Remedy part 34
মীরা রায়াদ
আজ বাচ্চাদের আকীকার দিন। কাল রাত থেকে শাইয়ানের কোনো খোঁজ নেই। সে ভীষণ ব্যস্ত। তার ব্যস্ততার শেষ নেই। তিন ছেলে-মেয়ের আকীকা বলে কথা। আজ বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত। যে যার মতো কাজে হাত লাগাচ্ছে। সে এক এলাহী কাণ্ড। অনেক মানুষ আসবে। তাছাড়া মিলাদ-মাহফিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সকলে নিজ নিজ ব্যস্ততা ফেলে বাচ্চাদের জন্য সময় বের করে আসবে। তাই শাইয়ান চাচ্ছে সবকিছু সুন্দর ও সুনিপুণ হোক। কোথাও কোনো ত্রুটি না থাকুক। সকাল থেকে ঝুমও অবশ্য ব্যস্ত। যদিও সে কোনো কাজে ব্যস্ত নয়। সে তার বাচ্চাদের দিয়ে মহা ব্যস্ত। বাচ্চা সামলানো যতটা সহজ ভেবে ছিল ততটা সহজ একদম লাগছে না। হাড় জ্বালিয়ে খাচ্ছে পাঁজি গুলো। তারওপর কাল শাইয়ান বাইরে থাকায় ওদের সামলাতে ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে। মেহেরুন্নেসা অবশ্য সাথে ছিল পুরোটা রাত কিন্তু তাতে কি! মেয়ে হয়েছে বাবা ভক্ত। এই সাতদিনে ভালই চিনে ফেলেছে শাইয়ানকে। যার দরুন কাল সারা রাত না নিজে ঘুমিয়েছে আর না ঝুমকে ঘুমাতে দিয়েছে।
ঝুম শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে বেডে ঘুমানো মেয়ের দিকে তাকালো। যে এখন নিশ্চিন্তে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। ঝুম লক্ষ করল মেয়েটার ঘুমের ভঙ্গিও শাইয়ানের মতো। ঝুম নিজের বড় বড় চোখ গুলো ছোট ছোট করে তাকিয়ে বিরবিড়িয়ে বলল –
” শাইয়ানের বাচ্চা একটা।”
মেয়েটা এতক্ষন যাবৎ ঘুমিয়ে ছিল। ঝুম এতটাই আস্তে বলেছে যে সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউ থাকলেও শুনতে পারবে না তার কথাটি। তবুও তাকে আশ্চর্যের চরম সীমানায় পৌছে দিয়ে তার সাতদিনের ছোট মেয়েটি বিকট গলায় কেঁদে উঠলো। ঝুম হকচকিয়ে উঠলো। শাড়ি সামলে ছুট লাগালো মেয়ের কাছে। এই কয়েক মুহূর্তের মাঝে মেয়েটা কেঁদে মুখ লাল করে ফেলেছে। ভাগ্য ভালো ছেলে দুজন এখানে নেই। ঈশাল ও মিশাল এসে তাদের নিয়ে গিয়েছে। নয়তো এই মেয়ের যা গলা! দেখা যেতো এর জন্য বাকি দুজনও কেঁদে ফেলেছে। এমন ঘটনা হরহামেশা হয়ে থাকে। ঝুম মেয়ের কাছে গিয়ে বসে দেখলো, বাচ্চাটি একহাতে নিজের মাথার সবে একটু বড় হওয়া চুলগুলো মুঠোয় ধরে চেঁচিয়ে কাদঁছে। আর অন্য হাতে পরনের সুতির জামাটি ধরে আছে। ঝুম এই অবস্থা দেখে অসহায় বোধ করলো। কার মতো হয়েছে এই বজ্জাতটা? নিজেই নিজেকে মেরে এমন নাটক করছে যেন কি না কি হয়েছে। ঝুম ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে আলতো হাতে মাথার চুল ছাড়াতে চাইলো। কিন্তু মেয়ে তার ছাড়তে নারাজ। আবার কান্নাও তার থামছে না বরং ক্ষণে ক্ষণে বেড়ে চলেছে। ঝুম বিপাকে পরলো। বাড়ি ভর্তি অতিথি, তারা যদি শুনে ফেলে কি ভাববে! বারকয়েক ঝুম চেষ্টা করলো বুঝাল তারপরও কাজ না হওয়ায় এবার নিজেই কেঁদে ফেলল। ব্যাস, মেয়ে চুপ। একদম ঠাণ্ডা। ওদিকে ঝুম নাক টেনে টেনে মেয়েকে বকে যাচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” পাঁজি মেয়ে। বাপের মতো হয়েছেন? হাড়-গোর জ্বালিয়ে খাচ্ছেন আমার। ভাইয়াদের মতো শান্ত হতে পারেননি? এতো জেদ কিসের বাপের মতো? একদম আবার হাসপাতালে গিয়ে রেখে আসবো বলে দিলাম আর যদি জ্বালাতন করেন তো। দুষ্টু মেয়ে একটা।”
