ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৮
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
দেখতে দেখতে কেটে গেছে একটা মাস।
সময় সত্যিই বড় বিচিত্র। চলার সময় তাকে ধরা যায় না, থামানো যায় না; অথচ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়—এই তো সেদিন! যেন গতকালই কোনো ঘটনার শুরু হয়েছিল, আর আজ সেই ঘটনার ওপর দিয়ে পুরো একটা মাস পার হয়ে গেছে। সময় অনেকটা আকাশের ভাসমান মেঘের মতো। চোখের সামনে ধীরে ধীরে সরে যায়, কিন্তু কখন দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যায়, তা বোঝার আগেই নতুন মেঘ এসে আকাশ ভরে ফেলে।
মাস বদলায়। দিন বদলায়।
তার সঙ্গে বদলায় মানুষের ব্যস্ততা, অপেক্ষা আর জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোও।
একটা মাস আগে যে দিনগুলো ছিল দুশ্চিন্তা আর তাড়াহুড়োয় ভরা—আজ সেসব যেন অতীতের পাতায় লেখা কোনো অধ্যায়। মুগ্ধাদের পরীক্ষা এবার প্রচুর গ্যাপে হয়েছে। একটা পরীক্ষা শেষ করে আবার কয়েকদিনের বিরতি। সেই বিরতির মধ্যে পড়াশোনা, নতুন সিলেবাস নিয়ে চিন্তা, পরীক্ষা কেমন হলো সেই আলোচনা—সব মিলিয়ে গত এক মাস যেন কচ্ছপের গতিতে এগিয়েছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব অপেক্ষারও শেষ আছে।
আজ মুগ্ধার পরীক্ষা শেষ।
দুপুর তখন প্রায় দেড়টা।
রোদটা আর সকালের মতো তেজি নেই। আকাশ থেকে নেমে আসা সোনালি আলো বাড়ির বারান্দা আর উঠোনের একপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। দুপুরের অলসতায় পুরো শেখবাড়ি যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
ঠিক সেই শান্ত দুপুরটাকেই আচমকা উলটেপালটে দিয়ে বাড়িতে ঢুকল মুগ্ধা। তার মুখে গান।
গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পায়ে পায়ে নাচ।
মনে হচ্ছে, এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আনন্দ আজ একসঙ্গে বেরিয়ে আসার রাস্তা পেয়ে গেছে।
“পরীক্ষা শেষ! পরীক্ষা শেষ!”
নিজের মনেই গুনগুন করতে করতে একবার ঘুরে দাঁড়াল সে। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলছে, ওড়নার একপাশ কাঁধ থেকে বারবার নেমে যাচ্ছে, আর সেই দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই তার। মুগ্ধা এখন সম্পূর্ণ মুক্ত।
পেছনে কয়েক কদম দূরে হাঁটছে ইখতিয়ার।
দুজনকে পাশাপাশি দেখলে মনে হবে—একজন যেন বসন্তের প্রথম দিনের রঙিন সকাল, আর অন্যজন বর্ষার আগে জমে থাকা কালো মেঘ।
একজন যতই উৎফুল্ল, আরেকজন যেন ততই নির্জীব।
মুগ্ধার মুখে হাসি থামছেই না।
আর ইখতিয়ারের মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
তবে তার হাঁটার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষটা ক্লান্ত। গত কয়েকদিনের যাতায়াত, মুগ্ধাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়া, আবার নিজের কাজ সামলানো—সব মিলিয়ে শরীরটা যেন একটু বিশ্রাম চাইছে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই মুগ্ধার চোখ পড়ল ইন্তিয়া বেগমের ওপর। ব্যস!
পরের মুহূর্তেই মুগ্ধা প্রায় দৌড়ে গিয়ে—
“আম্মু!”
বলে ইনতিয়া বেগমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
ইন্তিয়া বেগম প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরক্ষণেই মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন।
“এই ! কী হয়েছে? এমন করছিস কেন?”
মুগ্ধা মাথা তুলে এমন একটা হাসি দিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জয় করে এসেছে সে।
“আমার পরীক্ষা শেষ!”
“সেটা তো জানি।”
“না, তুমি জানো না! একদম শেষ! ফিনিশ! খতম! এখন আর পড়তে হবে না!”
