Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৬

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৬

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৬
Raiha Zubair Ripti

রাত তিনটার দিকে রমেশ রায় চন্দ্র আর প্রতাপ শহর থেকে বাড়ি ফিরলেন। নিস্তব্ধ বাড়ি,দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ডাক। আজকের বাতাসটা কেমন গরম গরম। শরীরের ক্লান্তি জুড়ানোর বদলে আরো ক্লান্তি ধরিয়ে দেয়। রমেশ রায় আর প্রতাপ ক্লান্ত ভঙ্গিতে গা এলিয়ে দিলেন চেয়ারে।
বিনোদিনী রুম থেকে গাড়ির শব্দ শুনে বুঝতে পেরেছিল তার বাবা আর প্রতাপ এসে পড়েছে। সে তখন জায়নামাজে বসে তাহাজ্জুদ পড়ছিল। নামাজ টা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। পায়ের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেখলো প্রতাপ হেঁটে যাচ্ছে তার রুমের দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। প্রতাপ থেমে গেল। বিনুর চোখ মুখ ফোলা দেখে বিচলিত হলো। ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে এসে উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,

” আর ইউ ওকে বিনু? ”
বিনোদিনীর প্রতাপের সামনে চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু করলো না। সে মাথা নত করে বলল,
” ঠিক আছি আমি। তোমাদের কাজ শেষ?”
” হুম। এত রাত অব্দি জেগে আছো যে? ঘুম আসছে না?”
” তাহাজ্জুদ পড়ছিলাম। ”
প্রতাপ রুমের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলল,
” সেটা আবার কী?”
” এটা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পড়া হয়। তখন আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন,কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
প্রতাপ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“প্রতিদিন পড়ো?”
“চেষ্টা করি।”
” তা ইসলাম গ্রহণ করার পর তোমার কেমন লাগে?”
বিনোদিনী এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ধীর কণ্ঠে বলল,
“জানি না কীভাবে বোঝাব।”
প্রতাপ চেয়ারে বসে পড়ল। “চেষ্টা করে বলো।”
বিনোদিনী জানালার দিকে তাকাল।
“যতক্ষণ ইবাদত করি, ততক্ষণ মনে হয় আমি এই পার্থিব দুনিয়ায় নেই। মনে হয়… অন্য কোনো জগতে চলে গেছি। যেখানে আর কেউ নেই শুধু আমি আর একজন আছি। যাকে দেখতে পারি না,ছুঁতে পারি না। তবে অনুভব হয় সে আছে। আমি তার কাছে সুরক্ষিত, নিরাপদ ।”
শেষ কথাটা বলেই বিনোদিনী থেমে গেল।
প্রতাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“এতটা শান্তি পাও?”
“হুম।”
“তাহলে তুমি ইসলামকে ভালোবেসে ফেলেছ?”

বিনোদিনীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। প্রশ্নটার উত্তর তার জানা নেই। তবে ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, “ইসলামে শান্তি আছে।”
” তুমি ইসলাম গ্রহণ করে খুশি?”
বিনোদিনীর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “খুশি কিনা জানি না। তবে মনে হয়, আমি এমন একটা জিনিস পেয়েছি, যেটার অভাব আমি আগে বুঝতেই পারিনি।”
প্রতাপ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। “কখনো মনে হয় না, তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
বিনোদিনী এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। “না।”
“কেন?”

এক মুহূর্তের জন্য বিনোদিনীর চোখে গভীর কোমলতা নেমে এলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে চোখ সরিয়ে নিল।
“কারণ ইবাদত করার পর আমার মনটা আর আগের মতো থাকে না। আমি ভেঙেচুরে যাই। নতুন এক আমি কে আবিষ্কার করি। যে কেবল কারো মুখাপেক্ষী হতে চায়। ”
প্রতাপ আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ নীরবতার পর হঠাৎ তার মনে পড়ল অন্য একটি কথা।
“আচ্ছা বিনু আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে?”
“হুম বলো?”
প্রতাপ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, ” মালাকুল মাওত। সম্ভব ওইরকম কিছু ছিলো ঐ কথাগুলো তে।”
বিনোদিনী বুঝতে পারল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুমি সম্ভবত কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাওত এই আয়াতটার কথা বলছ।”
প্রতাপ মাথা নাড়ল। বিনোদিনী ধীরে ধীরে বলল, “এর অর্থ,প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। ”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। প্রতাপ নিচু গলায় বলল,
“কী অদ্ভুত…”
“কী?”

“একটা নারীর কণ্ঠে এই আয়াতটা শুনেছিলাম আমি। ওরকম কণ্ঠ আমি আগে কখনো শুনি নি বিনু। আমার বুকের ভিতরে গিয়ে আঘাত করছিল সরাসরি ঐ কণ্ঠ স্বর। আমি দুদিন ঘুমাতে পারি নি। আই থিংক আই লাভ হার বিনু ।”
বিনোদিনীর মুখের সমস্ত রং যেন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল।হৃদপিণ্ডটা একবার যেন থেমে গিয়ে পরক্ষণেই দ্বিগুণ গতিতে ছুটতে শুরু করল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে সে? কার কথা বলছো? কার কণ্ঠে এই আয়াত শুনেছো? ”
” নাম পরিচয় কিছুই জানি না। তাকে দেখিও নি। শুধু কণ্ঠ শুনেছি।”
বিনোদিনী নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল।
“কোথায় শুনেছিলে?”
“সিকান্দার শাহ্ এর বাড়িতে।”

বিনোদিনীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। প্রতাপ অন্যমনস্কভাবে বলল, “মনে হয় সিকান্দার শাহ্ এর বাড়ির কোনো নারী হবে।”
বিনোদিনী চমকে তাকালো। বলল,
“সিকান্দার সাহেবের বাসায় তার স্ত্রী ছাড়া আর কোনো নারী নেই প্রতাপ।”
প্রতাপ থেমে গেল।
“তার স্ত্রী?”
“হ্যাঁ।”
“সিকান্দার… বিবাহিত?”
বিনোদিনী অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি জানো না?”
প্রতাপ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে বিনোদিনীর দিকে তাকাল। বিনোদিনীর চোখে তখনও অস্বস্তি। প্রতাপের কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে অনেক নিচু।
“তাহলে..তুমি কি একজন বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করার জন্যই মুসলিম হয়েছ?”
বিনোদিনী মাথা নত করে ফেললো। এই উত্তর দিতে আজ তার গলা কাঁপছে। কিন্তু বের হচ্ছে না শব্দ। সে চুপ করেই রইলো।

