অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৫
রুপা
ইয়াসারের অতীত শোনার পর থেকে পুষ্প আর্যর গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে, থামার নামই নিচ্ছে না। আর্য ধৈর্য ধরে পুষ্পর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। অনেকক্ষণ পরে রমনীর কান্না কিছুটা কমে এল, তবুও সে থেমে থেমে নাক টানছে। আর্য এবার নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “কাঁদছ কেন, ফ্লাওয়ার?”
রমনী নাক টানতে টানতে বলল—
– “আপনার অনেক কষ্ট, তাই না সরকার সাহেব?”
রমনীর কথায় আর্য চুপ হয়ে গেল। কষ্ট? হ্যাঁ, তার কষ্ট আছে—বন্ধু হারানোর কষ্ট, বন্ধুকে বাঁচাতে না পারার কষ্ট। এ কষ্ট হয়তো সারাজীবন থাকবে, কিন্তু সে এখন ভালো আছে; তার ফ্লাওয়ারের সাথে খুব ভালো আছে এবং সারাজীবন এভাবেই থাকতে চায়! তাই সে আদুরে গলায় বলল—
– “উঁহু, আমার কোনো কষ্ট নেই। আমার ফ্লাওয়ার আছে তো আমার কাছে! ফ্লাওয়ার আছে মানে সরকার সাহেবের কাছে সব আছে। আর কোনো কষ্ট নেই, ফ্লাওয়ার থাকলেই হবে।”
– “আমি সারাজীবন থাকব আপনার কাছে, আপনার সাথে!”
রমনীর কথায় আর্য দুই হাতে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল পুষ্পকে। পুষ্পও যেন পারলে আর্যর বুকেই ঢুকে যাবে! আর্য এবার রমনীর মাথায় আদুরে চুমু দিয়ে বলল—
– “আমি জানি তো, আমার ফ্লাওয়ার আমাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবে না। কারণ সে সবার চেয়ে আলাদা, একদম অন্যরকম!”
আর্য একটু থেমে আবার বলল—
– “আচ্ছা, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও, কেমন? রাতে তো ঘুম হয়নি। ঘুমালে বেটার ফিল হবে।”
আর্যর কথায় এবার পুষ্পর মুখে যেন আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ জমে গেল। সে মিনমিন করে ডাকল—
– “সরকার সাহেব!”
– “হুম!”
– “আমি সিমরান আপুর বিয়ে দেখব না?”
রমনীর কথায় আর্য চুপ হয়ে গেল। বিয়ে? হ্যাঁ, তার তো খেয়ালই ছিল না! আজকে জুমার নামাজের পরে বিয়ে। সিমরানের সাথে না হলেও সারার সাথে হবে, সেখানেও একটা ঝামেলা হবে হয়তো। আর সে ওই সব ঝামেলা থেকে তার বউকে দূরে রাখতে চায়। আর্য এবার পুষ্পকে জিজ্ঞেস করল—
– “জান, সিমরান আপুর বিয়ে দেখতেই হবে?”
আর্যর প্রশ্নে রমনীর মন খারাপ হলো। সে কোনোদিন সামনে থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান দেখেনি। গ্রামে যখন কেউ বিয়ের দাওয়াত দিত, তখন পুষ্পর চাচা-চাচি ও ভাইবোনেরা গিয়ে খেয়ে আসত। সেদিন পুষ্পর পেটে আর খাবারও জুটত না! পুষ্পর চাচি বলত, তারা তো খেয়েই এসেছে, বাড়িতে রান্না করার কোনো প্রয়োজন নেই, এত টাকা নেই তাদের কাছে—একদিন না খেলে পুষ্পর কিছুই হবে না! পুষ্পও না খেয়েই দিন কাটিয়ে দিত, বেশি ক্ষুধা লাগলে পানি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করত। এদিকে রমনীকে চুপ থাকতে দেখে আর্য জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে, জান, মন খারাপ?”
