Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২১
অধরা মিনহা

ইফরাদের কেবিনে হাসি-ঠাট্টার রোল পড়ে গেছে। রোশান আর আয়ুষ এসেছে। আয়ুষ দুপুরের দিকে ফোন করে ইফরাদকে জানিয়েছিল অফিসে আসছে আড্ডা দিতে। প্রায়ই এমন করে আসে। আয়ুষের ফোন পাওয়ার পর ইফরাদ রোশানকেও ফোন করে আসতে বলেছিল। ওদের আড্ডা কখনো দুজনের হয় না। তিনজন থাকলেই আড্ডাটা জমে ওঠে। কলেজজীবন থেকেই তিন বন্ধু ছিল জানের জান। সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে, কিন্তু ইফরাদের সঙ্গে দুজনের বন্ধুত্ব এখনো আগের মতোই আছে। যদিও রোশান আর আয়ুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না, একটা কারণে প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। তবুও ইফরাদের সঙ্গে দুজনের বন্ধুত্বে কোনো ভাটা পড়েনি।
ইফরাদের টেবিলজুড়ে তখন নাচুস, চিকেন ফ্রাই, স্যুপ আর অন্থন সাজানো। তিন বন্ধু বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, সঙ্গে চলছে নাস্তা। খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ আয়ুষের ফোন বেজে উঠে। আয়ুষ ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে নোহা। মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। সে ফোনটা কেটে দেয়। কিন্তু ফোনটা পকেটে রাখার আগেই আবার বেজে উঠে। আয়ুষ এবার আরো বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে বলে,

— পরে কথা বলবো! ব্যস্ত আছি।
ওপাশ থেকে নোহা রেগে বলে,
— ব্যস্ত কখন থাকো না তুমি? যখনই কল দেই তোমার ব্যস্ততা!
আয়ুষ বিরক্ত গলায় বলে,
— ব্যস্ত টাইমে কল দিয়ে ডিস্টার্ব করা তোমার স্বভাব হয়ে গেছে! কল দিবে না।
কথাটা বলেই আয়ুষ কল কেটে দেয়। ফোনটা টেবিলের ওপর রাখতেই আবার বেজে উঠে। এবার আয়ুষের মেজাজ গরম হয়। আয়ুষ টেবিল হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নোহার নম্বরটা ব্লক করে দেয়। এতক্ষণ ইফরাদ আর রোশান চুপচাপ পুরো ব্যাপারটা দেখছিল। এবার ইফরাদ মুখ খুলে,
— এই শালা, ঝামেলা করলে বাইরে গিয়ে কর! এক্ষুনি নোহা এসে হাজির হবে আমার অফিসে।
রোশান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চিকেন ফ্রাই খেতে খেতে বলে,
— আসলে গার্ড দিয়ে লাথি মেরে বের করে দিবি।

ইফরাদ কিছু বলতে যাবে, তখনি কেবিনের দরজায় নক হয়। পরমুহূর্তেই হিলের টুকটুক শব্দ তুলে কেবিনে ঢুকে বোরখা পরিহিত ইরাইনা। হাতে দুটো ফাইল। কেবিনে ঢুকেই ইরাইনা একটু থমকে গেল। কারণ, ইফরাদের কেবিনে কেউ আছে, এটা সে জানত না। রোশান আর আয়ুষ কেউই বোরখা পরা মেয়েটাকে চিনতে পারে না। তবে মেয়েটার চোখ দুটো তাদের দুজনের কাছেই ভীষণ চেনা লাগে। রোশান সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়। কিন্তু আয়ুষ চোখ সরাতে পারে না। মেয়েটা সুন্দর। বোরখা পরা অবস্থাতেও মেয়েটার দিক থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। বিশেষ করে তার চোখ দুটো, মারাত্মক আকর্ষণীয়। আর সেই চোখ দুটোও খুব পরিচিত।
তার ওপর সুন্দর মেয়েদের কাছ থেকে আয়ুষ এমনিতেও সহজে চোখ সরাতে পারে না। তবে আয়ুষ আর রোশান দুজনের মনেই একই সঙ্গে সামান্য কৌতূহল জেগে উঠে। মেয়েটা কে? এই অফিসে তো কেউ বোরখা পরে না!তাহলে মেয়েটা কে? আর হাতের এই ফাইলগুলোই বা কী?
ইফরাদ ইরাইনাকে দেখে বলে,

— কিছু বলবে?
ইরাইনা হাতে থাকা ফাইল দুটো ইফরাদের টেবিলের ওপর রেখে বলে,
— ফাইলগুলোতে তোমার সাইন লাগবে।
ইফরাদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আচ্ছা, রেখে যাও। আমি সাইন করে দিবো।
ইরাইনার কণ্ঠ শুনেই রোশান আর আয়ুষ দুজনেই চমকে তার দিকে তাকায়। এই কণ্ঠটা ইরাইনার! কিন্তু ইরাইনা বোরখা পরে আছে?! মানে, এটা কীভাবে সম্ভব? এবার দুজনেই ইরাইনাকে ভালো করে পরখ করতে লাগল।বোরখা পরা অবস্থায় মেয়েটাকে অন্যরকম আকর্ষণীয় লাগছে। চোখ সরানোই যাচ্ছে না। ইরাইনার পরনে কালো বোরখা, কালো নিকাব আর কালো হিজাব। নিকাবের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে বড় বড় চোখ। চোখজুড়ে টানা আইলাইনার। রোশানের চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না। সে তাকিয়েই রইল। ইরাইনা আচ্ছা বলে সেখান থেকে চলে যায়।
ইরাইনা কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই রোশান ঘাড় স্লাইড করতে করতে মনে মনে বলে,