” চুপ কেনো বলো? সিকান্দার শাহ্ কী তোমায় বিয়ে করতে রাজি? ”
” উনি জানে না এই বিষয় প্রতাপ। আমি বলি নি। তুমি এখন তোমার রুমে যাও। আমি একটু ঘুমাবো। ”
প্রতাপ কিছুক্ষণ বিনোদিনী কে দেখে বেরিয়ে গেল রুম ছেড়ে। বিনোদিনী উঠে এসে বাড়ির উঠানের দিকে তাকালো। রমেশ রায় চন্দ্র কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। সে মাথার কাপড় ফেলে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বাবার পাশে দাঁড়ালো। রমেশ রায় মেয়েকে দেখে, পরে ফোন করছি বলে ফোনটা কেটে দিলো।
” এত রাতে তুমি এখানে যে? ঘুমাও নি কেনো? আর চোখ মুখ এমন কেনো তোমার? কী হয়েছে? ”
বিনোদিনী তার বাহু হাত ঘাড় গলা দেখিয়ে বলল,
” কিছু দেখতে পাচ্ছেন? ”
রমেশ রায় একবার তাকিয়ে বলল,
” আঘাতের দাগ। কী করে হলো? ”
বিনোদিনী এগিয়ে এলো। ফিসফিস করে বলল,

” আপনার মেয়ে আজ দ্বিতীয় বারের মতো রে’ইপ হতে যাচ্ছিল। কিন্তু সুখবর হলো সে এবারও বেঁচে গেছে। তাঁকে বাঁচিয়েছে কে জানেন? সিকান্দার শাহ্। কী কি করবেন এখন আপনি? বাবা হিসেবে আপনার করনীয় কী? আপনি ঐ জানো’য়ার দের কে খুঁজে আমার সামনে হাজির করবেন? নাকি আমি নিজে খুঁজে এনে পুরো গ্রামের সামনে মারবো? আপনার না মানসম্মানের বড় চিন্তা? এখন চয়েস আপনার। আপনি কী করবেন। আমি কিন্তু আবার মানুষ মারতে এক্সপার্ট। আগেও মেরেছি। ইউ নো ভেরি ওয়েল,হোয়াট আই মিন? ”
রমেশ রায়ের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। বিনোদিনী ঘুরে চলে যেতে নিলে তিনি বলে উঠলেন,
” এই বাড়িতে তো বাহিরের কেউ ঢুকতে পারে না। তাহলে রে’ইপ হতে যাচ্ছিলে কী করে? ”
” আমি কী একবারও বলেছি বাড়ির ভেতরে? বাড়ির ভেতরে হলে জানে বাঁচত? এই বাড়ির উঠান এতক্ষণে রক্তে লাল হয়ে যেত। বাড়ির বাহিরে হয়েছিল। ”
” বাড়ির বাহিরে বের হয়েছিলে কেন তুমি রাতে? কি দরকার ছিলো?”
” সেটা আপনার জানার দরকার নেই। ”

বিনোদিনী চলে গেল। রুমে ঢুকে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পরলো। ঘুম ভাঙলো ফজরের আজানের সময়। সে ওজু করে নামাজ আদায় করতে দাঁড়ায়।
রমেশ রায়ের ঘুম হয় নি সারা রাত। এই মেয়ে নিয়ে তিনি অনেক যন্ত্রণায় আছে। কেবল মাত্র মানসম্মানের দিকে তাকিয়ে সহ্য করছে। ভোরে তিনি মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য মেয়ের রুমের সামনে আসে। দরজাটায় হাত রাখতেই অনুভব করলো দরজা খোলা। সে একটু ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। বিনোদিনী কে ডাকার জন্য মাথা তুলে ভেতরে তাকাতেই তার শরীর জমে গেল। রক্ত টগবগিয়ে উঠলো। চোখ দুটো লাল রক্তবর্ণ হয়ে গেল। ধুপধাপ পা ফেলে রুমে প্রবেশ করে একটানে নামাজ পড়া বিনোদিনী কে সেজদা থেকে টেনে তুলে দাঁড় করালো। আচমকা হেঁচকা টানে বিনোদিনী চমকে উঠলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো রমেশ রায় কে। রক্তক্ষরণ চোখে তাকিয়ে আছে। ঐ চোখ দিয়েই বোধহয় বিনোদিনী কে ভস্ম করে দিবে।
রমেশ রায় বিনোদিনীর বাহু শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

” কী করছিলি একটু আগে তুই? নামাজ পড়ছিলি? মিথ্যা বলার চেষ্টা তুই মোটেও করবি না। তাহলে এখনই তোকে মেরে ফেলবো হা’রামি। ”
বিনোদিনী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
” হু পড়ছিলাম নামাজ। আপনি কেন আমাকে নামাজ টা পড়তে দিলেন না? জিজ্ঞেসাবাদ করার ছিলো, অপেক্ষা করতেন। আপনি কেন আমার নামাজ ভঙ্গ করলেন? ”
রমেশ রায় বিনোদিনীর মুখ চেপে ধরে বলল,
” বান্দির বাচ্চা,নরকের পাপী ছাই। তুই নামাজ কেন পড়লি? তুই মুসলমান? ”
” হ্যাঁ আমি মুসলমান। আমি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছি। ”
সাথে সাথে কষে একটা চড় পরলো বিনোদিনীর গালে। বিনোদিনী বুঝে উঠার আগেই পরপর আরো দুটো চড় পরলো। চতুর্থ নম্বর চড় টা পড়ার আগ দিয়ে বিনোদিনী হাতটা ধরে ফেলে। রাগে ফেটে যায় রমেশ চন্দ্র। বিনোদিনীর গাল লাল হয়ে আছে। ঠোঁটের একপাশ সামান্য কেটে গেছে। চোখে পানি জমেছে, অথচ সেই চোখে ভয় নেই। রমেশ রায় দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “হাত ছাড়।”

বিনোদিনী হাত ছাড়ল না।
“ছাড় বলছি!”
বিনোদিনী এবার হাত ছেড়ে দিলো। রাগী কণ্ঠে বলল,
” আর একটা চড় মেরে দেখুন আমায়। পুরো গ্রাম জেনে যাবে এই বিষয়টা। তখন কী হবে? ভাবুন সেটা নিয়ে। ভালো লাগবে তো? ”
রমেশ রায় দমে গেলেও বাহিরে তা প্রকাশ করলো না। সামনে নির্বাচন আছে। এই খবর বাহিরে যাওয়া যাবে না।
” মুসলিম কেন হলি?”
” ভালো লেগেছে তাই। ”
” সত্যি কথা বল বিনু। তুই ইসলাম সম্পর্কে জানিস কতটুকু? ”
” যতটুকু জানলে হৃদয়ে শান্তি মেলে ততটুকুই জেনেছিলাম। এখন আরো বেশি জানছি। ”
” কে তোকে উসকানি দিয়েছে? কার কথায় এটা করলি? কে করেছে এমন টা? নাম বল।”
” কেউ না। আমি নিজ থেকেই হয়েছি। আপনি আসুন এখন। ”
রমেশ রায় রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলেন রুম ছেড়ে। টানা কয়েকদিনের বিনোদিনীর গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ নিলেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন বিনোদিনী বাড়ি থেকে বের হয়ে একটি বাড়িতেই যেত। আর সেটা সিকান্দার শাহ্ এর বাড়ি।

