Home Remedy Remedy part 25

Remedy part 25

Remedy part 25
মীরা রায়াদ

“আমীরাকে আমরা মেরেছি। বিষ দিয়ে মেরেছি।”
কিছুটা থেমে তাকালো জলিল শিকদারের দিকে। তার চোখ মুখ ভীষন কঠিন। মিসেস শিকদার চোখ নামিয়ে বলতে লাগলেন –
” আমার মা আর জলিলের মা দূরসম্পর্কের বোন। ছোটো বেলা থেকে আমাকে বোঝানো হয়েছিল আমি জলিলের বউ। বড় হলে আমাদের বিয়ে হবে। একই সাথে বড় হওয়া আমরা জানতাম আমাদের ভবিষ্যতে বিয়ে হবে। সুতরাং মন দেয়া নেয়ায় দেরি হলো না। কিন্তু সব বদলে গেলো আমীরার জন্য। সারা জীবন ধরে বুনে রাখা স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে জলিল বিয়ে করে নিলো আমীরাকে। আমাকে.. আমাকে একবার জানালো না! ভালোবাসার মানুষের পাশে অন্য কাউকে দেখার কি কষ্ট তা আমি সেদিন বুঝে ছিলাম। বিয়ের কথা শুনে ছুটে আসলাম। কিন্তু আমীরার মুখোমুখি হতে পারলাম না। খালা মানে আমার শাশুরি সেদিন বলল –

” অনেক সম্পত্তির মালিক এই মেয়ে। কয়েক বছর সহ্য করে নে মা। তোমাদের বিয়ে দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দিবো। কিন্তু এখন কোনো বাঁধা দিস না।”
আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ ছিলাম। কোনো রকম থাকা খাওয়াটা হতো। জলিলের তখন নতুন চাকরি। তাও সৈনিক পদে। মাস শেষে কোনরকম চলতো। ওদের বাড়িটার ও যাচ্ছে তাই অবস্থা ছিল। আমীরাই তখন ওদের এই বাড়িতে নিয়ে আসে। ভাবলাম মানুষটাকে পেলে হলো। দরিদ্রতা ঘুচলে সমস্যা কোথায়? আমি চুপ করে গেলাম। ওদের বিয়ের কিছু দিন পরই জলিল আমাকে বিয়ে করে নিলো আমীরার অলক্ষ্যে। বিয়ের পর পরই আমাকে নিয়ে গেলো নিজের কাছে। শুরু হলো আমাদের সুখের দিন। ভেবে ছিলাম আমীরার থেকে সবটা লিখে নিয়ে ওকে তাড়িয়ে দিবো। কিন্তু ওই মহিলা একটা কিছু লিখে দিলো না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

উল্টো এই সম্পত্তির জন্য আমার প্রথম সন্তানকে বলি দিতে হলো। খালা বলল, এই বাচ্চার ব্যাপারে আমীরা কিছু জানতে পারলে এতদিনের সব কষ্ট বৃথা যাবে। জলিল তাই জোর করে আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলল। আমার বাচ্চাটাকে ওই মহিলার জন্য মেরে ফেলতে হলো। সেই শোকে জলিল ওকে কতো মারতো, নির্যাতন করত কিন্তু তবুও ভাঙতে পারেনি। আমীরাকে আর সহ্য করতে না পেরে মেয়ে হওয়ার অজুহাত দিয়ে বাড়ি যাওয়া বন্ধ করলো। বোকা আমীরা তখনো ভাবতো জলিল ওকে ভালবাসে। অথচ ও জানতোই না জলিল শুধু আমাকে ভালোবেসেছে। আর ওকে ব্যবহার করেছে। যখন কোনো কিছুতেই কাজ হলো না তখন আপা বলল নয়নের সাথে ঝুমের বিয়ে দিতে। আমীরার সবকিছুর অধিকারী একমাত্র ঝুম ছিল।