ইনতিয়া বেগম হেসে ফেললেন।
“কয়েকদিন পরেই আবার ফলাফল নিয়ে চিন্তা শুরু হবে।”
“সেটা পরের মুগ্ধার সমস্যা। আজকের মুগ্ধা শুধু আনন্দ করবে।”
কথাটা বলেই আবার একটু নেচে উঠল সে।
এদিকে ইখতিয়ার তাদের দিকে একবার তাকাল মাত্র। মুখে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া নেই।
কোনো কথা না বলে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে। ারী পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল।
মুগ্ধা একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল।
“দেখছো আম্মু? কী ভাব! মানুষের পরীক্ষা শেষ, আর উনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে উনার অফিসে দশ কোটি টাকার লস হয়েছে!”
ইনতিয়া বেগম হাসতে হাসতে বললেন,
“সকাল থেকে তোকে নিয়ে কত ঘুরেছে। ক্লান্ত হয়ে গেছে।”
মুগ্ধা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তা বলে একটু হাসবে না? নিশ্চিত জন্মানোর সময় মধু দিতে ভুলে গেছিলে”
উত্তর না পেয়েই সে আবার ঘুরে দাঁড়াল। এবার তার চোখ পড়ল রহিমার ওপর।
“দাদিমা!”
বলে আবার ছুটে গেল সে।
রহিমা বসে ছিলেন সোফায়। মুগ্ধা গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
“আহা, ছাড়! আমার হাড়গোড় সব ভেঙে দিবি নাকি?”
মুগ্ধা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“আমার পরীক্ষা শেষ!”
“হ, শুনলাম। পুরো বাড়ি শুনল।”
“তুমি খুশি হওনি? চলো ডান্স দেই”
রহিমা চোখ কুঁচকে তাকালেন।
“খুশি হইছি না কে কইছে?”
“তাহলে মুখে হাসি এত কম কেন?”
“বেশি হাসলে আমার লাল দাঁত দেখা যায়। তাই কম হাসি।”
মুগ্ধা খিলখিল করে হেসে উঠল। হিমা এবার তার হাত ধরে টেনে পাশে বসালেন।
আয়, বস। পরীক্ষা কেমন হইছে বল তো?”
ুগ্ধা এবার একটু গম্ভীর হলো।
আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হয়েছে। শেষেরটা নিয়ে একটু টেনশন ছিল, কিন্তু ভালোই লিখেছি।”
হিমা মাথা নাড়লেন।
ভালো। এখন আর পড়াশোনার চিন্তা নাই কিছুদিন।”
ুগ্ধা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
এই কথাটাই শুনতে চাচ্ছিলাম!”
িছুক্ষণ চুপ করে রইলেন রহিমা। তারপর এমন স্বাভাবিক গলায় বললেন—
তা পড়াশোনা তো অনেক হলো।”
ুগ্ধা কৌতূহলী চোখে তাকাল।
হুম?”
হিমা এবার মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বললেন,
এবার একটা পুতির ঘরে নাতি-নাতনির মুখ দেখি।”
ুগ্ধার মুখের হাসি যেন এক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল। রহিমা আবার বললেন,
অনেক পড়াশোনা করছিস, অনেক পরীক্ষা দিলি। এবার আমাকে একটা নাতি-নাতনির মুখ দেখাও। কবে মরি-টরি যায়, তার তো কোনো ঠিক আছে?”
আল্লাহ! কীসব বলো!”
ুগ্ধার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। ঠিক তখনই কোথা থেকে রাফেয়া এসে কথোপকথনের শেষ অংশটা শুনে ফেলল। সে মুগ্ধার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
আমি কিন্তু এই ব্যাপারে উনার সঙ্গে একমত।”
ুগ্ধা বড় বড় চোখ করে তাকাল। রাফেয়া গম্ভীর মুখে বলল,
আমি তো শুধু পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছি।”
কীসের ভবিষ্যৎ?”
এই বাড়ির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।”
ুগ্ধা এবার চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“চাচি!”
কী? আমি কি ভুল কিছু বললাম?”
তোমরা কেউ চুপ করবে?”
াফেয়া এবার রহিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
দেখেছেন? লজ্জা পাচ্ছে!”