সে হরিমতি কে ডেকে আনলো। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। হরিমতির থেকে জানতে পারলো বিনু মুনতাহার কাছে যেত ইসলাম সম্পর্কে জানতে।
রাগে ফেটে উঠলো। সে প্রতাপ কে ডাকলো। প্রতাপ কে বলল বিনু মুসলমান হয়েছে। প্রতাপ শুনে বলল,
” হু জানি। ”
রমেশ রায় চমকায়। ” তুমি জানতে প্রতাপ! ঐ বান্দি এত বড় পাপ করেছে জেনেও আমাকে জানালে না! ”
” মুসলমান হওয়ার পর জেনেছি। ”
” কেনো হয়েছে জানো? ঐ মুনতাহা উসকিয়ে দিয়েছে নিশ্চিত। ”
প্রতাপ নামটা শুনে বলল, ” মুনতাহা কে? ”
” ঐ সিকান্দারের স্ত্রী। ”

প্রতাপ নামটা বিরবির করলো ঠোঁটের কোণে কয়েকবার। এই সেই রমণী তবে! যাক নামটা তো জানতে পারলো!
” জানো তুমি বিনু কেন মুসলিম হলো? ”
প্রতাপ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তার মতে কাকার জানা উচিত তার মেয়ে কেনো মুসলমান হয়েছে। তাই সে বলল,
” সিকান্দার শাহ্ কে বিয়ে করার জন্য। ”
কথাটা শুনে যেন মাথায় আকাশটা ভেঙে পড়লো। সে হাসফাস করতে লাগলো। তার মেয়ে এক মুসলামের বাচ্চা কে বিয়ে করার জন্য মুসলিম হয়েছে! তাও সেই ছেলেকে যে কি না তার শত্রু! প্রতাপ উঠে যাওয়ার আগে বলল,
” চাচা আপনার মেয়েকে বারন করবেন,সে যেন কারো সংসার না ভাঙে। ”
প্রতাপ চলে যেতেই রমেশ রায় পকেট থেকে ফোনটা বের করে সেলিম মির্জা কে ফোন করলেন।
বিনোদিনী তখন মাগরিবের নামাজ আদায় করে একটু কুরআন শরীরফ টা হাতে নিয়েছিল। তখন হরিমতি দৌড়ে এসে জানালো সিকান্দার শাহ্ কে নাকি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বিনোদিনী চমকালো। হাত ফস্কে কুরআন শরীফ পড়ে যেতে নিলেও সেটা সে ধরে ফেললো। আলমারির ভিতরে কুরআন শরীফ টা রেখে সে বাবার ঘরে আসলো।
রমেশ রায় তখন আয়েশ করে চা খাচ্ছিল। বিনোদিনী সামনে গিয়ে বলল,

” সিকান্দার সাহেব কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে বাবা? ”
তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ” হু। ”
” কেন? কী অপরাধ তার জানো? ”
” হু জানি তো। আমিই পুলিশ পাঠিয়েছি। ”
” কেন পাঠিয়েছেন? কী করেছে সে? ”
” আমার একমাত্র মেয়েকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। সেই অপরাধে ধরে নিয়ে গেছে। ”
বিনোদিনীর পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলেও নিজেকে সামলে নিলো। কন্ঠটা কেমন রোধ হয়ে আসলো। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
” মিথ্যা কথা এটা। উনি আমার সাথে ওমন নোংরা কাজ করে নি। বরং উনি আমাকে বাঁচিয়েছিল। আমি তো বলেছিলাম আপনাকে। তাহলে এমন মিথ্যা অপবাদ কী করে দিলেন আপনি? ”
রমেশ রায় মুখটা ভার করলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে স্নেহময় গলায় বললেন,
” আমার মেয়ের জন্য। আমি জানি তুমি সিকান্দার শাহ্ কে ভালোবাসো। আর তাকে পাওয়ার জন্যই তুমি মুসলিম হয়েছো। আর তুমি তো বলো তুমি জীবনে সুখ পাও নি। বাবা এবার তোমাকে সুখ দিবে। সিকান্দার শাহ্ তোমাকে বিয়ে করতে এবার বাধ্য হবে। ”
বিনোদিনী মাথা থেকে তার বাবার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,

” এটা ঠিক না বাবা। উনার নামে বদনাম ছড়াবেন না। উনি ওমন নন। উনি মেয়েদের দিকে তাকানও না সেখানে আপনি বলে দিলেন আমাকে রেইপ করতে চাচ্ছিল! ”
রমেশ রায় মেয়ের বাহু টেনে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” পুরুষ মানুষ নারীর দেহ লোভী বিনু। তোমাকে একা রাতে পেয়ে সে লালসার হাত বাড়াতেই পারে। তাছাড়া তোমার শরীরে তো আঘাতের দাগও আছে। কোর্টে গিয়ে বলবে হ্যাঁ সিকান্দার শাহ্ তোমার সাথে ওসব করতে চেয়েছিল। তারপর সিকান্দারের সামনে দুটো পথ খোলা থাকবে। এক জেলের ভেতর থাকা। আর দুই তোমাকে বিয়ে করা। আমি তোমার বিয়ের কথা তুলবো তখন। আমার বিশ্বাস সিকান্দার শাহ্ জেলে থাকবে না। বাঁচার জন্য তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে। ”