— এই মেয়েটা এত সুন্দর কেন? কেন এত মায়া দিয়ে বানালে, আল্লাহ? আল্লাহ, এই মেয়েটাকে যদি আমার বউ করে না দাও, তাহলে আমি মরেই যাবো!
অন্যদিকে আয়ুষ জিহ্বা ঠেলে গালের একপাশে বের করে মনে মনে বলে,
— ব্রেকআপ হওয়ার পর আরো বেশি সুন্দর হয়ে গেছে। দুনিয়ায় ব্রেক আপ হওয়ার পর এক্স সুন্দর হয়ে যায় কেন, খোদা? ওকে দিন দিন সুন্দর বানিয়ে তুমি আমাকে কোনটি পাপের শাস্তি দিচ্ছো, মাবুদ?
এরই মধ্যে ইফরাদ টেবিল থেকে টিস্যু তুলে হাত মুছতে মুছতে বলে,
— হয়েছে, এখন যা তোরা।
রোশান সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,

— কোথায়?
ইফরাদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আমি কি জানি! যেখানে ইচ্ছে যা।
রোশান জিজ্ঞেস করে,
— তুই কোথাও যাচ্ছিস?
ইফরাদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। টেবিলের ওপর থাকা নিজের দুটো ফোন পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলে,
— বাসায়।
আয়ুষ হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নেয়। পাঁচটা বাজে। অফিস টাইম সকাল দশটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। আয়ুষ ভ্রু নাচিয়ে বলে,
— ইদানীং দেখছি বাসা বাসা করিস! বাসায় কি মধু আছে?
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,

— উহু, বধু আছে!
আয়ুষ হাহুতাশ করে বলে,
— আজ একটা বধু নেই বলে!
ইফরাদ হেসে বলে,
— তোর যে চরিত্র, বধু টিকবে ঘরে!
আয়ুষ সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা বলে,
— কিছু মনে করাবো? ভুলে গেছিস!
ইফরাদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
— মনে রাখার প্রয়োজন নেই বলেই ভুলে গেছি!
আয়ুষ এবার হাত তুলে বলে,
— আচ্ছা ভাই, বাদ দে! তুই দেখছি ভাবির ইশারায় চলিস! ওহ, সরি!
কথাটা বলেই আয়ুষ আবার বলে,

— ওহ, মিস্টেক! ভাবি ডাকতে মানা করেছিলে! নামটা যেন কী? নাম ধরে ডাক….
ইফরাদ চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ভাবি ছাড়া একটা সাউন্ড বের করবি, স্টোর রুমে নিয়ে মারবো!
আয়ুষের মুখে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠে,
— তার মানে আমাদের অফিসিয়াল ভাবি?
ইফরাদ গম্ভীর গলায় বলে,
— ইয়েস। নাও, শি ইজ ইউর অফিসিয়ালি ভাবি।
কথাটা বলেই ইফরাদ নিজের সবকিছু গুছিয়ে নেয়। ফাইল দুটো হাতে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ে। আজ সাফিন অফিসে আসেনি। তার মা অসুস্থ থাকায় ছুটি নিয়েছে। ইফরাদের সঙ্গে সঙ্গে রোশান আর আয়ুষও বেরিয়ে গেল। তিনজনই চলে গেল নিজেদের যার যার গন্তব্যে। আর ইফরাদের গন্তব্য বাড়ি। তার মাই জানারের কাছে। ইফরাদের গাড়ি চলতে শুরু করে। সে গাড়ির পেছনের সিটে বসে আছে। সামনে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর ইফরাদের গাড়ি এসে বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ায়। দারোয়ান বাড়ির গেট খুলছে। তখনি হঠাৎ একটা মেয়ে এসে ইফরাদের গাড়ির দরজায় নক করতে শুরু করে।
ফোনে ব্যস্ত ইফরাদ একবার গাড়ির গ্লাস দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। তারপর আর কোনো পাত্তা না দিয়ে আবার ফোনে মনোযোগ দেয়। কিন্তু মেয়েটা থামে না। সে অনবরত গাড়ির দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। এভাবে বারবার ধাক্কা দেওয়ায় ইফরাদের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ইফরাদ রেগে গিয়ে ড্রাইভারকে বলে,

— হোয়াট দা হ্যাল! গ্লাস খোলো!
ড্রাইভার গ্লাস খুলতেই ইফরাদ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় ঝাড়ি দেয়,
— ম্যানার্স নেই?!
ইফরাদের এমন ধমকে মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
— দু…..দুলাভাই!
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে আরও রেগে বলে,
— কে দুলাভাই? ইডিয়ট!
মেয়েটার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা তখন তাকে পেছন থেকে হালকা খোঁচা দিয়ে কিছু একটা ইশারা করে।মেয়েটা এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— আমি আনাবি। আনতারার বোন!
কথাটা শুনতেই ইফরাদের মুখের রাগ কিছুটা কমে গেল।
সে চোখ সরু করে এবার সবাইকে ভালো করে দেখতে লাগল। মেয়েটার বয়স আনুমানিক উনিশ বছর। তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা, বয়স পঁয়ত্রিশ কিংবা সাঁইত্রিশ হবে। ইফরাদ মনে মনে আন্দাজ করে, এটাই সম্ভবত আনতারার সৎ মা। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে। গভীর আগ্রহ নিয়ে সে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে ইফরাদ চিনতে পারল না।ইফরাদ যখন সবাইকে দেখছিল তখনি দারোয়ান এসে তাদের দিকে ঝাড়ি মেরে বলে,

— এখনো যাননি! কখন যেতে বলেছি?
দারোয়ানের কথায় আনাবি প্রথমে চমকে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সাহস ফিরে পেয়ে চোখ রাঙিয়ে বলে,
— এই! চিনেন আমাকে?!
তারপর ইফরাদকে দেখিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বলে,
— আমি ওনার সম্পর্কে শালি হই।
বলেই ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— দেখুন না দুলাভাই, সেই কখন এসেছি কিন্তু আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। আমরা আনতারার সাথে দেখা করতে এসেছি।
ইফরাদ একবার আনাবির দিকে তাকায়। তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ গেল তার। এরপর দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

