন বাতাসী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে আমার মতো? ”
” করতেও পারে। ”
ইয়াসিন আর কিছু বললো না। যাওয়ার আগে বলল,
” ভাইজান কাজটা কী আমি ভুল করছি? ”
” নিজেকে প্রশ্ন করে দেখ। আমি তো বাহিরের লোক। আমার কথায় কী আসবে যাবে? ”
ইয়াসিন চলে গেল। সোজা উকিলের চেম্বারে গিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো বাতাসির। বাতাসি আসতে কিছুটা দেরি করলো। এমনিই কালো,তার উপর আজ কালো সেলোয়ার-কামিজ পড়ে এসেছে। কালো কী তবে শোকের প্রতীক! বাতাসির আজ বুঝি শোক দিন?
সোজা ইয়াসিনের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। ইয়াসিন এক নজর তাকালো। কালো পোশাকে আজ প্রথমবার তার কাছে বাতাসি কে অদ্ভুত ভাবে সুন্দর মনে হলো। ফুলো ফুলো চোখ,ব্রণে ভরা গালে কিভাবে সুন্দর লাগলো ইয়াসিনের কাছে তাকে? ভারি আশ্চর্যের বিষয় ছিল তা। হয়তো প্রতিটি সম্পর্কের শেষে তাদের পার্টনার দেরকে সুন্দরই মনে হয়।
উকিল সাহেব ডিভোর্স পেপার টা ইয়াসিনের দিকে এগিয়ে দিলো। সাথে একটা কলমও দিলো। ইয়াসিন থম মেরে বসে রইলো দেখে উকিল সাহেব তাকে ডেকে বলল সাইন করতে। ইয়াসিন কাঁপা কাঁপা হাতে কলমটা তুলে নিলো। জোরে এক শ্বাস ফেলে বাতাসির উদ্দেশ্যে বলল,
” আর ইউ হ্যাপি উইদাউট মি? ”
বাতাসি মুচকি হেসে বলল, ” ইয়েস,আই অ্যাম। ”
ইয়াসিন সাথে সাথে সাইন করে দিলো কাগজ গুলোতে। মনের সব রাগ ক্ষোভ ঝেড়ে দিলো ডিভোর্স পেপার নামক বস্তুটার উপর।
উকিল সাহেব এবার কাগজটা বাড়িয়ে দিলো বাতাসির দিকে। বাতাসি খুবই স্বাভাবিক ভাবে কাগজ কলম টা নিলো হাতে। ইয়াসিন বাতাসির দিকে আর একবার তাকিয়ে বলল,
” সত্যি তুমি আমাকে ছাড়া সুখী হবে তো! ”
বাতাসি ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আপনাকে নিয়ে সুখীই বা ছিলাম কবে যে আপনাকে ছাড়া অসুখী থাকবো? ”
” বাতাসি! ”
” আমরা এখানে কথা বলার জন্য আসি নি ইয়াসিন সাহেব। সম্পর্কের ইতি টানতে এসেছি। সেখানে এসব কথাবার্তা অস্বস্তিকর। আমাকে সাইন করতে দিন। ”
ইয়াসিন সাথে সাথে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আর এক মুহূর্ত সে সেখানে না থেকে বেরিয়ে গেল চেম্বার থেকে। বাতাসি কলমটা নিয়ে পেপারে সাইন করতে নিলে এবার উকিল বাতাসি কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
” মিস বাতাসি। ”
” জি বলুন উকিল সাহেব। ”
” আপনাদের হয়তো আরো সময় দরকার এই ডিভোর্সের জন্য। সময় নিন আরো। ”
বাতাসি এবার উকিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আমাদের সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে উকিল সাহেব। আজ কেবল আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ হওয়ার ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর করতে এসেছি। ”
উকিল সাহেব তপ্ত এক শ্বাস ফেললেন। তার অনেকক্ষণ পর ইয়াসিন আসলো। তখন বাতাসি ছিলো না আর। উকিল সাহেবের দিকে তাকাতেই উকিল সাহেব বললেন,
” বাতাসি অনেক আগেই চলে গিয়েছে। এই নিন ডিভোর্স পেপার। আপনারা এখন একে অপরের কাছে কেবল প্রাক্তন। আপনাদের তথাকথিত সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেছে। নিন। ”
ইয়াসিন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তারমানে তাদের সত্যি ডিভোর্স হয়ে গেছে! তারমানে বাতাসি সাইন করে চলেও গিয়েছে! ইয়াসিন থাবা মেরে ডিভোর্স পেপার টা নিয়ে চলে গেল।
ভালো হয়েছে তাদের ডিভোর্স হয়েছে। থাকুক ঐ মেয়ে নিজের মতো করে। যাবে না ইয়াসিন আর কখনো ঐ কৃষাঙ্গ মেয়ের নিকট। জাহান্নামে যাক বাতাসি। জাহান্নামে যাক তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি কাহিনি।
