Home Remedy Remedy part 20

Remedy part 20

Remedy part 20
মীরা রায়াদ

ঝুম, শাইয়ান, আহির বর্তমানে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে অবস্থান করছে। দীর্ঘ প্রায় ৪ ঘণ্টার আকাশ পথ পারি দিয়ে তারা ঢাকা পা রেখেছে। ঝুমের ঝলমলে চেহারা দুই ভাইয়ের ক্লান্তি দূর করে দিলো নিমিষেই। তারা মূলত অপেক্ষা করছে ঝুমের বিশেষ মানুষটির জন্য। আহির ঘেমে অস্থির। করাচি গরম হলেও ঢাকা মনে হচ্ছে একটু বেশিই গরম। দমবন্ধকর ভ্যাপসা গরম। তার মেজাজ ঠিক নেই। এই গরমে দাঁড়িয়ে আছে সেই কখন থেকে কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা তার খোঁজ নেই।

পাশে শাইয়ান কিছুক্ষন পরপর ঝুমকে দেখে নিচ্ছে। আবার যত্নের সাথে ঝুমের নাকের, কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছে। হঠাৎ তাদের সামনে একটি বাইক খুব স্পিডের সাথে এসে থামলো। শাইয়ান ঝুমকে আগলে নিয়ে সরে দাড়ালো। আহির কিছু বলবে তার আগে বাইক থেকে নেমে এলো একটি মেয়ে। মাথার হেলমেট খোলার সাথে সাথে তার ছোট ছোট করে কাটা রং বেরঙের চুলগুলো কাঁধ বেয়ে পিঠময় ছড়িয়ে পরলো। কালো চুলের মাঝে বাহারি রকমের রং ছড়ানো। পরনে বাদামি রঙের লেডিস লেদার জ্যাকেট। যার খোলা চেইন থেকে অভ্যন্তরের কালো লেডিস টপ স্পষ্ট। গলায় কতোগুলো হাবিজাবি চেইন। হাতে কালো গ্লাভস ও কালো ডেনিম জিন্স। মেয়েটি হেলমেট খুলে বুকের সাথে ঝুলানো কালো সানগ্লাসটি চোখে পরে নিলো। আহির মেয়েটির ফ্যাশন সেন্স দেখে চোখ মুখ কুঁচকে বিকৃত করে ফেলল। জঘন্য রকম অনুভূতিতে পেটের সব কিছু উগলে আসতে চাইল। সামনে তাকিয়ে মেয়েটির ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসি ফুটে উঠল। ছুটে এসে শাইয়ানের থেকে খাবলে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ঝুমকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” ঝুমি, মাই বেবি।”
ঝুমের মনে হলো চেপ্টে ভর্তা হয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু ঠোঁটে তার মিষ্টি হাসি। শাইয়ান ঠিক যতটা অবাক তার থেকে আহির বেশি অবাক হলো। এতটাই অবাক হলো যে তার মুখ ২ ইঞ্চি ফাঁকা হয়ে আছে। শাইয়ান আস্তে করে ঝুমকে নিজের দিকে টেনে এনে বলল –
” আস্তে ব্যাথা পাচ্ছে।”
মেয়েটার ঠোঁটে ঝলমলে হাসি। ঝুম নিজেও হেঁসে ফেলল। এবার ঝুম এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। ব্যাপারটা শাইয়ান, আহির কারোরই ভালো লাগলো না। শাইয়ান মুখভঙ্গি গম্ভীর করে টানটান হয়ে দাড়িয়ে রইলো। আর আহির মুখশ্রী এমন আকৃতি করলো যেন সে ইহজনমে এর থেকে অদ্ভুত দৃশ্য কখনো দেখেনি।

