Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৬ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৬ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৬ (২)
সাইদা মুন

ফারিন গ্রাউনের নিচের অংশটা দুহাতে একটু উঁচু করে ধরে স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। স্টেজে তালহা আর মেহরীন বসে আছে। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর আচমকাই থেমে গেল সে। কী মনে করে যেন কয়েক কদম পিছিয়ে বাম পাশে তাকাতেই চোখে পড়ল রাফিকে। এত ভিড়ের মাঝে ছেলেটা একা চুপচাপ এক কোণে বসে আছে দেখে ফারিন বেশ অবাক হলো। রাফি তো এমন চুপচাপ থাকার মানুষই নয়। কপাল কুঁচকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তার দিকে। রাফি তখন মনোযোগ দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে কী যেন দেখছিল।
ফারিন সামনে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল,

—কিরে, এভাবে একা বসে আছিস কেন?
রাফি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। তপ্ত একটা শ্বাস ফেলে মনমরা গলায় বলল,
—আজকে আমার মন ভালো নেই।
ফারিনের কপাল আরও কুঁচকে গেল,
—কেন?
রাফি আবার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এক্স আনব্লক করছে। পুরোনো টেক্সগুলো দেখে বড্ড মনে পড়তেছে।
ফারিন সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে এলো,
—তো কল দে কথা বল।
রাফি মুখ ভেংচে বলল,
—এহহ ভুলেও না আমার একটা প্রেস্টিজ আছে না।
ফারিন মোবাইলের দিকে উঁকি মেরে বলল,
—দেখি।
রাফি চ্যাট লিস্ট দেখানোর জন্য মোবাইলটা ফারিনের দিকে এগিয়ে ধরতেই ফারিন এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সোজা কল অপশনে চাপ দিয়ে দিল। তারপর দিল ভোঁ দৌড়। কল করা হয়ে গেছে বুঝতে পেরে রাফি লাফ দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

—আস্তাগফিরুল্লাহ, আইজরাইলরে কল দিছস কেন। ফারিনের বাচ্চায়ায়ায়ায়া…
বলেই হকচকিয়ে কোনদিক যাবে না যাবে, মোবাইলটা কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতেই হাত থেকে ঝটকা মেরে নিচে ফেলে সেও উল্টো দিকে দৌড় দিল সে। এদিকে রিং হতে থাকা মোবাইলটা ঘাসের ওপর পড়ে রইল। একবার…দুবার…তিনবার… রিং হতেই অবশেষে ওপাশ থেকে কেউ কলটা ধরল। ঠিক তখনই রাফা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠে ভেসে আসল তার কানে,
—হ্যালো… হ্যালো…
শুনে থেমে গেল সে। চারপাশে তাকিয়ে কণ্ঠের উৎস খুঁজতে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা মোবাইলটা দেখতে পেল। কৌতূহল নিয়ে সেটা তুলে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে আবার ভেসে এলো,
—হ্যালো বেবি, শুনতে পাচ্ছো না?
রাফা বড় বড় চোখ করে একবার মোবাইলটার দিকে তাকাল। তারপর আবার কানে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—হ্যালো.. কে আপনি?
ব্যস! এতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল। মেয়েলি ন্যাকা কণ্ঠটা মুহূর্তেই বদলে গেল। রাগে চিৎকার করে উঠল,
—শালা চিটার। আমি জানতাম তুই কোনোদিন ভালো হবি না। নতুন গফও জুটিয়ে ফেলছিস? আর খালি একবার আমারে কল দিস, বংশের বাত্তি নিভাই দিব, শালা।
রাফা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওপাশ থেকে ধাম করে কল কেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ব্লকও। রাফা ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহূর্ত মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই যেন তার মাথায় ঢুকছে না। এরমধ্যেই রাফি আবার ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