বলে চোখ রাঙালো ঝুম। কিন্তু মেয়েটা কিছু বুঝলে তো! বাচ্চাটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মায়ের কান্না দেখে গেলো।
শাইয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এতক্ষন সবটাই দেখেছে। মনে মনে মেয়ের কাজে ভীষন খুশী সে। ঝুম যেমন তাকে জ্বালিয়েছে এতগুলো দিন, সেই সব কিছুর শোধ নিচ্ছে তার মেয়ে। যদিও একটু খারাপ লাগছে ঝুমের জন্য তার। নিচে মেহেরুন্নেসার কাছ থেকে শুনে এলো কাল রাতে নাকি মেয়েটা একদম ঘুমাতে দেয়নি। যদিও শাইয়ান ভেবে ছিল এমন কিছুই হবে। কারণ ছেলেদের সামলাতে পারলেও মেয়েকে এখনো সামলাতে পারে না। তাই তো কাল রাতে এবং ভোরে সে বেশ কয়েকবার ঝুমকে ফোন করে জানতে চেয়ে ছিল কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না? কিন্তু মেয়েটা প্রতিবার মুখ বুজে এড়িয়ে গিয়েছে। শাইয়ানেরও কিছু করার ছিল না। কারণ সে বাচ্চাদের আকীকার বেড়া আনতে করাচি শহরের বাহিরে গিয়ে ছিল আহিরকে নিয়ে। ফিরেছে পাঁচটি ভেড়া সমেত এইতো ঘন্টাখানেক হলো। তবুও বাড়ির মাঝে প্রবেশ করতে পারেনি।
মসজিদের ইমামকে নিয়ে আলোচনা ও কাজের জন্য আনা লোকদের সব কিছু বুঝিয়ে দিতে দিতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। ঘামে ভিজে শরীর ছিপছিপে লাগছে। নিচে বাচ্চাদেরকে সেই কারণে কোলেও নেয়নি সে। দেখা করে সোজা উপরে চলে এসেছে। আর এসেই মা-মেয়ের এই অসাধারণ মুহূর্ত দেখে তার সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই গায়েব হয়ে গেল। শাইয়ান পা বাড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। কারো পায়ের শব্দে ঝুম দরজার পানে দৃষ্টি দিল। তার চোখে তখনো পানি। চোখেমুখে রাগ, বিরক্তির কারণে কপাল কুঁচকে আছে। শাইয়ানকে দেখতে পেয়ে কপালের সেই ভাঁজ গায়েব হয়ে গেলো। মুখে ফুটে উঠল আদুরে আল্লাদিপনা। শাইয়ান কাছে এসে চমৎকার এক হাসি দিলো। ব্যাস, ঝুম ঠোঁট উল্টে দুহাতে শাইয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে পেটে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল। কাল রাত থেকে লোকটাকে দেখেনি ঝুম। খুব বেশি মিস করেছে। শাইয়ান হেসে ঝুমের মাথায় হাত রেখে বলল –
” আমি ঘেমে আছি পাখি। শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। ফ্রেশ হয়ে আসি আগে? দেখি সরুন।”
” উহু।”
শাইয়ান বিশেষ কিছু বলল না। প্রশ্রয় দিলো ঝুমকে। বেশ কিছুক্ষন পর বলল –
” সবাই চলে এসেছে পাখি। এখন তৈরি না হলে দেরি হয়ে যাবে। নামাজেও তো যেতে হবে তাই না?”
