প্রেমপিপাসা পর্ব ২০
সুমাইয়া সুলতানা
সকালটা কেমন যেন ঝাপসা। আকাশ ধূসর, না ঠিক মেঘলা, না একেবারে রোদ ঝলমলে। বাতাস ভারী, অলস গতি নিয়ে জানালার পর্দায় ঢেউ তুলে দিচ্ছে। গাছের পাতায় হালকা কাঁপুনি, যেন ক্লান্ত হয়ে আছে দীর্ঘ রাতের নিস্তব্ধতায়। দূরে কোথাও একটা কাক ডাকছে, বিরক্তিকর কণ্ঠস্বরটা একবার শুনলে ভুলে যাওয়া মুশকিল। পাশের বাসার বারান্দায় কারো নরম আলাপ শোনা যাচ্ছে, খণ্ডিত শব্দগুলো বাতাসে ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে।
উদাস চিত্তে বারান্দায় দেয়াল ঘেঁষে চেয়ারে বসে আছেন জামশেদ। বিষণ্ণতায় ঘেরা মনগহীন মেয়ের চিন্তায় ব্যাকুল। দৃষ্টি বাইরের ওই গুমোট বাতাবরণ, পাখির কলতান শব্দ আর কিছু মানুষের শোরগোলে নিমজ্জিত। রিক্ত শূন্য দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখলেন গলির সেই মোড়ে, যেখানে প্রজ্জ্বলিত আলোক শিখার ন্যায় দেখেছিলেন বিশেষ একজনকে! আর সেই বিশেষ একজন হলো নিখিল।
কাল অরু যখন বাড়িতে এসেছিল, বাবার সঙ্গে হাসিমাখা আনন্দময় মুহূর্ত কাটানোর পর, অরু চলে যায় ছোট চাচির কাছে। বোনদের নিয়ে, চাচির সাথে খুনসুটি চলে দীর্ঘক্ষণ। জামশেদ তখন বারান্দায় বসে কিছু কাজ করছিলেন। এরইমধ্যে বারান্দা থেকে দূরে মেইন রাস্তায় নজর পড়ে। যেখান দিয়ে হ্যাভেনের বাড়িতে যেতে হয়। সেখানে রাস্তার পাশে একটা বড়সড় দোকানের সামনে নিখিল’কে একটা মেয়ের সঙ্গে কিছুটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তৎক্ষনাৎ মস্তিষ্ক এলোমেলো ভাবনায় বিভোর হয়। রুম থেকে বেরিয়ে বড়ো ভাবীকে দেখতে পেয়ে, চোখ দুটো চকচকে করে উঠে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জলের সন্ধান পাওয়ার মতো অবস্থা। জামশেদ’কে দেখে শাহানা মুখ বাঁকিয়ে চলে যেতে নিলে, হুড়মুড়িয়ে জামশেদ তাকে জ্ঞান দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিলেন,
” অরু এসেছে। তার সাথে কোনোরকম ঝুট-ঝামেলা করতে যেন না দেখি। সে শুধু এ বাড়ির মেয়ে না, এখন সে বড়োলোক বাড়ির বউ। বুঝেশুনে কথা বলবে তার সাথে। ”
ব্যস! এটুকুই যথেষ্ট ছিল শাহানা’কে ক্ষেপাতে। বড়োলোক বাড়িতে মেয়ে বিয়ে দিয়ে কি মাথা কিনে নিয়েছে, যে এমন আদেশের ভঙ্গিতে জামশেদ তার সাথে কথা বলছেন? অপমানের তোপে শাহানার নেত্র জ্বলে উঠে। সেজন্য তক্কে তক্কে ছিলেন, কখন সুযোগ বুঝে অরু’কে কথা শোনাবেন। ইচ্ছে করে অরু’কে ইনিয়েবিনিয়ে মুখ ঝামটি মেরে মেরে নানান কটুকথা বলেছেন। একপর্যায়ে অরুও তেতে উঠেছিল। এটাই তো চেয়েছিলেন শাহানা। সুযোগ পাওয়া মাত্র মনের ঝাঁঝ মিটিয়ে নিয়েছিলেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
