Home Remedy Remedy part 33

Remedy part 33

Remedy part 33
মীরা রায়াদ

ঝুমদের তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ দেয়া হলো। পরিবারের অর্ধেক মানুষ তখন ঝুম ও বাবুদের নিতে হাজির। একটা গাড়িতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিয়ে অন্য গাড়িতে শাইয়ান নিজে ঝুমকে নিয়ে বসলো। গাড়ি ড্রাইভিংয়ের দায়িত্বটি বরাবরের মতো আহির নিজের কাঁধে নিয়ে নিল। তার পাশেই শ্রাবণী বসে আছে। যে এক দন্ড চুপ নেই। সিটের ওপর পা তুলে পিছু ফিরে ঝুমের সাথে নন-স্টপ বকবক করে যাচ্ছে। ঝুম অবশ্য তেমন কিছু বলছে না, শুধু শুনে যাচ্ছে। শাইয়ান একহাতে ঝুমের কাঁধ জড়িয়ে নিয়ে ঝুমের মাথাটা নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে আয়েশ করে বসিয়ে দিলো, যাতে করে ঝুমের কষ্ট না হয়। এরপর আহিরকে শাসিয়ে বলল –

” গাড়ির স্পিড কমিয়ে চালাবে। আমার বউ ব্যাথা পেলে তোমার খবর আছে।”
আহির মাথাটা ঘুরিয়ে শাইয়ানের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। এই ছেলের কাজে আজকাল ও ভীষণরকম বিরক্ত হয়। ওর ওভাবে তাকানো দেখে মনে হলো পারলে ছেলেটা শাইয়ানকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। ঝুম অতিষ্ট হয়ে শাইয়ানের বুকে চিমটি কাটলো। শাইয়ান যদিও প্রতিক্রিয়া করলো না, তবে ঝুমের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল –
” কি?”
ঝুম হাত ছাড়াতে চাইলো, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করতে পারল না। অতঃপর চোখমুখ কুঁচকে বলল –
” কি শুরু করেছেন আপনি? ভাইয়া বোঝে না নাকি? হাত ছাড়ুন। সব কিছুতে আপনার বেশি বেশি করাই লাগবে তাই না?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শাইয়ান ঝুমের কথা মোটেও আমলে নিল না। সে আরো ভালোভাবে ঝুমকে জড়িয়ে ধরে সিটের সাথে শরীর এলিয়ে দিল। শ্রাবণী এদের খুনসুঁটি ভীষণ এনজয় করে। আজ দীর্ঘ ২০ দিনের মতো হলো তারা পাকিস্তানে এসেছে। শীঘ্রই তারা বাংলাদেশে ফিরে যাবে বলে মনস্থির করেছে।
শাইয়ানের কথা আহির খুবই গুরুত্বের সাথে পালন করেছে। যার দরুন তাদের পৌঁছতে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেল। ঝুম মাঝে একবার ঘুমিয়েও নিয়েছে। আজ জ্যামও ছিল প্রচুর। তারা যখন বাড়িতে প্রবেশ করলো তখন বসার ঘরে এলাহি কাণ্ড। ঝুম ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থায় সোফার একপাশে গিয়ে বসলো। ঈশাল বাচ্চাদের এটাসেটা বলেই যাচ্ছে। তার উদ্ভট কথা শুনে বাচ্চারা স্বশব্দে কেঁদে উঠলো। শাইয়ান ওর কাজে বেজায় নারাজ। তার ছেলে-মেয়েকে বিরক্ত করা কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না।
সে গম্ভীর গলায় ঈশালকে বলল –

” ওদের বিরক্ত করছেন কেন? আমার বউয়ের মাথা খেয়ে মন ভরেনি আপনার? এখন আমার বাচ্চাদের পিছনে লেগেছেন?”
ঈশাল শাইয়ানের এরূপ কথায় মুখ ফুলিয়ে ফেলল, কিন্তু বাকি সবাই হেসে দিল। এরই মাঝে শাইয়ানের দাদাজান বলে উঠলো –
” বড় দাদুভাই আপনারা কি বাচ্চাদের আকীকা নিয়ে কিছু ভেবেছেন?”
ঝুম এবার মুখ তুলে তাকালো শাইয়ানের পানে। অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলো তার উত্তরের আশায়। শাইয়ান ঝুমকে একপলক দেখে নিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বলল –
” হ্যাঁ দাদাজান। ওনাদের জন্মের সাত দিনের দিনটিতেই দিতে চাচ্ছিলাম আপনাদের অনুমতি থাকলে, এবং সেই দিনটি শুক্রবার পরে।”