” কেমন আছো শ্রাবণী আপু।”
” আগে কেমন ছিলাম জানি না, তবে তোকে দেখে ভীষণ ভালো হয়ে গেছি রে আমার পাখি।”
বলে ঝুমকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে খুব যত্নের সাথে ঝুমের মাথার অগোছালো চুল গুলো দুহাতে ঠিক করে দিলো। শাইয়ান তখনো গম্ভীর। তার ভালো লাগছে না ব্যাপারগুলো। ঝুমকে সে ছাড়া এভাবে কেউ যত্ন নিয়ে ভালোবাসছে বিষয়টা চরম জঘন্য লাগছে। অথচ বউ তার দাঁত বের করে কেমন হাসছে দেখো! মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার। যে কোনো সময় উল্টা পাল্টা বলে দিতে পারে। যথা সম্ভব তাই চুপ রইল। কিন্তু আহির চুপ রইল না। এটি তার স্বভাবসুলভ কাজ না। একে তো শ্রাবণী আর ঝুমের কথা সে বুঝতে পারছে না, তারওপর এমন এক জংলী মার্কা মেয়ের সাথে ঝুমের এই গলায় গলায় ভাব তার সহ্য হলো না মোটেই। সে এগিয়ে এসে কেমন অদ্ভুত ভাবে শ্রাবনীকে দেখে ঝুমকে টেনে দূরে সরালো। শ্রাবণী ভরকাল ভীষণ। ঝুমকে দারুন অপ্রস্তুত লাগলো। কিন্তু শাইয়ান মনে মনে খুশিই হলো। ঝুম হেসে পরিবেশ আগের মতো ঠিক করতে চাইল। আহির ঝুমের কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল –

” আপনি কার জন্য অপেক্ষা করছেন ভাবি? সে আসবে কখন? এখন ভীষণ গরম। প্লীজ তাড়াতাড়ি চলুন। আর এসব মেয়ের সাথে কথা বলতে হয় না।”
কথাটি বলে আড় চোখে একবার শ্রাবনীকে দেখে মুখ কুচকালো। এই পর্যায়ে ঝুম ভীষণ রকম অপ্রস্তুত হলো। গলা ভিজিয়ে মৃদু হেসে বলল –
” এই হলো আমার শ্রাবণী আপু। বিথী আন্টির বড় মেয়ে। আমরা এতক্ষন দির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ( কথাটি বলে শাইয়ানের কাছে গিয়ে হাত ধরে কাছে টেনে শাইয়ানকে দেখি বলল) আর আপু হি ইজ মাই ম্যান। মাই হাজবেন্ড ডঃ শাইয়ান রেহমান আনসারী। ( এবার আহিরকে দেখিয়ে বলল) উনি আমার দেবর ইঞ্জিনিয়ার আহির রেহমান আনসারী।”
‘মাই ম্যান’ শব্দটি ঠিক বুকে গিয়ে গেঁথে গেলো শাইয়ানের। এতক্ষন চোখে মুখে লেগে থাকা বিরক্তির রেশ কেটে চেহারায় দ্যুতি ছড়িয়ে পরলো শাইয়ানের।
শ্রাবণী শাইয়ানের দিকে এক পলক তাকিয়ে একটু হাসলো। পরপর ঝুমের দিকে ঝুঁকে এসে বাজখাঁই গলায় বলল –

” ঝুমিরে, দুনিয়াতে ছেলের কি অভাব ছিল যে তুই এই রাজাকারের বাচ্চা বিয়ে করলি শেষমেশ? আমাদের দেশে কি ছেলে ছিল না পাখি?”
ঝুম দ্রুত শাইয়ানের হাত ছেড়ে দুহাত সমানে নাড়িয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল –
” সু সু সু। উনি বাংলা বুঝতে পারে আপু।”
শ্রাবণী দাঁতে জ্বিভ কেটে শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে বোকা হাসলো। শাইয়ান গম্ভীর চোখে তাকে দেখে যাচ্ছে। সুযোগ পেলে এই মেয়েকে এক আছাড় মারতে দেরি করবে না। কতো বড় সাহস, তাকে রাজাকারের বাচ্চা বলে। আহির পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখলো সব। যদিও সে খুব একটা ভালো বাংলা জানে না। কিন্তু কিছু কিছু বুঝতে পারে। তা থেকেই সে ধারণা করে নিলো এই জংলী মেয়েটা শাইয়ানকে কিছু উল্টা পাল্টা বলেছে। নয়তো তার ভাইয়ের নাক ওমন লাল হবে কেন?
শ্রাবণী এবার ঝুমের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল –

” আগে বলবি তো তোর জামাই চালু জিনিস।”
ঝুম নিজেও শ্রাবণীর মতো ফিসফিসিয়ে বলল –
” তুমি কি বলার সুযোগ দিয়েছো? আর প্লীজ আপু, নিজের মুখটা কিছু দিনের জন্য নিয়ন্ত্রণে রেখো। ডক্টর ভীষণ রাগী কিন্তু।”
ঝুম অসহায় ভাবে বলল। মেয়েটার ঠিক নেই, ২৮ বছরের রমণীটি ভীষণ রকম এলোমেলো। কথা বার্তার ঠিক ঠাকানা নেই। ভালো মন্দ না বুঝেই অনেক কিছু বলে কেস খেয়ে লটকে থাকে। শ্রাবণী কিছু বলতে চাইলো শাইয়ানের জন্য পারল না।

” আরীবা, আমাদের এখন যাওয়া উচিত। এখানে খুব গরম। আপনার শরীর বিশেষ ভালো না। যার জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন তাকে তো পেয়েছেন। এবার যাওয়া যাক?”
স্পষ্ট বাংলা ভাষা। আহির ছাড়া সকলেই বুঝলো। শ্রাবণী ঝুমের অসুস্থতার কথা শুনে ব্যতিব্যস্ত হয় পরলো। প্রশ্ন করলো কি হয়েছে? উত্তরে ঝুম বলল –
” তেমন কিছু না আপু। জার্নি করে ক্লান্ত ছিলাম সামান্য মাথা ঘুরে গিয়ে ছিল।”

শ্রাবণী কথা না বাড়িয়ে তাদের জন্য আনা গাড়ির ড্রাইভারকে কল লাগাল। ড্রাইভার কাছেপিঠে কথাও ছিল হয়তো। মিনিট ২ এর মাঝে তাকে দেখা গেল চার সিটের ছোট একটি গাড়ি নিয়ে হাজির হতে। আহির অপেক্ষা না করে নিজে গিয়ে বসলো ড্রাইভারের পাশে। শাইয়ান সযত্নে বাম পাশের দরজাটা খুলে ঝুমকে বসিয়ে দিল। তারপর ড্রাইভারের সাহায্যে নিজেদের লাগেজ গুলো গাড়ির পিছনে দিকে রেখে নিজে গিয়ে বসলো ঝুমের ওপর পাশে। শাইয়ান উঠে বসতেই শ্রাবণীর নির্দেশে ড্রাইভার গাড়ি চালানো শুরু করলো। শ্রাবণী তার বাইক নিয়ে ছুটলো তাদের পিছে। ঝুম জানালার সাথে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। তার শরীর ভালো লাগছে না একদম। চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে বারবার। অথচ কাউকে বুঝতে দিতে চাচ্ছে না। পাশে বসা লোকটা একবার বুঝতে পরলে তাকে আস্ত রাখবে না। অথচ তার পাশে বসা মানুষটি ঠিকই বুঝতে পারল। কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে দেখলো শাইয়ান ঝুমকে। অতঃপর আলতো হাতে টেনে নিজের বুকে মাথাটা চেপে ধরলো। খুব ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে। ঝুম আরাম পেয়ে আরো ভালোভাবে মিশে চোখ বন্ধ করলো।

