Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৮
Jannatul Firdaus Mithila

আধারের অন্ধকার ছাপিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। অথচ কাল সারাটা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি কবির সাহেব। পারবেনই বা কিভাবে? গতকাল রাতের দেখা ঘটনাটি যে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তিনি।যতবার চোখদুটো বন্ধ করতে চেয়েছেন ঠিক ততবার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠেছে গতরাতের ঘটনা। কবির সাহেব ধীরে ধীরে শোয়া ছেড়ে উঠে বসেন। ঘাড় বাকিয়ে পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীর পানে তাকালেন একবার। ইশশ্ বেচারি গতকাল তার জন্য কি চিন্তিতই না হয়ে পড়েছিলেন।সে-তো কবির সাহেব বারবার করে “ ঠিক আছি” বলায় কোনরকমে শান্ত হয়েছিলো। এইতো ভোর হবার কিছুক্ষণ আগেই চোখ দুটো লেগে এসেছে জুবাইদা বেগমের।কবির সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। তারপর ক্লান্ত দেহটা নিয়ে চলে গেলেন ওয়াশরুমের দিকে।

“ সে কি রে? তোরা আমায় একটিবারও ডাকলি না কেনো? আহারে! একা একা এতোগুলাে রান্না করতে কষ্ট হয়েছে না ভিষণ?”
জুবাইদা বেগমের কথায় মুচকি হাসলো রাফিয়া বেগম। তার পাশে থাকা মাইমুনা বেগমও হাসলেন একটুখানি। তিনি আবার ব্যস্ত হাতে রুটি সেকছেন। জুবাইদা বেগম উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখতে লাগলেন দু-জা’য়ের কর্মকান্ড। তখনি রাফিয়া বেগম তরকারির কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ানো অব্যাহত রেখে পেছনে ঘুরলেন। জুবাইদা বেগমের পানে তাকিয়ে আলতো হেসে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ তুই তো রোজ তারাতাড়ি করেই উঠিস।আজকে ওমন বেলা করে শুয়ে ছিলি বিধায় ভাবলাম শরীরটা বোধহয় খারাপ লাগছে তোর।তাই আর আগ বাড়িয়ে ডাকিনি তোকে! আচ্ছা এবার বল তো, তোর শরীর ঠিক আছে?”
জুবাইদা বেগম মুখটা মলিন করে নিলেন।মলিন মুখেই কিচেন কাউন্টার থেকে একটা গ্লাস পুরিয়ে ঢকঢক করে পানিটা গিলে নিলেন পুরোটা।তারপর কেমন চিন্তিত গলায় বললেন,
“ আর বলিস না! আমি আলহামদুলিল্লাহ সুস্থই আছি কিন্তু রোদের আব্বুর শরীরটা বোধহয় খারাপ যাচ্ছে। এইতো গতকাল মধ্যরাতে দেখলাম ঘুম ছেড়ে বসে আছেন মাথা নিচু করে। আমি ঠিক কতবার করে জিজ্ঞেস করলাম — কেনো ওভাবে বসে আছে?

কিন্তু মানুষটা প্রতিত্তোরে কিছুই বললো না! হয়তো আমি চিন্তা করবো বিধায় বলতে চাচ্ছিলো না আমাকে।”
কথাটা বলে ফোঁস করে এক ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেললেন জুবাইদা বেগম। এদিকে তার এমন কথা শুনে চিন্তায় পড়লেন রাফিয়া বেগম ও মাইমুনা বেগম। মাইমুনা বেগম তো রুটি সেকা বাদ দিয়ে বলেই বসলেন,
“ বড় বু! তুমি রোদকে জানিয়ো কিন্তু বিষয়টা!”
জুবাইদা বেগম নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে লাগলেন স্বামীর কথা!

ডাইনিং রুমে উপস্থিত বাড়ির সকলে।যে যার মতো বসে পড়েছে ব্রেকফাস্ট সারতে।রৌদ্র ব্যস্ত হাতে খাবার বাড়ছে নিজের পাতে।দুয়েকবার যদিও আড়চোখে তাকাচ্ছে মুখোমুখি হয়ে বসে থাকা অরিনের দিকে। অরিন তো খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মুখ ভেংচি দিয়ে যাচ্ছে রৌদ্রকে।রৌদ্র মুচকি হাসে মেয়েটার কর্মকাণ্ডে। প্রায় মিনিট দশেক পর ডাইনিং রুমে উপস্থিত হলেন কবির সাহেব। হাতদুটো তার পেছন দিয়ে কোমরের ওপর বেধে রাখা।তিনি গম্ভীর মুখে বসে পড়লেন নিজ আসনে। হাত বাড়িয়ে খাবারের প্লেট সামনে এনে একপলক আড়চোখে তাকালেন রৌদ্রের দিকে। দেখতে পেলেন — ছেলেটা খাবার খাচ্ছে কম, অরিনের দিকে তাকাচ্ছে বেশি! কবির সাহেব তৎক্ষনাৎ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আনলেন ছেলের ওপর থেকে। মানুষটার গম্ভীর মুখের আদলে ফুটে ওঠলো খানিকটা রাগীভাব! তিনি নাক ফুলিয়ে সাব্বির সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,

“ সাব্বির!”
সাব্বির সাহেব খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পাশে বসা তায়েফ সাহেবের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিলেন।এরইমধ্যে হুট করে বড় ভাইয়ের ডাক কানে আসতেই সেদিকে ফিরলেন তিনি।বাধ্যগত মানুষের মতো বললেন,
“ জ্বি ভাইজান!”
“ তোর খাওয়া শেষ হলে আমার রুমে আসিস।জরুরি একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো তোর সঙ্গে।”
সাব্বির সাহেব হ্যা-সূচক মাথা নাড়ালেন।তারপর ফের মনোযোগ টানলেন নিজের খাওয়ার দিকে।

কবির সাহেব বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন।মানুষটার চোখে আটাঁ মোটা ফ্রেমের চশমা,আর মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাবসাব। সামনের টেবিলের ওপর রাখা আছে গরম ধোঁয়া ওঠা এক-কাপ লাল চা।তিনি পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এক-দু চুমুক নিচ্ছেন চায়ের কাপ থেকে।ঠিক সেই সময় সাব্বির সাহেব রুমে এসে উপস্থিত হলেন। আশে-পাশে একবার নজর বুলিয়ে বড় ভাইকে খুঁজলেন কিন্তু পেলেন না। তাই তিনি মৃদু স্বরে ডাকলেন,
“ ভাইজান?”
কবির সাহেব পত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে নজর উঠালেন।গলায় মৃদু খাঁকারি তুলে বললেন,
“ বারান্দায় আয়!”
সাব্বির সাহেব ভাইয়ের আওয়াজ পাওয়া মাত্রই বারান্দায় ছুটলেন। তাকে দেখে কবির সাহেব পত্রিকাটি ভাজঁ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। গম্ভীর মুখে ছোটো ভাইয়ের পানে তাকিয়ে বললেন,

