আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৭ (২)
সুরভী আক্তার
সবার সাথে কথা বলার মাঝেই আদ্র ফোন হাতে টেনে নেয় । বলে খানিক রাগে…..
” টুকটুকির বাচ্চাাাাা,,, আগে ফোন করিস নি কেনো, হ্যাঁ ? আমরা কতটা টেনশনে ছিলাম, জানিস ?
শাফাহ্ হাসলো শব্দ করে । টুপ করে পানি ঝড়লো বাঁ চোখের ভেজা কার্নিশ বেয়ে,, বললো হাস্যোজ্জ্বল মুখে….
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাা,,, এইতো টেনশন মুক্ত করে দিলাম এখন । অযথা চিন্তা করো না আমায় নিয়ে । আমি ভালো আছি । বিশ্বাস করো, খুব ভালো আছি । এখানে তুমি নেই ,, জ্বালাতন করছো না আমায় । ভালো থাকবো না আবার ? আর উনি, মেঘার ভাইয়া কিন্তু খারাপ নন । বৃথা ভুল বুঝোনা ওনাকে । উনি আমার কোনো ক্ষতি করেননি ।
এপাশ থেকে তৌসিফ কাবিরের কম্পিত স্বরের বাক্য রমনীর কানে যায় এবারে…..
” আমরা জানি, ইয়াশ খারাপ নয় । ওকে বলো, তোমাকে যেনো দেশে নিয়ে আসে । আমরা কিচ্ছু বলবো না । মেনে নেবো সবটা । শুধু জানতে চাই, ও কেনো এমনটা করলো ।
বাবার কথায় শফাহ্ ভেজা চোখে ইয়াশের দিকে তাকায় । এখনো সটান বসে আছে যুবক । দুহাত একসাথে বেঁধে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছে । শুনছে হয়তো মনযোগ দিয়ে । ফোন স্পিকারে । শাফাহ্ নিজে স্পিকার অন করেছে ।
আব্বুর কথার কোনো উত্তর করলো না রমনী । ছোট ছোট চোখে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে রইলো । ওপাশ থেকে আগ বাড়িয়ে মেঘা ফোন হাতে নেয় ।
” টুকটুকি, ভাইয়া কোথায় ?
” এখানেই আছে !
” ফোন দে, আমি কথা বলবো ওর সাথে ।
ইয়াশ ঝট করে উঠে দাঁড়ালো এবার । মেঘার প্রত্যুত্তরে শাফাহ্ আর কিছু বলার আগেই তেড়ে গিয়ে এক ঝটকায় ফোন কেড়ে নিলো । মুখের উপর টুং টুং করে কল কেটে দিলো ।
শাফাহ্ ভড়কায় । চোখ মুছে ঢোক গিলে বলে…..
” কেটে দিলেন কেনো ?
দাঁত খিচলো ইয়াশ । কিড়মিড় করে চিবিয়ে বললো…..
” আজ থেকে আর বাড়িতে কথা বলতে পারবে না তুমি । এইই শেষ । আমার নামে সুনাম গাইতে বলিনি আমি তোমায় ! বেকার বেকার সবার সামনে ভালো সাজাচ্ছো কেনো আমায় ?
” আপনি তো খারাপ নন !
” খারাপ হয়ে দেখাই এবার ?
কন্ঠ আরো বেশি চড়ে এলো এ বেলায় । চোখ মুখ টাটিয়ে মেয়েটার দিকে ঝুঁকে পড়লো তপ্ত যুবক । যেনো হাত উদ্যত করবে এক্ষুনি । শাফাহ্ চিবুক নামিয়ে সিটিয়ে যায় একই অবস্থানে । নড়ে না একটুও । ভয় পায় না । বলে নির্ভয়ে….
” কি খারাপি করবেন ?
” যা সহ্য করতে পারবে না !
” মেয়েরা অলৌকিক সহ্য শক্তি নিয়ে জন্মায় । কি করবেন আর,, মারবেন ?
