Remedy part 22
মীরা রায়াদ
বাড়ি ফেরার পর শ্রাবণী একটা কথাও বলেনি কারো সাথে। এমনকি গাড়িতেও টু শব্দটি করেনি। মেয়েটা কাদঁছে ও না। ওদিকে মেয়ের চিন্তায় মিসেস বিথীর প্রেসার ফল করেছে। শাইয়ান তাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়েছে। সে আপাদত ঘুম। বাড়ির পরিবেশ ভীষণ রকম শান্ত। কারো রাতে ভালো ভাবে আর খাওয়া হয়নি। শ্রাবণ ও খাওয়ার জন্য আজ বায়না করেনি। স্থূল দেহের অধিকারী ছেলেটা অত্যন্ত বুদ্ধি সম্পন্ন। বোনের পরিনতিতে শ্রাবণ ও নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আহির ওকে সাথে করে নিজের ঘরে নিয়ে গেল।
আপাদত ছেলেটাকে সাথে রাখা উচিত হবে বলে মনে হল তার। ঝুম বেশ কিছুক্ষন শ্রাবণীর সাথে ছিল তার ঘরে। মেয়েটা শান্ত হয়ে আছে। নিত্যদিনের মতো নিজস্ব কাজ করে যাচ্ছে মন দিয়ে। আবার কখনো ঝুমের সাথে কথা বলে যাচ্ছে হেঁসে হেঁসে। ঝুম নির্বাক চোখে সবটাই দেখলো। শ্রাবণী যে নিজেকে সকলের কাছে শক্ত প্রমাণ করতে চাইছে তা বেশ বুঝলো। শ্রাবণী ব্যস্ত পায়ে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। ঝুম বেড সাইডে বসে ছিল এতক্ষন। সে শ্রাবণীর হাত ধরে পাশে বসাল তার। শ্রাবণী চোখে চোখ মিলালো না। অপ্রস্তুত হেঁসে নিজেকে লুকাতে চাইলো। ঝুম আচমকা জড়িয়ে ধরলো শ্রাবনীকে। খুব শক্ত করে। চোখ বন্ধ করে শ্রাবণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” তুমি এখন কাদতে পারো আপু। কেউ দেখছে না।”
কথাটায় কি ছিল কে জানে? শ্রাবণী হঠাৎ ঝুমকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। বাঁধ ভাঙ্গা নদীর মতো চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে কাকে বলবে এই কষ্ট? তার এতো সাধের ভালোবাসা আজ অন্য কারো নামে। হায় আল্লাহ্! কি হয়ে গেলো তার সাথে? এতোগুলো বছরের আবেগ, অনুভূতি কি তাহলে মিথ্যে ছিল? সুন্দর্যের কাছে তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আজ হেরে গেলো। ওই মানুষটার জন্য সে কি না করেছে। অথচ সেই মানুষটা তাকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে গেলো? তার বিশ্বাস, ভালোবাসাকে সকলের সামনে অপমান করলো? আচ্ছা যারা আমাদের হবে না, তারা কেন আমাদের জীবনে আসে? ভালোবাসা শিখায়? দূরেই যখন যাবে, তাহলে কাছে এসে মায়া বাড়ায় কেন? এখন সে কিভাবে সব ভুলে থাকবে? কিভাবে মেনে নিবে ওই মানুষটা আর তার নেই। তার সাথেই কেন হলো এমন? শ্রাবণী শব্দ করে কেঁদে ফেলল। এতো কষ্ট নিতে পরছে না শ্রাবণী।
তার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। এই দুনিয়া বিষাক্ত। কারো নিঃস্বার্থ ত্যাগের মূল্য দিতে জানে না। শ্রাবণীর এই আহাজারি দরজার ওপাশে দাড়ানো আহিরের কানে পৌঁছালো। সে মূলত শ্রাবণীর অবস্থা দেখতেই এসেছিল। কিন্তু ঝুমকে দেখে আর যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। দরজাটা আলতো হাতে চাপিয়ে নিজ ঘরের দিকে পা বাড়ালো। বিছানায় শ্রাবণ নিদ্রায় আচ্ছাদিত। আহির সেদিকে একবার তাকিয়ে পা বাড়ালো বারান্দার দিকে। বারান্দার দরজাটা আলতো চাপিয়ে দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়ল। সেও কি পাভেলের মতো ঠকায়নি? তার আর পাভেলের মাঝে কি খুব একটা পার্থক্য আদোও আছে? জারাও কি শ্রাবণীর মতো এভাবে বুক ফাটা আর্তনাদ করতো? পুরুষ মানুষের নাকি কাদতে নেই? তাহলে তার চোখ দিয়ে কেন আজও জল পড়ে?
