Remedy last part
মীরা রায়াদ
আহির বাড়ি ছেড়েছে বেশ কিছুদিন হলো। আকস্মিক সেই ঘটনার পর বাড়ির পরিবেশ থমথমে। এমন কিছু কেউ আশা করেনি। সব থেকে বেশি প্রভাব ঝুমের ওপর পরেছে। কেন কি জন্য আহির এমনটা করলো সে বুঝতে পারছে না। শ্রাবণীও অদ্ভুত ভাবে একদম শান্ত হয়ে গিয়েছে। কারো সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলছে না। সেদিনের পর আহিরের কোনো খোঁজও কেউ জানে না। কারো সাথে যোগাযোগ করছে না। আহিরের চিন্তায় তার মা সজ্জাশয়ী। এই সবকিছুর জন্য ঝুম নিজেকে দায়ী মনে করছে। মনই মন ভীষণভাবে ভেঙে পরেছে। শাইয়ান সব দেখেও শান্ত। তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে সবটা নীরবে দেখে যায় শুধু। তার করারও কিছু নেই। সবাইকে আগেই সতর্ক করে ছিল। কিন্তু কেউ শুনলে তো তার কথা! এখন যা করার নিজেরা করুক, সে এসবের মাঝে নেই।
শাইয়ান গুরুত্বপুর্ণ কাজ করছিল গভীর মনোযোগের সাথে। ঝুম বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে ওর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো। শাইয়ান দৃষ্টি না তুলে একইভাবে কাজের মাঝে ডুবে থেকে বলল –
” কিছু বলবেন পাখি?”
ঝুমের চোখ ভিজে এলো। অপরাধবোধের কারণে সে কারো মুখোমুখি হতে পারে না আজকাল। মনে হয় যা কিছু হয়েছে বা হচ্ছে সব কিছুর জন্য সে নিজে দায়ী। শাইয়ানও কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে তাকে এড়িয়ে চলে। সে কাউকে বুঝাতে পারছে না যা কিছু করেছে তা সবার ভালোর কথা ভেবে। শ্রাবণীকে সরাসরি বললে সে কখনো রাজি হতো না এই প্রস্তাবে। তাছাড়া কেউ জানুক না জানুক ঝুম জানে আহিরের মনে শ্রাবণীর জন্য কিছুটা হলেও অনুভূতি রয়েছে। তাইতো ভেবে ছিল বড়দের সাথে কথা বললে যদি কিছু একটা হয়ে যায় ক্ষতি কি তাতে?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঝুম শব্দ করলো না একটিও। শাইয়ান এবার মুখ তুলে তাকালো ঝুমের দিকে। মেয়েটা কয়েকদিনের মাঝে একদম মূর্ছে গিয়েছে। চোখের নিয়ে কালির প্রলেপ, সাথে শারীরিক অবনতি। সব মিলিয়ে কেমন রোগা-পাতলা লাগে এখন। বাচ্চাগুলোর জন্য ঘুমাতেও পারে না। তাছাড়া শাইয়ানও রাগ দেখিয়ে কিছুদিন দূরে দূরে ছিল ওর থেকে। নিজের এই ব্যবহারে অনুতপ্ত হলো শাইয়ানের অন্তর আত্তা। ঝুমের মুখপানে তাকিয়ে হঠাৎ বড়ই অসহায়বোধ করলো শাইয়ান। হাতের কাজ ফেলে দুহাতে কাছে টেনে ঝুমকে নিজের কোলে বসিয়ে দিলো। অতঃপর ঝুমের কোমরে একহাত ও অন্যহাত মাথার পিছে রেখে আরো কাছে টেনে ঝুমের মাথা নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। হার্টটা খুব দ্রুত বিট করছে কি! অত্যধিক দ্রুত। এতদিনের অস্থিরতা আস্তে ধীরে ঠিক হচ্ছে। মেয়েটা যে কি যাদু করলো তাকে? ঝুম শাইয়ানের বুকে পরে কেঁদে ফেলল। তার এতো খারাপ লাগছিল এই কয়দিন! কি হয়ে গেলো তার জন্য? ভাইয়া কোথায় চলে গেলো? ঝুম আকুল হয়ে কাদলো। কান্নার ফলে হিচকি তুলে ফেলেছে। নিশ্বাসও নিতে পারছিল না মেয়েটি। শাইয়ান এতক্ষন কিছু না বললেও এবার বলল।
” সব ঠিক আছে পাখি। শান্ত হন। কান্না থামান।”
ঝুম কাদতে কাদতে অস্পষ্ট স্বরে বলল –
” কিছু ঠিক নেই ডক্টর। আমি সব শেষ করে দিয়েছি। সব আমার জন্য হয়েছে।”
শাইয়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল –
” যা হওয়ার হয়ে গেছে আরীবা। তখন আমার কথা শুনলে এমনটা কখনো হতো না।”
” আমি আমি তো ভাইয়ার কথা ভেবে করে ছিলাম বিশ্বাস করুন। ভাইয়ার চোখে আপুর জন্য অনুভূতি দেখেছি। বিশ্বাস করুন ডক্টর আমি মিথ্যা বলছি না।”
” জানি।”
ঝুম মাথা তুলে অবাক হয়ে জানতে চাইলো –
” জানেন?”
