Remedy part 13
মীরা রায়াদ
ঝুম অনেকক্ষন ধরে কেবিনেট উথাল-পাতাল করে পরার জন্য জামা খুজছে। তারা আজ নিকটস্থ এক সি বিচে যাবে। এরই মাঝে সবাই জেনে ফেলেছে শাইয়ানকে যেতে হবে। তাই ঈশাল আর সাদ ও আজ তাদের সাথে সেখানে যাবে। তাছাড়া আহির, মিশাল আর আয়ান ও যাচ্ছে তাদের সাথে। শুধু সারা যাবে না। যেহেতু তার প্রেগন্যান্সির প্রায় শেষ সময় চলছে তাই এই সময় তার যাওয়াটা ঠিক হবে না। যদিও সারার জন্য তাদের মন খারাপ হচ্ছিল। তখন সারা নিজেই বলল, আপাদত যেন তারা গিয়ে ঘুরে আসে। বাবু পৃথিবীতে আসলে সবাই আবার এক সাথে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ঝুম জামা খুঁজে যাচ্ছে। তাঁর একটাও পছন্দ হচ্ছে না।
পুরো রুম এলোমেলো করে ফেলেছে। শাইয়ান সেই কখন থেকে গালে হাত দিয়ে দেখে যাচ্ছে তাকে। মেয়েটা আগের থেকে খুলেমিলে গেছে সকলের সাথে। আগের মতো মুখচোরা ভাব নেই। সর্বক্ষণ হাসি-খুশি আর দুষ্টামিতে মেতে থাকে। এখন তার মাঝে চঞ্চলতা খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু কি তাই? আজ কাল তো শাইয়ানকেও পাত্তা দেয় না, ভয় পায় না। এই তো গত কাল রাতের কথা, ঝুম হঠাৎ বলল সে এই রুমে থাকবে না। তার সাথে ঘুমাবে না। শুনে শাইয়ান ভীষণরকম ক্ষেপে গেল। এমনিতেই বউ ছেড়ে যেতে হবে বলে তার কষ্টের শেষ নেই, এখন আবার এই মেয়ে নতুন কাহিনী শুরু করেছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলছে, ঘুমের মধ্যে নাকি শাইয়ান তাকে কোলবালিশ বানিয়ে শরীরের সব ভার ঝুমের ওপর ছেড়ে দেয়। তার ওই ৮০ কেজির পাথর শরীর দিয়ে ঝুমের ৪৮ কেজির রোগা-পাতলা শরীরটাকে চেপে আলুভর্তা করে দেয়। যার ফলে ঝুমের ঘুম হয় না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নিশ্বাস নিতে পারে না। সারা শরীর ব্যাথায় বিষ হয়ে থাকে। ভাবা যায়! এসব কেমন কথা বলে মেয়েটা? এই নিয়ে ঝুম এর আগে অনেকবার বলেছে শাইয়ানকে, কিন্তু শাইয়ানেরই বা কি দোষ? ওমন নরম-সরম বউ থাকলে একটু-আধটু এমন হওয়া কি ভুল? সেতো চেষ্টা করে কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন চলে যায় বউটার কাছে। আর তারপর সকাল হলে যুদ্ধ লেগে যায় দুজনের। কাল রাতেও এই নিয়ে শুরু হলো। ঝুম কিছুতেই শাইয়ানের সাথে থাকবে না এক ঘরে। শাইয়ান এতো করে বুঝাল শুনলোই না। শেষে দিলো এক ধমক। ব্যাস, কাজ হয়ে গেলো। ধমক খেয়ে ঝুম মুখ ফুলিয়ে কাদোকাদো মুখে ফুলেফেঁপে রইলো। এতো বলেও তাকে দিয়ে একটা কথা বলানো গেলো না তারপর। বারবার ক্ষমা চেয়েও যখন লাভ হলো না। শেষে শাইয়ান কানে ধরে ক্ষমা চাইলে ঝুম মানলো। কিন্তু শর্ত দিল আজও যদি শাইয়ান তাকে ঘুমাতে না দেয় তাহলে সে ঈশালের ঘরে চলে যাবে।
