অভিসৃতি পর্ব ২৬
নওরিন কবির তিশা
নব প্রভাতের সঙ্গে কোনো এক নব জীবনের সূচনা হতে চলেছে। কাঙ্ক্ষিত দিন উপলক্ষে,জন কয়েক আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে বিবাহের আয়োজন করা হয়েছে তূজার। আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন। কনেকেও সাজানো হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। বরপক্ষ আসার অপেক্ষায় পুষ্পসজ্জিত আসনে বসে আছে তূজা। হৃদয়টা ভারাক্রান্ত। বিয়েটা করার ইচ্ছা ছিল না যে!পাশেই ওকে ঘিরে রয়েছে বন্ধু মহল। একমাত্র অনুপস্থিত থাকা ইভান কেও কিছুক্ষণ হলো, ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে রুশাফ আর নিহার।
তবে ছেলেটার চোখমুখ অস্বাভাবিক ফোলা। এক রাতেই, যেন চরম বার্ধক্য গ্রাস করেছে ওকে। ফুলে থাকা, চোখের শুভ্র অংশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করায়, ভয়াল দেখাচ্ছে ওকে। তুজা মন খারাপের মাঝেও বন্ধুর অসুস্থতার কারণ জানতে ভুলল না,,
“কি হয়েছে তোর?”
ইভান মলিন হাস্যে ঘাড় ঘুরিয়ে, তূজার সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্ম পাতার ন্যায় মুখখানিতে চাইলো, কাঙ্খিত প্রশ্নের জবাবে অন্য উত্তর দিলো,,
“তোকে বউ সাজে ভীষণ সুন্দর লাগছে তূজা!”
সার্বক্ষণিক পেত্নী বলে ক্ষেপিয়ে আসা ছেলেটার মুখে, জীবনে প্রথম প্রশংসা শুনে,আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে উদ্বিগ্ন হলো তূজা। কারণ একটাই, ছেলেটার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক। আগে কখনো ইভানকে এভাবে কথা বলতে শোনে নি ও। বিস্মিত কন্ঠে ও শুধালো,,
“সত্যি?”
“তিন সত্যি!”
তুজা পুর্বের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলো,,
“চোখ ফোলা কেন? বললি না যে!”
ইভান আলগোছে অন্যদিকে চেয়ে, অনাগত অশ্রু কণা সকলের অলক্ষ্যে লুকিয়ে, চোখ ডোলে বলল,,
“আসলে তোর বিয়ে ছিল তো, আর আমি এতো এক্সাইটেড ছিলাম যে গত দুইদিন ঘুমাতেই পারিনি! তাই ভাবছি আজ তোর বিয়ের পর ঘুমাবো, একটা দীর্ঘ লম্বা ঘুম! যা বহুদিন ধরে প্রয়োজন ছিল আমার,আজ নাহয় প্রয়োজন মেটাবো!”
কায়রা এতক্ষণ যাবৎ, দূর হতে নিঃশব্দে অবলোকন করছিল ওদের।হঠাৎ, দুর্জয়ের কল আসায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে, ফাঁকা জায়গার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করল ও। বিয়ের আয়োজনটা মূলত হয়েছে তুজাদের প্রশস্থ আঙিনায়। গ্রামীণ বাড়ি না হলেও, ওদের বিল্ডিংয়ের সম্মুখে বেশ অনেকটা জায়গা ফাঁকা হওয়ায় গ্রাম্য উঠানের মতো লাগে।
কায়রা কোলাহল থেকে সরে এসে, প্রায় জনশূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে,ফোন রিসিভ করে কানে চেপে বলল,,
“আপনি আসবেন কখন?”
কল করেছে দুর্জয়।অর্থাৎ নিঃসন্দেহে প্রথম বাক্য দুর্জয়ের পক্ষে থেকে আসার কথা।কিন্তু প্রশ্ন এসেছে গ্রহণকারীর পক্ষ থেকে। দুর্জয় মৃদু হাস্যে ঘাড় চুলকায়। আসার ইচ্ছা ওরও ছিল, কিন্তু ভোর হতেই বারংবার আসা ফোন কলে, তৎক্ষণাৎ খুলনা সেনানিবাসে আসতে হয়েছে ওকে।
“মেবি এখানে দু’ঘন্টা লাগবেই। তারপর যতো জলদি সম্ভব চলে আসবো। আর হ্যাঁ, টেক কেয়ার, শাড়ি পড়ে গিয়েছো,বেশি দৌড়াদৌড়ি করবে না।”
কায়রা এপারে থেকেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। লোকটা পাশে না থাকায় মনটা খারাপ থাকলেও, বুঝদার হয়।
“আপনি এতটুকু বলতেই কল করেছিলেন?”
“হ্যাঁ!”
