বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৫
রানী আমিনা
পিছু হটতে হটতে রেক্সা যখন লাইফট্রির সাথে ঠেকে গেলো তখন বিদ্ধ বুলেটের যন্ত্রণায় আর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো সে৷ একটু আগেও বুকে যে সাহস জমা ছিলো তা ক্ষয়ে গেলো মুহুর্তেই। তার সামনে এখন দাঁড়িয়ে গোটা চার অস্ত্রধারী লোক। শক্তিশালী বর্মে মোড়া তাদের শরীর, একজনের হাতে ধরা ধারালো অস্ত্র, অন্যদের হাতে রাইফেল।
শঙ্কিত চোখে সৈন্য গুলোর দিকে একবার দেখলো কোণঠাসা হয়ে পড়া রেক্সা। পালানোর কোনো পথ নেই আর! লোকগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে, তাদের ভারী বুটের শব্দ ভঙ্গ করছে রাতের নিস্তব্ধতা।
সৈন্যদের একজন সতর্ক চোখে সন্ধান করলো কোকোর, সে সত্যিই নিখোঁজ হলো, নাকি ঘাপটি মেরে আছে! ঘাপটি মেরেও বা তার লাভ কি হবে? একটা হাত নেই তার। এবার বাড়াবাড়ি করতে এলে অবশিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গও খোয়াতে হবে তাকে। চতুর্দিক দেখে নিয়ে সোলজার দের ভেতর একজন ধারালো অস্ত্র হাতে সৈন্যটির উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“হ্যারোল্ড, এই জানোয়ারটিকে কুপিয়ে শেষ করাই শ্রেয়। বুলেট দিয়ে ওকে কাবু করা যাবে না৷ শুধু শুধু বুলেট ক্ষয় হবে। গলার নিচের দিকে থেকে কোপাতে পারো, সেদিকের মাংস নরম, কাটবে সহজে। দ্রুতো করো, এসব চুকিয়ে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে হবে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রেক্সা অসহায়ের ন্যায় চতুর্দিকে দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষনাৎ। লোকগুলো তাকে ঘিরে ফেলেছে, তাদের খুনো নিঃশ্বাস যেন গলার কাছে এসে লাগছে। আক্রমণ আসন্ন। হ্যারোল্ড নামক লোকটা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে তার ছোরাটা আকাশের দিকে তুলে রেক্সার মাথায় আঘাত করতে নিলো। ঠিক সেই মুহুর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে হ্যারোল্ডের ছোরার ধারালো অংশ আটকে গেলো কারো রোবটিক হাতের বজ্র মুষ্টিতে, তা আর স্পর্শ করলোনা রেক্সার কটিন চামড়া।
আচমকা বাধায় স্তম্ভিত হ্যারোল্ড চমকে উঠে রোবটিক হাতটিকে অনুসরণ করে তাকালো হাতের মালিকের দিকে। মুহুর্তেই চোখে পড়লো কোকোর শীতল, হিংস্র, কুমিরিয়ান চোখ জোড়া।
তার মনোযোগ চ্যুতি হয়েই কোকো অন্য হাতে এক লহমায় ধরে ফেললো হ্যারোল্ডের অস্ত্র ধরা হাতখানার কবজি! বজ্রমুষ্ঠির তীব্র, অসহনীয় চাপে আচমকা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল হ্যারোল্ড, ছোরাটি তার হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল মাটিতে।
বাকিরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করা মাত্রই বন্দুক তাক করলো কোকোর দিকে, কোকো একহাতে হ্যাচকা টেনে হ্যারোল্ডকে মাটিতে ফেলে পরক্ষণেই কর্তৃত্ব নিয়ে উঠে দাঁড়ালো ওর ওপর। তারপর ধ্বংসাত্মক চোখে তাকালো বন্দুকধারীদের দিকে। কোকোর ভারী শরীরের নিষ্পেষণে ছটফট করতে লাগলো সে পায়ের তলায়।
