রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৭
ফারহানা চৌধুরী
-‘ইউ আর সেভেন মিনিটস্ লেইট মিস অর মিসেস অরুনিকা।’
কি গুরুগম্ভীর গলা! অরুর মনে হলো তার শ্বাসটা আটকে আসছে গলায়। আবার কি না কি বলে অপমান করে তার ঠিক নেই। তবে আপাতত অরুর নিজের মাথারও যে খুব ঠিক আছে তা-ও না। তার রাগে ফুঁসছে ভেতরে ভেতরে। এসব বাইরে এসে ছড়ালে, এতক্ষণে এই সাত ত’লা বিল্ডিং ধ্বসে পড়তো, তা অরু উইল করে দিতে পারবে। সে জোরপূর্বক হেসে বলল,
-‘ওটা ‘মিস অরুনিকা’ হবে স্যার।’
শুভ্র চোয়াল শক্ত করে চাইল। দাঁতে দাঁত পিঁষে বলল,
-‘দ্যাটস্ নন অফ মাই বিজনেস, ইফ ইউ আর মিস অর মিসেস। দেরি কেন করেছেন সেটা বলুন।’
অরু অবাক হলো। জেনে-বুঝেও এমন ভং ধরেছে যেন কচি খোকা সে। কিচ্ছু জানে না। অথচ সবকিছুর মূল এই লোক। পারলে এই লোককে এই সাত ত’লা তেকে নিচে ফেলে দিতো অরু। খুবই বাজে চিন্তা ভাবনা। অরু নিজের চিন্তাভাবনায় কস্টেপ মেরে দিলো। বলল,
-‘আপনি জানেন, আমার কেন দেরি হয়েছে।’
-‘একজন এমপ্লয়ির কেন অফিসে আসতে লেইট হচ্ছে, তার খোঁজ-খবর বস কবে থেকে রাখা শুরু করেছে মি-স অরুনিকা? আপনার দেখছি কথাবার্তার মতোন বুদ্ধিটাও হাঁটুতেই রয়ে গিয়েছে।’
অরু এবার ভয়ানক রেগে গেল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-‘বস যদি সেই এমপ্লয়ির হাজবেন্ড হয়, আর তাকে উঠতে বসতে বিরক্ত করতে থাকে, যাতে তার ইচ্ছে করে লেইট হয় অফিসে, তখন বেচারি এমপ্লয়ির কি করার থাকবে স্যার?’
শুভ্র এবার ধমকে উঠল,
-‘এটা আপনার বাসা না। আর না এখানে কেউ আপনার সো কল্ড ‘ডিয়ার হাজবেন্ড’। একে লেইট করেছেন, তারউপর মিসবিহ্যাভ কি করে করেন আপনি?’
অরু এবার চুপ করে গেল। সে চায় না, এসব বাড়াবাড়ি পর্যায় যাক এখন। সে শান্ত-শিষ্ট গলায় বলল,
-‘আপনি তো জানেন, কেন দেরি হয়েছে। মাঝ রাস্তায় আমাকে ওভাবে নামিয়ে দিয়েছিলেন, কতো কষ্টে আমি এড্রেস খুঁজে খুঁজে অফিসে এসেছি। স্টিল আপনি আমাকে জেরা করবেন?’
শুভ্র দু’হাতের কনুই টেবিলে রেখে ভাজ করে হাতের উপর থুঁতনি রাখলো। ফিচলে হেসে বলল,
-‘মিসেস, আম্— মিস অরুনিকা। আপনি মিস না মিসেস, আমার তাতে বিন্দুমাত্রও যায় আসে না। লেট মি রিমাইন্ড ইউ ওয়ান্স এগেইন, দিস নট ইউর হাউজ; সো, ইউ বেটার বিহ্যাভ ইউর সেলফ্।’
অরু নিজের এবার স্ব-বেগে সামনে এসে দাঁড়ালো। নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলল,
-‘আমি কি ভুল বললাম? আমার কি দোস এখানে? সবেতে আমার দোষ দেখেন কেন আপনি?’
শুভ্র তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
-‘কেউ নিজের অফিসের বসের সাথে এমন করে কথা বলে, বা এমন আচরণ করে? ইম্প্রেসিভ!’