কায়রা অবাক হয়। লোকটা ভোর বেলায় বেরিয়েছে মানে নিঃসন্দেহে কোনো জরুরী কাজ বেঁধেছে। অথচ ব্যস্ততার মাঝে, শুধুমাত্র তাকে সতর্ক করতে কল করলো? ওর ভাবনায় ছেদ ঘটে যখন বুঝতে পারে, অপর প্রান্তের লোকটা কল কেটে দিয়েছে। অবশ্যই প্রতিবারের ন্যায়, এবারও হয়তো শেষে বলেছিল “টেক কেয়ার!” তবে ভাবনার অতলে নিমজ্জিত কায়রা শুনতে পায়নি তা।
খুলনার সেনানিবাসের কক্ষে গুমোট বদ্ধ নিস্তব্ধতা ঘাঁটি গেড়েছে। ৫২ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পারভেজ আহমেদ আপাতত প্রচন্ড গম্ভীর মুখে নিজ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছেন। উনার পার্শ্ববর্তী আসনে, এনএসআই (ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স)এর স্পেশাল ডিরেক্টর খন্দকার মাহমুদ এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের কতিপয় শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে একই টেবিলে বৈঠকে উপস্থিত মেজর দুর্জয় আহসান এবং তার দলের অন্যতম প্রজ্ঞাবান সদস্য ক্যাপ্টেন ফাহিম।
বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপত্যকায় সম্প্রতি সফল হওয়া মিশনের প্রধান আসামীর জবানবন্দিতে উঠে আসা বিস্ফোরক,লোমহর্ষক তথ্যে আপাতত খাওয়া-ঘুম নাই হয়েছে প্রশাসনের। টেবিলের ওপর প্রজেক্টরের আলো পড়তেই এনএসআই ডিরেক্টর মাহমুদ সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,,
“মেজর দুর্জয়, গত রাতের ইন্টারোগেশনে আসামী স্বীকার করেছে যে এটা শুধু ক্রস-বর্ডার ড্রাগ স্মাগলিংয়ের মিশন ছিল না। দিস ইজ সামথিং মাচ বিগার অ্যান্ড মোর ডেডলি। আগামী চার দিনের মধ্যে দেশের চার প্রধান মহানগরী—ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা আর সিলেটে একযোগে কোঅর্ডিনেটেড আইইডি ব্লাস্টের ব্লু-প্রিন্ট সাজানো হয়েছে।”
ক্যাপ্টেন ফাহিম হাত বাড়িয়ে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ম্যাপ আর ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের ফাইলটা দুর্জয়ের সামনে তুলে ধরে বলল,,
“ইয়েস স্যার। শিপমেন্টের ট্র্যাকিং কোড অনুযায়ী বর্ডার বেল্ট দিয়ে অলরেডি আরডিএক্স আর লিকুইড এক্সপ্লোসিভ দেশে ঢুকে গেছে। কোস্টাল এরিয়া আর ক্যাপিটালের ড্রাগ নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে এই বিস্ফোরক ডিস্ট্রিবিউট করা হচ্ছে।”
দুর্জয় প্রখর দৃষ্টি মেলে,তীক্ষ্ণ নজরে ফাইলগুলোর ওপর চোখ বোলাল। কিছুদিন আগে গোপন সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের বিস্তার এত দূর হয়েছে, ভেবে তাচ্ছিল্যভরে হাসলো ও। অতঃপর পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বলল,,
“উই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম, স্যার। ওদের মেইন টার্গেট পাবলিশড হওয়ার আগেই আমাদের কাউন্টার-অফেন্সিভ মোডে যেতে হবে। ঢাকা আর চট্টগ্রামের হাই-রিস্ক জোনগুলোতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন আর অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের জয়েন্ট ডেপ্লয়মেন্ট লাগবে। ক্যাপ্টেন ফাহিম, খুলনা আর মোংলা পোর্টের অল এক্সিট পয়েন্টসে ইমিডিয়েট ব্লকেড বসাও। কাউকেও যেন চেকিং ছাড়া ক্রস করতে না দেওয়া হয়।”
ক্যাপ্টেন ফাহিম তৎক্ষণাৎ স্যালুট ঠুকে বলল,,
“ইয়েস, মেজর! অলরেডি স্পেশাল ট্রুপস রেডি রাখা হয়েছে।”
উচ্চপদস্থ অফিসারদের নিয়ে সাজানো পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্যের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ আর স্ট্র্যাটেজিক ছক তৈরিতে সময় কেটে গেল জলধারার মতো।তবে, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এমনকি সুষ্ঠুভাবে সেটা সম্পন্ন হলেও জীবনের ঝুঁকি রয়েছে এ কাজে নিয়োজিত থাকা প্রত্যেক সেনা সদস্যের। কিন্তু, দেশ মাতৃকার কথা বিবেচনায় রেখে পিছু হটল না কেউ।
অতিক্রান্ত হয়েছে ঘন্টাখানেক। বরপক্ষ আসার নাম গন্ধ নেই। আর সেটা কেন্দ্র করেই বিয়ে বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড। সাধারণ বাঙালি পরিবারে এমন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে আত্মীয়-স্বজনের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ আর কানাঘুষা যেভাবে চারপাশ বিষিয়ে তোলে, এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
তূজার বাবা আহমেদ সাহেব এমনিতেই হৃদরোগের রোগী। একের পর এক বিদ্রূপ আর একমাত্র মেয়ের অনাগত ভবিষ্যৎ ভেবে পরিস্থিতি ক্রমশ তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগলে, বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। উপায়ান্তর না পেয়ে কায়রা, মেধা, নিহার আর রুশাফ কক্ষে গিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। আহমেদ সাহেব তখন বুকে হাত চেপে,শয্যায় কাতর হয়ে শুয়ে আছেন।
ওদের দরজার মুখে দেখেই তিনি ব্যাকুল হয়ে নিহার আর রুশাফের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হু হু কেঁদে ফেললেন; রুদ্ধ কণ্ঠে বললে,,
“আমি সব শেষ করে দিলাম! আমার নিজের হঠকারিতায় আমার মা-টার জীবনটা একদম ধ্বংস হয়ে গেল! আমার মেয়েটার এবার কি হবে বাবা?”