— ওদের ভেতরে ঢুকতে দাও।
তারপর ড্রাইভারকে বলে,
— গাড়ি স্টার্ট দাও।
ইফরাদের কথা শুনে আনাবির মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠে। রাবেয়া মল্লিকাও খুশি হলেন। ইফরাদের গাড়ি গেট পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। গাড়িটা ভেতরে ঢুকতে দেখে এবার একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাদমান আনাবির কাছে এগিয়ে এল।
আনাবি হেসে বলে,

— চল, ভেতরে যাই।
তারপর ওরাও বাড়ির ভেতরে ঢুকে। গেটের বাইরেরটা যতটা সুন্দর আর আকর্ষণীয়, ভেতরের সৌন্দর্য তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। বিশাল বাড়িটাকে দেখলে মনে হলো কোনো রাজপ্রাসাদ। তবে পুরো বাড়ির ডিজাইন, কাজ আর সাজসজ্জায় আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। বাড়ির বাইরের অংশজুড়ে চকচক করছে কালো কাচ। প্রথমবার বাড়িটা দেখলেই একটা কথাই মনে হয়, রুচি আছে লোকটার! বাড়ি বানাতে হলে এমনই হওয়া উচিত। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করবে না।
আনাবি চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে রাবেয়া মল্লিকাকে বলে,

— আম্মু, আমি যাওয়ার সময় ইফরাদ রিদান চৌধুরীর সাথে একটা সেল্ফি তুলবো! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না, এত বড় সুপারস্টারের বাড়িতে আমরা!
রাবেয়া মল্লিকা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলেন,
— আমারও বিশ্বাস হচ্ছে না।
কথাটা বলেই হঠাৎ রাবেয়া মল্লিকার মুখটা চুপসে গেল।
ওনার চেহারায় এবার স্পষ্ট হয়ে উঠে হিংসা। আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকার দুজনের মনেই এক ধরনের হিংসা জন্ম নেয়। এমন বিশাল, রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে আনতারা এসেছে, এই ব্যাপারটা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। বিষয়টা মনে হতেই ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলতে লাগল তারা। এদিকে ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ইফরাদ গাড়ি থেকে নামে। নেমেই ইফরাদ একবার ওদের দিকে তাকায়। আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকা এখনো মুগ্ধ হয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।

অন্যদিকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার এসবের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার চোখ অন্য কাউকে খুঁজছে। কিন্তু এই ছেলেটা কে?আনতারার কাছ থেকে তো ইফরাদ কখনো তার কথা শোনেনি। ইফরাদ আর দাঁড়ায় না। সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। ইফরাদকে ভেতরে যেতে দেখেই আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকা একপ্রকার ছুটে ইফরাদের পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। সাদমানও তাদের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে। তারা ইফরাদের পেছন পেছন লিভিং রুমে গিয়ে পৌঁছায়। লিভিং রুমে আগে থেকেই বসে ছিলেন শার্লিন ইমরোজ আর ইফতিন। তারা দুজন কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন।
ইফরাদকে এবং তিনজন অচেনা মানুষকে দেখতে পেয়ে ওরা চুপ হয়ে যায়। শার্লিন ইমরোজ ভালো করে তাদের দিকে তাকান। তাদের পরনের পোশাক বেশ ভারী ও গর্জিয়াস। মুখেও একগাদা মেকআপ। শার্লিন ইমরোজ এতটুকু নিশ্চিত হলেন, এরা তাদের সোসাইটির লোক না।
কিন্তু তাহলে কারা? ইফরাদই বা এদের কাদের নিয়ে এলো? প্রশ্নটা আর মনে চেপে রাখতে পারলেন না তিনি।
সরাসরি জিজ্ঞেস করেন,

— ওরা কারা, রাদ?
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। খুব সুন্দরভাবেই শার্লিন ইমরোজের প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। আসলে কালকের ঘটনার কারণেই মায়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। শার্লিন ইমরোজ আর ইফতিন দুজনেই ব্যাপারটা বুঝতে পারে। ইফরাদও নিজের আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয় তা। এবার ইফতিন ডাকে,
— ব্রো?
ইফরাদ একবার তাদের দিকে তাকায়। বুঝতে পারে তাদের কৌতহল। তাই স্বাভাবিক গলায় বলে,
— ওরা তোমার ভাবির ফ্যামিলির লোকজন।
কথাটা লিভিং রুমে উপস্থিত বাকি সবার কাছে যতটা স্বাভাবিক ছিল, রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবির কাছে ততটাই বিস্ময়ের। দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে একে অপরের চোখের দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করে, ভাবি? আনতারাকে ভাবি বলা হচ্ছে? তাহলে কি সত্যিই আনতারা এই বাড়িতে বউয়ের মর্যাদা পাচ্ছে? শার্লিন ইমরোজ আনতারার ফ্যামিলির লোকজন শুনেই নাক ছিটকালেন। মনে মনে বলেন,