“ ঘরের দরজাটা ভেতর দিয়ে লাগিয়ে দিয়ে আয়!”
এপর্যায়ে সাব্বির সাহেব খানিকটা চিন্তিত হলেন।কপালে তার দেখা মিললো দু-তিনেক চিন্তার ভাজ।তিনি মনে মনে ভাবলেন, — বড় ভাইজান কি এমন বলবে তাকে, যার জন্য ঘরের দরজা অবধি লাগাতে বলছে!
কিয়তক্ষন বাদেই সাব্বির সাহেব নিজের এহেন ভাবনার মাঝ হতে বেরিয়ে এলেন। জোরালো কদমে গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে, ফের ভাইয়ের কাছে আসলেন।পরক্ষণেই গলায় একরাশ চিন্তার রেশ ঢেলে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি হয়েছে ভাইজান?”
কবির সাহেব ভাইয়ের একহাত টেনে নিজের পাশের চেয়ারটায় বসালেন। বললেন,

“ তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ভাবছি!”
“ কি কথা ভাইজান?”
“ আচ্ছা আমার যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপর তোর ভরসা আছে তো?”
সাব্বির সাহেব বেশ অবাক হলেন এহেন কথায়। তিনি অবাক সুরে বলে ওঠেন,
“ এ আবার কেমন কথা ভাইজান? তোমার সিদ্ধান্তে আজ অবধি নাখোশ হয়েছি আমরা কেও? তাহলে আজ আবার হুট করে এমন কথা জিজ্ঞেসই বা করছো কেন?”
কবির সাহেব এবার খানিকটা নড়েচড়ে বসলেন।ছোটো ভাইয়ের হাতের ওপর হাত রেখে বললেন,

“ জানি! কিন্তু তবুও আজ জিজ্ঞেস করছি অন্য একটা কারণে!”
“ কি সেই কারণ?” — সাব্বির সাহেবের কন্ঠে স্পষ্ট লেপ্টে আছে কৌতুহল।
“ আমি অরিনের সম্বন্ধের ব্যাপারে আলাপ করতে চাইছি!”
সাব্বির সাহেব থমকালেন। কিয়তক্ষন অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন ভাইয়ের দিকে।কি করে ভাইকে বোঝাবেন তিনি, — তার যে এখনি মেয়েকে বিয়ে দেবার মতো সাহস হয়নি! কবির সাহেব হয়তো বুঝলেন ভাইয়ের মনের কথাগুলো। তিনি কেমন আস্বস্তের সুরে বলতে লাগলেন,
“ আমি জানি তুই কি ভাবছিস! কিন্তু এটাই তো সত্যি, আজ নাহয় কাল মেয়েদের তো বিয়ে দিতেই হবে! তাছাড়া ছেলের পরিবারের মানুষও বেশ ভালো। এমনকি তুইও চিনিস ওদের। ”
সাব্বির সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ কার কথা বলছো ভাইজান?”
“ আকাশ! ঐযে আমাদের বিজনেস পার্টনার জনাব তৌসিফ মির্জার বড় ছেলে। আকাশ মাহমুদ! ক্লাউড ইন্জিনিয়ার।ছেলেটা দেখতে যেমন ভালো,ঠিক তেমনি চারিত্রিক দিক দিয়েও বেশ ভালো।এখন তুই বল আমি কি আগাবো ব্যাপারটা?”
সাব্বির সাহেব মৃদু ঢোক গিললেন।শুষ্ক অধরজোড়া জিভ দিয়ে কোনমতে ভিজিয়ে নিয়ে বললেন,
“ ইয়ে… মানে.. ভাইজান বলছিলাম যে, এতো তারাতাড়ি…!”
তার কথা শেষ হবার আগেই কবির সাহেব মুখে টেনে নিলেন কথাটা।বললেন,
“ আরে, তারা তো এখনি মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে না! তারা আপাতত কাবিনটা করে রাখতে চাইছে।তারপর মেয়ের পড়াশোনা শেষ হলে তুলে নিয়ে যাবে আরকি!”

এহেন একটা কথায় বুঝি বেশ স্বস্তি পেলেন সাব্বির সাহেব। তিনি খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“ তাহলে ঠিক আছে ভাইজান! আমার অরির যদি এ নিয়ে কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমারও কোনো আপত্তি নেই!”
এহেন কথায় বুঝি বেশ অসন্তোষ হলেন কবির সাহেব। তার সম্পূর্ণ মুখের অভিব্যাক্তিই কেমন যেন পাল্টে গেলো নিমিষেই। তিনি গম্ভীর হয়ে চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিলেন।কপালের কাছে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলে ওঠেন,
“ ঠিক আছে! আমি কথা বলবো অরির সাথে!”
সাব্বির সাহেব মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। তারপর হুট করেই কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠেন,

“ তা ভাইজান! কবে আসবে তারা?”
“ আজই!” — কবির সাহেব আগের মতো গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলেন।
সাব্বির সাহেব অবাক হলেন ভাইয়ের কথায়।অবাক কন্ঠে বলে বসেন,
“ আজকেই? না মানে.. বলছিলাম, এতো কম সময়ের মধ্যে কিভাবে কি করবো? আরকি, একটু গোছগাছেরও তো ব্যাপার আছে তাই-না?”
কবির সাহেব কপাল থেকে হাত সরালেন এবার।ছোটো ভাইয়ের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললেন,
“ সব হয়ে যাবে! শুধু সময়ের অপেক্ষা!”

