যাত্রাপথ পর্ব ১৯
মাশফিত্রা মিমুই
বহুদিন পর স্বামীর ভিটায় ভাইয়ের আগমনে ফরিদার ব্যস্ততা সকাল থেকেই একটু বেড়েছে। আতিথ্যে যেন বিন্দুমাত্র খামতি না থাকে তার জন্য কাকডাকা ভোরে শাহরিয়ারকে পাঠিয়েছিলেন হাটে। ছেলেটা ফিরতেই বাজারের ব্যাগ নিয়ে বারান্দায় বসলেন তিনি। ভালো করে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,“খালি মাছ আর আনাজ ক্যান? গোশ কই?”
কলপাড় থেকে হাত ধুয়ে এসে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জুতা খুলছিল শাহরিয়ার। প্রশ্ন শুনে উত্তর দিলো,“হাটে গরু কাটা হয় সপ্তাহে দুইদিন, বিষদবার আর শুক্কুরবারে। আইজ মঙ্গলবারে আমি গোশ পামু কই?”
চিন্তায় পড়লেন ফরিদা। ললাটে ফুটে উঠলো বিরক্তির ছাপ। এতদিন পর ভাই এলো বাড়িতে অথচ মাংস খাবে না? কোমল স্বরে বললেন,“তাইলে খোপ থাইক্যা একটা মোরগা ধইরা আন।”
“মাত্র হাট থাইক্যা ফিরলাম, চাচী। নাজমুল, জাহিদরে কন গিয়া।” বলেই সে চলে গেলো ঘরে। ফরিদা ওখানে বসেই কিছুক্ষণ বিড়বিড় করলেন। তারপর কোমরে আঁচল গুঁজে নিজেই খোপের দিকে হাঁটা ধরলেন।
কাচারি ঘর থেকে ভেসে আসছে পুরুষদের হাসির ঝংকার। মুখোমুখি বসে আছেন আমিরুল শাহ আর শ্যালক সিরাজ উল্লাহ। চা খেতে খেতে জম্পেশ আলোচনা চলছে দুজনের মধ্যে। তবে কিছুটা বেজার হলেন আমিরুল শাহ। বললেন,“তোমারে খবর পাঠাইছি আরো সপ্তাহ খানেক আগে। আর তুমি কিনা আইছো আইজ? তাও আবার আওয়ার আগে জানাও নাই পর্যন্ত।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“রাগ কইরেন না তো, দুলাভাই। বাড়িত অনেক কাম। জন্ম দিছি দুইডা আকাইম্যা। বাপ ছাড়া এক পাও লড়তে পারে না। তাই আইতে আইতে দেরি হইয়া গেছে। খবর যে পাঠামু তারও জো নাই।”
“এইদিকে তো আর আসোই নো। খালি কামের বাহানা যত।”
“আমনে বুঝবেন না। এইবারের ঝড়ে আমার বুরো ক্ষেতের ধান নষ্ট হইয়া গেছে। মাত্র এক মণ উডাইতে পারছি। বহুত লস হইয়া গেছে, দুলাভাই!”
“আমগোও হইছে। শেষের ধানগুলা পানিতে ডুইবা গেছে। ওইদিকে নাজিরের কপাল আবার ভালা। আগে আগেই কাইট্টা ফেলাইছে। ভালাই ফলন হইছে।”
“অনেকদিন দেখা হয় না। তা কী করে নাজিরে?”
“কী করে না হেইডা কও। বাড়িত ঢুকতেই যেই বিশাল গরুর খামার দেহা যায়? ওইডা হেরই। এইবার ঈদে তিনডা গরু আর দুইডা খাসি বেচছে। লগে ক্ষেত করে, কয়দিন আগে ধানের মিলও দিছে। কত কইরা কইলাম, আমগো ব্যবসার লগে যোগ কর।”
“রাজি হয় না?”
