Remedy part 23
মীরা রায়াদ
গতকালের ঝড়ের পর কারো মন ঠিক ছিল না। সেই থেকে না খাওয়া প্রত্যেকে। শ্রাবণী জানে তার জন্য সকলের মন খারাপ। তাই কথা বাড়ালো না। চেয়ার টেনে খেতে বসে গেলো। পূর্বের তুলনায় টেবিল এখন সক্রিয়। সব থেকে মিসেস বিথীকে প্রাণচ্ছাস লাগছে। সে সকলকে এটা সেটা তুলে দিচ্ছে। হঠাৎ করে যেন খাওয়ার রুচি বেড়ে গেলো দ্বিগুণ। ক্ষিদে মাথাচারা দিয়ে উঠেছে রীতিমত। সকলে খেলেও ঝুমের মাঝে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেলো না। তার খেতে ভালো লাগছে এসব। অল্প একটু খাবার প্লেটে নিয়ে নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে। অন্য সময় হলে শাইয়ান বকা দিতো। তারপর জোর করে খাওয়াতো। কিন্তু আজ সে কিছুই বলল না। আগে ঝুমের সাথে কথা বলা দরকার।
” বেরোচ্ছি কখন আমরা?”
অকস্মাৎ আহিরের প্রশ্নে ধ্যান ভঙ্গ হলো সকলের। শাইয়ান ঝুমের পানেই তাকিয়ে ছিল। আহিরের প্রশ্নে ঝুম মুখ তুলে চাইলো শাইয়ানের দিক। মুহূর্তে চোখে চোখ মিলিত হলো দুজনের। ঝুমকে ক্লান্ত লাগছে খুব। হয়তো ঘুম সম্পূর্ণ হয়নি। শাইয়ান চোখ নামিয়ে আবার খাওয়ায় মন দিল। খেতে খেতে ছোট করে বলল –
” আগামীকাল যাবো।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হাত থেমে গেলো আহিরের। চোখ তুলে তাকালো শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান ইশারায় ঝুমকে দেখালো। তারপর দু’ভাইয়ের মাঝে চোখে চোখে কি কথা হলো কে জানে? আহির কথা বাড়ালো না আর। সেদিন তারা শ্রাবনীকে নিয়ে সারাদিন জমিয়ে আড্ডা দিলো। হাসি, আনন্দে ভাটা পরলো ঝুমের শরীর কাঁপিয়ে জ্বরে। সারাদিন হাসি – খুশি থাকা মেয়েটা হঠাৎ করে সন্ধ্যার পর অসুস্থ হয়ে পরলো। কোনরূপ আগাম বার্তা ছাড়া এই জ্বর। ঝুম একদম নেতিয়ে পড়ল। শাইয়ান অসহায়ের মতো তাকিয়ে। তার মতো শক্ত – পোক্ত পুরুষের এই মেয়েটিই একমাত্র দুর্বলতা। চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে। শুধু পারছে না কেঁদে দিতে। দুনিয়ার সব কষ্ট সয়ে যাওয়া মেয়েটা জ্বরের কাছে হেরে যায়। জ্বর হলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ করে আলস্যতার দাস হয়ে যায়।
ডাক্তার হওয়ার খাতিরে প্রয়োজনীয় মেডিকেল কিট শাইয়ান নিজের সাথে রাখে সর্বদা। তাছাড়া সে ভেবে ছিল আহির বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না। ফলস্বরূপ কোনো না কোনো অসুস্থতা তাকে কাবু করে ফেলবেই। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আহির দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝ থেকে তার নরম বউটা অসুস্থ হয়ে পরলো। এটা কোনো কথা? এই মেয়ে রীতিমত তাকে অত্যাচার করে যাচ্ছে সেই শুরু থেকে। কবে না জানি এর জন্য আবার হসপিটালে যেতে হয় তাকে। চিকিৎসার সকল কিছু থাকার পরও ঝুম জ্বরে কঠিন ভাবে ভুগছে। শাইয়ানকে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে দেখে আহির একচট বকে দিলো। তারপরও শাইয়ানের ভাবাবেগ ঘটলো না। সে গভীর চিন্তায় আছে। ঝুমের কন্ডিশন না বুঝে এখন কোনো মেডিসিন দেয়া ঠিক হবে না। তাই বার কয়েক ঝুমকে ডাকলো শাইয়ান। কিন্তু ঝুম প্রচণ্ড জ্বরে হুশ খুইয়ে বিছানা নিয়েছে। শাইয়ান একবার ভাবলো হসপিটালে নিয়ে প্রয়োজনীয় চেকআপ করিয়ে আনবে তারপর কি একটা ভেবে নিজেকে সামলে নিলো। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে বর্তমানে।