রেক্সা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কোকোর দিকে। সে ভেবেছিলো কোকো বোধ হয় আর আসবে না, সে বোধ হয় ঢুকে গেছে লাইফট্রি ভেতর, লাইফট্রি বোধ হয় নিয়ে গেছে তাকে রেক্সার থেকে! কোকোকে এই ক্রান্তি লগ্নে নিজের সামনে সুস্থ সবল দেখতে পেয়ে রেক্সার যেন আনন্দের সীমা রপিলোনা। কোকো রেক্সাকে আগলে দাঁড়াতেই রেক্সা স্বস্তির শ্বাস ফেলে নিজের হিউম্যান ফর্মে এসে শরীর এলিয়ে দিলো লাইফট্রির গায়ের ওপর।
বন্দুকধারী গুলো নিরাপদ দুরত্ব সরে গিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে কোকো কে হুশিয়ারি দিলো, এখুনি হ্যারোল্ডকে ছেড়ে দিয়ে তাদের নিকট আত্মসমর্পণ না করলে তারা গুলি ছুড়তে বাধ্য হবে৷
হাসলো কোকো, নিজের পায়ের এক শক্তিশালী আঘাত হানলো সে হ্যারোল্ডের পিঠের ওপর, মুহুর্তেই দম আঁটকে ছটফট করতে শুরু করলো হ্যারোল্ড। কোকো নেমে এলো ওর ওপর থেকে। তার চোখের দৃষ্টি তখনো নিবদ্ধ রইলো বন্দুকধারীদের দিকে।
সে যতই এগোলো, বন্দুকধারী গুলো ততই পেছালো। আর দিয়ে চলল হুশিয়ারি। নিজের রোবোটিক হাত খানা উঁচিয়ে কোকো কয়েকবার নড়াচড়া করে দেখলো ঠিক ঠাক অনুভূত হচ্ছে কিনা। তার পরমুহূর্তেই ঝড়ো গতিতে ঘুরে গিয়ে বন্দুকধারীদের একটার কব্জিতে প্রচন্ড আঘাত হানতেই বন্দুকটা ছিটকে পড়লো মাটিতে।
প্রচন্ড যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে উঠলো সে, কব্জি খানা যেন আলাদা হয়ে আসার উপক্রম হলো তার! কব্জির সম্পুর্ন অনুভূতি হারিয়ে, অন্য হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হাতখানা আঁকড়ে ধরে সে পিছিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ।
কোকো মাটি হতে তুলে নিলো বন্দুকখানা। ওকে বন্দুক তুলতে দেখা মাত্রই ভড়কালো বাকিরা, বন্দুক তাক করা অবস্থাতেই ছুটে পিছু হটলো। কেউ একজন হঠাৎই ট্রিগার চেপে গুলি ছুড়লো কোকোর দিকে। তড়িতে বেঁকে গেলো কোকো, বুলেটটি তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল সাঁই করে।
কোকো ক্রোধে চিৎকার দিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে লোকটির কলার চেপে ধরে হ্যাচকা টানে শূন্যে তুলে সামনের মোটা গাছের গুঁড়ির ওপর ছুঁড়ে মারল। লোকটি আছড়ে পড়তেই হাঁড় ভাঙার শব্দ শোনা গেলো তার পিঠের নিকট থেকে। জ্ঞান হারিয়ে সে পড়ে রইলো সেখানেই।
বাকি দুজন কোকোর অমনোযোগীতার সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলো অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। কিন্তু কোকোর চোখ এড়াতে পারলো না। কোকো বুলেট দেখলো, দুটিই বাকি আছে। দূর হতেই বন্দুক তাক করলো সে তাদের দিকে, পরপর দুইটা শট।
ক্ষণিক পরেই সৈন্য দুটো হাটু গেড়ে বসে পড়লো জঙ্গলের মাটিতে, পিঠ বেয়ে অঝোরে রক্ত নামতে শুরু করলো তাদের। পরক্ষণেই মুখ থুবড়ে পড়লো সেখানে।