কথাগুলো বলে সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। বাচ্চাটি তাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে। এখন দেখলে মনেই হবে না এই মেয়ে ঝুমকে জ্বালাতন করে। ঝুম এবার ছেড়ে দিলো। অতঃপর বলল –
” আপনার মেয়েকে আপনি দেখেন। এই পাঁজিকে আমি আর সামলাতে পারবো না।”
শাইয়ান ওকে ছেড়ে দিলে কপালে কয়েকটি ভাঁজ ফেলে বলল –
” এখন আমি কেন দেখব? আমি বলে ছিলাম ওদের আনতে?”
ঝুম ঠোঁট উল্টে তাকালো। নাক-মুখ কুঁচকে বলল –
” আপনি আমাকে খোটা দিচ্ছেন?”
ঝুম উত্তর করলো না। বরং কেবিনেট থেকে সাদা ধপধপে একটি পাঞ্জাবি নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল –
” হয়তো।”
ঝুম হা করে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর মুখ ফুলিয়ে ভাবলো, তার মেয়েটা এই ডক্টরের মতো পাঁজি হয়েছে।
” এক্সকিউজ মি।”
শ্রাবণী বাড়ির সামনে দাড়িয়ে ছিল। আজ আবহাওয়া অন্যান্য দিনের তুলনায় ভালো। মৃদু বাতাস আর রোদ কম হওয়ায় আজ গরমটাও কম। বাড়ির ভিতর সবাই খুব ব্যস্ত বলে শ্রাবণী এখানে এসে দাড়িয়ে কাজ দেখছিল। এখানে সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যতটুকু সম্ভব সবটাই করছে শাইয়ানরা। আজ শ্রাবণী পাকিস্তানি কুর্তি কামিজ পরেছে। সাধারণ কাজ করা এই পোশাকটিতে তাকে অসাধারণ লাগছে। কোমর সমান চুলগুলো দুহাতের সাহায্যে খোপা করতে করতে আশপাশটা দেখছিল সে, তখনই উক্ত কথাটি ভেসে এলো। শ্রাবণী সেই কন্ঠ অনুসরণ করে ঘুরে দাঁড়ালে দেখতে পেল কিছুটা কাছে একটি লম্বা গড়নের ছেলে দাড়িয়ে আছে। পরনে তার সি-গ্রীন শার্ট ও কালো প্যান্ট। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছেলেটিকে দেখতে শুনতে দরুন লাগলো শ্রাবণীর কাছে। শ্রাবণী উত্তর করলো না কিন্তু তাকিয়ে রইলো ছেলেটির দিকে পরবর্তী কথা শোনার জন্য। ছেলেটি এবার আলতো হেসে এগিয়ে কাছাকাছি দাঁড়ালো।
” আমি আদিল। কিছু মনে করবেন না আপনাকে এভাবে ডাকার জন্য।”
খাঁটি উর্দুতে বলা কথাগুলো শ্রাবণী বুঝতে পারল। কিন্তু নিজে কিভাবে বলবে বুঝতে পারছে না। কারণ তার উর্দু খুব একটা ভালো না। সে উর্দুর থেকে বেশি হিন্দি বলে ফেলে। বাংলা, হিন্দি আর উর্দুর সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়ে যায়। আহিরই তো মাঝে মাঝে ভীষণ রেগে যায়। না জানি এই লোক কি ভাবে!
ও অপ্রস্তুত হেঁসে বলল –
” সমস্যা নেই। আমি শ্রাবণী।”
ঠিকঠাকই তো বলেছে মনে হয়। ছেলেটি চিন্তিত হলো নাম শুনে।
” শ্রাবণী! আপনি কি গেস্ট?”