মেধা ও কায়রা তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,,
“আঙ্কেল, প্লিজ একদম টেনশন করবেন না! আমরা সবাই আছি তো, কোনো না কোনো উপায় ঠিক বের হয়ে যাবে।”
কিন্তু আহমেদ সাহেব তখন কোনো যুক্তির ধার ধারছেন না, চোখের জলে ভাসছেন। ওদিকে তূজার মা মাহিমা বেগমেরও কান্নায় ভেঙে পড়ে,প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম। ছেলের বাড়ি থেকে কোনো ইতিবাচক বার্তা তো দূর, একটা কল পর্যন্ত আসেনি। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ সমস্ত বন্ধু মহলও। এদিকে এর মাঝে আত্মীয়-স্বজনের কানাঘুষা তো লেগেই আছে।
তূজার দূরসম্পর্কের ফুফু আনিজা পারভীন মাহিমা বেগমকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে মাথার ধারে বসে আছেন। উৎকণ্ঠিত পরিস্থিতিতে উনি ব্যাকুল স্বরে বললেন,,
“তূজাডার কি হবে এবার? একবার বিয়া ভাঙলে তো,মাইয়ে সুন্দরী কিনা সিডা কেউ দেখবে না।”
কান্নার তোড় বৃদ্ধি পেলো মাহিমা বেগমের। এদিকে ওনার কথাবার্তায় এর মাথায় রক্ত চড়ল বন্ধু মহলের। কায়রার রীতিমতো ফুঁসে উঠে বলল,,
“তূজার আর কখনো কোথাও বিয়ে হবে কি হবে না সেটা বোঝার জন্য আঙ্কেল আন্টি আছেন। আপনার অতিরিক্ত দরদ দেখাতে কে বলছে? কে আপনি? তূজার আগের কোনো প্রয়োজনে তো আপনাকে দেখিনি! আগে যখন প্রয়োজন হয়নি, আজকেও প্রয়োজন হবে না নিশ্চয়ই। আপনি এখন আসতে পারেন। বাকি সমস্যা আমরা সমাধান করব।”
আনিজা পারভীন গালমন্দ করে পাশে থাকা মহিলাদের উদ্দেশ্যে বললেন,,
“দেখেছো দেখেছো? এইসব মাইয়ে ছুয়ালের সাথে মিশে মিশে ওই মাইয়েডাও উচ্ছন্নে গেছে। এইজন্যিই তো বিয়ে এত্তি আসিনি। আসবেও না কেউ।”
উনি মুখ বাঁকিয়ে প্রস্থান প্রস্তুতি নিতেই, এবার রুশাফ বলল,,
“আনিজা আন্টি, দুদিন আগে শুনেছিলাম আপনার মেয়ে ভেগে গিয়েছিল। তার জন্যেও ভালো ছেলে পাচ্ছিলেন না মনে হয়।”
মহিলা কোনোক্রমে সম্মান বাঁচিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়লেন। আস্তে আস্তে ঘর ফাঁকা হয়ে এলেও, উনাদের কথা বেশ ভালোই প্রভাবিত করেছে তূজার বাবা মাকে। এমন চরম সংকটে, শেষমেষ বন্ধু মহল নিজেদের আর্জি জানালো উনাদের,,
“আঙ্কেল, আন্টি… আপনারা যদি কিছু মনে না করেন, তবে এই পরিস্থিতি সামলানোর মতো একটা ইমিডিয়েট সলিউশন আমাদের কাছে আছে।”
মাহিমা বেগম আর আহমেদ সাহেব কোনো কিছু না ভেবেই আকুল হয়ে বলে উঠলেন,,
“তোমরা যা ভালো বোঝো করো বাবা! শুধু আমার মেয়েটার এমন অপমান আর সর্বনাশ হতে দিও না! তোমরা যা বলবে আমরা তাতেই রাজি!”
