Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯ (২)
মারিয়াম ফুল

বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে পেছনের বাগানে ঢুকতেই স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটি আর বহু বছরের পুরনো পচা পাতার এক বিদঘুটে গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল, শতবর্ষী এক বটগাছ। তার ঝুলে থাকা ঘন ঝুরিগুলো চারপাশ ঘিরে যেন কোনো প্রাচীন, মৌন পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গোধূলির রক্তিম আলো বটগাছের পাতার ফাঁক গলে মেঝের ওপর ঠিকরে পড়ে এক বিষাদময় ছায়া ফেলেছিল।
গাছটার ঠিক বাম পাশটায় এসে মেহেরের পা দুটো আচমকা থমকে গেল।

সেখানে কোনো বাঁধানো কবর নেই, নেই কোনো নামফলক। কেবল চারপাশের অনিয়ন্ত্রিত আগাছার মাঝে ওই নির্দিষ্ট জায়গাটুকুর মাটি কিছুটা দেবে গিয়ে অবহেলায় বসে আছে। বহু বছরের জমে থাকা ঝরা পাতায় ঢেকে থাকলেও স্পষ্ট বোঝা যায় ,একসময়ে এখানে মাটি খোঁড়া হয়েছিল, নিঃশব্দে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল একটি প্রাণ।
মেহেরের হাঁটু দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল, যেন শরীরের সমস্ত ভার এক নিমেষে নিখোঁজ হয়ে গেছে। ধপ করে সে বসে পড়ল স্যাঁতসেঁতে, ভেজা কাদার ওপর। তার কাঁপা কাঁপা আঙুলগুলো শূন্যে কিছুক্ষণ ভেসে থেকে আস্তে করে নেমে এল দেবে যাওয়া মাটিটুকুর ওপর।হাতের তালুতে ভেজা কাদার স্পর্শ লাগতেই বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এসে গলায় আটকে গেল। ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে রইল, অথচ কোনো শব্দ বের হলো না।
পেছন থেকে রুদ্র এসে ঠিক তার কয়েক কদম দূরে থমকে দাঁড়াল।

কিন্তু সেই আচ্ছন্নতা দীর্ঘ হলো না। মেহেরের আকুলতাটুকুই যেন হঠাৎ বাতাসে উবে গেল। চোখের পাপড়িগুলোর দ্রুত কাঁপুনি এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে সেখানে নেমে এল এক অদ্ভুত, পাথুরে স্থিরতা। হাত দুটো এবার কাদার ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোর দিকে বাড়াল সে। খুব ধীর গতিতে, একেকটা করে পাতা সরিয়ে মাটিটুকু পরিষ্কার করতে লাগল। তার নখের ভেতর জমে উঠতে লাগল কালো কাদা।চারপাশটা তখন নিস্তব্ধ। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়া পানির শব্দটুকুও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা অতীতটার ওপরে কোনো উত্তর ছিল না। মেহেরের চোখের কোণে জমে থাকা তরলটুকু চোখের পাতাতেই শুকিয়ে টানটান হয়ে রইল। কিছুক্ষণ সেভাবে হাঁটু মুড়ে বসে থাকার পর সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পুরো শরীরে কোনো তোলপাড় নেই, যান্ত্রিক এক কাঠামোর মতো সোজা হেঁটে এল রুদ্রর দিকে।মেহেরের এই এলোমেলো অবয়ব আর হঠাৎ নেমে আসা অনুভূতিহীন নীরবতা দেখে রুদ্রের বুকের ভেতরটা থমকে গেল। তার চোখের মণিতে জমে থাকা শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রুদ্র বুঝল, এই মুহূর্তে কোনো সান্ত্বনাই যথেষ্ট নয়।
মেহের নিষ্পলক চেয়ে থেকে শুধু শুকনো ঠোঁট দুটো ফাঁক করল, “ক্যাপ্টেন সাহেব…”

