প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪০
সাইয়্যারা খান
পৌষের প্রশ্নের উত্তর বরাবরের মতোই এড়িয়ে গেলো তৌসিফ। শাসন করার ভঙ্গিতে বললো,
“তোমাকে রাতে এই জানালা খুলতে বারংবার নিষেধ করি আমি।”
“নিষেধ কেন শুনব আমি?”
বলেই তৌসিফের হাতটা সরিয়ে দিলো নিজের থেকে। প্রত্যাখান দেখলো তৌসিফ। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। তীক্ষ্ণ বাজপাখির ন্যায় চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো। তাকেও কেউ এভাবে প্রত্যাখান করতে পারে তা যেন ভাবনার বাইরে ছিলো। পৌষ বিয়ের এতগুলো মাসে কখনো তাকে এভাবে সরিয়ে দেয় নি। কখনোই না৷ মন থেকে হোক বা না হোক, পৌষ তাকে মেনে নিয়েছে। মেনে নেয়াটা যতটুকুন সুখ তৌসিফকে দিয়েছে তার চাইতে কয়েকগুণ বেশি আঘাত যেন আজকের মূহুর্তটা তাকে দিলো। কেন দিলো? তৌসিফের অন্তরস্থ সত্তা উত্তরে বললো, “তখন ভালোবাসা ছিলো না, এখন আছে। ভালোবাসার প্রত্যাখ্যান এমনই হয়। ভীষণ তিতকুটে স্বাদের।”
তৌসিফ তা হজম করলো নিঃশব্দে। পৌষের ডান হাত ধরে শক্ত চোয়ালেই বললো,
“শুনতে তুমি বাধ্য পৌষরাত।”
“আপনার বউ বলে?”
“অস্বীকার করার তো সুযোগ নেই।”
“করছিও না তবে আপনার বা আপনাদের এসব কালো অধ্যায় খুব ভালো কিছু বয়ে আনবে বলেও মনে হচ্ছে না।”
তৌসিফ কথা কানেই তুললো না৷ পৌষের হাত ধরে খুব যত্নে আনলো বিছানা পর্যন্ত। বিছানায় বসিয়ে প্লাজু তুলে পা দেখলো কিছুক্ষণ। সাদা গজ কাপড়ের উপর আঙুল বুলিয়ে দিতে গিয়ে সূক্ষ্ম এক ব্যথা যেন সে নিজে অনুভব করলো। তৌসিফ নিজের উপর নিজেই ইদানীং কালে অবাক হচ্ছে। এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না কিন্তু হচ্ছে। একবার না বরং বারবার হচ্ছে। পৌষ নামক এই খুব সাধারণ মেয়েটার কাছে সে হেরে যাচ্ছে। অথচ ভেঙে গিয়ে তৌসিফ নিজেকে খুব শক্ত করে গড়েছিলো। এখন শক্ত এই তৌসিফকে যে পৌষ এভাবে নরম করে ফেলবে নিজের প্রতি তা কোনদিন ভাবে নি তৌসিফ। দিনকেদিন ও যেন মাত্রারিক্ত নরম হচ্ছে পৌষের প্রতি নাহয় আজ এই মূহুর্তে তৌসিফের হাতের দুটো চড় পৌষ খেতো শুধুমাত্র কথা না শোনার জন্য।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পৌষের পা থেকে হাত সরাতে গিয়েই টের পেলো পা দুটো ভীষণ শুষ্ক ওর। তৌসিফ হাত বুলিয়ে বললো,
“নিজের একটু যত্ন নিলেও তো পারো পৌষরাত। হাত পায়ের কি অবস্থা? শীত আসছে, কেমন শুষ্কতা ত্বকে।”
“সরিষার তেল লাগিয়ে নিব নে ঠান্ডা বাড়লে।”
“সরিষার তেল?”