“না, উল্ডা কয় ওর বাপের ভাগের সবকিছু নাকি আমরা ভোগ কইরা খাইতাছি। ইদানিং একটু বেশিই লাফাইতাছে। কাউরে মানে না। মাঝে মাঝে তো আমারই ডর লাগে ওরে।”
“বিয়া দিয়া দেন। বয়স কম, বাপ-মা কাছে পায় নাই তাই এমন করে। আমার সাদ্দামও এমন করতো। পরে বিয়া দিয়া ঘরে বউ আনতেই ঠিক হইয়া গেছে। বাপের কথায় এহন উঠে আর বসে।”
“হের লাইগাই তো তোমারে ডাইকা আনছি। একটা মাইয়া দেহো, সিরাজ। গরিব ঘরের মাইয়া লাগবো। সমাজে যাতে কোণঠাসা হয়। ভাই টাই থাকবো না। এমন মাইয়া খোঁজ করো যাতে এক ব্যাডার অনেক মাইয়া, বিয়া দিতে পারতাছে না ট্যাহার অভাবে। তয় দেখতে সুন্দরী হওয়া চাই। বড়লোক ঘরের মাইয়া দিয়া আবার সংসার হয় না। জামাইয়ের উপর মাতব্বরি করার পাঁয়তারা করবো।”
“আমনের তো চাহিদা বেশি, দুলাভাই। আমার মাইয়া আছে। দিমু নাকি? ফুফু আর ভাইঝি মিল্যা এক বাড়িত না হয় সংসার করবো।”
“লজ্জা নাই তোমার? পুরানা কথা ভুইল্যা গেছো?”
“অতীত মনে রাখতে নাই। যেইদিকে লাভ হেইদিকেই সিরাজ উল্লাহ। রাজি থাকলে কন।”
“না, যা কইছি তা হুনো। তাড়াতাড়ি সন্ধান লাগবো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়া দিয়া দিতে চাই।”
“হঠাৎ ভাই পুতের লাইগা এত দরদ উতলাইয়া পড়ে ক্যান? মতলব কী আমনের? রহস্যের গন্ধ পাইতাছি।”
“কোনো মতলব নাই। বাড়িত শত্রু ঢোকার পাঁয়তারা করতাছে। তাই পথ বন্ধ করতে চাইতাছি।”
“শত্রু?”
“পরে কমু। তুমি ঘটক লাগাও, মাইয়া খোঁজো। হাতে এই সপ্তাহটাই সময় আছে।”
“চিন্তা কইরেন না। এই সপ্তাহও মনে হয় না লাগবো। চেনা পরিচিত মাইয়া আছে। যেমন চাইছেন তেমনই। আইজ ফিইরাই কথা কমু না হয়। এরপর আমনেরে খবর পাঠামু।”
আমিরুল শাহ সন্তুষ্ট হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। রোদের দেখা মিলছে না বেশ কয়েকদিন ধরে।
“আরে সিরাজ মামু যে! খবর কী?”
সিরাজ উল্লাহ সবে চায়ে চুমুক দিয়েছিলেন। রসিকতার সুরে কথাটা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখা পেলেন পরিচিত মুখের। খানিকটা হাসলেন, “নাজির শাহ যে! খবর ভালাই। তোরটা ক।”
বাম হাতে ধরা লুঙ্গির এক কোণা ছেড়ে দিয়ে তাঁর পাশে ধপাস করে বসে পড়ল নাজির। অপর হাতে বাঁশের মতো দেখতে আখের খন্ড। চিবিয়ে রস খেতে খেতে বললো,“মন্দ না।”
“কাজ কাম কেমন চলে? হুনলাম, ব্যবসা করোস?”
“কীয়ের আবার ব্যবসা? ট্যাহা আছে নাকি? দাদার এত জমিজমা থাকতে বাপে ভাগে পাইছে দুই বিঘা। তার মধ্যে আমরা দুই ভাই পামু মাত্র এক বিঘা কইরা। আর ব্যবসা তো দখল করছে চাচারা। তাই আল্লাহর রহমতে খাইয়া পইড়া বাইচ্চা আছি কোনো মতো।”
মেজাজটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো আমিরুল শাহর। ধমকালেন,“মুখ সামলা, নাজির! সারাক্ষণ শুধু চাচাগো দোষই জিহ্বার ডগায় লাইগা থাকে? তোর নিজের কিনা জমির কথা কস না ক্যান?”