উচ্চারণে কোনো ধার ছিল না, ছিল না কোনো আবেগ। পরমুহূর্তেই মেহেরের বাঁধ ভাঙল, কিন্তু কোনো কান্না দিয়ে নয়,সে সোজাসুজি আছড়ে পড়ল রুদ্রর বুকের ওপর। আচমকা এই সম্পূর্ণ ভার সামলাতে না পেরে রুদ্রর পা জোড়া পিছিয়ে গেল দুই ধাপ। মেহের দুই হাতে রুদ্রর কোটের কাপড়ে কামড়ে ধরার মতো শক্ত করে মুঠি বাঁধল। তার ছোট ছোট নিঃশ্বাস গুলো রুদ্রর বুকের জামায় এসে থমকে থমকে আছড়ে পড়ছে।
“আমার… আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে… ক্যাপ্টেন সাহেব! আমি… আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না… কেমন যেন লাগছে আমার… একদম ভালো লাগছে না… কিচ্ছু ভালো লাগছে না আমার…”
রুদ্র কোনো কথা বলল না। হাত দুটো ঝুলিয়ে রেখে সোজা দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি বরফের মতো ঠাণ্ডা, চোয়াল শক্ত। সে মেহেরকে জড়াতে হাত বাড়াল না, বরং আলতো করে নিজের শরীরটা খানিকটা ছাড়িয়ে নিয়ে দু-পা পেছনে সরে গেল। নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট করে নিচু গলায় বলল,”তুমি ঠিকই বলতে, মেহের। আমরা আলাদা কেউ নই। একই রকম।”তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তেতো, শুকনো হাসি ফুটে উঠল।“একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তুমি যেদিকেই দাঁড়াও, মেহের… অন্য পাশে আমি থাকব।”

মেহের সেই কথার অর্থ বোঝার মতো অবস্থায় ছিল না। রুদ্র এক পা সরতেই তার মনে হলো পায়ের নিচের মাটিটাই তলিয়ে যাচ্ছে। সে আবারও রুদ্রর শার্টের কলার আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে গায়ের ওপর ঢলে পড়ল। চোখে কোনো অশ্রু নেই, কেবল গভীর শূন্যতা আর দিশেহারা এক দৃষ্টি।রুদ্রর বুকের জামাটুকু চেপে ধরে নিচু কণ্ঠে বলে উঠল,
“আপনারও কি বুকটা এমন খালি লাগে? আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে… ভীষণ… আপনি কিছু বলছেন না কেন? দেখতে পাচ্ছেন না আমার কষ্ট হচ্ছে…?”
রুদ্রর হাত দুটো এক মুহূর্তের জন্য শূন্যে কেঁপে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই অত্যন্ত ধীর গতিতে সে হাত বাড়াল। মেহেরের মাথার আলগা হয়ে যাওয়া হিজাবটা টেনে কপালে তুলে দিল, কাঁধ থেকে খসে পড়া ওড়নাটা সোজা করে দিতে দিতে নিচু গলায় বলল, “বাড়িতে মাহাদ একা। অনেকক্ষণ হলো আমরা বাইরে… বাড়ি চলো।”
কথাটা কানে পৌঁছাতেই মেহেরের হাত আলগা হয়ে এল। সে মাথা তুলে পেছনে তাকাল।কবরটার দিকে আবার চোখ গেল তার। হাত দুটো তখনো রুদ্রের শার্টের বোতামে আটকে আছে। সে ধীরে ধীরে রুদ্রের দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ… মাহাদ একা আছে তো… বাড়ি যাব। মাহাদের কাছে নিয়ে যান আমাকে…”
কথাগুলো স্বাভাবিক মানুষের মতো উচ্চারণ করলেও তার চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ স্থির। হাত দুটি সরিয়ে নিয়ে সে এক পা এক পা করে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। তারপর আর একবারের জন্যও রমণী পেছন ফিরে তাকাল না। না অন্তু’র উঁচু হয়ে থাকা কবরটার দিকে, না রুদ্রের নিষ্পাপ চোখ দুটোর দিকে।শুধু ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর রুদ্র এসে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে বসল।
গাড়ির চারপাশ ঘিরে তখন গোধূলির ঠান্ডা আলো-ছায়ায় ঢাকা পরিবেশ। পশ্চিম আকাশে রক্তের মতো লাল রংটুকু মিলিয়ে গিয়ে একটা ধূসর আবছা আলো ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে। আঁকাবাঁকা পাকা রাস্তা ধরে গাড়িটি ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে। দু-পাশের গাছপালা আর ফাঁকা মাঠগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে এতই চুপচাপ যে, ইঞ্জিনের হালকা শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। পাশাপাশি দুজন মানুষ বসে থাকলেও কারও মুখেই কোনো কথা নেই।

