Home Remedy Remedy part 12

Remedy part 12

Remedy part 12
মীরা রায়াদ

“আমি ডিভোর্সি”
এমন একটি কথার পরও শাইয়ানের নড়চড় নেই। কঠিন পাথরের ন্যায় সে দাঁড়িয়ে ঝুমকে দেখছে। ঝুম কাদঁছে ভিশন কাদঁছে। জীবনের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তার সকল সুখ – শান্তি শেষ করে দিয়েছে। কি বয়স ছিল তখন তার? পুতুল খেলার বয়সে সবাই তার জীবনটা নিয়ে খেলে ছিল। কাঁদতে কাঁদতে গলা শুকিয়ে গেছে ঝুমের। সামান্য ডোগ গিলে গলা ভিজানোর বৃথা চেষ্টা করলো।

” মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় আর ১৮ বছরে তালাক।”
ঝুম বিদ্ধস্ত। ওর এইরূপ শাইয়ানকে কত কষ্ট দেয় মেয়েটা কি কখনো বুঝবে না? নিজের কঠিন রূপ সরিয়ে হাঁটু গেঁড়ে ঝুমের সামনে বসে ঝুমের দু গালে হাত রাখে শাইয়ান। গাল বেয়ে গড়িয়ে পরা অশ্রুজল সযত্নে মুছে দিল। এরপরও ঝুমের বড় বড় মায়াবী চোখগুলো জলে টইটম্বুর। শাইয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলায় ঝুম।
” আপনি কেমন, আপনার অতীত কি, কি হয়েছিল তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না আরীবা। এখন আপনি আমার স্ত্রী এটাই শুধু ম্যাটার করে আমার কাছে।”
ঝুম ছলছল নয়নে আকুতি করে বলল –
” কেন এমন করছেন আপনি? কেন যেতে দিচ্ছেন না আমায়? আমার এখন আর কাউকে চাই না। কারো মায়ায় জড়িয়ে নিজেকে শেষ করতে পারবো না। দোহাই লাগে যেতে দিন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” এখন আর তা সম্ভব না আরীবা।”
” কেন সম্ভব না? আপনি চাইলেই সম্ভব।”
” কিন্তু আমি তো চাচ্ছি না।”
অবাক হলো ঝুম। সব জেনেও কোনো পুরুষ তাকে চাইছে? আদোও এ সম্ভব?কান্না ভুলে তাকিয়ে দেখল লোকটাকে। কিছু খুঁজলো যেন ঐ ফ্যাকাশে দুচোখে। পেয়েও গেল। তাও প্রশ্ন ছুড়লো –
” কেন?”
শাইয়ান এগিয়ে এলো ঝুমের খুব কাছাকাছি। মোহময় চোখে কেমন কলিজা কাপানো গলায় বলল –
” ভালবাসি যে। আপনাকে যেতে দিলে আমি বাঁচবো কি করে? আগে বাঁচতে শিখি তারপর যেতে দিবো। ( একটু থেমে ঠোঁটের আগায় হাসি এনে ঝুমের ডান গালের সাথে নিজের বা গাল মিলিয়ে বলল) তবে কি বলুন তো? মনে হচ্ছে আপনাকে ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব হবেনা। সেভাবে দেখতে গেলে আপনি আমার কাছে সারাজীবনের জন্য বন্ধি।”

ঝুম হাসফাঁস করলো। তার বুক কাপছে। অসম্ভব কাপছে। লোকটা এত কাছে কেন এসেছে? ঝুম নিজেকে সামলাতে পারছে না। সে করো মায়ায় জড়াতে চায় না। কখনো না। মায়ায় জড়ানো পাপ। ভালোবাসা পাপ। শেষ করে দেয়, সব শেষ করে দেয়।
শাইয়ান ঝুমকে ছেড়ে উঠে দাড়ালো।
” উঠুন, এখান থেকে যাওয়ার ভুত মাথা থেকে নামান। কোথাও যাওয়া হচ্ছে না আপনার। যতো দিন আমি জীবিত আছি তত দিন পারবেন না। নরমাল হওয়ার চেষ্টা করুন। অতীতকে অতীতে থাকতে দিন। আম্মাকে পাঠাচ্ছি খেয়ে নিবেন। কাল রাতের কাজ যেন রিপিট না হয়।”
ঝুম তখনো থ্ম মেরে বসে। শাইয়ান ওর তেরামিতে অতিষ্ট। এতো ধৈর্য্য সে জীবনে কখনো ধরেনি। তার ভোলা ভালা বউটা এত পাজি হলো কিভাবে?
শাইয়ান ঝুঁকে ঝুমকে টেনে তুলল। ঝুম প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে তাই করলো যা শাইয়ান তাকে দিয়ে করাতে চাইল। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শাইয়ান শুনতে পেল –