কথা দিলেও শাইয়ান তা রাখতে পারেনি। ঠিকঠিক ঝুমের কাছে চলে গিয়েছিল। সকাল হতেই ঝুম সেই চোখমুখ কুঁচকে রাগী চোখে শাইয়ানকে দেখেছে। বড়বড় চোখগুলো আরো বড় করে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকালে শাইয়ান সত্যিই ভয় পায়। এখন অবশ্য ঝুম সব ভুলে বসে আছে। অবশ্য তার সেসব মনে রাখার সময় কোথায়? ঈশালের সাথে দেখা হওয়ার খুশিতে সে দিশেহারা। দীর্ঘক্ষণ ঝুমের কাজ নীরবে দেখে শাইয়ান যেতে যেতে হুশিয়ারি দিয়ে গেল শাড়ি পড়া যেন না হয়। কিন্তু ঝুম শুনল না। ঘণ্টা খানেক পর এসে দেখলো ঝুম শাড়িই পরেছে। এই মেয়ে তাকে জ্বালানোর একটা সুযোগও হাত ছাড়া করে না। শাইয়ান যদি বলে পূর্ব সে তাহলে পশ্চিমে যাবে। শাইয়ান জানে ঝুম কেন এসব করে। সে ভেবেছে শাইয়ানকে বিরক্ত করলে শাইয়ান তাকে ছেড়ে দিবে। কিন্তু সেতো আর জানে না শাইয়ান তার এই চঞ্চলতা কতো বেশি উপভোগ করে। তাছাড়া সে জানতো ঝুমকে যা বলবে তার উল্টোটা করবে, তাই ইচ্ছে করেই বলে ছিল যেন শাড়ি না পরে। শাড়িতে ঝুমকে কি দারুন লাগে তাকি ঝুম জানে? বোকা মেয়েটা তার মন বুঝলো না।
বাড়ির সকলকে বলে তারা বেরিয়ে পরেছে। ৬ সিটের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে তারা মূলত ক্লিফটন বিচ যাচ্ছে। যা তারেক রোড থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্বে। যেতে হয়তো ১৭/২০ মিনিট লাগবে। ঝুম ছাড়া এখানের প্রায় সবারই ক্লিফটন বিচে যাওয়া হয়েছে। তাই সব থেকে উৎসাহি ঝুমকেই বেশি লাগলো। ঝুম, ঈশাল আর মিশাল এক হওয়ার পর থেকে তাদের আর কেউ আলাদা করতে পারেনি। সেই যে তিনজনের গল্প শুরু হয়েছে শেষে হওয়ার নাম নেই। তারা তিনজন গাড়ির শেষের ২ সিটে বসেছে। যা নিয়ে শাইয়ানের রাগের শেষ নেই। চেয়েছিল বউয়ের সাথে একান্ত কিছু মুহূর্ত কাটাতে, তাই ঝুমকে বলে ছিল বিচে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে কি করলো? সারা বাড়ির লোককে বলে বেরিয়েছে, সাথে যাওয়ার জন্য বিশেষ নিমন্ত্রনও দিয়েছে।
তখন শাইয়ানের মুখখানা দেখার মতো হয়েছিল। না পারছিল বউকে কিছু বলতে আর না পারছিল সইতে। তাও মেনে নিয়েছিল সে, কিন্তু এখন কাজটা করলো কি? তাকে কতো করে শাইয়ান বলল যেন ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে। কিন্তু মেয়েটা তাকে আবারও পাত্তা না দিয়ে ঈশাল, মিশালের সাথে শেষে গিয়ে বসলো। এমন জায়গায় বসলো, যেখান থেকে ফ্রন্ট মিরর দিয়ে ভালো করে দেখাও যায় না। সেই থেকে তার চোখমুখে থমথমে ভাব। পাশে বসা আহির সেই কখন থেকে তাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। তাতে যেন আরো রাগ বাড়ছে শাইয়ানের। রাগে লাল হয়ে যাওয়া চোখ নিয়ে ফিরে তাকিয়ে কয়েকবার আহিরকে ওয়ার্নিং দেয়া হয় গেছে। কিন্তু আহির থামার পাত্র না। তার শাইয়ানের এই করুন অবস্থা দেখতে দারুন লাগছে। কোনো কিছুতে পরোয়া না করা শাইয়ান একমাত্র ঝুমের কাছেই কাবু হয়। এটা তার বেশ লাগে।
