Remedy part 31
মীরা রায়াদ
আহির দীর্ঘ ৩০ মিনিট ধরে জিন্নাহ্ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা নেই। গরমে আহিরের নাজেহাল অবস্থা। ফর্সা মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। বিরক্তিতে মুখ থেকে চ মূলক শব্দ বেরিয়ে এলো। ঠিক তখনই পকেটে থাকা তার মহামূল্যবান ফোনটি আপন গতিতে বেজে উঠলো। ফোনটা ধরতে একদম ইচ্ছা করলো না আহিরের। এই গরমে তার সব কিছু অসহ্য লাগছে। তবুও ফোন বের করে হাতে নিল। স্ক্রিনে ঝুমের নাম জ্বলজ্বল করছে।
” ভাইয়া।”
” হুম।”
” কোথায় আপনি? আর কতক্ষন লাগবে আপনাদের?”
ঝুম অধৈর্য্য। সে আর শান্ত হয়ে বসতে পারছে না।
” জানি না ভাবি।”
ঝুম মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল –
” ওরা আসেনি এখনো?”
” উহুম।”
ওপর পাশ থেকে শব্দ এলো না আর। কিছুক্ষন নিরবতা, অতঃপর খট করে ফোনটা কেটে গেলো বিনা নোটিশে। আহির অভ্যস্ত এসবে তাই বিশেষ প্রতিক্রিয়া জানালো না।
এরপরও প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষার পর হঠাৎ বিকট কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এলো।
” ওই রাজাকারের বাচ্চা।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আহির চোখ তুলে দেখলো অদূরে সাধারণ কামিজ পড়ুয়া ছিমছাম গড়নের শ্রাবণী দাঁড়িয়ে হাত নাড়াচ্ছে। তার চিৎকারের শব্দে আশেপাশের মানুষগুলো কেমন করে তাকিয়ে দেখছে তাদের। আহির বিব্রতবোধ করলো। অথচ শ্রাবণীর মাঝে বিশেষ পরিবর্তন নেই। তার ঠোঁট কোনে মস্ত বড় হাসি। মিসেস বিথী মেয়ের কাণ্ডে বেজায় বিরক্ত। সে না পারতে বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে পা বাড়ালো আহিরের উদ্দেশ্যে। তার সঙ্গ নিলো শ্রাবণ। শ্রাবণীও তাদের পিছু বড়বড় দুটো লাগেজ হাতে এগোলো।
” দুঃখিত বাবা অনেকক্ষন অপেক্ষা করিয়েছি।”
আহির তার কথায় হাসলো। সে এখন বাংলা বুঝতে পারে। বলতেও পারে অল্প-স্বল্প। সবটাই সম্ভব হয়েছে শ্রাবণীর কারণে। তারা বাংলাদেশ থেকে আসার পরও সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে শ্রাবণীর সাথে তার যোগাযোগ ছিল প্রতিনিয়ত। তাদের সম্পর্কটিও আরো মজবুত হয়েছে বইকি। শ্রাবণীই আহিরকে একটু একটু করে বাংলা শিখিয়েছে। যদিও বলতে গেলে এখনও সমস্যা হয়। তবুও একদম না পারার থেকে কিছু পারে এটাই শান্তি।
” আপনাদের আসতে সমস্যা হয়নি তো?”
” না না কোনো সমস্যা হয়নি।”
” বেশ তাহলে যাওয়া যাক? ভাবি অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্য।”
” হ্যাঁ হ্যাঁ চলো।”
শ্রাবণী এতক্ষন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। আহির তার দিকে তাকালে সে সুন্দর করে একটি হাসি দিল। সেই হাসির বিপরীতে আহিরও হাসলো। এগিয়ে এসে লাগেজ গুলো নিয়ে শ্রাবণী প্রশ্ন করলো –
” কেমন আছেন মিস বাংলাদেশ?”
শ্রাবণী শব্দ করে দারুন একটি হাসি দিয়ে বলল –
” আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
আহির সেই হাসি দেখলো। মেয়েটা আগের থেকে বদলে গেছে অনেক। কি দারুন স্নিগ্ধ লাগছে আজ। চোখের শান্তির সাথে মনেরও শান্তি। আহির মাথা নুইয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল –
” আলহামদুলিল্লাহ্।”
” এই এই আপনি লজ্জা পাচ্ছেন?”
