Remedy part 8
মীরা রায়াদ
বর কনে বসার জন্য খুব সুন্দর করে সাজানো জায়গায় বসে আছে ঈশালরা। সব মেয়েরা মিলেমিশে কতক্ষন হাসাহাসি করছে তো কতক্ষন ছবি তুলতে লেগে যাচ্ছে। ঝুম বরাবরের মতো শান্ত হয়ে ঈশালের পাশে বসে। দূর থেকে দুহাত বুকে বেঁধে শাইয়ান তাকে দেখে যাচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা সেই দিনের শাড়িটা কি আরও একটু গাঢ় ছিল? হয়তো। সে অনেক খুঁজেও ওই রংটি পায়নি। ওই রংটি এখনো শাইয়ানের বুকে বিঁধে আছে। এই রঙেও ঝুমকে অসাধারণ লাগছে। ডান হাতে বুকের বা পাশ চেপে ধরলো শাইয়ান। আবারও ব্যাথা করছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এতো সুন্দর কেন লাগতে হবে মেয়েটাকে? সে যে এই মেয়ের সৌন্দর্যে মোরে যাচ্ছে তা দেখতে পায় ও? দ্রুত নিশ্বাস নিয়ে বার দুয়েক মাথা ঝাঁকালো শাইয়ান। মাথাটা একদম নষ্ট করে দিল মেয়েটা।
এতো সুন্দর বউয়ের মত সেজে তার সামনে ঘুরঘুর করে তাকে কষ্ট দেয়ার ফল সে আজই এই মেয়েকে দিবে। একবিন্দুও আর ছাড় দিবে না। কথাটি ভেবে মাথা নিচু করে হালকা হেঁসে ফেলল শাইয়ান। আহির তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকক্ষন। দুই ভাই আজ পাঞ্জাবি পরেছে। শাইয়ানের পরনে কালো পাঞ্জাবি আর আহিরের পরনে গাঢ় নীল রঙের পাঞ্জাবি। উচ্চতায় লম্বা সুদর্শন পুরুষ দুজনকে আজ আরো বেশি সুদর্শন লাগছে। ফর্সা শরীরে রংগুলো যেন ঝিলিক দিচ্ছে। একজনের চুল ছোট করে কাটা আর অন্য জনের বাবরি। স্বভাবে ভিন্ন দুজন যুবক একই মেয়েকে দেখে যাচ্ছে। একজনের চোখে অপরিসীম ভালোবাসা আর অন্যজন স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে দেখছে শান্ত মেয়েটিকে। অন্য মেয়েদের মতো তার মাঝে অতিরিক্ত চাকচিক্য নেই। ভীষণ সাধারণ তার চলন বলন। এই জন্যই কি শাইয়ান এভাবে পাগল হয়েছে? আচ্ছা মেয়েটা যখন জানবে তার প্রেমে পিছলে শাইয়ানের যাচ্ছেতাই অবস্থা, তখন তার রিয়েকশন কেমন হবে? মায়া হয় ঝুমের জন্য তার। শাইয়ানকে বুকে হাত রাখতে দেখে আহির প্রশ্ন করলো –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আবার ব্যাথা করছে?”
শাইয়ানের দৃষ্টি অনড় ঝুমের ওপর। একটুও এদিক ওদিক হচ্ছে না। হয়তো পলকও ফেলছে হিসেব করে।
” ওনাকে কাছে না পাওয়া পর্যন্ত এই ব্যাথা কমবে বলে মনে হচ্ছে না।”
” যা করছো তা কি ঠিক হচ্ছে শাইয়ান?”
” তোমার কি মনে হয়?”
” তাড়াহুড়ো করো না শাইয়ান। ওনাকে মানিয়ে নেয়ার সময় দাও। এভাবে আমার মনে হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না।”
” ওনার ক্ষেত্রে ধৈর্যের পাঠ কাজ করে না আমার আহির। তাছাড়া সময় নেই হাতে। তোমার কি মনে হয়, ঈশালের বিয়ে শেষ হলে উনি এখানে, এই দেশে থাকবে?”
আহির বুঝলো কিন্তু তারপরও তার মন মানছে না।
” কিন্তু তাই বলে এভাবে? বাড়াবাড়ি হচ্ছে না?”