সে অন্যায় করে ছিল জারার সাথে। হয়তো পাভেলের মতো করেনি কিন্তু তার একাংশ হলেও তো করে ছিল। আকাশ পানে তাকিয়ে অপরাধবোধে নুয়িয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষটি আজ কাদলো। কাদলো তার অসমাপ্ত ভালোবাসার জন্য। কাদলো এক হতভাগী নারীর কষ্টের জন্য।
শ্রাবণী থামলো অনেক অনেকটা সময় পর। সে নেতিয়ে গেছে একপ্রকার। এই দস্যি মেয়েটাও যে মানুষ। আর কতো সইবে সে? শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মেয়েটা শুধু দুঃখের সাগরে নিজেকে স্ব ইচ্ছায় ডুবিয়ে গেলো কোনরূপ অভিযোগ ছাড়া। সে এবার মুক্ত। তার আর কোনো দায় নেই। ঝুম শ্রাবনীকে ধরে শুইয়ে দিলো। খুব যত্ন করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ঠিক যেমনটা শ্রাবণী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে আগলে রাখতো, যখন তার আম্মার কথা মনে পড়তো তখন। শুরুর দিকে যখন ঢাকা এলো তখন তো এই উড়নচণ্ডী মেয়েটিই ছিল তাকে আগলে রাখার জন্য।
বড় বোন নাকি মায়ের মতো হয়। শ্রাবণীর সাথে তার রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মেয়েটা তাকে মায়ের মতোই আগলে নিয়ে ছিল। কতোগুলো তার প্যানিক এ্যাটাকের জন্য জ্বরে ভুগেছে। তখন শ্রাবণীই তার মাথার কাছে বসে যত্ন করতো। সেই শ্রাবণী থেকে এই শ্রাবণীর পথটা অনেক করুন ছিল। সে দেখেছে শ্রাবণীর রাত জাগা কান্না, শ্রাবণীর অপেক্ষা। অথচ দিন শেষে মেয়েটা কি পেলো? শূন্যতা! এর যোগ্য কি ছিল শ্রাবণী? ঝুম বসে রইলো ততক্ষন যতক্ষন শ্রাবণী না ঘুমালো। যে মেয়েটাকে একদিন শ্রাবণী বাচ্চার মতো আগলে নিয়ে ছিল, আজ সেই মেয়েটা শ্রাবনীকে বাচ্চাদের মতো আগলে রাখলো। নিয়তি আমাদের কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায় তাই না!