” জ্বী হ্যাঁ। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।”
ছেলেটি ভীষণ অবাক হয়ে বলল –
” সত্যি!”
শ্রাবণী হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল –
” হ্যাঁ।”
” বিশ্বাস হচ্ছে না।”
শ্রাবণী কপাল কুঁচকে বলল –
” আপনার কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলছি?”
ছেলেটি ঘাবড়ে গেল শ্রাবণীর রেগে যাওয়া দেখে। হরবড়িয়ে বলল –
” এই না না। আমি এমন ভাবিনি। আসলে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন শুনে অবাক হয়েছি একটু।”
শ্রাবণী প্রতিক্রিয়া দেখলো না। বরং গলার স্বর নরম করে বলল –
” আপনি কে?”
ছেলেটি এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খুবই নম্র ভাবে বলল –
” আমি আদিল শেখ।”
শ্রাবণী বিরক্ত। এটা কোনো কথা! এক নাম কয়বার শুনবে সে? আস্তো হাবা তো লোকটা।
” সে তো একবার বলেছেন। আমি জানতে চেয়েছি এই বাড়ির সাথে আপনার সম্পর্কটা কেমন?”
আদিল নামের ছেলেটির বোকা বোকা হেসে বলল –
” দুঃখিত বুঝতে পারিনি। আমি আহিরের বন্ধু। আবার বলতে পারেন কলিগ। আমরা একই অফিসে জব করি।”
” আপনিও ইঞ্জিনিয়ার?”
” জ্বী হ্যাঁ।”
” ওওওওওও।”
শ্রাবণী টেনে টেনে বলল।
” আপনার এই বাড়ির সাথে সম্পর্ক কেমন জানতে পারি? মানে বাংলদেশ থেকে এসেছেন তো তাই জানতে চেয়েছি।”
” আমি ঝুমির আত্মীয়।”
” ঝুমি?”
” আপনি বাবুদের আকীকা অনুষ্ঠানে এসেছেন?”
” জ্বী জ্বী।”
” বাবুদের আম্মুর নাম ঝুম। আমি আদর করে ঝুমি ডাকি। ও বাংলাদেশী।”
” হ্যাঁ হ্যাঁ আবার মনে পরেছে। আহির একবার বলে ছিল। দুঃখিত ভুলে গিয়ে ছিলাম।”
শ্রাবণী হাত নাড়িয়ে হেসে বলল –
” আরে কোনো ব্যাপার না।”
আদিল হেসে বলল –
” আপনাকে দারুন লাগছে দেখতে।”
শ্রাবণী কপাল কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। আদিল ঘাবড়ে গিয়ে বলল –
” দুঃখিত আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আপনি দয়া করে ভুল ভাববেন না।”
শ্রাবণী ছেলেটিকে ভয় পেতে দেখে খিলখিলিয়ে হেসে দিল। আদিল নামের ছেলেটা কথায় কথায় ঘাবড়ে যায়। তাকে ভয় পায়। এই বিষয়টি দারুন মজার লাগলো শ্রাবণীর কাছে। আদিল অবশ্য ওই হাসি দেখেই কুপোকাত। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো। শ্রাবণী হাসি থামিয়ে বলল –
” ধুর মিয়া ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি কিছু মনে করিনি।”
আদিল বুকে হাত দিয়ে বলল –
” আমি ভেবেছিলাম….”
বাকিটুকু শেষ করার আগে ভারি গলার স্বর ভেসে এলো –
” তুমি এখানে কি করছো শ্রাবণী?”
আকস্মিক আহিরের এভাবে বলায় শ্রাবণী হকচকিয়ে গেল। কিছু বলতে চাইলো কিন্তু তার আগে আবারো আহির বলে উঠলো –
” ভিতরে যাও।”
আহিরের চোখমুখ অন্যরকম। কিছু একটা হয়েছে বুঝে শ্রাবণী কথা বাড়ালো না। চুপচাপ কেটে পরলো। শ্রাবণী বাড়ির ভিতর প্রবেশ না করা পর্যন্ত আহির একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণী দৃষ্টির আড়াল হওয়ার পর আহির আদিলের পানে তাকিয়ে বলল –
” এখানে কি? ওর সাথে কি কথা বলছিলে?”