” হুম।”
ঝুম বুঝতে পরছে না কি জানার কথা বলছে শাইয়ান। তাই নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করল –
” ভাইয়া আপুকে পছন্দ করে আপনি জানেন?”
শাইয়ান ভারী গম্ভীর গলায় ঝুমের চোখে চোখ রেখে বলল –
” আহির শ্রাবণীকে ভালবাসে আরীবা।”
” কিহ!”
ঝুম এতটাই অবাক হলো যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। উত্তেজনায় তার শরীর কাপছে মৃদু মৃদু। শাইয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো।
” আমি পূর্ব থেকে অবগত ছিলাম।”
ঝুম কিছুই বলল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শুধু। ভালবাসে! কই সে তো বুঝতে পারল না। ভালই যখন বাসে তাহলে ওভাবে চলে গেলো কেনো?
” আমি কিছু বুঝতে পরছি না ডক্টর। দয়া করে আমাকে খুলে বলুন সবটা।”
” আমারা দেশে ফিরে আসার পরও শ্রাবণীর সাথে আহিরের যোগাযোগ ছিল সেটা কি জানেন আপনি?”
” হুম।”
” পাভেল শ্রাবণীর সাথে যা করে ছিল দেখতে গেলে তার কিছুটা হলেও কিন্তু আহির জারার সাথে করেছে। তারওপর শ্রাবণীর পরিস্থিতি স্বচক্ষে উপলব্ধি করে ভীষণভাবে ভেঙে পরে ছিল আহির। বারবার নিজেকে দোষ দিতো ওই সময়। নিজেকে অপরাধী মনে করতো। জারার সাথে করা অপরাধ ও শ্রাবণীকে করা শুরুতে অপমান সবটাই নিজের মাঝে দাবিয়ে রেখে একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এরপর শ্রাবণীকে কাছ থেকে জানা। ওনাকে নিয়ে ভাবা, ওনার প্রতি সহানুভুতি অনুভব করা, সবটাই ধীরে ধীরে আহিরকে শ্রাবণীর দিকে টেনে নেয়। কথায় আছে একটি পুরুষ ও একটি নারী দীর্ঘক্ষণ নিজেদের সাথে সময় কাটালে নিজেদের মাঝে আকর্ষণ অনুভব করে। আহিরের ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছিল। তার ওপর শ্রাবণীর প্রতি আহিরের আলাদা টান তো ছিলই ওনার অতীতের জন্য। শ্রাবণীর ব্যাপারটা আমি নিশ্চিত নই। তবে আহিরের অনুভূতি নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। কারণ সে আমাকে এই ব্যাপারে আগেই বলে ছিল।”
ঝুম বাকরুদ্ধ। শাইয়ান আগে থেকেই জানতো সব? তাকে কিছু কেন জানানো হয়নি? সে কি এতটাই পর ওনাদের? ঝুম কষ্ট পেলো খুব। তিক্ত অনুভূতির কারণে কথা বলতে পারলো না, কিন্তু চোখ তার বারণ শুনতে নারাজ। সে আপন গতিতে জল গড়িয়ে দিতে লাগলো। শাইয়ান কিছু বুঝলো কি না বোঝা গেলো না। সে হাত বাড়িয়ে ঝুমের গাল গড়িয়ে পরা চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল –
” তখন আপনি প্রেগনেন্ট ছিলেন। আপনি এতটাই দুর্বল আর চিন্তিত থাকতেন যে আমাদের সাহস হয়নি এই ব্যাপারে আপনার কাছে কিছু বলার। তবে আহির শীঘ্রই আপনাকে সব বলতো।”
ঝুম তাচ্ছিল্য করে হেঁসে বলল –
” বলতো? সত্যিই কি বলতো ডক্টর?”
শাইয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল –
” মানে? কি বলতে চান আপনি?”
” ভাইয়ার যদি আমাকে বলারই থাকতো তাহলে আজ দুপুরে কেনো এড়িয়ে গেলো?”
শাইয়ান এবার চমকে উঠলো। দুপুরের কথা সে জানে না। কি হয়ে ছিল?
” মানে?”