জামশেদ ভেবেছিলেন, কিছু একটা করে সেই সময় অরু’কে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে। যাতে নিখিলের কার্যকলাপ, নতুন নতুন মেয়েদের সাথে অন্তরঙ্গতা স্বচক্ষে দেখতে পারে। সে একজন প্লে বয় এবং কতটা নোংরা ছেলে জানতে পারে। সেজন্য উপস্থিত বুদ্ধি হিসেবে বড়ো ভাবীর তীক্ষ্ণ ধারালো বাক্যবাণ বেছে নিয়েছিলেন। তাহলে হ্যাভেনের প্রতি অরু আকৃষ্ট হবে, ভালো লাগার সৃষ্টি হবে। জামশেদ বুঝতে সক্ষম অরু এখনো হ্যাভেন’কে পরিপূর্ণ ভাবে স্বামী রূপে স্বীকার করতে পারেনি। সেজন্য মেয়েকে তার প্রেমিকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত করা জরুরি মনে করেছেন। তাই তো বড়ো ভাবীকে কার্যসিদ্ধির গুটি বানিয়ে ছিলেন।
কিন্তু জামশেদ বুঝতে পারেন নি শাহানা বলতে বলতে বেশি বলে ফেলবেন। তার মৃত স্ত্রীকে টেনে কথা বলবেন! তিনি ভেবেছিলেন শুধু হ্যাভেন’কে নিয়ে খোঁচা মেরে কটুকথা শোনাবেন। তবে রেগে শাহানা বাড়াবাড়ি রকমের অপমান করবেন ঘুনাক্ষরে টের পাননি। এটার জন্য মনে মনে তিনি গিল্টি ফিল করেছেন। এদিকে হাতে সময় নেই। নিখিল যেকোনো সময় সেখান থেকে চলে যেতে পারে। ঝগড়াঝাটির মাঝে শাহানা’কে কিছু না বলে, উল্টো মেয়েকে বুঝিয়ে তড়িঘড়ি করে স্বামীর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে ক্ষীর খেয়ে যেতে বললে, অরু খায়নি। একে তো চাচির কথাবার্তা, তারউপর বাবা একপ্রকার তাড়িয়ে দিচ্ছে, মেনে নিতে না পেরে অরুও রেগে বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে আসে। জামশেদ আহত, মলিন চোখে চেয়ে ছিলেন পুরোটা মুহূর্ত।
অরু চলে যাওয়ার পর, শাহানা’কে কড়াকথা শোনাতে চেয়েও পারেন নি। বড়ো ভাবীকে মায়ের মতো সম্মান করে জামশেদ। আবার মোক্ষম সময়ে কটাক্ষ কথাবার্তা বলে অরু’কে নিখিলের কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগ করে, অজান্তেই উপকার করে দিয়েছে সে। তাছাড়া, জামশেদ নিজেও উসকানিমূলক কথা বলে শাহানার গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। কিছুটা দোষ তারও আছে। তিনি শাহানা’কে অরুর সাথে ঝামেলা করতে নিষেধ করা নিয়ে জ্ঞান না দিলে, হয়তো অল্পকিছু কথা শোনাতেন মুখ ঝামটি মেরে। বেশি বেশি বলতেন না।
অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জামশেদ বড়ো ভাইকে ডেকে টাকাগুলো হাতে দিয়ে, কড়া গলায় সাবধান করেছেন, যেন নেক্সট টাইম শাহানা এসমস্ত কথাবার্তা না বলে অরু’কে। বললে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
নিজস্ব কাজের কথা মনে পড়তেই মনমরা হয়ে ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললেন জামশেদ। অশ্রুতে ঝাপসা চক্ষু জোড়া পাঞ্জাবির হাতায় মুছে নিলেন। চোখে চশমা লাগিয়ে, সেটায় আঙুল ঠেলে ভ্রুর দিকে নিয়ে নিউজ পেপার পড়ায় মনোযোগী হলেন।