— এই জন্যই এদের পোশাক-আশাক দেখে এমন লাগছিল!
অন্যদিকে ইফতিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমেই তার নজর গিয়ে পড়ে আনাবির ওপর।মেয়েটার পরনে একটা শর্ট শার্ট, সঙ্গে জিন্স। মুখে ভারী মেকআপ। ইফতিন মনে মনে হাসে। এই মেয়েটাকে দেখে কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই আনতারার বোন বলে মনে হচ্ছে না। তারপর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটার দিকে তাকায় ইফতিন। আন্দাজ করে, এই মহিলাই সম্ভবত আনতারার মা। কিন্তু আনতারার মায়ের অবস্থাও একই। পরনে ভারী থ্রিপিস। মুখে মেকআপের ছড়াছড়ি। পর্দার ছিটেফোঁটা নেই তাদের মধ্যে। ওদের কাউকেই দেখলে বোঝার উপায় নেই যে আনতারা তাদের কিছু লাগে।
যেখানে আনতারার পরিবারেরই ধর্মীয় জ্ঞান নেই, সেখানে আনতারা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান দেয়। যেখানে বিশ কিংবা পঁচিশ বছর থেকেও সে নিজের পরিবারের পরিবর্তন করতে পারেনি, সেখানে আনতারা এসেছে তাদের পরিবর্তন করতে!
এদিকে রাবেয়া মল্লিকার আর তর সইছে না। তিনি আনতারাকে দেখতে চান। এমনিতেই এত বড় বাড়ির বউ আনতারা হয়েছে, এটা নিজের চোখে দেখে হিংসায় ভেতরটা জ্বলছে ওনার। কিন্তু সেটা উপরে না বুঝিয়ে হাসি দিয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— বাবা, আনতারা কোথায়? আমার মেয়েটাকে দেখতে চাই।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— রুমে আছে। মেইডকে দিয়ে পাঠাচ্ছি ওর কাছে।
এরপর ইফরাদ একজন মেইডকে ডাকে। ওদের আনতারার কাছে নিয়ে যেতে বলে। তারপর সাদমানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তুমি আনতারার ভাই?
সাদমান গম্ভীর গলায় বলে,
— না, আমি ভাই না।
ইফরাদ এবার আনাবির দিকে তাকিয়ে বলে,
— তাহলে কে?
আনাবি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— ও আমার ভাই!
ইফরাদ এবার গলার স্বর একটু তীক্ষ্ণ করে বলে,

— তাহলে তো আনতারার ভাইই হলো!
কথাটা সাদমানের মোটেও পছন্দ হলো না। ইফরাদ ইচ্ছে করেই কথাটা বলেছে। শুরু থেকেই সাদমানকে তার সুবিধার মনে হচ্ছে না। পছন্দও হচ্ছে না। এমন না যে অন্যদেরও সে খুব একটা পছন্দ করেছে। কিন্তু কেন যেন সাদমানকে সে একদমই সহ্য করতে পারছে না। ইফরাদ ভালোভাবেই বুঝে গেছে, সাদমানের নিয়ত ভালো না। মেইড যখন আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল, সাদমানও তাদের সঙ্গে যেতে উদ্যত হলো। তখনি ইফরাদ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
— তুমি কোথায় যাচ্ছো?
সাদমান স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আনতারার কাছে।
ইফরাদ সরু চোখে সাদমানের দিকে তাকিয়ে বলে,

— আনতারা পরপুরুষদের সামনে যায় না। আনতারা আমি ছাড়া কারোর সামনেই যায় না।
কথাটা শুনে সাদমান নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে। সে বুঝতে পারছে, ইফরাদ তাকে সহ্য করতে পারছে না।ইফরাদের দৃষ্টিই সেটা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। ইফরাদ এমন ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাদমানের দিকে তাকিয়ে আছে যে, মনে হচ্ছে সুযোগ পেলে সাদমানকে বিষ খাইয়ে দিতে পারলেই তার শান্তি হতো। অন্যদিকে ইফতিন পুরো ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। সাদমান যে আনতারার ভাই না, সেটা সে বুঝে গেছে। তার ধারণা, হয়তো সাদমান আনতারার প্রেমিক! এই ধারণাটা মনে হতেই ইফতিনের বেশ হাসি পেল। বিষয়টা ইফতিনের কাছে বেশ মজারই লাগছে।
অন্যদিকে শার্লিন ইমরোজ চুপচাপ বসে সবকিছু দেখছেন। কিন্তু কিছু বলছেন না। এমনিতেই কালকের ঘটনার কারণে ইফরাদ ওনার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যদি আবার তার শ্বশুরবাড়ির মানুষের সামনে কোনো কিছু করে বসেন, তাহলে ছেলের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ুক, এটা তিনি চান না। ইফরাদ গিয়ে সোফায় বসে। পায়ের ওপর পা তুলে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে সাদমানকে ডাকে,

— আরে শালা, দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো!
শালা ডাকটা সাদমানের কাছে গালি লাগে। অবশ্য ইফরাদ দিয়েছেই এমনভাবে কিন্তু তবুও ভদ্রতার খাতিরে গিয়ে সোফায় বসে সাদমান। সে এখানে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে। আনতারার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য মনটা আকুপাকু করছে।
এর মাঝেই হঠাৎ ইফরাদ প্রশ্ন করে,
— তুমি আনতারার কেমন ভাই?
প্রশ্নটা সাদমানের কাছে অসহ্য লাগে। তবুও সে নিজেকে সংযত করে উত্তর দেয়,
— আমি আনাবির খালাতো ভাই।
কথাটা বলেই সাদমান পাল্টা প্রশ্ন করে,
— আপনারা কবে বিয়ে করেছেন?
ইফরাদ কোনো জবাব দেয়। বরং বেশ সূচালো দৃষ্টিতে সাদমানের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদমানের চোখে পড়ে সেই দৃষ্টি। তবুও সে আবার বলে,
— না, মানে শুনেছিলাম আপনি নাকি আনতারাকে আরো এক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন? সাংবাদিকের কাছে এমনটাই বলে…..
ইফরাদ এবার ঠান্ডা অথচ দৃঢ় গলায় বলে,

— ওসব বাদ। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে পরপুরুষের সাথে কোনো কথা বলতে চাই না।
ব্যস। এরপর সাদমান আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগই পেল না।
অন্যদিকে আনতারা মাগরিবের নামাজ শেষ করে মোনাজাত শেষ করেছে তখনি দরজায় নক হয়। আনতারা ভেতর থেকে আওয়াজ দেয়,
— কে?
ওপাশ থেকে মেইডের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— ম্যাম, আমি।
— খুলছি।
কথাটা বলে আনতারা জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। জায়নামাজটা তুলে সুন্দর করে ভাঁজ করে হাতে নেয়। তারপর দরজা খুলতেই বাইরে মেইডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
মেইড বলে,
— ম্যাম, আপনার বাড়ির লোক এসেছে।
কথাটা বলেই মেইড সেখান থেকে চলে গেল। রাবেয়া মল্লিকা আনতারাকে এভাবে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলেন,