” আপোষে না মানলে কৌশল খাটাতে হয় আহির। কৌশলে না পেলে জোর খাটাতে হয়। আর শাইয়ান নিজের জিনিষ জোর করে কেড়ে নিতে জানে। তোমাকে যে কাজ গুলো দিয়েছিলাম তার কি হলো?”
” হয়ে গেছে। ওরা আসে পাশে আছে। ঠিক সময় চলে আসবে।”
শাইয়ান মাথা নাড়ালো শুধু।
” আজ ঈশালের বিয়ে শাইয়ান। বিয়েটা অন্তত ভালো ভাবে হতে দাও।”
” আমি নিজেরটা ছাড়া অন্য কারো ব্যাপারে ভাবি না। তুমি তো ভালো করেই জানো আমি কতটা স্বার্থপর।”
মাথা কাত করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে আহিরের পানে তাকিয়ে বলল সে। আহির বুঝলো শাইয়ান তার উদ্দেশ্যে অনড়। একে বুঝিয়ে কিছু হবে না।
” আজ এখানে যাই হোক তুমি একটা কথাও বলবে না আহির। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখবে। আবারও বলছি যাই হোক হাইটাইটে আসবে না। গট ইট?”
আহির তাকিয়ে শাইয়ানের দিকে কিন্তু কিছু বললো না। এই ছেলে শুনবে না তার কথা। শুধু শুধু বলে লাভ নেই। তাই কথা না বাড়িয়ে আবার ঝুমের পানে চাইল। আজ এখানে কি হবে তার ধারণা থাকলেও ঝুমের ওপর দিয়ে কি যাবে তার কোনো ধারণা নেই। তার ভাই কেন এই মেয়েটার সাথে এভাবে খেলছে বুঝতে পারছে না।
” ঝুম আমার সাথে আসুন। জরুরী দরকার আছে। আপনার ইমপোর্ট এক্সপোর্টের পেপার এসেছে।”
মেহেরুন্নেসার ডাকে সব মেয়েরা ফিরে চাইল। ঝুমের মনে পরল, যখন তার পার্সেল বাংলাদেশে পাঠানো হয় তখন কিছু জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। মেহেরুন্নেসা ছিল বলে জিনিসগুলো সঠিক ভাবে বাংলদেশে পাঠাতে পেরেছিল। সেই সময় মেহেরুন্নেসাই তাকে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে বলে পাকিস্তানে। সে সঠিক নিয়ম না জানলেও মেহেরুন্নেসা তাকে আশ্বাস দিয়েছিল সমস্যা হবে না, বরংচ ভবিষ্যতে সে চাইলে আরো পণ্য আমদানি করতে পারবে। ব্যবসায়ীক কাজে আরো পণ্য নিতে হতে পারে বলে সেও রাজি হয়েছিল। সত্যি বলতে ঝুম ভুলে গিয়েছিল লাইসেন্সের কথা। কিন্তু মেহেরুন্নেসা ঠিক মনে রেখেছে। ঝুমের চোখে এক আকাশ পরিমাণ কৃতজ্ঞতা। সে আলতো হাতে শাড়ির কুচি তুলে মেহেরুন্নেসার পিছু নিল। মেহেরুন্নেসা তাকে নিয়ে তার রুমে প্রবেশ করল। দ্রুত হাতে আলমারি থেকে একটা ফাইল নিয়ে ঝুমকে ইশারা করে সাইন করতে বলল। ঝুম প্রশ্নযুক্ত চোখে তাকালো মেহেরুন্নেসার পানে। বুঝতে পারল না এখন কিসের সাইন দিতে হবে? সব অফিসিয়াল কাজ তো আগেই হয়ে গেছে।
” কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। তখন কিছু পেপার সাবমিট করা হয়নি। সেগুলোতেই এখন সাইন লাগবে। পেপার এসে গেছে শুধু এগুলোর জন্য আনতে পারছি না। আমাকে বিশ্বাস করেন আপনি?”
” আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না আণ্টি। আমি ওভাবে বোঝাতে চাইনি। দুঃখিত আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকলে। আমি সাইন করে দিচ্ছি।”
কথা না বাড়িয়ে কয়েকটি পেপার চেক করে ঝুম পরের গুলো না দেখেই একে একে সবগুলোতে নিজের সাক্ষর দিয়ে দিল। সে মেহেরুন্নেসাকে ভীষণ বিশ্বাস করে। মেহেরুন্নেসা তাকে ঠকাবে না এতটুকু বিশ্বাস তার আছে। হাত বাড়িয়ে ফাইল মেহেরুন্নেসাকে দিল। মেহেরুন্নেসাকে ভীষণরকম গম্ভীর দেখল আজ। ঝুম চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো –
” আপনি ঠিক আছেন আণ্টি?”
মেহেরুন্নেসা কথা না বাড়িয়ে দুহাতে ঝুমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল –
” আন্টি আপনাকে খুব ভালবাসে ঝুম। আমাকে কখনো ভুল বুঝবেন না। মনে রাখবেন আমরা যা করব তা আপনার ভালোর জন্য করবো। আপনি আমার আরো একটি মেয়ে।”
কথাগুলো বলে ঝুমকে ছেড়ে তার কপালে আলতো চুমু খেল। ঝুম অবাক হয়ে দেখল সব। সে জানে মেহেরুন্নেসা তাকে ভালবাসে কিন্তু এভাবে কখনো এর আগে প্রকাশ করেনি। সে নিশ্চিত মেহেরুন্নেসার কিছু হয়েছে। কিন্তু জোর করল না তাকে। বলার হলে নিজে থেকেই বলতো। প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত কিছু বিষয় থাকে যা মাড়িয়ে যাওয়া অন্য ব্যক্তিদের উচিৎ না।
” আমি যাবো আণ্টি?”
” সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন।”
ঝুম মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা হাতের ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখে দেখলেন শাইয়ান এখনো কলে রয়েছে। মেহেরুন্নেসা ফোন কানে চেপে বলল –
” সাইন করে দিয়েছে।”
ঈশাল আর সাদ স্টেজে বসে আছে। ঝুম তাদের দূর থেকে দেখছে। সাদকে সে আগেও কয়েকবার দেখেছে। ঈশাল ঠিক যতটা চঞ্চল সাদ ঠিক ততটাই শান্ত। তাদের এক সাথে দারুন মানায়। সাদ মানুষ হিসেবেও দারুন। ঝুম তাদের থেকে দূরে একটি চেয়ারে বসে আছে। সামনে তার কারুকাজ করা টেবিল। টেবিলে দারুন সুঘ্রাণের নাম না জানা সব ফুল। মিশাল, আয়ান এতক্ষন তার সাথেই ছিল কিন্তু হঠাৎ কথায় গেলো কে জানে? একা একা ঝুমের অস্বস্তি লাগছে। আসে পাশের কয়েকজন কেমন করে তাকে দেখছে। দূর থেকে আমিরুন্নেসার মেয়ে জামাইকে আসতে দেখে কেউ যেন ঝুমের বুক খামচে ধরলো। এই লোক তার দিকে কেমন করে যেন তাকায়। খুবই বাজে দৃষ্টিতে। শুধু তার দিকেই নয়, সে খেয়াল করেছে অন্য মেয়েদের দিকেও বাজে দৃষ্টিতে তাকায়, এমনকি ঈশাল মিশাল ও বাদ যায় না। বার কয়েক তো তাকে ছোঁয়ার ও চেষ্টা করে ছিল।