রাত যতো বাড়ল ঝুমের জ্বর ততো বাড়তে রইলো। প্রায় রাত ১ টা পর্যন্ত ঝুমের চিন্তায় কেউ ঘুমাতে পারল না। পরবর্তীতে শাইয়ান সকলকে আশ্বাস দিলো যে এখন ঝুম অনেকটা ভালো আছে। তাই ঘুমাতে যেতে পারে। সকলে তার কথা মেনে নিলে ও আহির নড়ল না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে শাইয়ান বেজায় বিরক্ত হলো। শ্রাবণী পাশে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখছিল। এরা দুই ভাই যে ঝুমকে চোখে হারায় বোঝার বাকি নেই। তবে বিষয়টা তার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। পরিবারহীন মেয়েটাকে ভালোবাসার জন্য এখন কিছু মানুষ তো রয়েছে। সে নিশ্চিন্ত। শাইয়ান হয়তো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু বলতে পরলো না। তার আগেই আহির গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল। শ্রাবনী ও আর দাড়ালো না। সে পা বাড়ালো ছাদের দিকে। এখন কিছুটা সময় তার নিজেকে দিতে হবে। যতই সে নিজেকে সামলে নিক, কষ্ট ঠিকই হচ্ছে। যা চাইলেও লুকাতে পারবে না এখন। আজ আকাশে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। ঝলমলে রূপে কাউকে কি মুগ্ধ করতে চাইছে সে? তারায় তারায় ভরা আকাশটাকে খুব আপন লাগছে শ্রাবণীর। মৃদুমন্দ বাতাসে মুখরিত চারপাশ। আজ আর সে একদম কিনারায় গিয়ে বসলো না। বরং ছাদের রেলিংয়ের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নিচে বসে পড়ল। চোখটা বন্ধ করে গুনগুনিয়ে উঠলো হঠাৎ।
“যত ভুল জমা আছে দেখো মনে
সব লিখে রেখেছি গোপনে
আমি চলে গেলে তুমি বড় একা,
ক্লান্ত রাতে।
সব ছেড়ে আমিও চলে যাবো
তখন বুঝবে তুমি কি হারিয়েছো
আমায় একা ফেলে তুমি দূরে কেনো যাবে?
তাই এখন সব ভিন্ন ভিন্ন লাগে
তুমি ছাড়া ঠুনকো এ জগতে
এতো সহজে! ছেড়ে দিলে হায়!
তুমি ছাড়া শুন্য শুন্য লাগে
ঠোঁটে আসে নাম তোমার বারে বারে
বোঝাই কাকে?
এ কেমন ব্যাথা?
তুমি বড় প্রিয়, আমার প্রিয়
তুমি আমার, মনের আঙিনায় থাকো
তুমি এতো প্রিয় আমার কাছে।”
ধপ করে পাশে শব্দ হওয়ায়, শ্রাবণী চোখ খুলে চাইলো। দেখলো তারই মতো করে আহির বসে আছে। তবুও বিশেষ আগ্রহ দেখালো না। আহির একপলক শ্রাবনীকে দেখে মাথা তুলে আকাশ দেখতে দেখতে বলল –
” মন খারাপ?”
ওপর পাশ থেকে শুধু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ফিরে এলো।
” কিছু কিছু জিনিস আমাদের হয় না। তাই তাদের মনের এক কোণে রেখে সামনে আগানোটাই উত্তম।”
” যদি আমাদের নাই হবে তাহলে আমাদের জীবনে আসে কেন?”
আহির আকাশ পানে তাকিয়ে উদাস কন্ঠে বলল –
” মাঝে মাঝে তারা আমাদের বাস্তবতা শিখাতে আসে।”
” কিন্তু বড্ড কষ্ট হয় যে!”