” করাচি আসার আগে তো চেকআপ করিয়ে এনেছিলাম। তখন তো রিপোর্টে সব ঠিক ছিল। তাহলে এখন খারাপ লাগছে কেন? আপনি আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছেন আরীবা?”
ঝুম মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো। সে কিছু লুকায়নি। বরং সে নিজেও বুঝতে পারছে না এমন কেন হচ্ছে।
” মেডিসিন খাচ্ছেন না আবার?”
ঝুম চুপটি করে পরে রইলো। করাচি এসে মেডিসিন খাওয়া হচ্ছে না। মূলত সে ইচ্ছে করেই খাচ্ছে না। এখন রিপোর্ট ভালো আসছে বলে প্রয়োজন মনে করেনি। শাইয়ান বুঝলো মেয়েটা আবার ফাঁকিবাজি শুরু করেছে।
” কবে থেকে এসব করছেন? আর শরীর খারাপ কখন থেকে হচ্ছে? মেডিসিন গুলো কি সাথে করে এনেছেন? নাকি তাও আনেন নিই?”
” এনেছি।”
” বাহ্। এখন বাকি প্রশ্নের উত্তর দিন।”
আহির সবটাই শুনছিল। এবার সে পিছু ফিরে বলল –
” আহ্ শাইয়ান, ছোট মানুষ ছেড়ে দেও এবারের মতো। বকা দিও না আর। এমনিতেই শরীর ভালো না দেখতেই পাচ্ছো।”
শাইয়ান রাগ রাগ চোখে আহিরের পানে তাকিয়ে বলল –

” ছোটো মানুষ? তা এই ছোট মানুষ যখন তোমার পিছু পরে তখন দিশেহারা হয়ে যাও কেন? আমাকে ফোন দিয়ে বলো কেন, তোমার বউয়ের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও শাইয়ান।”
আহির কাচুমাচু করলো। কথা না বাড়িয়ে সামনের পথের দিকে ফিরে বসলো। শাইয়ানও আর কিছু বলল না। কিন্তু তার হাত দুটো অনবরত ঝুমের মাথায় বুলিয়ে গেল।
দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে ঝুমরা একটি বড় উচু দালানের সামনে নেমে দাড়াল। আশেপাশের বাকি দালান গুলোও একইরকম। দেখে বোঝাই যাচ্ছে বিলাসবহুল এলাকা এটি। তাদের নেমে দাঁড়াতে দেরি কিন্তু শ্রাবণীর বাইক থামতে দেরি হলো না। সে খুব দক্ষতার সাথে বাইক রেখে নেমে দাড়াল। ঝুমকে একহাতে জড়িয়ে ধরে পা বাড়ালো লিফটের দিকে। শাইয়ান কপাল কুঁচকে দেখলো। মেজাজ তার ভীষণ খারাপ। আসার পর থেকে মেয়েটা তার বউকে নিয়ে টানাটানি লাগিয়েছে। এতো ভারী মুছিবত হলো। আহির শাইয়ানের কুঁচকানো কপাল দেখে বলল –

” মেয়েটাকে আমার ভালো লাগছে না শাইয়ান। কেমন উসৃঙ্খল। ভাবির মতো এমন মিষ্টি মিষ্টি মেয়েটার ওমন দজ্জাল মেয়ের সাথে গলায় গলায় খাতির আমি আর নিতে পারছি না। চলো আমরা দেশে ফিরে যাই। এখানে ভালো লাগছে না। অত্যধিক গরম, জ্যাম। নিশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না।”
শাইয়ান মাথা নেড়ে সহমত পোষণ করলো। তারা একে অপরের পিছে লেগে থাকলেও ঝুমকে নিয়ে দুজনই পসেসিভ। শাইয়ান মনে মনে ভেবে নিল, ঝুমকে বুঝিয়ে ২/১ দিনের মাঝে পাকিস্তান ফিরে যাবে তারা।