শাইয়ান শুয়ে শুয়ে খুব মনোযোগের সাথে ফোনে কিছু দেখে চলেছে। আচমকা ধুম করে তার ওপর কিছু পরলো। পেট, বুক জুড়ে ভারী কিছু হঠাৎ পরায় প্রস্তুত ছিল না সে। যার দরুন ব্যাথাও পেলো বেশ। ফোনটিও ছিটকে পড়ল পাশে। চোখমুখ কুঁচকে দেখতে পেলো ঝুমকে। রাত তখন ২ টার বেশি। এখন তার আসার সময় হলো! যদিও সে বিশেষ একটা কিছু বলল না। কারণ সময়, পরিস্থিতি এখন ঠিক নেই। নয়তো এতক্ষন তাকে ছেড়ে থাকার মজা সে ঠিক বুঝিয়ে দিতো এই পাঁজি মেয়েকে। ঝুম ওভাবেই পরে রইলো নড়চড় বিহীন। শাইয়ান নরম শরীরটা আদুরে ভঙ্গিতে দুহাতে জড়িয়ে আরো একটু ভালো ভাবে আগলে নিল। সে বুঝলো ঝুমের মন খারাপ। এটাই স্বাভাবিক। শ্রাবনীকে সে বিশেষ পছন্দ করে না। না করার যথেষ্ট কারণ আছে। না সে আহিরের মতো শ্রাবণীর পোশাক কিংবা চালচলনের জন্য অপছন্দ করে এমন না। তার সমস্যা মেয়েটা সব সময় তার বউকে নিয়ে টানাটানি লাগায়। যা ভীষণ বিরক্তিকর লাগে শাইয়ানের কাছে। কিন্তু অপছন্দের সেই মেয়েটির জন্য আজ শাইয়ানের ও খারাপ লেগেছে। প্রতিটি মানুষ ভালোবাসার যোগ্য। সেখানে তো মেয়েটা এতো কিছুর পরও ঠকে গেল। শাইয়ান ঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো যত্ন করে। সময় দিলো ওকে শান্ত হওয়ার।
” কি অবস্থা এখন ওনার?”
ঝুম একই ভাবে পরে রইলো। তার চোখে পানি। সে বুঝতে দিল না শাইয়ানকে। মিনমিন করে বলল –
” ঘুমাচ্ছে। প্রচুর কেঁদেছে।”
শাইয়ান বুঝতে পারল তার বোকা বউ কাদঁছে। তবুও তাড়া দেখলো না। শান্ত ভঙ্গিতে বলল –
” কাঁদে না। দেখি ভালো ভাবে শুয়ে পড়ুন। পেয়ে চাপ লাগছে আপনার।”
শাইয়ান চিন্তিত। তার হাত ঝুমের পেটে। ঝুম একটু নড়ে পেটের ওপর কম চাপ দিয়ে শুয়ে রইলো।
” ভালো মানুষগুলোর সাথে এমন কেন হয় ডক্টর?”
শাইয়ান গভীর এক নিশ্বাস নিলো। ঝুমকে বুঝানোর মতো করে বলল –
” আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহু যাদের খুব ভালবাসে তাদের পরীক্ষা করেন নানান ভাবে। বিভিন্ন বিপদে ফেলে তাদের ধৈর্যের পরিচয় নেন। তারা আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহুর ওপর কতটা বিশ্বাসী সেটা দেখেন। এটাই আমাদের প্রতি তার ভালোবাসা আরীবা। আমাদের প্রতিনিয়ত তার ওপর বিশ্বাস রেখে ধৈর্য্য ধরা উচিত। নিশ্চই তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। তাই না?”
” হুম।”
” আপনি কাঁদবেন না। আপনাকে কাঁদলে পঁচা লাগে। জানেন তো আপনার কান্না আমার ভালো লাগে না।”
ঝুম মাথা তুলে চাইলো এবার। ছোট্ট শরীরটা তখনো শাইয়ানের বাহুডোরে। শাইয়ানের চোখে চোখ রেখে অবুঝ গলায় প্রশ্ন করলো –
” পঁচা লাগে?”
শাইয়ান শব্দ করে হেসে ফেলল ঝুমের বাচ্চামোতে। মুখের ওপর ঝুঁকে আসা কিছু চুল ডানহাতে সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বলল –
” হ্যাঁ, খুব।”
তারপর মাথাটা এগিয়ে ঝুমের নাকে নিজের নাক লাগিয়ে মোহনীয় গলায় বলল –
” এতটাই যে মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে খেয়ে ফেলি একদম।”
ঝুম শাইয়ানের সাথে আরো একটু ঘনিষ্ট হয়ে চোখ বুঝে ফেলল। এই মানুষটা তার একান্ত আপন। তার সব কষ্টের প্রতিকার। এই মানুষটাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। শ্রাবণীর সাথে যা হলো তা যদি তার সাথেও হয়? সে কি পারবে নিজেকে সামলে নিতে? শাইয়ানকে অন্য কারো সাথে দেখতে কি পারবে? কখনো না। ঝুম শাইয়ানের বুকে মাথা রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তার শরীর মৃদু কাপছে। যা স্পষ্ট শাইয়ান অনুভব করতে পারল।
” কি হয়েছে আরীবা?”