বিকেল হওয়ার কারণে রাস্তায় ভালই জ্যাম ছিল। যার দরুন ক্লিফটন বিচে পৌঁছাতে তাদের ২০ মিনিটের পরিবর্তে ঠিক ৩৮ মিনিট লেগে গেল। গাড়ি থেকে যখন নামলো তারা তখন রোদের ছিটে ফোঁটাও নেই। প্রকৃতি এক নতুন রঙে সেজেছে। আকাশটা হালকা আকাশি রঙের। ঠিক তার নিচে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ।
ক্লিফটন বিচ করাচির সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবার চেনা একটি সমুদ্রসৈকত। এটি আরব সাগরের তীরে অবস্থিত, এবং শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে খুব সহজে যাওয়া যায়, বিশেষ করে তারেক রোড বা রাবি রোড এলাকা থেকে। যেখানে বর্তমানে ঝুমের বসবাস। সূর্যাস্ত দেখার জন্য অসাধারণ স্থান। তাছাড়া এখানে উট বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে মজা নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। বেশ কিছু খাবারের ব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। সাধারণত, বিকেল থেকে রাতের সময়টুকু ক্লিফটন বিচে ভির বেশি থাকে। কিন্তু এই সময়টাতেই ক্লিফটন বিচ অসাধারণ রূপ ধারণ করে বলে সূর্যাস্ত দেখতে সকলে এখানে ভির জমায়। যেমন ঝুমরা এসেছে। ছুটির দিন না হওয়ায় আজ ভির তুলনামূলক কম।
ঝুম খুশিতে দিশেহারা। এতো সুন্দর দৃশ্য সে কল্পনাও করেনি। পাকিস্তানে আসার আগে তারেক রোডের আশেপাশের এলাকা, দর্শনীয় স্থান নিয়ে সে গুগলে সার্চ করেছিল। তখন সে এই বিচ নিয়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছিল। আসার ইচ্ছা থাকলেও কখনো কল্পনাও করেনি সত্যিই আসতে পারবে। এতো এতো সুন্দর কেন পৃথিবী? ঝুম কারো অপেক্ষা না করে পা বাড়ানো সমুদ্রের দিকে। শাইয়ান তাকে যেতে দেখে গাড়ির চাবি আহিরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পার্ক করার নির্দেশ দিল। পরপর সেও ঝুমকে অনুসরণ করে দূরত্ব বজায় রেখে ঝুমের পিছু নিল। মেয়েটাকে সে একা ছেড়ে দিলো নিজের মতো করে কিন্তু ঝুমের সাথ ছাড়লো না।
সকলকে পিছু ফেলে ঝুম নিজের মতো দুনিয়াবি সব চিন্তা ভুলে হেঁটে চলল অনেকদূর। হাঁটতে হাঁটতে মানুষের ভির ঠেলে তারা জনমানবহীন এরিয়ায় চলে এলো। ঝুম যখন বুঝতে পারল, চোখেমুখে ভয় নিয়ে আশেপাশে তাকালো। দেখতে পেল তার থেকে কিছুটা দূরে শাইয়ান দু পকেটে হাত গুঁজে তার পানে তাকিয়ে। তার চোখ দুটো যেন ঝুমকে বলছে, ‘ ভয় নেই আপনি নিজের মতো আনন্দ করুন। আমি আছি আপনার পাশে।’ ঝুম জানে শাইয়ান যতক্ষন আছে তার কোনো কিছুতে ভয় পেতে হবে না। সে স্মিত হেঁসে পায়ে দেয়া জুতাটা খুলে হাতে নিলো। তাকে জুতা হাতে নিতে দেখে শাইয়ান এগিয়ে এসে ঝুমের হাত থেকে জুতাটা নিজের হাতে নিয়ে চোখের ইশারায় বলল, ‘ যান।’