—কল ধরেছিল?
রাফা তখনও হতভম্ব। অবাক চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। রাফি জিজ্ঞেস করতেই বলল,
—কল ধরে বলেছে, শালা চিটার, বংশের বাত্তি নিভাই দেব আর একবার কল করলে। তারপর ব্লক করে দিল।
রাফির মুখ মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাঁটু একত্র করে মিইয়ে গেল সে। আমতা আমতা করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
—যা শুনেছ, ভুলে যেও। কাউকে বলবে না কিন্তু।
বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। আবার ছুটতে ছুটতে কিছুটা দূর গিয়ে থেমে পেছন ফিরে সাবধান করে বলল,
—ভুলেও কাউকে বলবে না কিন্তু।
রাফা তার চলে যাওয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কাহিনিটা কী, সেটা বুঝতে বুঝতেই হঠাৎ তার মাথায় এল, সে এখানে কী করতে এসেছিল। মাথা চুলকাতে চুলকাতে একবার পেছনে, আবার সামনে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—আমি কোথায় যেন যাচ্ছিলাম? উফফ মনে পড়ছে না তো। আমি এখানে কেন আসলাম? আম্মু কেন যেন পাঠালো? ধ্যাত আবার গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে।
বলেই সে আবার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। যেতে যেতে রাফিকে ইচ্ছেমতো বকতে লাগল। ব্যাটার জন্যই তার এতক্ষণে আসল কাজটাই মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।

তনিমাও আজ নীল রঙের গাউন পরেছে। বান্ধবীদের খুঁজতে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হতে যাবে, অমনি তাহসানের মায়ের ডাকে থেমে গেল। হবু শাশুড়ির ডাক শুনে কিছুটা চমকে গেল সে। তাড়াতাড়ি ওড়নাটা ঠিকঠাক করে ভদ্র হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়েই সালাম দিল। তিনিও মিষ্টি হেসে সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
—কাউকে খুঁজছো?
—জ্বি, তাহিয়াদের খুঁজছিলাম।
—তাহিয়াকে তো স্টেজের পাশেই দেখে আসলাম।
—ওহ, আচ্ছা আন্টি।
—আচ্ছা শোনো, ওই যে একটা মেয়ে দেখছো..
বলেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ সুন্দর দেখতে একটি মেয়ের দিকে ইশারা করলেন। তনিমা কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকাল। তিনি পরপর বললেন,
—তুমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলে দেখবে, মেয়েটা কেমন?
তনিমা আমতা আমতা করে বলল,
—জ্বি, অবশ্যই আন্টি। কিন্তু কথা বলব কোন উদ্দেশ্যে, সেটা যদি একটু বলতেন…
তিনি এবার প্রশস্ত হেসে বললেন,
—আসলে মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি সোজাসুজি গিয়ে কথা বললে কেমন দেখায় না? তাই আগে কাউকে দিয়ে একটু কথা বলিয়ে বুঝে নিই, মেয়েটা কেমন। তাহিয়া কাজে আছে, তাই তোমাকেই পাঠাচ্ছি। কিছু মনে করোনি তো মা?
তনিমা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল তাহসানের মায়ের দিকে। মনে একরাশ ভয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—আন্টি, কিছু মনে না করলে বলবেন কার জন্য পাত্রী দেখছেন?
তিনি আরও হাসিমুখে বললেন,
—আমার তাহসানটার জন্য। তালহারও বিয়ে হয়ে গেল, এবার আমার ছেলেটার একটা দিক লাগাতে হবে তো। সে তো বিয়ের কথা কানেই তোলে না। তাই আমিই এবার সব ঠিকঠাক করব।
তনিমার মুখটা মুহূর্তেই লটকে গেল। তার হবু শাশুড়ি কিনা তার হবু জামাইয়ের জন্য তাকে দিয়ে পাত্রী খুঁজাচ্ছেন। মুহূর্তেই যেন মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অসহায় চোখে উনার দিকে তাকিয়ে রইল তনিমা। তিনি নরম সুরে বললেন,
—কথা বলতে একটু যাবে?
তনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন মুখে বলল,
—আচ্ছা আন্টি..
হতাশ হয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে। আর তাহসানের মা-ও তার ওপর ভরসা রেখে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। তনিমা কিছুদূর যেতেই পথিমধ্যে তাহসানকে দেখতে পেল। মোবাইলে কথা বলতে বলতে এদিকেই এগিয়ে আসছে সে। একপলক তাকিয়েই তনিমা তাকে ইগনোর করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তা দেখে তাহসান সেখানেই থেমে গেল। বড্ড আশ্চর্য হলো সে। তনিমা তাকে ইগনোর করে চলে গেল? যে মেয়েটা তাকে দেখলেই অন্তত একটা হলেও খোঁচা মেরে কথা বলে, নয়তো মুচকি একটা হাসি দেয়, সে আজ এভাবে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল? ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ঠেকল না তার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে দিয়ে তনিমার পিছু নিল।