” ডক্টর।”
” হ্যাঁ পাখি। এইতো আমি। বলুন শুনছি।”
” আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো কখনো?”
শাইয়ান আলতো হেসে মাথায় হাত রেখে বলল –
” প্রাণ থাকতে না। আপনাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো পাখি? আমার শুরু আপনাতে শেষও আপনাতে।”
” ডক্টর। আমরা কাল এখানে থেকে যাই? কাল বাদে পরশু না হয় গ্রামের বাড়ি যাবো।”
” আচ্ছা আপনি যা বলবেন তাই হবে। শান্ত হোন আপনি।”
ঝুম শান্ত হলো। তারা দীর্ঘক্ষণ কেউ কথা বলল না। অনেক অনেকটা সময় পর শাইয়ান ইতস্তত করে বলল –
” আরীবা আপনি সুস্থ আছেন? মানে কোনো রকম অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ খেয়াল করেছেন? মেয়েলি কোন কিছু যা আপনি বলতে পারছেন না আমাকে, এমন কিছু কি আছে?”
শাইয়ানের কন্ঠ অস্বাভাবিক ভাবে কম্পিত। সে নিজের ভয়টা ঝুমকে দেখাতে চাইছে না। কথাগুলো সে কিভাবে যে বলল তা কাউকে বুঝাতে পারবে না। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে ঝুম উত্তর করলো না। শাইয়ান বার দুয়েক ডেকেও যখন সাড়া পেলো না, তখন মাথা তুলে চাইলো ঝুমের দিকে। দেখতে পেলো মেয়েটা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে তার ওপর শরীরের ভার ছেড়ে ঘুমিয়ে আছে। ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বালিশে মাথা রাখলো শাইয়ান। একহাতে ঝুমকে আগলে নিয়ে অন্য হাতে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। সে যা ভাবছে এমন কিছু যেন না হয়। ঝুম এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ না। এই মেয়েকে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। এখন এই শরীরে অন্য কারো আগমন ঘটলে সে চিন্তায় এবার সত্যিই হার্ট এ্যাটাক করে বসবে। মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা নিয়ে শাইয়ান সে রাতে আর ঘুমাতে পারল না। ভোর বেলা আযানের শব্দে সে ঝুমকে সুন্দর করে বেডে শুইয়ে দিয়ে নামাজ পরে নিলো। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালার কাছে সিজদায়ে ঝুমের সুস্থতা কামনা করলো। তারপর বেডে এসে ঝুমকে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।
নাস্তার টেবিলে শ্রাবণী ছাড়া প্রত্যেকে উপস্থিত রয়েছে। মিসেস বিথীর অসুস্থতায় আজ নাস্তা ঝুম তৈরি করেছে। গরম গরম খিচুড়ির সাথে ডিম ভাঁজা, চাটনি আর এক খণ্ড লেবু যেন অমৃত লাগে শ্রাবণের নিকট। অথচ সেই অমৃত আজ শ্রাবণের পেটে যেতে চাইছে না। জোর করে খাওয়ায় চেষ্টা করছে। মিসেস বিথীর ও একই অবস্থা। সকলে খাবার সামনে রেখে নীরবে খাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। শ্রাবনীকে ডেকে আনার সাহস কেউ আর করলো না। কিন্তু মনে মনে হয়তো অপেক্ষায় আছে। মিসেস বিথী চাতক পাখির মতো মেয়ের রুমের দরজার পানে তাকিয়ে।