সময় বেলা ১১ টা!
অরিন বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে, মোবাইল স্ক্রল করতে করতে গুনগুন করে যাচ্ছে একমনে। আজ কেনো যেন তার ইচ্ছে করছে না ভার্সিটি যেতে। অরিন ফোন স্ক্রল করতে করতে বেশ লম্বা একটা হামি টানলো। সকাল সকাল ঘুম ছেড়ে উঠে পড়ায় এখন বুঝি চোখদুটোতে তন্দ্রা নামছে খানিকটা। অরিন ফোনটা হাত থেকে সরিয়ে বালিশের পাশে রাখলো। মুখটা বালিশের মাঝে গুঁজতেই হঠাৎ করে কল্পনার মানসপটে ভেসে ওঠলো রৌদ্রের সুশ্রী মুখখানা। অরিন চোখ বন্ধ রেখেই মুচকি হাসলো। ঠিক তখনি এক গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো ঘরের দরজার সামনে থেকে।

“ অরি!”
অরিন হকচকায়।তড়িঘড়ি করে শোয়া ছেড়ে উঠে বসে বিছানায়। হাত দিয়ে গায়ের ওড়নাটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কবির সাহেবের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেশ টেনে বলে ওঠে,
“ জ্বি বড় আব্বু! কিছু বলবে?”
কবির সাহেব গম্ভীর মুখে রুমে ঢুকলেন। অরির বিছানার কাছ হতে খানিকটা দূরে দাড়িয়ে রাশভারী কন্ঠে বললেন,
“ তোমার সাথে কিছু কথা আছে!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বসলো।উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো,
“ হ্যা,হ্যা বলো কি বলবে!”
এপর্যায়ে কবির সাহেব থামলেন একটুখানি। চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন অরিনের দিকে। তার ওমন দৃষ্টি দেখে ভড়কে গেলো অরিন। বুকটায় কেমন হুট করেই মোচড় দিয়ে ওঠলো খানিকটা। আচ্ছা হঠাৎ করেই এমন একটা অনুভুতি আসছে কেনো তার মধ্যে? এ আবার নতুন কোনো ঝড় আসবার পূর্ব লক্ষণ নয়তো?

বাড়ির পরিবেশ ভিষণ জমজমাট।গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন রান্নাঘরে। চার জা মিলে হাতে হাতে কাজগুলো করে নিচ্ছেন ভাগ-বাঁটোয়ারা করে।সবার মধ্যেই ভিষণ উৎকন্ঠা! কেও এমন হুটহাট সম্বন্ধ নিয়ে আসার কথা বলে? এইটুকুন সময়ের মধ্যে কিভাবে এতোগুলো কাজ সামাল দিবেন তারা?
রাইসা বেগম টেবিল গোছানো শেষে ছুটে এলেন রসুইঘরে। তারপর নিজ উদ্যোগে হাত বাটাতে লাগলেন বাকিদের সঙ্গে।

জুবাইদা বেগম রোস্টের প্যানে হালকা একটু ঘি ছড়িয়ে ঢাকনাটা দিয়ে দিলেন আবারও। হাতে থাকা স্প্যাচুলাটা নামিয়ে রেখে শাড়ীর আঁচলে ঘর্মাক্ত মুখখানা কোনমতে মুছলেন। এদিকে রাফিয়া বেগম হাতে গ্লাভস পড়ে বালুসাই মিষ্টিটা মাখছেন। এইতো আরেকটু পরেই গরম তেলে ছেড়ে দিবেন সেগুলো।মিষ্টি বানানোর একপর্যায়ে হাতে একটা কাঠি নিয়ে তেলটা পরোখ করে নিলেন তিনি। যাক! তেলটা একেবারে পারফেক্ট আঁচে আছে মিষ্টিগুলো দেবার জন্য! তিনি একে একে মিষ্টি গুলো দিয়ে দিলেন তেলের ওপর।
খানিকটা দূরে দাড়িয়ে কাচের বাসন-কোসন পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে, সেগুলোকে ভালো করে পরিষ্কার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিচ্ছেন মাইমুনা বেগম।
এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন কবির সাহেব। গম্ভীর হয়ে খানিকটা উঁচু গলায় বললেন,

“ রান্না-বান্না কতদূর হলো তোমাদের?”
জুবাইদা বেগম চুলার কাছ থেকে সরে এলেন কিছুটা। স্বামীর সামনে এগিয়ে এসে বললেন,
“ এইতো প্রায় শেষের পথে!”
কবির সাহেব মাথা নাড়লেন। গম্ভীর হয়ে চলে যেতে নিলেই পেছন থেকে জুবাইদা বেগম বলে ওঠেন,
“ বলছি রোদের আব্বু! ছেলেদুটোকে ফোন দিয়ে চলে আসতে বলেছো তো? ”
থামলেন কবির সাহেব। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরে কোনরকমে বললেন,
“ তারা সময়মতো চলে আসবে! তোমরা নিজেদের কাজ করো!”

জুবাইদা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন।রোদের আব্বুর ব্যাবহারটা আজ কেমন অন্যরকম ঠেকছে তার কাছে! ব্যাপারটা কি? তারওপর কাওকে তেমন কোনো আগাম সংকেত না দিয়েই এতো ব্যস্ত হয়ে মেয়েটার জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসলেন কেনো তিনি? সবেমাত্র কয়েকটা দিন আগে রুহিটার বিয়ে গেলো,মেয়েটাতো এখনো দেশেই ফিরলো না, এরইমধ্যে তিনি সম্বন্ধও নিয়ে আসলেন?
জুবাইদা বেগম ভাবুক হয়ে ডাইনিং এর একটি চেয়ারে বসলেন। কিয়তক্ষন বাদে রাফিয়া বেগম কাজ থেকে একটু বিরতি নিতে ডাইনিং এ আসলেন। তখনি তার দৃষ্টি আঁটকে গেলো চেয়ারে বসে থাকা জুবাইদা বেগমের দিকে।মানুষটাকে এমন চিন্তিত মুখে বসে থাকতে দেখে রাফিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন।জুবাইদা বেগমের কাঁধে হাত রাখতেই একপ্রকার চমকে ওঠেন জুবাইদা বেগম। রাফিয়া বেগমের কুঁচকে রাখা ভ্রু আরও খানিকটা কুঁচকে এলো।তিনি জুবাইদা বেগমের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়লেন তৎক্ষনাৎ। পরক্ষণেই কেমন অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন,

“ কি ভাবছিস তুই?”
জুবাইদা বেগম অসহায় চোখে বান্ধবীর দিকে তাকালেন। রাফিয়া বেগমের ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলতে লাগলেন,
“ রাফু! তোর কাছে সবটা কেমন অবাক লাগছেনা? মানে বলতে চাইছি, এতোটা তারাহুরো করে এসব করার কারণটাই বা কি? তাছাড়া রুহিটাও দেশে ফিরেনি,মেহরিনকেও বলতে পারলাম না। তেমন কাউকেই কিছু জানাতে পারলাম না! এরইমাঝে এমন হুট করে মেয়েটার জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসাটা কেমন যেন লাগছে আমার কাছে!”
রাফিয়া বেগম গম্ভীর মুখে শুনলেন সবটা।তিনি প্রতিত্তোরে তেমন কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালেন। জুবাইদা বেগম হকচকিয়ে তাকান বান্ধবীর পানে। ইশারায় জিজ্ঞেস করে, — কি হলো?
রাফিয়া বেগম গম্ভীর হয়েই মৃদু স্বরে বললেন,
“ তুই বস! আমি আসছি একটু!”