“ওইগুলা কমু ক্যান? ওইগুলা আমার পরিশ্রমের ফল। আমার অর্জন। কথা হইবো বাপ, দাদারটা লইয়া।”
“আহা! কাইজ্জা কইরেন না তো, দুলাভাই। পোলাপাইন মানুষ। কত কথাই তো কয়। তাছাড়া কথা কিন্তু ভুল না। আমনেগো ভাগে এত জায়গা জমিন আর সুবহান ভাই এর ভাগে কিনা মাত্র ওইটুকুন? যে কারোরই চোখে পড়ার কথা। অসুইখ্যা ভাইয়ের পোলাগো ঠকানো কিন্তু আল্লাহ সহ্য করবো না।” সিরাজ উল্লাহ বলে উঠলেন কথাটা।
শ্যালকের কথায় আমিরুল শাহ কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন,“তুমিও এহন ওরে কানপড়া দিতাছো, সিরাজ? তা তুমি কোন ওলি আউলিয়া? অযথা আমার মুখ খুলাইয়ো না। বাপের তো একটা ছনের বাড়ি ছাড়া কিছুই আছিলো না। এই কয় বছরে এত উন্নতি কেমনে?”
“সবই কষ্টের ফল, দুলাভাই। বহুত পরিশ্রম করছি এই জীবনে। পরিশ্রম করলে সফলতা আপনাআপনি দোরগোড়ায় আইয়া পড়ে। ঠিক কইছি না, নাজির?”
“ঠিক মানে? খাপে খাপ ছকিনার বাপ।”
ফের দাঁতে দাঁত পিষলেন আমিরুল শাহ। তাঁর বড়ো কন্যার নাম আয়েশা। নাজির ঢং করে ডাকে ছকিনা আপা। তার মানে এটাও তাঁর উদ্দেশ্যেই খোঁচা মারা কথা। আর এই সিরাজটাও এক নাম্বারের ধুরন্ধর। কাউকে পেলেই ভালো সাজার অভিনয়ে নেমে পড়ে। এই জন্যই স্ত্রী আর স্ত্রীর গোষ্ঠীকে পছন্দ করেন না তিনি। লোকে বলে এরা নাকি ঘেঘা বংশ। তবুও জোরপূর্বক হেসে প্রসঙ্গ বদলানোর উদ্দেশ্যে বললেন, “বিয়ার প্রস্তুতি শুরু কর, নাজির। এইডা আষাঢ় মাস না? এই মাসেই তোর বিয়া দিয়া ঘরে নতুন বউ তুলমু। ছুডো ভাইয়ের বিয়া হইছে অথচ বড়ো ভাইয়ের হয় নাই। তাই পাছে লোকে অনেক কথাই কয়।”
“মাইয়া কেমন? থাকে কই?”
“সিরাজরে এর লাইগাই ডাকছি। ওর পরিচিত মাইয়া। এই সপ্তাহেই দেখতে যামু।”
“তার আর দরকার নাই।”
“ক্যান?”
“আমার লাইগা আমিই মাইয়া ঠিক করছি। আমনে গিয়া শুধু পাকা কথা কইয়া দিন তারিখ ঠিক কইরা আসেন। আর না পারলে কইয়েন, ছুডো চাচারে কমু না হয়।”
ভারি অবাক হলেন লোকটা। বয়সের ছাপ পড়া ফর্সা মুখখানায় অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। পরনের ফতুয়ায় হাত মুছে বললেন,“মাইয়া ঠিক করছোস মানে? কোন মাইয়া ঠিক করছোস তুই? কবে করলি? বাড়ি কই?”