” আমি এখানে থাকতে রাজি আছি।”
শাইয়ান পিছু ফিরল। তার কপাল কুঁচকানো। বউটা এত ভালো কিভাবে হয়ে গেলো ক্ষণিকের মাঝে? বুঝে আসছে না।
” কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
এইবার ঠিক আছে। এইতো তার বউ। তার তেরা বউ তেরামি করলেই ঠিক লাগে। কি এক জ্বালা। করলে অশান্তি না করলেও অশান্তি। শাইয়ান ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে সম্পূর্ণ কথা শোনার জন্য। ঝুম নিস্তব্ধ শাইয়ানের চোখে চেয়ে কঠিন গলায় বলল –
” কথায় কথায় আমাকে ছুঁতে পারবেন না। আর কাল রাতে যা করেছেন দ্বিতীয়বার করতে আসবেন না বলে দিচ্ছি। দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন। এরপর অনুমতি ছাড়া কাছে আসলে মুখ ভেঙে দিবো।”
শাইয়ান হা করে তাকিয়ে ঝুমের কথা গিলো। মুখ ভেঙে দিবে? এতো বড় সাহস? ঠিক আছে এরপর তাহলে ঝুমের অনুমতিতেই কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দিবে সে।

” আপনার অনুমতিতেও পারবো না?”
ভড়কে গিয়ে ঝুম বলল –
” মানে?”
” কিছু না। দেখি কতদিন আপনি দূরত্ব মেনে চলতে পারেন।”
ঝুম তার হেঁয়ালি কথা বুঝেনি। হয়তো বুঝতে চায়নি। শাইয়ান যেতে নিল ঝুম হুড়মুড়িয়ে উঠে এসে বলে –
” কথা দিন।”
শাইয়ানের কপালের মাঝে বিশাল ভাঁজ পড়ল। গম্ভীর গলায় সুধালো –
” আমাকে বিশ্বাস নেই?”
ঝুমের স্পষ্ট জবাব –

” না।”
শাইয়ান হতভম্ব, বাকরুদ্ধ।
চেঁচিয়ে বলল –
” কিহ! কিন্তু কেন?”
সে মর্মাহত। ঝুমের থেকে এমন জবাব একদম আশা করেনি। কি না করেছে মেয়েটাকে নিজের করে পেতে, আর সেই মেয়ে তাকে বিশ্বাস করে না? অভাবনীয়!
” কারণ আপনি অসভ্য।”
এবার আরো চমকালো শাইয়ান। বলে কী মেয়ে! সারা জীবন মেইনটেইন করা তার পবিত্র চরিত্রকে এই মেয়ে ধুয়ে দিল? জীবনে ‘ অসভ্য ‘ শব্দটা সে প্রথম তার স্ত্রীর থেকেই শুনল। কি কপাল, হাহ! অবশ্য সে যা করেছে তাতে অসভ্য বলে ভুল করেনি ঝুম। তাই বলে মুখের ওপর বলবে? মেয়েটাকে তো সে ভালো, ভদ্র ভেবেছিল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে ভারী পাঁজি।

“আপনি আমাকে অসভ্য বলতে পারেন না আরীবা। আমি কখনো আপনার সাথে অসভ্যের মতো কিছু করিনি।”
শাইয়ানের কন্ঠ ভিশন করুন। কে বলবে কাল এই মানুষটা মধ্যরাতে অমানুষের মতো কাজ করে এসেছিল? এটা তার স্বভাবসুলভ আচরণ না। তার দরাজ, গম্ভীর কন্ঠে পুরো হসপিটাল কাপে। সেখানে সে এই মেয়ের কাছে এত নাজুক হয়ে কেন পরে জানে না সে।
ঝুম তার কথায় পাত্তা দিলো না। একই ভঙ্গিতে চোখ – মুখ বিকৃত করে শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে। চোখ দিয়ে বোঝাতে চায় –