মুগ্ধা এবার আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।
আমি আমার রুমে যাচ্ছি!”
লে একপ্রকার দৌড়েই সিঁড়ির দিকে ছুটল সে।তার পেছনে রাফেয়ার হাসির শব্দ ভেসে এলো।
ইন্তিয়া বেগম এবার আলতো করে রাফেয়ার বাহুতে চাপড় দিলেন।
আহা, আর জ্বালাস না। মেয়েটা লজ্জা পেয়েছে তো!”
াফেয়া হেসে বলল,
লজ্জা পাওয়ার কী আছে? বিয়ে হয়েছে কতদিন!”
নতিয়া বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
তা হলেও তো মেয়ে।”
িঁড়ির মাঝপথে দাঁড়িয়ে মুগ্ধা স্পষ্টই শুনতে পেল কথাগুলো। িজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে সে আরও দ্রুত ওপরে উঠে গেল। ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল মুগ্ধা।
খতিয়ার এখনো জামা পাল্টায়নি।
য়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়িটা খুলছিল সে। দিনের ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট, তবুও তার সেই স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বে কোনো পরিবর্তন নেই। মুগ্ধার দরজা ঠেলে এমনভাবে ঢুকে পড়া দেখে সে আয়নার মধ্যেই একবার তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। মুগ্ধা তখন হাঁপাচ্ছে।
ৌড়ে আসার কারণে বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
খতিয়ার ভ্রু তুলল।
এভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?”
ুগ্ধা কোনো উত্তর দিল না। বরং চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ইখতিয়ারের চোখে তখন দুষ্টু একটা ঝিলিক। সে শুনে ফেলেছে। ধীরে ধীরে মুগ্ধার দিকে এগিয়ে এল সে। মুগ্ধা আরও অস্বস্তিতে পড়ল।
কি?”
খতিয়ার কিছু বলল না। একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মুগ্ধার কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
ুগ্ধা চমকে উঠল।
ইখতিয়ার!”
হুম?”
ছাড়েন।”
কেন?”
এমনিই।”
এমনিই ছাড়ব কেন?”
মুগ্ধা এবার চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।ইখতিয়ারের ঠোঁটে মুচকি হাসি। এক হাত দিয়ে সে মুগ্ধার নাকটা আলতো করে টেনে দিল।
বলো তো, ঝিমা কী বলল?”
ুগ্ধার মুখের রং আবার বদলে গেল।
তুমি জানো?”
তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
কিছু বলেনি।”
সত্যি?”
হ্যাঁ।”
খতিয়ার একটু ঝুঁকে এল।
তাহলে তুমি এভাবে লজ্জা পাচ্ছ কেন?”
ুগ্ধা যেন একেবারে নেতিয়ে পড়ল।
উফ! আপনি না!”
খতিয়ার এবার হেসে ফেলল।
বলেই ফেলো।”
ুগ্ধা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কিছু না।”
মিথ্যা বলছ।”
আপনার জানার দরকার নেই।”
আমার জানার দরকার নেই?”
খতিয়ারের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট মজা।
হুম।”
খতিয়ার আরও একটু কাছে এল।
তাহলে আমি আন্দাজ করি?”
ুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
না!”
খতিয়ার হেসে উঠল।
ওহ্! তাহলে নিশ্চয়ই ঠিক ধরেছি।”
ুগ্ধা এবার সত্যিই লজ্জায় তার ঘাড়ের কাছে মুখ লুকিয়ে ফেলল। ইখতিয়ারের চোখের হাসি আরও গভীর হলো। সে আলতো করে বলল,
চলো তাহলে।”
ুগ্ধা মাথা তুলল।
কোথায়?”
বাবা-মা হয়ে যাই।”
ুগ্ধা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। ইখতিয়ার একদম স্বাভাবিক মুখে বলল,
সব তো হলো। এগুলোও বাকি থাকে কেন?”