কোকো নিজের রোবোটিক হাত খানার উঁচিয়ে ধরে আরেকবার ঝাকালো, চেয়ে দেখলো হাত আর কাধের সংযোগ স্থলে। শরীরের শিরা উপশিরার সাথে ঠিক যেন প্রাকৃতিক ভাবে জুড়ে আছে রোবোটিক হাতটি। স্পর্শ সহ সবই অনুভব করছে সে। যেভাবে ইচ্ছা নড়াচড়া করতে পারছে রক্ত মাংসের হাতের মতোন। বেশ আশ্চর্য হলো কোকো, সন্তুষ্টির হাসি দেখা গেলো তার ঠোঁটের কোণে।
রেক্সা গুটিসুটি মেরে বসে ছিলো এক কোণে। শরীরে ক্ষত তার, বুলেট তেমন গভীর ক্ষত করতে পারেনি। কিন্তু যেটুকু করেছে তাতেই যথেষ্ট যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে তাকে।
কোকো পিছু ফিরে তাকালো। কাছে গিয়ে দুহাতে কোলে তুলে নিলো রেক্সার দুর্বল দেহকে। রেক্সা আলগোছে শরীর এলিয়ে দিলো কোকোর বুকের ওপর। আঘাতপ্রাপ্ত হাতখানা ঠেস দিলো কোকোর উদাম বক্ষে। কোকো ওকে নিয়ে মসভেইলের দিকে এগোতে এগোতে কপালে ঠোঁট ছুইয়ে নরম স্বরে বলে উঠলো,
“ভয় পেয়োনা, সব ঠিক আছে। আমি চলে এসেছি না? আর কেউ তোমার গায়ে একটা পালকও ছোয়াবে না।”
রেক্সা আলতো হেসে পরম নিশ্চিন্তে মাথা এলিয়ে দিলো কোকোর কাঁধে।
প্রাসাদের ইনভিজিবল লিফটের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে মীর, তার পাশে স্ট্যাচুর মতোন দাঁড়িয়ে লিও কাঞ্জি। মীর খুলে ফেলেছা তার গায়ের রক্তাক্ত শার্ট, সেটি অবহেলায় পড়ে আছে নিচে। হাতের কুড়ালটিতে থাকা রক্তগুলো বেশ যত্নসহকারে পরিষ্কার করতে ব্যাস্ত সে, যেন এই মুহুর্তে কুড়ালটিকে চকচকা ঝকঝকা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর একটিও নেই। লিও কাঞ্জি দুজনে আড়চোখে দেখে চলেছে মীরের কাজকর্ম।
মুখে তার এখন সিগারেট, সেটা অর্ধেক খানি শেষ হয়েছে। পূর্বে তার এ অভ্যাস ছিলো না। বহু পূর্বে যখন লিও কাঞ্জি তার বডিগার্ড হিসেবে নিযুক্ত ছিলো তখনও কোনো নেশাদ্রব্য মীরকে কখনো স্পর্শ করতে দেখেনি, জেনেছে আনাবিয়ার জন্মের পূর্বেও কখনো ছোয়নি।
নেশাদ্রব্য, বিশেষ করে নিকোটিন তার পূরুষালি সক্ষমতাকে হ্রাস করবে জেনে সে এসবের ধারে কাছেও যেতোনা। কিন্তু আনাবিয়া তার মস্তিষ্ক থেকে মুছে যাওয়ার পর এটা তার নতুন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লিও কাঞ্জি কখনো কিছু বলতে পারেনি, বাধা দিতে পারেনি, সাহস হয়নি।
হঠাৎ মীরের গমগমে আওয়াজে চমকে উঠলো দুজনেই,
“মেয়েটি আমাদের হয়ে কেন যুদ্ধ করছে? আমাদের সাথে তার কি সম্পর্ক?”
কাকে নির্দেশ করছে বুঝতে পারা মাত্রই ভড়কালো লিও কাঞ্জি। অপ্রস্তুত চোখে একে অপরের দিকে ঢোক গিললো ওরা। মীর কুড়ালের ধারালো অংশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। কোনো উত্তর না পেয়ে সে চোখ তুলে তাকালো দুজনের দিকে। তার শীতল চাহনির সম্মুখে স্বাভাবিক থাকা কষ্টকর হলো দুজনেরই। লিও শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
“আম-আমরা জানিনা, ইয়োর ম্যাজেস্টি। ত্-তাকে তো চিনিই না, জ্-জানবো কিভাবে?”
