যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ২২
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
প্রীতিরা যখন কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছায় তখন বরযাত্রীও কাছাকাছি চলে এসেছিল। ওদের পাঁচ মিনিট আগেই প্রীতি সেখানে পৌঁছে যায়।
এদিকে জীবন অস্থির হয়ে ছিল প্রীতির কোনো খোঁজ না পেয়ে। লজ্জায় কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছিল না। সারাটা পথ যে ওর কেমন কেটেছে এটা কেবল শুধু ও নিজেই বলতে পারবে। ভয় হচ্ছিল সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা! এখানে পৌঁছে যখন দেখল সবাই গেইট ধরেছে তখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল জীবন। পরিবেশ স্বাভাবিক দেখে বোঝা যাচ্ছে সব কিছু ঠিকঠাক আছে। কিন্তু যতক্ষণ না সে প্রীতিকে দেখবে নিজের চোখে, ততক্ষণ সে স্বস্তি পাবে না কিছুতেই।
প্রিতম হাসপাতালের সব বিল ও ফরমালিটিস মিটিয়ে একজন রিসেপশনিস্টকে নিজের বিজনেস কার্ড দিয়ে বলল,
“রোগির জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত আমি এখানে অপেক্ষা করতে পারছি না, দুঃখিত। কারণ আজ আমার বোনের বিয়ে। আমাকে এখনই ফিরে যেতে হবে। এইযে এটা আমার কার্ড। কোনো দরকার হলে অবশ্যই আমাকে একটু ইনফো করবেন প্লিজ!”
এরপর রাহাতের মানিব্যাগটা দিয়ে বলল,
“এখানে ওনার বিজনেস কার্ড আছে। সম্ভবত ম্যানেজারের নাম্বারও পাবেন। আপনারা প্লিজ একটু যোগাযোগ করে নিয়েন। আমার হাতে সময় থাকলে আমিই সব করতাম।”
রিসেপশনিস্ট মেয়েটা ইতোমধ্যেই জেনেছে, রাহাতকে প্রিতম চেনে না। তবুও যে একজন অচেনা লোকের জন্য প্রিতম এতখানি করেছে এটাই বা কম কী? আজকাল এটুকুই বা কে করে? তাই মেয়েটা সৌজন্যতামূলক হাসি দিয়ে বলল,
“আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আমি কল করব তার ম্যানেজারকে। আর প্রয়োজন হলে আপনাকেও কল করব।”
প্রিতম কিছুটা ভারমুক্ত হয়ে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ সো মাচ।”
বিয়ে বাড়ির এত ব্যস্ততায় ভাইকে আর আলাদা করে রাহাতের কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি প্রীতির। তার সমস্ত মন জুড়ে এখন শুধু বিষন্নতা। বুক ভার হয়ে আসছে। চোখ টলমল করছে সেই কখন থেকে! এত বছরের সম্পর্ক, এত বছরের চিরচেনা সেই পুরনো বাড়ি, ও বাড়ির মানুষজনকে ছেড়ে যেতে হবে।
বিদায় শব্দটা কতটা ভারি হতে পারে এটা কেবল মাত্র একটা মেয়ে তখনই বুঝতে পারে, যখন তার জীবনে এই দিনটা আসে। প্রীতির জীবনেও এসেছে। খুব অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। সে জানে না, জীবন আদৌ কেমন হবে। সারাজীবন কেমন থাকবে। তবুও কোন ভরসায় সে হঠাৎ করে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল তা সে জানে না। শুধু মন তাকে এটুকু সায় দিয়েছে, সামনে সবকিছু ভালো হবে।
বিদায়ের পর ঐ বাড়িতে গিয়ে সব নিয়ম-নীতি শেষ করে প্রীতিকে জীবনের রুমে রেখে এসেছে সবাই। জীবন উতলা হয়ে ছিল প্রীতির সাথে একা কথা বলার জন্য। গাড়িতে কথা বলার সুযোগ থাকলেও উপায় ছিল না। আসার সময় প্রীতি এত কাঁদছিল যে, জীবন আরো বেশি অস্থির হয়ে যাচ্ছিল।
অবশেষে যখন রুমে এসে প্রীতির সাথে কথা বলার সুযোগ হলো, তখন দেখল, প্রীতি এখন আগের থেকে অনেকটাই স্বাভাবিক আছে। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কানের দুল খুলছিল। পায়ের শব্দ শুনে শুধু একবার ফিরে তাকিয়েছিল জীবনের দিকে।
জীবন দরজা বন্ধ করে প্রীতির কাছে এগিয়ে গেল। অনেকক্ষণ শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইল। প্রীতি এবার জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবেন?”