তখন নিহার একটু সামনে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,,
“আমাদের কাছে একজন পারফেক্ট পাত্র আছে। কারেন্টলি হয়তো বড় কোনো জব বা এস্টাবলিশমেন্ট নেই, কিন্তু হি হ্যাজ আ ব্রাইট ফিউচার। ভবিষ্যতে ও অনেক দূর যাবে।”
আহমেদ সাহেব ও মাহিমা বেগম বিস্ময়ে তাকাতেই কায়রা ও রুশাফ ইভানের নাম প্রকাশ করল। এতদিন ইভান কীভাবে তূজাকে নিভৃতে ভালোবেসে এসেছে আর এই মুহূর্তে তূজার সম্মান রক্ষায় ও কতটা খাঁটি, সবটা বুঝিয়ে বলল। মেয়ের এই ঘোর বিপদ ও সমাজের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচাতে আহমেদ সাহেব আর মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। কেবল ক্ষীণ কণ্ঠে শুধালেন ইভানের পরিবারের সম্মতির কথা।
মেধা অমনি আশ্বস্ত করে বলল,,
“ইভানের বাবা ছাড়া তো পরিবারে আর কেউ নেই। আপনি শুধু উনার সাথে ফোনে একটু কথা বলে নিন আঙ্কেল। আমরা ওনার সাথে আগে থেকেই কথা বলে নিয়েছি, শুধু আপনাদের সম্মতির!”
অর্ধ সমাপ্ত কথা শেষ হতেই নিহার ইভানের বাবার নম্বরটা ডায়াল করে ফোনটা আহমেদ সাহেবের কাঁপা হাতের তালুতে তুলে দিল।
“কিরে বিড়িখোর? দুদিনেই ভালো সিগারেট খেতে শিখেছিস দেখি! গিল গিল আরো বেশি করে গিল। গিলতে গিলতে ম’র গা।”
তূজাদের বাসার এককোণে, জনশূন্য গ্যারেজের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে সিগারেট টানছিল ইভান। নিখাদ বন্ধুত্বের চাদরে নিজের একপাক্ষিক ভালোবাসার তীব্র রক্তক্ষরণ আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টার মাঝে,কায়রার এই বাঁকা কন্ঠ ভেসে আসতেই চমকে পেছনে তাকাল ও।
দেখলো উপস্থিত পুরো বন্ধু মহল। ওদের চোখমুখ দেখে প্রাথমিক পর্যায়ে একটু ঘাবড়েই গেল ও। তড়িঘড়ি হাতে থাকা সিগারেটটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একটা কৃত্রিম হাসির রেখা টেনে বলল,
“আরে তোরা এখানে?”
নিহার ধীর পায়ে এগিয়ে এসে,ইভানের কাঁধে একটা শক্ত চাপড় মেরে গম্ভীর স্বরে বলল,,
“চাইলে একবার আমাদের বিশ্বাস তো করতে পারতিস, হাদা! ভেতরে ভেতরে এত বড় কষ্টটা চেপে রেখে একা একা মরতে যাচ্ছিলি কেন?”
বন্ধুর এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ আর কথার গভীরতা টের পেয়ে ইভানের মুখের কৃত্রিম হাসির প্রলেপটা এক মুহূর্তে ধসে পড়ল। ও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেধা আলতো হেসে,পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য বলল,,
“আসলে কি জানিস, হবু বরদের নাকি বিয়ের আগে একটু বেশিই প্রেসার থাকে! কিন্তু তাই বলে সিগারেট ফুঁকে মরতে হবে?”
ইভান হতবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,,
“হবু বর মানে? তোরা কী উল্টাপাল্টা বকছিস বল তো?”
ঠিক তখনই রুশাফ হাতে থাকা ভাঁজ করা শেরওয়ানি, ইভানের কাঁধে পাশে ঝুলিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলল,
“বেয়াদব একটা! ড্রামা বন্ধ কর আর চুপচাপ এটা পরে দশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে আয়। একটুও যদি ভাঁজ হয় না, খবর আছে! চাঁদা তুলে কিনেছি। আগে থেকে জানলে বরযাত্রী নিয়ে ঢোল পিটিয়ে আসতাম,তাতে অন্তত তোকে এভাবে লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকতে হতো না!”
ইভান বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়ে চেয়ে রইল। মনে হচ্ছে যেনো কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছে ওর উপর দিয়ে।
“তোরা… তোরা কি মজা করছিস আমার সাথে? কার বিয়ে? আর কার শেরওয়ানি এটা?”
নিহার এবার ইভানের কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,,
“আঙ্কেল-আন্টি সব জানেন ইভান। তূজার সাথে তোর বিয়ের ফাইনাল সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আঙ্কেল অলরেডি তোর বাবার সাথে ফোনে কথা বলে সব পারমিশন আর ব্লেসিংস নিয়ে নিয়েছেন। তোর আর তূজার বিয়েটা আজই হচ্ছে, এখনি!”