ঝুমের তখন নিজেকে বিশেষ কেউ মনে হচ্ছিল। কেউ তাকে এতোটা যত্ন নিচ্ছে তার বিশ্বাস হয় না। বুকের ভিতর খুশির ফোয়ারা বয়ে বেড়াচ্ছে। চোখেমুখে অন্যরকম দ্যুতি ছড়িয়ে পরলো। একহাতে শাড়ির আঁচল আর অন্যহাতে কুঁচি সামলে সে ছুট লাগালো সমুদ্রের দিকে। শাইয়ান নিজেও প্যান্টের নিচের অংশ কিছুটা তুলে নিজের জুতাটা পাশে বালুতে রেখে একহাতে ঝুমের জুতা নিয়ে ঝুমের আশেপাশে দাঁড়িয়ে ঝুমকে দেখতে রইলো। তার দেখা সেই চুপচাপ গুমরে মরা মেয়েটা আর নেই। এখন ঝুম নিজের মাঝে লুকানো চঞ্চলতা দেখায়। শাইয়ানকে রাগ দেখায়। ঝুমের মাঝে যে পরিবর্তন এসেছে তা কি মেয়েটা বুঝতে পারছে? মেয়েটার শাড়ির নিচের অংশ ভিজে একাকার। আবেগে আপ্লুত ঝুম দিকবেদিক ছুটে চলছে। অনেক অনেকক্ষন পর সে হাঁপিয়ে গেল। শাইয়ানের কাছে ফিরে এসে বলল –
” ডক্টর পানি খাব।”
শাইয়ান তাকিয়ে দেখলো ঘামে ভেজা মুখখানা। শেষ বিকেলের কমলা রোদে কি চমৎকারই না লাগছে তাকে। অসাধারণ। বাম হাতে তখনো ঝুমের জুতা জোড়া। ডান হাতটা তুলে শার্টের হাতা দিয়ে খুব আল্লাদে, সযত্নে ঝুমের নাকের ঘাম মুছে দিল। যেন ঝুম কোনো বাচ্চা মেয়ে। এমন কাজে ঝুম খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। শাইয়ান তখনো হাপুস্ নয়নে ঝুমকে দেখছে। কি ভীষণ সুন্দর হাসি। এগিয়ে এসে ঝুমের বা’হাত নিজের ডান হাতে আঁকড়ে নিয়ে এগিয়ে গেল। ঝুম দেখতে পেলো শাইয়ানের অনাদরে পরে থাকা জুতাটা সে পায়ে পরছে। তারপর নিজে ঝুমের সামনে বসে হাত বাড়িয়ে দেয় ঝুমের পায়ের দিকে। কি হচ্ছে বুঝতে পেরে ঝুম দূরে সরতে চাইলো কিন্তু শাইয়ান এবার তা হতে দিলো না।
একহাতে পা ধরে অন্যহাতের তালু দিয়ে ঝুমের পায়ের তালুর নিচে থাকা বালু গুলো যত্ন সহকারে মুছে দিয়ে একে একে দুপায়ে জুতা পরিয়ে দিল। বিস্ময়ে ঝুম কথা বলতে ভুলে গেলো। এসব কি সত্যি? বাস্তব? এমনও কি হয়? এতো ভালোবাসা? তার জন্য? কিন্তু কিভাবে? সে বুঝতে পারছে না। শাইয়ানকে সে যতো দেখে ততো অবাক হয়ে। ভালবাসতে চায়। কিন্তু ভয় হয়। খুব ভয় হয়। ভালোবাসা পেয়েও যদি হারিয়ে ফেলে? এই ভয়ে সে আগাতে পারে না। নয়তো এমন একটা পুরুষকে নিজের করে পাওয়া সব মেয়ের স্বপ্ন থাকে। এই মানুষটাকে ভালো না বেসে থাকা যায়? যায় না। ঝুম ও পরছে না। তবুও জোর মনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঝুম বুঝতে পরছে বেশি দিন নেই এই লোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার। যা শুরু করেছে লোকটা।
তারা যখন সকলের কাছে আসলো তখন দেখতে পেল ঈশাল, সাদ, মিশাল, আয়ান উটের পিঠে চড়ে বেড়াচ্ছে। দারুন দৃশ্য। তার চোখ প্রফুল্ল। শাইয়ান কোথা থেকে এক বোতল পানি এনে বোতলের ঢাকনা খুলে ঝুম হাতে দিয়ে বলল –
” উঠবেন?”