ওকে বেঁধে ফেললে আপনা – আপনি সব আমাদের হাতে চলে আসবে। কতো যে কসরৎ করেছি বিয়েটার জন্য। অথচ শেষ সময়ে এসে আপা নিজেই পাল্টি খেলেন। আমাদের কাছে তখন আর উপায় ছিল না আমীরাকে মারা ছাড়া। জীবনটা বিষিয়ে দিয়েছিল একদম। যেদিন ওকে বিয়ে করে আনলো জলিল, সেদিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ছিলাম ওকেও বুঝাবো ভালোবাসার মানুষটির সাথে অন্য কাউকে দেখলে কেমন লাগে। তাইতো জলিলকে অনেক বুঝিয়ে এবাড়িতে পা রাখলাম। ওর দুচোখে যন্ত্রণা দেখতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু ও.. ও কাদলো না। একদম কাদলো না। আমাদের অবাক করে দিয়ে কিছুই বলল না, যেন আগে থেকেই সব জানতো। আমরা ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম সব হারানোর। তাই আম্মা আর আমি জলিলকে জানালাম, আমীরাকে মেরে ফেলার কথা। কিন্তু জলিল জানালো, ও আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা করে রেখেছে আমীরাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলবে। সব প্ল্যান রেডি ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

কথাগুলো বলে হাপিয়ে উঠলেন তিনি। বড়বড় কয়েকটি নিশ্বাস নিলেন। ঝুমের মাঝে বিশেষ কিছু লক্ষ্য করা গেলো না। সে যেভাবে ছিল সেভাবেই বসে আছে। শাইয়ান কড়া গলায় বলল –
” কিভাবে মেরেছেন?”
মিসেস শিকদারের চোখে পানি। বাকিটুকু আরো ভয়ানক যে।

” সেদিন রাতে জলিল আমীরাকে ওদের ঘরে ডেকে নেয়। সেখানে পূর্ব থেকে আমি আর আম্মা উপস্থিত ছিলাম। জলিল চেষ্টা করে ছিল আমীরাকে রাজি করিয়ে সব লিখে নেয়ার। কিন্তু আমীরার মাঝে ভাবাবেগ ছিল না কোনো। আমাদের এতো বুঝানোর পরও ও একবিন্দু মেনে নেয়নি। আমি বলে ছিলাম ওদের আমীরা আপোষে মানলে ছেড়ে দিতে, খুন করার দরকার নেই। ওরাও মেনে নিয়ে ছিল। কিন্তু আম্মা বলল না মানলে মেরে ফেলতে হবে। যেহেতু আমীরার পরিবার নিয়ে ঝামেলা ছিল না। সুতরাং সব এমনিতেই ঝুম আর জলিলের নামে চলে আসবে। আমরা সেভাবেই কাজ করে ছিলাম। সেদিন রাতে দরজা বন্ধ করে তিনজন জোর করে ওর সাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তবুও ও দিচ্ছিল না যখন, তখন আমরা আমাদের আসল অস্র কাজে লাগাই। রাইসিন নামের একটি অত্যধিক বিষাক্ত দ্রব্য রুমালে ঢেলে আমীরার নাকে চেপে ধরে জলিল। তারপর ওকে আমরা ছেড়ে দিই। আশ্চর্যজনক ব্যাপার আমীরা সেদিন আমাদের কিছু বলেনি। চুপচাপ চলে যায়। আমরাও আপদ বিদেয় হওয়ার খুশি উৎযাপন করতে ব্যস্ত হয়ে পরি।”

ওনার কথা শেষ হতেই হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জলিল শিকদারকে দেখা গেলো শান্ত হয়ে বসে থাকতে। ঝুমের ফুপু অবাক হলো বেশ। তারা খারাপ হতে পারে তাই বলে খুন? কিভাবে সম্ভব?
” মা, তোমরা মেরেছো আমীরাকে? এমনতো কথা ছিল না।”
ঝুমের দাদী কিছু বলতে পারলেন না। এই শেষ বয়সে এসে সব ফাঁস হয়ে যাবে সে ভাবেনি। ঝুমের মামা বলল –
” আমীরা বুঝতে পেরেছিল তোমরা কিছু করেছো ওর সাথে। ও বুঝতে পেরেছিল ওর সময় শেষ। তাইতো সেদিন রাতে আমাকে ফোন দিয়ে বলল, ঝুমের খেয়াল রাখতে। যতো দ্রুত সম্ভব ওকে এখান থেকে দূরে পাঠিয়ে দিতে। তোমরা এতো নিষ্ঠুর যে আমার বোনটাকে আমাদের শেষ দেখাও দেখতে দাওনি। বাড়ির ভিতর ঢুকতে দাওনি একবার। শুধু ঝুম জেনে যাবে এই ভয়ে। সেদিন থেকে এই বাড়ির আশেপাশে সর্বদা কেউ না কেউ ঝুমকে সুরক্ষা দিয়ে গেছে।”
শাইয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল –

” রাইসিন তো মারাত্মক একটি ড্রাগ। এটিতো বে-আইনি। তা মি. শিকদার আপনি কোথা থেকে পেয়ে ছিলেন এটি? আইনের লোক হয়ে তাহলে এসব ও করা হয়? যদিও আপনার কুকর্মের লিস্ট দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি রক্ষক নামে ভক্ষক। দেশের সেবা করার শপথ নিয়ে দেশদ্রোহীদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। আপনার কি হবে তা তো বলতে পারছি না। কিন্তু আপনাদের কুকর্মের ফল এখন আপনার ছেলে – মেয়েকে বইতে হবে।”
একে একে তাদের প্রত্যেককে নিয়ে যাওয়া হলো। শাইয়ান এই দিনের জন্যই এতো পরিশ্রম করেছে। জলিল শিকদারের পাপের শাস্তি হওয়া উচিৎ ভীষণরকম অপমান ও লাঞ্ছনা। শাইয়ান তার জন্যই রিটায়ার্ড হওয়ার আগ মুহূর্তকে বেছে নিয়ে ছিল। এর থেকে লজ্জার অপমানের হয়তো আর কিছু হবে না।
ঝুম শান্ত ভাবে উঠে দাড়িয়ে শ্রাবনীকে উদ্দেশ্য করে বলল –

” আপু আমাকে একটু ধরবে? রুমে গিয়ে রেস্ট করব ভালো লাগছে না।”
শাইয়ান অসহায় অনুভব করলো ভিশন। ঝুম কিছু বলছে না কেন? তার সাথে কথা বলবে না? শ্রাবণী ঝুমকে নিয়ে আগাতে নিলে হঠাৎ জলিল শিকদারের ছেলে এসে অতর্কিতভাবে ঝুমকে খুব জোরে ধাক্কা দেয়। আকস্মিক ধাক্কায় ঝুম বা শ্রাবণী কেউই নিজেদের সামলে নিতে পারলো না। ধাক্কাটা ঝুমকে দেয়ায় শ্রাবণী কয়েক পা দূরে সরে যায়। কিন্তু ঝুম নিজেকে সামলাতে পারেনি। পাশে রাখা ছোট টেবিলের ওপর পরতে নিলে নয়ন দুহাতে আগলে নেয়। ততক্ষনে আহির শাইয়ান দুজনই ছুটে এসেছে। ঝুম ভয়ে দ্রুত একহাত পেটে চেপে ধরলো। কি হতে যাচ্ছিল ভেবে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে। শাইয়ান নয়নের কাছ থেকে ঝুমকে ছিনিয়ে নিলো। শাইয়ানের চোখে মুখে ভয়ানক রাগ। ঝুমকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল দ্রুত। তা দেখে নয়ন হাসলো। বেদনার হাসি।

জলিল শিকদারের ছেলেটি রাগে চেঁচাচ্ছে। ঝুমকে অকথ্য ভাষায় এটা সেটা বলে যাচ্ছে। শাইয়ান আর নিতে পারল না। ডান হাতে ঝুমকে বুকের সাথে আগের মতো মিশিয়ে নিয়ে বাম হাতে ছেলেটির গলা চেপে ধরলো। ১৫/১৬ বছরের ছেলেটির রক্ত গরম। সঠিক শিক্ষার ওভাবে মানুষকে মানুষ মনে করে না। তাইতো বুঝতে পারেনি কোথায় হাত দিয়েছে। শাইয়ানের দানবীয় হাতের চাপে ছটফটিয়ে উঠলো। কিন্তু শাইয়ানের মাঝে ছাড়ার লক্ষণ নেই। মেরে ফেলবে নাকি? ঝুম একপলক ছেলেটিকে দেখে খুব ধীরে শাইয়ানকে বলল –
” ছেড়ে দিন ডক্টর। মরে যাবে।”