সোলেমান আজও হাসপাতালে এসেছে। বাশার সুলতানের জ্ঞান এখনো ফেরেনি। ডাক্তাররা শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে সে কোমায় চলে গেছে। খবরটা শুনেও সোলেমানের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। না উদ্বেগ, না অস্থিরতা। শুধু মাথা নেড়ে খবরটা গ্রহণ করেছিল সে।
হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে ধীরে ধীরে চাচার কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কেবিনটা নিস্তব্ধ মনে হলো। মেশিনের একটানা শব্দ। মনিটরে ওঠানামা করা রেখা। বাশার সুলতান বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে। চোখ বন্ধ। মুখের এক পাশে শুকিয়ে যাওয়া আঘাতের দাগ। নাকে অক্সিজেনের নল। হাতে স্যালাইন।
সোলেমান কিছুক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসল।
চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। কিছুক্ষণ পর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
” ঘুমাচ্ছ? নাকি অভিনয় করছো। ”
নিঃশব্দ কেবিন। শুধু মেশিনের শব্দ। সোলেমান চেয়ারে হেলান দিল। ডাক্তার বলেছে কোমায় চলে গেছে। কিন্তু সোলেমানের সন্দেহটা এখনো যায়নি।
সে উঠে দাঁড়াল। বিছানার একেবারে কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ বাশারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চাচার হাতটা একবার ধরল। হাতটা নিস্তেজ। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সোলেমান হাত ছেড়ে দিল। তারপর আশপাশে একবার তাকাল। কেবিনের দরজা বন্ধ। বাইরে কেউ নেই। সে পকেট থেকে ছোট্ট একটি ধাতব জিনিস বের করল। জিনিসটা কী, সেটা বোঝার মতো করে না দেখিয়ে হাতের মুঠোয় আড়াল করে রাখল। তারপর বাশারের বাহুর এমন একটি জায়গায় খুব হালকা কিন্তু আকস্মিকভাবে চাপ দিল, যেখানে আঘাত লাগলে স্বাভাবিক মানুষটির শরীর অনিচ্ছায় সাড়া দেওয়ার কথা।
সোলেমানের চোখ তখন বাশারের মুখে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। কিছুই হলো না। চোখের পাতা নড়ল না। মুখের পেশিতে সামান্য টানও দেখা গেল না। সোলেমান এবার হাত সরিয়ে নিল। আরেকবার তাকাল মনিটরের দিকে। হৃদস্পন্দন আগের মতোই চলছে। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। মুখের সেই সামান্য সন্দেহটাও মিলিয়ে গেল।
” সত্যিই কোমায় চলে গেছো। আমি ভেবেছিলাম অভিনয় করছো। ভেবেছিলাম, সবকিছু থেকে বাঁচার জন্য আরেকটা নাটক শুরু করেছো। তুমি জানো, তোমার সঙ্গে আমার কত কথা আছে? অনেক কিছু বলার ছিল। তুমি কোমা থেকে ফিরে এসো একবার। ফিরে এসো। তোমার সঙ্গে আমার হিসাব আছে। সব কিছুর হিসাব নিকাশ নিব। এভাবে মৃত শরীরে হিসেব নিলে আমি ঠিকঠাক শান্তি পাবো না। জীবিত শরীরে আঘাত করার আনন্দই আলাদা। শুনতে পাচ্ছ নিশ্চয়ই আমার কথা গুলো? আমি তোমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় রইলাম। ভুলেও এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো না ডিয়ার চাচা। প্রহরী আর কঠোর সিকিউরিটি আছে কেবিন জুড়ে আর কেবিনের চারিপাশ জুড়ে। নাউ ইউ আর ফিনিশড! তোমাকে মারতে একটু কষ্ট হবে। তবে ব্যাপার না। কিছু কষ্টের পর স্বস্তিও আছে। এবার সময় আমার পরিবার গুছানো। কেবল আমার। সেখানে তোমরা কেউ থাকবে না। না তুমি,আর না তোমার ছেলে। তোমার ছেলে এজওয়ানের জীবনটা সোলেমানের কারনেই এখনো বেঁচে আছে। কথা দিচ্ছি তার জীবন আমি আজীবন বাঁচিয়ে যাব। কারন এজওয়ান আমার সন্তানের মতো। তার সকল দোষ গুন অপরাধ আমি লুকিয়ে যাব। নিজের কাঁধে নিব। ভালোবাসবো,আদর করবো। কিন্তু তোমাকে নয়। ”