চোখ নামিয়ে রইলো ওরা, বুকের ভেতর ধুকধুক করতে শুরু করলো। মীর আরও কিছুক্ষণ সেভাবেই তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। হয়তো সরাতোনা নিজের দৃষ্টি, যদিনা লিফট তাদের গন্তব্যে না পৌছাতো।
লিফট কিছু পরেই ওপেন হবে ঠাহর করে মীর নিজের হাতের পাঞ্জায় গ্রিপ র্যাপ জড়াতে জড়াতে বলে উঠলো,
“রয়্যাল ফ্লোরে আমাদের জন্য ফাঁদ পাতা আছে, পা রাখা মাত্রই চতুর্দিক থেকে বুলেটের বৃষ্টি নামবে। সতর্ক থাকতে হবে। তোমাদের আর্মর বেশিক্ষণ সেইফটি দিবে না। তাদের সংগ্রহে কি ধরণের অ্যামো আছে সেটা আমরা জানিনা। তাদের বুলেট যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয় তবে আর্মরে প্রোটেকশন দিতে ব্যর্থ হবে। সেই ভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করে নাও৷”
“ইয়েস ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
সমস্বরে বলে উঠলো দুজনেই।
পরক্ষণেই শব্দ করে খুলে গেলো লিফটের দরজা। লিও কাঞ্জি প্রস্তুত হয়েই ছিলো। দরজা খুলতেই দুজনে উর্ধশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গিয়েই উপর্যুপরি ফায়ার করতে শুরু করলো৷ শত্রুপক্ষ প্রস্তুতই ছিলো, স্বয়ং ইযান তাদের নেতৃত্বে।
প্রায় জনা বিশেক দক্ষ বন্দুকধারী এবং ভারী বর্ম পরা বেশ কজন ধারালো অস্ত্রধারী প্রস্তুত তাদের ধরাশায়ী করতে।
দুই পক্ষের ভীষণ রকম গোলাগুলির শব্দে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠলো প্রাসাদ। ইযান সতর্ক চোখে দেখলো আরও কেউ লিফট থেকে বের হচ্ছে কিনা। কিন্তু কাউকে বের হতে না দেখে স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো সে। এই দুটোকে শেষ করা তো তার জন্য বা হাতের খেল৷ এত এত বুলেটের সামনে ওরা কোনোভাবেই টিকবে না। উচ্ছসিত চেহারায় এগোলো সে লিও কাঞ্জিদের দিকে।
লিও কাঞ্জির হাতে ধরা রাইফেল দুটো থেকে ঝড়ের বেগে বুলেট ছুটতে রইলো। কিন্তু শত্রুপক্ষ লুকিয়ে থাকায় তাদের সঠিক অবস্থান জানা তাদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠলো। লুকিয়ে থাকা কাউকেই চিহ্নিত করতে না পেরে অগত্যা দৃষ্টি সাইমার মধ্যে যাকেই দেখলো তাকে উদ্দেশ্য করেই উপর্যুপরি গুলি ছুড়তে শুরু করলো।
মীর সিগারেটটা সময় নিয়ে শেষ করলো। পেছনের অংশটুকু নিচে ফেলে পায়ে পিষে, লিফটের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা কুড়ালটি সুকৌশলে হাতে উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে।
উচ্ছসিত ইযান নৃশংস হেসে বন্দুকধারী দের নির্দেশনা দিয়ে চলেছিলো লিও কাঞ্জিদেরকে ভূপতিত করতে। কিন্তু লিফট হতে মীরকে দুহাতে দুই ধারালো অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা মাত্রই হাসি মুখ থেকে সমস্ত রঙ উড়ে গিয়ে ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করলো তার।
ক্ষণিক পরেই তার ফ্যাকাসে মুখে দেখা দিলো ভয়, ঠিক যখন মীর এগিয়ে এসে নির্বিকার মুখে নিজের শক্তিশালী হাতে ধরা কুড়ালটি একের পর এক বিধে দিতে রইলো কারো মাথায়, কারো বুকে, কারো গলায়, কারো মুখের মধ্যিখানে— ছিটকে যখন বেরিয়ে আসতে রইলো তার সহযোদ্ধা দের কুচো হাড়!