একা দেখলেই কেমন চিলের মতো তেড়ে আছে। এই লোককে দেখলে সে সর্বদা আতঙ্কে থাকে। ঝুমের আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝে হঠাৎ আহির এসে তার পাশের চেয়ার টেনে বসে পরলো। হাতে তার দুটো ডেসার্টের কাপ। একটা ঝুমের সামনে রেখে চোখের ইশারায় খেতে বলে অন্যটা নিজে খাওয়া শুরু করলো। আহিরের থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার ওই লোকের দিকে তাকালে দেখতে পেল লোকটা অদূরে দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু দৃষ্টি তার ঝুমদের দিকে। ঝুমের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো আহির। লোকটি এবার অন্যদিকে চলে গেল। তা দেখে ঝুম হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আহির ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করলো কি? ঝুম মাথা নেড়ে কিছু না বুঝিয়ে ডেসার্ট খাওয়ায় মন দিল। মিশাল না আসা পর্যন্ত আহির ঝুমের পাশে সুপার গ্লু এর মত লেগে রইল। নাহ্! আজ আহির রোজকার দিনের মতো ঝুমকে বোকা বানিয়ে মজা নিল না।
ঝুমও আগ বাড়িয়ে কিছু বলল না তাকে। মিশাল ফিরল সারার ছেলে হামজাকে নিয়ে। সে আসা মাত্র আহির চলে গেল। এবাড়ির সব থেকে ছোট সদস্য হামজা। ভীষণ মিষ্টি আর গোলুমোলু একটা বাচ্চা। ঝুম এখানে আসার পর থেকে তার ন্যাওটা হয়ে গেছে। তাইতো ঝুমকে দেখে মিশালের কোল থেকে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ঝুমের কোলে আসলো। ঝুম বাচ্চাটাকে পরম মমতায় আগলে নিয়ে একটু একটু করে ডেসার্ট তার মুখে দিতে লাগল। শাইয়ান বাইরে গিয়ে ছিল কিছু প্রয়োজনীয় কাজে। যাওয়ার আগে আহিরকে আদেশের সুরে বলে গিয়ে ছিল ঝুমের দিকে খেয়াল রাখতে। ঝুমকে একা ছাড়া যাবে না বলে বিশেষ নির্দেশনাও দিয়ে গেছে। ভাইয়ের আদেশ অনুযায়ী তাই এতক্ষন আহির ঝুমকে পাহারা দিচ্ছিল। নয়তো ঝুমের চোখের দিকে তাকাতে আহিরের অপরাধবোধ কাজ করে এখন। দূর থেকে ঝুমের হামজাকে নিয়ে মাতামাতি খুব একটা পছন্দ করল না শাইয়ান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঝুমের খুব কাছে থাকা হামজাকে দেখে নিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। বড় বড় কদমে তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে গমগমে কন্ঠে বলল –
” হামজা! মামুর কোলে আসো।”
হামজা তো গেলই না উল্টো ঝুমের সাথে আরো সেঁটে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো। এই মামুকে সে ভয় পায়। শাইয়ান বাড়িতে না থাকার দরুন ছোট বাচ্চাটার সাথে তার সক্ষতাও কম। হামজা শুধু শাইয়ানের রাগের সাথে পরিচিত। তাই এটা তার রাগী মামু। এতটুকু বাচ্চা ভালই জানে এর কাছে যাওয়া মানে বোকা খাওয়া। আর আহির তার ভালো মামু। সবরকম দুষ্টমিতে আহির তাকে সাপোর্ট করে। হামজাকে নিজের কাছে আসতে না দেখে আরো রেগে গেল শাইয়ান। কিন্তু প্রকাশ না করে ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে নরম কন্ঠে বলল –
” আমার কাছে আসো বেবি। আন্টির কষ্ট হচ্ছে।”
ঝুম এতক্ষন শাইয়ানের কাজ দেখছিল। যা তার কাছে নিতান্তই ছেলে মানুষী কাজ ছাড়া বিশেষ কিছু মনে হলো না। এভাবে বললে বাচ্চা কেন বড়রাও কাছ ঘেষবে না লোকটার তাকি বুঝতে পারছে না? গলার স্বর শুনে তারই ভয় করছে, হামজা তো আরো ছোট বাচ্চা। যদিও সে বিরক্ত কিন্তু প্রকাশ না করে নরম সুরে বলল –