—তনিমা…
তনিমা থেমে গেল। পেছন ফিরে তাকাতেই তাহসান তার মনমরা চেহারাটা দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—Any problem?
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
—মা পাঠায় পাত্রী দেখতে আর ছেলে জিগায়, Any problem, সরেন।
বলেই রাগ দেখিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তাহসান কিছুক্ষণ কপাল কুঁচকে তনিমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার রাগের কারণ ঠিক বুঝলো না। তার মা আবার কী বলেছে তনিমাকে? ভাবতে ভাবতেই মায়ের দিকে এগিয়ে গেল সে। কয়েকজন মহিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। তাহসান তাকে ডেকে একটু আড়ালে নিয়ে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
—আম্মু, তনিমাকে কিছু বলেছো?
—তনিমা?
—হ্যাঁ, তাহিয়ার ফ্রেন্ড, আমার স্টুডেন্ট।
তিনি একটু ভেবে বললেন,
—ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ, তাকে পাঠালাম একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে।
—কেন? কী কথা বলতে?
তিনি মুচকি হেসে দেখিয়ে বললেন,
—ওই মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি ডিরেক্ট গিয়ে কথা বললে কেমন দেখায় না? তাই আগে একটু ওরে দিয়ে কথা বলিয়ে দেখি, মেয়েটা কেমন।
তাহসান হতাশ চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আর মানুষ পেলে না?
ছেলের কথায় তিনি কপাল কুঁচকে তাকালেন,

—কেন? কী হয়েছে?
—কিছু না। তুমি আবার শুরু করেছ এসব।
—তো কী করব? ছেলে আমার বিয়ের নামই নিচ্ছে না। তাই আমিই এখন ব্যবস্থা করব।
—আম্মু, আমি এখন বিয়ে করব না।
—তো কবে করবি? বুড়ো বয়সে? ঊনত্রিশ হয়ে গেছিস, কদিন পর ত্রিশে পড়বি। কোন মেয়ে তোর মতো বুড়োর কাছে বিয়ে বসবে, শুনি? আমি জানি না, আমার ওই মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলব।
তাহসান কপালে হাত বুলিয়ে হতাশ গলায় ইনিয়েবিনিয়ে বলল,
—আম্মু, আমার পছন্দ আছে।
ছেলের কথায় তিনি বড় বড় চোখ করে তাকালেন। যেন তিনি আশ্চর্যজনক কিছু শুনলেন। পরমুহূর্তেই মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল হরবরিয়ে বলতে লাগলেন,
—কীইই! এই কথা আগে বলবি না? কাকে পছন্দ? কে সেই মেয়ে? আম্মুকে বল, আমি কথা বলছি।
তাহসান মাকে থামিয়ে বলল,

—এখন না আম্মু। তালহার বিয়েটা শেষ হোক, তারপর যা করার করো। আপাতত এসব বাদ দাও।
বলেই চলে যেতে নিল সে। পেছন থেকে মা আবার ডাকলেন,
—কে সেই মেয়ে, সেটা তো বলে যা।
তাহসান আর পেছনে ফিরল না। হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
—মাত্রই আমার পছন্দের মেয়েকে দিয়ে তুমি তোমার পছন্দের মেয়েকে টেস্ট করতে পাঠালে।
কথাটা বলেই একটা ইঙ্গিত দিয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল সে। ছেলে চোখের আড়াল হতেই তাহসানের মা কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ উনারও চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ধীরে ধীরে দৃষ্টি গিয়ে থামল তনিমার দিকে। মেয়েটা এই মুহূর্তে ওই মেয়েটার সঙ্গেই কথা বলছে। ছেলের কথার অর্থ বুঝতে তার আর বেশি সময় লাগল না। মুহূর্তেই মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল তার। তবে তার ছেলে আটকেছে এখানেই। তিনি কপালে হাত দিলেন, সামনে এত সুন্দর একটা পাত্রী রেখে তিনি কিনা এতক্ষণ মেয়ে খুঁজছিলেন। তাকে।চোখেই পড়ল না। নিজের বোকামিতে মৃদু হেসে ফেললেন তিনি।