মায়ের মন মেয়ের জন্য ভীষণ কাদঁছে। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মিনিট ২ এর মাঝে খট করে শ্রাবণীর রুমের দরজাটি খুলে গেলো। পরনে সাদা চুড়িদার। বুকের ওপর শালীন ভাবে ওড়না জড়ানো। ছোট করে কাটা চুলগুলো গুছিয়ে পনিটেল করে রেখেছে। তারপরও কিছু সংখ্যক চুল বাঁধন ছেড়ে মুখের ওপর এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে। মিসেস বিথীর চোখে পানি চলে এলো। অথচ ঠোঁটে তার মিষ্টি হাসির বিচরণ। তার মেয়েটাকে আগের মতো লাগছে। সেই মিষ্টি মেয়েটা, যাকে সে আজ কতগুলো বছর ধরে খুঁজে চলেছে, আজ তার সেই মেয়েটা ফিরে এসেছে। শ্রাবণী নিজেকে নিজে ফিরে পেয়েছে। আনন্দে আত্মহারা সে কেঁদে ফেলল। শ্রাবণী মায়ের বাচ্চামো কান্নায় ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। মৃদু পায়ের ভরে হেঁটে এলো সকলের নিকট। তার প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিলো সে নরম নয়, তাকে ভেঙে দেয়া এতো সহজ নয়। এ এক নতুন শ্রাবণী, যার চলন বলন নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছে, ইস্পাতসম ব্যক্তিত্ব তুলেছে ধরেছে।
” কাদঁছো কেন মা?”
মিসেস বিথী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। শ্রাবণীর মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল –
” আমার মা। আমার সোনা মা। তুই আর নিজেকে কষ্ট পেতে দিবি না। কাউকে দরকার নেই আমি আছি তোর সাথে।”
শ্রাবণী মনোমুগ্ধকর হাসি দিল। এমন মা কয়জন পায়? সেতো ভীষণরকম ভাগ্যবতী। আল্লাহ্ তাকে মমতাময়ী এক মা দিয়েছে। আর কিছুর কি প্রয়োজন আছে?
” আমি আর কখনো নিজেকে কষ্ট দিব না মা। আজ থেকে আমি মুক্ত। এবার থেকে আমি নিজের জন্য বাঁচবো। তোমাদের জন্য বাঁচবো। প্রাণ খুলে বাঁচবো মা। নিজের মতো করে বাঁচবো।”
শাইয়ান নীরবে হাসলো। তার হাসি এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে কেউ তা দেখতে পেলো না। আজ ভোরে নামাজ পড়ে সে রুম থেকে খাবার ঘরে গিয়ে ছিল পানি খেতে। তখন সে শ্রাবণীর রুমের আলো জ্বলতে দেখে কৌতুহলের বশে সে দিকে পা বাড়িয়ে ছিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যা দেখে ছিল তাতে তার অত্যধিক রাগ হয়। শ্রাবণী ডান হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে বাম হাতের নার্ভের কাছে ধরে আছে। দূর থেকেই শাইয়ান লক্ষ্য করলো শ্রাবণীর হাত অত্যধিক কম্পিত। বুঝতে একদম দেরি হলো না শ্রাবণীর কি হয়েছে। মূলত এমন সব সিচুয়েশনে মানুষ নিজের ওপর আশা হারিয়ে ফেলে। ব্রেইন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ঈমান দুর্বল হয়ে পরে। যার সুযোগ শয়তান ভালোভাবেই কাজে লাগায়। কু-প্ররোচনায় বিভ্রান্ত করে ভুল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। অনেকে শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে অকালে জীবন হারায়। আর ঠিকানা হয় জাহান্নামে। এরকম অনেক কেস শাইয়ান হ্যান্ডেল করেছে। তাই শ্রাবণীর ব্যাপারটা তাকে বিচলিত করলো না। অথচ অন্য কেউ হলে চিৎকার চেঁচামেচি করত। এসবে ট্রমায় থাকা ব্যক্তি আরো বেশি ভয় পেয়ে