“বুইড়া টানা সপ্তাহ দুয়েক ধইরা পিছনে পইড়া আছে। কী আর করমু? কয়বার না করা যায়? হের পরে ব্যাপারটা লইয়া অনেক ভাবলাম। আব্বার লগেও কথা কইলাম। বিয়া করলে আসলে আমারই লাভ। তাই সিদ্ধান্ত নিছি কাশেমের মাইয়ারেই বউ কইরা ঘরে তুলমু। হেরা যত দ্রুত সম্ভব কথাবার্তা পাকা কইরা দিন তারিখ ঠিক করতে চায়। আমনে তো আজাইরা মানুষই। কাইল, পরশু যান তাইলে।”
আঁতকে উঠলেন আমিরুল শাহ। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই। ঠিক শুনলেন তো? সিরাজ উল্লাহর দিকে একবার তাকালেন। ইশারায় কিছু বলতেই সিরাজ উল্লাহ হাত রাখলেন নাজিরের কাঁধে। নরম স্বরে বললেন,“আকবর মিয়া মাস্টর বাড়ির বুইড়াডা না?”
“হ।”
“হায় আল্লাহ! মাথা খারাপ হইয়া গেছে নাকি তোর? ওই ব্যাডা যেই চালাকের চালাক! তোর দাদার বন্ধু আছিলো ওই বুইড়ায়। লোকে কইতো একেবারে এক মায়ের পেট থাইক্যা জন্ম নেওয়া দুই ভাই যেন। তোর চাচীর বিয়ার সময়ও আছিলো। খুব সম্মান করতাম। কিন্তু কী করল শেষমেশ? তোর দাদার পিঠে ছুরি মারলো। তোর বাপে নিজের বাপের পর মান্য করতো ওই ব্যাডারে। অথচ তারেও ছাড়লো না। তোর বাপ জাইন্না ফেলায় হের জিভ কাটলো, পা ভাঙলো। প্রাণেই হয়তো মাইরা ফেলতো কিন্তু তোর চাচারা ঠিক সময়ে পৌঁছাইয়া যাওয়ার কারণে আর পারে নাই। আর হের সঙ্গ দিছিলো হের পোলারা। বড়ো নাতিও তো তহন ডাঙর। হেগো কারণে তগো আজ এই অবস্থা। তোর চাচাগোও কম ক্ষতি করে নাই। এই আমি আমার বন্ধু-বান্ধব আর সম্বন্ধি লইয়া সারা রাইত পাহারা দিছি এই শাহ বাড়ি। আর তুই কিনা হেগো বাড়ির মাইয়া ঘরে তুলতে চাস? ওরা যে কত ভয়ংকর তা তুই জানোস না। ঘুমের ঘোরে মাইরা দিলে কী করবি?”
ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে শ্বাস ফেলল নাজির। এই ঘটনার বর্ণনা সেই দশ বছর বয়স থেকেই সে শুনে আসছে। এলাকায় এ নিয়ে অনেক রটনাও আছে। তখন দেশে সদ্য স্বাধীনতার আনন্দ চলছে। হানাদারদের হাত থেকে মুক্তি মিলেছে। আইন শৃঙ্খলা ততটা কঠোর নয়। নব্য স্বাধীন দেশে সব ঠিক করতেও তো একটু সময় লাগে নাকি? অথচ তার মধ্যেই পুনরায় দেশে দেখা দিলো অশান্তি। স্বৈরাচার হয়ে উঠলো মহান নেতা। সে বহু কাহিনী। তাই কোন গ্ৰামে কে কাকে মেরেছে তা কে আসবে দেখতে?