” আলহামদুলিল্লাহ্। বাহ্ উত্তম সিদ্ধান্ত। তাহলে সেই ভাবে প্রস্তুতি নেয়া হোক।”
” জ্বী দাদাজান।”
এ পর্যায়ে ইব্রাহীম বলে উঠলো –
” আমার কিছু বলার আছে শাইয়ান।”
শাইয়ান তার বাবার পান তাকিয়ে বিনম্র স্বরে বলল –
” জ্বী আব্বা বলুন।”
” আমি আর আপনার আম্মা চাচ্ছিলাম আকীকাতে আপনার সাথে সামিল হতে।”
শাইয়ান কিছুটা চিন্তিত স্বরে বলল –
” কিন্তু আব্বা আকীকার দায়িত্ব তো বাবার ওপর থাকে।”
ইব্রাহীম কাছে এসে ছেলের কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল –
” সে আমি জানি শাইয়ান। সেই দায়িত্ব আপনার ওপরই থাকবে। আমি আর আপনার আম্মা ভেবেছি বাচ্চাদের চুল পরিমান দান-সদকাহ আমরা করবো।”
শাইয়ান একবার ঝুমের দিকে তাকালো। চোখের ইশারায় জানতে চাইলো তার মতামত। ঝুম হেসে সায় জানালো শাইয়ানও আর অমত করলো না। অতঃপর সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল শাইয়ান বাচ্চাদের আকীকার ব্যবস্থা করলেও, বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা একত্রিত হয়ে দান-সদকাহ দিবেন।

” অনেক হয়েছে আহির এবার আপনি বের হন আমাদের রুম থেকে।”
বাড়িতে ফেরার পর থেকে শাইয়ান ঝুমকে এক মিনিটের জন্যও একা পায়নি। সর্বক্ষণ কেউ না কেউ থেকেছে তাদের আশেপাশে। এখন রাত। তারা বেশ কিছুক্ষন হলো রাতের খাবার শেষ করেছে। ঝুমের শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে তাদের খাবারের ব্যবস্থা শাইয়ানের ঘরেই করা হয়ে ছিল। খাওয়া শেষ হওয়ার পর সেই যে আহির এসে বাচ্চাদের পাশে হাত-পা গুটিয়ে বসেছে ওঠার নাম নেই। এতেই শাইয়ান ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলল। ফলস্বরূপ, উক্ত কথাগুলো বলতেও একবার ভাবলো না সে।
আহির চোখ মুখ তুঙ্গে তুলে বলল –
” পারবো না। আর যেতে হলে বাবুদের সাথে করে নিয়ে যাবো।”
তার বাচ্চাদের নিয়ে যাবে মানে? কি সাংঘাতিক কথা! শাইয়ান রেগে মেগে তেড়ে এলো ওর দিকে।
” ফাজলামো পেয়েছো? বাচ্চাদের কোথাও দিবো না। আর তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আরীবা অসুস্থ। ওনার বিশ্রাম দরকার।”