আর্যর প্রশ্নে পুষ্প নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তার বিয়ে দেখার শখ থাকলেও এখন সে চাইলেও যেতে পারবে না, সে তো ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছে না—হেঁটে যাবে কী করে? তাই সে নরম গলায় বলল—
– “নাহ্! আমি ঠিক আছি।”
– “সত্যি ঠিক আছো? তোমার সিমরান আপুর বিয়ে দেখতে পারবে না, মন খারাপ হচ্ছে না?”
– “মন খারাপ করে কী হবে? আমি তো ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছি না, তাই চাইলেও তো যেতে পারব না!”
রমনীর কথায় অগোচরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল আর্য। বউটা তার ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছে না! সত্যি তার আরও একটু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে কী করবে? বউয়ের কাছে আসলে শরীরসহ আরও অনেক কিছু নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন চাইলেও সে নিজেকে আটকাতে পারে না। আর্য নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে পুষ্পকে বলল—
– “আচ্ছা, মন খারাপ করো না। এখন তো মেডিসিন নিয়েছ, একটু ঘুমিয়ে নাও। দেখবে, ঘুম থেকে ওঠার পরে ব্যথা অনেকটা কমে যাবে।”
রমনী আর কিছু বলল না, দুই হাতে আর্যকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে লেপ্টে রইল। সারারাত নির্ঘুম ক্লান্তিতে খুব কম সময়ের মধ্যে ঘুমের পরীরা এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। আর্য নিজেও পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল।
পুরো সরকার বাড়ি জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে রঙ-বেরঙের ফুল ও ছোট ছোট লাইট দিয়ে। মেয়েরা সাজগোজ করে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে—কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত, তো কেউ আড্ডা দিতে ব্যস্ত, আবার কেউ সবার সাজ দেখতে ব্যস্ত। এর মধ্যে গেট দিয়ে বাড়ির ছেলেদের প্রবেশ করতে দেখা গেল। জুমার নামাজ শেষ করে তারা ফিরছেন। সবার পরনে পাঞ্জাবি থাকলেও ব্যতিক্রম শুধু আর্য—তার পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট, যা ভিড়ের মাঝেও নজর কাড়ছে। অনেক মেয়েই হা করে তাকিয়ে আছে আর্যর দিকে। গম্ভীর মুখ, হাঁটার ভঙ্গি আলাদা, আর এককথায় দারুণ এটিটিউড—সুদর্শন এক পুরুষ আর্য! তবে সে কোনোদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না, গম্ভীর মুখেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
আর্য রুমে ঢুকতেই দেখল পুষ্প বিছানায় বসে আছে, আর তার পাশে কিছু গহনা ও শাড়ি রাখা। আর্য এগিয়ে এসে পুষ্পর সামনে দাঁড়াল, কপালে হাত দিয়ে চেক করে দেখল জ্বর এখনো কিছুটা আছে, তবে সকালের মতো বেশি নয়। পুরুষালি দুই হাতের আজলায় আলগোছে রমনীর মুখটা তুলে সে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “ব্যথা কমেছে?”
– “হুম!”
আর্য এবার বিছানায় রাখা গয়না ও শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
– “এগুলো কে দিয়েছে?”
– “ফুফুমণি! এই শাড়ি-গয়নাগুলো পরতে বলেছেন।”
আর্য শাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল ডার্ক মেরুন কালারের অরগানজা শাড়ি, বলতে গেলে কিছুটা পাতলা, সাথে সোনার গয়না। মায়ের ওপর আর্য বেশ অসন্তোষ হলো—তার বউকে এই শাড়ি দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? পরলেই তো তার বউয়ের শরীর দেখা যাবে! আর্য নিজের ভাবনা নিজের মধ্যে চেপে রেখে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে বলল—
– “এই শাড়ি পরার প্রয়োজন নেই!”