” থাক না আমার সমস্যা হচ্ছে না তো।”
” আপনি চুপ করুন। কেউ শুনতে চেয়েছে আপনার কাছে? নিজের সমস্যা বোঝেন আপনি? আগে নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে শিখুন তারপর আমার কাছে বলতে আসবেন। আমার কাছে আসো হামজা।”
ঝুমকে ধমকে হামজাকে একপ্রকার ছিনিয়ে তার থেকে আলাদা করলো। ধমক খেয়ে ঝুমের মুখটা চুপসে গেল। তার থেকেও বেশি অবাক হলো শাইয়ানের কাজে, কথায়। এভাবে জোর করে নেয়ার কি আছে? সেকি খেয়ে ফেলত হামজাকে? অদ্ভুত লোক একটা। মন খারাপ করে বসে রইল সে। শাইয়ান দেখেও বিশেষ গুরুত্ব দিল না। একে পরে দেখা যাবে। আগে হামজাটার একটা ব্যবস্থা করা উচিত। রাগ অভিমান কমানোর সময় আরো পাওয়া যাবে কিন্তু ঝুমের কাছাকাছি কাউকে সে সহ্য করবে না।
বিয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কাছের আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের মানুষ ঈশালকে ঘিড়ে ধরে আছে। ঝুমকে জোর করে ঈশাল নিজের পাশে বসিয়ে রেখেছে। ঝুম একহাতে পাশ থেকে আলতো করে জড়িয়ে আছে ঈশালকে। মেয়েটা নার্ভাসনেসের দরুন মৃদু মৃদু কাপছে। হঠাৎ শোরগোলের আওয়াজ কানে আসলো ঝুমের। বর পক্ষের কিছু লোক তর্ক করছে উচ্চশব্দে। মুহূর্তে বিয়ের কাজ থেমে গেল। ঈশাল আদ্র চোখে চেয়ে ঝুমের পানে। ঝুম তাকে চোখের ইশারায় ভরসা দিলেও তাকে উৎকণ্ঠিত দেখালো। কি হয়েছে বুঝতে পরলো না ঝুম। ঝামেলা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে বিরাট রূপ নিল যখন, তখন সে বুঝতে পারল ঝামেলার মূল কারণ ঝুম নিজে। অবাক ঝুম কিছু বুঝে ওঠার আগে কয়েকজন পুরুষ মহিলা তেড়ে আসলো এদিকে।
” দুজন অবিবাহিত ছেলে আছে জেনেও যে বাড়িতে মেয়ে থাকতে দেয়া হয় এমন বাড়ির মেয়ে আমরা আমাদের ছেলের জন্য নিবো না।”
বিস্মিত ঝুমের বুঝতে সমস্যা হলো না কি বোঝাতে চেয়েছেন তারা। সে ভীষণ আতংকিত। আসে পাশে মেহেরুন্নেসাকে খুঁজলো কিন্তু পেল না। হচ্ছে কি এসব। আল্লাহ্ তাকে আবার কোন পরীক্ষায় ফেলল?
সাদের বাবাকে দেখা গেল ঈশালের বাবা- চাচাদের সাথে একত্রিত হয়ে ওই লোকদের বুঝাতে। ভদ্রলোক নিজেও বুঝতে পারছেন না পরিস্থিতি এমন হলো কিভাবে। তাছাড়া যারা ঝামেলা করছে তাদের বিশেষ চিন্তেও পারছেন না তিনি। পরিবেশ অসম্ভব গরম। আহির, শাইয়ানকে দেখা গেল ভিড় থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে কিছু একটা ইশারা করল। কিন্তু দুদিক থেকেই নেতিবাচক সংকেত পাওয়া গেল। আহিরকে আতংকিত দেখালেও শাইয়ান তখনো ভীষণ রকম শান্ত। আহির চিন্তিত, শাইয়ান একবার রেগে গেলে এখানে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাবে। এরই মাঝে আমিরুন্নেসা বলে উঠলেন –
” আমি বলেছিলাম এই মেয়েকে না রাখতে কেউ আমার কথা শুনেনি। হলো তো এবার? বাইরের একটা মেয়ের জন্য বাড়ির মেয়ের বিয়ে ভাঙলো বলে। ভীষণ বেলাজ স্বভাবের মেয়ে মানুষ তুমি। পুরুষ দেখলেই গায়ের ওপর পরতে হয়?”