অরুর ঘুম ভাঙলো অনেক দেরিতে। ঘুম ভালো হয়েছে। হ্যাভেনের বুকে আইঢাই করতে করতে কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে বুঝতে পারেনি। মাথা ব্যথা নেই। শরীর মোটামুটি ঠিক লাগছে, তবে এখনো দুর্বল। ঘরটা কেমন বোঝা যায় না এমন আলোতে ভরে আছে, যেন সকালের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই এখানে। হ্যাভেন ততক্ষণে রেডি হয়ে গিয়েছে। হ্যাভেনের ডাকেই ওঠা হলো ওর। আলস্যে ভরা দেহটা বিছানা থেকে উঠতে চায় না, কিন্তু বাধ্য হয়ে উঠে ওয়াশরুমে গেল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এসে বিছানায় বসলো।
তক্ষুণি কর্নগহ্বরে হ্যাভেনের গলার আওয়াজ ভেসে আসে। কার সাথে যেন কথা বলছে ফোনে। একটু খুশির ছোঁয়া আছে তাতে। ফোনের শব্দও বেশ স্পষ্ট। কাকে যেন বলছে কিছু! জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। কাঁচের বাইরে দৃষ্টি স্থির রেখে কথা বলছে। অরু বিশেষ ভাবল না কিন্তু মেয়েলি গলার টুকরো টুকরো শব্দ কানে আসতেই ভ্রু যুগল কুঁচকে ফেলল। সচকিত মস্তিষ্কের ভেতর জমাট বাঁধল ভিন্ন আলাপন। বক্ষপটে অজানা অস্বস্তির কাঁটাগুলো খচখচ করে বেঁধে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই বিতৃষ্ণা চলে এলো মনে। কোন মেয়ের সঙ্গে খুশিমনে বিরতিহীন এত কথা বলে চলেছে?
মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা শেষ করে হ্যাভেন অরুর দিকে ফিরল। সে চোখমুখ শক্ত করে আছে। ওকে থম মেরে তাকিয়ে থাকতে দেখে হ্যাভেন ললাট ভাঁজ করে কাছে এলো। সরু চোখে চেয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” কিছু বলবে? ”
অরু প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। অকস্মাৎ অদৃশ্য অন্তরের ক্রোধের তাড়নায় জরাজীর্ণ শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে, সম্মুখের বেড সাইড টেবিল হতে কাঁচের ডিজাইনার একটা শোপিস তুলে আছড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। ঝনঝন আওয়াজে মুখরিত হলো চারিপাশ। হ্যাভেন হতভম্ব হয়ে গেল। হতবিহ্বল অক্ষিপট বড়ো করে তাকিয়ে থাকল, আচমকা ক্ষেপে উঠা অরুর পানে। আকস্মিক কাজের উৎস কি বুঝতে সক্ষম হলো না। অরু দাঁতে দাঁত পিষে কঠিন দৃষ্টিতে হ্যাভেন’কে দেখছে। সেই চাউনীর ভাষা হ্যাভেনের বোধগম্য হচ্ছে না।
পরিস্থিতির গুমোট ভাব কিয়ৎক্ষণ পর শিথিল হলে, হ্যাভেন গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইল,
” ভাঙচুর খেলা খেলতে ইচ্ছে করছে? মুড সুইং হচ্ছে? কিন্তু আমি তো মুড সুইং হওয়ার মতো কাজটা এখনো করতে পারিনি। ”
অরু ভালো করে বুঝতে পারছে বজ্জাতটা কি বোঝাতে চেয়েছে। নাকের পাটাতন ফুলিয়ে ঝাঁঝ নিয়ে জবাব দিল,
” বাজে কথা বন্ধ করে, সামনে থেকে সরুন। ”