পুলিশ নাকি আকবর মিয়া আর তাঁর বড়ো পুত্রকে আটকও করেছিল। সপ্তাহ খানেক গারদে থাকার পর মুক্তি মিলেছিল তাদের। কেন মিলেছিল নাজির তা জানে না। এখানেও অবশ্য একেকজনের একেক মত।
তবে নাজিরের ধারণা, আইন শৃঙ্খলার দুর্বলতার কারণেই হয়তো শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল তারা। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“এক কথা হুনতে হুনতে মুখস্থ হইয়া গেছে। নতুন কিছু থাকলে কইয়েন। নাজির শাহরে মারা এত সহজ? হুটহাট সিদ্ধান্ত আমি নেই না, মামু। শত্রুর মাইয়া শাহ বাড়িতে আইবো, শাহ বাড়ির মাইয়া কিন্তু যাইবো না। সে নিজে প্রস্তাব লইয়া আইছে। আর আমি শুধু সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইতাছি। খারাপ কী? বাপের দুর্বলতা হইলো নিজের মাইয়া মানু। তাই আপত্তি করার কিছু নাই। আর আমিও কারো মতামত চাই নাই। আব্বা ঠিক থাকলে কী চাচাগো পাত্তা দিতাম? তাই আর কোনো কথা না কইয়া বিয়ার ব্যবস্থা করেন। বিয়ার খরচ কিন্তু বড়ো চাচা আমনের। অনেক ট্যাহা পাই আমনের কাছে।”
কথা শেষ করে উঠে গেলো নাজির। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই চলে গেলো। আমিরুল শাহর মাথায় হাত। দুর্বল কণ্ঠে বললেন,“এহন কী হইবো, সিরাজ? এই পোলা আমার কোনো কথা হুনে না। তুমি তো নিজ চোখেই দেখলা।”
“পোলায় কিন্তু চালাক আছে। কথায়ও যুক্তি আছে। ওই বলদ বাপের ঘরে এমন চালাক পোলা কেমনে পয়দা হইলো? নাকি নাসরিনের অন্য জায়গায় চক্কর আছিলো, দুলাভাই? সেই অপকর্মের ফসল?”
সশব্দে হাসলেন সিরাজ উল্লাহ। আমিরুল শাহ বিরক্ত হলেন এতে। মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“চুপ থাকো মিয়া। তুমি জানতা না ওই বেডি কেমন আছিলো? আর চক্কর থাকলেও পোলার চেহারা বাপ, দাদার মতন কেমনে হয়? একেবারে হুবহু আব্বার নাক, কান পাইছে। আর কপাল, ঠোঁট সুবহানের লাহান। উচ্চতায় মুমিনের সমান। আমগো বংশে সবচেয়ে লম্বা তো মুমিনই।”
“চোখের কথা কন না ক্যান? একেবারে মায়ের মতন। ওই চোখ আমি জীবনেও ভুলমু না।”
প্রসঙ্গ আবারো বদলালেন আমিরুল শাহ। চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। নাজিরকে বুঝিয়ে আর লাভ হবে না। যা সিদ্ধান্ত একবার সে নেয় তাই করে ছাড়ে। তবুও ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে একবার শেষ পরামর্শ করে দেখবেন।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাটির সরু রাস্তা পেরিয়ে মেইন সড়কে উঠতেই আবারো আকবর মিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো নাজিরের। রোজ নিয়ম করে দুইবার দেখা হয়। সেদিন না করার দুই সপ্তাহ পেরিয়েছে। তবুও হাত ধুয়ে লোকটা পরে আছে তার পেছনে। নাজির অবশ্য কম ভাবেনি। ভেবেই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আকবর মিয়া কিছু বলার উদ্দেশ্য ঠোঁট নাড়ালেন। কিন্তু নাজির তাকে বলার সুযোগ দিলো না। হাত থেকে আখের শেষ অংশটুকু ঢিল মেরে দূরে ফেলে দিয়ে তার আগেই সে বলে উঠলো,“মেজাজ খারাপ। কথা কইয়েন না তো।”
“উত্তর কী একই?”