তৌসিফ সামান্য অবাক হয়ে প্রশ্নটা করেও বোকা বনে গেলো। পৌষ মুখ ঝামটা দিয়ে বললো,
“অত আলগা পিরিত আমার নেই বুঝেছেন। সরুন।”
তৌসিফ সরলো না৷ উঠে গেলো কিছুক্ষণ পর। লোশন এনে যত্ন করে দুই হাত, পায়ে মেখে দিতে দিতে বললো,
“তুমি দেখে বেঁচে যাচ্ছো হানি। বারবার বেঁচে যাচ্ছো। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এভাবে বাঁচতো না।”
“আমার জায়গায় অন্য আর কাকে চাইছেন? আছে নাকি কেউ?”
তৌসিফের কপালে ভাজ পড়লো। ডান হাতের আঙুল দুটো দিয়ে টোকা দিলো পৌষের নাকে। পৌষ সরু চোখে তাকালো। তৌসিফের মুখটা ভালোমতো দেখে বললো,
“আমাকে নিয়ে আফসোস হয় আপনার? শুধু মাত্র এতিম আর ফুপির মেয়ে বলে মেনে নিয়েছেন তাই না? অন্য কেউ হলে এভাবে অন্তত আগলে রাখতেন না। না কারো মুখের কথায় বদনাম হবে বলে আমাকে বিয়ে করতেন।”
“বদনাম হওয়ার ভয় তো আমি কোন কালেই পাই নি পৌষরাত।”
“না জানি কোন কালে কোন আকাম করে রেখেছেন আপনি৷”
“আকাজ আমি কোনকালেই করি নি হানি। আর রইলো ব্যাপারটা তোমাকে ঘিরে তার উত্তর তো আমি নিজেও পাই না। কতটাই না অলিখিত ছিলো সেই সময় যখন তোমার প্রেমে পড়লাম আমি। নিজের অজান্তেই সবটা হয়েছে হানি। দেখো আমাকে, ঠিক কতটা অবনতি আমার। আমি সেই ভালোবাসা প্রকাশ করে বেড়াচ্ছি অথচ তুমি ফিরতি আমাকে শূণ্যতা বৈ কিছুই দিচ্ছ না। আমি কতটাই না মূল্যহীন তোমার কাছে যে আমার কথার বিপরীতে যেতেও তুমি দুবার ভাবো না।”
তৌসিফ যথাসম্ভব পুণরায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ফেললো অথচ এটা তার স্বভাব, জাত থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। কথার মারপ্যাঁচে আবারও পৌষকে এসব থেকে দূরে থাকতে বললো অথচ পৌষের মাঝে আবেগ অনুভূতির ছিটেফোঁটারও দেখা মিললো না বরং খুব সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার আজ এতবার হানি হানি ডাকছেন কেন? মতলব তো সুবিধার না আপনার। আচ্ছা আপনি কি জানেন, আমার মধু ঠিক কতটা অপছন্দ? আমার জন্মের পর মুখেও নাকি মধু দেয় নি কেউ। একথা সেঝ চাচি বলে। তাহলে বুঝুন কতটা অপছন্দের নামে আমাকে ডাকেন আপনি?”
তৌসিফ অপলক তাকিয়ে রইলো। কিছুসময় পর সামান্য মুচকি হেসে বেশ আদুরে স্বরে বললো,
“অপছন্দ তো তুমি আমাকেও করো পৌষরাত কিন্তু তাতে কি, আমরা কি আলাদা হয়ে গিয়েছি? তুমি তো তোমার এই অপছন্দের কাছেই থাকো। তার বুকের মাঝে প্রায়সময় ঘুমিয়ে যাও। তাকে যত্ন করে রেঁধে খাওয়াও। তার কাপড় গুলো নিজ হাতে ধুয়ে যাও। এতটা দখলদারিত্ব করেও অভিযোগ তুলছো?”
পৌষের সেই হেয়ালি স্বর বদলালো। কিছুটা আনমনা হয়েই শুধালো,
“আপনি আমার অপছন্দের নন।”
খুব হালকা স্বরে বলা কথাটাও তৌসিফ শুনে নিলো। পলকহীন তাকিয়ে রইলো পৌষের দিকে। আজ আরেকবার ভালোবাসার ভিখারি হলো তৌসিফ। পৌষের চিকন হাত দুটো নিজের হাতের মাঝে বন্দী করে আবদার জুড়ে দিলো,
“আমাকে ভালোবাসবে পৌষরাত?”