হ্যাভেন বাধ্য স্বামীর ন্যায় সরে দাঁড়ায়। অরু’কে ওয়ারড্রব থেকে ড্রেস বের করতে দেখে জোড় ভ্রু কুঞ্চিত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। রাশভারী গলায় বলে,
” কোথাও যাবে নাকি? ”
ওয়াশরুমে যেতে যেতে অরু খিটখিটে মেজাজে বলল,
” ভার্সিটি। ”
হ্যাভেন চুপচাপ ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকালো। হাত ঘড়ি পড়ে, চুল ঠিকঠাক করল। অরু চেঞ্জ করে বেরিয়ে আসতেই ভরাট স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
” তোমাকে ভীষণ উইক লাগছে। আজ ভার্সিটি না গিয়ে বাড়িতে থেকে রেস্ট নিলেই পারো। ”
অরু গলায় স্কার্ফ জড়াতে জড়াতে বিরস মুখে উত্তর দেয়,
” কালকে যাইনি। পরীক্ষার ডেট এগিয়ে আসছে। এখন কোনো ক্লাস মিস দেওয়া যাবে না। ”
” কুইকলি রেডি হও। ব্রেকফাস্ট করতে হবে। ”
” খাবো না। ”
হ্যাভেন ভাবল অলরেডি লেট হয়ে গিয়েছে। পথিমধ্যে হোটেল থেকে ব্রেকফাস্ট করে নিবে। তাই ঘাঁটল না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অরুর দিকে, কিছুতেই মেলাতে পারছে না এই আচরণের কারণ। অরুর রাগান্বিত চোখে আগুনের ফুলকি ভাসছে। হ্যাভেন’কে ভৎসনা দিচ্ছে সেই চাহনি বারংবার! নিজের উচাটন কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি নিজেরই বুকের ভেতর অস্বস্তি নিয়ে বাজছে।
ভারিক্কি নিঃশ্বাস ছাড়ল হ্যাভেন। হতাশ ভঙ্গিতে আফসোসের সুরে বলে ওঠে,
” কিছু মেয়েদের বাইরে থেকে স্মার্ট লাগলেও, তারা আস্ত একটা রসকষহীন মানুষ! এদের মতো মেয়েদের জন্য বংশের বাতি জ্বালাতে এত দেরি হয়! ”
অরু রেডি হচ্ছিল মনোযোগ সহকারে। হ্যাভেনের কথায় সেফটিপিন লাগানো থামিয়ে তার দিকে দৃষ্টি তাক করল। কাঠিন্য মুখশ্রীতে চওড়া গলায় বলে উঠলো,
” এক্সকিউজ মি, আপনি কি আমাকে কিছু বললেন? ”
হ্যাভেন ফিচেল হাসে। ভাবলেশহীন ভাবে তীর্যক চাউনী নিক্ষেপ করে জানায়,
” তোমাকে কেন বলবো? যেই সমস্ত মেয়েরা এমন ধাঁচের তাদের উদ্দেশ্যে বলেছি। তুমি কি তাদের মধ্যে একজন? ”
অরু থমথমে খায়। মুখ ঘুরিয়ে নেয়। রাগত্ব কন্ঠে কিড়মিড়িয়ে কটাক্ষ করে বলে,
” কিছু পুরুষ মানুষ হলো হারে বজ্জাত। এদের একটা বউ দিয়ে হয় না। লুচু মানুষের মতো ঘরে বউ থাকা সত্ত্বেও বাইরের মেয়েদের সঙ্গে প্রেম আলাপ জমায়। ”
হ্যাভেন বিস্মিত হলো। চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বিস্ফোরিত চাউনীতে অবাকের রেশ! কপাল কুঁচকে জোরালো গলায় শুধাল,
” কার কথা বলছো? আমাকে নয় তো? ডিড ইউ ইন-ডিরেক্টলি ইনসাল্ট মি? ”
অরু তৎক্ষনাৎ প্রত্যুত্তর করলো,
” নেভার! আপনাকে কেন বলবো? আপনি কি সে-সকল পুরুষের মতো? ”
হ্যাভেন ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস টানল। তাকে নকল করে, উত্তর দেওয়া হচ্ছে? আকস্মিক কি হলো মেয়েটার? উল্টো গান গাইছে কেন?