“না বদলাইছে। রাজি আমি। বড়ো চাচার লগে মাত্র কথা কইয়া আইলাম। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যেই হেরা আমনেগো কাছে যাইবো।”
আকবর মিয়া প্রথমে অবাক হলেন। পরপর মুখমন্ডলে প্রকাশ পেলো চাপা আনন্দ। বিড়বিড় করে আলহামদুলিল্লাহ বলে ত্যাগ করলেন স্থান। নাজিরের মতো ঘাড়ত্যাড়া ছেলে যে এত দ্রুত রাজি হয়ে যাবে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে গতকালও ছেলেটা বৃদ্ধর সঙ্গে ত্যাড়ামি করেছিল। অথচ আজ! দ্রুত পা চালালেন তিনি। এবার বাড়ির সবাইকে জানাতে হবে খবরটা। এতদিন ওই ছেলের মতামতের জন্যই তো জানাতে পারেননি।
মিছরির দিনগুলো বিশেষ ভালো যাচ্ছে না। গ্ৰামে আছে মাস খানেকেরও বেশি সময় ধরে। স্কুল ছেড়ে, সমবয়সী বান্ধবীদের ছেড়ে এতদিন ভালো লাগে কোথাও? অথচ বাবা, দাদা কিছুতেই তাকে যেতে দিচ্ছে না। মাঝখানে অবশ্য বিয়ে দেওয়ার ঝোঁক চেপেছিল তাদের মাথায়। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে মাথা থেকে আপাতত সেসব বেরিয়েছে। তাতেই শান্তি।
দুপুরের খাওয়া শেষে নিজ স্ত্রী এবং বাড়ির পুরুষদের বসার ঘরে তলব করেছেন আকবর মিয়া। সুজন বাদে যথাসময়ে বাদবাকি সকলে এসেই উপস্থিত হয়েছে সেখানে। আকবর মিয়া এসে বসলেন নিজের তুলোর নরম বালিশ বিছানো কেদারায়। হাতলে দুই হাত রেখে পিঠ ঠেকালেন পেছনে। সৈয়দুন নেছা জিজ্ঞেস করলেন,“সবাইরে ডাকলেন যে? গুরুত্বপূর্ণ কিছু কইবেন?”
“হ।” একটু সময় নিয়ে নিজেকে গোছালেন তিনি। তারপর শুরু করলেন,“মিছরির বিয়া দিমু কইছিলাম। কিন্তু মনমতো পাত্র না পাইয়া শেষমেশ ঘটকরে আইতে নিষেধ কইরা দিছি। তার উপরে গেরামের কিছু মানুষ এহনো আমগো মাইয়ার বিরুদ্ধে।”
পুত্ররা মাথা নাড়িয়ে সহমত পোষণ করল। নাতি তালেব বললো,“বড়ো মামায় চিঠির মাধ্যমে আরিফের লগে মিছরির বিয়ার প্রস্তাব পাঠাইছে। ওইডা নিয়া কী ভাবলেন, দাদাজান? প্রস্তাব কিন্তু ভালা।”
“তা ভালা কিন্তু সারাজীবন কী আর মাইয়া বরিশাল পইড়া থাকবো নাকি? তোর বাপে ওই প্রথম আমার বিরুদ্ধে গিয়া আমার নাতনিরে অতদূরে দিয়া রাখছিল। কিন্তু এইবার আর আমি দিমু না। যহন লঞ্চে উঠে তহনি তো আমার ডর লাগে।”
“তাইলে?” নজরুল আলম জিজ্ঞেস করলেন।
“পাত্র আমি ঠিক কইরা রাখছি। বাড়ির মাইয়া চোখের সামনে থাকবো, যহন ইচ্ছা তারে দেখতে পারমু।”
“পোলা কেডা?”
“নাজির শাহ।”
মুহূর্তেই যেন স্থানটিতে বিস্ফোরণ ঘটলো। বৃদ্ধর মুখে এমন একটি কথা কেউই আশা করেনি যেন। শুধু স্ত্রী সৈয়দুন নেছা এবং ছোটো পুত্র কাশেম আলী শান্ত রইলেন। দুজনে আগে থেকেই সবটা জানেন। স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ না করে পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্ত বৃদ্ধ নেন না। মাসুম ক্ষ্যাপে উঠলো,“এই প্রথম আমনের লগে আমি একমত না, দাদাজান। আমার বোইন আমি কিছুতেই শাহ বাড়িতে দিমু না। আর নাজিররে তো আমার একদমই পছন্দ না। হারামজাদায় বেয়াদব। ওর লগে বিয়া দিয়া আমার বোইনের জীবন ধ্বংস করমু নাকি? আব্বা, আমনে কিছু কন না ক্যান?”
কাশেম আলী নিচু স্বরে বললেন,“আমার কোনো আপত্তি নাই। আব্বায় আমারে আগেই জানাইছে।”
“তারপরেও কেমনে?”