ইশ কি বেদনাদায়ক সুর। না পাওয়ায় কষ্টের থেকে কি কিছু আছে জীবনে? আহিরের জানা নেই। সে শ্রাবণীর অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল –
” কাউকে চেয়ে না পেলে কষ্ট হয়, কিন্তু পেয়েও হারিয়ে ফেলাটা জীবনটাকে নিঃশেষ করে দেয়।”
” আমরা যাকে চাই তারা আমাদের চায় না। এই সত্যটা মেনে নেয়ার মতো শক্তি দিয়ে কেন আল্লাহ আমাদের পাঠালো না?”
” জানি না।”
এরপর আর একটি কথাও তাদের মাঝে হলো না। অথচ দূরত্ব রেখে পাশাপাশি বসা দুটি মানুষ ঠিকই বুঝতে পারল, তারা হেরে গেছে। ভালোবাসার কাছে হেরে গেছে।
৬ সিটের বড় একটি গাড়ি নিয়ে ঝুম তার বাবার বাড়ি যাচ্ছে। যদিও খুব ভাল স্মৃতি তার নেই সেই বাড়ি নিয়ে তবুও, সেখানে ঝুম ওর আম্মার সাথে কত মধুর স্মৃতি কাটিয়েছে। যেসব তার আজও মনে পরে। সকাল হতেই ঝুম আসার জন্য বায়না করলো। শাইয়ান চেয়ে ছিল ঝুম সুস্থ হলে যাবে কিন্তু মেয়েটা শুনল কই। গাল ফুলিয়ে একে বারে অভিমানী কুমারী সেজে ছিল। শুধু কি তাই? আসার সময় শ্রাবনীকে ও ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে সাথে করে। মিসেস বিথীও অমত করেনি। মেয়েটি কিছু দিন ঘুরে ফিরে এলে ভালো লাগবে ভেবে নিজেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে দিলেন। ঝুম শাইয়ানের বাহুডোরে আবদ্ধ। মেয়েটি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কতবার করে বলল আজ যেতে হবে না। শুনলই না। এখন কষ্ট কার হচ্ছে শুনি?
টানা ৭ ঘণ্টা জার্নি করে গাড়ি এসে থামলো একটি পাকা একতলা বাড়ির সামনে। ঝুম এতক্ষনে নেতিয়ে পড়েছে। রাস্তায় দুবার বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। সেই থেকে শাইয়ান রেগে কথা বলছে না ওর সাথে। একটা কথা বললে যদি শুনতে চায় মেয়েটা? আগে তাও ভালো ছিল, নিজের ভালো – খারাপ বুঝতো। এখন একদম মাথায় উঠে গেছে। রাগ – জেদ চেপে বসেছে। ঝুম ভয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলল না। একে একে গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো সকলে। শাইয়ান ঝুমকে আগলে পা বাড়ালো বাড়ির অভিমুখে। ঝুমের চোখে হাজারো আগ্রহ, ব্যাকুলতা। চোখ ঘুরিয়ে এদিক থেকে ওদিক দেখে যাচ্ছে মেয়েটা। বাড়ির সামনে একপাশে ওর আম্মার কবরটা আগাছায় পরিপূর্ণ। কতোগুলো দিন যত্ন নেয়া হচ্ছে না? মানুষটা মৃত্যুর পরও কারো ভালোবাসা পেলো না। কিছু কিছু মানুষ কি ভীষণ অভাগী হয়ে জন্মায়! ঝুম শাইয়ানের বাহু থেকে নিজেকে মুক্ত করে পা বাড়ালো কবরের দিকে। আস্তে আস্তে তার চোখ ভারী হয়ে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে মাথা রাখলো আগাছাপূর্ণ কবরের ওপর। আপন আপন গন্ধ আসে এখনো। ঝুম তার আম্মাকে এখনো অনুভব করতে পারছে। গলগল করে চোখ থেকে পানির স্রোত বয়ে নামলো।
” আম্মা। শুনতে পাচ্ছো আম্মা? আমি তোমার আরীবা। তুমি কি আমায় দেখতে পাচ্ছো? আম্মা তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না। আমাকে একা রেখে কেনো চলে গেলে তুমি? আমার কথা একবার ভাবলে না আম্মা?”