” রাইট, আমি তাদের মতো না। হ্যাভেন ইজ ডিফরেন্ট ফ্রম এভরিওয়ান। ”
অরু ভেংচি কাটে। হ্যাভেনের বেশ দাম্ভিক সমেত ভাব নিয়ে বলা কথাটা পছন্দ হলো না। অজান্তেই তীব্র অভিমান পোষণ করে গোমড়া মুখে বলল,
” একজন নারী তখনই ভাগ্যবতী, যখন তার স্বামী তাকে ছাড়া আর কিছু বোঝে না। ”
হ্যাভেন ভ্রু কুঁচকে ফেলল। দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করে ভরাট কন্ঠে জানালো,
” আমি এক নারীর প্রতি আসক্ত। তাকে ছাড়া কিছু বুঝি না। ”
ফুঁসে উঠল অরু। কেন যে বলতে গেল! নিশ্চয়ই প্রথম বউয়ের প্রতি পিরিত জাগ্রত হয়েছে! ভালোবাসা হানা দিয়েছে! তাহলে ওকে কেন বিয়ে করেছে? বেগার খাটুনির জন্য?
অরু রাগান্বিত চক্ষু জোড়া হ্যাভেনের দিকে তাক করল সহসা। বাজখাঁই গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
” বউয়ের জন্য এত পিরিত থাকলে, বাইরের মেয়েদের সঙ্গে হাসাহাসি করে কথা বলতে লজ্জা করে না? বিবেক বাঁধল না? ”
হ্যাভেন হকচকিয়ে যায়। নিগূঢ় নয়ন অরুর মুখমন্ডলে নিবদ্ধ। অরুর রাগের বহিঃপ্রকাশ মগজে ঢুকল না। তখন থেকে কিসের বাইরের মেয়ে, বাইরের মেয়ে বলে চলেছে? সচল মস্তিষ্ক মুহূর্তে সিগন্যাল দিল অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনা। হতভম্ব হয়ে গেল তৎক্ষনাৎ সে। নেত্রদ্বয় বড়ো বড়ো করে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকল চটে যাওয়া অরুর মুখাবয়বে।
কিছুক্ষণ আগে জাজলিনের সাথে কথা বলেছে। কল কাটার পর থেকেই দেখছে অরু রেগে বোম হয়ে আছে। কেমন উদাসীনতা ছড়িয়ে পড়েছে মুখশ্রী জুড়ে। যে মেয়েটার সঙ্গে হ্যাভেন কথা বলছিল, সে ছিল তার এক ক্লায়েন্ট। মেয়েটা একজন বিদেশি। হ্যাভেন কাজের সূত্রেই তার সঙ্গে কথা বলছিল। আর অরু কি-না সেজন্য ক্ষেপে আছে? কিন্তু এই মুহূর্তে অরুর নিকট সত্যিটা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
হ্যাভেনের মাথায় দুষ্টুমি ভর করল। গলা খাঁকারি দিল সে। সন্দেহী দৃষ্টিতে চেয়ে রসিকতা গলায় বলে উঠলো,
” বিবেক থাকলে তো বাঁধবে! বাইরের মেয়েদের সঙ্গে হাসাহাসি করলে, তারা যদি খুশি হয়, তাহলে যুবক হিসেবে আমার জীবন স্বার্থক। তাদের হাসিমাখা লালচে ঠোঁট, আহা কত সুন্দর বলে বোঝানা যাবে না। তাছাড়া, নিজের বউয়ের চেয়ে বাইরের মেয়েরা সেই লেভেলের হ…..! ”
কথা শেষ করতে পারে না হ্যাভেন। যবানিকা টানার পূর্বে অরু কলার চেপে ধরে। মুখটা অতি সন্নিকটে নিয়ে রক্তিম চোখে চাইল। ফুঁসতে ফুঁসতে তিরিক্ষি মেজাজ সহিত বলে,
” আর একটা ফালতু কথা বললে, ঘুষি মেরে আপনার মুখ ভেঙে ফেলবো অসহ্যকর লোক! ”