” আসলে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন ওনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কথা হলো। তাছাড়া মেয়েটি ভীষণ সুন্দর। ( লাজুক হেসে বলল) বুঝতেই পারছো বিয়ের বয়স হয়েছে।”
আহির চোখ ছোট ছোট করে তাকালো আদিলের দিকে। বিরক্তিতে মেজাজ খারাপ হয়ে আছে তার।
” ওর কথা ভুলে যাও।”
আদিল অবাক হয়ে বলল –
” কেন?”
আহির গম্ভীর গলায় বলল –
” ওনার বিয়ে হয়ে গেছে।”
” কিহ!”
বড়ই দুঃখ পেলো আদিল এই কথায়। শ্রাবণী নামের মেয়েটিকে তার সত্যিই দারুন লেগেছিল। ছেলেটা কথা বাড়ালো না আর। মন খারাপ করে চলে গেলো। আহির ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বকলো বেশ কিছুক্ষন।
” ওহ্, আপুর বিয়ে হয়েছে? আমি তো জানতামই না।”
আহির ও আদিলের সব কথাই ঝুম শুনছিল। শুরুতেই তার খটকা লেগে ছিল। তাছাড়া সেদিন রাতে যখন আহির আর শ্রাবণী বাড়ি ফিরল অনেক রাতে তখন ঝুম তাদের দেখে ফেলেছিল। ভেবে ছিল আহিরকে প্রশ্ন করবে কিন্তু এতো কিছুর মাঝে আর হয়ে ওঠেনি। আহির ঝুমকে দেখে অপ্রস্তুত হলো। কি বলবে বুঝতে পারল না।
” কি ভাইয়া? কাহিনী কি?”
আহির নার্ভাস হলেও বুঝতে দিল না ঝুমকে। দেখা যাবে কি না কি ভেবে উল্টা পাল্টা কাজ করে তাকে ফাঁসিয়ে দিবে। তখন মুসিবত বাড়বে বৈ কমবে না। তাই নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল –
” কিসের কি কাহিনী?”
” ওও এখন বুঝতে পারছেন না? ওনাকে মিথ্যা কেন বললেন?”
” কারণ ও ভালো ছেলে না।”
” তাই?”
” হুম।”
” তা কি করেছে উনি?”
” আরে ভাবি আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার বন্ধু আমি তো জানি কে কেমন হবে। ও ভালো হলে আমিই আপনাকে বলতাম।”
ঝুম জহুরী চোখে কিছুক্ষন পরখ করে নিলো আহিরকে। আহির ঝুমের ওভাবে তাকানো দেখে ঘাবড়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো –
” আপনি বাইরে কি করছেন? আপনার ছেলে-মেয়ে কোথায়? আর আপনার জামাই আপনাকে একা ছাড়লো?”