ঝুম স্মিত হেসে মুখে পানি নিয়ে দুদিকে বারবার মাথা নেড়ে বুঝাল উঠবে না। তার ভয় করে বাবাহ্। যদি ওখান থেকে একবার পড়ে যায় তার কোমরের হার একটাও জীবিত থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। শাইয়ান বুঝলো ঝুম ভয় পাচ্ছে তাই আর জোর করল না। এমনিতেও সে চায় না তার বউ এতগুলো মানুষের মাঝে উটের পিঠে চড়ে বেড়াক। সেদিক থেকে ঝুমের উত্তরে খুশিই হলো সে। অন্যহাতে আনা ঝালমুড়ির প্যাকেটটা ঝুমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পানির বোতলটা নিজের হাতে নিল। ঝুম ওদের দেখতে দেখতে মুড়ি খেতে লাগলো। আহিরকে দেখা গেলো কিছু দূরে উদাস নয়নে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছে। শাইয়ান একপলক আহিরকে দেখে আবার ঝুমের পানে তাকালো। মেয়েটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে উটের পিঠে চড়ে বসা ঈশালকে দেখছে। যে সমানে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সাদকে বকছে। ঈশাল একদম উঠতে চায়নি। ভয় পায় সে তাও সাদ জোর করলো একসাথে ওঠার জন্য। তাই বোকাও খাচ্ছে সে। ওদের দেখে ভীষণ হাসি পেলো ঝুমের। ঝুমের ঠোঁটে হাসি দেখে শাইয়ানের বুকে শান্তি শান্তি লাগে। মেয়েটা ইদানিং হাসে। রয়েসয়ে হাসলেও হাসে তো। যা আগে দেখা যেতো না। হাসলে কি যে মিষ্টি লাগে, তা সে কাউকে বুঝাতে পারবে না। ঝুম যখন হাসে তখন তার দুগালে মিষ্টি দুটো টোল পড়ে। যাতে তাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। শাইয়ান তখন তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখতেই থাকে।
তারা বাড়িতে ফিরল রাত ৮ টা নাগাদ। সূর্যাস্তের মিষ্টি দৃশ্য দেখে তারা আরো কিছুক্ষন আশেপাশে ঘুরেফিরে খেয়েছে। ঈশাল, মিশাল আর আয়ান মিলে এটা ওটা কিনেছে। ঝুম বরাবরই নীরব। শাইয়ান বারকয়েক বলল কিছু কেনার হলে কিনতে। এমনকি রূপী ভর্তি ওয়ালেটটাও তার হাতে তুলে দিলো। তা দেখে আশেপাশের সবাই ওদের দিকে কেমন করে যেন তাকালো। ঈশাল সাদের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল –
” দেখো। দেখে কিছু শেখো।”
বখাটে আহিরটা আরো একধাপ এগিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলো। ঝুম যে কি লজ্জায় পরেছিল তখন। অথচ কাজটা করে শাইয়ানের মাঝে ভাবাবেগ দেখা গেলো না। তার মতে সে ঠিক করেছে। তার সব কিছুর একমাত্র হকদার তার বউ। বউ যদি ওয়ালেট ফাঁকা করেও দেয় তাতে কিছু যায় আসে না। অথচ তার বউ ওয়ালেট ফাঁকা করা তো দূরের ব্যাপার ওয়ালেট ধরে সেই যে মাথা নিচু করলো আর তার দিকে ফিরে চাইল না। এতো লজ্জার কি আছে শাইয়ান বুঝলো না। যা বুঝলো তা হলো, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তার আন্ডা – আন্ডিকে আনতে তাকে অনেক বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে। মনে মনে বলেও ফেলল –
” তোদের আসার সময় আরো কয়েক বছর পেছালো রে বাপ।”
যদিও তারা বাইরে ঘুরেছে কিন্তু রাতের খাবারটা সকলে এক সাথে বাড়িতেই খেলো। ঈশাল আর সাদ আজ এখানেই থাকবে। খাওয়া শেষ হলে ঝুমকে আর পাওয়া গেলো না। এতগুলো দিন পর ঈশাল আর ঝুম এক হয়েছে তাদের আলাদা করার সাধ্য কার? শাইয়ান বুঝেছিল এমন কিছুই হবে। তাই বিশেষ বাধা দিল না। কিন্তু রাত যখন বাড়তে বাড়তে ১ এর ঘরে পৌঁছালো তখন সে অস্থির। এতক্ষন বউ ছাড়া সে থেকেছে এইতো অনেক। এখন তার ঝুমকে চাই। চটজলদি রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ঈশালের রুমের উদ্দেশ্যে। ওখানে গিয়ে সে অবাক। সে ছাড়া সকলে আড্ডা দিচ্ছে। এমনকি আহিরও উপস্থিত। মানে কি? ইতরগুলো তার বউকে এখানে রেখে তাকে বউ ছাড়া একা রাখার ধান্দা করছিল নাকি? ক্ষেপে গেলো সে। কথা নেই বার্তা নেই বড়বড় কদমে ঝুমের পাশে গিয়ে দাড়াল। সকলের দৃষ্টি তখন শাইয়ানের দিকে। আর শাইয়ান ঝুমকে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিতে ব্যস্ত। আহির কিছু বলতে মুখ খোলার আগে শাইয়ান তার লম্বা, শক্ত, পেটানো পুরুষালি হাতে ঝুমকে তুলে নিল। ফিরে যেতে যেতে বলল –
” রাত অনেক হয়েছে তাই বউকে নিয়ে যাচ্ছি। গুডনাইট।”
সকলে হতভম্ব শাইয়ানের এইরূপ দেখে। আহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –
” আগেই বলে ছিলাম যেতে দাও ওনাকে। শাইয়ান আসলে নাক কাটা যাবে শুনলে কেউ আমার কথা?”