কথাটা শেষ করে সোলেমান চলে গেল। মেহরিনের মেডিক্যাল কলেজে চান্স প্রাপ্ত ছেলেমেয়েদের ভর্তির কাজ সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। মেহরিন আজ ব্যাংকে এসেছে। তার বাবা তার পড়াশোনার জন্য যা টাকা রেখে গিয়েছে মেহরিন সেগুলো দিয়েই নিকের খরচ মিটাবে। সুলতানের কোনো টাকা পয়সা তার জীবনের খরচে ব্যয় করবে না। মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার পর সে টিউশনি খুঁজবে। স্ট্রাগল করবে। তার আম্মাকে দেখবে। তার বাপটা তো পৃথিবী চিনানোর জন্যই তাকে একা ফেলে পালিয়ে গেল। মেহরিন চিনবে পৃথিবী কে। দায়িত্ববান হতে শিখবে। ব্যাংক থেকে ভর্তি,বই কেনার,ও নিজের খরচ চালানোর জন্য কিছু টাকা উইথড্র করলো। সুলতান নিবাসে ফিরে যাবতীয় সকল কাগজপত্র নিয়ে একা একাই ভর্তির কাজ সম্পাদনা করতে গেল। সোলেমান অবশ্য মেহরিন কে এখন কোনো কিছুতেই বাধা দেয় না। তবে বলেছিল মেহরিনের কষ্ট করে গিয়ে ভর্তি হতে হবে না। সোলেমান কাগজপত্র পৌঁছে দিবে। কাজ হয়ে যাবে। মেহরিন শুনে নি। তার কোনো কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করাবে না। নিজের কাজ নিজেই করবে।
মেডিক্যালে ভর্তির সব কাজকর্ম শেষ করে ফেরার পথে ইমনের সাথে দেখা হলো। ইমন খবর পেয়েছিল বাশার সুলতানের। ইমন বলল,
” এটা কোনো প্ল্যান নয় তো? এই পুরো ঘটনা টা আমাদের মাইন্ড কোনো কিছু থেকে ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্য করা হয় নি তো মেহরিন? বাশার সুলতান নিজের ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচতে সেই নিজেরই ক্ষতি করবে! কেমন খাপছাড়া লাগছে না ঘটনা টা? আবার বললে সোলেমান সাহেব বেশ স্বাভাবিক রয়েছে। এসবের পিছনে চাচাকে বাঁচানোর জন্য তার কোনো প্ল্যান নয় তো? ”
” জানি না ইমন ভাই। আমি উনাকে আর বুঝতে পারি না। বুঝার চেষ্টাও করি না। ঐ বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। আব্বুর কথা মনে পড়ে। ক্লাস শুরু হলে আমি হলে এসে উঠবো। আমি থাকবো না আর ওখানে। আমাকে কয়েকটা টিউশন খুঁজে দিতে পারবেন? তাহলে একটু উপকার হয়। ”
” আমি যেই কোচিং সেন্টারে পড়াই। সেখানে পড়াতে পারো।”
” আচ্ছা, তাহলে আমাকে সময়টা জানাবেন। ”
” আচ্ছা। বাসায় ফিরতে পারবে? গাড়ি নিয়ে এসেছ? ”
” না। রিকাশ করে এসেছি। সমস্যা নেই আমি পৌঁছে যেতে পারবো। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন। আসছি। ”
মেহরিন চলে যাওয়ার পরপরই ইমন কে এসে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল।
মাহি বারে এসে এজওয়ানকে খুঁজছিল। বারের ভেতর তখন আলো-আঁধারির পরিবেশ। চারপাশে মানুষের ভিড়, মৃদু সুরে গান বাজছে। একপাশে লম্বা কাউন্টার, অন্য পাশে কয়েকটা আলাদা ডেস্ক। মাহির চোখ শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামল এজওয়ানের ওপর। সে একটা ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে ড্রিংকস করছিল। মুখটা স্বাভাবিক, চোখে সেই চিরচেনা উদাসীনতা। মাহি তার দিকে এগোতে যাবে ঠিক তখনই একটা মেয়ে হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এসে এজওয়ানকে জড়িয়ে ধরল। এজওয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা তার গালে চুমু দিয়ে ফেলল। মাহি থেমে গেল। এজওয়ানও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির। তারপর ঘটনাটা বুঝতে পারতেই তার মুখের সমস্ত স্বাভাবিকতা উধাও হয়ে গেল। এক ঝটকায় মেয়েটাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল সে।
” What the fuck are you doing? ”