টানা কয়েকদিনের বিয়ের ঝামেলা অবশেষে আজ গিয়ে শেষ হলো। খাওয়া-দাওয়ার পালা শেষ হতেই একে একে মেহমানরাও বিদায় নিতে শুরু করেছেন। দুপুর গড়িয়ে এখন প্রায় চারটা। সিকদার পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া শেষ করে উঠেছে কেবল। তালহা হাত ধুতে গেছে। মেহরীনও নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। আজ তাকে নিজ হাতে খেতে হয়নি। এমনকি গত তিনদিন ধরে তালহাই তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। নিজের শাড়িটা সামলে নিয়ে তাহিয়া-তনিমাদের সঙ্গে বাড়ির দিকে যেতে নিতেই আচমকা কোথা থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছুটে এল তার দিকে। হঠাৎ ছুটে আসায় মেহরীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটা এসে ধাক্কা খেল তার সঙ্গে। ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই মেঝেতে পড়ে গেল বাচ্চাটি। পরমুহূর্তেই চারপাশ কাঁপিয়ে কান্না জুড়ে দিল সে। তাহিয়া দ্রুত তাকে উঠাতে এগিয়ে যেতেই ছেলেটার মা তেড়ে এলেন। নিজের ছেলেকে টেনে তুলে কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে মেহরীনের দিকে রাগে চোখ রাঙিয়ে বললেন,

—কানা নাকি? চোখে দেখো না? দেখে চলতে পারো না? দিলে তো আমার বাচ্চাটাকে ব্যথা পাইয়ে।
মেহরীন হকচকিয়ে গেল। এমন আচমকা কথা শুনে কী বলবে, বুঝে উঠতে পারল না। সে তো দেখেনি বাচ্চাটাকে, বাচ্চাটাই আচমকা এল। এদিকে উনার চেচামেচিতে দ্রুত এগিয়ে এলেন তিতলি বেগম, সালমা বেগম আর তালহার বড় মামি। মেহরীন আমতা আমতা করে সরি বলতে যাবে, তার আগেই পেছন থেকে ভেসে এল তালহার মোটা, গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
—মুখ সামলে কথা বলবেন আন্টি। আমার ওয়াইফের সঙ্গে গলা উঁচু করে কথা বলার অধিকার আমি আমার পরিবারকেও দিইনি। সেখানে আপনি কোন সাহসে এভাবে কথা বলছেন?
মেহরীন থতমত মুখে তালহার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা চেপে ধরে চোখের ইশারায় তাকে থামতে বলল। কিন্তু তালহা সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। বরং মেহরীনের সামনে এসে শক্ত হয়ে দাঁড়াল সে। মহিলাটি ছেলের কাপড় থেকে ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে ফুঁসতে ফুঁসতে তিতলি বেগমের দিকে তাকালেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিতলি বেগম ছেলের দিকে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
—তালহা, তোমার আন্টি হয়। এভাবে কথা বলছ কেন?
তালহা মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে আবার মহিলাটির দিকে ফিরল,
—সরি, বাট আই বিলিভ ইন, গিভ রেসপেক্ট, টেক রেসপেক্ট। আপনি আমার স্ত্রীকে অসম্মান করেছেন, তাই আমিও আপনাকে সম্মান দিতে ব্যর্থ হলাম।
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। মেহরীনের হাত ধরে তাকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। তালহার এমন আচরণে মহিলার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। ফুঁসতে ফুঁসতে তিতলি বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—দেখছেন ভাবি? বিয়ে হতে না হতেই বউভক্ত হয়ে গেছে। কদিন পর তো আপনাদের সঙ্গেও..
কথা শেষ করার আগেই সালমা বেগম হেসে হেসে বলে উঠলেন,
—ভাবি আপনি যেভাবে রিয়াক্ট করেছেন, আমার ছেলের জায়গায় আমি থাকলেও ঠিক এমনটাই করতাম। তাছাড়া সিকদার বাড়ির সকল কর্তারা মাশাআল্লাহ বউভক্তই, তাই তো তাদের এত উন্নতি। তাহলে আমাদের ছেলে কেন বউভক্ত হবে না? আপনি যাকে বউভক্ত বলছেন ইসলামে তাকে শ্রেষ্ঠ স্বামী বলে। আমাদের ছেলের এসব কাজকর্মে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, বরং আমরা আরও খুশি বাপ-চাচার পরম্পরা বজায় রাখছে।
শেষ কথাটা বলেই মুখটা একটু ভেংচিয়ে হাসতে হাসতেই সেখান থেকে চলে গেলেন তিনি। মহিলাটিকে মিষ্টি কথার অপমানে আরও রেগে গেলেন। দাঁড়িয়ে রইলেন তিতলি বেগম, ছেলের এমন কাণ্ড, তার ওপর জায়ের মুখের ওপর এমন জবাব, সব মিলিয়ে তিনি বেশ নড়বড়ে হয়ে গেলেন। পরিস্থিতি সামলাতে তারপর মহিলাটির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—ওদের কথায় কিছু মনে করবেন না।
এরপর বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নেহের সুরে বললেন,
—বাবু, দুষ্টুমি করো না।
বলেই ভাইয়ের বউকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে সরে গেলেন তিনিও। এদিকে এতক্ষণ চুপ করে থাকা মহিলার রাগ গিয়ে পড়ল এবার নিজের ছেলের ওপর ঝারতে লাগলেন,
—তোর জন্য আজ এত বড় অপমান করলো। এত শয়তানি করিস কেন? আজ বাসায় চল খালি, তোর বাপেরে আর তোরে দেখে নেব।
ফুঁসতে ফুঁসতে ছেলেকে নিয়ে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন।