ইয়াশ তাজ্জব হয় মেয়েটার কথায় । কেমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলছে এই মেয়ে । যেনো কত কি বোঝে । কত বিজ্ঞ সে ! অথচ সে বড্ড অবুঝ । তাকে সেই হিসেবেই চেনে সবাই । জানে তার বোকামি । রাগ উঠলো ইয়াশের । রমনীর কথার পৃষ্ঠে তাল জোগাতে পারলো না ।
রাগ সামলাতে দাঁতে দাঁত চিপে পিষে নিজের চুল নিজেই টেনে ধরলো । ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বজ্র ঝাড়ি মারলো….
” চুপচাপ ঘুমাও স্টুপিড ।
দরজার কাছে গিয়ে থামলো আকস্মিক । কিছু মনে পড়তেই পিছু ফিরে রগরগে দৃষ্টিতে তাকালো । আবারো তপ্ত স্বরে বললো…..
” এইইই মেয়ে,, তখন ঐ ছেলেটা তোমাকে জান বলে ডাকলো কেনো ?
শাফাহ্’র এক মুহুর্তেই বুঝতে বাকি রয় না । নিশ্চয়ই সায়ানের কথা বলছে এই লোক । সেই তো জান বললো । আর শাফাহ্, পরিপ্রেক্ষিতে ভাইয়া বলে গুঁড়িয়ে দিলো তাকে । ভাবতেই অস্বাভাবিক হাসলো মেয়েটা । গলা বাড়িয়ে নির্দ্বিধায় উত্তর করলো ভেজা কন্ঠ চিরে….
” জান ? কারন উনি আমাকে ভালোবাসেন, তাই । জান সম্বোধনে তীব্র ভালোবাসা প্রকাশ পায় জানেন ? ভালোই লাগে শুনতে ।
” ভালোবাসে মানে ?
ইয়াশের কন্ঠ গর্জে এলো । সে আবারো তেড়ে এলো ঘরে ।
” বাহ্ রে,,, আমাকে বুঝি কেউ ভালোবাসতে পারে না ?
সবাই আমায় ভালোবাসে, বুঝলেন ? সবার ভালোবাসা এক হয় না । সেও ভালোবাসে আমায় । নিঃস্বার্থ ভাবে । আমার বাডি আমাকে খুব ভালোবাসে । খুব বেশি । সবাই জানে । আমিও জানি এটা । কিন্তু সে না জানুক । তার ভালোবাসা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না । এটাই মানুক ।
আন্দাজে কথা ছুড়ে নিস্তেজ কদমে ওয়াশ রুমের দিকে এগোলো মেয়েটা । চোখ থেকে টপাটপ পানি ঝড়লো । অগোচরে হাতের উল্টো পিঠে ভেজা কপোল মুছে নিলো । ইয়াশ কিছু বুঝে পায় না । চোখ সরু করে তাকিয়ে রয় । কি বললো এই বোকা মেয়েটা ? অর্থ এতো জটিল লাগছে কেনো ?
এদিকে ফোন কাটতেই মেঘার মুখখানা মলিন হয়ে আসে । অবস হয়ে আসে শরীর । শুভ্রর ফোন শুভ্রর দিকে বাড়িয়ে দেয় সে । ফোন হাতে পেয়েই ধক্ করে ওঠে শুভ্র । এতক্ষণে আঁতকে পিছু ফেরে । ঝটপট ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ ওপাশ তাকায় । বাড়ির সবাই উপস্থিত ড্রইং রুমে । শুভ্র গলা বাড়িয়ে বললো….
” মেহের, সায়ান কোথায় ?
মেহের ও এপাশ ওপাশ চাইলো তড়াক করে ।
” এখানেই তো ছিলো । কোথায় ভাইয়া !
শুভ্র ধড়ফড়িয়ে সদরের দিকে চায় । দরজা খোলা । সেদিকে কেউ নজর দেয়নি এতক্ষণ । ব্যস্ত ছিলো মেয়েকে নিয়ে । কিছু একটা আন্দাজ করেই ভড়কে গেলো শুভ্র । কপালের ধারে তর্জনী আর মধ্যমা বুলিয়ে বিড়বিড় করলো….
” ওওও নো…..