ইযান অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে শ্বাস টানলো জোরে, সে যা ভেবেছিলো তার থেকেও যে শেহজাদা কয়েক গুণ বেশি ভয়ানক হবেন সেটা তার জানা ছিলোনা। সবচেয়ে বেশি অবাক হলো যখন দেখলো একটি বুলেটও তার শরীর স্পর্শ করার ফুরসত টুকু পাচ্ছে না, তার আগেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
ইযান দ্রুতই ব্যাবস্থা নিলো, অরোরাদের আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠানোর পর রয়্যাল জ্যু নামক কামরাটা খালি হয়ে গেছিলো, সেখানে কিছু উচ্ছিষ্ট অস্ত্র জমা করে রেখেছিলো সে। চিৎকার করে নিজেদের সহযোদ্ধা দের উদ্দ্যেশ্যে বলল বুলেট ছেড়ে সেখান থেকে অস্ত্র নিয়ে আসতে।
ইযানের আদেশ পেয়ে বন্দুকধারী দের একাংশ ছুটলো সেদিকে, ক্ষণিক পরেই বেরিয়ে এলো হাতে ধারালো রড আর বর্শা নিয়ে। তারা সরাসরি ধেয়ে এলো মীরকে লক্ষ্য করে।
মীরের কোনো ভাবান্তর হলো না তাতে, মুখের নির্লিপ্ত ভঙ্গিমার এতটুকুও পরিবর্তন হলোনা তার। এগোতেই রইলো সে সামনের দিকে। রড এবং বর্শা হাতে ছুটে আসা সৈন্যরা সেগুলো দিয়ে তার শরীরে আঘাত করার ঠিক আগ মুহুর্তে নিজের দুহাত বাড়িয়ে ঝটকা দিলো মীর, মুহুর্তেই হাতের কব্জিতে থাকা কালো রঙা বাঘের চিত্র দুটি স্বর্ণাভ আলোয় আলোকিত হয়ে, তড়িতে পীচ ব্লাক আর্মরে মুড়িয়ে দিলো তার সমস্ত শরীর!
সেই মুহুর্তেই বর্শা আর রড গুলো সজোরে এসে ধাক্কা খেলো মীরের বক্ষে, বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তৎক্ষনাৎ সেগুলোর পেছনের অংশ বিধে গেলো শত্রুপক্ষের দুজনের পেটে, বাকি গুলো এঁকেবেঁকে ছিটকে চলে গেলো অন্যদিকে।
মীর নিজের হাতের ভেতরেই দক্ষতার সাথে ঘোরালো কুড়ালটি, পরমুহূর্তেই সজোরে একের পর এক কোপ দিলো সে সৈন্যগুলোর শরীরে। পালিয়ে বাঁচার সুযোগটুকুও পেলোনা তারা।
ইযান পিছিয়ে গেলো নিজের জায়গা থেকে, সামনে ঠেলে ঠেলে পাঠিয়ে দিতে রইলো অন্যদের। ইয়ার পিসে যোগাযোগ করলো নিজের গোপন বাহিনীর সাথে। দ্রুতই সাইলেন্সর রাইফেল গুলো নিয়ে রেডি হতে বলল তাদের। অ্যামো তে যেন কোনো কমতি না হয় সেটাও মনে করিয়ে দিলো বারংবার।
বারান্দায় থাকা সৈন্য গুলোর ক্রমাগত বুলেটের আক্রমণে সামনে এগোতে অপারগ হচ্ছিলো লিও কাঞ্জি। কাঞ্জির কোমরের নিকট সামান্য জখম হয়েছে, একটি বুলেট বেকায়দা ভাবে ঢুকে গেছে। লিও ওকে কভার দিয়ে এগিয়ে আসছে সামনের দিকে। এদিকটা সম্পুর্ন ক্লিয়ার, হিজ ম্যাজেস্টি সব ক্লিয়ার করে দিয়ে এগিয়ে গেছেন সামনে। ওরা এখন শুধুই পেছন থেকে আসা আক্রমণ গুলো ঠেকাবে।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ পিছনের দিক হতে লুকিয়ে থাকা একজন স্নাইপার লিওকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল।
পর পর বিকট শব্দে চমকে উঠলো কাঞ্জি। পেছনে ফিরে স্নাইপারকে কাঁচের জানালার ওপাশে দেখতে পাওয়া মাত্রই ট্রিগার চেপে তাকে শেষ করে দিলো সে৷
আর কেউ লুকিয়ে আছে কিনা সেটা পরখ করে সামনে ফিরে তাকানো মাত্রই দেখতে পেলো লিও হাটু গেড়ে বসে পড়েছে মাটিতে, ডান কাঁধের ওপর থেকে স্রোতের বেগে রক্ত বেরিয়ে আসছে তার।
কাঞ্জি ছুটে এসে ধরলো লিওকে, আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“ভাই, তোর যে গুলি লাগছে! ভাই কথা বল ভাই। গুলি অনেক গভীরে পৌছেছে? হাত নাড়াতে পারবি? যন্ত্রণা হচ্ছে অনেক?”