আহা কি অবুঝ বুলি! ঝুম যেন নিজের মাঝে নেই। অদূরে দাড়ানো তিনটি মানুষ দেখলো প্রাপ্ত বয়স্ক একটি মেয়ের তার মাকে করা অভিযোগ। শাইয়ান এগিয়ে এলো কাছে। হাঁটু মুড়ে পাশে বসে ঝুমকে তুলে নিলো বুকে। ঝুম তখনো কেঁদে কেঁদে কিছু একটা বলে যাচ্ছে। শাইয়ানকে দেখে নিজের হাত দ্বারা শাইয়ানের হাত ধরে কবর ছুঁয়ে বলল –
” আম্মা দেখো কাকে নিয়ে এসেছি। আমার ডক্টর। তোমার আরীবার স্বামী। দেখতে পাচ্ছো আম্মা? তোমার পরে এই মানুষটাই এখন আমার সব আম্মা। আমাদের জন্য দোয়া করো আম্মা। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আম্মা। তোমাকে খুব মনে পরে।”
বলতে বলতে মেয়েটা জ্ঞান হারালো শাইয়ানের বাহুর মাঝে। শাইয়ান সস্নেহে আগলে নিল। তারপর খুব ধীরে ফিসফিসিয়ে বলল –
” আমি যত দিন বেঁচে আছি আরীবাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না আম্মা। আপনি ওখানে নিশ্চিন্তে থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে আম্মা, এই ফুলকে আমার জন্য হেফাজতে রাখার জন্য। আপনাকে একটি খুশির সংবাদ দিই আম্মা। আপনি নানুয়াপু হতে চলেছেন। আপনিই প্রথম যাকে এই সংবাদটি দিলাম। খুশি তো? সাবধানে থাকবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন আম্মা। আমার সন্তান যেন সুস্থ ভাবে ভূমিষ্ঠ হয় তার জন্য দোয়া করবেন।”
তারপর দুহাতের মাঝে খুব যত্ন করে আগলে নিল ঝুমকে। পা বাড়ালো বাড়ির দিকে। এখনো যে অনেক কাজ বাকি। অথচ মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে এমন হলে বাকি সব কাহিনী দেখবে কে? কার জন্য সে এতো পরিশ্রম করলো?
বাড়ির দিকে আগাতে আগাতে শুনল ভিতর থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ। গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেছে তাহলে? সঠিক সময় এসে পড়েছে তারা। দ্রুত পা চালাল শাইয়ান। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো ভিতরে বেশ বড় সর ঝামেলা বেঁধেছে। দুজন মহিলা গলার স্বর বাড়িয়ে চেঁচামেচি করছেন সমানতালে। শাইয়ানের মেজাজ খারাপ হলো। একপলক ঝুমকে দেখে নিয়ে ভালো করে আগলে নিল সে। তারপর ভারী গলায় ভীষণ গম্ভীর ভাবে বলল –
” হচ্ছে কি এখানে? এতো চেঁচামেচি কেন হচ্ছে?”
মুহূর্তে সব শীতল। ঘরে থাকা প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি তখন দরজার অভিমুখে দাড়ানো শাইয়ানের দিকে। চেঁচামেচি করা দুজন মহিলার মাঝে একজন হায়হায় করে উঠলো। কর্কশ ভাষায় ঝুমকে বাজে ইঙ্গিত দিয়ে বলল –
” দেখ ভাই দেখ, তোর মেয়ের অবস্থা। কোথাকার কোন লাং এর কোলে চড়ে বাড়ি ফিরেছে আজ এতো বছর পর। না জানি কতো বেটা মানুষের হাত বদল হয়েছে এই মেয়ে।”