সন্ধ্যা সাতটা। সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছেন। বাড়িতে এখন খুব কাছের মানুষজন ছাড়া বাকিরা সবাই চলে গেছে। ফারিনরাও বিদায় নিয়েছে। রয়ে গেছে শুধু তনিমা, ফাইজার সঙ্গে। ফাইজা আরও দুদিন থাকবে, তাই ভাবির সঙ্গ দিতে তনিমাও রয়ে গেল। ফারিন আর রাফিকে অনেক বলে-কয়েও রাখা গেল না, টানা চারদিন থাকার পর বাড়ি থেকে জরুরি তলব এসেছে, আজই ফিরতে হবে তাদের।
নাস্তা খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ তনিমার ফোনে একটা কল এলো। সে ফোনটা কানে নিয়ে হালকা সরে গেল সেখান থেকে। সবাই নিজেদের গল্পে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টায় কেউ আলাদা করে খেয়াল করল না। তনিমা কথা বলতে বলতে দোতলায় উঠল, তবে নিজের রুমে না গিয়ে সোজা ছাদের দিকে পা বাড়াল। পুরো ব্যাপারটা এতক্ষণ দূর থেকে লক্ষ্য করছিল তাহসান। মুহূর্তেই তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কে এমন ফোন করল যে কথা বলতে বলতে একদম ছাদে যেতে হচ্ছে? চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। আর বসে থাকতে না পেরে, কল রিসিভ করার বাহানা তুলে সেও চলল তনিমার পিছু পিছু।
ছাদে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াল তাহসান। তনিমার খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ওপাশের মানুষের কথা শুনে সে যেন হেসে গড়াচ্ছে। তা দেখে তাহসানের চোখমুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। কার কথায় এত হাসি? শুনতে সে আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। একদম পেছনে এসে দাঁড়ানোর পরও তনিমা টের পেল না। এতে তাহসান আরও গম্ভীর হয়ে গলা খাঁকারি দিল। এবার গিয়ে ধ্যান ভাঙল তনিমার। কথা বলতে বলতেই পেছন ফিরে তাহসানকে দেখে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,

—আপনি এখানে?
তাহসান পকেটে হাত ঢুকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
—একই প্রশ্ন আমারও। তুমি এখানে কী করছ?
তনিমা ফোনটা কান থেকে নামিয়ে সহজ গলায় বলল,
—কথা বলছিলাম।
তাহসান সরু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কার সাথে?
—ফ্রেন্ডের সাথে।
—তা এত হাসাহাসি করার কী হলো?
তনিমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—ফানি লেগেছে, তাই হেসেছি।
তাহসান এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে বলল,
—ওহ, তা কেমন ফ্রেন্ড?
তনিমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। বুঝতে চেষ্টা করল লোকটার সমস্যাটা কোথায়। হঠাৎ পিছু পিছু এসে এত খোঁজখবর নেওয়ার মানে কী? ভাবতে ভাবতেই বলল,