কিন্তু লিও কথা বলল না কোনো, হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো সে। চোখের সামনে আঁধার নেমে এসেছে তার। অসহায়ের মতো চারদিকে তাকিয়ে আলো দেখার চেষ্টা করলো সে, কিন্তু চোখের সামনে শুধুই আঁধার।
কাঞ্জি কি করবে বুঝতে পারলোনা, হিজ ম্যাজেস্টি আগেই এগিয়ে গেছেন। কাঞ্জি চতুর্দিকে তাকালো শত্রুপক্ষের আরও কেউ লুকিয়ে আছে কিনা দেখতে। কাউকে দেখতে না পেয়ে সে লিওকে বলল,
“তোর সামনে যেতে হবে না, তুই এখানেই বস। এদিকে কেউ আছে বলে মনে হয়না, আমি কাজ শেষ করেই ফিরে আসছি। একা থাকতে পারবিনা?”
লিও উপর নিচে মাথা নাড়ালো, সজ্ঞানে নাকি অজ্ঞানে সেটা বুঝলোনা কাঞ্জি। তবুও চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে সে ছুটে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।
কিছুদূর এগিয়ে যেতেই পেছন দিক থেকে ভেসে এলো পর পর কয়েকটি বুলেটের বিকট শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো কাঞ্জি, হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করে উঠলো তার। গলায় উঠে আসা একটা শুকনো ঢোক গিলে প্রচন্ড শঙ্কা, সর্বনাশের ভয় নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো একদিকে হেলে পড়েছে লিও, বুকের নিকট ভিজে গেছে রক্তে, ক্রমে লাল হয়ে উঠছে তার সাদা পোশাক!
মীর সামনের দিকেই ছিলো, দুই দুইবার এত গুলো বুলেটের শব্দে সে শত্রুপক্ষের দিকে একটা স্মোক গ্রেনেড ছুড়ে দিয়ে ছুটে পিছিয়ে এলো এদিকে। কাঞ্জিকে নিঃসাড় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সামনে তাকাতেই লিওর রক্তাক্ত দেহ চোখে পড়লো তার।
মুহুর্তেই কপাল সোজা হয়ে এলো তার, চোয়াল জোড়া শক্ত হয়ে এলো। লিওর নিথর দেহের দিকে চোখ রেখে কাঞ্জিকে উদ্দ্যেশ্য করে শীতল, ভারী গলায় বলে উঠলো,
“ওকে নিয়ে এখুনি এখান থেকে বেরিয়ে যাও, প্রাসাদের মেডিক্যাল জোনে নিয়ে যাবে। তোমাদেরকে তারা ভালোভাবেই চিনে, কোনো অসুবিধা হবে না আশা করি। অসুবিধা বুঝলে সাথে সাথেই আমাকে জানাবে৷”
স্তম্ভিত কাঞ্জি মীরের কথায় হুশে এলো যেন। ফুপিয়ে কেঁদে উঠে তড়িতে ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত লিওকে টেনেটুনে কাঁধের ওপর তুলে নিলো সে, পরক্ষণেই ছুটলো প্রাসাদের মেডিক্যাল জোনের উদ্দ্যেশ্যে।
সেদিকে চেয়ে শক্ত হয়ে এলো মীরের চোয়াল। হঠাৎই কুচকুচে কালো বর্ণ ধারণ করলো তার স্বর্ণাভ চোখ জোড়া। সেখানে দাঁড়িয়েই নিজের ডান দিকে দৃষ্টি দিলো মীর। কামরার দেয়ালের ভেতরের এক সুক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বন্দুক তাক করে আছে কেউ।
দেয়ালের ওপার হতেই মীরকে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাতে দেখে ভড়কালো স্ক্রিণে চোখ লাগিয়ে রাখা স্নাইপারটি৷ বন্দুকটি সন্তর্পণে হাত থেকে রেখে পিছিয়ে যেতে চাইলো সে।