বলেই তিনি জুবাইদা বেগমকে আর কিছু বলতে না দিয়ে এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে। উদ্দেশ্য — অরির রুমে যাওয়া। প্রায় জোরালো কদমে অরিনের রুমে এসে হাজির হলেন তিনি।রুমে ঢুকতেই বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে রাফিয়া বেগমের।অদূরেই মেয়েটা কেমন বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। রাফিয়া বেগম চিন্তিত হয়ে ছুটে আসেন মেয়ের কাছে।তড়িঘড়ি করে এসেই মেয়ের পাশে বসলেন তিনি। আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতেই অরিন বালিশের মাঝ হতে মুখ তুলে চাইলো মায়ের দিকে। রাফিয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠেন মেয়েকে দেখে।মেয়েটার সুশ্রী মুখখানা কেমন লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। চোখদুটো ফুলে কলাগাছ যেন।ভাব এমন — ভিষণ কেঁদেছে হয়তো! রাফিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে শোয়া ছেড়ে উঠে বসালেন। পরক্ষণেই অরিনের গালে হাত রেখে নরম কন্ঠে বলতে লাগলেন,

“ কি হয়েছে তোর? মুখের এই অবস্থা কেনো? কাঁদছিলি তুই?”
অরিন ভেজা চোখে হাসলো কিছুটা।মৃদু নাক টেনে ঝট করে মা’য়ের বুকে আছড়ে পড়লো মেয়েটা।রাফিয়া বেগম আরেকধাপ চিন্তিত হলেন মেয়েকে নিয়ে। তিনি ব্যস্ত হয়ে বলতে লাগলেন,
“ এই অরি! কি হয়েছে মা তোর? আমায় বল সবটা।তুই কি রাজি না এই সম্বন্ধে?”
অরিন ফের নাক টানে। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে রেখে মোটা হয়ে আসা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কে বলেছে আমি রাজি নই আম্মু? আমি রাজি!”
রাফিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকালেন।মেয়েকে বুক থেকে উঠিয়ে নিজের সামনে বসালেন। অরিনের থুতনিতে আঙুল ঠেকিয়ে মুখটা কিছুটা উঁচিয়ে তুলে জিজ্ঞেস করলেন,
“ সত্যি তুই রাজি? তোর কি তেমন কিছুই বলার নেই আমাকে? আচ্ছা সত্যি করে বলতো! তোকে কি কেও জোর করছে এ সম্বন্ধের ব্যাপারে?”
অরিন তৎক্ষনাৎ ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। বলে,

“ না আম্মু! সত্যি কেও জোর করেনি! আর জোর করবেই বা কেন? যেখানে আমি নিজেই রাজি হয়েছি!”
এপর্যায়ে মুখটা কেমন শক্ত হয়ে এলো রাফিয়া বেগমের।তিনি মেয়েকে একবার আপাদমস্তক পরোখ করলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।তারপর হুট করেই শক্ত গলায় বললেন,
“ তাহলে এমন মরার মতো কাঁদছিলি কেনো?”
মায়ের এমন ঝাঁঝালো কথাতেও আলতো হাসলো অরিন।নাক টেনে হাতের উল্টো পিঠে চোখদুটো মুছে নিলো খানিকটা। তারপর বললো,
“ তোমাদের সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে তাই!”
রাফিয়া বেগম দাঁতে দাঁত চেপে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। কেন যেন মেয়েটার ওপর খুব রাগ লাগছে তার।তিনি আর কিছু না বলে চলে গেলেন মেয়ের রুম ছেড়ে।

রাফিয়া বেগম একপ্রকার ছুটে এলেন নিজের রুমে। তড়িঘড়ি করে এসে বিছানা হাতড়ে মোবাইলটা খুজতে লাগলেন তিনি।খানিকক্ষণ বাদে পেয়েও গেলেন ফোনটা।মোবাইলটা হাতে নিয়েই আর একমুহূর্ত দেরি করলেন না রাফিয়া বেগম। তড়িৎ কল লাগালেন ছেলের নাম্বারে। ওপাশে দুটো রিং হতেই কল রিসিভ করে অনিক।বলে,
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মু?”
“ অরিকে দেখতে পাত্রপক্ষ আসবে,তুই কি জানিস এটা?”
ওপাশে স্থিরচিত্তে বসে থাকা অনিক ভড়কায় মায়ের কথায়। ভড়কানো কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে,
“ কি বললে? কখন?কে আসবে ওকে দেখতে? আর আমাকেই বা জানালে না কেন?”
রাফিয়া বেগম এতক্ষণে ঘটনা কিছুটা হলেও আচঁ করতে পারলেন যেন।তিনি অনিকের প্রশ্নের কোনরূপ জবাব না দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ তারাতাড়ি রোদকে নিয়ে বাড়ি ফির! আ’ম ওয়েটিং…! ”

বিকেল চারটে
মির্জা বাড়ির লোকজন চলে এসেছেন এহসান বাড়িতে।কবির সাহেব সহ তার বাকি ভাইয়েরা মিলে এগিয়ে নিয়ে আসছেন তাদের। ওদিকে বাড়ির ভেতরে গৃহিণীরা যেন মুখিয়ে আছেন মেহমানদের স্বাগত জানাতে।বাকি সবাই বেশ আপ্লূত থাকলেও রাফিয়া বেগম একেবারেই নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক কোণে।মানুষটা বারেবারে ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন।হয়তো সময় দেখছেন নয়তো বা কারো জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর তৌসিফ মির্জা, তার স্ত্রী হামিদা মির্জা এবং তাদের বড় ছেলে আকাশ, আর একমাত্র মেয়ে মাহা এসে প্রবেশ করেন বাড়ির ভেতরে।তারা এসে বসেন ড্রয়িং রুমে। তাদেরকে দেখেই গৃহিনীরা এসে সহাস্য মুখে কুশলাদি বিনিময় করতে লাগলেন সকলের সঙ্গে। কুশলাদি বিনিময় পর্ব শেষ করে টুকটাক কথাবার্তা বলতে লাগলেন সকলে মিলে।