– “কেন? শাড়িটা তো সুন্দর!”
– “এই জন্যই পরবে না!”
– “তাহলে কী পরব?”
পুষ্পর কথায় আর্য আলমারি থেকে দুটো শপিং ব্যাগ বের করে দিল। পুষ্প একটা ব্যাগ খুলতেই চোখে পড়ল ক্রিম কালারের জমকালো স্টোন বসানো কাজের একটা গাউন। আরেকটা ব্যাগ খুলতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল! চোখের কোণ ভিজে উঠল। ব্যাগ থেকে ওড়নাটা বের করতেই টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এদিকে হঠাৎ পুষ্পকে কাঁদতে দেখে আর্য উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে, ফ্লাওয়ার? কাঁদছ কেন?”
– “এ… এটা আম্মুর ওড়নার মতো!”
কাঁপা গলায় বলল পুষ্প।
– “হ্যাঁ, এইটা তোমার আম্মুর ওড়নার ঠিক সেম ডিজাইনের ওড়না বানিয়ে আনা হয়েছে।”
পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারছে না। হ্যাঁ, ওড়নাটা সেম—তার মায়ের ওড়নার মতোই, কিন্তু এখানে তো তার মায়ের শরীরের ঘ্রাণ নেই, তার পরিবর্তে আছে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ। আর্য হয়তো বুঝতে পেরেছে রমনীর মনের কথা, তাই তো সে রমনীর পায়ের কাছে মেঝেতে বসে অনুতপ্ত হয়ে বলল—
– “আই অ্যাম সরি, ফ্লাওয়ার! আমি সেদিন রাগের মাথায় তোমার আম্মুর ওড়না পুড়িয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু আমি সত্যি জানতাম না ওটা তোমার আম্মুর ওড়না ছিল। পরে আম্মুর কাছে জেনেছি। তারপর তোমাকে কাঁদতে দেখে আমার একদম ভালো লাগেনি, তাই তোমার আম্মুর সেই পোড়া ওড়নাটা দিয়ে এই ওড়নাটা ডিজাইন করা হয়েছে। আই নো, এই ওড়নায় তোমার আম্মুর স্মৃতির ঘ্রাণ কিছু নেই, কিন্তু এইটাই তোমার সরকার সাহেবের তরফ থেকে অ্যাজ এ সরি—একসেপ্ট করে নাও। আমি সত্যি জানতাম না ওইটা তোমার আম্মুর ওড়না ছিল।”
আর্যর কথা শুনে রমনীর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এদিকে পুষ্পকে কাঁদতে দেখে আর্যর বুকে মোচড় দিয়ে উঠল—কেউ যেন ধারালো নখ দিয়ে খামচে ধরেছে তার হৃৎপিণ্ড! সে আবারও অনুতপ্ত গলায় বলল—
– “আই অ্যাম রিয়্যালি সরি, ফ্লাওয়ার! আমি সত্যি জানতাম না ওটা তোমার আম্মুর ওড়না ছিল।”
আর্যর কথা শেষ হওয়ার আগেই রমণী জাপটে জড়িয়ে ধরল আর্যকে, গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল। আর্যও নিজের বুকে আগলে নিল তার পিচ্চি বউটাকে। রমণী এবার ভাঙা গলায় বলল—
– “আব্বু-আম্মু চলে যাওয়ার পরে আমি অনেক কেঁদেছি, কিন্তু কেউ আমাকে বুকে আগলে নিয়ে শান্ত করেনি! ছোট চাচির কাছে আমার আম্মুর সব জিনিস ছিল, কিন্তু ছোট চাচি আমাকে কিছুই নিতে দেয়নি। এই একটা ওড়না ছিল আমার কাছে, আম্মুর কথা মনে পড়লে আমি এই ওড়নাটা জড়িয়ে আম্মুর ঘ্রাণ নিতাম। কিন্তু সেদিন আপনি রেগে যখন ওড়নাটা পুড়িয়ে দিলেন, তখন আমার কাছে আর কিছুই ছিল না আম্মুর ঘ্রাণ নেওয়ার মতো… তখনও আমি অনেক কেঁদেছি!”