বলেই এলোমেলো কদমে বাইরের দিকে ছুটলো হন্তদন্ত হয়ে । পেছন থেকে ডাকলেন শাহিনা কাবির…..
” শুভ্র ,, কোথায় যাচ্ছিস এখন ?
” আমি আসছি আম্মু ।
ক্যালিফোর্নিয়ায় রাত সাড়ে দশটা ।
শাফাহ্ তখন ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে ইয়াশ কে দেখেনি আর । শাড়ি পাল্টে ইয়াশের একটা ধূসর রঙা টি শার্ট পড়ে নিয়েছে মেয়েটা । যদিও ওর শরীরে এটা খুব ঢিল । তার মতো রাক্ষুসে শরীর তো নয় অনুচ্চ রমনীর । সে নিতান্তই ছিমছাম গড়নের । কাঁধ থেকে পিছলে খুলে যাচ্ছিলো টিশার্টের গলা । শাফাহ্ কাঁধের কাছে একটা গিট্টু দিয়ে টাইট করে আটকেছে কোনো রকমে । টি শার্টের সাথে মিলিয়ে শর্ট’স পড়েছে একটা । ক্লজেট ঘেঁটে খুঁজে বের করেছে এটা । ইয়াশের হাঁটু সমান নিকার্স রমনীর পায়ের টাখনু অবধি পৌঁছেছে অনেকটা ।
শাড়িতে বেহাল হচ্ছিলো এতক্ষণ । এখন কম্ফোর্ট লাগছে । ঘুম আসছে না একলা একা । তার উপর ঘরের এমন হলদেটে আলোয় মাথা ভনভন করছে কেমন । চোখ দুটোতে অন্ধকার নামছে । খুলে রাখাও অসহনীয় । আবার ঘুম ও আসছে না । মেয়েটা বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়েছে এক সময় । বুজে নিয়েছে দু’চোখ । চেষ্টায় আছে ঘুম টানার । দরজায় শব্দ হলো । খানিক চমকালেও নড়লো না মেয়েটা । ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলো । ইয়াশ এসেছে, বুঝতে বাকি নেই । ঘুমানোর ভান ধরলো সে । তবে শ্বাস টানার সাথে সাথে ধক্ করে উঠলো অসহ্যকর বিদঘুটে গন্ধে । সিগারেটের ভ্যাপসা গন্ধ । এক লাফে উঠে বসলো মেয়েটা । গমগমে স্বরে বলল……
” সিগারেট খাচ্ছেন ?
ইয়াশ নিস্পৃহ । বেডের উপর থেকে বালিশ নিয়ে সরে আসতে আসতে জবাব করলো গা ছাড়া ভাবে….
” খেয়ে এসেছি !
” সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য হয় না আমার । অ্যালার্জি আছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ।
” জানা আছে ।
” স্মেল ছড়াচ্ছে এখনো ।
কিছু বললো না অটল যুবক ।
মেয়েটা চেয়ে রইলো । তার পিটপিট দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বালিশ আর কম্ফোর্টার নিয়ে ফের বাইরে বেরোনোর জন্য পা বাড়ালো যুবক । শাফাহ্ পেছন থেকে ডাকে…..
” আবার কোথায় যাচ্ছেন ?
” ঘুমোতে !
” আমি একা থাকবো ?
খাট থেকে নেমে এসেছে মেয়েটা । পেছনে এসে দাঁড়ালো গুটিসুটি মেরে । ছোট ছোট হাত দুটো জড়ো করে বললো আবার…..
” ভয় লাগে আমার ! আমি ঘুমোনোর পর আপনি অন্য রুমে যাবেন, বাঁধা দেবো না ।
তার কথা শেষ হতে না হতেই হেঁচকা টান পড়লো হাতে । মেয়েটাকে এক টানে দেয়ালে ঠাস করে আছড়ে ফেলে চেপে ধরলো যুবক । শাফাহ্ চমকে যায় আকস্মিক কান্ডে । ভয়ার্ত চোখে তাকায় । ইয়াশ ঝুঁকে হিসহিসিয়ে ওঠে ক্রোধিত স্বরে….