মেহের সিটে পিঠ ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। তার চেহারায় এখন আর কোনো দুর্বলতা বা আবেগের চাপ নেই….তার বদলে এসেছে এক ধরনের ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষা মানুষের স্পষ্ট স্থিরতা। সে পাশে রাখা বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেল। গলার শুকিয়ে যাওয়া ভাবটা কাটার পর এসি-র তাপমাত্রাটা একটু কমিয়ে দিল।
রুদ্র শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে সামনের ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। লুকিং গ্লাসে চোখের কোণ দিয়ে মেহেরের এই রূপান্তরটা সে একবার দেখে নিল। মেহেরের ভেতরে চলা ঝড় রুদ্র ঠিকই বুঝতে পারছে, কিন্তু এই শান্ত পরিবেশ নষ্ট না করতেই সে নিজে থেকে কোনো প্রশ্ন করল না।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে মেহের নিজেই কথা বলে উঠল। তার গলার স্বর নিচু, কিন্তু ভীষণ পরিষ্কার আর স্থির “জানেন… ওই জানোয়ারটাকে আমিই জেলে রাখার ব্যবস্থা করেছি।”
রুদ্রর বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না যে মেহের কার কথা বলছে। রুদ্র বুঝতে পারল, মেহেরের মনে এতদিন ধরে চেপে রাখা জটগুলো সে এবার খুলতে চায়। তাকে কথা বলার সুযোগ করে দিতেই রুদ্র গাড়ি চালানোয় চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে?”

মেহের একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। তার নিশ্বাসের গতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। সে বলতে শুরু করল, “২ তারিখ… মেঘলা আমাকে জানাল, বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বাড়ির সবাই বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ব্যস্ত। স্বাভাবিকভাবেই ওই সময় বাড়িতে কেউ ছিল না।
হাসপাতালে মানুষের আসা-যাওয়া থাকায় সায়েদ বাড়িটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা ছিল। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিল মেঘলা। ”
রুদ্র গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে আড়চোখে তাকাল, “মেঘলা?”

“মেঘলা আমার মেজো ভাইয়ের বউ,” মেহের মেপে মেপে স্বাভাবিক গলায় বলল, “সেদিন সন্ধ্যার দিকে মেঘলা হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসেছিল কিছু দরকারি কাগজের বাহানায়। সায়েদ মির্জাও তখন বাড়িতেই ছিল। সে ভেবেছিল বাড়িতে কেউ নেই, সেই সুযোগে নিজের অবৈধ মালামাল বাড়িতে এনে ঢোকায়। মির্জা যে এসব অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তা সায়েদ বাড়িতে সবাই কমবেশি জানত,পুলিশের তাড়া খাওয়াও তার জন্য নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু ওই রাতে মেঘলা নিজের চোখে দেখে ফেলে যে গোপনে বাড়িতে কিছু আনা হচ্ছে।মেঘলার সন্দেহ হতে লাগল। বাড়ির প্রয়োজনীয় কোনো জিনিসপত্র হলে সেগুলো এভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে গুদাম ঘরে রাখার কোনো কারণই নেই। নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কোনো ব্যাপার আছে। কিন্তু কী? রাত দুটো বাজলে মেঘলা সাহস করে গুদামঘরে যায়, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেঘলার চোখের সামনেই মালামালগুলো ঘরে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। অথচ কিছুক্ষণ পর মেঘলা যখন সেই ঘরে গেল, সেখানে কিছুই ছিল না।”