নিম্ন ও কুরুচিবোধক শব্দগুলো ঝুমের ফুপু অর্থাৎ প্রাক্তন শাশুরি উচ্চরণ করলো। ঝুমকে নিয়ে বলা বাক্যগুলো শাইয়ানের রক্ত গরম করে দিলো। রাগে চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কপালের পাশের রগগুলো ফুলে স্পষ্ট দেখা গেল। আহির, শ্রাবণী ঠিক পিছনেই ছিল শাইয়ানের। শ্রাবণী রেগে এগিয়ে এলো সামনে। আঙুল তুলে তেড়ে গিয়ে বলল –
” ওই মুখ সামলে ওকে? নয়তো পরের বার কথা বলার জন্য মুখটা আর সুস্থ থাকবে না।”
মহিলা নেকা কান্না শুরু করে দিলো। একটি লোকের নিকট যেতে যেতে
বলল –
” দেখ ভাই দেখ। তোর সামনে আমাকে কিভাবে অপমান করাচ্ছে তোর মেয়ে।”
শ্রাবণী বেজায় বিরক্ত হলো। বলল সে, কিন্তু নাম দিলো ঝুমের। এই মহিলাকে সে টাইট না দিতে পারলে তার নামও শ্রাবণী না।
শাইয়ান দেখলো ঝুমের বাবাকে ভালো করে। এর আগে ছবিতে সে বহুবার দেখেছে। এই লোকের যা হিস্টোরি! বাঁধিয়ে রাখার মতো। আস্তো মাকাল ফলের একটা। ঝুমের মায়ের মতো বিচক্ষণ মহিলা কিভাবে এই লোকের ফাঁদে পা দিলো বুঝে আসে না এখনো শাইয়ানের। সে পা বাড়িয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ঝুমের ফুপুকে উদ্দেশ্য করে বলল –
” আপনার নাটক শেষ হলে এবার আসতে পারেন। আপনার সাথে কথা বলার মুড নেই এখন। কাল আপনার চেপ্টার দেখা যাবে। ততক্ষন ধৈর্য্য ধরুন। এখন আসুন। কাল না হয় আবার নাটক করতে আসবেন। রাইট নাউ, উই আর টায়ার্ড।”
মহিলা তেঁতে উঠলো। অচেনা একটা ছেলে তাকে অপমান করছে বিষয়টি সে মেনে নিতে পারল না।
” এই এই কি বললে তুমি? তোমার সাহস তো কম না? আমাকে তুমি বেরিয়ে যেতে বলো?”
শাইয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মেজাজ খুব বেশি খারাপ হলে সমস্যা। দেখা যাবে এদের বংশ ধুলিস্যাৎ করে দিলো।
” আমার সাহস দেখতেই কাল আসতে বলেছি আপনাকে।”
এই পর্যায়ে ঝুমের বাবা লোকটি কথা বলল। সে এতক্ষন বসে সবটাই লক্ষ্য করছিল। আর্মি হওয়ার খাতিরে বিচক্ষণতা তার মাঝেও বিদ্যমান। অপরিচিত ছেলে – মেয়ে গুলোকে দেখে তার মনে হলো ছেলে দুটি অন্যরকম। তাছাড়া এই ছেলেটিকে দেখেই সে বুঝে গেছে এর মাঝে আলাদা কিছু ব্যাপার আছে।
” কে তুমি? কি চায় এখানে? ঝুমের সাথে তোমার কি সম্পর্ক?”
শেষের কথাটি সে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে বলল। শাইয়ান ফিরে তাকালো তার দিকে। চোখে চোখ রেখে ফিচলে হেসে বলল –
” আমি আরীবার হাসবেন্ড।”
ছোট কথাটি যেন ভূমিকম্পের মতো কাজ করলো। প্রতিটি মানুষ হতভম্বের মতো তাকিয়ে। পাশে দাঁড়ানো ঝুমের ফুপু ও ঝুমের বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী বিষয়টি মেনে নিতে পারল না। ঝুমের এতো সুন্দর বর? এ হতে পরে না।হিংসায় চোখমুখ কুঁচকে নিলেন তারা। ঝুমের বাবা অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে শাইয়ানের চোখের দিকে। হয়তো কিছু একটা আঁচ করলেন।
” এতদিন পর হঠাৎ?”
শাইয়াইন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে ফেলল। ঠোঁটের কোনে ভয়ানক হাসি ঝুলিয়ে বলল –
” কেনো মেয়েকে দেখে খুশি হননি?”
“এদের তোমরাই আনিয়েছো?”