বিস্ময়ের তোপে হ্যাভেন শুন্যে ভেসে চলল। কথাগুলো বলার সময় অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মতো অরুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। ওর ক্রোধান্বিত ক্ষেপাটে মুখবিবর পর্যবেক্ষণ করে অচিরেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল হ্যাভেন। পলকহীন বিমূঢ় দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নিঃশ্বাস ভারী হলো। কিয়ৎকাল মুহূর্ত এভাবে অতিবাহিত হয়। পরপর অরুর কোমর প্যাঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। দুর্বোধ্য হাসল। গ্রীবা বাঁকিয়ে অরুর কানের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস করে আওড়াল,
” ওহে ধানিলংকা, আমি কিন্তু ব্যাপক মুডে আছি। উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকো। নয়তো তুমি এখন রেহাই পাবে না। আমার নিউমোনিয়া বেড়ে গেলে, তোমার শরীরেও নিউমোনিয়া বাড়িয়ে দেবো। তোমাকে আসল নিউমোনিয়া কেমন হয় সেটা ফিল করাবো, যেটা তোমাকে দেখলে আমার ফিল হয়। ”
অরু’কে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে হ্যাভেন গাড়ি নিয়ে চলে গেল অফিসে। কথা ছিল হোটেল থেকে ব্রেকফাস্ট করবে। অনেকবার বলার পর, জোর করার পরও অরু খেতে রাজি হয়নি। রাস্তায় বেহুদা সিনক্রিয়েট তৈরি হবে, সেজন্য হ্যাভেন বাড়াবাড়ি করেনি। নিজেও ব্রেকফাস্ট করেনি। ভোরের দিকে খেয়েছিল দুজন, তাই হ্যাভেন বুঝলো এবং ভাবল, হয়তো অরুর সত্যি খিদে পায়নি।
অরু ভার্সিটির গেইটের কাছে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। আশেপাশের কোলাহল, ছাত্রছাত্রীদের উচ্ছ্বাস, ভার্সিটির বিশাল ভবনের ছায়া, সব মিলিয়ে একটা পরিচিত ভারী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক তখনই মিষ্টির ডাক কানে এলো,
” অরু! ”
চমকে তাকাল সে। মিষ্টি হাত নাড়াতে নাড়াতে এদিকে এগিয়ে আসছে। চোখে সেই চিরচেনা উৎফুল্ল। উড়নচণ্ডী তরুণী বলে কথা। মিষ্টি’কে দেখে অরুর অধরেও হাসির ঝলক দেখা যায়। সেও ধীর কদমে এগিয়ে চলল।
মিষ্টি চনমনে কন্ঠে শুধাল,
” নিয়মিত আসিস না কেন? ”
অরু জোর পূর্বক হাসল। সাবলীলভাবে জবাব দেয়,
” কিছুটা অসুস্থ। ”
মিষ্টি ওর কপালে হাত রাখল। চোখেমুখে উদ্বীগ্ন।
” জ্বর এসেছিল? ”
অরু মিহি স্বরে জানায়,
” অল্প। নাউ আ’ম ফাইন। ”