বিনোদিনী দাঁত চেপে বলল, ” আপনার কেন মনে হলো আমি কোর্টে মিথ্যা কথা বলবো? ”
রমেশ রায় হেঁসে বললেন, ” বলবে,বলবে। আমার বিশ্বাস তুমি বললবে। কারন সেলিম মির্জা রাজি তোমাকে তার পুত্রবধূ করতে। আমিও রাজি তোমাকে সিকান্দার শাহ্ এর সাথে বিয়ে দিতে। তুমিও তাকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চাও। আমাদের সবার চাওয়া এক হলে তুমি দ্বিমত পোষণ কী করে করবে? বিরাট একটা সুযোগ তোমার সামনে বিনু। মুনতাহা নাম টা চিরতরে মুছে যাবে সিকান্দারের জীবন থেকে। তখন তোমার আর সিকান্দারের সুন্দর একটা সংসার হবে। ভাবো এটা নিয়ে বিনু। তোমার সংসার, সিকান্দার আর তুমি। কোনো বাঁধা নেই। ”
বিনোদিনী কোথায় যেন হারিয়ে গেল। খুব চমৎকার ভাবে ব্রেইন ওয়াশ করে ফেললো রমেশ রায়। বিনোদিনীর চোখে সামনে ভেসে উঠলো সিকান্দার আর তার একটা ছোট্ট সংসার। তার চোখে নোনাজল দেখা গেল। সে ধরা গলায় বলল,
” সত্যি সিকান্দার আমাকে বিয়ে করবে এটা করলে? ”
” অবশ্যই। আর কোনো উপায় আছে নাকি বিয়ে করা ছাড়া? নেই। তোমার জবানের উপর সম নির্ভর করছে বিনু। একটা মিথ্যা যদি তোমাকে সারাজীবন সুখ দেয়,ভালোবাসার সাথে থাকার সুযোগ দেয়। তুমি কি সেটা গ্রহন করবে না? ”
বিনোদিনীর মস্তিষ্ক টাকে রমেশ রায় নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে নিলেন। বিনোদিনী বাচ্চাদের মতো লোভের পড়ে বলল,
” করবো গ্রহণ। ”
” তাহলে বলো। সিকান্দার শাহ্ কে পাওয়ার জন্য তুমি কতদূর যেতে পারবে বিনু?”
বিনোদিনীর চোখ মুখে একটা অবাধ জেদ দেখা গেলো। সেই জেদ বলে দিচ্ছে সে হয়তো সত্যি সত্যি তার বাবার কথা মতো কাজ করে। অটল গলায় বলল,
“ সিকান্দার শাহ্ কে পাওয়ার জন্য যদি আমার সাথে সাথে তার ও সম্মান নিলামে তুলতে হয়,তাহলে তাই সই। আমি নিলামে তুলবো দুজনের সম্মান। কলঙ্কিত করবো নিজের সাথে থাকেও। মিথ্যা অপবাদ দিব তার নামে। পুরো দুনিয়ার সামনে তাকে চরিত্রহীন পুরুষ বানাবো। আই ওয়ান্ট সিকান্দার শাহ্ বাই হুক অর বাই ক্রুক। ”
” দ্যাটস মাই গুড গার্ল। ”

প্রতাপের কানে এসেছে সিকান্দার কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে সেই কথা। এ-ও কানে এসেছে বিনোদিনী সিকান্দার শাহ্ কে পাওয়ার জন্য মিথ্যা কথাও বলবে। গ্রামবাসী জানে না কেন সিকান্দার কে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। পুলিশ বলে নি কারন। বললে হয়তো সিকান্দার শাহ্ কে নিয়েই যেতে পারতো না। কাকার মুখে শুনলো সিকান্দার শাহ্ নাকি বিনোদিনীর সাথে খারাপ কিছু করতে চেয়েছিল। প্রতাপের বিশ্বাস হলো না। সিকান্দার শাহ্ এর বিষয়ে যতটা শুনেছে তাতে সিকান্দার শাহ্ একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ। সে কখনোই এসব করবে না। নিশ্চয়ই চাচা আর বিনুর ষড়যন্ত্র হয়তো সামনের নির্বাচন থেকে সিকান্দার কে হটানোর জন্য। পরে রমেশ রায় বলল বিনুর বিয়ে হবে সিকান্দারের সাথে। মানে এক ঢিলে দুই কাজ শেষ করতে চেয়েছিল!
সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বিনুর ঘরে গেল। বিনু তখন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইছিল। মরিচীকার স্বপ্ন দেখছে তো। তাই আনন্দ উৎসব করছে।
প্রতাপ রাগী গলায় বলতে লাগলো,

” তুমি এতটা নিচ প্রকৃতির কবে থেকে হলে বিনু? ”
বিনোদিনী পিছু ফিরে বলল,
” আমি আবার কী করেছি? ”
” মিথ্যা অপবাদ কেন দিলে সিকান্দার শাহ্ এর নামে? ”
” কোনো মিথ্যা অপবাদ দেই নি আমি। ”
প্রতাপ বাহু শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
” তোমাকে আমি চিনি বিনু। একে তো নিজ ধর্মের বাহিরে গিয়ে এক মুসলিম বিবাহিত পুরুষ কে ভালোবাসলে! তারপর শুধু ভালোবাসা অব্দিই থেমে থাকলে না। তার জন্য লুকিয়ে মুসলিম হলে। এখন তাকে পাওয়ার জন্য তার সংসার ভাঙতে উঠে পড়ে লেগেছ! মনুষ্যত্ব বলতে কি কিছুই বাঁচিয়ে রাখো নি নিজের মধ্যে! চাচার কথা শুনে লাফাচ্ছ! ”
বিনোদিনী হেসে প্রতিত্তোরে বলে উঠলো ..

” তুমি যেভাবে এক মুসলিম বিবাহিত নারীর গলায় কুরআন তেলওয়াত শুনে তাকে না দেখেই ভালোবেসে ফেলেছো। আমিও তেমন এক মুসলিম বিবাহিত পুরুষ কে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলছি। পাপ তুমি আমি দুজনেই করেছি। কেবল দোষ দিচ্ছ আমার একার! এ কেমন বিচার তোমার প্রতাপ? আমি ভালোবাসি সিকান্দার কে। তাকে পাওয়ার জন্য আমাকে যত নিচে নামতে হয় আমি নামবো। শেষে তাকে আদায় করেও ছাড়বো। দেখে নিও তুমি। ”
” এখানেই তোমার আমার মধ্যে পার্থক্য বিনু। আমি তোমার মতো পাগল নই। নিজের ধর্ম ত্যাগ করি নি। কেবল সেই নারী কে এক তরফা ভাবে ভালোবেসেছি। তখন তার পরিচয় আমার জানা ছিলো না। আমি আমাকে নিয়ে কখনো তাদের মাঝে কোনো সমস্যা হতে দেই নি। এমন কি কারো কাছে প্রকাশও করি নি তুমি ব্যতিত। আর বিবাহিত জানার পরই আমি আমার হৃদয়কে গুটিয়ে নিয়েছি। ভালোবাসা এটাকে বলে বিনু। কিন্তু তুমি যেটা করছো সেটা ধ্বংসাত্মক। আর নাম দিচ্ছ ভালোবাসো! ভালোবাসা এটাকে বলে না। এটাকে বলে পাগলামি। তুমি মোহে পাগল হয়ে গেছ। দুই ধর্ম কে তুমি ছেলেখেলা বানিয়ে ছেড়েছো। কোনো বিধর্মী ইসলাম গ্রহন করতে পারে কেবল সেই ধর্মের স্রষ্টা কে ভালোবেসে কোনো সৃষ্টি কে ভালোবেসে না। কিন্তু তুমি তো সেই স্রষ্টার সৃষ্টি কে ভালোবেসে ইসলাম গ্রহন করলে! পাবনার পাগলখানায় রাখা উচিৎ তোমাকে ডিজগাস্টিং মেয়ে। এখনো সময় আছে সঠিক পথে ফিরো। মুসলিম যেহেতু হয়েই গেছ সেটাকে অন্তত মানো। ফাতরামি বন্ধ করো। মানুষের সুখী জীবন নষ্ট করা বন্ধ করো। তা না হলে সত্যি সত্যি আমাকে তোমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। হয় খু’ন করে পুড়াবো,না হয় কবরে পুঁতে রাখবো তোমায়। সিকান্দারের সংসার ভাঙার চেষ্টা না থামালে। ”