শাইয়ান ছাড়লো না। জলিল শিকদারের মেয়েটি ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাদঁছে। বারবার করে ছেড়ে দিতে বলছে। ঝুম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শাইয়ানের সাথে আরো একটু মিশে গিয়ে বলল –
” ছেড়ে দিন ডক্টর। ছোটো মানুষ। কিছু দিন পর আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা চাইলে আমাদের জীবনেও কেউ আসবে। কারো সন্তান কেড়ে নিয়ে আমরা ভালো থাকতে পারবো না। ক্ষমা করে দিন।”
শাইয়ানের হাত ধীরে ধীরে থেমে গেলেও তার চোখের কঠোরতা কমলো না। ছেলেটি বড়বড় নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাচ্ছে। আর একটু হলে দমবন্ধ হয়ে মরে যেতো। ভয়ে সে বোনের বুকে মিশে গেল। শাইয়ান আহিরকে উদ্দেশ্য করে বলল –

” এদের এই বাড়ির বাইরে বের করে দাও আহির। এদের আমি আরীবার ত্রি-সীমানায় দেখতে চাই না। এন্ড ইয়ু, দিস ইজ ইয়োর ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং, নেভার এভার ট্রাই টু হার্ট হার। আদারওয়াইজ আই ওন’ট লেট ইউ গো।”
মেয়েটি কেঁদে উঠে বলল –
” কিন্তু আমরা যাবো কোথায়?”
শাইয়ান রাগে কাপছে। কি হতে পারতো ভাবলেই আশঙ্কায় বুক কাপছে তার। চোখ বন্ধ করে বড় একটি নিশ্বাস ছেড়ে বলল –
” এই কথাটি এমন কাজ করার আগে ভাবা উচিত ছিল না? আমি আমার বউয়ের আশেপাশে আপনাদের কাউকে দেখতে চাই না। বেরিয়ে যান এখনই এখান থেকে।”
ঝুম শাইয়ানের থেকে নিজেকে আলাদা করে নিজের ছোট ছোট হাত দ্বারা শাইয়ানের বিশাল বড় হাতটি ধরে কোমল স্বরে বলল –

” শান্ত হোন ডক্টর। ওরা এখনো ছোট। সময় দিন কিছুটা। ( পরপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল) আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করিনি। বরং আপনার মা – বাবা আমার শৈশব নষ্ট করেছে। আমার থেকে আমার আম্মাকে কেড়ে নিয়েছে। আমার জীবনটা বিভীষিকাময় করে দিয়ে ছিল। অতীত আপনারা জানেন কি না আমার জানা নেই। তবে আজ সব শুনেও আপনাদের এই ব্যবহার বলে দিচ্ছে আপনাদের শরীরে ঐ পশুর রক্তই বইছে। যদিও আমি চাই না এই বয়সে আপনারা বাড়ি ছাড়া হয়ে ক্রূর বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তাই বলব, নিজেদের শুধরে নিন। সত্যের মুখোমুখি হন। অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজেদের মাঝে লুকিয়ে থাকা ভালো দিকটার প্রকাশ ঘটান। সুযোগ দিচ্ছি সৎ ব্যবহার করুন। এরপর এমন ব্যবহার মেনে নিবো না। আজ আপনাদের ঘর ছাড়া করছি না। সুস্থ ও সুন্দর ভাবে ভবিষ্যৎ গড়ার এই সুযোগ আপনারা কিভাবে কাজে লাগাবেন সেটা একান্ত আপনাদের বিষয়। আমি চাইলে আপনাদের মা – বাবার কর্মের শাস্তি আপনাদের দিতে পারতাম। কিন্তু যেহেতু দিচ্ছি না, সুতরাং আশা রাখবো আপনারাও আমার কিংবা আমাদের কারোর ক্ষতি করবেন না। চলুন ডক্টর।”
ঝুম শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে চমৎকার একটি স্নিগ্ধ হাসি দিল। শাইয়ান সেই হাসিতেই কুপোকাত। কে বলবে কিছুক্ষন আগেই এক মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল এই মেয়ের সাথে?