মেয়েটা কিছু বলার আগেই এজওয়ানের হাত উঠল। একটা প্রচণ্ড চড় বসেছে মেয়েটার গালে। মেয়েটা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। বারের চারপাশের কয়েকজন তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেল। এজওয়ান টেবিল থেকে একটা টিস্যু তুলে নিজের গাল মুছতে মুছতে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। চোখ দুটো তখন রাগে অন্ধকার।
মেয়েটা উঠে বসার আগেই এজওয়ান তার চুলের মুঠি ধরে টেনে মুখটা ওপরে তুলল।
” You fucking bitch. ”
মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
” I didn’t mean..”
এজওয়ান আরো শক্ত করে তার চুলের মুঠি টেনে ধরে বলল,
“I don’t give a fuck what you meant. You fucking touched me. You put your filthy lips on me without my permission. Who the fuck do you think you are?”
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলার চেষ্টা করল।
” Please…”
এজওয়ান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। “Don’t fucking, please me. You wanted my attention? Congratulations. Now you’ve got it.”
তার চোখে তখন এমন রাগ, যেন পরের মুহূর্তে সত্যিই ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে। “And if you ever put your hands on me again, I swear to God, you’ll regret the fucking day you learned my name.”
এজওয়ান পা তুলে মেয়েটার দিকে এগোতেই মাহি ছুটে এসে তাকে আটকে দিল।
” এজওয়ান! Stop! ”
” Get the fuck off me তরিকুলের বেটি। ”
মাহি তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
” না! আপনি আর এক পা এগোবেন না। ”
“She fucking kissed me! আর আমার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার সবার নেই।”
” আমি জানি! ”
“Then get the fuck out of my way!”
মাহি তাকে পেছনে টেনে আনল। এজওয়ান কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। ইচ্ছে করছিল পা টা দিয়ে ওর ঐ মুখ টা থেঁতলে দিতে। এই দেশে এসব কিস টিস কমন। কিন্তু এজওয়ানের কাছে কমন না। সে কেবল তরিকুলের বেটির ঠোঁট থেকে চুমু খেতে অভ্যস্ত। এই অধিকার কেবল সে তরিকুলের বেটি কে দিয়েছে। এই মেয়ে ভেবেছে এজওয়ান এত হ্যান্ডসাম ড্যাশিং, কিস দিলে, গায়ের উপর ঢোলে পরলে হয়তো অ্যাট্রাক্ট হবে তার প্রতি। কিন্তু এজওয়ান তো উল্টোটা করে বসলো।
এজওয়ান ধীরে ধীরে নিজের রাগটা সামলে নিতে লাগলো। চোখের আগুনটা তখনও নিভেনি।
মাহি মেয়েটার দিকে তাকাল। গালে ইতিমধ্যে দাগ বসে গেছে চড়ের। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“Listen carefully. Stay the fuck away from this man. Don’t look at him. Dont talk to him. Don’t touch him. Don’t come anywhere near him. And you sure as hell don’t fucking try that shit again.Remember that. Because next time, I won’t be this fucking patient.”
মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। পাশ থেকে এক মেয়ে প্রশ্ন করলো,
” who are you? ”
মাহি তখন এজওয়ানের বা হাতটা ধরে বলল,
দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (৩)
” I am his, and he is mine
In the end, it’s him and I.
Always him and I. Am I right এজওয়ান?
এজওয়ান মাহির হাত ছেড়ে দিলো। মাহি ঘাড় ফিরে তার দিকে তাকাতেই এজওয়ান মাহির মাথার পেছনে হাত রেখে মাহিকে নিজের দিকে টেনে এনে সকলের সামনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে বলল,
“ You’re damn right, sweetheart. In the end, it’s you and me.”