— তুই বুঝি খুশি হোসনি আমাদেরকে দেখে?
আনতারা এবার দুইদিকে মাথা নেড়ে না বোঝায়। তারপর মুখে হালকা হাসি এনে বলে,
— না না, আম্মা। খুশি হবো না কেন? আমি আসলে অবাক হয়েছি!
রাবেয়া মল্লিকা কোনো কথা না বলে আনতারাকে পথ থেকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলেন। তারপর রুমের ভেতরে ঢুকে বিশাল ঘরটা চারপাশ থেকে ভালোভাবে দেখতে দেখতে বলেন,
— এই রুমটা কার রে?
আনতারা শান্তভাবে উত্তর দেয়,
— আমার আর ওনার!
আনাবি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,
— ওনার বলতে সুপারস্টার ইফরাদ রিদান চৌধুরীর?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
এরপর আনতারা একটু জড়তা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তোমরা একা এসেছো?
আসলে সে জানতে চায় তার বাবা সাথে এসেছে কিনা। কিন্তু আনাবি বলে,

— না, সাদমান ভাই এসেছে সাথে!
কথাটা শুনতেই আনতারার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার শরীরটা কেমন যেন ভয়ে সামান্য কেঁপে উঠে। মনের ভেতর হঠাৎ এক অজানা ভয় এসে বাসা বাঁধল।নিজের সুন্দর একটা সংসার হয়েছে তার। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। এই সংসারে সে শান্তিতে আছে। সে চায় না, কেউ তাদের মাঝখানে আসুক। কিন্তু সাদমান কেন এসেছে?
আনতারা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে,
— ওনি কেন এসেছে?
আনাবি অবলীলায় বলে,
— তুমি জানো না? বেচারা বিদেশ থেকে এসে তোমার সম্পর্কে জেনে পাগল হয়ে গেছে বলতে গেলে।
আনতারা এবার দ্রুত জিজ্ঞেস করে,

— কোথায় ওনি?
আনাবি হেসে বলে,
— তোমার বরের সাথে নিচে!
কথাটা শুনে আনতারার ভেতরের ভয়টা আরো বেড়ে গেল
একজন পরপুরুষ তার বাড়িতে এসেছে। তার ওপর ইফরাদের সঙ্গে নিচে বসে আছে। বিষয়টা নিয়ে ইফরাদ রাগ করলে? ভয়টা মনে জাগলেও আনতারা সেটা প্রকাশ করে না। কোনোভাবে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আনতারা বলে,
— আব্বুজান কেমন আছে?
রাবেয়া মল্লিকা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন,
— তুই যে কালি মেখে এসেছিস! সেই কালি নিয়ে আর কেমন থাকবে?
আনতারা এবার একটু দৃঢ় গলায় বলে,
— আমি আগেও বলছি, এখনো বলছি, আমি কিছু করিনি। তাছাড়া আনাবি….
আনাবি সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

— ওসব পুরনো কথা প্লিজ বাদ দাও!
আনতারা আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
— আম্মা, কিছু কথা ছিলো!
রাবেয়া মল্লিকা তাকিয়ে জিজ্ঞেস কলেন,
— কী কথা?
আনতারা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে,
— ওই বাড়ি থেকে আমি এক কাপড়ে এসেছি। আম্মুর কোনো স্মৃতিই আনতে পারিনি। তুমি আমাকে আম্মুর জিনিসগুলো দিয়ে দিবে?
রাবেয়া মল্লিকা ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— জিনিস বলতে কোনগুলো? সোনা-গয়নার কথা বলছিস?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। ওগুলো ছাড়া তো আর কোনো স্মৃতি তুমি রাখোনি!
রাবেয়া মল্লিকার রেগে বলেন,
— সোনা-গয়নার ওপর তোর কোনো হক নেই। ওগুলো এখন আমার আর আমার মেয়ের।
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— কিন্তু ওগুলো তো আমার আম্মুর!
রাবেয়া মল্লিকা একদম সোজাসাপ্টা গলায় বলেন,
— পাবি না। সোজা কথা শুনে রাখ!

কথাটা শুনে আনতারার চোখে পানি এসে গেল। তার মায়ের স্মৃতি বলতে এখন কেবল ওই সোনার গয়নাগুলোই আছে। এ ছাড়া আর কিছুই নেই। তার মায়ের বাকি সব স্মৃতি রাবেয়া মল্লিকা পুড়িয়ে ফেলেছেন, এটা আনতারা নিজেই রাবেয়া মল্লিকার কাছ থেকে শুনেছিল। শুধু তার মায়ের স্বর্ণের গয়নাগুলোই আনতারার কাছে ছিল। ওগুলো তার দাদী তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই গয়নাগুলোই ছিল তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া একমাত্র স্মৃতি। আর এখন সেটুকুও তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার কথা বলছে রাবেয়া মল্লিকা।
আনতারা চলে আসার পর তার মায়ের সোনার গয়নাগুলো যে রাবেয়া মল্লিকার কাছেই আছে, সেটা আনতারা জানে। স্বর্ণের প্রতি আনতারার কোনো আগ্রহ নেই। ওই গয়নাগুলো তার কাছে মূল্যবান শুধু একটাই কারণে, ওগুলো তার মায়ের স্মৃতি।
আনতারা অশ্রুসিক্ত চোখে রাবেয়া মল্লিকার দিকে তাকিয়ে বলে,