জীবন এক সেকেন্ডও সময় না নিয়েই বলল,
“আমি কি আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি?”
হঠাৎ এ কথা শুনে প্রীতির ঘাবড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে ঘাবড়াল না। বরং বিস্মিত হলো। এর কারণ জীবনের চোখের ভাষা! ঐ চোখে ভয় আছে, খুব প্রিয় কিছু হারানোর ভয়। জীবনের কণ্ঠস্বরও কাঁপছিল। প্রীতি কয়েক মুহূর্ত নিরব থেকে জিজ্ঞেস করল,
“আর ইউ ওকে?”
জীবন জবাব দিল না। প্রীতির অনুমতির অপেক্ষাও করতে পারল না। আচমকাই খুব শক্ত করে প্রীতিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। প্রীতি থতমত খেয়ে কোনো রকম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জীবন নিজেই বলল,
“আমি জানিনা কেন আপনাকে হারানোর এত ভয় পাচ্ছিলাম আমি! আপনাকে এতগুলো কল করার পরও যখন কল ধরছিলেন না তখন ভীষণ ভয় হচ্ছিল আমার। পার্লার থেকে বের হয়ে নক করেছিলেন। আমি তখন জানতাম আপনি গাড়িতে। তাই আমার ভয়টা…”
প্রীতি এবার মুচকি হাসল। খুব আলতো করে হাত রাখল জীবনের পিঠের ওপর। এরপর বলল,
“তাই ভয় পাচ্ছিলেন, আমিও প্রিয়তা আপুর মতো এ’ক্সিডেন্ট করেছি কিনা?”
জীবন এবার আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বেচারা প্রীতির তখন জীবনের বুকে পিষ্ট হওয়ার উপক্রম!
“এভাবে বলবেন না প্লিজ! প্রিয়তা আমার হতো বা না হতো, তাতে আমার কোনো আফসোস থাকত না। অন্তত ও বেঁচে থাকত, বছরে কখনো একটু দেখা হতো, কথা হতো, ওকে সুখে সংসার করতে দেখতাম তাও ভালো থাকতাম। ওর এরকম অকাল মৃ’ত্যু আমি কখনো চাইনি। ওকে হারিয়েছি, কিন্তু আমি আপনাকে হারাতে পারব না।”
প্রীতির বুকটা যেন শান্তিতে ভরে গেল। জীবনকে নিয়ে তার সংশয় কেটে গেছে এখন অনেকটা। সে এবার আলতো করে নয়, বরং একটু জোড়ালোভাবেই জীবনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনি চাইলেও আমাকে হারাতে পারবেন না। কারণ আমি কোথাও হারাবোই না আপনাকে ছেড়ে! যেখানেই যাই না কেন, আপনাকে সাথে করেই নিয়ে যাব।”
জীবন এবার প্রীতিকে ছেড়ে কপালে আলতো করে চুমু খেল। প্রীতি লজ্জায় দৃষ্টি নামিয়ে নিল তখন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল,
“আমি আপনার থেকে একটা জিনিস চাই।”
“কী?”
প্রীতি একটু ভেবেচিন্তে বলল,
“কথা দিন, আপনি প্রিয়তা আপুর সার্কেল কিংবা রাহাত ভাইয়া যে কোনো কাউকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন?”
“আর কিছু পেলেন না আজ চাওয়ার মতো?” কিছুটা হতাশ হয়েই বলল জীবন।
“এটুকু করতে পারবেন না আমার জন্য?”