কথাগুলো ইভানের কানে বিশ্বাসাতীত এক স্বপ্নের মতো শোনাল। যার ভূবন ভোলানো সাজের দিকে চেয়ে একটু আগেই মনে মনে শেষ বিদায় জানিয়েছিল, সেই তূজাই এখন ওর জীবনের বাস্তবতা হতে চলেছে? অনাগত জলকণা আর ধরে রাখতে পারল না ইভান। একলহমায় চোখে বাঁধভাঙা জল নেমে এলো ওর। সমস্ত অভিমান আর দীর্ঘশ্বাস একপাশে সরিয়ে, নিহার আর রুশাফকে তীব্র আবেগে জড়িয়ে ধরল ও।
নিহার ওর পিঠ চাপড়ে বলল,,
“ধুর ব্যাটা! এখন কান্নার টাইম নাকি? কনে প্যান্ডেলে ওয়েট করছে, জলদি রেডি হ!”
কায়রা এগিয়ে এসে, ওর পিঠে সজোরে থাপ্পড় দিয়ে বলল,,
“নাটক কম করো পিও। যখন শুনেছিলাম তখন না,না করে উড়িয়ে দিলে আর এখন আবেগ দেখাচ্ছ?”
ইভান ঘাড় ঘুরিয়ে অশ্রু সজল নেত্রে কায়রার দিকে চায়। সমস্ত কিছুর পিছনে যে এই মেয়েটার হাত আছে তা খুব ভালো করে জানা ওর। তবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় না ও। কেবল, কম্পিত হাত দ্বারা জীবনে প্রথম কায়রার হাতটা আলতো স্পর্শ করে বলে,,
“তুই আমাকে লাইফের শ্রেষ্ঠ সারপ্রাইজটা দিলি। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না তোকে। আসলে তোরা সবাই আমার জন্য ব্লেসিং!”
কায়রা প্রশস্ত হাসলো। তবে বন্ধুত্বের সম্পর্কে, মনে থাকা ভালোবাসা প্রকাশ করতে নেই, এটা খুব ভালোভাবে মানে ও। তাই ইভানের কৃতজ্ঞতা বাক্যে ও বাঁকা জবাব দিয়ে বললো,,
“যাতে তুই সিগারেট গিলতে গিলতে ফুসফুসে ক্যান্সার হয়ে না ম-রিস,এইজন্য করলাম! স্পেশাল ভাবিস না নিজেকে। ফকির-মিসকিন মানুষ তুই, চিকিৎসা টাকা পেতিস না তো! তাই আর কি!”
হেসে উঠল বন্ধু মহল। হাসলো ইভান নিজেও। তবে পরক্ষণে কথোপকথন দীর্ঘ না করে, ইভান কে নিয়ে চলে গেল নিহার আর রুশাফ।মেধা ওদের প্রস্থান পথে চেয়ে, কায়রার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলল,,
“তুই আসলেও আমাদের জন্য ব্লেসিং কায়া! তুই না থাকলে, এত সুন্দর একটা ভালোবাসার পূর্ণতা দেখার সৌভাগ্য হতো না আমাদের। দেখ কি বোকা আমরা, সামনে থাকা কালীনও ইভানের মনের ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।”
কায়রা মৃদু হেসে বলল,,
“আরে ধুর! ফ্রেন্ডের মনের কথা না বুঝলে কেমন ফ্রেন্ড হলাম? এতটুকু আমার দায়িত্ব ছিল!”
সুষ্ঠুভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ইভান প্রচন্ড ঘোরে আচ্ছন্ন। এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না জীবনের প্রথম ভালবাসাকে এভাবে পেয়েছে ও। শত মোনাজাতের ফসল পাচ্ছে ভেবেই সুখের কান্নায় ভেসে যেতে চাইছে মন। বিবাহ সম্পাদনের ক্ষণকাল অতিবাহিত হয়েছে বিধায় আপাতত বর কনের দেখা হওয়ার লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে। ইভান দরজার বাইরে থেকেই তূজার উদ্দেশ্যে সালাম দিলো,,
“আসসালামু আলাইকুম!”
তূজা হচকিত নেত্রে ঘাড় ঘুরিয়ে চায়। বিবাহ পূর্ববর্তী ঝঞ্ঝাটের কথা অজ্ঞাত নয় ওর। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, কোনো এক রাজকুমার এসে সম্মান রক্ষা করেছে, এটাও জেনেছে ও। তবে ছেলেটা কে? কিংবা কি তার পরিচয়? জানার প্রয়োজন বোধ করেনি ও। জেনেই বা কি হবে? বিয়েটা কি আটকাতে পারবে না-কি? এমনকি,ও এতটাই দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিল যে কাজীর বলা ছেলের নাম কিংবা পরিচয় বৃত্তান্ত কিছুই শুনতে পারে নি। কেবল কাঠের পুতুলের ন্যায় কবুল শব্দটা উচ্চারণ করেছিল তিনবার। তবে আকস্মিক, পরিচিত কন্ঠে হুশ হারানোর উপক্রম ওর। ভুল শুনছে কিনা যাচাইয়ে পিছন ঘুরতেই কাঙ্খিত পুরুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে দেখে বিস্ফোরিত চোখে চাইলো ও।
ইভানের শুষ্ক কপোলে জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। ও মৃদু হেসে এগিয়ে এসে তুজার মাথায় গাট্টা দিয়ে বলল,,
“সালাম দিলে উত্তর দিতে হয়, জানিস না?”