আহির সত্যিই লজ্জা পাচ্ছে। কেন তার তা জানা নেই। কিন্তু শ্রাবণী এভাবে মুখের ওপর বলবে তার ধারণায় ছিল না। এই মেয়ের ঠোঁট পাতলা স্বভাব তার একদম পছন্দ না। কপাল কুঁচকে অদ্ভুত ভাবে তাকালো আহির। শ্রাবণী বুঝলো ভুল প্রশ্ন করেছে। তাই বোকা বোকা হাসি দিয়ে কেটে পরলো। আহির অতিষ্ট এই মেয়ের কাজে। মাথা নাড়িয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে লাগেজ গুলো রেখে গাড়িতে গিয়ে বসলো।
শ্রাবণীরা আসার পর থেকে এক জনের পর একজন ঝুমকে জড়িয়ে আছে। শাইয়ান চোখমুখ কুঁচকে দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় বউটা সরকারি জিনিস হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। যে যখন যেখান থেকে পারছে এসে চিপকে ধরছে। আজ তার অফ ডে। শ্রাবণীরা আসার উদ্দেশ্যেই মূলত ঝুম জোর করেছিল আজ ছুটি নেয়ার জন্য। ঝুম তার ভারী শরীর নিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে খুব আয়েশ করে বসে আছে। শরীরের তুলনায় পেটটা তার তিনগুণ। যার ফলে হাঁটতে, বসতে, শুতে ঝুমের খুব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তবুও মেয়েটা হাসিখুশি বসে গল্প করে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টে আহিরের সাথে ঝুমও যেতে চেয়ে ছিল। কিন্তু শাইয়ান যেতে দেয়নি বলে সেই যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এখনো শাইয়ানের দিকে তাকাচ্ছে না। অথচ সবার সাথে কি ভাব! শাইয়ান মেজাজ খারাপ নিয়ে ঝুমের হাবভাব দেখে যাচ্ছে। সময় তারও আসবে, তখন এই মেয়ে কি করে দেখে নিবে সে।
” কষ্ট হয় বেশি পাখি?”
শ্রাবণী চিন্তিত ঝুমকে নিয়ে। মেয়েটার পায়ে পানি জমেছে। সেই রোগা, পাতলা মেয়েটা নেই এখন আর। পুরোদস্তর মা মা ভাব এসেছে তার মাঝে এখন। ঝুম মিষ্টি করে হেসে বলল –
” একটু কষ্ট হয় আপু। কিন্তু ওদের কথা ভাবলে সেই কষ্ট আর অনুভব করতে পারি না।”
” এখন কয় মাস চলে?”
ঈশালের মা এক বাটি ফল এনে ঝুমের হাতে দিয়ে বলল –
” প্রায় সাড়ে আট মাস চলছে ওর। আর কিছু দিন পরই বাড়িতে তিন তিনজন নতুন অতিথি চলে আসবে ইনশাল্লাহ্।”
সকলের চোখেমুখে আনন্দের আভাস কিন্তু শাইয়ান আতঙ্কিত। সে উঠে দাড়িয়ে কোনো আগাম বার্তা ছাড়া ঝুমকে ধীরে তুলে উঠালো। অতঃপর কোনো কথা ছাড়া আস্তে ধীরে টেনে নিয়ে গেলো নিজেদের রুমে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে ঝুমের খুব কষ্ট হলো। যদিও শাইয়ান বারবার বারণ করেছিল নিচে আসতে, কিন্তু মেয়েটা শুনলে তো! ঠিক অমান্য করে নিচে নেমেছে। এখন কষ্টও পাচ্ছে তাই। শ্রাবণী বারণ করতে চাইলো কিন্তু আহির চোখের ইশারায় থামতে বলল। অতঃপর ধীরে বলল –
” ডোন্ট ওয়ারি। ওদের একা ছেড়ে দাও।”
” কিন্তু ঝুমকে ওভাবে নিয়ে গেলো কেন?”