” আজ দুপুরে ভাইয়ার কাছে আমি জানতে চেয়ে ছিলাম। অথচ তিনি খুব নিপুণ ভাবে ব্যাপারটি এড়িয়ে গিয়ে ছিল। ভাইয়া বলেনি আমায় ডক্টর। বুঝলাম তার ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই। কিন্তু আপনি? আপনিও তো আমার থেকে সবটা লুকিয়েছেন ডক্টর।”
ঝুমের কন্ঠস্বর মিইয়ে এলো। তার আজ হঠাৎ করে খুব অসহায় লাগলো নিজেকে। সে কি এতটাই বিশ্বাসের অযোগ্য ছিল? পূর্ব থেকে সবটা জানা থাকলে আজ এমন পরিস্থিতি কি আসতো?
শাইয়ানের বুঝতে সমস্যা হলো না ঝুম তাদের ভুল বুঝছে। তাই ব্যতিব্যস্ত হয় পরলো সে।
” পাখি আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে। আমি আপনার থেকে কিছু লুকাইনি। আহির কেন আজ এড়িয়ে গিয়েছে আমি জানি না, কিন্তু ও আপনাকে জানানোর কথা নিজে আমাকে বলে ছিল। হয়তো কিছু একটা ভেবে বলেনি। কিন্তু আপনি আমাদের ভুল বুঝবেন না দয়া করে অনুরোধ করছি আমি। আমি ভেবে ছিলাম যার ব্যাপার সে আপনাকে নিজে থেকে বললেই ভালো হবে। তাছাড়া আপনি তো জানেন আপনাদের মাঝে আমি কখনই কথা বাড়াই না।”
” ভাইয়ার সাথে আপনার যোগাযোগ হয় তাই না?”
শাইয়ান এই পর্যায়ে এসে মিইয়ে গেলো। মুখটা কাচুমাচু করে ইতিউতি করে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঝুমের জহুরী নজর এড়িয়ে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না।
” বলুন ডক্টর।”
” ইয়ে মানে।”
” হুম শুনছি বলুন।”
শাইয়ানের মতো পুরুষ বউয়ের ভয়ে কথা বলতে পারছে না। এই কথা অন্য কেউ জানতে পারলে তার মান-ইজ্জত কি থাকবে? থাকলে থাকুক নয়তো লাগবে না। সত্যি তো এইটাই শাইয়ান তার বউকে ভয় পায়।
” হুম।”
” হুম কি?”
” হয়।”
ঝুম ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ালো শাইয়ানের কোল থেকে। শাইয়ান চোরা চোখে দেখল সব, কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস করলো না। ঝুম উঠে দাড়িয়ে কোমরে হাত রেখে
বলল –
” আপনাদের কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমি ভীষন হতাশ ডক্টর। ছোট চাচী শারিরীক ভাবে ভেঙে পরেছে দেখেও আপনি চুপ করে ছিলেন? আশ্চর্য!”
শাইয়ান মৌন থাকাই উত্তম বলে মনে করলো। তাই উত্তর করলো না। মাথা নিচু করে বসে রইলো।
” তা সেই মহারাজা আছেন কোথায় এখন?”
” ওর অফিস কোয়ার্টারে।”
” কিহ! কিন্তু ওনার অফিসে তো খোঁজ নেয়া হয়েছিল। তারা যে বলল ভাইয়া অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে।”
” হুম।”
” তাহলে কিভাবে কি?”
” আহির অফিস থেকে বছর দুয়েক আগে ফ্লাট পেয়েছিল। যেটি সে ব্যবহার করতো না। তাই কাউকে জানায়নি কখনো।”
ঝুম চোখ ছোট ছোট করে চাইলো শাইয়ানের দিকে।
” ফোন লাগান ওনাকে।”
” আচ্ছা।”
শাইয়ান তার সামনে রাখা টেবিল থেকে ফোনটি তুলে কল লাগালো আহিরকে। রিং বাঁজতে বাঁজতে এক সময় ফোনটি কেটে গেল। শাইয়ান আবারও কল লাগালো। এবার দুবার রিং বাঁজার সাথে সাথে কলটা ধরে ফেলল ওপাশ থেকে। শাইয়ান ফোন লাউডে দিয়ে পুনরায় টেবিলের ওপর রাখলো।
” আসসালামু আলাইকুম।”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো আহির? ফোন ধরতে দেরি হলো কেনো? সব ঠিক আছে?”
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। চিন্তা করো না। ফোন সাইলেন্ট মুডে ছিল বলে খেয়াল করিনি। দুঃখিত। তোমারা কেমন আছো? ওখানে সব ঠিক আছে?”