আহির এ পর্যায়ে ঝুমের দিকে তাকালো। মেয়েটা অসুস্থতার কারণে নুইয়ে পরেছে। চোখে মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট। হয়তো ঘুমাতে চায়। অন্য সময় হলে শাইয়ানের সাথে সে তর্ক করতে ভুলতো না। কিন্তু ব্যাপার যখন ঝুমকে নিয়ে তখন সে আর কথা বাড়ালো না। বাচ্চাদের কপালে চুমু খেয়ে শাইয়ানকে শাসিয়ে বলল –
” দিন এখন তোমার তাই যা ইচ্ছা করে নাও। আজ ছেড়ে দিচ্ছি কিন্তু কাল দেখে নিবো।”
কথাগুলো বলে বড়বড় পা ফেলে সে হারিয়ে গেলো। শাইয়ান অতিষ্ট হওয়া ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে পা বাড়ালো দরজার দিকে। অতঃপর হালকা শব্দ করে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এলো ঝুমের দিকে। ঝুম তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। কোনরূপ আগাম বার্তা ছাড়া সুনিপুণ ভাবে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো ঝুমকে। প্রথমে আস্তে অতঃপর ধীরে ধীরে তা ব্যাথায় পরিণত হলো। ঝুম সহ্য করতে না পেরে কুঁকিয়ে উঠলো। যার ফলে হালকা আওয়াজও হলো। তবুও শাইয়ান ছাড়লো না। উল্টো দাঁতের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ঝুমের ঘাড়ে কামড় দিয়ে বসলো। কিসের এতো রাগ কে জানে? ঝুম ব্যাথায় কেঁদে ফেলল। দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু শাইয়ানের নড়চড় নেই। না পারতে ঝুম কেঁদে বলল –

” ব্যাথা পাচ্ছি ডক্টর ছাড়ুন। কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? ছেড়ে দিন দয়া করে।”
শাইয়ান তবুও ছাড়লো না। এই প্রথম ঝুমের কান্না অগ্রাহ্য করে নিজের মনের জ্বালা মিটিয়ে তবেই ছাড়লো। ততক্ষনে ঝুম নেতিয়ে পরেছে ব্যথায়। হিচকী তুলে ফেলেছে একদম। বাচ্চাগুলোও মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে কেঁদে উঠলো আপন স্বরে। শাইয়ান ঝুমকে আগলে নিয়ে বাচ্চাদের দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইলো। এখন কি এদের জন্য সে ঝুমের সাথে নিজের মনমার্জি মতো কাজও করতে পারবে না? কি অদ্ভুত! বউটা এবার সত্যিই ভাগ হয়ে গেলো। ঝুম নিজেকে ছাড়িয়ে নিল বড়ই অভিমানের সাথে। কাঁধে হাত চেপে ব্যাথা জায়গাতে কয়েকবার হাত বুলিয়ে দিয়ে নাক টেনে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর বাচ্চাদের কাছে গিয়ে একে একে প্রত্যেককে খাওয়ানোর পর আবার শুইয়ে দিলো। এই সবটাই শাইয়ান নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষন করলো। শুরুতে বাচ্চাদের খাওয়াতে ঝুমের সমস্যা হলেও এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ঝুম। তাই একা একাই পারে সে। ঝুমের ছেলে দুজন খুব শান্ত। তারা মায়ের কল পেলেই ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটা শাইয়ানের মতো জ্বালায়। কিছুতেই ঘুমায় না।

উল্টো কোল থেকে নামলেই উচ্চ শব্দে কেঁদে ওঠে। এবারও একই ঘটনা ঘটলো। ছেলে দুজনকে ঘুম পাড়িয়ে শুইয়ে দিয়ে মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে পরতে হলো বিড়ম্বনায়। সে চোখ দুটো মেলে তাকিয়ে আছে। ঘুমাচ্ছে না। একটু চোখ বন্ধ করলে যেই না ঝুম তাকে বিছানায় শোয়ায় ওমনি কেঁদে ফেলে। যেই সেই কান্না নয় একদম গলা ফাটিয়ে কান্না শুরু করে মেয়েটা। এবারও তাই হলো। মেয়ের কান্নায় ভয় পেয়ে ঝুমও কেঁদে ফেলল। অসহায়ের মতো শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে বোবা কান্না কাদঁছে সে। শাইয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠে দাড়ালো। অতঃপর রুমের এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে হেঁটে মেয়ের পিঠে আলতো আলতো চাপড় কেটে কিভাবে কিভাবে মেয়েকে ঠিক ঘুম পাড়িয়ে দিলো। ঝুম হা হয়ে দেখলো তা। পাঁজি মেয়ে বাপের মতো নাটকবাজ হয়েছে একদম। শাইয়ান মেয়েকে বেশ কিছু সময় কোলে রেখে ঘুম গাঢ় হওয়ার পর শুইয়ে দিলো। না ওঠেনি এবার। ঝুম হাফ ছেড়ে বাঁচলো। শাইয়ান ওর রিয়েকশন দেখে মুখ লুকিয়ে হাসলো। অতঃপর খুব সাবধানে ঝুমের কাছে গিয়ে বসে ঝুমকে নিজের দিকে টেনে নিল। ঝুম অভিমানী চোখে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। এতেই বেজায় চটলো শাইয়ান। ঝুমের থুতনির কাছটায় শক্ত করে ধরে নিজের মুখোমুখি করে বলল –