ঠিক তখনি, এলোমেলো চুলে, জুতো পায়েই হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে রৌদ্র।তার পেছন পেছন ছুটে আসে অনিক। রৌদ্র কেমন বুক ফুলিয়ে হাঁপাচ্ছে! হয়তো খুব দ্রুত ছুটে এসেছে বাড়িতে। তাকে এভাবে, এমন অবস্থায় দেখে ভড়কালেন উপস্থিত সকলে। তৌসিফ মির্জা তো হা করে তাকিয়ে আছেন রৌদ্রের দিকে।হয়তো ভাবছেন — ছেলেটা এতোবড় হয়েও ম্যানার্সের বালাই জানেনা? এভাবে জুতো পায়ে বাড়িতে ঢুকে কেও?
প্রায় মিনিট খানেক বাদে কবির সাহেব গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ান।ছেলের দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে বলে ওঠেন,
“ রুমে যাও! ফ্রেশ হও তারপর…. ”
তার কথা শেষ হবার আগেই রৌদ্র তার দিকে তাকায় রক্তবর্ণ হয়ে আসা চোখদুটো দিয়ে। কবির সাহেব সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। রৌদ্রের শ্যামবরণ মুখশ্রীটা কেমন যেন লাল হয়ে গেছে! চোয়ালটাও ফুটে উঠেছে শক্তভাবে। রৌদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,

“ উনাদের আসতে বলেছে কে?”
উপস্থিত সবাই বুঝি হা হয়ে গেলেন এহেন কথায়। সাব্বির সাহেব তো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন রৌদ্রের দিকে। তাশরিক সাহেব ছুটে আসেন রৌদ্রের নিকট।গম্ভীর গলায় বলেন,
“ কি হচ্ছেটা কি রোদ? তুমি হঠাৎ এমন বিহেভ করছো কেন? দেখো মেহমানরা কিন্তু বাজে ভাবে দেখছে বিষয়টা!”
তাশরিক সাহেবের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে রৌদ্র একপ্রকার বজ্র কন্ঠে বলে ওঠে,
“ হু দা হেল কেয়ারস এবাউট দেট ফা*কিং বুলশিট চাচ্চু? আমার অরিকে দেখতে আসার সাহস আসে কোত্থেকে ওনাদের?”

ব্যস! এইটুকু কথাই বুঝি যথেষ্ট ছিলো পুরো এহসান বাড়িতে বজ্রপাত ঘটানোর জন্য।উপস্থিত সকলে একপ্রকার চমকে ওঠে বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। তৌসিফ মির্জা রাগে-অপমানে মুখ লাল করে তাকিয়ে আছেন কবির সাহেবের দিকে।এভাবে বাসায় ডেকে এনে অপমান করানোর মানেটাই বা কি? তারা তো আসতেও চায়নি এমন তারাহুরো করে, সে-তো কবির সাহেব রিকুয়েষ্ট করে বললো বিধায় চলে আসেন তারা।কিন্তু এখানে এসে তো মনে হচ্ছে— বেশ বড়সড় একটা অপমান হবেন তারা!
কবির সাহেব এবার মুখ খুললেন। দাঁত কিড়মিড় করে ছেলেকে বললেন,
“ বিহেভ ইউরসেলফ রোদ! বাসায় মেহমান আছেন।তাদের সামনে নিজেকে এভাবে বখাটেদের মতো প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছো কেন?”

রৌদ্র বুঝি ফুঁসে ওঠে আরেকটু। সে তৎক্ষনাৎ জোরালো কদমে এগিয়ে আসেন তৌসিফ মির্জার সামনে। তারপর একহাত বুকে চেপে,অন্যহাত পেছনে নিয়ে বেশ কায়দা করে বলতে থাকে,
“ দুঃখীত আঙ্কেল! আপনারা যেই মেয়ের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে এসেছেন সেই মেয়ে আগা থেকে গোড়া পুরোটাই আমার! আমি বাদে তাকে অন্য কারোর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া তো দূর, এমন কথা চিন্তাও যদি করা হয়, তাহলে আমি — এই ইফতেখার এহসান রৌদ্র ভুলে যাবো আমার সকল লিমিট! তাই বলছি,প্লিজ এখান থেকে সসম্মানে চলে যান আদারওয়াইজ আরেকটু পর হয়তো আমি সম্মান নাম বিষয়টাকে একেবারেই ভুলে যাবো!”
এমন এক হাঁটুর বয়সী ছেলের থেকে ওমন ত্যাড়া-ব্যাকা কথা আর হুমকি পেয়ে খানিকটা গর্জে উঠেন মির্জা সাহেব।তিনি শক্ত চোখে কবির সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“ এভাবে বাসায় এনে অপমান করানোটা কি সত্যিই দরকার ছিলো মিঃএহসান? আমি কিন্তু এই দিনটার কথা কোনোদিনও ভুলবোনা!”
কথাটা বলেই তিনি একপ্রকার মারমার করে বেরিয়ে গেলেন এহসান বাড়ি থেকে। পেছন পেছন তার পরিবারও ছুটে গেলো তার সঙ্গে। এদিকে রৌদ্র ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। কবির সাহেব ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে ভিষণ চটে গেলেন।তিনি একপ্রকার তেড়ে এসে বললেন,
“ বেয়াদব! এমন ব্যাবহার কেনো করলে তুমি? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমায় আমি?”
রৌদ্র শ্লেষাত্মক হাসলো খানিকটা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে বাবার দিকে। পরক্ষণেই বাবার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে,

“ এই বয়সে এসে এতোটা ট্রিকস খাটানোটা ঠিক হয়নি তোমার আব্বু! তুমি কি ভেবেছো? আমায় না জানিয়ে, আমার অরির জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসবে আর আমি এটা টেরও পাবো না? সিরিয়াসলি আব্বু?”
রৌদ্রের এহেন কথায় ভ্রু কুঁচকালেন সাব্বির সাহেব। তিনি তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে রৌদ্রের হাতের কনুই চেপে তাকে নিজের দিকে ঘোরালেন। অবিশ্বাস্য গলায় বলতে লাগলেন,
“ রোদ! তুমি বারবার অরিকে তোমার অরি কেনো বলছো? আর হুট করে এতোটা সিনক্রিয়েট করছোই বা কেন?”
রৌদ্র এবার সটান হয়ে দাঁড়ালো। চোখ থেকে চিকন ফ্রেমের চশমাটা খুলে নিলো হাতে।তারপর জোরালো কন্ঠে জবাব দিলো,