তূজা বাকরুদ্ধ। কি বলবে বুঝতে না পেরে হঠাৎ ও বলল,,
“ত-তুই?তুই এখানে কেন?”
ইভান ভ্রু জড়ালো,,“তুই অন্য কাউকে এক্সপেক্ট করছিলি?”
“আমি সেটা কখন বললাম?”
“মাত্রই বলেছিস!”
“আরে,আমি তো জাস্ট…!”
ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এগিয়ে এলো ইভান। বেশ অনেকটা কাছাকাছি এসে, দূরত্ব ঘুচিয়ে আবদারের সুরে বলল,,
“একবার জড়িয়ে ধরি, তোকে? বেশ শক্তভাবে! যাতে কখনো ছেড়ে যেতে না পারিস। আর হ্যাঁ, তুই এখন আমার হালাল কিন্তু! শুনছিস তুজা, আমার সহধর্মিনী তুই! আমার হালাল ভালোবাসা!”
তূজা কি হলো কি জানি? সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠল ওর। না চাইতেও অযাচিত অশ্রুপাতে লেপ্টে গেল কাজল। ইভান জলদি পায়ে এগিয়ে এসে, অশ্রুটুকু মুছে বুকে জড়িয়ে নিল তুজাকে, গভীর-ভরাট কণ্ঠে বললো,,
“আজীবনের জন্য নিজেকে সঁপে দিলাম তোর তরে! আমার সামনে অন্তত,কখনো কাঁদিস না। না সুখে, না দুঃখে! সারা জীবন বুকে জড়িয়ে থাকিস।”
তূজা কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না।। তবে হঠাৎ মস্তিষ্কের তড়িৎ বেগে খেলে গেল কয়েকটা প্রশ্ন। তৎক্ষণাৎ, তার জবাব পেতে মরিয়া হয়ে উঠল ও,
“তুই কি আমাকে করুণা করে বিয়ে করলি ইভান?”
ইভানের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। মেয়েটা এমনটা ভাবল কিভাবে? ক্রোধ জেঁকে বসলেও, প্রিয়ার সম্মুখে প্রকাশ করলো না তা। হৃদয়ের লুকায়িত সত্য জীবনে প্রথম প্রকাশ করল,,
“আমি তোকে ভালবাসতাম,গাধী! নিজের চেয়েও বেশি!”
তূজার সমস্তটা একটা মিষ্টি স্বপ্নের মতো লাগলো। এগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয় কিছুতেই। তবুও এটাই বাস্তবতা। বাক্যহারা হয়ে ইভান কে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো ও। দু এক ফোটা অশ্রু কণা বিসর্জিত হলো বৈ-কি!
“মানুষকে আটকে রেখে হ্যারাস করা রীতিমত ক্রাইম! এটা আপনার জানা আছে,মিসেস? নাকি হাজব্যান্ডের পাওয়ারের অপব্যবহার করার চেষ্টা করছেন?”
দুর্জয়ের স্বাভাবিক স্বরে বলা কথাটাতেও,ক্ষণিকের তরে যেন হিম শীতল বরফে ঢাকা পড়ল কায়রা। সন্ধ্যা গড়িয়ে তখন আবছা আঁধারে ঢেকেছে চারপাশ। তূজা-ইভানের বিয়ের যাবতীয় ঝামেলা চুকিয়ে দুর্জয়ের গাড়িতে চেপে কায়রা কেবল বাড়ি ফেরার পথ ধরেছিল। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলবে, ঠিক তখনই পাশে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটার এই গম্ভীর আকস্মিক প্রশ্নে, হৃৎস্পন্দন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে এলো ওর!
দুর্জয় অতি দক্ষতায়, মসৃণ গতিতে গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামাল। চারপাশ নিস্তব্ধ। ভেতরে মিটিমিটি আলো জ্বালিয়ে, ও স্টিয়ারিং থেকে এক হাত সরিয়ে কায়রার সিটের পেছনের হেলান দেওয়া অংশে রাখল। তারপর ওর সেই সুগভীর দৃষ্টি হেনে, ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল। এদিকে ওর এমন কাণ্ডে অবস্থা বেগতিক কায়রার। কোনো মতে ওর দিকে চেয়ে তোতলাতে তোতলাতে ও বলল,,
“আ-আসলে… মানে হয়েছে কী… মানে আপনি এসব কী বলছেন? আমি আবার কাকে আটকাতে গেলাম?”