— আচ্ছা, তুমি শুধু বালাগুলো দাও? আচ্ছা, দুটো না, একটা বালাই দাও। এছাড়া তো আম্মুর আর কোনো স্মৃতি নেই। কাপড়চোপড় সব তুমি পুড়িয়ে দিয়েছো!
রাবেয়া মল্লিকা একদম কঠিন গলায় বলেন,
— ওগুলো আমি জীবনেও দিবো না। বুঝেছিস?! কেঁদে লাভ নেই।
আনতারা বুঝতে পারে, সত্যিই তিনি গয়নাগুলো দেবেন না। অবশ্য আনতারা মনে মনে আশাই করেছিল, রাবেয়া মল্লিকা জীবনেও এগুলো তাকে দেবেন না। এই স্বর্ণের গয়নাগুলোর ওপর রাবেয়া মল্লিকার আগে থেকেই নজর ছিল। এখন তো আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরে রাখবেন।
আনতারা চোখের পানি মুছে নেয়। রাবেয়া মল্লিকা ঘরটা দেখতে দেখতে হঠাৎ আনতারার দিকে ফিরে তাকান।তারপর রহস্য করে বলেন,

— সত্যিই ইফরাদ তোকে বিয়ে করেছে? নিশ্চয়ই তোকে বিয়ে করে বাড়ির কাজের লোক হিসেবে রেখেছে। নয়তো তোর মতো মেয়েকে তো বউ হিসেবে মানার কথা না ওমন সুপারস্টারের!
আনতারা এবার কপাল কুঁচকে ফেলে।
— কী বলতে চাইছো?
রাবেয়া মল্লিকা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন,
— না, আমি বলতে চাইছি, এসব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ওপর বিশ্বাস নেই। আজ এটাকে ধরে, তারপর দুইদিন খেয়ে ছেড়ে দিয়ে নতুন কাউকে ধরে। চরিত্র ভালো থাকে না আরকি!
কথাগুলো শুনে আনতারার চেহারা মুহূর্তেই রাগে লাল হয়ে উঠে। আনতারা জীবনে কখনো এতটা রাগেনি। কিন্তু আজ তার সহ্যের সীমা একেবারে শেষ হয়ে গেল। এতক্ষণ সে নিজের সম্পর্কে হাজারটা কথা শুনেও চুপ ছিল। কিন্তু নিজের স্বামীর সম্মানের জায়গায় আঘাত আসতেই আনতারা আর নিজেকে থামাতে পারে না। সংযত কিন্তু প্রচণ্ড রাগী কণ্ঠে বলে,

— আমার উপর হাজার কথার টু শব্দ করিনি, কিন্তু আমার স্বামীর সম্মানে আঘাত আনলে আমি ভুলে যাবো তোমাকে আমি আম্মা ডাকি! স্বামীর সম্মান নিয়ে আমি কোনো বোঝাপড়া করবো না।
কথাটা শুনে রাবেয়া মল্লিকার চোখ-মুখ রাগে শক্ত হয়ে গেল। তিনি চিৎকার করে বলেন,
— তোর সাহস কত বড়, তুই আমার সাথে এভাবে কথা বলিস! তোকে বুঝাচ্ছি আমি!
কথাটা বলেই রাবেয়া মল্লিকা হাত তুললেন আনতারাকে থাপ্পড় মারার জন্য। কিন্তু হাতটা আনতারার গালে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল। কেউ শক্ত করে ওনার হাত ধরে ফেলেছে। তিনজনই তাকিয়ে দেখে ইফরাদ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতেই রাবেয়া মল্লিকার হাতটা ধরা।ইফরাদের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে। চোয়াল শক্ত, চোখে কঠিন দৃষ্টি। সেই চেহারা দেখে রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবি দুজনেই ভয় পেয়ে গেল। দুজনেই ঢোক গিলে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
ইফরাদ রাবেয়া মল্লিকার হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দেয়। তারপর আঙুল তুলে কঠোর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে,

— যে মেয়েটাকে এতদিন আপনার সতিনের মেয়ে বলে
অত্যাচার করেছেন, সেই মেয়েটা এখন আমার বউ। সে এখন এই ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউ। নারী হোন বা গুরুজন, কাউকেই মানবো না। জীবনে যদি আর কোনোদিন আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকান, শরীর থেকে মাংস আলাদা করে ফেলব।
ইফরাদ এত শক্ত করে রাবেয়া মল্লিকার হাত ধরেছিল যে ওনার হাতটা এখনো ব্যথা করছে। যেখানে ইফরাদ ধরেছিল, সেই জায়গাটা অবশ হয়ে আছে। কিন্তু ব্যথার দিকে ওনার কোনো খেয়াল নেই। ভয়ে ওনার গলা শুকিয়ে গেছে। আনতারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে, কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না।এর মাঝেই ইফরাদ সবার সামনে খুব আলতো করে আনতারার কপালে একটা চুমু এঁকে দেয়। নরম গলায় বলে,

— কাজের মেয়ে না, মনের রানী করে রেখেছি। She is the queen of my Heart.
কথাটা শুনে রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এবার তারা বুঝতে পারল,।আনতারা সত্যিই এই বাড়িতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সে শুধু বউয়ের মর্যাদাই পাচ্ছে না, সম্মানও পাচ্ছে, ভালোবাসাও পাচ্ছে। আনতারা সত্যিই সোনার কপাল নিয়ে জন্মেছে।ইফরাদ রিদান চৌধুরীর মতো একজন সুপারস্টার তাকে মাথায় করে রাখছে। রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবির সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার আর মুখ নেই। তারা দুজনেই ভীষণ অপমানিত হয়েছে।
এর মাঝেই ইফরাদ কঠিন গলায় বলে উঠে,

— আপনারা বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে।
দুজনেই আর সেখানে দাঁড়ায় না। মুখ চুপসে গেল দুজনের। কাচুমাচু চেহারায় তারা রুম থেকে বেরিয়ে এল।এদিক সেদিক তাকাতে লাগল। ভয় হচ্ছে, কেউ তাদের এভাবে অপমানিত হতে দেখেনি তো! তখনি সেখানে থাকা শাহানারা তাদের এদিক সেদিক তাকাতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
— ম্যাম, আপনারা কিছু খুঁজছেন?
দুজনেই মাথা নেড়ে না বোঝায়। কিন্তু তাদের মুখে লেগে থাকা অস্বস্তি দেখে শাহানারা হালকা হেসে বলে,
— আপনি বলতে পারেন। আপনার মেয়েরই বাড়ি।
রাবেয়া মল্লিকা এবার জোর করে একটা হাসি এনে বলেন,
— হ্যাঁ হ্যাঁ। এটা তো আমার মেয়েরই বাড়ি।
শাহানারা হেসে বলে,