“নাজির এমনিতে খারাপ না। চরিত্র ভালা, পরিশ্রমী পোলা। গেরামের কেউ ওর নামে খারাপ কিছু কইতে পারবো না। সবার বিপদে আগাইয়া যায়। শুধু একটু ঘাউড়া। মুখের উপরে সত্য কথা কইয়া দেয়। খারাপ হইলে হেইদিন ওই বিচার সভায় সবার বিরুদ্ধে গিয়া আমগো মিছরির পক্ষে কথা কইতো?” আকবর মিয়া বললেন।
কিছু সময়ের জন্য চুপ রইলো মাসুম। তার সাথে সাথে রুহুলও ক্ষ্যাপা। নজরুল আলম বললেন,“কার মনে কী আছে জানি না, আব্বা। নিজেগো মাইয়ার জীবন লইয়া খেলতে পারি না আমরা। যতই হোক, শাহ বংশের পোলা ওয়। আমগো মিছরি কী প্যাঁচঘোচ কিছু বোঝে?”
“আমার সিদ্ধান্তের উপরে তোর ভরসা নাই, নজরুল? আমি কী কহনো তগো লাইগা ভুল সিদ্ধান্ত নিছি?”
“তা নেন নাই, আব্বা। তবুও!”
“কাশেম রাজি, তগো আম্মায় রাজি। তারপরেও তোরা এই কথা কস কেমনে? আমি ভাইবা চিন্তা সিদ্ধান্ত নিছি। কাশেমের মত নিয়াই প্রস্তাব দিছি।”
তালেব জিজ্ঞেস করল,“নাজির কী কয়? রাজি ওয়?”
“হ রাজি। দুয়েক দিনের মধ্যেই ওর চাচারা দিন তারিখ ঠিক করতে আইবো।”
তালেব বুদ্ধিমান পুরুষ। বাকি ভাইদের মতো হুটহাট রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেমানান। কথাও বলে কম, ভেবেচিন্তে। মাসুম ক্ষিপ্ত হয়ে বললো,“আমি রাজি না। ওই বাড়িত আমি আমার বোইন দিমু না। আব্বায় রাজি থাকলেও না।”
নিজের কথা শেষ করে হনহনিয়ে সে চলে গেলো ঘরে। কাশেম আলী করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন পিতার দিকে। আকবর মিয়া আশ্বস্ত করলেন,“বয়স কম, রক্ত গরম। বুঝাইলে ঠিক বুঝবো। একটু সময় দে।”
নজরুল আলম পুনরায় বললেন,“আমি জানি না আব্বা, আমনে ক্যান এই সিদ্ধান্ত নিছেন। কিন্তু অতীত নিশ্চয়ই ভুলেন নাই? নিজেগো স্বার্থ সিদ্ধির চক্করে ওই ছুডো মাইয়াডার না আবার ক্ষতি হইয়া যায়।”
যাত্রাপথ পর্ব ১৮
“অতীত ভুলি নাই। তবে এইডা আকবর মিয়ার নাতনি। কারো এত বড়ো কইলজা হয় নাই যে আমার নাতনির দিকে হাত বাড়াইবো। আকবর মিয়ার পোলা, নাতিরা কী মইরা গেছে? নাকি শরীরের জোর কইম্মা গেছে? শালিসে কিছু করতে পারি নাই, মাইয়া বাড়িত থাকার কারণে। কিন্তু তাই বইল্যা ক্ষমতা আমগোও কম না। কেউ গায়ে হাত লাগাইতে আইলে ওই হাতটাই কাইট্টা দিবি। প্রয়োজন হইলে আমার মতন গুলি চালাইয়া দিবি। তবুও শত্রু গো কোনো ছাড় দিবি না।”
নজরুল আলম এই পর্যায়ে এসে হয়তো পিতার কথার অর্থদ্বার বুঝতে পারলেন। তাই চুপ রইলেন। তবে সেই আলোচনা শেষ হলো না। চলতে থাকলো আরো বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা।