কথা বলতে বলতে ক্লাস রুমে এসে পৌঁছাল দুজন। মিষ্টি একের পর এক বকবক করছে, আর অরু চুপচাপ সেগুলো শ্রবণ করছে। বেশিরভাগ কথা রাহাত’কে নিয়ে বলছে। মিষ্টির কণ্ঠে আনন্দ, কিন্তু অরুর মনে এক অদ্ভুত ভার। তাদের মধ্যকার কথোপকথন চলার মাঝে ব্যাগ বেঞ্চে রেখে, ক্লাসের বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। মিষ্টি কথা বলছে, অরু শুনছে, মাথা নাড়ছে, মাঝে মাঝে কিছু বলছে, তবু কোথাও যেন একটা ভারী ছায়া লেগে আছে।
অতর্কিত মিষ্টির কিছু বলার মাঝখানে, অরুর চোখ আটকে যায় গেইটের নিকট। ভার্সিটির বিশাল বারান্দা থেকে নিচের গেইট পর্যন্ত তার দৃষ্টি চলে গেল অবলীলায়। গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত। বেশভূষা পরিপাটি। একটা লোকের সাথে কথা বলছে।
অরু অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,
” ভাইয়া! ”
মিষ্টি ভ্রু কুঁচকে বলে,
” কোন ভাইয়া? ”
” রাহাত ভাইয়া। ”
অরু আঙুল উঁচু করে দেখাল। মিষ্টি সেদিকে দৃষ্টি তাক করে। অমনি চক্ষু জোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মিটিমিটি তাঁরার মতো বক্ষপট জ্বলজ্বল করছে। মিষ্টির ঠোঁটে খুশির আমেজ। এদিকে অরু কিয়ৎপল স্তব্ধ থাকল। পরমুহূর্তে শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। একটা কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতি, একটা ক্ষত, একটা গভীর অভিমান বুকের ভেতর আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। কোনো কথা না বলে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই, মিষ্টির হাত শক্ত করে চেপে ধরল। অতঃপর মিষ্টির উদ্দেশ্যে বলল,
” চল, নিচে যাই। ”
মিষ্টির মন বাকবাকম করে উঠে। তবুও রয়েসয়ে অসম্মতি প্রকাশ করে,
” হঠাৎ নিচে কেন? ”
” চল বলছি। ”
অরুর কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা যে মিষ্টি কিছু না বলেই পা বাড়াল। সিঁড়ি দ্রুত ডিঙিয়ে নামতে লাগল তারা। অরুর মুখে একটা তীক্ষ্ণতা খেলা করছে। একেকটা ধাপ ওর আবেগের গভীর ক্ষতের উপর আঘাত করে যাচ্ছে। নিচে এসে গেইটের কাছাকাছি দাঁড়াল। রাহাত তখনো সেখানেই। অরু’কে দেখতে পেয়ে অধর প্রসারিত করে চমৎকার হাসল। সেই হাসিতে মিষ্টির মন পুলকিত হলো, কিন্তু অরুর তেমন ভাবান্তর পরিলক্ষিত দেখা যাচ্ছে না। অরু সেধে সেধে কথা বলতে কিছুটা বিব্রতবোধ করছে। একরাশ অনুভূতি বুকের ভেতর ঢেউ তুলল। অভিমান, বেদনা, স্মৃতি, হয়তো কিছু অনুক্ত প্রশ্ন। বাড়িতেও রাহাতের সাথে দেখা হয়নি। সে তখন বাড়িতে ছিল না। এক পলক দেখল, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিলো। অভিমান জমে আছে অনেক দিনের, সহজে গলে যাবে না। রাহাত কি অনুভব করল? বুঝতে পারলো বোনের রাগ?