আহির শব্দ করে হেসে দিলো, সাথে বাকিরাও।
” ঝুম শাইয়ানকে পাত্তা না দিলে ও অস্থির হয়ে যায়।”
শ্রাবণী বুঝলো না। সে অবুঝের মতো তাকালো সকলের দিকে। বাংলদেশে যখন তারা ছিল তখন শাইয়ানকে সে যতটুকু দেখে ছিল তাতে শ্রাবণী বুঝেছিল শাইয়ান ঝুমকে প্রচুর ভালবাসে। কিন্তু শাইয়ান যে এভাবে জেলাস মনোভাবের তা তো আগে বুঝতে পারেনি।
মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে বলল –
” আপনি এসব নিয়ে ভাববেন না। শাইয়ান আর যাই করুক ঝুমের ক্ষতি করবে না। নিশ্চিত থাকুন। আপনারা বরং ফ্রেশ হয়ে নিন।”
মিসেস বিথী সায় দিলো তার কথায়।
” হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই ভালো হয়।”
” আসুন আপনাদের থাকার ঘর দেখিয়ে দিচ্ছি।”
শ্রাবণীরা উঠে দাড়ালো। আহির এগিয়ে এসে বলল –
” শ্রাবণ আমার সাথে থাকুক না হয়। কি শ্রাবণ সমস্যা হবে?”
শ্রাবণ বরাবরই শান্তিপ্রিয় ছেলে। তাকে খেতে দিলে আর কিছুর দরকার হয় না। যে যেভাবে বলে সেভাবেই চলে ছেলেটি। এবারও তাই অমত করলো না। সে মাথা নাড়িয়ে জানালো তার সমস্যা নেই। অতঃপর মেহেরুন্নেসা শ্রাবণী ও মিসেস বিথীকে তাদের রুম দেখিয়ে দিলেন। আর শ্রাবণ গেল আহিরের সাথে তার ঘরে।
” সমস্যা কি আপনার? ইগনোর করছেন কেন?”
রুমে আসার পর থেকে ঝুম শাইয়ানকে অদেখা করে যাচ্ছে। যেন এই যাবৎ সংসারে শাইয়ান নামের কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। যার জন্য শাইয়ান আরো ক্ষিপ্ত। যদিও এখনো তাকে বিশেষ পাত্তা দিল না ঝুম। শাইয়ানের প্রচুর রাগ হচ্ছে। সে পারছে না সেই রাগ দেখাতে। ইদানিং এই এক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে। হুটহাট রেগে যাচ্ছে সে। কিন্তু তা ঝুমের সামনে প্রকাশ করতে পারে না। মেয়েটার সাথে একটু উঁচু গলায় কথা বললে কেঁদেকেটে নাজেহাল অবস্থা করে ফেলে নিজের। কিন্তু দিন দিন মেয়েটা যা শুরু করেছে তাতে বকা না দিয়ে উপায় কোথায়!
” আরীবা।”
ঝুমের দুহাতে দুটা কাঠি। একটি গাঢ় টকটকে লাল রঙের উলের সুতা সেই কাঠির সাহায্যে দক্ষ হাতে বুনে যাচ্ছে। এই কাজ সে আহিরের মায়ের কাছ থেকে শিখেছে। তারপর থেকেই সে নিজের বাচ্চাদের জন্য এটা সেটা যাচ্ছে। শাইয়ান ঝুমের মাঝে কোনো বিশেষ পরিবর্তন না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে এসে কাছ ঘেঁষে বসলো।
” এতো রাগ কেন করছেন পাখি? আমি কি আপনার খারাপ চাই? দেখুন এতটুকু হেঁটে এসে আপনি নিশ্বাস নিতে পারছিলেন না। আবার অতদূর গেলে কতটাই না কষ্ট হতো! আপনারই কষ্ট হতো পাখি।”
তারপর আরো কাছে গিয়ে একহাত পেটে রেখে বলল –
” একবার ওনারা চলে আসুক, তারপর আপনার যেখানে ইচ্ছা যাবেন বারণ করবো না। আমি নিয়ে যাবো আপনাকে পাখি। কিন্তু আর কিছু দিন সহ্য করুন প্লিজ। এই সময় বিপদ-আপদ এলে আমি শেষ হয়ে যাবো।”