মেহের একটু থামল, ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটল, “মেঘলা তখন আমাকে ফোন করে খুব ভয় পেয়ে বলল যে, তার চোখের সামনে জিনিসগুলো আনা হলো, অথচ গুদামঘরে কোথাও কিছু পাওয়া যাচ্ছে না! আমি তাকে বললাম হাল ছেড়ো না। আমার একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল, মির্জা জিনিসগুলো এমন জায়গায় রাখবে যেখানে হুট করে কেউ খুঁজতে যাবে না। অতি-চালাক লোকেরা সবসময় তাদের সবচেয়ে গোপন জিনিসগুলো চোখের সামনেই রাখে, যেখানে সহজে কারও নজর পড়ে না। যে ঘরটায় কারও ঢোকার নিয়ম নেই, যা তার নিজের ব্যক্তিগত জায়গা ,সেটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য জায়গা। তাই আমি মেঘলাকে বলেছিলাম, গুদামঘর খোঁজা ভুল, তুই সোজা মির্জার ঘরে গিয়ে দেখ। কারণ আমি জানতাম, নিজের হাতের বাইরে জিনিসগুলো সে কিছুতেই রাখবে না।”
রুদ্র চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। মেহের যেভাবে মানুষের মন বিশ্লেষণ করছে, তা দেখে সে মনে মনে অবাক হলো।
মেহের বলতে লাগল, “আমি মেঘলাকে আরও বলেছিলাম সরাসরি কিছু না পেলেও ঘরটা যেন ভালো করে খুঁজে দেখে। মেজো ভাইয়া ততক্ষণে হাসপাতাল থেকে ফিরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরটার একটা বাড়তি চাবি মেঘলার কাছে আগেই ছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকে খোঁজাখুঁজি করেও যখন কিছু পাওয়া গেল না, মেঘলা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিল। ঠিক তখনই দেয়ালের বইয়ের তাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মেঘলার হাত থেকে চাবিটা নিচে পড়ে যায়। চাবিটা তুলতে গিয়ে সে দেখে, কাঠের প্যানেলের নিচের ছোট একটা ফাঁক দিয়ে সামান্য আলোর রেখা আসছে। তখনই বোঝা গেল বইয়ের তাকের পেছনেই গোপন একটা ঘর আছে… তবে ঝুঁকি কিন্তু পুরোটাই ছিল। একটা ভুল চাল হলেই সব ভেস্তে যেত।”

গাড়ি চালাতে চালাতে রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “যদি ওই সময় মেজো ভাই জেগে যেত? বা মির্জা নিজে চলে আসত?”
“সেটা বেশ বড় ঝুঁকি ছিল, মেজো ভাইয়া জেগে উঠলে মেঘলার প্ল্যান ছিল বাবার প্রেসারের দরকারি ফাইল খোঁজার বাহানা দিয়ে কেটে পড়া, আর আমি তাকে বলেছিলাম ,পরিস্থিতি খারাপ দেখলে প্রমাণ খোঁজার চিন্তা ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে সরে আসতে। আর মির্জা যদি চলে আসত, তবে মেঘলার একটাই কাজ ছিল,বারান্দার ড্রপ-বোল্টটা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া। ভাগ্য ভালো, মেজো ভাইয়া ওঠেনি। মেঘলার হাতে সময়ও কম ছিল। ওই বাক্সগুলো মির্জার ঘর থেকে না সরালে সকালে মির্জা এসে সেগুলো সরিয়ে নিয়ে যেত। প্রমাণ এতটা কাছে এসেও হাতছাড়া করার কোনো মানে হয় না। তাই…ঘরের জিনিসগুলো আপাতত খালি গুদামঘরে সরিয়ে রেখেছিল।গুদাম করে রাখারও একটা কারণ ছিল। মির্জার সকালে হাসপাতালে চলে যাওয়ার কথা ছিল। তার মধ্যে মেঘলা ধরা পড়ে গেলেও অন্তত তার ওপর সন্দেহ আসত না।
তারপর বিকেলে খবর এলো, বাবা মারা গেছেন। তখন প্লেনে বসেই আমার মাথায় এলো…ওগুলো গুদামঘরে রেখে যাওয়া নিরাপদ নয়। যেহেতু বাবা সকালে মারা গেছেন, তার মানে… সবাই হাসপাতালে চলে যাবে।তাহলে তখনও ওই জিনিসগুলো গুদামঘরেই থাকার কথা।