“পারব। কথা দিচ্ছি, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
প্রীতি এবার খুশি হয়ে নিজের থেকেই আলিঙ্গন করে নিল জীবনকে।
প্রীতির নতুন জীবন স্বপ্নের মতো সুন্দর যাচ্ছে। প্রতিটা রাত, সকাল কাটছে আনন্দে। দুজনে মিলে প্ল্যানিং করছে হানিমুনে কোথায় যাওয়া যায়। রিসিপশনের অনুষ্ঠান শেষ করে প্রীতি জীবনকে নিয়ে বাপের বাড়িতে নাইয়রে এসেছে। এখনো যে দুই বাড়ির আত্মীয়ের বাড়িতে কত দাওয়াত বাকি আছে। এত দাওয়াত খেয়ে খেয়েই এক মাস চলে যাবে। হানিমুনটা যে কবে হবে!
প্রীতি যখন এসব নিয়ে খুব আফসোস করছিল, তখন জীবন হেসে বলল,
“আরে এত প্যারা নিচ্ছ কেন? হানিমুন তো এখানেও হচ্ছে প্রতিদিন।”
প্রীতি রাগ দেখিয়ে বলল,
“নির্লজ্জের মতো কথা বলবেন না। আমি কখনো সেভাবে কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি জানেন? ঐবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম আব্বু-আম্মুর হাতে-পায়ে ধরে। কত আকুতি-মিনতি করে। মা সবসময় বলত, বিয়ে করে স্বামীকে নিয়ে যেখানে ইচ্ছে হয় যেও।”
জীবন শব্দ করে হেসে বলল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি মন খারাপ কোরো না। তোমাকে নিয়ে আমি পুরো ওয়ার্ল্ড ট্যুর দেবো।”
“শুকনো কথায় তো চিড়ে ভিজবে না, জনাব। কাজে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। নয়তো জীবনে ঘুরতে যাওয়ার গল্প ঐ একটাই থাকবে।”
“চট্টগ্রাম?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার চট্টগ্রাম যাওয়াই উচিত হয়নি।”
“কেন?”
“চট্টগ্রাম না গেলে তো প্রিয়তার ডায়ারি পেতে না। আর সব সত্য জানার ভূতও তোমার মাথায় চেপে বসত না।”
“আরে আপনি এটা কী বললেন? আপনার তো এটার জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত। এই ডায়ারির জন্যই আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। নয়তো আপনাকেও আমি রিজেক্ট করতাম।”
“কী সাংঘাতিক! তাহলে তিনবার বলছি শুকরিয়া, শুকরিয়া, শুকরিয়া।”
প্রীতি হেসে উঠল। বাইরে থেকে তখন টুম্পার কান্নার শব্দ আসতে লাগল। প্রীতি আর জীবন দুজনই বের হলো রুম থেকে। টয়া টুম্পাকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিল ড্রয়িংরুমে হেঁটে হেঁটে। প্রীতি জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? ও কাঁদছে কেন?”
“আর বোলো না! প্রিয়ম বাজারে গেছে। এখন টুম্পাও যাবে সাথে। ওকে নিয়ে বেচারা বাজার করবে কীভাবে?” বলল টয়া।
প্রীতি টুম্পাকে কোলে নিতে নিতে বলল,
“বড়ো ভাইয়া কোথায়?”
“সে তো সকাল থেকেই বাড়িতে নেই।”
টুম্পা প্রীতির কোলে গিয়েও থামছিল না। জীবন তখন ওকে কোলে নিয়ে বলল,
“চলো মামনি, চাচ্চু ঘুরতে নেয়নি তাতে কী হয়েছে? ফুপা তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। চলো আমরা মজা খেয়ে আসি।”
জীবনের কোলে গিয়ে কান্না একটু থেমেছে টুম্পার। টয়া হেসে বলল,
“একদম ফুপির মতো হয়েছে। সারাক্ষণ মন শুধু ঘুরুঘুরু করে।”
প্রীতি তখন কোমরে দুহাত গুজে বলল,
“কী ব্যাপার ভাবি, তুমি এখানে আমাকে টানতেছ কেন?”