কিন্তু সেই মুহুর্তেই বিকট শব্দে দেয়াল ফুড়ে এগিয়ে এলো মীরের সাঁড়াশির ন্যায় বজ্রমুষ্ঠি, খপ করে চেপে ধরলো স্নাইপারের গলা। শ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁস শুরু করলো সে। পরমুহূর্তেই এক ভীষণ চাপে গলে গেলো লোকটির গলা, ধড় থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে একে একে ধুপ ধাপ করে পড়লো মেঝেতে। কালো রক্তে মাখামাখি হয়ে গেলো মীরের হাত।
রক্তের দিকে ঘৃণ্য দৃষ্টি দিয়ে এক ঝটকায় হাত থেকে তরল টুকু হতে নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে মীর এবার ক্রোধে উন্মত্ত বাঘের মতোন এগোলো সামনের দিকে।
টিয়ার গ্যাস যুক্ত স্মোক গ্রেনেডটির কালো ধোঁয়া ততক্ষণে হালকা হয়ে এসেছে, ক্ষণিকের অন্ধত্ব কাটিয়ে ওঠা শত্রুপক্ষের সেনারা চোখ খুলে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে দেখতে পেলো ওই কালো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে সামনে হেটে আসছে একটি মাত্র অবয়ব— দীর্ঘ, বলিষ্ঠ, ক্রোধে উন্মাদ!
নিজেদেরকে সামলে নিয়ে তারা মীরের দিকে বন্দুক তাক করা মাত্রই মীরের হাতের তালওয়ারের বজ্র আঘাতে মুহুর্তেই দুটুকরোয় পরিণত হলো রাইফেল গুলোর কয়েকটি। হতচকিত হয়ে নিজেদের দ্বিখণ্ডিত রাইফেলের দিকে চেয়ে তারা হতভম্ব হয়ে দেখল তাদের হাতে থাকা অস্ত্রের আর কোনো মূল্যই নেই।
মীর এবার বের করলো তার কুড়ালটি, আর তারপর কাউকে দম পর্যন্ত ফেলতে দিলোনা সে। তার বুলেট প্রুফ আর্মরে বুলেট লেগে সশব্দে পড়তে রইলো মার্বেল পাথরের মেঝেতে। ট্রিগার চাপতে চাপতে ক্রমেই পিছু হটতে শুরু করলো সৈন্যগুলো।
আর মীর নির্বিকার চিত্তে কুড়ালের আঘাত করতে করতে এগিয়ে চলল তাদের দিকে। বাম হাতের বাহুর নিচে দুটো বুলেট ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে তার। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় হলোনা মীরের। যে সৈন্যেরই অ্যামো শেষ হলো তারই মস্তক বিচ্ছিন্ন হলো মুহুর্তেই, দ্বিতীয় বার রিলোড করার সময়, সুযোগ কোনোটাই হলোনা তাদের!
আচমকা কোপানো থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো মীর। সৈন্য গুলো ওর হঠাৎ ইস্তফায় যারপরনাই অবাক হয়ে কি করবে বুঝতে পারলোনা। ঠিক সেই মুহুর্তেই হাতের কুড়ালটি ঘুরিয়ে মীর ছুড়ে মারলো উপরের দিকে। তৎক্ষনাৎ কুড়ালের আঘাতে বারান্দার সিলিংয়ের অবশিষ্ট ঝাড়বাতি গুলো ভেঙে গুড়িয়ে গেলো, অবিলম্বে রয়্যাল ফ্লোর নিমজ্জিত হলো ঘোর অন্ধকারে। শুধুমাত্র একটি ছোট্ট বাতি কিছুক্ষণ পর পর হঠাৎ হঠাৎ জ্বলে উঠতে রইলো।
ইযান সহ অবশিষ্ট জনা পাঁচেক বন্দুকধারী তখন হতভম্ব। তারা ভয়ে আতঙ্কে অন্ধকারে ভেতর চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিয়ে একে অপরের উপর ভুল করে গুলি চালাতে শুরু করল।
মীর ক্রুর হাসলো। অন্ধকারেই তার শিকার জমবে ভালো। বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে, বারান্দার রেলিঙে ঠেস দিয়ে কিছুক্ষণ চিৎকার চেচামেচি করতে দেখলো সে ওদেরকে। আর তারপরেই দক্ষ কৌশলে হাতের ভেতর কুড়াল ঘুরিয়ে এগিয়ে গেলো হট্টগোলের ভেতর।