দূর্জয় বক্র হাস্যে ঠোঁট বাঁকায়,
“আদিল আর ওর পুরো ফ্যামিলিকে মাঝরাস্তায় আটকে রাখার আইডিয়াটা কার ছিল বলবেন? হায়ার করা লোক দিয়ে টায়ার ব্লাস্ট করানো, তারপর ফ্রেন্ডসদের কবুল বলা পর্যন্ত ওদেরকে একদম ট্রাফিকে আটকে রাখা… প্ল্যানিংটা কিন্তু বেশ নিখুঁত ছিল, আই মাস্ট সে! মেজর দুর্জয় আহসানের ওয়াইফ বলেই হয়তো গ্যাংস্টার মোডটা একটু বেশিই অন হয়ে গিয়েছিল, তাই না?”
কায়রা বিস্ফোরিত নেত্রে চাইলেও দুর্জয়ের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী নজরের সামনে মুখ খোলার সাহস পেল না। আদিলরা হয়তো এটাকে নিছক ছিনতাইকারী বা রোডের লোকাল ঝামেলার নাটক ভেবে পুলিশ কেস করার সুযোগই পায়নি, কিন্তু সেনাবাহিনীর একজন প্রজ্ঞাবান মেজরকে যে এই ধোঁকা দেওয়া অসম্ভব, তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলো কায়রা। দুর্জয় কায়রার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে গাঢ় কণ্ঠে বলল,,
“আই মাস্ট অ্যাপ্রিশিয়েট ইওর লয়্যালটি ফর ইওর ফ্রেন্ডস,ম্যাম। কিন্তু নেক্সট টাইমে যদি কোনো অপারেশনে নামতে হয়, অ্যাটলিস্ট আপনার হাজবেন্ডকে ইনফর্ম করবেন। মাই মিলিটারি নেটওয়ার্ক ইজ মাচ মোর ইফিসিয়েন্ট দ্যান ইওর সো কল্ড লোকাল গুন্ডা!”
আর কিছু বলার সাহস করল না বেচারী। ভীত বদনে, আড়ষ্ট নেত্র জানলার বাইরে নিবদ্ধ করলো। দুর্জয়ও আর কথা না বাড়িয়ে, ধীরেসুস্থে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি ড্রাইভ করা শুরু করল। হঠাৎ কায়রা বলল,,
“ভবিষ্যতে কখনো লাগলে নিশ্চিত আপনাকেই প্রধান সেনাপতি বানাব, মেজর সাহেব!”
“ইওর অফার অ্যাকসেপ্টেড,মাই কুইন!”
ক্লান্তির এক প্রগাঢ় অবশতা গ্রাস করেছিল কায়রাকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে আধার ঘনীভূত হয়েছিল্। সাজেদা চৌধুরী ওর শ্রান্ত মুখ অবলোকনপূর্বক আর কথা বাড়াননি; আদরে ভরা হাতটি মাথায় বুলিয়ে ওকে সোজা পাঠালেন নিজ কক্ষে। পরিশ্রান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেওয়া মাত্রই নিমেষে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল কায়রা।
দেয়ালঘড়ির তীক্ষ্ণ টিকটিক শব্দে যখন ওর ঘুম ভাঙল, তখন রাতের আঁধার বেশ ঘনীভূত হয়েছে। সময়ের কাঁটা নির্দেশ করছে রাত সাড়ে আটটা। ঝিমুনি কাটাতে কায়রা দ্রুত উঠে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। ঠান্ডা পানির স্পর্শে মুখমণ্ডল ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘর হতে বের হতেই চমকে উঠল সে।
দরজার সমুখেই হাতে দু’কাপ চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দুর্জয়। গম্ভীর, সুপুরুষ লোকটার হাতে দুই কাপ চা এই অসময়ে মানায় না মোটেই! কিছুটা নিস্পৃহ আর নিয়মানুবর্তী মানুষটা সচরাচর এই গভীর রাতে চা পান করে না। অবাক চোখে তাকিয়ে কায়রা কিছু শুধাতে যাবে, তার পূর্বেই দুর্জয় গভীর স্বরে শান্ত আদেশ শোনাল,,
“কাম অন, ব্যালকনিতে এসো।”
কায়রা কোনো দ্বিমত করল না। লোকটার গম্ভীর আদেশের পেছনে সবসময়ই এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে, যা উপেক্ষা করা দায়। দুর্জয়ের পিছু পিছু সে পা বাড়াল শয়নকক্ষ সংলগ্ন সুবিশাল ব্যালকনিটার দিকে।ওদের ঘরের এই অর্ধবৃত্তাকার বারান্দাটা বেশ প্রশস্ত। সেখানে পা রাখতেই দুর্জয় দেয়ালের সুইচবোর্ডে হাত বাড়িয়ে আলো জ্বালিয়ে দিল।
আঁধার চিরে আলোয় চারপাশের দৃশ্য উন্মোচিত হতেই কায়রা একদম বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ময়ে দু’চোখ ছানাবড়া, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডান উঠে গেলো মুখের ওপর। চক্ষু সম্মূখের জিনিসগুলো অবিশ্বাস্য ঠেকছে।