সেখানে উপস্থিত একজন মধ্যবয়স্ক লোক ও দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষকে দেখিয়ে বলল সে। শাইয়ান তাদের দিকে তাকিয়ে চোখে হাসলো। যুবক ছেলেদের মাঝে একজনের সাথে চোখে চোখে কিছু কথা বলে ঝুমের বাবাকে বলল –
” হুম। আরীবার যে এতো সুন্দর আরও একটি পরিবার আছে সেটা জানার অধিকার ওর অবশ্যই আছে তাই না? ওরা আজ এখানেই থাকবে। ওদের থাকা – খাওয়ার ব্যবস্থা করুন। আর হ্যাঁ, কেউ যদি উল্টা – পাল্টা কিছু করার চিন্তাও করে, সেটা তার জন্য ভালো হবে না আগেই জানিয়ে রাখছি। সুতরাং সাবধান।”
ঝুমের বাবা হঠাৎ ভীষণ রেগে গেলেন। উঠে দাড়িয়ে শাইয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল –
” তুমি এতকিছু বলার কে? আমার বাড়িতে আমি তোমাদের কাউকে থাকতে দিবো না। বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও।”
ঝুম তখনো শাইয়ানের কোলে। বুকের সাথে মিশে আছে মেয়েটা। শাইয়ান ওকে নিয়ে এগিয়ে লোকটার মুখোমুখি দাড়িয়ে বলল –
” আপনার বাড়ি? কিন্তু আমি যে জানি এটা আরীবার আম্মার বাড়ি। তার মৃত্যুর আগে তিনি বাড়িটা আরীবার নামে করে দিয়ে গিয়েছেন। তাহলে আপনি কি করে বলছেন এটা আপনার বাড়ি মি. শিকদার?”
শাইয়ানের কথায় ঝুমের বাবা জলিল শিকদার নামের লোকটি চমকে উঠলো। সে আশা করেনি এমনটা। এই সত্য কারো জানার কথা নয়। ঝুমের মা মৃত্যুর আগে বাড়ি ঝুমের নামে করে দিয়ে গেছেন? কিভাবে সম্ভব? এতো প্ল্যানিংয়ের পরও মহিলা কিভাবে কি করলো? নাকি ছেলেটা মিথ্যা বলছে?
” মিথ্যা। তুমি মিথ্যা বলছো। এই বাড়ি আমার। এসব কিছু আমার।”
তাকে বদ্ধ উম্মাদের মতো লাগছিল তখন। শাইয়ান গভীর চোখে সবটাই পর্যবেক্ষন করলো। এবাড়ির কেউ স্বাভাবিক না বুঝতে সময় নিল না। চিন্তিত ঠেকল তাকে। ঝুমকে এখানে এনে ঠিক করলো তো? সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে হবে দ্রুত।
” সে না হয় দেখা যাবে পরে। সময় তো আছে তাই না শশুর বাবা? মেয়ে জামাই প্রথমবার এলো আপনার বাড়িতে, আপ্যায়ন করুন। কেমন?”
শাইয়ান কথা না বাড়িয়ে বড় বড় কদমে এগিয়ে গেলো ঝুমের ঘরের দিকে। তার প্রতিটি কদম জানান দিচ্ছে, সে এই বাড়ির নাড়ি নক্ষত্রের সাথে পরিচিত।
” এখানে আমরা বেশি দিন থাকবো না। কিন্তু যতদিন আছি সকলে সাবধানে থাকবেন। চোখ – কান সজাগ রাখবেন। আর হ্যাঁ, ঝুমকে কেউ একা ছাড়বেন না।”
শাইয়ান উক্ত কথাগুলো বলে তাকালো ঝুমের দিকে। মেয়েটা ঘুম। এখন গভীর রাত। এতো রাগ পর্যন্ত জেগে থাকতে পারে না। ইদানিং ঘুম বেড়েছে তার। সুযোগ পেলেই ঘুমায়। আসার পর জ্ঞান ফিরলে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিয়ে ছিল। তারপর ঘরের প্রতিটা কোনা হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। ঘরটা এখন তার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ের। সে থাকে এই ঘরে। শাইয়ান এই ঘরে ঝুমকে নিয়ে থাকায় বড্ড বাড়াবাড়ি করে ছিল মেয়েটা। চিৎকার, চেঁচামেচি করে পরিবেশ খারাপ করে দিয়েছিল একদম। ২০/২১ বছরের মেয়েটি এমন করছিল যেন ঘর ছাড়া সে মরে যাবে। শাইয়ান তখন কিভাবে যে নিজেকে সামনে রেখে ছিল? শাইয়ান কিছু না বললেও শ্রাবণী চুপ থাকেনি। তার দাবাং হাতের এক চটকানায় মেয়েটা চুপ হয়ে গিয়েছিল। শ্রাবণী মনে মনে বলতে ভুললো না, যেমন মা – বাবা তেমন মেয়ে। শাইয়ান শ্রাবণীর কাজে ভীষন খুশী হলেও মুখে প্রকাশ করেনি। আহির অবশ্য অবাক হয়নি শ্রাবণীর কাজে।এই মেয়ে মারপিট করলেও সে অবাক হবে না। তখন তাদের দুজনকে শাইয়ান রাতে এঘরে আসতে বলে ছিল।
” শাইয়ান আমার মনে হয় ভাবিকে এখানে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি।”
চিন্তিত স্বরে শাইয়ান বলল –
” এখন আমারও তেমনটাই মনে হচ্ছে। কাল দিনটা পর্যন্ত ওকে সাবধানে রাখতে হবে আহির।”
আহির, শ্রাবণী মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। এমন সময় শাইয়ানের ফোন বেজে উঠল। দ্রুত হাতে ফোন রিসিভ করে পিছু ফিরে চাইলো ঝুমের দিকে। তিন জোড়া চোখ ব্যাকুল হয়ে দেখলো ঝুমের ঘুম ভাঙ্গলো কিনা। নাহ্ ভাঙেনি। সামান্য নড়েচড়ে সে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
” হ্যালো।”
………….