“ কজ আই লাভ হার! উঁহু, শুধু ভালোবাসি না বরং ভিষণ ভয়ংকর ভাবে ভালোবাসি ওকে মেজো আব্বু!”
থমকালেন সাব্বির সাহেব। মধ্য বয়স্ক শরীরটা বোধহয় কেঁপে ওঠলো খানিকটা। চোখদুটোর কার্নিশ কেমন ছলছল হয়ে আসলো যেন।তিনি পিছিয়ে গেলেন দু-কদম। পেছাতে পেছাতে হুট করেই বসে পড়লেন পেছনের সোফাতে। তায়েফ সাহেব দ্রুত এসে ভাইকে আগলে নিলেন নিজের সঙ্গে। কিয়তক্ষন বাদে সাব্বির সাহেব অসহায় মুখে তাকালেন বড় ভাইয়ের দিকে। থেমে থেমে বললেন,

“ তুমি কি এসব আগে থেকেই জানতে ভাইজান?”
কবির সাহেব নিশ্চুপ।গম্ভীর মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছেন তিনি।তা দেখে সাব্বির সাহেব ফের তাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ ও ভাইজান? বলো না! তুমি কি আগে থেকেই জানতে এই ব্যাপারে?”
কবির সাহেব গম্ভীর মুখেই জবাব দিলেন,
“ হ্যা!”
ব্যস! এটুকু কথা শোনামাত্রই মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দেয় মধ্য বয়স্ক সাব্বির সাহেব। চোখজোড়া বন্ধ করে নিয়ে অসহায়ের মতো বলতে লাগলো,
“ কেনো ভালোবাসতে গেলি বাপ? কেনো ঐ পুরনো আগুনের ছাই আবারও নতুন করে নিজের গায়ে মাখতে গেলি? কেনো এই পুরনো অভিশাপে নিজেকে জড়াতে রোদ?”

শুধু এটুকুই বলতে পারলেন মানুষটা।তারপর আর কথ বলতে পারলেন না তিনি।পারবেনই বা কিভাবে? গলা যে ধরে এসেছে তার। ভাব এমন — কেও বুঝি ভিষণ জোরালো ভাবে কন্ঠরোধ করে রেখেছে তার।সাব্বির সাহেব ঝিমঝিম করা মাথাটা নিয়ে নড়েচড়ে বসলেন।রৌদ্রের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বললেন,
“ রোদ! তুই নাহয় আমার মেয়েকে পছন্দ করিস বাপ,কিন্তু অরি? ও কি তোকে পছন্দ করে?”
রৌদ্র এবার প্রবল আস্থার সাথে হাসলো খানিকটা। সে তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,
“ হ্যা! অরিও আমায় ভালোবাসে।”
এবার বুঝি মাথায় বাজ পড়লো সাব্বির সাহেবের।তিনি চট করে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।রৌদ্রের দিকে এগিয়ে এসে বলতে লাগলেন,
“ মানে? অরি যদি তোকে ভালোবেসেই থাকে তাহলে আজ এই সম্বন্ধতে ও রাজি হলো কিভাবে?”
তড়িৎ চমকে ওঠে রৌদ্র। বিস্ফোরিত নেত্রে তাকায় সাব্বির সাহেবের দিকে। গলায় একরাশ অবিশ্বাসের ছাপ ফুটিয়ে বলে,

“ অসম্ভব! তোমরাই হয়তো জোর করছো এসব বলতে!”
কবির সাহেব এবার গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন।অনিকের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ অরিনকে নিয়ে এসো এখানে।”
অনিক বুঝি এতক্ষণ এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিলো। সে তড়িৎ গতিতে ছুটে গেলো সিঁড়ি বেয়ে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর নিয়ে আসলো অরিনকে।অরিন ভাইয়ের হাতটা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো সিঁড়ির কোণে। কবির সাহেব গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসেন খানিকটা। অরিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন,
“ তুমি কি রোদকে ভালোবাসো?”

অরিন নিশ্চুপ! হয়তো ভিষণ অস্থির হচ্ছে মেয়েটা।অস্থিরতায় বারেবারে হাত কচলে যাচ্ছে সে।কিয়তক্ষন হয়ে যাবার পরও তাকে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রৌদ্র বলে ওঠে,
“ সানশাইন প্লিজ স্পিক আপ! আজ এটলিস্ট বলে ফেল সবটা।”
কবির সাহেব একবার আড়চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর আবারও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ কিছু জিজ্ঞেস করছি অরিন! তুমি কি রোদকে ভালোবাসো?”
“ না!”

থমকায় রৌদ্র। একমুহূর্তের জন্য নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলো ছেলেটা। তার মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে এখন।কি শুনলো সে? অরিন কি সত্যি না বললো? রৌদ্রের নিশ্বাস ভারি হয়ে আসে ক্রমাগত।
সে এদিক ওদিক তাকায় এলোমেলো দৃষ্টিতে।বুকটায় কেমন যেন তীরের মতো বিঁধছে কিছু একটা।তার চোখদুটোও কেমন অস্থির হয়ে উঠে তৎক্ষনাৎ। সে একহাতে বুকের বাঁ-পাশটা ঢলতে থাকে ক্রমাগত। কি হচ্ছে এই যুবকের সাথে? বুকের বাঁ-পাশটা কেনো ঢলছে সে? তার কি ব্যাথা হচ্ছে ওদিকে? রৌদ্র বারেবারে ঢোক গিলে। গলার কাছটা কেমন যেন ব্যাথা ব্যথা লাগছে।অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জুবাইদা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছেন।ছেলের এহেন পরিস্থিতি যে মা হয়ে দেখা বড় দায়!
রৌদ্র কাঁপা কাঁপা দেহটা নিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় অরিনের মুখোমুখি। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে পাগলের মতো বলতে থাকে,

“ ক-কি ব-বললি তুই?আআমি হয়তো ভুল শুনেছি!তুই আরেকবার বল প্লিজ!”
অরিন চুপ করে রইলো একমুহূর্ত।পরক্ষণেই মাথা নিচু রেখে কেমন শক্ত গলায় ফের বললো,
“ না! আপনি ভুল শুনেননি রোদ ভাই! আমি সত্যি আপনাকে ভালোবাসি না!”
এবার বুঝি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলোনা রৌদ্র। ছেলেটা তৎক্ষনাৎ টলমল পায়ে দু’পা পিছিয়ে যায়। টলমল শরীরটা ধরে রাখতে না পেরে হেলে পড়ে ফ্লোরে। জুবাইদা বেগম ঘর কাপিয়ে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে আসেন ছেলের কাছে।অনিকও একপ্রকার দৌড়ে এসে রৌদ্রকে আগলে নিলো নিজের সঙ্গে।তাশরিক সাহেব রক্তচক্ষু নিয়ে ছেলেটার পিঠ চাপড়ে দিতে লাগলেন। তায়েফ সাহেব সাব্বির সাহেবকে ধরে রেখেছেন সে-ই কখন থেকে।তিনি অসহায়ের মতো রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাফিয়া বেগম দৌড়ে গিয়েছেন রান্নাঘরে।ছেলেটার জন্য শরবত আনতে বোধহয়।