“রাগ করেছেন ডক্টর?”
শাইয়ান চোখ তুলে তাকালো কিন্তু কথা বলল না ঝুমের সাথে। তখন রুমে এনেই ঝুমের কিছু সাধারণ চেকআপ করে নিয়েছে শাইয়ান। প্রেগন্যান্সির শুরুর দিকটা খুবই সতর্ক থাকতে হয়। ছোট ছোট জিনিসও বিপদজনক হতে পারে। ভয় পেয়েও অনেক সময় বিপদ ঘটে। শাইয়ান চিন্তিত খুব। ঝুমকে একবার হসপিটালে নিয়ে চেকআপ করাতে পারলে ভালো হতো।
” ডক্টর।”
” হুম।”
” রাগ করেছেন?”
” না।”
” তাহলে কথা বলছেন না কেন আমার সাথে?”
” ওদের এখানে রাখা কি খুব বেশি দরকার ছিল আরীবা?”

ঝুম এগিয়ে গেলো শাইয়ানের কাছে। লোকটা মাঝে মাঝে এতো বাচ্চামো করে, তখন সামলানো মুসকিল হয়ে পরে। শাইয়ানের গালে হাত রেখে বলল –
” আম্মাকে ছাড়া আমি একা যখন এবাড়ি থেকে বের হই, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে বুঝতে পারি দুনিয়াটা কত বেশি নিষ্ঠুর। ওরা এখনো ছোট ডক্টর। কিভাবে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় একা ছেড়ে দিই?”
” আপনার আমাকে নিষ্ঠুর – পাষাণ মনে হয়?”
” তা কখন বললাম?”
” তাহলে ভাবলেন কিভাবে ওদের মতো বাচ্চা ছেলে – মেয়েকে একা ছেড়ে দিবো?”
ঝুম চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো। শাইয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। ঝুমকে ভালো ভাবে বেডে শুইয়ে দিয়ে গায়ে পাতলা চাদর টেনে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল –

” আমি চেয়ে ছিলাম যতদিন আপনি এখানে আছেন সেই কয়দিন ওরা অন্য কোথাও গিয়ে থাকুক। তারপর না হয় এখানে এসে থাকবে। আপনার কি মনে হয় ওদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই? ওদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেকে আছে পাখি। আমার ওপর ভরসা রাখুন ওদের সাথে খারাপ কিছু করব না। জাস্ট আমরা এখানে যে কয়দিন আছি সে কয়দিন অন্য কোথাও গিয়ে থাকুক না হয়। আমি নিজে এই ব্যাপারে খেয়াল রাখবো।”
ঝুম শাইয়ানের ব্যাকুলতা বুঝলো। লোকটা তাকে নিয়ে চিন্তিত খুব।
” ডক্টর আমি পাকিস্তান যেতে চাই। ইমিডিয়েট টিকিট কাটুন। কাল সকাল সকাল ঢাকা যাচ্ছি আমরা।”
শাইয়ান অবাক হলো খুব। হঠাৎ পাকিস্তান ব্যাক করার ইচ্ছা জাগলো কেন বুঝলো না। বেশ কিছুক্ষন ঝুমের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝুঁকে ঝুমের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। ওভাবেই বলে উঠলো –
” আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন পাখি, আপনি আপনার খারাপ হবে এমন কিছু করব না।”
ঝুম চোখ বন্ধ করে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। রিনরিন গলায় সুর তুলে ঠোঁটে হাসি নিয়ে বলল –
” জানি ডক্টর।”