ঝুম কোনা চোখে তাকিয়ে নাক ফুলিয়ে বলল –
” কতোগুলো দিন আপনি আমাকে কোথাও যেতে দিচ্ছেন না ডক্টর। আমি বাইরে বের হতে পারি না। সারাক্ষন এই বাড়ির মধ্যে কেমন অস্থির লাগে।”
তার চোখ ছলছল। শাইয়ান বুঝলো মুড সুইং এর কারণে এমন হচ্ছে। তাই কিছুটা প্রশ্রয় দিয়ে বলল –
” আমি দুঃখিত। আমি খারাপ। আর এমন করব না। ক্ষমা করে দিন আমাকে।”
ঝুমের ঠোঁটে হাসির ঝলক দেখা গেলো এবার। সে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। আবদার করে বলল –
” আইসক্রিম খাবো ডক্টর।”
ঝুমের আল্লাদি কন্ঠ। অন্য সময় হলে শাইয়ান বারণ করতো কিন্তু এখন আর ঝুমকে রাগাতে চাইলো না বলে মেনে নিল। এরপর ঝুম শাইয়ানকে দিয়ে সেই আইসক্রিম আনিয়ে খেয়েই ছেড়েছে। বেচারা শাইয়ান না পারছিল সইতে না পারছিল কিছু বলতে। মেয়েটা প্রচুর জ্বালাতন করে আজ কাল। এখন ঠান্ডা লাগলে তখন বুঝবে মজা। যদিও পরবর্তীতে ঝুমের ঠাণ্ডা লাগেনি। তার জন্য শাইয়ান অবশ্য আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করেছে। নয়তো ঝুম ও বাচ্চাদের প্রচুর সাফার করতে হতো।
এরপর কেটে গেলো আর বেশ কিছু দিন। এইতো সেদিন রাতের কথা হঠাৎ করে ঘুমের মাঝে ঝুম কেঁদে উঠলো। শাইয়ান তখন কিছু কেস স্টাডি করছিল। ঝুমের কান্নার শব্দে সে কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো কি হয়েছে। ঝুম তখন একহাত পেটে রেখে কেঁদে বলল –
” ব্যাথা করছে।”
শাইয়ান ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। ঝুমের নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না। তাই সি-সেকশন করাতে হবে। কিন্তু তার জন্যও তো বেশ কিছুটা সময় রয়েছে। শাইয়ান দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে আজকের ডেট দেখে নিলো।
২৪ সেপ্টেম্বর, ভোর রাত ২ টা। ডেলিভারি ডেট তো সামনের মাসের ২০ তারিখে দেয়া হয়ে ছিল। এখনো একমাসের মতো। তাহলে এখন এই ব্যাথা কিসের? এদিকে ঝুম শাইয়ানকে তখনো বসে থাকতে দেখে ব্যাথায় চেঁচিয়ে উঠলো। রাগে কিরমিরিয়ে
বলল –
” অদ্ভুত লোক তো আপনি? আমার ব্যাথা করছে আর আপনি এখনো বসে আছেন? পাঁজি, বদলোক। সামনে থেকে সরুন।”
ঝুমের কথায় শাইয়ানের হুশ ফিরল যেন। সে তখনো কি করবে বুঝতে পারল না। এমন দক্ষ ডাক্তার হয়ে কিনা কি করবে তাই জানে না! ব্যাথায় ঝুম ছটফটিয়ে উঠছে। শাইয়ানের হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে মেহেরুন্নেসাকে ফোন দিল। কিন্তু ওপর পাশ থেকে ফোন ধরলো না কেউ। ব্যাথায় ঝুম আর পারছে না। তবুও আরো একবার কল দিতে গেলে ওপর পাশ থেকে কল এলো এবার।
” আম্মা ব্যাথা করছে। তাড়াতাড়ি রুমে আসুন। আপনার ছেলের কি যেন হয়েছে। লোকটার মাথায় সমস্যা। আপনি প্লিজ একটু আসুন আমি আর পারছি না।”