” এইই , আমি তোমার বডিগার্ড নই । ওকে ? একদম আদেশ করবে না আমায় । বলেছি তো, তোমায় সুখে রাখার জন্য এখানে আনিনি আমি । অনেক সহ্য করছি তোমায়, আর তোমার এই বকবকানি । ভালো আছি, ভালো থাকতে দাও । তোমার উপর রাগ ঝাড়তে বাধ্য করো না আমায় ।
ছলছল করে ওঠে রমনীর আঁখি জোড়া । নামিয়ে নেয় ভরা চোখ । নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে আলগোছে সরে আসে । চুপচাপ বিছানায় গিয়ে গুটিয়ে শুয়ে পড়ে । ইয়াশ তাকালো । রাগে ক্ষোভে রক্তবর্ণ তার অক্ষি যুগল । মেয়েটার এমন হঠাৎ বদলে যাওয়া নিস্পৃহ ভাব দেখে রাগ বাড়লো আরো । তবে তা নিজের উপর ।
ক্ষোভের দরুন সপাটে একটা লাথি বসালো দরজায় । অতঃপর ঠাস করে কপাট আটকে দিলো । বালিশ, কম্ফোর্টার বিছানায় ছুড়ে মারলো আবার । গজগজ করে একপাশে এসে মাথা চেপে ধরে বসলো ।
মিনিট কয়েক লাগলো রাগ দমাতে । রমনী পাশ ফিরে যুবককে দেখে ঠোঁট চেপে বললো এবারে….
” এই যে শুনুন, সকাল দশটার আগে আমি ঘুম থেকে উঠতে পারি না । সো, সকাল হলে প্যান প্যান করে ডিস্টার্ব করবেন না আমায় । আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই নিজ দায়িত্বে ব্রেকফাস্ট রেডি করে রাখবেন । কাল ব্রেকফাস্টে পরোটা খাবো আমি । ঠিকমতো সব রেডি করে রাখবেন, ওকে ? আমি আবার খিদে সহ্য করতে পারি না ।
ইয়াশ ঝট করে তাকালো অগ্নি চক্ষু নিয়ে । শাফাহ্ ফিক করে হেসে উঠলো । তা দেখে ফোঁস করে ওঠে যুবক ! কুশন ছুড়ে মারে রমনীর উপর । তেঁতে বলে…..
” ওওও শাট আপ টকেটিভ লেডি,,,, ঘুমাও চুপচাপ ।
,,,,,
বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী বাজে বিকেল চারটে ।
রৌদ্রের ফোন ভেঙেছে মেঘা । খানিক আগে নিজের জন্য একটা নতুন ফোন কিনে এনেছে রৌদ্র । সেটাতে সিমকার্ড ইন করে ওপেন করলো । মেঘার অনুপস্থিতির সুযোগে চুপিচুপি একটা নাম্বার তুলে ডায়াল করলো । রিসিভ হতেই কথা শুরু হলো তার । বেশ কদিনের ঝঞ্ঝাটে মিনির সাথে কথা হয়নি সেভাবে । বাচ্চাটা নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে রেখেছে । তার ধারনাই সঠিক । আদুরে বাচ্চাটা অভিমান করেছে । মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । কিছুতেই কথা বলবে না রৌদ্রের সাথে । রৌদ্র ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে টান দিয়ে ডাকলো আদুরে গলায়…..
” মাম্মাআআ !
মিনি ডাক শুনে ওষ্ঠ উল্টায় ।
ফিক করে হাসে রিসা । এই মেয়ের অভিমান গলে জল এক ডাকেই । রিসা মিনির দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়েও সরিয়ে নিলো,, বললো…..
” মিনি তোমার সাথে কথা বলবে না রৌদ্র ! ছাড়ো ওকে…..
হাসলো রৌদ্র । বললো…..
” তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে রিসা । বলা হচ্ছে না । বলাটা প্রয়োজন । আগে মেয়েকে দাও, ওর সাথে কথা বলি । কদিন কথা হয়নি, ভালো লাগছে না ।
রিসা হেসে আবারো মিনির দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো । এ বেলায় চট করে ফোন কেড়ে নিলো বাচ্চাটা । কানে ঠেকিয়েই আহ্লাদী সুরে ওষ্ঠ উল্টে ডাকলো….