তাই আপনাদের লিভিং এরিয়াতে রেখে নিজের ঘরে যাওয়ার কথা বলে তালা ভেঙে ওগুলো উদ্ধার করি। তারপর আবার মির্জার রুমে রেখে পুলিশ অফিসার নির্ণয়কে খবর দিই।”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেহেরের কথাগুলো মেলাতে চেষ্টা করল। তারপর শুধাল, “আর শিকদার কোম্পানির সঙ্গে তার যে যোগসাজশ ছিল? সেটা কীভাবে জানলে?”
মেহেরের চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠল, “আমি শিকদার কোম্পানিকে চিনতাম না। তবে সায়েদ বাড়ির মেয়ে হিসেবে জানতাম মির্জা ওই জমিটা পাওয়ার জন্য মরিয়া ছিল। যখন শুনলাম পুলিশ শুধু অবৈধ মালামালের মামলা দিচ্ছে, তখন আমার হিসাব পরিষ্কার ছিল—
শুধু এসব মদের বা অবৈধ মালামালের মামলায় মির্জাকে তার ক্ষমতার জোরে দ্রুত জামিনে বের করে আনা যাবে। কেসটাকে শক্ত করতে হলে বড় অঙ্কের আর্থিক অপরাধের প্রমাণ দরকার। তাই মায়ের ঘরের লকার থেকে মির্জার গোপন ফাইলের দলিলগুলো সরাই। সেখানে শুধু জমির কাগজ ছিল না, ছিল মির্জার সই করা একটা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি …যা সরাসরি প্রমাণ করে যে জমি দখলের পেছনে বেনামী কোম্পানিটা আসলে মির্জার নিজেরই। সেই কাগজটা সরাসরি পুলিশ অফিসার নির্ণয়ের হাতে পৌঁছাতেই আদালতের কাছে তার জামিনের আর কোনো সুযোগ ছিল না।”

পুরো সত্যটা বলা শেষ করে মেহের একটা হালকা নিশ্বাস ফেলল। দীর্ঘদিনের চেপে রাখা রাগ আর যন্ত্রণা যেন এখন তার ভেতরে একটা শান্ত ভাব এনে দিয়েছে।আমি কিংবা মেঘলা, কেউই বুঝতে পারিনি সবকিছু এত দ্রুত এভাবে ঘটে যাবে। ওই দিনই যে মির্জা এভাবে ধরা পড়ে যাবে, সেটাও আমাদের ধারণার বাইরে ছিল। কিন্তু সেদিন ভাগ্যটা যেন কোনোভাবে আমাদের পক্ষেই ছিল।ওই দিনটা ছাড়া আমি আর কখনো সেই বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেতাম কি না, কে জানে! তার ওপর সামনে ছিল দেশ ছাড়ার তাড়া। সময়ও যেন হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, এখন আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।যা হওয়ার হবে।
ঠিক তখনই গাড়িটি এসে থামল চৌধুরী বাড়ির বড় গেটের সামনে।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯

রুদ্র গাড়ি থামিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল। মেহেরের চেহারায় এখন আর কোনো ভেঙে পড়ার চিহ্ন নেই। রুদ্র মনে মনে বলে উঠল, ‘মিস অ্যারোফোবিয়া এমনভাবে চাল চেলে পাশা উল্টে দিল যে প্রতিপক্ষ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না… উফ, রুদ্র! এই মেয়ে যদি টের পায় যে তুই তাকে না জানিয়ে আরেকটা দলিল নিজের নামে করিয়ে নিয়েছিস, তবে তোর কপালেও শনি আছে!’
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতেই মেহের আর রুদ্র দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। গোধূলির আলোটুকু একেবারে মিলিয়ে গিয়ে রাতের আবছা অন্ধকার তখন চৌধুরী বাড়িকে ঘিরে ধরতে শুরু করেছে।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫০

বাকি পর্ব গুলো পড়তে প্লেস্টোর থেকে রোমান্টিক গল্প অ্যাপ ইন্সটল করুন অথবা এই লেখাতে ক্লিক করুন বাকি পর্ব গুলো সেখানেই দেওয়া হবে আপনাদের যদি সমস্যা হয় যে এখানে পরবো তাহলে সেটাও জানাবেন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here