ঈশাল এখনো তার অবাকতা কাটাতে পারেনি। শাইয়ানকে সে এভাবে কখনো দেখেনি। তারা শাইয়ানকে ভয় পায়। কিন্তু আজকের শাইয়ান অন্যরকম ছিল। আলাদা একটা মানুষ। এসব কি ঝুমের জন্য? ঈশাল ওভাবেই থম মেরে বলল –
” তাই বলে এভাবে? এতো পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব?”
আহির কথা বাড়ালো না। এরাতো আর জানে না ঝুমের জন্য শাইয়ান কি কি করে। জানলে এই প্রশ্ন করত না। সে ওখানে বসে না থেকে বেরিয়ে গেল।
“অসভ্য, অসভ্য, অসভ্য।”
” আচ্ছা।”
বলে বিছানায় নামিয়ে দিলো ঝুমকে। ঝুম ভীষণ রেগেছে। পারে না রাগে চেঁচাতে। এই লোক পেয়েছে কি তাকে? মান-ইজ্জতের কিচ্ছু রাখলো না। যখন যা মনে চাইবে করে যাবে। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করে শুয়ে পড়ল ঝুম। শাইয়ান ঘরের লাইট বন্ধ করে তার পাশে এসে ঝুমের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। ঝুম তার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে।
” কাল আমি চলে যাচ্ছি।”
কাল! কিন্তু তার তো আরও দুইদিন থাকার কথা ছিল। চট করে ঝুম পাশ ফিরে শাইয়ানের দিকে ফিরল। তার চোখে মুখে প্রশ্ন।
Remedy part 12
” অফিসিয়াল মেইল এসেছিল গতকাল রাতে। আগামীকালই যেতে হবে।”
তার মানে এই জন্য শাইয়ান ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল? কারণ কাল সে চলে যাবে বলে? বুকের ভিতর কেমন করে উঠলো ঝুমের। কাল চলে যাবে লোকটা? তারপর কি এই ঘরে তাকে একা থাকতে হবে? শাইয়ান আর থাকবে না তার সাথে? বুকটা পুড়ে যাচ্ছে কষ্টে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না ঝুম। শাইয়ান হয়তো কিছু শুনতে চেয়ে ছিল তার থেকে। কিন্তু নাহ্, মেয়েটা একটা কথাও বলল না। হঠাৎ করে বড্ড অভিমান হলো শাইয়ানের। প্রতিবার সেই কেন চেষ্টা করে যাচ্ছে? কেন ঝুমের তরফ থেকে কোনো বার্তা আসছে না? সে কি জোর করছে ঝুমকে? করছেই তো। নাহলে কেন ঝুম তার থেকে দূরে থাকার পাঁয়তারা করবে? শাইয়ান আর একটা কথাও বলল না। এবার সে ঝুমের দিকে পিঠ দেখিয়ে শুয়ে পড়ল। শাইয়ান পাশ ফিরতেই এতক্ষনে ধরে রাখা ঝুমের চোখে জমা অশ্রুগুলোর বেরিয়ে এলো।