” আচ্ছা কিছু করেন নাই? তাহলে কাল রাতে কে ছিল ওটা?”
কিন্তু মুখ ফুটে বলল না। শাইয়ান হয়তো বুঝলো তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কথা দিয়ে কেটে পরলো। তার মতো মানুষ বউ কে ভয় পাচ্ছে? এটাও মানা যায়! মানুষ শুনলে কি বলবে? বউ জুটেছে এক তার কপালে মাশাআল্লাহ। না না জুটেনি, সে নিজের ইচ্ছায় জুটিয়েছে। ঝুম শাইয়ানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখান থেকে কি যাওয়া হবে না তার? দেশের মাটিতে পা রাখা কি হবে না? উদাস হয়ে পরলো সে।

কতক্ষন ওভাবে বসে ছিল তার জানা নেই, যখন তার হুশ ফিরল তখন সে নিজের কাছে মেহেরুন্নেসাকে পেল। যত্ন করে ঝুমের চুলের বাঁধন খুলে আঁচড়ে দিচ্ছে মেহেরুন্নেসা। ঝুম বাধা দিলো না। তার ভালো লাগছে। যতো যাই বলুক, মেহেরুন্নেসা তাকে ভালবাসে। সেও মেহেরুন্নেসাকে আপন মনে করে। কাল রাতের ব্যবহারের জন্য ঝুম লজ্জিত। ক্ষমা চাইতে চায় কিন্তু পারছে না। মেহেরুন্নেসা খুব সুন্দর করে যত্ন নিয়ে ঝুমের চুল গুছিয়ে দিল। তারপর খাবার প্লেট হাতে নিয়ে নিজ হাতে মেখে ঝুমের মুখের সামনে তুলে ধরলো। এবার আর ঝুম নিজেকে সামলাতে পারল না। অপরাধ বোধ তাকে শেষ করে দিচ্ছে। কেঁদে ফেলল সে। মেহেরুন্নেসা কিছু বলল না, শুধু চোখের ইশারায় খাবার মুখে নিতে বলল। ঝুম চোখ ভর্তি পানি নিয়ে মুখে খাবার নিল।

” শাইয়ান জন্মের সময় ওর বাবা আমাদের কাছে ছিল না। আর্মি ক্যান্টনমেন্টে ছিল। সে বার প্রচুর ব্যাথা হলো। ব্যাথায় দিশেহারা আমি। তখনতো ফোনের ব্যবহার ছিল না। টেলিফোন ছিল। ওর বাবাকে জানানো হলো। কিন্তু বেচারা ছুটি পেলো না। আর্মি অফিসাররা চাইলেই যেকোনো সময় আসতে পারে না। স্বামী পাশে নেই, বয়স কম আমার। সে কি ভয় পেলাম। ভয় আর ব্যাথা নিয়ে শাইয়ানকে জন্ম দিলাম। প্রথমবার যখন ওকে কোলে দিলো সকল ব্যাথা, কষ্ট এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল। কত সুন্দর দেখতে হয়ে ছিল আমার আব্বা জানেন ঝুম? ছোট্ট একটা পুতুল ছিল। কোলে নিয়ে কেঁদে ফেললাম। ওর বাবা যখন ওকে প্রথম দেখে তখন ওর বয়স ৯ মাস। প্রথমবার বাবা হওয়ার সুখে ছেলেকে কোলে নিয়ে সেও আমার মতো কেঁদে ছিল। কিন্তু সেই ছেলেকে আমরা জীবনের ব্যস্ততায়, অসহায়ত্বে যত্ন নিতে ভুলে গেলাম। তোমার শশুর বরাবরই দেশের সেবায় জান – প্রাণ দিয়ে দেয়ার মতো ছিল।

সে ব্যস্ত হয়ে গেলো তার কাজে। আর এদিকে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম পারিবারিক ব্যবসায়। শাইয়ানের তখন ৫ বছর, আমার ওইটুকু বাচ্চা বাবা – মাকে ছেড়ে থাকা শুরু করলো। প্রথম দিকে জেদ করত। আমার সাথে যাবে, আমার সাথে খাবে, আমাকে ছাড়া ঘুমাবে না। মা ভক্ত ছিল ছেলেটা আমার( বলে মৃদু হাসলো সে)। কিন্তু তারপর একা একা চুপ হয়ে গেল। কারো সাথে কথা বলত না , নিজের মতো দুনিয়া সাজিয়ে নিয়ে ছিল। ভেবে ছিলাম বড় হচ্ছে তাই। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। ছেলে আমার অভিমান করে একা থাকতো। বুঝতে পারিনি, মা হয়ে আমি ছেলের মন বুঝতে পারিনি। তারপর হঠাৎ একদিন এসে বলল ক্যাডেট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেছে। আমরা খুশি হওয়ার থেকে অপরাধ বোধে ভুগলাম।