রৌদ্র গা ছেড়ে দিয়েছে একেবারে। তার অনিমেষ চোখজোড়া এখনো তাকিয়ে আছে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অরিনের পানে। ছেলেটার চোখদুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনাধরা। জুবাইদা বেগম হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে বুকে চেপে ধরলেন।শাড়ির আঁচলে ভেজা চোখদুটো মুছে দিলেন নরম হাতে। রৌদ্র তখন দু’হাত পিছনের দিকে হেলিয়ে ছাঁদের দিকে মুখ তাক করে বড় বড় হা করে নিশ্বাস ফেলতে থাকে ক্রমাগত। ছেলেটার সারা শরীর কেমন ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা! রৌদ্র কেমন কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগলো,
“ আম্মু! আম্মু! ও আম্মু! ধরো আমায়! আমি মরে যাচ্ছি আম্মু! আমার বুকটা কেমন ফেটে যাচ্ছে। ও আম্মু! আমার এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো? আমার মাথাটা এতো ব্যাথা করছে কেনো? আম্মু! আমি কি সত্যি মরে যাবো? মা…..”
জুবাইদা বেগম চিৎকার দিয়ে কাঁদছেন।ছেলের বুকে পিঠে হাত ডলতে ডলতে বলেন,

“ এভাবে ভেঙে পড়িস না বাবা! ধৈর্য্য ধর বাবা!”
নাহ! এতোশতো বোঝানোর পরও ছেলেটার কষ্টগুলো বাড়ছে বৈ কমছে না! রৌদ্র কেমন পাগলের মতো মাথা নাড়িয়ে বলতে লাগলো,
“ মা…মাগো…আমি সত্যি ওকে ভালোবাসি মা! ও মিথ্যা বলছে মা। আমি জানি ও আমায় ভালোবাসে। মা..আমার প্রচুর কষ্ট হচ্ছে মা।আমার নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। আমার চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। মা…আমি আর পারছিনা!”

রৌদ্রের একের পর এক আহাজারিতে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন সকলে।সাব্বির সাহেব সোফার হ্যান্ডেলে হাত রেখে তারওপর মাথা ঠেকিয়ে কেঁদে যাচ্ছেন নিঃশব্দে। কবির সাহেব অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন। পাথুরে মানবটার চোখদুটো কেমন লাল হয়ে এসেছে। আচ্ছা সে কি কাঁদছে?
অরিন আর সেখানে দাঁড়ালো না। সে একপ্রকার দৌড়ে চলে গেলো নিজের রুমে।
প্রায় মিনিট দশেক পর রৌদ্র কিছুটা স্বাভাবিক হলো।চোখের কান্নাগুলো শার্টের হাতায় মুছে নিয়ে মুখের আদলে পরিবর্তন আনলো। দৃঢ় চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে তুলে গটগট পায়ে এগিয়ে গেলো সিড়ি বেয়ে। এদিকে তাকে ওমন চলে যেতে দেখে পেছন থেকে ডাকতে শুরু করেন কবির সাহেব,

“ রোদ! দাঁড়াও বলছি।মেয়েটাকে একা ছেড়ে দাও! রোদ! ”
কথাটা বলেই তিনি সিঁড়ির দিকে এগোতে গেলে তার একহাত পেছন থেকে চেপে ধরে তাশরিক সাহেব। কবির সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন পেছনে।আর তৎক্ষনাৎ তিনি ভড়কে গেলেন খানিকটা। তাশরিক সাহেবের রক্তচক্ষু যেন চিৎকার দিয়ে তাকে বলছে — থেমে যাও ভাইজান!
অনিক রৌদ্রের পিছুপিছু ছুটে আসে অরিনের রুমের দিকে। এসেই দেখতে পায় রৌদ্র একাধারে করাঘাত করে যাচ্ছে অরিনের ঘরের বন্ধ দরজায়। কিন্তু মেয়েটা যেন পণ করে রেখেছে আজ আর দরজা খুলবেই না! অনিক শক্ত মুখে এগিয়ে আসে দরজার কাছে। পরপর দু’বার করাঘাত করে শক্ত গলায় বলে ওঠে,

“ অরি! দরজা খোল!”
এবার বুঝি টনক নড়লো অরিনের। সে দ্রুত এসে দরজাটা খুলে দিলো।আর সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ঘরে প্রবেশ করলো রৌদ্র। পেছন পেছন অনিকও আসলো।ছেলেটা আবার বুদ্ধি করে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো তৎক্ষনাৎ। রৌদ্র দৃঢ় চোয়ালটা আরও খানিকটা দৃঢ় করে নিয়ে শক্ত চোখে তাকায় অরিনের দিকে। এহেন দৃষ্টি দেখে পরপর কয়েকটা ফাঁকা ঢোক গিললো অরিন। মেয়েটা আমতা আমতা করে বললো কোনরকমে,
“ আবার কেনো এসেছেন?”
রৌদ্র আর সাত-পাঁচ না ভেবে একপ্রকার তেড়ে আসলো অরিনের দিকে। মেয়েটার চোয়াল শক্ত হাতে চেপে ধরে খেঁকিয়ে ওঠে বলে,

“কেন করলি তুই এমন? এই তোর এতোবড় কলিজা হইসে কবে থেকে,তুই আমার ভালোবাসাকে অস্বীকার করিস! এই তুই না বলেছিলি তুই আমায় ভালোবাসিস।সারাজীবন, যেকোনো অবস্থায় তুই আমার সাথে থাকবি, তাহলে আজ? আজ কি হলো তোর? আজকে কেন এমন মিথ্যা বললি তুই?”
অরিন চোয়ালের ব্যাথায় মৃদু ককিয়ে উঠে। তা দেখে তার চোয়ালটা সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেয় রৌদ্র। ভিষণ রাগ নিয়ে ঘরে থাকা টেবিলটার ওপর সজোরে লাথি বসিয়ে দেয় সে।হঠাৎ এমন হওয়ায় খানিকটা কেঁপে ওঠে অরিন। রৌদ্র ফের গর্জন তুলে বলে,

“এই,এই তুই চোখ ওপরে তোল।তাকা আমার দিকে।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তুই আমায় ভালোবাসিস না। বল এতদিন সবটা মিথ্যা বলেছিলি। ওপরে তাকা বলছি!”
অরিন তাকালো না।আগের ন্যায় মাথা নুইয়ে রেখে কোনমতে থেমে থেমে বললো,
“ বাসিনা আপনাকে ভালো!”