” জ্ঞান দিও না তো প্রতাপ। আসতে পারো তুমি এখন। ”
প্রতাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
মুনতাহা স্বামী কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে শুনেই বোরকা নিকাব পড়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সাথে আছে রাশেদের ছোট বোনটা। থানাটা খুব বেশি দূরে না গ্রাম থেকে। দ্রুত পায়ে হেঁটে সে থানায় এসে পৌঁছাল। থানায় পৌঁছে দেখলো রাশেদ, জামাল,শফিক সাহেব, রহিমুদ্দিন মিয়া সহ আরো দু একজন আছে এখানে। মুনতাহা ছুটে গিয়ে শফিক সাহেব কে ডেকে বলল,
” চাচা উনাকে পুলিশ কেন ধরেছে? উনি কোথায়? ”
শফিক সাহেব মুনতাহার দিকে তাকালেন। একটা জেল রুম দেখিয়ে বলল,
” ওখানে আছে সিকান্দার। চেয়ারম্যান বলে মামলা করছে সিকান্দারের নামে। ”
” কি নিয়ে মামলা করেছে? ”
” বলতেছে না তো। চেয়ারম্যান আইলে নাকি বলবে। ”
মুনতাহা আর দাঁড়ালো না। সে চলে গেল সিকান্দারের কাছে। সিকান্দার তখন জেল রুমের ছোট কাঠের চৌকি তে বসেছিল। পায়ের আওয়াজ শুনে মাথা তুলে মুনতাহা কে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলো। বলল,

” আপনি এখানে কেনো? ”
মুনতাহা সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে শরীর মুখ দেখতে দেখতে বলল,
” ওরা আপনাকে মারে নি তো? ”
সিকান্দার হাসলো এ কথা শুনে। ” উঁহু মারে নি। শান্ত হন। আপনার এখানে আসা উচিৎ হয় নি। ”
মুনতাহার রাগ হলো। রাগী গলায় বলল, ” তাহলে কী করবো? বাসায় বসে থাকবো আমার স্বামী কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এটা শোনার পরও? ওরা কেন আপনাকে ধরে নিয়ে এসেছে। চেয়ারম্যান কিসের মামলা ঠুকে দিয়েছে আপনার নামে? ”

” জঘন্য এক মামালা ঠুকে দিয়েছে চেয়ারম্যান সাব। ”
” সেটা কী? ”
সিকান্দারের ঘৃণা লাগলো এটা বলতে। তারপরও বলল,
” চেয়ারম্যান সাব বলেছেন আমি নাকি তার মেয়ের সাথে…. ”
” কীহ! আপনি তো উল্টো তাকে কাল বাঁচালেন। ”
” সে যে মুসলিম হয়েছে জানতেন সেটা? ”
” না তো! বিনোদিনী তো আমাকে বলে নি। ”
” সে আমাকে বিয়ে করার জন্য মুসলিম হয়েছে। ”
মুনতাহার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। কয়েক মুহূর্ত সে যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারলো না। তারপর ধীরে ধীরে সিকান্দারের দিকে তাকালো।

“আপনাকে বিয়ে করার জন্য?”
সিকান্দার চোয়াল শক্ত করে মাথা নাড়লো। “হ্যাঁ।”
মুনতাহা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইলো। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
” তারমানে বিনোদিনী আপনাকে ভালোবাসে?”
সিকান্দার চোখ নামিয়ে নিলেন।
“আমি জানি না সে ভালোবাসাকে কী নামে ডাকে। তবে তার আচরণ থেকে এতটুকু বুঝেছি সে আমাকে পাওয়ার জন্য নিজের ধর্ম পর্যন্ত বদলে ফেলেছে।”
মুনতাহার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বিনোদিনী কতবার তার কাছে এসেছিল। কখনো ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে। কখনো ওযু সম্পর্কে। কখনো নামাজ সম্পর্কে। কখনো কুরআনের আয়াতের অর্থ জানতে চেয়েছে। মুনতাহা ভেবেছিল, মেয়েটা সত্যিই জানতে চাইছে।
কতবার সে বিনোদিনীর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে! কত আন্তরিকভাবে তাকে বুঝিয়েছে ইসলাম মানে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। আর সেই মেয়েটাই তার স্বামীকে তার থেকে আলাদা করতে চাইছে! সেদিন এজন্যই বলেছিল মুনতাহার জন্য তার চিন্তা হয়!

কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার সামনে রমেশ রায় চন্দ্রের গাড়ি এসে থামলো। তার পেছনে বিনোদিনী।
কালো বোরকা পরা মুনতাহার নিকাবের আড়ালে ঢাকা চোখ স্থির হয়ে গেল মেয়েটার ওপর। বিনোদিনীও তাকে দেখলো।দুজনের চোখ এক হলো। এগিয়ে এলো বিনোদিনী। মুনতাহার ইচ্ছে করলো ঠাটিয়ে চড় লাগাতে। তবে সে খুব ভদ্রতার সাথে জিজ্ঞেস করলো,
” আপনি এমনটা কেনো করলেন বিনোদিনী? যে আপনাকে বাঁচাল তার নামেই মিথ্যা অপবাদ দিলেন! আবার তাকে বিয়ে করার জন্য মুসলিমও হলেন! প্রথমে আপনি আমার থেকে আমার ধর্ম, আমার সংসার, আমার ব্যক্তিগত জীবন সবকিছু জেনেছেন। তারপর সেই জ্ঞানই আমার সংসার ভাঙার কাজে ব্যবহার করলেন!”
বিনোদিনী তাকালো সিকান্দারেড দিকে। সিকান্দার ঘুরে আছে মুনতাহার দিকে।

” তোমার কেন মনে হলো আমি মিথ্যা অপবাদ দিয়েছি? ”
” কারন আমি আমার স্বামী কে চিনি। সে কী করতে পারে আর কী পারে না আমি খুব ভালো করেই জানি। ”
” ভুল জানো। আর ভুল চিনো তোমার স্বামী কে তুমি। সে সত্যি সত্যি… ”
” জাস্ট কিপ ইউর মাউথ শাট। আমি মেয়েদের গায়ে হাত তুলি না। আল্লাহ যদি মেয়েদের গায়ে হাত তুলার বৈধতা বা অনুমতি দিত,তাহলে সর্বপ্রথম চড় টা আমি আপনার গালেই মারতাম মিস বিনোদিনী। বেঁচে গেলেন কেবল এজন্য। নইলে পৃথিবীর কোনো আইন আদালত ছিলো না আমাকে আটকানোর। একমাত্র আল্লাহর দেওয়া আইনেই আমি আঁটকে গেছি। তা না হলে আপনার জিভ টেনে ছিঁড়ে নিয়ে আসতাম আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্য।”