“হুঁ?”
“ভালোবাসবে আমাকে?”
“চাইলেও পারছি না। তবে আপনি চাইলে আমি মুখে বলতে পারি যে আপনাকে ভালোবাসি। এতে হয়তো আপনি একটু স্বস্তি পাবেন।”
তৌসিফের মুখের রঙ সামান্য বদলালো। সেই আবদার মাখা মুখের উজ্জ্বলতা ধপ করে নিভে গেলো। কিছুটা নম্রতা এসে ভর করলো সেই সুন্দর মুখটায়। পৌষের হাতদুটো নিজের গালে লাগিয়ে তৌসিফ আস্তে করে বললো,
“ভীষণ লোভী হয়ে যাচ্ছি পৌষরাত আজকাল। আমাকেও মানুষ স্বান্তনা দিতে চায়।”
পৌষ কথা বলে না। উঠে গিয়ে চিরুনী আনে তৌসিফ। পৌষ নিজের চুলের খোঁপায় হাত দিয়ে বলে,
“আমিই পারব। দিন।”
“যেহেতু আগে আমার মনে পরেছে তাই আমিই করব।”
তৌসিফ এই কাজগুলো জোর খাটিয়ে করে। পৌষ রাজি না হলেও করে। এই মেয়েটা এমন হলো কেন? তার ভেতরের মায়া নামক অনুভূতিবোধ কি শুধু মাত্র ভাই-বোনদের জন্য? আর কারো জন্য না? কথাটা ভাবতে গিয়েই তৌসিফ হিংসুক হয়ে উঠলো। মনটা চিড়বিড় করতে করতে বললো, ‘আছে তো। এক নর্দমা সমান আবেগ আছে এই মেয়ের সম্রাট ভাইজানের প্রতি।’
রাতটা তখনও গভীর। চারপাশে শীতল হওয়া। শীত শীত অনুভূতি হয় সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত। নিশুতি রাত হওয়াতে কুয়াশায় ঘিরে গিয়েছে চারপাশ। নিঃস্তব্ধতায় ঘেরা এই সময়টায় শব্দ হলো ঠাস করে। গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে একটা লাস্যময়ী নারী। চড়টা দিয়েছে তাহমিনা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তাহমিনা মেয়েটার চুল চেপে ধরে আচমকা। মৃদু আর্তনাদ করে উঠে সে। হিসহিসিয়ে তাহমিনা বলে,
“কত টাকা? বল কত টাকা দিয়ে আনিয়েছি তোকে? নিজের এই রূপ দিয়ে যদি পুরুষ হাত করতে না পারিস তাহলে কোন কাজের এই চেহারা?”
“আ..আপা। আপা ব্যথা পাচ্ছি। ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন দয়া করে।”
করুণ শোনালো মেয়েটার কণ্ঠস্বর। তাহমিনা চুল ছেড়ে ওর গলা চেপে ধরে। ঠেসে ধরে বড় আম গাছটার সাথে। মেয়েটা ভীষণ ব্যথা পেলো পিঠে। কুঁকড়ে উঠলো সাথে সাথে। তাহমিনা আকুতি শুনলো না। তার আকুতি যখন কেউ শুনে না তখন তাহমিনাও শুনবে না কারোটা। গলার চাপ বাড়িয়ে আফসোসের স্বরে তাহমিনা বললো,
“রূপের জাল যেহেতু বিছাতেই পারলি না তাহলে রূপ ধুয়ে নিশ্চিত পানি খাবি না৷ আমি তালুকদার বাড়ীর মেয়ে। মনটা ভীষণ বড়। তোর এই অকেজো রূপ কাজে লাগিয়ে দেই চল। অন্তত আমার মাছগুলোর পেট ভরুক।”