শুভ্র কথাটুকু কোনোমতে শেষ করে, কপাল চেপে বিরবির করল,
-‘গড!’
মুখ তুলে অরুর দিকে তাকালো। তার চুপসে আসা মুখ আরো চুপসে দিতে বলল,
-‘ইয়্যু নো হোয়াট? আমি আপনার মতো ম্যানারলেস, ইরেসপন্সিবল কাউকে এখানে, আমার অফিসে ইন্টার্নশিপের জন্য হায়ার করতে একদমই চাইনি। তবে আল্লাহর রহমতে আমার বাবা যা! তার জন্য আপনাকে এখানে আমাকে এখন সহ্য করতে হচ্ছে। এন্ড সো স্যাডলি, আমি চাইলেও আপনাকে বের করতে পারছি না।’
অরু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, শরীরটা পাথরের মতো ভারি হয়ে গেছে। চোখের পাতায় কেমন এক ঝাপসা আসছিল। অপমানে মুখ নীল হয়ে গেলো যেন। সে চোখ-মুখ শক্ত করে তাকিয়ে রইল। শুভ্র চোখ সরালো। ডেস্কে রাখা বেশ কয়েকটা ফাইল নিয়ে উঠে অরুর সামনে এসে দাঁড়ালো। অরু কাঠ মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে তখনও। শুভ্র মুচকি হেসে তার হাতে ফাইলগুলো ধরিয়ে দিল। ভারি ফাইলগুলো হুট করে নিয়ে দাঁড়াতে হিমসিম খাচ্ছিলো অরু। শুভ্র টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকালো। বুকে আড়াআড়ি হাত গুঁজে এবার বলল,
-‘এই ফাইলগুলো সলভ্ করে আমাকে সন্ধ্যার মধ্যে দেখাবেন। আমি কোনো ভুল চাই না এখানে। মাইন্ড ইট। নাও লিভ।’
রাগে, ঘৃণায় অরুর নাকের পাটা ফুলে উঠলো। চোখগুলো কেমন করছে। কান্না পেয়ে যাচ্ছে তার। এমন মানুষ হয়? এতো নিকৃষ্ট? অরু দরজা খুলে, ওভাবেই বেরিয়ে যাচ্ছিলো দ্রুত পায়ে। তখনই শুভ্রর ডাকে তাকে,
-‘আ—ওয়েট।’
অরু থেমে গেল। মুখ কুঁচকে ফিরে তাকালো৷ শুভ্র আঙুলের ইশারায় দরজা দেখিয়ে বলল,
-‘বন্ধ করে, তারপর যান।’
অরু রাগে তিরতির করে কাঁপছে। পেছনে মুড়ে এসেই ঠাস করে দরজা লাগাতে নিলে শুভ্র আবার বলল,
-‘ঠিক করে।’
অরু দাঁতে দাঁত পিষে তাকালো। ঠিক করেই দরজা আটকে চলে এলো। শুভ্র সবটাই দেখলো৷ নৈঃশব্দ্যে হেসে ফেললো।
অরু নিজের ডেস্কে এসে ধরাম করে ফাইলগুলো রাখলো। পাশের ডেস্কে বসে কিবোর্ডে টাইপ করতে থাকা মিশমি, এমন শব্দে চমকে উঠলো। পাশ ফিরে তাকাতেই রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকা অরুকে দেখলো। আশেপাশে চেয়ে দেখলো কয়েকজন তাকিয়ে আছে অরুর দিকে। মিশমি তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিজেদের কাজে মনোযোগ দিলো। মিশমি উঠে এলো চেয়ার ছেড়ে। অরুর কাছে এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-‘কি হয়েছে?’
অরু চেয়ারে বসে পড়লো। আচমকা মুখে দু’হাতে ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। মিশমি তার হঠাৎ কান্নায় চমকালো। অরুর কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-‘কি হয়েছে অরু? কাঁদছো কেন?’
অরু চোখ মুছে তাকালো তার দিকে। মিশমি চেয়ার টেনে তার সামনে বসে। প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে,
-‘কি হয়েছে? শুভ্র স্যার কিছু বলেছে?’