বিনোদিনী হাসলো। ” সেই উছিলায় হলেও তো আমাকে ছুঁতেন। ”
মুনতাহা বিনোদিনীর দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপনাকে সিকান্দার কখনো এমন কোনো আশ্বাস দিয়েছে?কখনো এমন কোনো কথা বলেছে, যাতে মনে হতে পারে সে আপনাকে বিয়ে করবে? কখনো আপনাকে ভালোবাসার কথা বলেছে? কখনো আপনার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছে, যাতে আপনি কোনো স্বপ্ন দেখার সাহস পান তাকে নিয়ে? খবরদার মিথ্যা বলবেন না।”
বিনোদিনী এবার মুনতাহার চোখের দিকে তাকালো।
“না।”
“তাহলে আপনি তার জন্য ধর্ম পরিবর্তন করলেন কেন?”
” কারন আমি তোমার স্বামী কে ভালোবাসি। ”
মুনতাহা হেসে ফেললো এ কথা শুনে। সিকান্দারের চোখ মুখে রাগ স্পষ্ট হলো।
“ তাহলে একটা কথা আজ পরিষ্কার করে দিই আপনাকে মিস বিনোদিনী। আপনি হিন্দু থাকলেও আমি আপনাকে বিয়ে করতাম না। আর মুসলিম হয়েছেন বলেও আমি আপনাকে বিয়ে করবো না। কারন আপনার প্রতি আমার কোনো দাম্পত্য অনুভূতিই নেই। আপনি পৃথিবীর যেই ধর্মেই থাকতেন আমার উত্তর একই থাকতো। কোনো মানুষকে পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করা আর আল্লাহকে ভালোবেসে ইসলাম গ্রহণ করা এক জিনিস নয়। আল্লাহর সৃষ্টি হৃদয় কেড়ে নিতে পারে। কারো প্রতি মুগ্ধতা জন্মাতে পারে। ভালোবাসাও জন্মাতে পারে। কিন্তু সেই সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে স্রষ্টার দ্বীন গ্রহণ করা একদমই উচিত নয়। ইসলাম কোনো মানুষের কাছে যাওয়ার সিঁড়ি নয়। ”

” আপনি আমাকে যতই বোঝান সিকান্দার সাহেব,আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
সিকান্দার মুনতাহার দিকে তাকালো।
” আর আমি তাকে ভালোবাসি। তাকে চেয়েছি,আর তাকেই পেয়েছি।”
” আমিও আল্লাহর কাছে আপনাকে চেয়েছি।”
” একজন বিবাহিত পুরুষকে কোন ভালো নারী চাইতে পারে? যে চায় তার রুচির সমস্যা, না হয় মাথার সমস্যা। ”
” আমি আপনাকে চাইতেই থাকবো। ”
সিকান্দার মৃদু মাথা নাড়লেন।
“বেশ, চান। প্রতিদিন চান,শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চান। রবের কাছে চাওয়ার অধিকার সবারই আছে। আমি তো আর আটকাতে পারি না। তবে রব তো আপনার একার না বিনোদিনী। এটা মাথায় রাখবেন। রব সে তো আমারও। আর আমি চাইবো আমার জীবনে মুনতাহা ব্যতিত আর কোনো নারীর প্রবেশ না ঘটাক।”
বিনোদিনী ঠোঁট কামড়ে ধরলো। “আমি আপনাকে হাসিল করেই ছাড়বো।”
মুনতাহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। “আপনি আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন?”

“হ্যাঁ।”
মুনতাহা মৃদু হাসলো। “তাহলে আপনি ইতিমধ্যেই হেরে গেছেন।”
“কীভাবে?”
“কারণ আমি সিকান্দারকে পাওয়ার জন্য কারো সংসার ভাঙিনি। খোদ রব তাকে আমার জীবনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। আর সে বিবাহিত জেনেও আপনি তাকে পাওয়ার জন্য নিজের বিবেক পর্যন্ত বন্ধক রেখেছেন। তাহলে বলুন কে জিতলো? ”
” তোমার স্বামী জেলের ভেতরে আছে মুনতাহা, ভুলে যেও না। ”
মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো, ” এখন আপনি চাচ্ছেন টা কী? ”
” হয় সিকান্দার আমাকে বিয়ে করবে। তা না হলে তাকে জেলেই থাকতে হবে। জামিন পাবে না। ”
সিকান্দার শব্দ করে হেসে উঠলো এবার। বলল,

” আপনাকে করবো বিয়ে আমি! হাস্যকর। জীবনেও হবে না এটা। আর আমাকে বড়জোর আপনি আজকের রাতটা আটকে রাখতে পারবেন। কাল তো আমার জামিন কনফার্ম। তখন আপনার কী হবে ভেবে দেখেছেন? পুরো গ্রামবাসী সহ কোর্ট চত্বরে আপনার মানসম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে। লোকে তখন জানবে একজন নারীর কুৎসিত কার্যকলাপ সম্পর্কে। ধিক্কার জানাবে। সেটা ভেবেছেন একবারও? না ভাবলে আজ ভাবুন। মুসলিম হয়েছেন। কুরআনও নিশ্চয়ই পড়েছেন তাহলে বাসায় গিয়ে কুরআন খুলুন। সূরা আল-বাকারা, ২:৪২ আয়াতটায় চোখ বুলান। আল্লাহ তায়ালা আপনার এই কর্মকাণ্ডের জন্য আপানকে কি বলেছে জেনে নিবেন। তাকে ভয় করুন। আর যতদ্রুত নিজের এই নিম্ন ব্যক্তিত্বটাকে বদলানোর চেষ্টা করুন। এখন আপনি আসুন। আর নিশ্চিত থাকুন আমি জেল থেকে বের হচ্ছি আগামীকাল। ”
বিনোদিনী মাথা নত করে চলে গেল। সিকান্দার মুনতাহার হাত চেপে ধরে বলল,
” আপনিও বাসায় যান মন। আর চিন্তা করে শরীর খারাপ করবেন না। আমি বেরিয়ে আসবো। আপনি আর এখানে আসবেন না। নাদিম উকিল নিয়ে আসছে। সামলে নিবে সবটা ও। আপনি আপনার পড়াশোনায় ফোকাস করুন। সামনে এক্সাম আছে তো। আমি কালই বাড়ি ফিরবো। বিশ্বাস রাখুন। চাচা চাচা। ”
সিকান্দার শফিক সাহেব কে ডেকে উঠলেন। শফিক সাহেব এগিয়ে আসতেই সিকান্দার বলল,