প্রাসাদের দেয়ালে টানানো রাজকীয় ঘড়িটির সেকেন্ডের কাটাটি বার দশেক এগোলো বোধ হয়, তার ভেতরেই অনবরত তাজা মাংসে কুড়ালের ঘচাং ঘচাং আঘাতের শব্দ ভেসে এলো সৈন্যদের দিক হতে৷ শুনতে পাওয়া গেলো রক্তের ছলকানির শব্দ, আর্তনাদের চাপা শব্দ, আর হঠাৎ কারো ছুটে পালিয়ে যাওয়ার শব্দ। মীর ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলো সেদিকে। ছোট্ট বাতিটা সেই মুহুর্তেই জ্বলে উঠলো একবার।
চারদিকে ছিন্নভিন্ন লাশের স্তুপ। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মীর, একা। তার কুড়ালের ডগা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে রক্ত।
মীর এখনো নিরাপদ আছে জানতে পারা মাত্রই আনাবিয়া গোপন জায়গা হতে ছুটলো প্রাসাদের মেডিক্যাল জোনে। সেখানে ঢুকতেই চোখে পড়লো অপারেশন বেডে শুয়ে লিও। তার বুক আর কাঁধ হতে মাত্রই বের করা হয়েছে বুলেট গুলো। কাঞ্জি দাঁড়িয়ে আছে পাশেই। ডাক্তার তাকে বারবার ওটি থেকে বাইরে যেতে বলা সত্ত্বেও সে যায়নি, কাউকে সে ভরসা করে না। তাই নিজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে অপারেশন।
হঠাৎ দরজায় আনাবিয়াকে দেখতে পাওয়া মাত্রই কাঞ্জির এতক্ষণের শক্তপোক্ত খোলস ভেঙে গুড়িয়ে গেলো যেন। ভেঙেচুরে কেঁদে উঠে সে ছুটে গেলো আনাবিয়ার কাছে, আনাবিয়ার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে ফুপিয়ে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, লিও কোনো কথা বলছেনা, ওরকোনো হুশ নেই! অনেক রক্ত ঝরেছে, রক্ত দিতে হবে কিন্তু এখন রক্ত কই পাবো আমি? ওকে তো ওর গোত্রের কেউ ছাড়া রক্ত দিতে পারবে না, এখন আমি কি করবো?”
আনাবিয়া কাঞ্জিকে দুহাতে উঠিয়ে দাঁড় করালো। কাঞ্জি ছোট্ট বাচ্চাটির ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করতে করতে এগোলো আনাবিয়ার পেছন পেছন। মেডিক্যাল জোনের ডাক্তার এবং স্টাফরা, আনাবিয়াকে দেখা মাত্রই সংযত হলো। মাথা নুইয়ে সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়িয়ে রইলো। আনাবিয়া গিয়েই ডক্তারকে জিজ্ঞেস করলো,
“ওর রাইট নাও সিচুয়েশন বলুন।”
“শেহজাদী, বুলেট গুলো সব বের করা হয়েছে, ইনফেকশন যেন না ছড়ায় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু ছেলেটার প্রচুর ব্লাড লস হয়েছে। যেহেতু তার ব্লাড গ্রুপ অন্যরকম, তাই আমাদের ব্লাড ব্যাংকের কোনো ব্লাড তার শরীরে স্যুট করবে না, হিতে বিপরীত হবে। এখন আমরা কি করবো আদেশ করুন!”
আনুগত্যের সাথে উত্তর করলো কর্তব্যরত ডাক্তারটি। আনাবিয়া ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে কাঞ্জির দিকে একবার তাকিয়ে পরক্ষণেই ডাক্তারের দিকে ফিরে কাঞ্জিকে দেখিয়ে বলল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৪
“এর কোমরে একটা বুলেট বিধেছে, ক্ষত বেশি গভীর নয়। দ্রুতই সেটা বের করার ব্যাবস্থা করুন। আমি আসছি।”
বলে কাঞ্জিকে সেখানেই রেখে লিওকে নিজের কাঁধের ওপর তুলে মেডিক্যাল জোন থেকে বেরিয়ে উধাও হয়ে গেলো আনাবিয়া।