পাশ দিয়ে তখন পারভীন বেগম যাওয়ার সময় বললেন,
“তো ভুল কী বলছে? সত্যিই তো বলছে।”
প্রীতি ধপ করে সোফায় বসে বলল,
“এই বাসার কেউই আমাকে ভালোবাসে না। বিয়ের পর তো মনে হচ্ছে এখন আরো কমে গেছে সবার ভালোবাসা।”
টয়া তখন ওর পাশে বসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বাচ্চা হওয়ার পর বাপের বাড়িতে মেয়েদের ভালোবাসা আরো কমে যায়। তোমারও…”
প্রীতি পুরো কথা না শুনেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ইশ! ছি ভাবি!”
টয়া মুখ চেপে হাসছে। প্রীতি বলল,
“এই যাহ্! উনি বাইরে গেল, আইসক্রিম আনতে বলতাম। দাঁড়াও ফোন দিয়ে বলি। তোমরা কিছু খাবে?”
টয়া বলল,
“উহু!”
“আচ্ছা তাহলে সবার জন্যই আইসক্রিম আনতে বলি।”
প্রীতি ফোন নিয়ে নাম্বার ডায়াল করার আগেই কলিংবেল বেজে উঠল। টয়া হেসে বলল,
“নাও কল দেওয়ার আগেই চলে এসেছে।”
“সমস্যা নেই, আবার পাঠাব দোকানে হুহ্!”
প্রীতি গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলে দেখে জীবন আসেনি। প্রিতম এসেছে। প্রীতি বলল,
“ওহ তুমি!”
প্রিতম ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কাকে আশা করছিলি?”
প্রীতি এবার লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
“আরে কাউকেই না!”
প্রীতি দরজা লাগাতে গেলে প্রিতম বলল,
“খোলাই থাক। প্রিয়ম আসতেছে।”
টয়া পাশ থেকে বলল,
“তো? ও আসলে কি তখন দরজা খোলা যাবে না? মেইন দরজা হাঁট করে খোলা রাখবে নাকি?”
প্রীতি দরজা লাগিয়ে দিল। আর জীবনকেও তখন কল করে বলল আসার সময় সবার জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসতে। ও কলে কথা বলতে বলতেই প্রিয়ম চলে এসেছে। প্রিতম তখন টয়াকে বলল,
“যাও এখন আবার খোলো দরজা।”
“কেন? তুমি পারতেছ না?”
প্রীতি ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আরে কী শুরু করেছ তোমরা? আমি খুলতেছি দরজা।”
প্রিতম বলল,
“থাক আমিই খুলি। পরে আবার নয়তো এটা নিয়ে তোর ভাবি আবার আমার মাথা খাবে।”
টয়া তখন রেগেমেগে বলল,
“কারো দরজা খুলতে হবে না। আমিই যাচ্ছি।”
এরপর তিনজনই গেল একসাথে দরজা খুলতে। দরজা খোলার পর প্রিয়ম ওপাশ থেকে বলল,
“এতক্ষণ লাগে তোমাদের দরজা খুলতে?”
দুজনই কিছু বলতে গিয়ে চুপ হয়ে গেল। প্রিয়মের পাশে তখন আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। প্রিতম তাকে খুব আপ্যায়নের সহিত বলল,
“আসুন, আসুন ভেতরে আসুন।”
তার দুটি চোখ তখন অন্য দুটি চোখে আটকে ছিল। প্রিতম টয়াকে বলল,
“উনি রাহাত। সেদিন যে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম?”
টয়ার মনে পড়ে বলল,
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ২১
“ওহ হ্যাঁ, আসুন ভাইয়া ভেতরে আসুন।”
রাহাত তখনো স্থির। তার দৃষ্টিও স্থির। এক পলকে তাকিয়ে আছে প্রীতির দিকে। প্রীতি এতক্ষণ স্বাভাবিক থাকলেও ‘রাহাত’ নামটা শোনার পর থেকেই সে নিজেও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। উনিই কি তবে সে-ই রাহাত? প্রিয়তার রাহাত? এজন্যই কি সেদিন তাকে দেখে চেনা চেনা লাগছিল?
রাহাতের অস্পষ্ট কণ্ঠ থেকে বের হয়ে এলো,
“প্রিয়!”