অরু এবার তীব্র ঘৃণার প্রকাশ ঘটালো,
-‘উনি আবার না বলে কখন থেকেছেন? এতো জঘন্য ঐ লোক! মিশমি, আমার সত্যি বলতে জানো; মন চাইছিলো ঠাটিয়ে একটা চড় বসাই ঐ লোকের গালে।’
মিশমি হতবাক হয়ে গেলো,
-‘আস্তে আস্তে। শান্ত হও। হয়েছেটা কি? এতো রেগে আছো কেন? কি করেছে স্যার?’
অরু সব বলতেই নিচ্ছিলো। মাঝ পথে শুভ্র করা ওয়ার্নিং মনে পড়ে গেল। সে থেমে গেল। কথাটুকু কোনোমতে পাড় করডে বলল,
-‘অপমান করেছে।’
-‘কেন?’
-‘লেইট হয়েছে বলে। তাও কতক্ষণ জানো? মোটে সাত মিনিট। তুমি বলো, সাত মিনিট দেরি কি কারো কোনো ভাবে হতে পারে না?’
মিশমি হতাশার শ্বাস ফেললো,
-‘সে হতেই পারে। দেরি হওয়া কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার-স্যাপার না। হতেই পারে।’
-‘তবে?’
-‘এটা স্যারকে কে বোঝাবে বলো? উনি খুব পাংচুয়াল। কেউ কোনোরকম একটু কোনো কাজ এদিক-সেদিক করতে পারে না। যদি করে ঐদিন আর স্যার তাকে আস্ত রাখে না।’
অরু পাংশুটে মুখে চেয়ে বলল,
-‘ওনার ব্যবহার সবার সাথেই এমন?’
মিশমি অনিহায় মাথা দোলায়,
-‘জ্বি-ই।’
এরপরই অরুর পেছনে তাকাতেই আঁতকে উঠল। শুভ্র দাঁড়িয়ে। শিট! শিট! শিট! মিশমি কোনোমতে চেয়ার ছেড়ে উঠতে হাতলে হাত দিয়েছিলো, শুভ্র হাতের ইশারায় তাকে বসতে বলল। কৌশলে বুঝিয়ে দিল, এখন সামান্য নড়াচড়া করেও যদি সে সামনের ব্যক্তিকে তার ব্যাপারে জানান দেয়, শুভ্র তাকে সেই সেকেন্ডেই সেই বিখ্যাত কোরিয়ান সিরিজ ‘স্কুইড গেমে’র মতোএলিমিনেট করে দিবে। এতো আর যে সে এলিমিনেট করা নয়, বরং উপর ওয়ালার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দেওয়া। মিশমি চুপটি মেরে বসে পড়লো। অরু আপনমনে বলে গেল,
-‘খুবই বাজে ব্যাপার তো! আল্লাহ ওনার মতো লোককে একটু সুবুদ্ধি দিক। এতো মানুষের ঘুম হারাম করে ওনার কি লাভ? এভাবে মানুষের সাথে ব্যবহার করলে টপকে যেতে বেশি সময় লাগবে না।’
মিশমি মুখ কুঁচকে ফেলল। অরু কথা বলতে বলতেই তার দিকে তাকালো৷ মুখ কুঁচকাতে দেখে কপাল কুঁচকালো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-‘কি?’
মিশমি ভ্রু কেমন করে যেন তাকে পেছনে তাকাতে ইশারা করলো। অরু ইঙ্গিত বুঝে পিছে তাকাতেই আঁতকে উঠল। শুভ্র তাকে তাকাতে দেখেই ভ্রু নাচালো৷ অরু ততক্ষণাৎ সামনে ফিরে চেয়ারের দিকে নুইয়ে বসলো। শুভ্র এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-‘এখন লুকিয়ে কি লাভ মিস অরুনিকা? I’ve heard everything.’
অরু নড়লো না। শুভ্র ধমকে উঠলো এই পর্যায়ে,
-‘গেট আপ!’