এরপরের সময়টা চোখের পলকে কেটে গেলো। মেহেরুন্নেসা তৎক্ষণাৎ আহিরকে নিয়ে তাদের রুমে হাজির হলো। শাইয়ানও ততক্ষনে সিএমএইচ-এ কথা বলে ডক্টর ম্যানেজ করিয়ে নিলো। যদিও তারা একদম তৈরি ছিল না কিন্তু তাও অল্পের মাঝে যা সম্ভব হলো তাই করলো সবাই। ঝুম অবশ্য শাইয়ানকে ইচ্ছা মতো ঝেরেছে। যদিও ঝাড়ি খাওয়ার মতোই কাজ করেছে শাইয়ান তাই নিশ্চুপ রইল সে। তাছাড়া তার মনে কি চলছে তা হয়তো সে ঝুমকে কেন, অন্য কাউকে বুঝাতে পারবে না। আহির শাইয়ানের অবস্থা দেখে এমন সময়ও হাসতে ভুললো না। ঝুমকে হাসপাতালে নিয়ে দ্রুত এডমিট করানো হলো। ডক্টর কিছু টেস্ট করে বললেন এখনই সি-সেকশনের ব্যবস্থা করতে হবে। পেইন উঠেছে। সেই কথা শুনে শাইয়ানের অবস্থা দেখার মতো হয়েছিল সেদিন। সেই মুহূর্তে শাইয়ান একটি কথাও বলেনি। নার্স তাকে একটি পেপার দিয়ে বলল, সাক্ষর দিতে। তাও সে করতে পারেনি। কিভাবে করবে? ওটা যে বন্ড পেপার ছিল। সেখানে কিভাবে শাইয়ান সাক্ষর করবে? সে না করলেও মেহেরুন্নেসা করে দিয়ে ছিল তৎক্ষণাৎ। কারণ যতো সময় যাচ্ছিল ঝুমের ব্যাথা ততো বেশি হচ্ছিল। অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে সকলে একবার করে ঝুমের সাথে দেখা করলেও শাইয়ান নড়ল না। এমনকি একটি কথাও বলল না কারো সাথে। যেখানে যেভাবে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো।
” আব্বা।”
মেহেরুন্নেসা এসে শাইয়ানের কাঁধে হাত রেখে ডাকলো। শাইয়ান মাথা তুলে তাকালো তার দিকে। শাইয়ান চোখ অসম্ভব লাল। মাথার পাশের রগগুলো ফুলে ফেঁপে আছে। ছেলের করুন চেহেরা দেখে মায়া হলো মেহেরুন্নেসার।
” ঝুম কথা বলতে চায় আপনার সাথে। কথা বলবেন না?”
শাইয়ান অবুঝ বাচ্চাদের মতো দুদিকে মাথা নেড়ে বুঝাল কথা বলবে না। কয়েক ঘণ্টার মাঝে ছেলেটার চোখমুখ বসে গেছে।
” একবার দেখা করুন আব্বা।”
” আম্মা ভয় করছে।”
শাইয়ান কি কেঁদে দিবে? দিতেও পারে। দিলেও এখন কেউ অবাক হবে না। যদিও মেহেরুন্নেসা নিজেও ভীষণ ভয়ে আছে।
” কিছু হবে না আব্বা। শক্ত থাকুন। আপনি যদি ভেঙে পরেন তাহলে ঝুমকে কিভাবে সামলাবো আমরা?”
শাইয়ান বড় করে একটি নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো ঝুমের মুখোমুখি করার। অতঃপর দীর্ঘ অনেকটা সময় পর শাইয়ান তার বউয়ের সম্মুখীন হলো। ঝুম বেডে শুয়ে দেখতে পেল শাইয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। ইঞ্জেকশন দেয়ার ফলে আগের থেকে ব্যাথা কিছুটা কম এখন। আর কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে অপারেশনের জন্য নেয়া হবে। কি হবে ঝুমের জানা নেই। আদোও আর ফিরে আসবে কি না সে জানে না। ঝুম হাত বাড়িয়ে শাইয়ানকে কাছে ডাকলো। ঠোঁটে তার নির্মল হাসি। শাইয়ান কি করবে জানে না। সে একদম নিশ্চুপ। এগিয়ে গিয়ে বসলো ঝুমের পাশে।
” এই ডক্টর।”
শাইয়ান তাকালো না। তার দৃষ্টি মেঝেতে।
” কথা বলবেন না ডক্টর? তখন বকা দিয়েছিলাম বলে রাগ করেছেন?”