তাদের একান্ত মুহূর্তে দরজায় শব্দ হলো। স্বভাবতই শাইয়ান বিরক্ত হলো। বউয়ের সাথে কাটানো মুহূর্তে কেউ বিরক্ত করুক তা সে একদম পছন্দ করে না। অথচ বিয়ের পর থেকে সেই অপছন্দনীয় কাজটিই তার সাথে বেশি হচ্ছে। আশ্চর্য! আবারও দরজায় শব্দ হলো। এবার একা ধারে বেশ কয়েকবার কড়া নাড়ানোর শব্দ হলো। ওপাশের ব্যক্তিটি ভীষণ ব্যস্ত। ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না তার। শাইয়ান ব্যস্ততা দেখলো না। সে বুঝে গেছে দরজার ওপাশে আহির কিংবা শ্রাবনীর মাঝে কেউ না। সুতরাং অন্য কে আসলো বা আসলো না তাতে তার খুব একটা যায় আসে না। সে ধীরে উঠে ভালো করে ঝুমের বুক সমান চাদরটা টেনে দিল। মেয়েটার শরীর আবার গরম লাগছে। প্রেগন্যান্সির সময় হরমোন পরিবর্তন কিংবা ব্যাথা/ টান এসবের জন্য জ্বর আসাটা স্বাভাবিক। প্রথম দিকে অধিকাংশ মায়ের মাঝে এই লক্ষণগুলো দেখা যায়। শাইয়ান তবুও ভয় পাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। যতো দ্রুত পাকিস্তান যেতে পারবে ততোই ভালো। এখানে শান্তি পাচ্ছে না। ভয় করছে খুব।

” ডক্টর।দরজাটা খুলে দিন। দেখুন কে যেন ক্রমাগত দরজা ধাক্কাচ্ছে।”
শাইয়ান নিজের চিন্তা থেকে বাস্তবে এলো। শুনতে পেলো কেউ একজন এখনো এক নাগাড়ে দরজায় শব্দ করে যাচ্ছে। আশ্চর্য এতো ব্যস্ত কেন? মুখ থেকে বিরক্তিকর শব্দ বের করে উঠে দাড়ালো। ধীর পায়ে গিয়ে দরজা খুলে যাকে দেখলো তাকে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো খুব। এই লোককে তো মেরে এই বাড়িতেই পুঁতে রাখবে শাইয়ান। নয়ন দাঁড়িয়ে দরজার ওপাশে। শাইয়ানকে দেখে ভাবাবেগ হলো না তার। শাইয়ান রুষ্ট গলায় প্রশ্ন করলো –
” কি চাই এখানে? মিনিমাম কমন সেন্স নেই? কোনো কাপলদের ঘরে এভাবে নক করে? আর যখন দেখছেনই দরজা খুলছি না তখন বোঝা উচিত আমরা কোয়ালিটি টাইম স্পেণ্ড করছি। নাকি সেটাও বোঝেন না।”
নয়নের মুখ থমথমে আকার ধারণ করলো মুহূর্তেই। সে কোনরূপ ভনিতা না করে বলল –
” আমার ঝুমের সাথে কিছু কথা আছে।”
ঝুম! তার বউকে দিয়ে কি কাজ? রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেলো শাইয়ানের। গলার স্বর আরো একধাপ গম্ভীর হয়ে গেলো তার।

” আপনার হিসাব এখনো মিটানো হয়নি মি.। অপেক্ষা করুন আপনার সাথে পরে কথা বলবো। এখন আসতে পারেন। আর আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবেন।”
” দেখুন এখানে আমি আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করতে আসিনি।”
শাইয়ান শব্দ করে হেসে ফেলল।
” প্রতিযোগিতা? তার তো কোনো চান্সই নেই।”
তারপর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে নিয়নের মুখোমুখি দাড়িয়ে জেদ্দি গলায় বলল –
” আরীবা আমার। শুধু আমার। উনি এখন আমার বউ। তাই কারো সাথে প্রতিযোগিতা করার কোনো প্রয়োজনই নেই আমার। বরং যে আমাদের মাঝে আসতে চাইবে তাকে নিজ দায়িত্বে আমি সরিয়ে দিবো।”
শাইয়ানকে ভয়ংকর দেখলো সেই মুহূর্তে। তার চোখে মুখে স্পষ্ট সে ঝুমের প্রতি কত বেশি অবসেসড। নয়ন নিজেকে শান্ত করলো। ঝুমের সাথে এই মুহূর্তে কথা বলা খুব দরকার। অনেক প্রশ্ন রয়েছে তার। ঝুমের থেকে অনেক কিছু জানার আছে।