” যা কিছু হয়ে যাক কখনো আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না। কখনো না মানে কখনোই না। বুঝতে পেরেছেন?”
ঝুম এবার ছলছল চোখে অভিমানী কন্ঠে বলল –
” তাহলে আপনি আমাকে ব্যাথা দিলেন কেন? কি করেছি আমি? দেখুন কি করেছেন। এতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হয় মানুষ?”
শাইয়ান ঝুমের চোখমুখ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। মেয়েটা মানতেই পারছে না শাইয়ান তাকে এভাবে ব্যাথা দিয়েছে। শাইয়ান এগিয়ে এসে ঝুমের কাঁধের কাছে জামা একটু সরিয়ে দেখে নিলো ক্ষত হওয়া স্থানটুকু। তারপর উঠে গিয়ে বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি মলম তুলে নিয়ে আবার এসে বসলো ঝুমের সামনে। অতঃপর দক্ষ হাতে আস্তে ধীরে খুব যত্নের সাথে ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিয়ে বলল –

” ড. জুম্মানের সাথে হেসে হেসে কথা বলার শাস্তি ছিল এটি।”
ঝুম হতবাক। এতটাই হতবাক যে শাইয়ানের দিকে তাকিয়েই রইলো, চোখের পলক পরলো না। শাইয়ান তার ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো কি হয়েছে। হঠাৎ ঝুমের আজ সকালবেলার কথা মনে পরলো। তারা হাসপাতালে থেকে ফেরার আগের কথা। শাইয়ান ঝুমের ডিসচার্জ পেপার নিতে গিয়েছিল। সেই সময়ে ড. জুম্মান অর্থাৎ শাইয়ানের কলিগ ঝুমের কেবিনে উপস্থিত হয়। সে মূলত ছুটিতে ছিল। আজ জয়েন করে জানতে পারে শাইয়ানের তিনটি বাবু হয়েছে তাই দেখতে এসেছিল। হাসপাতালের কম-বেশি সবাই ওদের দেখতে এসেছে এই কিছুদিনে। সকলে খুব দোয়াও করে গিয়েছে, সাথে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দিয়েছে। ড. জুম্মান দারুন মানুষ। অল্প সময়ে যে কারো সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। ফলস্বরূপ, ঝুমের সাথেও সে বেশ হাসিখুশি আচরণ করলো। ঝুমও আস্তে ধীরে তার সাথে মিলে যায়। এটাই তার দোষ ছিল। শাইয়ান এসে যখন ব্যাপারটা দেখেছিল মনে মনে সে ভীষণ জেলাস থাকলেও প্রকাশ করেনি তা। ড. জুম্মানের সাথে ঝুমের ওভাবে কথা বলা তারওপর তাকে দেখেও পাত্তা না দেয়ার ব্যাপারটা তার একদম ভালো লাগেনি। মনের মাঝে সেই রাগ, ক্ষোভ পুষে রেখেছে সারাটা দিন। ভাবা যায় কি ভয়ানক লোক!