— সত্যিই এটা আপনার মেয়ের বাড়ি। এই বাড়িটা ইফরাদ স্যার আনতারা ম্যামের নামে লিখে দিয়েছেন। এখন এটা সত্যিই আনতারা ম্যামের বাড়ি!
কথাটা শুনে রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবি আবারো চমকে উঠে।।এত বিশাল বাড়ির মালিক আনতারা? ইফরাদের জীবনে আনতারা এতটা দামী? তারা ভেবেছিল, আনতারা হয়তো ঠুনকো হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে, আনতারা এখানে তাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক ভালো আছে। শুধু ভালো না তাকে রাজরানির মতো করে রেখেছে ইফরাদ! ঠিক তখনি পেছন থেকে ইফরাদের কণ্ঠ শোনা গেল,
— এখনো দাঁড়িয়ে আছেন কেন!
ইফরাদের কণ্ঠ শুনেই আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকা দুজনেই ভয় পেয়ে ছুট লাগায়। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না। এক ছুটে করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে লাগল তারা। ইফরাদও তাদের পেছন পেছন নিচে নামে। আনতারা অবশ্য ঘর থেকে বের হলো না।এদিকে সাদমান তখন লিভিং রুমের সোফায় একা বসে ছিল। ইফরাদ তাকে সেখানে বসিয়ে অনেকক্ষণ আগেই উপরে গিয়েছিল। আনতারার জন্য সাদমানের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে।
একটু কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করছে। হঠাৎ সে দেখতে পায়, আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকা দৌড়ে তার দিকে আসছে। সাদমান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। হতভম্ব হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কী হয়েছে?
আনাবি তাড়াহুড়ো করে বলে,
— বাইরে গিয়ে বলছি। চল এখান থেকে।
কথাটা বলেই আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকা সামনে এগিয়ে গেল। সাদমান কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনি তার চোখে পড়ে পেছন পেছন ইফরাদও আসছে। ইফরাদ এসে সাদমানের সামনে দাঁড়ায়। তারপর বাড়ির দরজার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
— ওদিকে এক্সিট!

কথাটা বলেই ইফরাদ পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে নেয়। সাদমান বুঝে গেল, উপরে নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তাই আর কোনো কথা না বলে সে আনাবি আর রাবেয়া মল্লিকার পেছন পেছন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ইফরাদ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার ফোনে কল এলো। কল আসায় ইফরাদ ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ির বাঁ দিকে থাকা সুইমিংপুলের দিকে চলে গেল।
অন্যদিকে আনতারা বেডে বসে ছিল। ইফরাদই তাকে বসিয়ে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু ইফরাদ নিচে গিয়ে কী করছে, সেটা ভেবে আনতারা ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে। ইফরাদ গিয়ে ওদের সঙ্গে রাগারাগি করবে না তো? চিন্তাটা মাথা থেকে কিছুতেই সরাতে পারছে না।একসময় আনতারা আর চিন্তা নিয়ে বসে থাকতে পারে না। সে উঠে দরজা খুলে একটু উঁকি দেয়। আর তখনি সামনে সাদমানকে এগিয়ে আসতে দেখে আনতারা চমকে উঠে। তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তাড়াহুড়োয় দরজাটা লক করতে পারে না। সাদমান সেটা লক্ষ্য করেই দ্রুত ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলে,

— আনতারা, প্লিজ দরজা খুলো! আমি একটু কথা বলতে চাই।
আনতারা প্রাণপণে দরজাটা ঠেলে ধরে রাখে।
— কিন্তু আমি বলতে চাই না। আপনি এখানে কেন এসেছেন?
— আমি তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।
আনতারা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দরজাটা ঠেলে ধরে বলে,
— আমার কোনো কথা নেই। আপনি চলে যান।
সাদমান এবার আকুল হয়ে বলে,
— আনতারা, এতো পাষাণ হইয়ো না।
আনতারা দৃঢ় গলায় বলে,
— পরপুরুষের প্রতি এমন দয়াশীল হতে চাই না আমি। আমার অনুরোধ, আপনি চলে যান।
সাদমান হাল ছাড়ে না।

— আমি যাবো না। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই! আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় বলে উঠে,
— চুপ! এই শব্দ আপনি দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করবেন না। আমার স্বামী আছে। চলে যান। আমার সংসারে দয়া করে অশান্তির কারণ হবেন না।
সাদমান অনুনয়ের সুরে বলে,
— আমি শুধু মাত্র একটু কথা বলব!
কথাটা বলেই সাদমান ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তখনি ইফরাদ এসে দরজার হাতল ধরে দরজাটা আবার লাগিয়ে দেয়। সাদমান সামনে ইফরাদকে দেখেই থেমে গেল। তার মুখের সমস্ত কথা মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঢোক গিলে।
ইফরাদ চোয়াল শক্ত করে বলে,
— কোথায় যাচ্ছিলে? জানো না, কারো বেডরুমে যাওয়াটা বেড ম্যানারস! অবশ্য লো ক্লাস ফ্যামিলি থেকে ম্যানারস আশা করাও যায় না। ম্যানারস ওয়াডটার সাথেও আদৌও তারা পরিচিত না।
সাদমান এবার সামান্য রাগ নিয়ে বলে,