নিজেদের ব্যস্ততায় এতটা মোজে ছিলাম যে আমার ছেলেটা নিজের জীবনের এতো বড় সিদ্ধান্ত কাউকে না বলেই একা একা নিয়ে ফেলল। যতদিনে বুঝতে পারলাম, শাইয়ান ততদিনে আমাদের থেকে অনেক দূরে চলে গেলো। সেখান থেকেই সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ হয়ে ফিরে এলো। জানেন ঝুম, আমি জানি আমার ছেলেটা আমাদের ওপর অভিমান করে আছে। কিন্তু তাও উনি কখনো আমাদের অসন্মান করেনি। ছুটিতে বাড়ি আসতো। আমাদের সাথে দেখা করত। ওনার চলে যাওয়ার পর বুঝলাম আমরা অনেক বেশি অবহেলা করেছি তাকে। বিশেষ করে আমি। সারার ক্ষেত্রে আমি ভালো মা হলেও শাইয়ানের ক্ষেত্রে আমি ভালো মা হতে পারিনি।

কখনো মুখ ফুটে কিছু না চাওয়া আমার সেই ছেলেটা যখন আমাদের পায়ের কাছে বসে আপনাকে চাইল, বিশ্বাস করুন ঝুম আমরা বারণ করতে পারিনি। শাইয়ান আপনাকে খুব ভালো রাখবে ঝুম। একটু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করুন। উনি আপনাকে ভীষণ ভালবাসে আম্মা। জানি আমরা আপনার সাথে অন্যায় করেছি, কিন্তু আমাদের খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। কাল ওখানে যা হয়েছিল তাতে আমাদের বা শাইয়ানের হাত ছিল না। পারলে আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিয়েন।”

মেহেরুন্নেসার চোখে জল। সে আজ কাদঁছে। শক্ত কঠিন খোলসে বাধা মানুষটি আজ অনেক বছর পর নিজের মনের কথা কাউকে বলতে পারলো। ছেলের সাথে করা অন্যায়ের অপরাধবোধ সে আর বইতে পারছে না। ঝুমকে পেলে যদি শাইয়ান সুখী হয়, তাহলে মেহেরুন্নেসা সেই ব্যবস্থাই করবে।
ঝুম মন দিয়ে শুনছিল সবটা। তার চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে। সে কাদতে চায় না ওই অসভ্য লোকটার জন্য। তাও বেহায়া চোখ মানছে না। তার কাছে তো তাও তার আম্মা ছিল কিন্তু শাইয়ান? বাড়ি ভর্তি মানুষ মা – বাবা, ভাই – বোনের অভাব না থাকতেও সে একা ছিল। ভাবতেই ঝুমের কষ্টে বুক ফেঁটে যাচ্ছে। লোকটা ভালোবাসার কাঙাল, এই জন্যই কি তাকে নিজের কাছে আঁকড়ে রাখতে চায়? ততক্ষনে ঝুমের খাওয়া শেষ। মেহেরুন্নেসা ভালো করে ঝুমের মুখ মুছে দিয়ে উঠে দাড়ালো যাওয়ার জন্য। মেহেরুন্নেসাকে যেতে দেখে ঝুম তার হাত ধরে বসে।
” আণ্টি কাল ওভাবে করার জন্য আমি দুঃখিত। যা করেছি নিজের অজান্তে। আপনার মনে কষ্ট দেয়ায় আমার খুব খারাপ লাগছে। আমাকে ক্ষমা করবেন না আণ্টি?”