পুষ্পর এক-একটা কথা যেন তীরের মতো বিদ্ধ হচ্ছে আর্যর বুকে, বুকে হাহাকার করছে!
– “আই অ্যাম সরি, খুব সরি! আমি জানতাম না ওটা তোমার আম্মুর শেষ স্মৃতি ছিল।”
আর্যর কথা শুনল কি না কে জানে! রমণী নিজের মতো করে আবারও বলল—
– “আমি আপনাকে অনেক আগেই মাফ করে দিয়েছি! আপনি তো জানতেন না ওটা আম্মুর ওড়না ছিল।”
পুষ্প একটু থেমে আবারও বলল—
– “আগে আমি আব্বু-আম্মুর কথা মনে করে কাঁদলে কেউ বুকে আগলে নিয়ে আদর করে শান্ত করত না। কিন্তু এখন আমি যখন তাদের মনে করে কাঁদব, আপনি আমাকে বুকে জড়িয়ে আদর করে শান্ত করবেন, কেমন?”
পুষ্পর কথায় না চাইতেও হেসে ফেলল আর্য। সে পুষ্পকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রমণীর মাথায় আদুরে চুমু দিয়ে বলল—
– “আমার ফ্লাওয়ারের জন্য এই বুক সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। সে যখন চাইবে কেঁদে ভেজাতে পারবে, আর কেঁদে যখন ক্লান্ত হবে, তখন তার সরকার সাহেব সামলে নেবে!”
আর্য এবার পুষ্পকে নিজের বুক থেকে তুলে দুই হাতে চোখের পানি মুছে দিল। ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিতে বলায় পুষ্প আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে হেঁটে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আর্য পুষ্পকে এভাবে কষ্ট করে হাঁটতে দেখে নিজেকে নিজেই ধমক দিল—কী প্রয়োজন ছিল এতটা হার্ড হওয়ার! সে নিজের মনে ঠিক করল, সে পরের বার থেকে আর এতটা হার্ড হবে না, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে। কিন্তু সেই কথায় পাঁচ মিনিটও স্থির থাকতে পারল না! যখনই পুষ্প ক্রিম কালারের গাউনটা পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল, আর্য ঢোক গিলল—কী রকম নেশা ধরে যাচ্ছে! আর্য দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল, আবার নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল—
– “বউ যদি এরকম হয়, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে কী করে? তাকালেই তো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে!”
আর্য নিজেকে অনেক কষ্টে সামলানোর চেষ্টা করল। এগিয়ে এসে পুষ্পকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলল, “তুমি রেডি হয়ে নাও, আমি কাপড় চেঞ্জ করে আসছি।” এই বলে নিজের কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। পুষ্প নিজেই হালকা মেকআপ করতে লাগল—আর্য বলতে গেলে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি কিনে দিয়েছে পুষ্পকে! সিমরানের কাছ থেকে মেকআপ করাও শিখেছে সে, সেই অনুযায়ী নিজের মতো করেই সাজত লাগল। এর মধ্যে আর্য বেরিয়ে এল; তার পরনে কালো ফরমাল প্যান্ট আর পুষ্পর সাথে ম্যাচিং করে ক্রিম কালারের শার্ট। সে এসে পুষ্পর পেছনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল তার বউয়ের সাজ। পুষ্প হঠাৎ আয়নার ভেতরে আর্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
– “এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
– “আমার বউকে দেখছি!”
আর্যর সোজাসুজি উত্তরে রমণী কিছুটা লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিল, আবারও মিনমিন করে বলল—
– “আপনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমি সাজব কী করে?”