— মি. সুপারস্টার? আই’ম এ ডক্টর। লো ক্লাস ফ্যামিলি থেকে ঠিক আছে, বাট আনএডুকেটেড না।
ইফরাদ ঠান্ডা গলায় বলে,
— শিক্ষিত কতটা, সেটা দেখাই যাচ্ছে। আর তুমি এখানে কেন? তুমি তো চলে গেছিলে!
সাদমান এবার মাথা নিচু করে একবার দরজার দিকে তাকায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— চলে যাচ্ছি।
সাদমানকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখে ইফরাদ দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে,
— খুলো।

আনতারা ইফরাদের কণ্ঠ চিনতে পারে। সে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দেয়। ইফরাদ ভেতরে ঢুকে। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে। আনতারার চোখ মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে। ইফরাদ কী কী শুনেছে, সে কিছুই জানে না। শুধু ভয় হচ্ছে। ভয়ে আনতারার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে।
ইফরাদ রুমে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে আনতারার দিকে তাকায়। তারপর কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কী হয় তোমার ওই ছেলে?
আনতারা ভালো করে ইফরাদের মুখের দিকে তাকায়। তার মুখ রক্তিম হয়ে আছে। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে প্রচণ্ড রাগ চেপে রেখেছে সে। আনতারা ঢোক গিলে ধীরে ধীরে বলে,
— বাইরে থেকে এসেছেন। গোসল করে খেয়ে তারপর কথা বলি!
ইফরাদ একদম অনড় হয়ে থাকে,

— যেটা বলেছি, সেটার উত্তর দাও!
আনতারা এবার একটা শ্বাস ফেলে বলে,
— আমার কিছু লাগে না। আম্মার বোনের ছেলে!
ইফরাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আর তোমার প্রেমিক!
আনতারা চোখ তুলে তাকায়। চোখে অবাক। কাঁপা গলায় বলে,
— আমার কিছু হয় না। আমি আপনি ব্যতীত কোনো পুরুষ…..
কথাটা শেষ করার আগেই ইফরাদ হুংকার দিয়ে উঠে। রাগের মাথায় সামনে থাকা টাওয়াল স্ট্যান্ডটা তুলে বেলকনির দরজার কাচের গ্লাসে ছুড়ে মারে। ঝনঝন শব্দে কাচ কেঁপে উঠে ভেঙে গুঁড়ো গুড়ো হয়ে যায়।
ইফরাদ গর্জে উঠে,

— মিথ্যা বলবে না।
আনতারা ভয়ে কেঁপে উঠে। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— মিথ্যা বলছি না আমি, রাদ…..
ইফরাদ আঙুল তুলে আনতারার দিকে,
— আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। আমার তো মনে হয় ওই ছেলের সাথে তোমার সম্পর্ক আছে!
আনতারা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— কী বলছেন, রাদ!

ইফরাদ এবার আনতারার দুই বাহু শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— ঠিক বলছি! আমি সব ঠিক বলছি! ওই ছেলে তোমার রুমেও আগে এসেছে! অভ্যাস আছে তাই তো এখানেও বেডরুমে ঢুকতে চেয়েছে!
কথাগুলো শুনে আনতারার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। আনতারা সঙ্গে সঙ্গে ইফরাদকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আপনি আমাকে চরিত্রহীন বলছেন?!
ইফরাদ চেচিয়ে বলে,
— তোমার কাজকর্ম বলছে!
কথাটা বলেই ইফরাদ আবার আনতারার কাছে এগিয়ে গেল। আনতারার বাহু ধরে বলে,
— তোমার যদি ওই ছেলের সাথে এফেয়ার থাকে, তাহলে ওই ছেলের গলায় ঝুলে যেতে! আমাকে ফাঁসালে কেন?! আমার সাথে এত কিছু করলে কেন? এতো এটাচ হলে কেন আমার সাথে?
আনতারা অশ্রুসিক্ত চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শক্ত গলায় বলে,
— আপনি ভেবে বলছেন এইসব?
ইফরাদ এবার নিজের চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে মরিয়া কণ্ঠে বলে,

— আমি ভাবতে পারছি না কিছু! আমার বউয়ের কারোর সাথে বিয়ের আগে এফেয়ার ছিলো, এটা আমার মস্তিষ্ককে অচল করে দিয়েছে! নাও, আইম টোটালি মেড!
কথাটা বলেই ইফরাদ চুল গুলো ছেড়ে নিঃশ্বাস ফেলে তারপর আনতারার এক বাহু ধরে আনতারাকে সামান্য ছুড়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলে,
— তোমাকে আমার আর লাগবে না। আই হেইট ইউ! আই জাস্ট হেইট ইউ! আমার জিনিস আমি কাউকে দেই না। অন্যকারোর কাছে ১% থাকলে বাকি ৯৯% আমি দান করে দিবো!
কথাটা বলেই ইফরাদ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। সে এগিয়ে গিয়ে বেডসিট টেনে হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর রুমের গ্লাসের পানির জগটা তুলে ছুড়ে মারে। জগটা মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল পানি সহ। গ্লাস ছুড়ে মারে। রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে পুরো রুমটা মুহূর্তের মধ্যে রুমে তান্ডব চালালো! এরপর ইফরাদ কোনো দিকে না তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আনতারা বিশাল এক ধাক্কা খেয়ে চুপ মেরে দাঁড়িয়ে রইল।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২০

সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, তার মানে এইসব! আর কে বলেছে? ইফরাদ তাকে এই কথাগুলো বলেছে! অবিশ্বাস্য! চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এই মুহুর্তে আনতারার কাছে সবকিছু বিষাদ লাগছে। ইফরাদের প্রতিটা কথা কানে বাজছে। ‘তোমাকে আমার আর লাগবে না।”আই হেইট ইউ।”আই জাস্ট হেইট ইউ।’ আনতারা কিছুতেই কল্পনা করতে পারছে না, এই কথাগুলো সত্যিই ইফরাদ তাকে বলেছে। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে আনতারা। চোখ ভরা অশ্রু নিয়ে কেবল শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল আনতারা।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here