যায়। ফলস্বরূপ অঘটন ঘটতে সময় লাগে না। আর শ্রাবনীকে দেখে মনে হচ্ছে না সে নিজের প্রাণ নেয়ার মতো এতবড় স্টেপ নিতে পারবে। তাই সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলো শ্রাবনীকে। বাঁধা দিলো না। অপেক্ষা করল শ্রাবণীর নিজেকে সামলে নেয়ার। শাইয়ানের বিশ্বাসকে জিতিয়ে দিয়ে শ্রাবণী ছুরিটা নিচে ফেলে দিয়ে দুহাতে মুখ চেপে হুহু করে কেঁদে ফেলল। এবার শাইয়ান কথা বলল। অথচ জায়গা থেকে নড়ল না।
” ভুল থেকে মানুষের উচিৎ শিক্ষা নেয়া। আরো একটি ভুল করা না। ভুলকে বারবার রিপিট করাকে অন্যায় বলে। আপনি বুদ্ধিমতি মেয়ে, আমার মনে হয় আপনাকে বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। শুধু বলবো যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নিজের মায়ের কথা একবার হলেও স্মরণে রাখবেন। তার সন্তান হয়ে এভাবে হেরে গেলে তাকে অসন্মান করা হবে। আমার কথা বুঝে থাকলে ওই জিনিসটা ( নিচে পরে থাকা ছুরিটিকে নির্দেশ করে) যেখান থেকে এনেছেন সেখানে রেখে ফ্রেশ হয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিবেন। সবাইকে আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহু শুধরে যাওয়ার সুযোগ দেন। তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের জীবনকে আরো একবার সুযোগ দিয়ে দেখবেন। আসি।”
সে দাড়ালো না আর। ঝুমকে একা রেখে এসেছে সে। শ্রাবনীকে নিয়ে আর চিন্তা নেই। সে যতটা মেয়েটিকে চিনেছে, তাতে হলফ করে বলতে পারে খারাপ কিছু ঘটাবে না। যা করছিল শয়তানের প্ররোচনায় পরে। এটা প্রতিটি ভাঙা মানুষ করে থাকে। কিন্তু এখন ভয় নেই। বাকিটা শ্রাবণী নিজে সামলে নিবে। হলো ও তাই। শ্রাবণী নিজেকে সামলে নিয়েছে। বেশ ভালো ভাবেই সামলে নিয়েছে। শাইয়ানের কথা মতো নামাজ সে পড়েছে। ফজরের নামাজ শেষে সে দীর্ঘক্ষণ নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে মাথা ঠুকে কেঁদেছে। তারপর থেকে মনে কি ভীষণ শান্তি কাজ করছে তা বলার মতো না।
আহির বেশ অনেকক্ষন থেকেই শ্রাবনীকে আড় চোখে দেখে চলেছে। এয়ারপোর্টের সামনে দেখা প্রথম দিনের সেই বিরক্তিকর, উশৃঙ্খল মেয়েটির সাথে আজকের এই ভেঙে নতুন করে গড়া মেয়েটির বিস্তর তফাৎ। শ্রাবণী লক্ষ্য করলো আহিরের দৃষ্টি। সে আগের মতো চটপটে দাপুটে স্বরে নয়, বরং ভীষণ নরম সুরে আহিরকে উদ্দেশ্য করে
বলল –
” কি এখনো কি উশৃঙ্খল লাগছে?”
Remedy part 21
আহির লজ্জা পেলো খুব। এমনিতেই কাল থেকে মেয়েটার সাথে পূর্বের করা ব্যবহারের জন্য খুব অপরাধবোধে ভুগছিল সে। এখন আবার এই মেয়ে তাকে খোঁচা মেরে কথা বলছে। তাও দেখো ভদ্র ভাষায় ট্রিগার করা যাকে বলে। সে উত্তর দিলো না। অথচ তার চোখে লজ্জা,অনুশোচনা, অপরাধবোধ স্পষ্ট। শ্রাবণী হাসলো শুধু। যে নিজের কর্মের জন্য অনুতপ্ত তাকে শাস্তি দেয়ার দরকার পরে না। ক্ষমা মহৎ গুণ। সে প্রত্যেকটি মানুষকে ক্ষমা করে দিলো, যারা তাকে কষ্ট দিয়েছে, ঠকিয়েছে, না জেনে খারাপ বলেছে সবাইকে।