সেই কখন থেকে বিথী আন্টি ঝুমকে বুকে নিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। তার আহাজারি দেখে মনে হচ্ছে কেউ মারা গিয়েছে। সে মানুষটা এমনিই। একটু ফিল্মি স্টাইলের। যুবতি বয়সে ভদ্রমহিলার মাঝে নায়িকা নায়িকা ভাব ছিল। দেখতে শুনতে নায়িকাদের মতোই। এখনো রূপের যে ঝলক! ভদ্রমহিলা স্বাধীনচেতা মনোভাবের। ছেলে – মেয়েদের ও সেভাবেই গড়ে তুলেছেন। কখনো কোনো বিষয়ে জোর করেনি। হয়তো এই কারণে শ্রাবণী এমন। আহির সেই কখন থেকে মুখ হা করে মহিলার তামাশা দেখে যাচ্ছে। গালে হাত দিয়ে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন বড় বিনোদনের কিছু চলছে। শাইয়ান ভীষণ বিরক্ত। তার আশেপাশের মানুষগুলো এক একটা জিনিষ বলতেই হয়। পারা যাচ্ছে না আর। সবগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করে অন্যদের বিনোদন দিয়ে যায়।

না জানি তার বউটাকে ও কবে এমন আধ পাগল করে ছাড়ে। শ্রাবণী পাশেই বসে মায়ের নাটক দেখছে। তার বসার ভঙ্গিও অতি অসাধারণ। সে চেয়ারের উল্টো দিকে ফিরে দুপাশে পা ছড়িয়ে চেয়ারের ব্যাকে থুতনি রেখে গোলগোল চোখে দেখছে। আহিরের চোখ আচমকা, অসাবধানতায় শ্রাবণীর দিকে ফিরে গেল। শ্রাবণী তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল হয়তো। চোখাচোখী হতেই আহিরকে দেখে একচোখ টিপলো। আহির হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। পরপরই চোখ মুখ কুঁচকে কি একটা বিড়বিড় করলো। হয়তো মনে মনে শ্রাবনীকে বকছে। শ্রাবণী ভারি মজা পেল। সে শুরু থেকেই লক্ষ্য করেছে ছেলেটি তাকে দেখলেই কেমন যেন করে। হয়তো তাকে পছন্দ হয়নি তাই।

এইজন্যই আহিরকে ভড়কে দিয়ে মজা পেয়েছে। সে আবার চোখ ফিরিয়ে তার মাকে দেখে নিল। তারপর তাদের ঠিক পাশে বসে ঘাপুষে গিলতে থাকা তার ভাইকেও দেখলো একবার। যে বর্তমানে দুনিয়া ভুলে বিরিয়ানি খেতে ব্যস্ত। বলা যায় ছোট খাট হাতির বাচ্চা। শ্রাবণী বিরক্ত হলো হাতিটাকে দেখে। এই ছেলের জীবনে খাওয়া ছাড়া কিছু নেই। যখন দেখা হবে, তখনি খেতে দেখা যাবে। নাম তার শ্রাবণ হলেও, শ্রাবণী তাকে মিনি হাতি বলে ডাকে।
” ওই মিনি হাতি। আর কত খাবি রে? এবার থাম। আর মা তুমি কি শুরু করেছ বলবে? ওরা মাত্র এলো। রেস্ট নিতে দাও, খেতে দাও। ফ্রেশ ও হতে পারেনি তোমার জন্য। ঝুমির শরীর ভালো না। ছাড়ো এখন ওকে। ঝুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে, গো।”