বলতে বলতে সে ঝুমের দিকে তেড়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে ঝুমকে এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। এতদিনের জমানো রাগ ক্ষোভ উতলে দিল সে। ভরা মজলিশে ঝুমকে অপদস্ত করতে পারে পৈচাশিক খুশিতে মন ভোরে গেছে তার। অতর্কিত হামলায় ঝুম হাতে হাঁটুতে ভীষণ ব্যাথা পেলেও মুখে টু শব্দটি করলো না। অপমান, কষ্টে তার বড় বড় মায়াবী চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগলো। রাগে ক্ষোভে শাইয়ান নিজের হাত মুঠো করে আগুন লাল চোখে সবটা নীরবে দেখে গেল। আহির অসহায় দৃষ্টিতে শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে। শাইয়ানের ইশারা ছাড়া সে এখন ঝুমের কাছে যেতে পারবে না। ঈশাল পাশে দাঁড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে। কি হচ্ছে কেন হচ্ছে জানে না সে। কিন্তু যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না। সে এগিয়ে গেলে আমিরুন্নেসা তার হাত ধরে বাঁধা দেয়। আমিরুন্নেসার মেয়ে জামাই যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। মেয়েটাকে প্রথম দেখেই তার মনে খারাপ ইচ্ছা জেগেছিল। কয়েকবার চেষ্টা করেও কোনরূপ প্রশ্রয় না পেয়ে দিন দিন সে হিংস্র হয়ে উঠেছে। আজ সুযোগ পেয়ে তাই হাত ছাড়া করতে চায়নি।
” শুনেছি বাংলাদেশ থেকে এসেছে। বাংলাদেশের মেয়েরা তো এমনিই খারাপ। এই মেয়ে নিশ্চই কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে।”
রেগে কটমট করতে করতে এগিয়ে গেল সে। উদ্দেশ্য ঝুমকে এই সুযোগে ছুঁয়ে দেয়া। খারাপ চরিত্রের মানুষগুলো যেকোনো পরিবেশে খারাপ কাজ করার সুযোগ খুঁজে যায়। সেও তাই করতে চাইল। কাছে গিয়ে ঝুমকে স্পর্শ করার আগে কেউ তার ডান হাত খুব রুক্ষভাবে চেপে ধরলো। এতটাই বল প্রয়োগ করে ধরেছে, না চাইতেও তার মুখ থেকে অস্পষ্ট ব্যাথাতুর আওয়াজ বেরিয়ে এলো। কে ধরেছে দেখতে ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেলো শাইয়ানকে। রাগে শাইয়ানের গলার রগগুলো ফুলে দৃশ্যমান হয়েছে। ভীষণরকম ভয়ানক লাগছে তাকে। ঝুম হয়তো এই অবস্থায় দেখলে আর সামনেই আসতো না। আমিরুন্নেসা হায়হায় করতে করতে ছুটে এলো। অবস্থা বেগতিক দেখে আহির শাইয়ানের কথা অমান্য করে শাইয়ানের থেকে লোকটিকে ছাড়ালো। শাইয়ান তাকালো ঝুমের দিকে। ঝুম তখনো একই ভাবে মূর্তির মত বসে। নড়চড় বিহীন কান্না করে যাচ্ছে। কিন্তু কান্নার কোনো শব্দ নেই। ওকে ওভাবে এলোমেলো হয়ে কাদতে দেখে রাগের সিমা ছড়িয়ে গেল শাইয়ানের। উচ্চ শব্দে মেহেরুন্নেসাকে ডেকে উঠল –
” আম্মা… আম্মা।”
অত্যধিক রাগ, জেদে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। উপস্থিত সকলে ভরকে গেলো ওর রাগ দেখে। মেহেরুন্নেসা এলেন ধীর পায়ে কোনো তাড়া বিহীন। কিন্তু এসে ঝুমকে ওভাবে বসে কাদতে দেখে ছুটে গেল তার কাছে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো –
” কি হয়েছে আম্মা? কাদছেন কেন? আমাকে বলুন। এইতো আমি বলুন কি হয়েছে।”
Remedy part 7
এতক্ষন পর ঝুম চোখ তুলে চাইল। চোখ ভর্তি পানি নিয়ে লুটিয়ে পরে মেহেরুন্নেসার বুকে। হুহু করে কান্নায় বুক বসিয়ে দিল ক্ষণকালের ব্যবধানে। মেহেরুন্নেসা কিছু বুঝলেন না। তাকে তার শাশুরি জরুরি আলাপে ডেকে ছিলেন। এখানে কি হয়েছে তার জানা নেই। চোখ তুলে শাইয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে কিছু জানতে চাইলেন। কিন্তু ছেলেকে অত্যধিক রাগে থাকতে দেখে সে আরো বেশি অবাক হলো। আহির এগিয়ে এসে সারসংক্ষেপে বুঝিয়ে বলল কাহিনী। সব শুনে মেহেরুন্নেসা রাগে মুখ কঠিন করে বোনের দিকে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শাইয়ান বলল –
” আম্মা আপনার বোনকে বলুন, সে এতক্ষন ধরে যে মেয়েকে খারাপ ভাষায় অপমান ও অপদস্ত করেছে সে আমার অর্ধাঙ্গিনী।”