ঝুম ওর কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে যেতে যেতে বলল –
” মাঝে মাঝে জামাইকে ছাড়া ঘুরে বেড়াতে হয়, নয়তো অনেক কিছু চোখে পরে না।”
অতঃপর আহিরকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে সে চলে গেলো। আহির মুখে হাত চেপে শুধু দেখেই গেলো ঝুম নামের ভয়ানক রমণীকে। আজ হঠাৎ তার শাইয়ানের জন্য ভীষণ মায়া হলো। আহারে বেচারা। এই মেয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে আদোও কি সে কিছু করতে পারে? আহিরের খুব জানতে ইচ্ছা করলো।
আকীকা দিয়ে বাচ্চাদের নাম রাখা হলো। এবং একই সাথে বাচ্চাদের চুল ফেলে সেই চুলের সমান দান-সদকা দেয়া হলো। আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হলো খুবই গুরুত্বের সাথে। প্রত্যেকে বাচ্চাদের দোয়া ও উপহার দিয়ে গেল। শাইয়ান – ঝুমের বড় ছেলের নাম রাখা হলো জারিয়ান রেহমান আনসারী। মেজ ছেলের নাম রাখা হলো জাবিয়ান রেহমান আনসারী ও ছোট মেয়ের নাম রাখা হলো শাইয়্যারা রেহমান আনসারী। দুই ছেলের নাম তাদের মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে রাখা হলো। এবং মেয়ের নাম শাইয়ান নিজে তার নামের সাথে মিল রেখে রাখলো। ঝুম লক্ষ্য করেছে শাইয়ান দুই ছেলের থেকে মেয়েকে একটু বেশি আদর করে। বাবারা মেয়েদের বেশি ভালবাসে কি না? তাই হয়তো। শাইয়ান ও তার মেয়েকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয় সেও যদি একটু ভালবাসা পেতো তার বাবার, তাহলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় ঝুম আড় চোখে আহির, শ্রাবণীকে দেখে গিয়েছে। মনে মনে ভেবে নিলো শ্রাবণীকে তার সাথে পাকিস্তানে স্থায়ী ভাবে রেখে দিলে কেমন হয়?
সেদিনের মতো সে চুপ থাকলেও পর দিন এই কথা সে মেহেরুন্না ও আহিরের মায়ের কাছে বলল। তারা বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবে ভেবে দেখলেন। শ্রাবণী খারাপ মেয়ে না। দেখতে শুনতেও ভালো। শিক্ষিত মেয়ে। আহির ও শ্রাবণীর মাঝে সম্পর্কও বেশ ভালো। সুতরাং তারা ভাবলো মিসেস বিথীর সাথে এই ব্যাপারে একবার কথা বলে দেখবেন। ছেলে-মেয়ের কানে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের অনুমতি নেয়াটাও জরুরি। শ্রাবণীকে যেমন তাদের পছন্দ হয়েছে তেমনি আহিরকেও তো মিসেস বিথীর পছন্দ হতে হবে। ঝুম যদিও নিশ্চিত ছিল, আহিরকে মিসেস বিথী মেনে নিবেন। তবুও বড়দের সিদ্ধান্তকে সে সন্মান জানিয়ে চুপ রইল।
এরপর তারা মেয়ে মহল মিলে মিসেস বিথীর কানে কথাটি তুললে সে এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। আহিরের মতো ছেলেকে বারণ করার মতো বোকা সে নয়। আহির লাখে একটা ছেলে। এমন ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পারলে সে নিশ্চিন্ত হবেন। অতঃপর তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলে-মেয়েকে বলে দ্রুত শুভ কাজ সেরে ফেলবেন। কারণ মিসেস বিথীদের বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সময় এসে গিয়েছে। শাইয়ান যখন এই কথা জানতে পারল প্রথমেই সে বারণ করে দিল। তার মতে আহিরকে না জানিয়ে আগ বাড়িয়ে এসব ভাবা বা করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু ঝুম তার কথায় বেজায় নারাজ। সে কিছুতেই শুনতে চাইলো না শাইয়ানের কথা।