তার চোখে পানি। মেহেরুন্নেসা বা হাতে ঝুমের চোখের পানি মুছে দিয়ে আলতো হেসে বলল –
” যা হয়েছে ভুলে যান ঝুম। ভাবুন অতীতে কিছু হয়নি। বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আপনার থেকে কিছু কেড়ে নিল তার থেকে আরো বেশি দেন। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা যা দিচ্ছেন তা গ্রহণ করে নিন। সে জানে আপনার জন্য কোনটা ভালো। আপনি এখনে, আমার শাইয়ানের কাছে ভালো থাকবেন মিলিয়ে নিয়েন। আর আমি চাইব এবার থেকে আমাকে আণ্টি বলে পর না ভেবে আপন মনে করে নিন। এটা পুরোটাই আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম। জোর করছি না। যদি খুব একটা সমস্যা না হয় তাহলে আণ্টি বলবেন না। ঠিক আছে?”
ঝুম মাথা নাড়ালো। মেহেরুন্নেসা চলে গেল। কিন্তু রেখে গেল ভাবুক ঝুমকে। অতীত বলতে মেহেরুন্নেসা কি বুঝিয়েছে? গতকালের কথা নাকি তার অতীত জীবন সম্পর্কে কিছু জানে তিনি?

ঝুম বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। মাঝে কেটে গেছে বেশ কিছু দিন। সে ধীরে ধীরে নিজের নিয়তি মেনে নিয়েছে। কিন্তু ভয় হয় আবার না কোনো অনার্থ হয় । শাইয়ানকে যতটা অসভ্য ভেবেছিল ততটা অসভ্য সে না। সে তার কথা রেখেছে। সেদিনের পর শাইয়ান তাকে ছুঁয়ে দেখেনি। এমনকি বিরক্তিও করেনি। স্বাভাবিক ছিল সবটা। হয়তো সে ওতো খারাপ না। তার সাথে একটা জীবন পার করে দেয়া যায়। তাছাড়া কোথাও না কোথাও সেদিনের পর শাইয়ানের জন্য তার ভীষণ মায়া হয়। সারা দিন সে ঝুমের আশেপাশে ঘোরে। ঝুমের মনোযোগ চায়। অসম্ভব ভালোবাসা নিয়ে তাকায় ঝুমের পানে। ঝুমের ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে।

কিন্তু বলা হয় না। বুকের ভিতর ভালো লাগার জোয়ার বয়ে যায়। আজ সে অনেক দিন পর শাড়ি পরেছে। মেহেরুন্নেসা হালকা গয়না পরিয়ে দিয়েছে। চুলগুলো রোজকার মতো খোপা করা। এভাবে তাকে সত্যিই বউ বউ লাগছে। বেখেয়ালি সে বুঝতে পারল না, শাইয়ান তাকে সেই কখন থেকে তৃষ্ণার্তের মতো দেখে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। হঠাৎ শাইয়ানের গলা শুকিয়ে গেল। এই মেয়ে তাকে মেরে ফেলে শান্তি পাবে। এত বেখেয়ালি কেন ঝুম? শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে পাতলা চিকন সফেত পেটখানা যেন উঁকি দিয়ে শাইয়ানকে কাছে ডাকল। ভয়ে শাইয়ান ওখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। এখন সে কিছু করলে ঝুম তখন তাকে অসভ্য বলবে। তার কথার খেলাপ হবে। যা সে একদম চায় না। অথচ তাকে উসকে দিল কে? তার কি কোনো দোষ হবে? হবে না। যতো দোষ সব শাইয়ানের। পাষাণ নারী।

ধুপধাপ পা ফেলে বাগানের দিকে এসে দেখল, আহির সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। শাইয়ানকে দেখা গেল হনহনিয়ে আসছে। আহির তাকে ওভাবে আসতে দেখে অবাক হয়ে কিছু বলবে, তার আগেই শাইয়ান ধপ করে ঘাসের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে বলল—
“ধুর ব্যাটা, বিয়ে করেও শান্তি নাই। বউকে সেজেগুজে নিজের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলেই সারা শরীরে সুড়সুড়ি লাগে। অথচ বউ আমায় দেখলে ১০০ হাত দূরে থাকে।”
এতক্ষণে কাহিনি বুঝতে পেরে আহির তার কথায় শব্দ করে হেসে উঠে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বলল—
“আরও করো জোর করে বিয়ে।”
শাইয়ান তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কিন্তু আহিরের হাসি থামল না। শাইয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে
বলল—

“হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে।”
শাইয়ানের কথায় আহিরের হাসি বাড়ল কি কমল না।
এদিকে দুই ভাইকে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখে ওপর থেকে ঝুম অবাক হয়ে ভাবল—
“এদের দুজনের মাথার তারই কি ছেঁড়া? সম্ভবত। অদ্ভুত সব লোক তার আশেপাশে।”
সে পা বাড়িয়ে ঘরে চলে গেল। শাইয়ান নজর ঘুরিয়ে ওপরতলার বারান্দায় তাকিয়ে দেখতে পায় ঝুম নেই। আহির তার দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে বলল –
” কি?”