মুগ্ধা এবার দুই হাত দিয়ে তার ঘাড় জড়িয়ে ধরল।
জ্জায় তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। ইখতিয়ার হেসে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটাকে সে যতবার লজ্জা পেতে দেখে, ততবারই যেন নতুন করে অবাক হয়। এত কথা বলে, এত ঝগড়া করে, এত দুষ্টুমি করে—কিন্তু সামান্য কিছু ব্যক্তিগত কথা উঠলেই কী আশ্চর্যভাবে গুটিয়ে যায়! মুগ্ধার হাত তখনও তার ঘাড়ে। ইখতিয়ারের হাত মুগ্ধার খাঁজ কাটা কোমরে। দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। মুগ্ধার ঠোঁটেন নাজুক হাসি বিদ্যামান।
খতিয়ার তার কপালের ওপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মুগ্ধা চোখ বন্ধ করল।
খানেই পৃথিবী থেমে যাক। আটকা পড়ে থাক দুটো মানুষ মানবীর ঘনিষ্ঠ স্মৃতি।
কাশের রোদ তখন আর দুপুরের মতো তীক্ষ্ণ নয়। তার ধারালো উত্তাপ নরম হয়ে এসেছে, যেন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সূর্য নিজেও একটু ধীরে হাঁটতে শিখেছে। পশ্চিমের আকাশে আলো ছড়িয়ে আছে মধুরঙা আবেশ হয়ে। বাতাসে দিনের গরমের সঙ্গে মিশে আছে নদীর দিক থেকে আসা একরাশ শীতলতা।
ৌরাউদ্দীন পার্ক—নামটা শুনলেই যেন এই শহরের মানুষদের মনে একটু প্রশান্তির ছবি ভেসে ওঠে। জায়গাটা নদীর এপাশ-ওপাশ জুড়ে বিস্তৃত। দূরে নদীর জল চিকচিক করছে ক্ষীণ আলোয়। কখনো বাতাস এসে জলের বুক ছুঁয়ে যায়, আর সেই ছোঁয়ায় ছোট ছোট ঢেউগুলো এমনভাবে কেঁপে ওঠে, যেন নদীটা নিজের মনেই হাসছে।
দীর ধারের এই খোলা পরিবেশেই রয়েছে ‘আসব ক্যাফে’। ক্যাফে বললেও শুধুমাত্র চার দেয়ালে বন্দি কোনো জায়গা নয় এটি। খোলা আকাশটাই এখানে সবচেয়ে বড় ছাদ। মাথার ওপরে অসীম নীলের বিস্তার, চারপাশে বাতাসের অবাধ যাতায়াত আর দূরের নদীর শব্দ—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত মুক্তির অনুভূতি আছে।
বে আকাশের মেজাজ তো আর মানুষের কথায় চলে না। হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলে এই খোলা ক্যাফেই বদলে যায় এক অন্যরকম আশ্রয়ে। চারপাশে বিশেষভাবে রাখা ত্রিপল টেনে নামিয়ে দেওয়া হয় ছাদের মতো করে। তারপর শুরু হয় প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত। ৃষ্টির ফোঁটা যখন সেই ত্রিপলের ওপর পড়ে, তখন চারপাশের সমস্ত কথাবার্তা ছাপিয়ে এক অপরূপ শব্দ জন্ম নেয়। মনে হয়, হাজার হাজার ছোট্ট আঙুল একসঙ্গে কোনো অদৃশ্য বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলছে।
জ অবশ্য আকাশ শান্ত। বৃষ্টি নেই। শুধু বাতাস আছে। আর আছে নদীর কাছ থেকে ভেসে আসা একরাশ প্রশান্তি।
্যাফের একদম দেয়ালঘেঁষা, খোলা আকাশের নিচের একটি টেবিল। টেবিলটা মূলত একটু কর্নারের দিকে হওয়ায় আশেপাশের কোলাহল থেকেও খানিকটা আলাদা। সেই টেবিলের দুই পাশে মুখোমুখি বসে আছে ইশতিয়াক আর স্নিগ্ধা।
াদের সামনে ধোঁয়া ওঠা নুডলসের প্লেট। আর ইশতিয়াক?