” ওকে। চারজনকে বাড়ির ভিতর পাঠিয়ে দিন। ভিতরে প্রটেকশন লাগবে।”
………..
” থ্যাংক ইয়ু।”
কল কেটে সামনে তাকালে দেখতে পেলো দু জোড়া উৎসুক নজর তার দিকে তাকিয়ে।
” বাংলাদেশ আর্মির সহায়তা নিয়েছি।”
আহির হা করে তাকিয়েই রইলো শাইয়ানের দিকে। শ্রাবণী চিন্তিত হয়ে বলল –
” কিন্তু ভাইয়া ওরা নিজেদের লোক ছেড়ে আপনাকে সহায়তা কি আদোও করবে? এখনতো সব জায়গাতেই দূর্নীতি হয়।”
শাইয়ান চমৎকারিত্ব হয় মেয়েটার চিন্তা ভাবনায়।
” আমিও ভেবে ছিলাম। কিন্তু কি বলুন তো শ্রাবণী, ক্ষমতারও বাপ আছে। উপর মহল থেকে চাপ পেলে সবাই বাপ বাপ করে।”
” তারপরও ভাইয়া আমাদের নিজেদের অন্যকোনো ব্যাকআপ রাখা উচিত। আমি এদের বিশ্বাস করি না। আর ঝুমের বাপটাকে আমার সুবিধার লাগলো না।”
” চিন্তা করবেন না। ওদের সাথে পাকিস্তানি আর্মিও রয়েছে। আপনারা শুধু আরীবাকে চোখে চোখে রাখবেন। যদিও আমি ওনাকে একা ছেড়ে যাবো না। তবুও যদি এমন হয় তখন সবটা দিয়ে হলেও ওনাকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব আপনাদের।”
এই পর্যায়ে আহির কথা বলল –
” সে নিয়ে চিন্তা করো না শাইয়ান। কিন্তু তুমি চারজনকে কেন আসতে বললে?”
” আরীবার সুরক্ষা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনই শ্রাবণীও আমার দায়িত্ব। ওনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এবাড়ির প্রতিটি মানুষ বিষক্ত। কখন কাকে ছোবল মারবে বলা যায় না। যতই উনি নিজের সুরক্ষা নিজে দিতে পারুক না কেন, দিন শেষে সে নিজেও একজন মেয়ে। বিপদ কখন কোন দিক দিয়ে আসবে বলা যায় না। আহির খেয়াল রেখো।”
Remedy part 22
আহির চোখের পলকে আশ্বাস দিলো। শ্রাবণীর চোখে কৃতজ্ঞতা। ঝুম সঠিক মানুষকে ভালোবেসেছে ভেবে খুশি হলো।
তাদের মজলিস সেখানেই শেষ হলো। শাইয়ানের কথা মতো দুজন ঝুমের ঘরের সামনে আর দুজন শ্রাবণীর ঘরের সামনে সারারাত পাহারায় রইলো। শাইয়ানের চোখে ঘুম নেই আজ। সে ঝুমকে বুকের সাথে আগলে নিয়ে রাখলো। অপেক্ষা নতুন ভোরের। আগামী সকাল নতুন কোনো শুরুর দিকে নিয়ে যাবে তাদের। নতুন কিছু সত্যের মুখোমুখি করবে ঝুমকে। মেয়েটা সামলে নিতে পারবে তো নিজেকে?