স্রেফ এক ঝলক দৃষ্টির লেনদেনের পর, অরু মুখ ফিরিয়ে হাঁটতে লাগলো। মিষ্টি তার পাশে চুপচাপ হাঁটছে। বিরক্ত হলো সে। অরু থাকলে রাহাত’কে কিছুক্ষণ দেখতে পারতো মন ভরে। আর এই মেয়ে ফিরে যাচ্ছে! তাহলে ভাইকে দেখে দৌড়ে এসেছিল কেন? রাহাত ব্যাটাই বা কেমন? আগ বাড়িয়ে বোনের সঙ্গে কথা বললে কি হতো? সবকিছুতে এ ব্যাটার আজাইরা জেদ! মনঃক্ষুণ্ন হলো মিষ্টির। বোঝার চেষ্টা করছে এই দুই ভাইবোনের নীরবতার গভীরতা।
অরু চলে যাচ্ছে দেখে, রাহাত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কথা না বলে চলে যাওয়ার মানে কি? তুরন্ত নরম কন্ঠে পিছু ডাকল,
” অরু? বোন আমার। ”
অরুর পা থামল। তবে পেছনে ফিরে তাকাল না। রাহাত নিজেই এগিয়ে আসলো। অরুর মুখোমুখি হয়। এক হাতে আলতো ভাবে অরুর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে,
” কথা বলবি না? ”
অরুর অক্ষিকোটর টলমলে নদী। উৎকন্ঠিত বক্ষঃস্পন্দন। কান্না গিলে ধরাশায়ী কন্ঠে বলে,
” কেমন আছো? ”
” তোকে দেখে বেটার লাগছে। আমার বোন কেমন আছে? ”
অরু তাচ্ছিল্য হেসে প্রত্যুত্তর করলো,
” যেমন থাকার কথা। ”
রাহাত বুঝলো অরু কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কথা পাল্টে শুধায়,
” ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করিস না? মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। ”
অরু মিহি স্বরে বলল,
” করি তো। তুমি এখানে? ”
” কাজ ছিল। ”
” তুবা’কে নিয়ে মাঝে মাঝে আমার কাছে যেতে পারো না? ”
” সময় পাই না। তোদের ক্লাসের ঘন্টা বেজে গিয়েছে। ”
অরু চকিতে তাকায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেল, স্যার ইতিমধ্যে বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। অরু হুড়মুড়িয়ে তাড়া দিল। ছুট লাগানোর পূর্বে রাহাত’কে বলে গেল,
” পরে কথা হবে। ভালো থেকো। ”
অরু চলে গেল। কিন্তু মিষ্টি তখনও অন্যমনস্ক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। অধরে লেপ্টে রয়েছে মনোমুগ্ধকর হাসি। রাহাত পেন্টের পকেটে হাত গুঁজল। তীক্ষ্ণ নজর বোলালো মিষ্টির স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে। অতঃপর ভ্রু নাচাল,
” তোমার কি ক্লাস করার ইচ্ছে নেই? ”
প্রেমপিপাসা পর্ব ১৯
মিষ্টির সম্বিত ফিরল। বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। ব্রীড়ানতায় শিরশির অনুভূতি হচ্ছে। রাহাত’কে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে, ঈষৎ লজ্জায় নুইয়ে পড়ল। ক্লাসের কথা মনে পড়তেই ছুটতে দেরি হয় না বিধিবাম! বিপত্তি ঘটাল বেসামাল বেগ। ব্যস্ত পা দুটো বিঁধল উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যম সাইজের পাথর খন্ডের উপর। মৃদুস্বরে আর্তচিৎকার করে, হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নেয়। তক্ষুনি রাহাত কোমর টেনে ধরে। মিষ্টি চোখ খিঁচে রেখেছে। পেলব দু’হাত খামচে ধরা রাহাতের কাঁধ এবং বাহুর শার্টের কাপড়। ঘনঘন শ্বাস টানছে। লিপস্টিক পরিহিত রাঙা অধর কামড়ে শক্ত হয়ে আছে। ঘন পল্লব নড়াচড়া করছে। আচানক মিষ্টির কামড়ে ধরা ঠোঁটে নজর পড়তেই রাহাতের ঘাম ছুটে গেল। শুষ্ক ঢোক গিলল নিমিষে।