এহেন কথায় এবার বুঝি তেতে উঠে অনিক।সে নিজেকে আর সংবরন করতে না পেরে হাত উঁচিয়ে থাপ্পড় বসাতে ন্যায় অরিনের গালে ঠিক তখনি তার হাত চেপে ধরে রৌদ্র। ছেলেটা আগুন চোখে তাকায় অনিকের পানে। অন্যদিকে, এই প্রথমবার ভাইকে নিজের গায়ে হাত তুলতে দেখে অবাক নেত্রে তাকিয়ে রইলো অরিন।মেয়েটা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারছেনা এটা সত্যিই তার ভাই!
রৌদ্র কটমট করতে করতে অনিকের হাতটা ছুড়ে ফেললো।ছেলেটার মুখের সামনে আঙুল উঁচিয়ে শাসানির সুরে বলতে লাগলো,

“ খবরদার অনিক! আজ যেটা করতে চেয়েছিস,সেটা যদি দ্বিতীয়বার করা কিংবা ভাবার দুঃসাহসও করিস তাহলে কান খুলে শুনে রাখ — তোর ঐ হাত আর আস্ত থাকবেনা। আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলাতো দূর ওর গায়ে ফুলের টোকাও যদি পড়ে, দ্যান আই সয়্যার আমি রৌদ্র বিষের তীর ছুড়তে দু’সেকেণ্ডও ভাববো না। স্টে ব্যাক!”
অনিক ছলছল চোখজোড়া নিয়ে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের দিকে।ছেলেটার গৌড় মুখটা লাল টুকটুকে হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে বলতে লাগলো,
“ এতো ভালোবাসলে কিভাবে রোদ ভাই? যেখানে ও সবার সামনে তোমার ভালোবাসাকে বারবার অস্বীকার করছে সেখানে তুমি….”

রৌদ্র এবার তাচ্ছিল্যের হাসি টানে ঠোঁটের কোণে। অরিনের দিকে তাকিয়েই অনিকের প্রশ্নোত্তরে বলে,
“ ও হয়তো ভুলে যাচ্ছে অনিক! আমি রৌদ্র ওকে ওর নিজের চাইতেও বেশি চিনি! ওর প্রতিটা মনোভাবের খবর আগে থেকেই জানতে পারি। তাছাড়া ওর চোখদুটোতো আমায় মিথ্যা বলবেনা তাইনা? ও যতই মুখে বলুক, ও আমায় ভালোবাসে না কিন্তু ওর চোখ! তারা তো চিৎকার দিয়ে বলছে — ও আমায় পাগলের মতো ভালোবাসে!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজের এলোমেলো দৃষ্টি লুকাতে তৎপর হয়ে পড়ে।মেয়েটার এহেন কান্ডে রৌদ্র ফিচেল হাসে।সে আবারও এগিয়ে এসে মেয়েটার দুগালে আলতো করে হাত রেখে মুখটা উঁচিয়ে তুলে। বলে,

“ তাকা আমার দিকে সানশাইন!”
অরিন চোখ বন্ধ রেখেই বলে ওঠে,
“ ডাকবেন না ঐ নামে আমায়!”
রৌদ্র তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়,
“ আমরন ডাকবো! তোর কোনো সমস্যা?”
অরিন আর কিছু বললোনা।সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় তৎপর। রৌদ্র তার এহেন প্রচেষ্টা দেখে আহত গলায় বললো,

“তুই ভুলে যাচ্ছিস সানশাইন! তোর নিরবতাও আমার সঙ্গে কথা বলে।আমি বেশ ভালো করেই বুঝছি,তোকে নিশ্চয়ই কেও না কেও ভয় দেখিয়েছে।কিন্তু তুই কেন ভয় পাচ্ছিস জানবাচ্চা? আমি আছি না তোর সাথে! এই সানশাইন! আমি থাকতে তোর কিসের এতো ভয়? তুই একটাবার মুখ ফুটে বল সবটা!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।রৌদ্রকে একপ্রকার ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে ধরে আসা গলায় বলে,
“ আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি আপনাকে।তাই প্লিজ,এই একই কথা বলে আমায় আর ডিস্টার্ব করবেননা!”
এহেন কথায় যেন মুহুর্তেই আগুন জ্বলে ওঠে রৌদ্রের শরীরে। সে রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে এসে মেয়েটার বাহুদ্বয় চেপে ধরে বলে,

“ ঐ! তোর সাথে নরম হয়ে কথা বলছি দেখে ভাবছিস তোর এসব বেয়াদবি সহ্য করবো? উঁহু একদম না! যদি এমনটা ভেবে থাকিস তাহলে বলবো তুই ভুল ভাবছিস! আরেকবার শুধু এভাবে কথা বলে দেখ — তোর জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো! বেয়াদব!”
অরিন নিশ্চুপ হয়ে শুনলো সবটা। তার যে আর বলার কিছু নেই! রৌদ্র কিয়তক্ষন চুপ থেকে মেয়েটার চুলগুলো পেছন থেকে চেপে ধরে। অরিন তৎক্ষনাৎ চোখমুখ কুঁচকে ফেলে ব্যাথায়।রৌদ্র সেদিকে কোনরূপ পাত্তা না দিয়ে কর্কশ গলায় বলতে থাকে,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৭

“ আমায় ভালোবাসিস না বলে বলে মুখে ফ্যানা তুলছিস, ঠিক আছে ব্যাপারটা নাহয় মেনে নিলাম। কিন্তু কিন্তু…
আমায় ত্যাগ করে আজ যেমন অন্য কারোর জন্য রাজি হয়েছিস তেমনটা যদি আবারও করার দুঃসাহসও করিস,
তাহলে এই রৌদ্রের ভয়ংকর রুপ দেখার জন্য একদম ফুল্লি প্রিপেয়ার থাকিস! মনে রাখবি,তুই আমার না মানে তুই কারোর না। আমি রৌদ্র যদি সারাজীবন একা থাকি তাহলে তুইও সারাজীবন একা থাকবি।ভুলেও যদি অন্য কারো চিন্তা মাথায় আনার দুঃসাহস করিস — তাহলে কসম খোদার, আমার হাতের প্রথম খুনটা তোরই হবে। মাইন্ড ইট বেইব!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৯