শাইয়ান তবুও কথা বলল না। ঝুম এবার দুহাতে নিজের কান ধরে বলল –
” সরি ডক্টর। কথা বলেন এখন, নয়তো পরে যদি আর কথা বলতে না পারেন তখন কিন্তু আফসোস করবেন।”
ঝুমের ইমোশনাল কথায় কাজ হলো খুব। শাইয়ান নিজেকে সামলাতে না পেরে ঝুমের ওপর উপুড় হয়ে কাঁধে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরলো। শাইয়ানের এমন কাজে ঝুম না হেসে পারল না। কাঁধে ভেজা অনুভব হলেও ঝুম কিছু বলল না। উল্টো একহাত শাইয়েনের পিঠে রেখে অন্যহাত শাইয়ানের মাথায় রেখে ধীরে হাত বুলিয়ে দিলো।
” আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না বলে দিচ্ছি। যেভাবে যাবেন আবার সেভাবেই ফিরে আসবেন। আপনি জানেন আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারি না।”
ঝুম নিজের কার্য অব্যহত রেখে হেসে বলল –
” ইনশাল্লাহ্ আমরা চারজন সুস্থ ভাবে আপনার কাছে ফিরে আসবো।”
” কথা দিলে রাখতে হয় কিন্তু।”
ঝুম ব্যাথা নিয়েও শব্দ করে হেসে উঠলো। শাইয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল –
” দোয়া করবেন আমাদের জন্য।”
শাইয়ান উত্তর করলো না কিন্তু মনে মনে সে শুধু প্রার্থনা করে গেলো ঝুমের জন্য। তার আর কিছু চাই না, কাউকে চাই না। শুধু ঝুম সুস্থভাবে ফিরে এলেই হবে।
ও টি রুমে শাইয়ানকে থাকতে বলা হলেও শাইয়ান গেলো না। উল্টো সে ও টি রুমের সামনে মেঝেতে বসে রইলো চুপটি করে। তার নড়চড় নেই। ডক্টর এতো বলেও তাকে নিতে পারল না। মেহেরুন্নেসাও বলে ছিল সে থাকলে ঝুম সাহস পাবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। শাইয়ান যাবে না বলে গো ধরলো। শেষমেশ তাকে কেউ পাঠাতে পারল না। সেই থেকে বেচারা কারো সাথে কথা বলছে না। ঘেমে অবস্থা খারাপ তার। মেহেরুন্নেসা ও ইব্রাহীম ছেলের চিন্তায় উদ্বিগ্ন। এখন না আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এই ছেলে। কিন্তু না এমন কিছুই হলো না। শাইয়ান ওভাবেই বসে রইলো পুরোটা সময়। অত্যধিক রিস্ক থাকার পরও আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালার অশেষ রহমতে দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা পর ঝুমের অপারেশন সম্পূর্ণ হলো। তিনজন নার্স কোলে করে তিনটি বেবিকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। সকলে এতটাই হতভম্ব যে শুরুতে কেউই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারল না। একজন নার্স শাইয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল –
Remedy part 30
” স্যার অভিনন্দন। আপনি দুজন পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন।”
মুহূর্তে উপস্থিত মানুষের মাঝে খুশির বন্যা বয়ে গেলো। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে একজনকে কোলে তুলে নিলে নার্স জানালো –
” ইনি মেয়ে। সবার ছোট। শেষ সময়ে ম্যামকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে।”
মেহেরুন্নেসা খুশিতে কথা বলতে পারলো না। বাচ্চাটির কপালে চুমু দিয়ে এগিয়ে বসলো শাইয়ানের সামনে।
” আব্বা, আপনার মেয়ে। কোলে নিবেন না?”
কিন্তু শাইয়ান তাকালো না। এমন কি কোনরূপ শব্দ করলো না। মেহেরুন্নেসা আরো কয়েকবার ডাকলেও নড়চড় নেই। ইব্রাহীম এগিয়ে এসে শাইয়ানের কাঁধে হাত রেখে ধাক্কা দেয়ার সাথে সাথে শাইয়ান মেঝেতে পরে গেলো।