” মুনতাহা কে একটু বাড়ি পৌঁছে দিবেন। আর চাচি কে আজ রাত টা মুনতাহার সাথে থাকতে বলবেন। ”
” আচ্ছা, তুমি চিন্তা কইরো না বাজান। মুনতাহা মা চলো। ”
মুনতাহা শেষ বার স্বামীর পানে তাকিয়ে বলল,
” আমি কালও আসবো। আপনাকে বাড়ি না নিয়ে শান্ত হতে পারবো না। বাঁধা দিবেন না খবরদার। আসছি। নিজের খেয়াল রাখবেন। ”
থানা থেকে বেরিয়ে আসার পর বিনোদিনীর সাথে আবার দেখা হলো মুনতাহার। মুনতাহা এগিয়ে গিয়ে বিনুর বাহু চেপে ধরে বলল,

“সিকান্দার আপনাকে মারতে পারবে না বলে যে আমিও পারবো না, এমনটা ভাববেন না মিস বিনোদিনী। আপনি ওর বিপরীত লিঙ্গের, তাই আপনার গায়ে হাত তোলার অধিকার উনার নেই। কিন্তু আপনি তো আমারই লিঙ্গের। উনার হাত যেখানে আটকে গেছে, আমার হাত কিন্তু সেখানে আটকে নেই। আমি আপনাকে থাপড়াতে থাপড়াতে আপনার গাল লাল করে দিতে পারি। এতে আমার পাপ হবে? হোক। আমি তো আর ফেরেশতা নই, আমি মানুষ। আমার দ্বারা পাপ হবে। আর পাপ মানুষের দ্বারাই হয়। এই পাপের জন্য আমি না হয় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব। ইউ নো না? আল্লাহ ক্ষমাশীল! সো ভেবে চিন্তে কাল কোর্টে আসবে। আজ সারা রাত ভরে ভাববে। তুমি যেই উদ্দেশ্য নিয়ে বিপথে হাঁটছো তার মূল্য কিন্তু খুব বাজে ভাবে দিতে হতে পারে গর্দভ মেয়ে। আমার স্বামীর কোনো অসম্মান আমি মুনতাহা মেনে নিব না। সো বি কেয়ার ফুল বেকুব নারী। ”
মুনতাহা চলে গেল। বিনোদিনীর কেমন যেন শরীর অসার হয়ে আসলো। সে কি করছে তার মাথায় আসছে না। সে বাবার সাথে বাড়ি চলে আসলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। চোখ দুটো কেমন লাল হয়ে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মুখে সেই আত্মবিশ্বাসের ছিটেফোঁটাও নেই, যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই সে থানার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, সিকান্দারকে সে হাসিল করে ছাড়বে।
বিনোদিনী দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

সিকান্দারের কথা মতো সে ওজু করে কুরআন শরীফ খুললো। সূরা আল বাকারার ২:৪২ তম আয়াত টা বের করলো। সেখানে যেন আল্লাহ তায়ালা বিনোদিনী কে উদ্দেশ্য করেই বলছে,
“ওয়া লা তালবিসুল হাক্কা বিল বাতিলি, ওয়া তাকতুমুল হাক্কা ওয়া আনতুম তা‘লামূন।”
অর্থ : “আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্যকে গোপন করো না।”
অর্থাৎ,সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাবে না, যাতে মানুষ সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারে। আর কোনো বিষয় সত্য জানা সত্ত্বেও সেটাকে গোপন করা যাবে না।
আয়াতের শেষ শব্দটুকু পড়েই বিনোদিনীর চোখ স্থির হয়ে গেল। শব্দগুলো কেবল কানে পৌঁছাল না, বুকের ঠিক মাঝখানে এসে যেন আঘাত করল। তার আঙুলের ফাঁকে ধরা কুরআনের পাতাটি কেঁপে উঠল। চোখ আবারও আয়াতের ওপর গেল, অথচ এবার আর অক্ষরগুলো ঠিকমতো দেখা গেল না। দৃষ্টির সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠল। কেমন অদ্ভুত! কিছুক্ষণ আগেও যে কথাগুলোকে নিজের পক্ষে সাজিয়ে নিয়েছিল, যে মিথ্যাকে সত্যের পোশাক পরিয়ে নিজের মনকে বুঝিয়েছিল এই কয়েকটি শব্দের সামনে এসে সেগুলোর কোনোটাই আর দাঁড়াতে পারল না।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ এমনভাবে মোচড় দিয়ে উঠল, যেন চুরি করে পালাতে থাকা একজন চোর ঠিক দরজার কাছে এসেই ধরা পড়ে গেছে। পালানোর আর কোনো পথ নেই। হাতে চুরি করা জিনিস, চোখের সামনে প্রমাণ, আর মাথার ওপর এমন এক দৃষ্টি যার কাছ থেকে পৃথিবীর কোনো অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়।
বিনোদিনী ধীরে ধীরে কুরআন থেকে চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু কোথায় তাকাবে? দেয়ালের দিকে তাকালেও দেওয়াল তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। জানালার দিকে তাকালেও মনে হলো রাতের অন্ধকার তাকে আড়াল করছে না। নিজের হাতের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। এই হাত দিয়েই সে কতকিছু আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে একজন বিবাহিত পুরুষকে নিজের করে নেওয়ার বাসনা, সেই বাসনাকে পূর্ণ করতে মিথ্যার আশ্রয়, আর এমন এক অভিযোগ যার ভার একজন নির্দোষ মানুষের জীবনকে কারাগারের দরজার ভেতর ঠেলে দিয়েছে।
নিজেরই সেই লোভ, জেদ আর অন্যায় আকাঙ্ক্ষা যেগুলোকে এতদিন ভালোবাসার নাম দিয়ে নিজের কাছে সুন্দর করে রেখেছিল। আজ সেগুলো আর সুন্দর লাগছে না। কিছুই না। বরং নিজেরই করা কাজগুলো মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। শরীরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। হাতের তালু ঘেমে উঠল। ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
একটা অদ্ভুত লজ্জা তাকে গ্রাস করল। কার কাছে লজ্জা?