ে পৃথিবীর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে বর্তমানে একমাত্র নুডলস খাওয়ার মহাযজ্ঞেই ব্যস্ত।
মনভাবে খাচ্ছে যেন গত তিন দিন ধরে তাকে কেউ খাবার দেয়নি। স্নিগ্ধা বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আসার পর থেকে লোকটা তার সঙ্গে ঠিকমতো একটা কথাও বলেনি।
কটা কথাও না।
থচ সে শুধু একবার ফোন করে বলেছিল, আসতে। আর ইশতিয়াক? একবারও ‘না’ বলেনি।
াহলে এখন এই ভাবটা কিসের? স্নিগ্ধা ভ্রু কুঁচকে বলল,
আপনি কি আমার সঙ্গে আসছেন, নাকি নুডলসের সঙ্গে ডেটে এসেছেন”
শতিয়াক কোনো উত্তর দিল না। চপস্টিক দিয়ে নুডলস তুলে মুখে দিল। স্নিগ্ধার মুখ আরও বিরক্তি রঙা হয়ে গেল।
আমি কথা বলছি।”
হুম।”
ুধু এইটুকু। স্নিগ্ধা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
ারপর পূণরায় বলল,
হুম মানে?”
শতিয়াক এবারও মাথা না তুলেই বলল,
শুনছি।”
শুনছেন?”
হ্যাঁ।”
“তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?”
শতিয়াক নুডলস মুখে পুরে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“খাচ্ছি।”
্নিগ্ধা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাই ইশতিয়াক? যে মানুষটা সাধারণ সময়ে পাঁচ মিনিট চুপ করে থাকতে পারে না? যার মুখে সারাক্ষণ কথা, দুষ্টুমি আর অকারণ হাসি লেগেই থাকে?
জ যেন তাকে কেউ বদলে দিয়েছে। তার চঞ্চলতা কোথায় যেন চাপা পড়ে আছে। এক আকাশসম অভিমানের নিচে।
্নিগ্ধা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
ঠিক আছে। খান।”
শতিয়াক খেতে লাগল।
“অনেক খান।”
শতিয়াক খেতেই থাকল। বিশেষ ভ্রুক্ষেপ নেই তার। স্নিগ্ধা র রাগ বাড়ল সে আবার বলল,
পেট ফেটে যাক।”
োকটা এবারও নির্বিকার। স্নিগ্ধা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
আপনি কি সত্যিই রাগ করে আছেন?”
োনো উত্তর নেই।
ইশতিয়াক?এই যে!”
শতিয়াক পানির গ্লাস তুলে পানি খেল। স্নিগ্ধার বিরক্তি এবার ধীরে ধীরে অন্য অনুভূতিতে বদলাতে লাগল। সে গলা একটু নরম করল।
আচ্ছা, রাগ করছেন কেন? শান্ত হোন না!”
শতিয়াক যেন শুনতেই পায়নি। স্নিগ্ধা টেবিলের ওপর হাত রাখল।
আমার দিকে একবার তাকান।”
োনো প্রতিক্রিয়া নেই। মেয়েটা এবার সত্যিই বিরক্ত হলো।
বাহ! এত ভাব! ফোন করলে চলে আসবেন, কিন্তু কথা বলবেন না?”
শতিয়াক এবার ধীরে ধীরে আরেক চামচ নুডলস মুখে তুলল। স্নিগ্ধার মনে হলো, তার সামনে কোনো মানুষ বসে নেই। একটা দেয়াল বসে আছে।
র সে সেই দেয়ালের সঙ্গে কথা বলছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সে। তারপর খুব আস্তে বলল,
আমি সরি বলছি তো।”
শতিয়াকের হাত থামল না। স্নিগ্ধা চোখমুখ কুঁচকে বলল,
সরি।”
্নিগ্ধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
শুনছেন?”
শতিয়াক এবারও মাথা তুলে তাকাল না। শুধু ঠান্ডা গলায় বলল,
শুনছি।”
্নিগ্ধার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। এই ‘শুনছি’-র মধ্যে কোনো উষ্ণতা নেই। কোনো আদর নেই।কোনো পরিচিত দুষ্টুমিও নেই।সে ঠোঁট কামড়ে বলল,
আমি কি এত খারাপ কিছু করেছি?”