” হসপিটালে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে আহির। অথচ সে এখনো মেনে নিতে পারেনি আমাকে। তাকে যে নিয়ে যাবো সাথে, তাও হয়তো যাবে না। বিয়ে করার পর বুকে ব্যাথা কমার বদলে বেড়েছে।”
তার কন্ঠ বড্ড উদাসীন। শাইয়ান এভাবে আর পারছে না। জীবনে প্রথমবার তার আফসোস হচ্ছে হঠকারিতায় নেয়া সিদ্ধান্তের জন্য। আরও একটু ধৈর্য্য ধরলে হয়তো ভালো হতো। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন ভোগ করা ছাড়া উপায় নেই। আহির হয়তো বুঝলো তার অস্থিরতা।
” এতো ভেবো না শাইয়ান। সময় দাও যখন ঠিক হওয়ার হয়ে যাবে। তাছাড়া ঝুম বুদ্ধিমতি মেয়ে। পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নিতে জানে। দেখবে সে মানিয়ে নিবে তোমার সাথে।”
আহিরের মুখে আবার ঝুম ডাক শুনে শাইয়ানের চোখ – মুখ কঠিন রূপ ধারণ করলো। আহিরকে শাসিয়ে বলল –
” আর একবার তোমার মুখে ঝুম নাম শুনলে এরপরের বার ওয়াটার থেরাপি তোমার ওপর অ্যাপ্লাই করবো। ভাবি ডাকবে আমার বউকে। বুঝেছ?”

” বাহ্, দরুন! বউ পেয়ে এখন ভাই শত্রু? ঠিক আছে ঠিক আছে দেখব কতদিন ভাই ছাড়া থাকতে পারো। যাই হোক, আমি গ্যাংস্টারের মতো দেখতে হলেও ওদের মতো কাজ – কথা তোমার। কারণ কি?”
সুযোগ পেয়ে খোঁচা দিতে ছাড়লো না আহির। শাইয়ান বুঝলো আহির শোধ নিচ্ছে।
” যাদের সাথে ডিল করতে হয় তাদের মত না হলে কি চলে?”
” তাও ঠিক। যেতে হবে কবে? এখানে যে কাজে এসেছিলে হয়ে গেছে?”
শাইয়ান উদাস কন্ঠে বলল –

” হয়ে গেছে বলেই যেতে হবে। হসপিটাল থেকে হয়তো ক্যাম্পে যেতে হবে।”
ক্যাম্পের কথায় অবাক হলো আহির। আবার? গতবার কি অবস্থা হয়েছিল এখনো ভুলেনি সে।
” কোথায়?”
” কুপওয়াড়া।”
আহির হম্বিতম্বি করে উঠে বসলো।
” কাশ্মীর কুপওয়ারা?”
শাইয়ান আহিরের দেখাদেখি উঠে বসে ধীরে বলল –
” হুম।”
” শাইয়ান আর ইয়ু ম্যাড? লাস্ট বার ক্যাম্পে কি হয়েছিল নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? এখন তোমার বিয়ে হয়েছে, বউ আছে। ভুলে গেলে চলবে না।”
শাইয়ান জানে এখন তার সাথে ঝুম জড়িয়ে। কিন্তু কিছু করার নেই। এটাই তার কাজ। সে করতে বাধ্য।
” এটা আমার কাজ আহির। ওখানে বর্তমানে পরিবেশ খুব খারাপ। ইমিডিয়েট ওখানে ডক্টর লাগবে। সেনারা ছাড়াও সাধারণ জনগণ আঘাতপ্রাপ্ত।”

Remedy part 11 (2)

” কিন্তু ঝুম?”
শাইয়ান চোখ গরম করে তাকালে, দ্রুত নিজের ভুল শুধরে বলল –
” মানে ভাবি। ভাবিকে কি বলবে?”
” আপাদত তুমি ছাড়া এই ব্যাপারে কেউ জানতে পারলে তোমাকে আমি ক্যাম্পে নিয়ে কায়সারের মতো আদরের ব্যবস্থা করাবো।”
আহির করুন চোখে চাইল শাইয়ানের পানে। কিন্তু দয়া – মায়াহীন মানবের কিছু যায় আসলো না।
” যাচ্ছো কবে?”
” নেক্সট উইক।”

Remedy part 13