” তাই বলে এভাবে কামড়াবেন? ব্যাথা পেয়েছি না?”
শাইয়ান ভাবলেশহীন। তার মনে কোনরূপ অনুতাপবোধ নেই।
” ব্যাথা পাওয়ার জন্যই দিয়েছি। আপনারও বোঝা উচিত আমি ব্যাথা পাই। তাও সেই সব কাজ আপনি বেশি করে করেন। তাই এবার থেকে আমিও আপনাকে ব্যাথা দিবো।”

ঝুম মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বকলো ওকে। বিড়বিড় করার তালে তালে ওর ঠোঁট ফুলে কেঁপে কেঁপে উঠল। শাইয়ান অপলক নির্লজ্জের মতো তাকিয়েই রইলো সেদিকে। বারকয়েক ডোকও গিললো। যার দরুন, শাইয়ানের অ্যাডামজ অ্যাপল ওঠা-নামা করলো অস্থির ভাবে। ঝুম ওকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হলো খুব। শাইয়ানের চোখমুখ সুবিধার লাগলো না। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না মেয়েটি। তার আগেই শাইয়ান হামলে পরলো। অসতর্কতার দরুন ঝুম পরতে নিলেও ধরে ফেলল শাইয়ান। এক হাত ঝুমের মাথার পিছে রেখে অন্যহাতের সাহায্যে ঝুমের কোমড় পেঁচিয়ে নিল। ঝুমকে নিজের দখলে নিয়ে নিজের আয়েশ মিটিয়ে চুমু খেলো ছেলেটি। প্রথম দিকে ঝুম অবশ্য বাঁধা দিল না, কিন্তু শাইয়ান হঠাৎ উম্মাদের মতো আচরণ শুরু করলো। তার হাতের গতিবেগের পরিবর্তন ঘটছে বুঝতে পেরে ঝুম দুহাতে ঠেলে সরাতে চাইলো। শাইয়ান বুঝি এতে থামে? উহু। উল্টো বিরক্ত করায় ঝুমের দুহাত পিছে মুড়ে একহাতের সাহায্যে চেপে ধরলো। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝেও কিছু করার ছিল না ঝুমের। কারণ শাইয়ান তাকে ছাড়তে নারাজ। অবশেষে ঝুম কথা বলতে পারলো যখন শাইয়ান ঝুমের ঠোঁট ছেড়ে ওর গলায় মুখ গুঁজলো।

” ডক্টর শান্ত হন।”
শাইয়ান থামার নামতো নিলোই না বরং আরো কাছাকাছি গেলো। ঝুম বড়বড় নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে ধীরে বলল –
” ডক্টর আমি অসুস্থ।”
এরপর সব শান্ত, শুধু শাইয়ানের দীর্ঘ দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। ঝুম বুঝতে পারলো শাইয়ানের হাতের বাঁধন নরম হচ্ছে। আস্তে আস্তে তার হাত ছেড়ে দেয়া হলো কিন্তু শাইয়ান নড়ল না। ঝুমের গলায় মুখ গুঁজে ওভাবেই পরে রইলো। ঝুম খুব আদুরে ভঙ্গিতে দুহাতে শাইয়ানকে জড়িয়ে নিয়ে বলল –
” দুঃখিত।”
শাইয়ান প্রতিউত্তরে কিছুই বলল না। উল্টো ঝুমের কোমড় দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল –
” আজ এভাবে ঘুমাই? অনেক দিন আপনার বুকে ঘুমাতে পারিনি।”
এভাবে বললে কি কেউ বারণ করতে পারে? ঝুমও পারেনি। শাইয়ান যদিও ঝুমের উত্তরের জন্য বসেও ছিল না।

আহির ও শ্রাবণী বসে আছে সমুদ্র পাড়ে। প্রায় দু’ঘন্টা ড্রাইভ করে তারপর আহির শ্রাবণীকে এখানে নিয়ে এসেছে। শহর থেকে বেশ দূরে জায়গাটি। এটি সেই জায়গা যেখানে আহিরের প্রজেক্টের কাজ চলছিল। এখন সেটি পরিপূর্ণ এক পাঁচ তারকা বিশিষ্ট হোটেল। এসব আসার পথে আহির নিজে থেকে শ্রাবণীকে বলেছে। তারা এখন বালুর ওপর জুতো রেখে বসে আছে। অপূর্ব সেই দৃশ্য। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সেই চাঁদের আলো সমুদের পানির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। শ্রাবণী সেই দৃশ্য মন দিয়ে দেখছে। প্রচণ্ড বাতাসে তার কোমর সমান খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। আগের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে চুলগুলো। বহুদিন কাটে না যে! যত্নও করছে এখন একটু-আধটু। তাকে একপ্রকার তুলে নিয়ে এসেছে আহির। অথচ এখানে এসে একদম নিশ্চুপ মানুষটা। শ্রাবণী দৃষ্টি ফিরিয়ে আহিরের দিকে নিল।