” পাপা !
” ইয়াহহ্ মাম্মা !
” মিনিল পাপা মিনিল কাচে আচে না । মিনি লাগ কলেচে ।
” ওওও মাম্মাআআ,, এইতো পাপা কথা বলছে । ইউ নো, আমি পাপা বিজি আছি । মিনি এ্যাজ অ্যা গুড গার্ল , সব বোঝে । রাইট ? পাপা তো চলে আসবে খুব তাড়াতাড়ি । রাগ করতে নেই মাম্মা !
” তুমি আচো না !
নাক টেনে বললো বাচ্চাটা । বোধহয় কেঁদে ফেলবে । কাঁদলো কিনা সন্দেহ । রৌদ্র ঠাহর করতেই ধক্ করে ওঠে । আরাফের কথা মনে পড়ে । সে বলেছিলো, যেনো তার ভবিষ্যৎ বাচ্চাকে বীনা কারনে কখনো কাঁদতে না দেয় রৌদ্র । রৌদ্রের হাতেই তো সঁপে ছিলো দায়িত্ব । রৌদ্র ভোলে কি করে ? সে হাপুসহুপুস করে শান্তনা দেয়….
” মাম্মা,,, কাঁদছো তুমি ? কাঁদে না মা । আমি চলে আসবো তো । নেক্সট মানথ,, ওকে ?
” প্লমিস ?
” পাক্কা প্রমিস !
” কাকে কি প্রমিস করছেন ?
আকস্মিক একবিংশীর স্বর । তড়াক করে পিছু ফেরে রৌদ্র । কান থেকে ফোন নামায় ঝট করে । অগোচরে কল কেটে দেয় সহসা । ব্যালকনির দরজার কাছে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা । দৃষ্টি তীক্ষ্ণ । কপালে ভাঁজ সূক্ষ্ম । রৌদ্রের নিরেট মুখাবয়বে কিঞ্চিত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো । রমনী তা লক্ষ্য করে এগিয়ে আবার শুধালো…..
” কি হলো ? এভাবে ভুত দেখার ন্যায় চমকালেন কেনো ? কার সাথে কথা বলছিলেন ?
হাসার চেষ্টা চালায় রৌদ্র । বলে কথা কাটিয়ে…
” ঐ , কিছু না । ক্লাইন্ট ছিলো । একটা ডিলে আটকে আছি । সেটা ক্লোজ করতে হবে ।
মেঘা দৃষ্টি সূচালো করলো আরো বেশি । বললো তীক্ষ্ণ স্বরে….
” প্রমিস করছিলেন কাকে ?
” এটার জন্যই । আমার জন্য আটকে আছে কিনা ,, তাই । তুই বুঝবি না ।
হঠাৎ তুই সম্বোধনে মেঘার কপালে তিতি বিরক্তির ভাঁজ পড়ে । ঝেড়ে ওঠে…..
” কি বললেন ?
” উপসস্, সরি সুইটহার্ট । মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে ।
” এবার মুখ ফসকালে মুখ সেলাই করে দেবো একদম ।
হাসলো রৌদ্র । খানিক বাদ মেঘাও ।
কাছে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতেই রমনীকে আরো কাছে টেনে নিলো বেপরোয়া যুবক । খোঁপার বাঁধন খুলে এক গোছা চুল টেনে চেপে ধরলো নাসিকার ডগায় । ঘ্রাণ টানলো উন্মত্তের ন্যায় । মেঘা ওর পাগলামো দেখে মিটিমিটি হাসে । হাঁফ ছেড়ে লোকটার সুঠাম বুকের বাঁ পাশে মাথা নামিয়ে বলে বিষন্ন কন্ঠে……
” বাড়ির সব ঠিকঠাক হচ্ছে ধীরে ধীরে ।
” হু ।
” ভাইয়ার সাথে কথা বলা প্রয়োজন ।
” সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে ।
” নতুন ফোন কিনেছেন ?