ঝুম কৃতজ্ঞ চোখে চাইল শ্রাবণীর দিকে। সত্যিই ওর খারাপ লাগছিল। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দরকার। কথা না বাড়িয়ে সে শাইয়ান আর আহিরকে নিয়ে চলল রুমের দিকে। ২ ইউনিটের ওপর বেশ বড় একটি ফ্ল্যাট। ৪ টি বেডরুম, ১টি গেস্টরুম ও ডাইনিং ড্রইংয়ের এই ফ্ল্যাটটি শ্রাবণীর বাবা খুব শখ করে বানিয়ে ছিলেন। ছেলে মেয়েকে নিয়ে থাকার ইচ্ছা থাকলেও সুদিন আসার পর সে হারিয়ে যায়। একটি রোড এক্সিডেন্টে তার অকাল মৃত্যু হয়। তারপর থেকে এই ফ্ল্যাটে শ্রাবণী তার মা ভাইকে নিয়ে আছে। ঝুমকে শত বলেও এখানে রাখতে পারেনি। মেয়েটির প্রচুর আত্মসম্মান কিনা!
খাওয়া শেষে তারা আড্ডা দিলো বেশ কিছুটা সময়। যদিও আড্ডায় ঝুম, শ্রাবণী ও তার মা অংশগ্রহণ করেছে। বাকিরা শুধু তাদের গল্প করা দেখেছে। অনেকক্ষন পর শাইয়ান সহ্য করতে না পেরে উঠে দাড়ালো। খাঁটি উর্দু ভাষায় বলল –

” আরীবা রুমে চলুন। নয়তো আমি নিয়ে গেলে সেটি ভালো লাগবে না আপনার।”
ঝুম অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। আহির মিটিমিটি হাসলো। শ্রাবণী হা করে তাকিয়ে পরপর সে নিজেও হেঁসে দিল। হিন্দি, উর্দু এদেশের কম বেশি সকলেই বুঝতে পারে। তাই শ্রাবণীর শাইয়ানের কথা বুঝতে সমস্যা হলো না। সে উঠে দাড়িয়ে বলল –
” আজ এই পর্যন্ত থাক, আগামীকাল আবার হবে। এখন সবাই গিয়ে রেস্ট নাও। গুড নাইট গায়েস।”
বলতে বলতে সে চলে গেল। ঝুম আলতো হেসে পা বাড়ালো। শাইয়ান ও তার পিছু ছুটল। রুমে গিয়ে ঝুম একপ্রকার হামলে পরলো শাইয়ানের ওপর।
” পাঁজি লোক। কি শুরু করেছেন কি আপনি? নির্লজ্জতার একটা সীমা থাকা উচিত। উফ্, সবাই কি ভাবলো? আল্লাহ্ আপনি এ কাকে পাঠালেন আমার জন্য!”

শাইয়ান ঝুমের কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে, টেনে শুইয়ে দিয়ে নিজেও জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।
” বড্ড ক্লান্ত আমি পাখি। ঘুম পাচ্ছে। আপনিও ঘুমান। এমনিতেই সারাদিন যেসব নাটক দেখলাম তাতে আমার চোখে ব্যাথা করছে। এখন বেশি কথা বললে কিন্তু মুখ বন্ধ করার ওয়ে আমার জানা আছে।”
ঝুম কথা বাড়ালো না। তার শরীর চলছে না আর। শাইয়ানের চুলের ফাঁকে আঙুল গুঁজে দিয়ে ওভাবেই চোখ বন্ধ করলো।

Remedy part 19

গভীর রাত। আহিরের চোখে ঘুম নেই। হাসফাঁস লাগছে। এখন মনে হচ্ছে এখানে না আসলেই ভালো হতো। সে বেড ছেড়ে উঠে দাড়ালো। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। ধীরে ধীরে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পা রাখলো সিঁড়ির দিকে। একধাপ দুইধাপ করে ছাদে চলে এলো কিভাবে সে নিজেও জানে না। তবে এখন তার ভালো লাগছে। উঁচু দালানের ছাদ হওয়ায় প্রচুর হাওয়া বইছে। সে একদম কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত রেখে গভীর নিশ্বাস নিল। পরক্ষণে একটি পরিচিত অপরিচিত মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো তার কানে।
” ওই রাজাকারের বাচ্চা।”

Remedy part 21