কোনো মানুষের কাছে নয়। আল্লাহর কাছে। এই লজ্জাটাই যেন তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিতে লাগল। সে মাথা নিচু করে ফেলল। চোখ তুলে কুরআনের দিকে তাকাতেও সংকোচ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পবিত্র এই কালামের সামনে তার নিজের হৃদয়টাই কত কলুষিত!
চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু নেমে এল। বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলল। যেন চোখের পানিটুকুও কারও সামনে প্রকাশ করতে লজ্জা লাগছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরেক ফোঁটা, তারপর আরও কয়েক ফোঁটা।তারপর একসময় চোখের পানি থামলই না। বিনোদিনী নিচু হয়ে বসে রইল। কান্নার শব্দও যেন বের করতে ভয় পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, তার এই কান্নাও আল্লাহর সামনে কোনো অজুহাত হতে পারে না। তাঁর কাছে তো চোখের পানির আগেই হৃদয়ের কথাগুলো পৌঁছে যায়। নিজের হৃদয়ের কথাই আজ তার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগছিল। কী ছিল সেখানে? ভালোবাসা? নাকি আকাঙ্ক্ষা? নাকি এমন এক লোভ, যা তাকে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ভুলিয়ে দিয়েছিল? প্রশ্নগুলো একটার পর একটা এসে বুকের ভেতর আঘাত করতে লাগল।

সে হাত সরিয়ে নিলো কুরআনের উপর থেকে। মনে হলো কোনো পাপীর ছায়া পড়ছে পবিত্র কুরআনের উপর। সে দ্রুত দুই হাঁটু ভেঙে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। কপাল মাটিতে ঠেকতেই বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল।
“আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি। আমি জানতাম এটা অন্যায়, জানতাম এটা ঠিক নয়, তবুও নিজের নফসের কথা শুনেছি। নিজের ইচ্ছাকে সত্যের চেয়ে বড় করে ফেলেছি। নিজের চাওয়াকে এত বড় করে দেখেছি যে, তার সামনে আপনার হুকুমের কথা ভুলে গিয়েছি।
আমি কী করে এতটা অন্ধ হয়ে গেলাম, আল্লাহ? আমি কী করে নিজের পাপকে ভালোবাসার নাম দিলাম? কী করে অন্যায়ের পক্ষে নিজের হৃদয়ে এতগুলো অজুহাত বানালাম? আপনি তো আমার অন্তর দেখেছেন। আমার মুখের কথার আগেও আপনি আমার নিয়ত জানতেন। আমি মানুষের কাছ থেকে লুকিয়েছি, নিজেকেও বুঝিয়েছি কিন্তু আপনার কাছ থেকে কীভাবে লুকাব, আল্লাহ?
আমি জানি না আপনার রহমতের কতটা অযোগ্য হয়ে গেছি। আপনার দিকে তাকানোর মতো মুখও আমার নেই। তবুও আপনার দরজার বাইরে যাব কোথায়? আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। আমি যদি আপনার কাছেই ফিরে আসতে না পারি, তবে কোথায় যাব?

আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না, আল্লাহ। আমার অন্তরটা পরিষ্কার করে দিন। যে অন্তর নিজের নফসের কাছে পরাজিত হয়েছে, তাকে আপনার আনুগত্যে ফিরিয়ে দিন। আমার নফসকে সংযত করুন। যে পাপের কথা মনে পড়লে আজ নিজের কাছেই লজ্জা লাগে, সেগুলোও আপনার রহমতের আড়ালে ঢেকে দিন।আমি আর এই ভার বহন করতে পারছি না। আমি ক্লান্ত,আমার বুকটা ভারী হয়ে গেছে। নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি নিজের হাতেই নিজের অন্তরটাকে কতটা নষ্ট করেছি। এতদিন যা নিয়ে অহংকার করেছি, আজ সেগুলোর কথাই মনে পড়ে আমার লজ্জায় মাথা নত হয়ে যাচ্ছে অনুশোচনায় হৃদয় টা ঝলসে যাচ্ছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আল্লাহ। আমার শান্তি চাই। আর আমার শান্তি কেবল আপনার কাছেই মেলে। আমি বাবার কথায় পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছিলাম অন্যের জীবন অনিষ্ট করার জন্য। আমাকে তার জন্য ক্ষমা করুন। আমাকে আর আমার নফসের হাতে ছেড়ে দেবেন না, আল্লাহ। আমার কোনো সিকান্দার শাহ্ চাই না, আল্লাহ।
আমি আর কোনো মানুষকে পাওয়ার জন্য আপনার কাছে কিছু চাই না। আমার শুধু আপনাকে চাই। আপনার ক্ষমা চাই। আপনার দয়া চাই। আপনার রহমত চাই। আপনার ভালোবাসা চাই। আমার হৃদয়কে আপনার জন্য করে দিন, আল্লাহ। আমার বাকি জীবনটা আপনার গোলামীতে কাটানোর তাওফিক দিন।

আপনি দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আমার হাত খালি করে ফেরাবেন না। আমার অন্তরকে বদলে দিন, আল্লাহ। আমার চোখকে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিন। আমার মনকে অন্যায় আকাঙ্ক্ষা থেকে ফিরিয়ে দিন। আমার জবানকে মিথ্যা থেকে ফিরিয়ে দিন। আমার পা যেন আর এমন কোনো পথে না যায়, যে পথে গিয়ে আপনাকে হারাতে হয়। ”
বিনোদিনী এই প্রথম তার সিজদায় সিকান্দার শাহ্ কে চাইল না। কোনো মানুষকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আল্লাহর দরজায় এসে দাঁড়াল না। তার জবান থেকে আজ কোনো দাবি বের হলো না, কোনো আবদারও নয়। শুধু নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে চাইতে তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল।
যে হৃদয় এতদিন একজন মানুষকে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ছিল, সেই হৃদয় আজ নিজের রবের কাছে একটু দয়া ভিক্ষা করছে।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৫

সিজদায় পড়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এতদিন সে কী ভুল জায়গায় শান্তি খুঁজেছে! একজন মানুষকে নিজের করে পেলেই বুঝি তার অস্থিরতা থেমে যাবে,এই ধারণাটাই তাকে ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে সত্যকে আড়াল করতে হয়েছে, মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে, অন্যায়ের পক্ষে নিজের বিবেককে চুপ করাতে হয়েছে।
অথচ আজ সেই মানুষটাকেই সে চাইছে না। আজ তার একটাই ভয় যেন তার রব তাকে ফিরিয়ে না দেন।
যে হৃদয় একবার আল্লাহকে চিনতে শুরু করে, তাকে পৃথিবীর কোনো আকর্ষণই আর বন্দি করে রাখতে পারে না।
কারণ আল্লাহর পরিচয় যখন অন্তরে জায়গা করে নেয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সৃষ্টির মোহ থেকে সরে এসে স্রষ্টার দিকেই ফিরে তাকাতে শেখে। আর বিনোদিনী সেদিন, বহুদিন পর, প্রথমবার নিজের হৃদয়টাকে একজন মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে তার রবের দরজায় রেখে দিয়েছিল বিনোদিনী জানে না আগামীকাল সে কতটা বদলাতে পারবে। জানে না তার ভেতরের পুরোনো আকাঙ্ক্ষাগুলো কত সহজে তাকে আবার টেনে ধরবে। জানে না এই কান্না কতদিন স্থায়ী হবে। তবে সে তার কর্ম নিয়ে ভীষণ অনুতপ্ত। আর সে এবার সৃষ্টি কে নয় স্রষ্টা কে ভালোবাসে তাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় বাকি জীবন!

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here