” হু ।
” দেখি !
রৌদ্র সহসা ফোন বাড়িয়ে দিলো । মেঘা সেটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বললো…..
” সরি ।
” ফর হোয়াই ?
” ফোন ভাঙ্গার জন্য !
ঠোঁট ঠেলে হাসলো রৌদ্র । একবিংশীর অবিন্যস্ত কেশরাশী কানের পাশে গুছিয়ে দিতে দিতে বললো…..
” আমাকেই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছো,, ফোন আর এমন কি ? হাজার টা আসবে যাবে । তবে এই রৌদ্র কিন্তু একটাই থাকবে ।
একটু থেমে ডাকলো….
” ইভারা ?
” উমম !
” আ… আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে !
” কোথায় ?
” সুইজারল্যান্ড ফিরতে হবে একটু !
মেঘা ছ্যাঁত করে উঠলো । দ্রুত মাথা তুলে চাইলো । গোল গোল মুখে বললো সহসা…..
” কেনো ?
” কাজ আছে জান ! যেতে হবে কদিনের জন্য !
শুষ্ক ঢোক গেলে রমনী । রৌদ্রের পিঠের জামার অংশ খামচে ধরে বলে ভেজা গলায়….
” কি কাজ ওখানে ? সব ছেড়ে দিন । আপনি শুভ্র ভাইয়ার সাথে বাবার বিজনেসে জয়েন করুন । আমরা দেশে সেটেল হবো ।
” হবো তো । বাট তার আগে ওখানে যেতে হবে ।
” না , যাবেন না ।
মেঘা আবারো মাথা নামিয়ে রৌদ্রের বুকে রাখলো । জেদ ধরে বললো শেষের কথা । রৌদ্রের কপালে ভাঁজ । মুখে গুরুত্বর ছাপ চিন্তার । হয়তো ভাবছে কিছু । চরম দোটানায় সে । দু পক্ষের টানে অস্থির তার অন্তরাত্মা । প্রকাশ করতে পারছে না । সে ঢোক গিললো । শক্ত করে জড়িয়ে নিলো স্ত্রীকে । রমনীর সিঁথির নিকট ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো কন্ঠ খাদে নামিয়ে…..
” জেদ করে না ইভারা । তুমি বুঝতে পারছো না । আমার কাজ আছে ওখানে । শুধু কদিনের জন্য যেতে হবে । চলে আসবো তো আবার ।
” তারপর পার্মানেন্ট চলে আসবেন ?
” হু ।
” বলেছিলেন যে ওখানে আমার জন্য সংসার সাজিয়ে রেখেছেন !
” না , ওখানে তোমায় নিয়ে সংসার পাতবো না । সাজানো সংসার গুছিয়ে এখানে নিয়ে আসবো । আমরা এখানেই ঠিক আছি সানি ।
অবিষন্ন শরীরে ঘরে ঢুকলো শুভ্র । চোখ মুখ পুরো দেবে গেছে । তখন প্রায় সন্ধ্যা । সারাদিন এপাশ ওপাশ ছোটাছুটি করেছে । দুপুরে ফিরেছিলো একবার ।
সে ঘরে ঢুকতেই মেহের ঘিরে ধরে ওকে….
ধড়ফড় করে বলে…..
” এসেছো তুমি,,, ভাইয়ার খোঁজ পেলে ?
শুভ্র পড়নের শার্ট টা খুলে ছুড়ে মারলো এক পাশে । ধপ করে বসে পড়লো সোফায় । দুহাতে মাথা চেপে ধরলো । মেহের বুঝলো যা বোঝার । ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । শুভ্রর পাশে বসে বাহু চেপে ধরলো ওর । ঝাকালো দূর্বল হাতে । বললো থেমে থেমে…..
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৭
” কি হলো , বলো না । ভাইয়া কোথায় গেছে, খোঁজ পাওনি এখনো ?
” ……..
” বলবে না কিছু ? চুপ করে আছো কেনো এভাবে ? কোথায় গেছে ভাইয়া ? খোঁজ পেয়েছো কি পাওনি ! বলো আমায় !