বলতে বলতে তাহমিনা ওকে টেনে নিলো লাগলো মাগুর মাছের পুকুরের দিকে। নারীটি নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। তাহমিনার শরীরে যেন অসুরে শক্তি ভর করেছে। মেয়েটিকে টেনে নিয়েছে পুকুরের কাছে। চুলের মুঠি ধরে ধাক্কা দিয়ে ঘাটে বসিয়ে নিজেও বসে পরে সে। ভয়ে, আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে নারীকণ্ঠ। তাহমিনা তাতে ভ্রুক্ষেপহীন। ও মেয়েটার মুখ ধীরে ধীরে আগায় ঐ কালো পানিতে। চাঁদের সামান্য কালো পানিটার বুকে অদ্ভুত ভাবে মিশেছে। তাহমিনা যখন নারীটির মুখ পানিতে ডুবালো তখনই মাছের আনাগোনা বেড়ে গেলো পাড়ে। তারা ঠিক বুঝে যায় কোনটা মানুষের শরীর।
হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করতেই তাহমিনা ওকে শক্ত করে ধরে। ঠিক সেই মূহুর্তে টর্চ লাইটের আলো আসে ওদের দু’জনের উপর। চোখে হঠাৎ আলো পরায় তাহমিনা চোখ বুজে। একাধারে কিছু পায়ের শব্দ শোনা গেলো তখন। রনি এসে টেনে সরালো মেয়েটাকে। ইতিমধ্যে তার গালের কিছু গোস্তো হয়তো মাছের আহারে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানহারা নারীটিকে নিজের কোলে তুলে নিতেই গমগমে স্বরে আদেশ করে কেউ,
“টনি, আপাকে তোল। নিশ্চিত হাঁটুর ব্যথা বেড়েছে।”
একসাথে দুই ভাইকে দেখে তাহমিনা জমে গেলো সেখানে। টনি আগায় না। তাহমিনাকে ধরার সাহস তার নেই। বড় বড় কদম ফেলে তৌসিফ এগিয়ে আসে। হাঁটু গেড়ে বসে তাহমিনার শিয়রে। খুব শীতল অথচ দৃঢ় গলায় বলে,
“যা খুশি করুন কিন্তু বাগান বাড়ীর ভেতরে। আমার বউয়ের চোখে যদি আর একবার কিছু পরে আপা। কসম করে বলসি ধ্বংস করে দিব সব।”
তাহমিনা চুপ করে যায়। তার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে যেন। তৌসিফ উঠে দাঁড়ায়। রনিকে আদেশের স্বরে বলে,
“ওকে ডাক্তার দেখা।”
রনি সেখান থেকে প্রস্থান নিতেই তৌসিফ আচমকা তাহমিনাকে ধরে দাঁড় করালো। তাহমিনা ওকে ধরে দাঁড়ায়। আস্তে করে তৌসিফের বুকে হাত রাখে। তৌসিফ দাঁড়িয়ে রয় ঠাই। শুধু মাত্র পৌষ ছাড়া কারো সামনেই সে নরম নয়। তাহমিনা নিজের মাথা রাখে তৌসিফের বুকে। এভাবে কিছুক্ষণ থেকেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। এমন একটা শীতল রাতে, এই নিঃস্তব্ধত খোলা জায়গায় ভৌতিক শোনালো সেই মাঝবয়সী নারীর কান্না। কাঁদতে কাঁদতে তৌসিফকে আঁকড়ে ধরে বারবার বলতে লাগলো,
“আমার ভাইজান কি সুস্থ হবে না? সে কি কখনোই সুস্থ হবে না? অ্যই তৌসিফ, তুই ডাক্তার দেখা না ভাইজানকে। কিছু কর না ভাই। আমাকে বাঁচতে দে। আমি মরে যাব তৌসিফ। কিছু কর। আমার ভাইজানকে বাঁচিয়ে দে।”
তৌসিফ যেন লৌহ মানব। সে নড়লো না একপাও। তুরাগ এগিয়ে আসে। টনিকে ইশারায় যেতে বলে সেখান থেকে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৩৯
“বাড়ীতে চল।”
দূর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝাপসা ঝাপসা দেখলো পৌষরাত। সে ঘুমায় নি৷ তৌসিফ তাকে ঘুম পাড়িয়েই গিয়েছে। নিজের পায়ের অসহ্য ব্যথা ভুলে পৌষ এই বন্ধ ঘরের বারান্দায় এসেছে। এখান থেকে বাড়ীর পেছনটা ভালোই দেখা যায়।