বারও কোনো উত্তর নেই। স্নিগ্ধা জানে, পৃথিবীর অন্য কেউ তাকে এভাবে পাত্তা না দিলে সে কখনো পেছনে ঘুরে তাকায় না। যে তাকে এড়িয়ে চলে, সেও তাকে এড়িয়ে যায়। অভিমান করারও একটা আত্মসম্মান আছে। কিন্তু সামনে বসে থাকা এই মানুষটার ক্ষেত্রে সব হিসাব উল্টে যায়। ইশতিয়াক তাকে পাত্তা না দিলে বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। অকারণেই। নিজের অজান্তেই। স্নিগ্ধা কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে বসে রইল। তারপর চোখ দুটো ভিজে উঠল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ইশতিয়াকের হাত থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। এক চোখে তাকিয়ে রইল স্নিগ্ধার দিকে। কিছু বলল না। তার মুখে এখনো সেই কঠিন ভাব। চঞ্চল ইশতিয়াক যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। তার জায়গায় বসে আছে এক আহত মানুষ—যার অভিমান এত সহজে গলবে না।
েনই বা গলবে?
ারও তো কষ্ট হয়েছে। স্নিগ্ধা তাকে পাত্তা দেয়নি।
ার কথা এড়িয়ে গেছে। আর আজ? আজ সে কাঁদছে বলে কি সব অভিমান মুহূর্তে উধাও হয়ে যাবে? কি যাবে? স্নিগ্ধার ও বোঝা উচিত ইশতিয়াক ফেলনা নয়। সবসময় সে ভালোবাসার কাঙলামো করবে না। তার ও অনুভূতি আছে। সেও কষ্ট পায়।
্নিগ্ধা ঠোঁট কামড়ে কেঁদেই চলেছে। ইশতিয়াক জোরে একটা শ্বাস নিল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। স্নিগ্ধা ভাবল, হয়তো সে চলে যাচ্ছে। কিন্তু না।
শতিয়াক ঘুরে এসে স্নিগ্ধার পাশের চেয়ারে বসল।
িছুক্ষণ চুপ করে থেকে ঠান্ডা গলায় বলল,
কান্না বন্ধ করো।”
্নিগ্ধা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“আপনি… আপনি একটা খারাপ মানুষ। একদম পঁচা। আমার সঙ্গে কথা বলেন না। আমি কতক্ষণ ধরে কথা বলছি, আপনি শুধু নুডলস খাচ্ছেন!”
শতিয়াক মুখ শক্ত করে বসে রইল। স্নিগ্ধার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কান্নায়।
আপনি জানেন, কেউ আমাকে পাত্তা না দিলে আমি তাকেও পাত্তা দিই না?কিন্তু আপনি… আপনি এমন করলে আমি পারি না।”
শতিয়াকের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল। স্নিগ্ধা এবার তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো টলমল করছে।
আপনি ইচ্ছা করে আমাকে কাঁদিয়েছেন।”
আমি তোমাকে কাঁদাইনি।”
কাঁদিয়েছেন!”
কান্না তুমি নিজে করছ।”
আপনি ভীষণ আপনি খারাপ! আপনার নামে আপুর কাছে বিচার দিব ”
শতিয়াক ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। ্নিগ্ধা আবার নাক টেনে বলল,
আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না।”
ভালো।”
আর দেখা করব না।”
আচ্ছা।”
ফোনও ধরব না।”
হুম।”
্নিগ্ধা এবার পুরোপুরি ক্ষেপে গেল।
আপনি এত সহজে সবকিছুতে রাজি হচ্ছেন কেন?”
শতিয়াক এবার প্রথমবারের মতো ঠিকভাবে তার দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে ক্লান্ত অভিমান।
“কারণ আমার কথা তো তোমার কাছে এমনিতেও খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না।”
্নিগ্ধা থেমে গেল।
আমি ভুল করেছি। কিন্তু আপনি আমাকে শাস্তি দিন? কথা বলা কেন বন্ধ করবেন?”
শতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। স্নিগ্ধা হঠাৎ কি মনে করে সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকলো। বলল,
নাকি আমি এতদিন ছিলাম না দেখে নতুন কাউকে পাইছেন ”
শতিয়াক চোখ উল্টালো। বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকল। এত নারী থাকতে এই তারকাটা অবোধের প্রেমেই তাকে পড়তে হলো? হায় আল্লাহ!