অরুর বুকের ভেতরটা যেন ছলকে উঠলো। সে মুখ কাচুমাচু করে ঠিক হয়ে দাঁড়ালো৷ আশেপাশে তাকালে দেখলো, সকলে চেয়ে আছে তার কেমন করে। অরুর এই পর্যায়ে আরো কান্না পেয়ে গেল। সে শুভ্রর দিকে ছলছল চোখে তাকায়। শুভ্রর বুঝি একটুও মায়া-দয়া হলো না। সে গম্ভীর গলায় ইংলিশে গড়গড় করে বলে গেল ত্যক্ত বাক্যগুলো,
-‘যেই ফাইলগুলো দিয়েছি, ওগুলো সন্ধ্যা না। বিকালের আগেই শেষ করবেন। কিভাবে করবেন, কি করে কি হবে; আমার কোনো যায় আসে না। যার থেকে ইচ্ছে হেল্প নিন৷ বাট, আই নিড টু গেটস দ্য ওয়ার্ক ডান।’
অরু চোখ নামিয়ে নিলো। শুভ্র ভ্রু কুঁচকায়,
-‘গট ইট অর নট?’
-‘ইয়েস স্যার।’
অরু দাঁত পিষে বলল। শুভ্র ফিঁচলে হাসল,
-‘গুড।’
অরু বাড়ি ফেরে বিকালে। নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলো। এসেই বিছানায় সটান করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আজকে যেই পরিমাণ খাটিয়েছে তাকে শুভ্র, অফিসে যাওয়ার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছে। এতো কঠিন কঠিন সব কাজ! প্রথম দিনেই এতো কাজ কেউ কি করে দেয়? অরুর নিজেকে এতো অসহায় লাগছে! আঙ্কেল-আন্টি এখানে এনে শুভ্রর কাঁধে তাকে কেন গছিয়ে দিলো? সে এতকিছুর চরম দুঃখে বিছানায়া টানা তিন মিনিট গড়াগড়ি করলো। এরপর উঠে বসলো তড়াক করে। পিছে তাকিয়ে দেখল, ভেজা চুলে বিছানার কিছু কিছু অংশ ভিজে গিয়েছে। এখনও চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। অরু এবার বিরক্ত হলো খুব। উঠে গিয়ে চেয়ার থেকে তোয়ালে নিয়ে কোমড় ছাড়ানো চুলগুলো ভালো করে মুছে নিলো। তখনই দরজায় নক হলে সে বিরক্তিকর ফাঁপা শ্বাস ফেলল। গিয়ে দরজা খুলে দিলো। শুভ্রকে সামনে দেখে স্বাভাবিক মুখ-চোখ হয়ে এলো তূলনামূলক শক্ত। অরু ভ্রু কুঁচকায়,
-‘জ্বি?’
শুভ্র বলল,
-‘নাস্তা দেওয়া আছে টেবিলে। খেতে এসো।’
বলে দাঁড়ালো না সে। চলে গেলো। অরু মুখ খিঁচিয়ে সেদিকে চেয়ে রইল৷ অতঃপর সকালের ঘটনা মনে পড়তেই সে হুড়মুড়িয়ে হেঁটে ডাইনিংয়ের কাছে চলে গেলো। দেখল শুভ্রকে। টেবিলে কফির মগ রাখা, তার সামনে ল্যাপটপ রাখা। নিজ মনে টাইপ করছে। এর মাঝে দু’বার কি তিনবার, কফিতে চুমুকও দিয়েছে। অরু এসেই ক্ষেপে বলল,
-‘আপনি এমন কেন?’
শুভ্র চমকে গেলো,
-‘স্যরি?’
-‘আমার সাথে সারাদিন মিসবিহ্যাভ করে; নাও ইউ আর টকিং লাইক, ইট ওয়াজ নাথিং!’
শুভ্র ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
-‘তো?’
অরুর রাগ এবার পাহার ডিঙালো,
-‘আপনি আমাকে সবার সামনে অপমান করেছেন। আপনার এতে কোনো যায় আসে না? এভাবে কারোর সাথে থাকা যায়? সিরিয়াসলি শুভ্র?’
শুভ্র বিশেষ ভাবাবেগ দেখালো না। নির্লিপ্ত থেকে বলল,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৬
-‘না থাকতে পারলে থেকো না। চলে যাও।’
অরু অবিশ্বাস চোখে চাইলো,
-‘কি?’
-‘লিভ ফ্রম মাই হাউজ। গো এহেএএড!’