” ডক্টর, কার সাথে কথা বলছেন? কে এসেছে?”
ভিতর থেকে ভীষণ মিষ্টি কন্ঠে শুদ্ধ উর্দু ভাষা ভেসে এলো। নয়ন বুঝলো ঝুম এখন পাক্কা পাকিস্তানি বউ। শাইয়ান প্রতিউত্তর করার আগে নয়ন অনুনয় করে বলল –
” প্লিজ, বেশি সময় নিবো না। শুধু কিছু কথা বলার ছিল। আপনি থাকতে পারেন চাইলে।”
” দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি ওনাকে একা কারো সাথে ছেড়ে যাবো না।”
নয়ন স্তব্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো। ভিতর থেকে কিছু একটা তাকে ক্রমাগত শেষ করে দিচ্ছে।
” তাহলে তো ভালই। আমাকে কিছু কথা বলতে দিন। তারপর আমি চলে যাবো।”
শাইয়ান ভালো করে দেখলো সামনে দাড়ানো জরাজীর্ণ দেহের পুরুষটিকে। হেরে যাওয়া মানুষটিকে দেখে মনে মনে বিদ্রুপ করে বলতে ইচ্ছে করলো, “বোকা পুরুষ। হীরে রেখে কয়লার কাছে গিয়ে ছিলি। ধন্যবাদ ওকে ছেড়ে যাওয়া জন্য।” কিন্তু বলল না। অতঃপর কিছু একটা ভেবে বলল –

” অনলি ১০ মিনিটস।”
” থ্যাঙ্ক ইয়ু।”
ঝুম ততক্ষনে উঠে বসেছে। লোকটা এতো সময় দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছে কে জানে। কিছু কিছু শুনতে পারলেও বুঝতে পারল না কে। তখনই দেখতে পেলো শাইয়ান দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুম তাকালো ভালো করে। নয়ন ঢুকলো ধীরে, দৃষ্টি তার বেডে বসে থাকা ঝুমের পানে। মেয়েটার রূপ বেড়েছে কি আগের থেকে? হ্যাঁ, আগের থেকেও এখন বেশি সুন্দর দেখতে লাগে ঝুমকে। চেহারায় সুখী সুখী ভাব স্পষ্ট। অতীতের জীবন থেকে যে হাজার গুণ ভালো আছে তা বুঝতে কষ্ট হলো না নয়নের। বুক ভর্তি বেদনা নিয়ে হাসলো সে।

” শরীর খারাপ তোর ঝুম?”
ঝুম এই সময়ে নয়নকে আশা করেনি। অবাক হয়েছে মেয়েটা। একপলক চোখ ঘুরিয়ে তাকালো শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান দ্রুত কদমে হেঁটে এসে ঝুমের পাশে বসে হাত চেপে ধরলো ওর। হয়তো নয়নকে বুঝাতে চাইছে ঝুমের ওপর একমাত্র অধিকার শুধু তার। নয়ন অবশ্য বুঝলোও, কষ্টও হচ্ছে তার খুব। কিন্তু আফসোস করা ছাড়া কি আর তার কিছু করার আছে?
” না, আমি ঠিক আছি। বসুন।”
পাশে রাখা পুরনো একটি চেয়ার টেনে বসলো নয়ন। ঝুমের দিকে তাকিয়ে বলল –
” ভালো আছিস তুই এখন? সুখে আছিস?”
ঝুম শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে শক্ত করে ধরলো শাইয়ানের হাতটি। শাইয়ানের চোখে চোখ রেখে মিষ্টি করে হেসে
বলল –

Remedy part 24

” আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহু রহমতে খুব ভালো আছি।”
নয়ন সেই হাসি দেখলো। চোখের কোণের পানি মুছে বিরস কন্ঠে বলল –
” আমার সাথে এমন কেন করলি ঝুম?”
ঝুম অবাক হলো। প্রশ্ন করলো –
” মানে? কি করেছি?”
” কিছু না জানিয়ে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেলি কেন? কি দোষ ছিল আমার? কেন ঠকালী?”

Remedy part 26