—আমার স্কুল ফ্রেন্ড।
—নাম কী?
—চিনবেন না।
—চিনি আর না চিনি, নাম বললে সমস্যা কোথায়?
তনিমা কলটা কেটে দিয়ে কোমরে দুহাত দিয়ে দাঁড়াল,
—আপনি নাম শুনে কী করবেন?
তাহসান পকেট থেকে হাত বের করে বুকে গুজে বলল,
—কিছু না, এমনি জানতে চাইলাম।
তনিমা খানিক ভেবে শক্ত গলায় বলল,
—কিন্তু আমি বলব না।
তাহসান অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল,
—কেন বলবে না? নাম বললে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে, আজব।
তাকে নাম শুনতে এত ব্যাকুল হতে দেখে তনিমা পাল্টা বলল,
—আজব তো আপনি। নাম শোনার জন্য এত উতলা হচ্ছেন কেন?
—কারণ আমি শুনব।
—আমি বলব না।

তাহসান আর কথা না বাড়িয়ে ছোঁ মেরে হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,
—তাহলে ফোনের লক বলো, আমি নিজেই দেখে নিচ্ছি।
ফোন নিতেই তনিমা ছটফট করে এগিয়ে এলো। তাহসানের হাত থেকে নিজের ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,
—আরে, দেন বলছি আমার ফোন। আপনার হয়েছেটা কী?
তনিমা ডান দিক থেকে নিতে গেলে তাহসান বাঁয়ে সরিয়ে নিচ্ছে, বাঁ দিক থেকে চেষ্টা করলে ডানে। টানাটানি করতে করতে শেষে ফোনটা একদম উঁচুতে তুলে ধরল সে। তনিমা লাফাতে লাফাতে বলল,
—কী অদ্ভুত। আপনাকে ভূতে ধরেছে নাকি? হঠাৎ এমন করছেন কেন, ফোনটা দিন।
—তো বলছ না কেন, ছেলে না মেয়ে ফ্রেন্ড?
তনিমা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

—ছেলে না মেয়ে, তা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন?
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তাহসান এক হাতে তনিমার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। এক টানে নিজের একদম কাছে এনে ফেলল। চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
—আমার বউয়ের একাধিক ছেলে ফ্রেন্ড আমি সহ্য করব না।
তনিমার ছটফটানি মুহূর্তে উবে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে সে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল তাহসানের দিকে। কথার অর্থ মাথায় ঢুকতে বেশ কিছুটা সময় লাগল তার। তনিমাকে বাকরুদ্ধ দেখে তাহসান ওভাবেই ধরে রেখে ফোনটা অন করে জিজ্ঞেস করল,
—লক কী?
তনিমা তখন একদম ভিজে বিড়াল। জীবনে প্রথমবার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বেচারি। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে কাঁপছে যেন, নিজের ওপর যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রশ্নের মুখে ঘাবড়ে গিয়ে হুট করে বলে ফেলল,

—তাহসান।
তাহসান চোখ কুঁচকে চাইল,
—কীই?
তনিমা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল। গাল দুটো আস্তে আস্তে রক্তিম হয়ে উঠছে। নিচু স্বরে বলল,
—আমার ফোনের লক ‘তাহসান’ দেওয়া।
তাহসানের ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই অদ্ভুত এক মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। ইংরেজিতে নিজের নাম টাইপ করতেই লক খুলে গেল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে “জেমি” নামটা। তার মানে এতক্ষণ মেয়ের সঙ্গেই কথা বলছিল সে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুচকি হেসে তনিমাকে ছেড়ে দিল তাহসান। দুই কদম পিছিয়ে এসে ফোনটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে মাথা নিচু করে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তনিমা। তাহসান একপলক তাকে দেখে নিয়ে নিচে নামার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। যেতে যেতে হালকা হেসে বলল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৬

—তোমাকে শান্তশিষ্ট দেখতে একদম বউ বউ লাগে। সবসময় এমনই থাকবে।
বলেই সে দীর্ঘ পদক্ষেপে চলে গেল। আর তনিমা ধপ করে ছাদের মেঝেতেই বসে পড়ল। এতক্ষণ আটকে রাখা শ্বাসটা যেন কেবল ছাড়তে পারল সে। হাঁ করে চেয়ে রইল তাহসানের যাওয়ার পথের দিকে। লোকটা বলে কী গেল?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here