রমণীর কথায় কী হলো কে জানে, আর্য হঠাৎ গুনগুন করে গান ধরে উঠল—
~ “আমি তোর আয়না হবো আজ
তুই শুধু ইচ্ছেমতো সাজ (২)…
রোদ্দুরে, যায় উড়ে, মন জাহাজ
তুই আমাকে আগলে রাখ
ঠিক এভাবে সঙ্গে থাক
সারাদিন, সারারাত (২)…”
এই নিয়ে আর্যর গান দুইবার শুনল পুষ্প। খালি গলায় খুব সুন্দর গান গায় আর্য—মুগ্ধ হয়ে শোনার মতো! পুষ্পও মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। আর্যর গান শেষ হতেই পুষ্প এবার আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল—
– “সরকার সাহেব, আপনি অনেক সুন্দর গান গাইতে পারেন, মুগ্ধ হয়ে শোনার মতো!”
– “তুমি মুগ্ধ হয়েছ?”
– “হুম!”
– “তাহলেই হবে, আর কারও মুগ্ধ হতে হবে না।”
পুষ্প আর কিছু বলল না, দুজনেই রেডি হয়ে নিল। পুষ্প হিজাব পরেছে, গাউনের সাথে একপাশে জামার ওড়নাটা পিন করে নিয়েছে নতুন করে কোনো জুয়েলারি পরেনি আর্য যা পরিয়ে দিয়েছিল সেগুলোই পরনে। আর্যও পারফিউম স্প্রে করে নিল হাতে দামি ঘড়ি মানানসই শো এবং নিজের দামি ব্র্যান্ডের কালো স্যুটটা পরে পুরো রেডি হয়ে পুষ্পর হাত ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আর্য আর পুষ্প নিচে নামার আগেই বরযাত্রী চলে আসে। সব নিয়মকানুন মেনে এখন ড্রয়িং রুমের সাজানো সোফায় বসে আছে স্নিগ্ধ ও তার ছোট চাচা-শেফার আরো আত্মীয়রা। সবাইকে ঠান্ডা শরবত ও মিষ্টি দেওয়া হলো। এর মধ্যে সেখানে আর্যকে নামতে দেখা যায়, যার কোলে পুষ্প! রমণী এই মুহূর্তে লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না। রুম থেকে বেরিয়ে সে আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, আর্য সেটা দেখে কোনো সতর্কতা ছাড়াই পুষ্পকে কোলে তুলে নিচের দিকে হাঁটা শুরু করল। পুষ্প অনেকবার কোল থেকে নামাতে বললেও আর্য শুনল না, এমনভাবে হাঁটতে লাগল যেন পুষ্পর কথা তার কানেই যায়নি!
পুরো ড্রয়িং রুমের মানুষের দৃষ্টি আর্য আর পুষ্পর ওপর, যেটাতে পুষ্প আরও আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অস্বস্তি ও লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে। আর্য সবার দিকে একপলক তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “বউ হয় আমার, পরনারীকে তো কোলে নিইনি যে এভাবে তাকিয়ে দেখতে হবে!”
আর্যর কথার সাথে সাথেই সবাই নিজেদের দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল, কেউ কুঁককুঁক করে কাশতে লাগল। আমজাদ সরকার ছেলের কাণ্ডে কী বলবেন, খুঁজে পেলেন না; তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য এবার কাজিকে তাড়া দিলেন বিয়ে পড়ানোর জন্য।
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৪
সবাই সম্মতি দিতেই সিমরানকে নিয়ে আসতে বলা হলো। খবর দেওয়ার অনেকক্ষণ পরেও সিমরান নিচে এল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হইচই শুরু হলো—বউ নেই! বউকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে বউ নিখোঁজের খবর শুনে সবাই যখন চিন্তায় অস্থির হয়ে সিমরানকে খোঁজায় ব্যস্ত, তখন আর্য স্নিগ্ধকে কিছু একটা ইশারা করে পুষ্পকে কোলে নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