াগ তরতর করে মস্তিষ্কে জমা হলো তার। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
হ্যাঁ তাই তাই, নতুন পাইছি ”
শতিয়াক উঠে ধপধপ পায়ে কাউন্টারে এগিয়ে গেল। বিল পরিশোধ করে হাঁটা দিলো। পিছনে তাকাল না। আর স্নিগ্ধা?
ইশতিয়াকের কথা শোনার পর থেকে জমে গেছে যেন। চোখদুটো লাল হয়ে উঠ মুহুর্তেই। হাতের আঙুলগুলো মুঠোয় শোভা পেলো। তা দরুন নোখ বিঁধে গেলো। হাতের তালুতে। আওয়াজ হলো কি ? উহু হলো না।
সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে নামছে শেখবাড়ির উঠোনজুড়ে। পশ্চিম আকাশের শেষ আলোটুকু যেন কমলা রঙের পাতলা ওড়না হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে আছে। দিনের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে। ঠিক তখনই গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল ইশতিয়াক। দুই হাতে বেশ কয়েকটা প্যাকেট। মুখে তার সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
“এই যে! সবাই কোথায়? ভাজাভুজা নিয়ে আসছি!”
ড্রয়িংরুম থেকে মুগ্ধা বেরিয়ে এলো। ইখতিয়ার বাড়িতে নেই—কোনো কাজে বাইরে গেছে। মুগ্ধা প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“কি কি এনেছিস?”
“তোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা!”
—গর্বিত ভঙ্গিতে বলল ইশতিয়াক। কিছুক্ষণ পর সবাই বসে ভাজাভুজা খেতে শুরু করল। মুগ্ধাও আনন্দ করে একটা পাকোড়া মুখে তুলেছিল। কিন্তু হঠাৎই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো। সে কপালে হাত রাখতেই শরীরটা টলে উঠল।
—মুগ্ধা!
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ধপ করে সোফার পাশে বসে পড়ল।ইন্তিয়া পারভীন আতঙ্কিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“ইশতিয়াক! তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন দে!”
রাফেয়া বেগম ছুটে এসে মুগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর রহিমা রাশিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“পানি আনো! পানি ঢালো!”
রাফেয়া মুগ্ধার মাথায় পানি দিতে দিতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“হঠাৎ এমন হলো কেন মা?”
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে রহিমা মুখ টিপে হাসছে। তার সেই হাসিটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন এই বাড়ির ভেতর ঘটে যাওয়া কোনো গোপন রহস্য সে আগেই জেনে বসে আছে। এদিকে ইশতিয়াক ফোন বের করে ডাক্তারের নম্বর ডায়াল করতে করতে বলল,
“আরে চিন্তা করার কিছু নেই। এত ভাজাভুজা খেলে এটাই হয়! গ্যাস হয়েছে গ্যাস! সারাদিন এটা ওটা খেয়ে বেড়ায় তা আর কি হবে!”
মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“আমি বলেছিলাম না, আমার ভাগেরটাও খাস না! আমার ভাগের টা খাওয়ার পাপ”
“চুপ কর!”
—ইনতিয়া ধমক দিলেন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে মুগ্ধাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করলেন। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার হঠাৎ বেশ গম্ভীর মুখে বললেন,
“আচ্ছা, মিষ্টি কোথায়?”
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৭
সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল। ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ মাথা হলো না কি? মেয়েটা অসুস্থ আর আপনি মিষ্টি চাইছেন? ডাক্তার”
ডাক্তার এবার ঠোঁটে হাসি টানলেন।
বললেন,
“কিছু অসুখে মিষ্টি না খেলে পাপ হয়”
রাফেয়া আর পারল না। বলেই বসল,
“ ইশতিয়াক বাপ তুই অন্য ডাক্তার ডাক, মৃধা ডাক্তারের বয়স হয়েছে, ভুলভাল বলছে ”
ডাক্তার হো হো করে হেসে উঠলো। ইন্তিয়া এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তিনি কিছু আন্দাজ করেছেন । ডাক্তার হাসি থামালেন। মুচকি হাসি বজায় রাখলেন ঠোঁটের কোণে ।
তারপর তিনি চোখ টিপে রহিমাকে আশ্বস্ত করলেন । ইন্তিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আপনাদের বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে। মিষ্টি দিবেন না?এত কৃপণ তো আপনারা না, ভাবি?”