ঝুম দেখেছে আহির ও শ্রাবণীর কষ্ট। তারা কতটা সাফার করেছে তা ঝুম কাছ থেকে দেখেছে। দুটো ভাঙা মনের মানুষ একে অন্যকে যেভাবে বুঝবে আগলে রাখবে তা অন্য কেউ পারবে না। আর সে আহিরের চোখে শ্রাবণীর জন্য কিছু একটা দেখেছে। যা মিথ্যে না। তারা একে অপরের সাথে সময় কাটিয়ে ভালো থাকে। তাহলে সারা জীবন এক সাথে থাকলে ক্ষতি কি? শাইয়ান যদিও ঝুমের চিন্তা বুঝতে পারে কিন্তু এসব করা যে ঠিক হচ্ছে না বেচারা সেই কথাটি বউকে কিছুতেই বুঝাতে পারল না। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা যে হিতে বিপরীত হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে, ঝুম জানতো না হয় তো। তাই তো সে যেমন ভেবে ছিল তেমন কিছুই হলো না উল্টো সবটা ঘেঁটে গেলো একদম।
দুদিন পরের এক সন্ধ্যাবেলার ঘটনা।
সেদিন সকলে এক সাথে বসে নাস্তা করলো। এরপর শাইয়ানের দাদাজান সকলের উদ্দেশ্যে বলল –
” সকলকে আমার কিছু বলার আছে।”
যদিও সেখানে উপস্থির অধিকাংশই জানতো কি বিষয়ক কথা, কিন্তু এরপরও তারা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে। শাইয়ান থমথমে মুখে চুপচাপ বসে। তার এসব ভালো লাগছে না। সে হাসপাতালে ছিল। জরুরী তলব করে তাকে আনা হয়েছে। সে ঝুমকে বুঝাতে না পেরে মেহেরুন্নেসাকে বলেছিল। কিন্তু তার মাও তার বউয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তাকে পাত্তা দিলো না। এমন কি তার বাবা, দাদা কেউ তার কথা শুনল না। সে আহিরকে চেনে। এসব কান্ডের পর আবার না বাড়ি ছাড়ে ছেলেটা।
” আহির শাইয়ান আর আপনি সমবয়সী। সে এখন তিন সন্তানের জনক। কিন্তু আপনি এখনো বিয়েই করেননি। এতদিন সময় চেয়েছেন আমরা আপনাকে সময় দিয়েছি। আপনার সিদ্ধান্তকে সন্মান জানিয়েছি। কিন্তু এবার আপনাকে আমাদের সিদ্ধান্তকে সন্মান জানাতে হবে।”
আহির কি বলবে বুঝতে পারল না। হঠাৎ কি এমন হলো যে দাদাজান এই কথা বলছে? সে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে রইলো বাকি কথা শোনার জন্য। দাদাজান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল –
” আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আপনার বিয়ে দিব। মেয়ে আমাদের পরিচিত।”
” কিহ!”
আহির বসা থেকে দাঁড়িয়ে পরলো। তার দুনিয়া হঠাৎ করে নড়ে উঠলো যেন। চোখের সামনে জোনাকি পোকা উড়ছে। তাকে আরো অবাক করে দিয়ে দাদাজান। তার পরবর্তী কথাটি বললেন।
” মেয়ে আমাদের শ্রাবণী।”
Remedy part 33
এবার শুধু আহিরই নয়, শ্রাবণীও ভীষণ অবাক হলো। সে অবাক চোখে চাইলো আহিরের দিকে। আহিরও ঠিক একই সময় তাকিয়ে পরলো শ্রাবণীর চোখে। দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো মুহূর্তে। আহির সেই চোখে কিছু একটা খুঁজলো। কিন্তু পেলো না। শ্রাবণী দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলে আহির চোখ ঘুরিয়ে তাকালো ঝুমের দিকে। দেখলো মেয়েটির চোখমুখ খুশিতে ঝলমল করছে। আহিরের বুঝতে কষ্ট হলো না এই অকাজ কে করেছে। এমন কিছু নিয়েই সে ভয়ে ছিল। সে এবার শাইয়ানের দিকে তাকালো শাইয়ান শুধু ফোঁস করে একটি নিশ্বাস ছেড়ে ঠোঁট নাড়িয়ে সরি বলল। আহির কিছুই বলল না। শুধু বুক ভর্তি বেদনা নিয়ে অস্পষ্ট ভাবে একটু হাসলো। অপেক্ষা করল শ্রাবণীর কিছু বলার কিন্তু শ্রাবণী সেই যে মাথা নিচু করে চুপ করলো আর মাথা তুলল না। আহির তাকিয়েই রইলো ওর দিকে। অতঃপর কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে সেই মুহূর্তে বাড়ি ছাড়লো।