” হঠাৎ এতরাতে এখানে নিয়ে এলেন যে? কেউ জানতে পারলে যদি কিছু মনে করে?”
আহির অদূরে তাকিয়ে ছিল। শ্রাবণীর প্রশ্নেও তার দৃষ্টি নড়চড় হলো না। স্নিগ্ধ, মোলায়েম কন্ঠে বলল –
” জারার খুব ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর এভাবে হুটহাট রাতের বেলা কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে এসে সমুদ্র বিলাস করবে।”
শ্রাবণী শব্দহীন হাসলো। মেয়েটার এতো কথা শুনেছে যে সামনে থেকে দেখার ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে।
” আপনার মন খারাপ?”
” উহুম।”
” তাহলে এখানে এলেন কেন, তাও আমাকে নিয়ে?”
এবার আহির দৃষ্টি শ্রাবণীর ওপর দিলো।
” শান্তি খুঁজতে।”
শ্রাবণী বুঝলো না তার কথা।
” শান্তি খুঁজতে? এখানে?”
” হুম।”
” পেয়েছেন?”
” পেয়েছি।”
” কিভাবে?”

আহির হাসলো। শ্রাবণী অবাক হয়ে সেই হাসি দেখলো। চাঁদের আলোতে আহিরকে স্বর্গীয় সৌন্দর্যের প্রতীক লাগছে। একটি ছেলের হাসি এতো অপূর্বও হয়? তার জানা ছিল না।
” অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তোমার আশেপাশে আমি শান্তি খুঁজে পাই শ্রাবণী।”
শ্রাবণী ভীষণ প্রস্তুত অনুভব করলো। এ কেমন কথা? সে জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করেও সফল হলো না। আহির বুঝলো তা।
” বি ইজি শ্রাবণী। অপ্রস্তুত হতে হবে না। আমাদের জীবনে কিছু মানুষ বা বলতে পারো কিছু বন্ধু থাকে যারা আমাদের শান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার কাছে তুমি তেমন।”
শ্রাবণী এবার মন থেকে হাসলো।
” জারা কোথায় আপনি জানেন তাই না?”
আহির মুখ লুকিয়ে হাসলো। দৃষ্টি সরিয়ে আবার দূরে দিয়ে বলল –
” এমন কেন মনে হলো?”

শ্রাবণী এতক্ষন আহিরকে দেখছিল। এবার সে সোজা হয়ে বসে পূর্বের ন্যায় দুর আকাশ দেখতে দেখতে বলল –
” আপনি ওনাকে ভীষণ ভালোবাসেন। আর যারা ভালবাসে তারা সর্বদা খুঁজে বেড়ায়।”
” তার মানে বলতে চাচ্ছো তুমি এখনো পাভেলের খোঁজ রাখো।”
শ্রাবণী শব্দ করে হেসে দিলো। খোলা জায়গায় সেই হাসি ছড়িয়ে পরলো দূর থেকে দূরন্তে। না লুকিয়ে বলল –
” হ্যাঁ রাখি তো। আমার ভালবাসা মিথ্যে ছিল না। ওর ভালো-খারাপ উভয় ব্যাপারেই খোঁজ রাখি।”
আহির মাথা নুইয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বলল –
” জারা ওর হাসবেন্ডের সাথে ইউএসএ- এ আছে। জানো কিছু দিন আগে ওর একটি মেয়ে হয়েছে। আর….”
বিষণ উৎফুল্লের সাথে বলল আহির। কি ভীষণ ভালবাসা!

Remedy part 32

” আর।”
” আজ ওর জন্মদিন।”
আহির চুপ করে রইলো এরপর। শ্রাবণী বুঝলো আহির মন খারাপ তাই ঘাটালো না। বরং কথা ঘুরিয়ে বলল –
” ওনাকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল।”
” কেন?”
” জানি না। হয়তো এমনিই দেখতে ইচ্ছা করলো।”

Remedy part 34