পুরো বারান্দাটা এক মায়াবী রূপপুরীতে রুপান্তরিত। অর্ধবৃত্তাকার ব্যালকনির চারপাশ ঘিরে অন্যান্য বনফুলের পাশাপাশি, সীমানা জুড়ে সারি সারি কাঠের টবে লালানো হয়েছে অসংখ্য কাঠগোলাপের চারা; ফুটে থাকা শুভ্র-হলুদ কাঠগোলাপের তীব্র স্নিগ্ধ সুবাস নৈশ বাতাসে ভেসে এসে কায়রার নাসারন্ধ্র ভরিয়ে দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছিল বারান্দার উত্তর পার্শ্বে দেয়ালটায়।
পুরো দেয়ালজুড়ে নিখুঁত কারুকাজে তৈরি করা হয়েছে মেহগনি কাঠের বেশ কয়েকটি তাক–একদম আস্ত এক লাইব্রেরির আদলে। আর সেই তাকগুলোতে থরে থরে সজ্জিত দেশি-বিদেশি অসংখ্য বিখ্যাত উপন্যাসের বই। মসৃণ মলাটের ওপর মৃদু আলোর প্রতিফলন অপূর্ব দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তার ঠিক নিচেই পাতা একটা ঝুলন্ত কাঠের চৌকি সদৃশ আরামদায়ক কাউচ, যাতে বিছানো নরম গদি আর কয়েকটি তুলতুলে কুশন।
কায়রা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে স্পর্শ করল তাকের ওপর সাজিয়ে রাখা বইয়ের মলাটগুলো। একদম ওর কল্পলোকের ন্যায় সাজানো সব কিছু,পরম মমতায় ছুঁয়ে দেখল কাঠগোলাপের পাপড়ি। চোখের কোণে জমা হতে যাওয়া শিশিরবিন্দুগুলোকে সামলে নিয়ে পেছনে ফিরল ও। দেখল, দুর্জয় এখনো আগের মতোই মৃদু হেসে চায়ের কাপ দুটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কায়রা আবেশিত আর অবিশ্বাস্য কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“মেজর…?”
দুর্জয় চায়ের কাপ দুটো কাঠের ছোট টেবিলটার ওপর রেখে অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এলো কায়রার দিকে। ওর আয়ত চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সুগভীর, গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“কেউ একজন বলেছিল, কাঠগোলাপ তার ভীষণ প্রিয়। অতঃপর, আমার চোখে আর অন্য কোনো ফুলের সৌন্দর্য ধরা দেয়নি। আর… সেই কেউ একজন এও বলেছিল যে, সে নাকি উপন্যাসের কাল্পনিক পাতায় হারিয়ে যেতে ভালোবাসে! অথচ সে বোঝেনি, বাস্তবে তাকে একনজর দেখলেই যে আমার এই শক্ত পুরুষালী সত্তা পুরোপুরি হারিয়ে যায়, উন্মাদের ন্যায় হাওয়ায় ভেসে যায়!”
দুর্জয়ের প্রতিটি শব্দ কায়রার হৃদয়ের গভীরে প্রকম্পন সৃষ্টি করল;আবেগী কায়রা সোজা এগিয়ে গিয়ে দূর্জয়ে প্রশস্ত বুকে নিজেকে সঁপে দিল নিজেকে। দু’হাতে শক্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল লোকটাকে। দুর্জয়ও ক্ষণকাল বিলম্ব না করে এক হাতে কায়রার ক্ষীন কটিদেশ পেঁচিয়ে ধরে ওকে নিজের ছাতি জুড়ে আগলে নিল, অন্য হাতের আঙুল চালিয়ে দিল ওর ঘন চুলগুলোর মাঝে। দুর্জয়ের বুকের ধুকপুক শব্দটা কান পেতে শুনে, কায়রা বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলে উঠল,
“আপনি জানেন মেজর, এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মেয়ে যদি কেউ থাকে, তবে সে আমি! যার স্বামীর কাছে তার মুখের ছোটো ছোটো অপ্রকাশিত কোনো ফালতু ইচ্ছাও এত বড় অর্থবহুল আর দামী হিসেবে কাজ করে… আই অ্যাম জাস্ট সো লাকি, মেজর! সো সো লাকি!”
অভিসৃতি পর্ব ২৫
দুর্জয় মৃদু হেসে কায়রার চুলে হালকা ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর স্বরে বলল,
“তুমি শুধু আমার হয়ে থেকে যাও,তোমার প্রতিটা ছোট ছোট ইচ্ছা পূর্ণ করার দায়িত্বও এই দুর্জয় আহসান নিজের মাথা পেতে গ্রহন করবে। অ্যান্ড ইয়্যু নো,আই অলওয়েজ কমপ্লিট মাই ডিউটি উইথ পারফেকশন!”