” আলহামদুলিল্লাহ্। এখানে পরিস্থিতি আগের মতোই।”
” ওহ।”
” আহির।”
” হুম।”
” আরীবা আপনার সাথে কথা বলতে চায়।”
ওপরপাশ থেকে পরপর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো শুধু। অতঃপর ধীরে বলল –
” জেনে ফেলেছে সব?”
” হুম।”
” এখন কি তোমার পাশে?”
” হুম।”
ওপাশ থেকে পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে গেল সব। ঝুম এগিয়ে এসে বলল –
” ভাইয়া।”
আহির কখনোই এই ডাককে এড়িয়ে যেতে পারে না। যতো যাই হোক ঝুমের জন্য তার সন্মান, স্নেহ কখনোই কমবে না।
” জ্বী ভাবি। ভালো আছেন?”
ঝুম হঠাৎ করে গলায় ব্যাথা অনুভব করলো। কান্নাগুলো যেন গলায় পাক লাগিয়ে চেপে বসে আছে। ভারী হয়ে আসা গলায় বলল –
” ভালো নেই ভাইয়া আমরা কেউ। আপনি আপনার ভাইয়ের মতো তো পাষাণ না। তাহলে কিভাবে এমন করলেন? না হয় আমরা একটা ভুল করেছি। আপনি বললেই হতো কিন্তু তাই বলে যোগাযোগ বন্ধ করে কি ঠিক করেছেন? এটা কেমন বাচ্চামো ভাইয়া? আপনাকে ভীষণ মনে পরে আমাদের। ফিরে আসুন। বাচ্চারাও একা হয়ে গিয়েছে।”
আহির হাসলো আলতো। ভীষণ নরম গলায় বলল –
” শান্ত হন ভাবি। নয়তো আপনার স্বামী আমাকে গুলি করে দিবে আপনাকে কাঁদানোর অপরাধে।”
ঝুম নাক টেনে চোখ ছোট ছোট করে শাইয়ানের দিকে তাকালো। শাইয়ান কিছুই বলল না, বরং গম্ভীর মুখ করে ঝুমকে দেখে গেলো।
” আসবেন কবে ভাইয়া।”
” আর কিছুদিন যাক ভাবি, তারপর দেখা যাবে।”
” আমাকে কেনো বললেন না একবার ভাইয়া? আমি কি এতটাই পর ছিলাম? বুঝিয়ে বললে কি বুঝতাম না?”
আহির চুপ করে রইলো কিছুক্ষন। তারপর ঝুমকে বুঝানোর মতো করে বলল –
” আপনি পর না ভাবি। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে আমি আপনাকেই আগে বলতাম। কিন্তু তার আগে শাইয়ান ধরে ফেলেছিল।”
” তাহলে সেদিন কেন বললেন না?”
” সেদিন আপনাকে বললেও কি আপনি আমাকে বুঝতেন ভাবি? আপনি যেটা দেখেছেন বা শুনেছেন তা নিয়ে অনেক বেশি খুশি ছিলেন। আমি বুঝিয়ে বললেও আপনি বুঝতে চাইতেন না। বরং এমন কিছু করতেন যাতে শ্রাবণীর ওপর প্রভাব পরতো।”
ঝুম জানে আহির ঠিক বলছে। সেদিন তাকে বললেও হয়তো ঝুম আমলে নিতো না।
” ভাইয়া।”
” হুম।”
” আপু আপনাকে ফোন দিয়ে ছিল।”
ফোন! একটা ফোন যদি দিতো মেয়েটা! কিছু যদি বলতো! কিন্তু নাহ্। সে ফোন দেয়নি। এমনকি সেদিনের পর তাদের আর কথাও হয়নি।
” নাহ্।”
” আপু কখনো আপনাকে কিছু বলেনি?”
” ভাবি শ্রাবণীর মনে আমার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই। ওর চোখে আমি কেবলমাত্র একজন বন্ধু। খুব ভালো বন্ধু। আর আমি সেই বন্ধুত্বের জায়গাটি হারাতে চাইনি বলেই সেদিন পালিয়ে এসেছিলাম।”
” কিন্তু ভাইয়া এমনও তো হতে পারে যে আপু চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। হয়তো আপনাকে ভুল বুঝছে আপনার ওভাবে চলে যাওয়ার কারণে।”
” কিছু মানুষের চোখ মনের কথা বলে দেয় ভাবি। শ্রাবণীও তেমন একটি মানুষ। আমি কখনো ওর চোখে নিজের জন্য কোনো অনুভূতি দেখিনি। আপনার কাছে অনুরোধ আমার আপনি এই বিষয়ে শ্রাবণীকে কিছু বলবেন না।”
” সে না হয় বললাম না। কিন্তু ভাইয়া আমার মনে হচ্ছে আপনি এবার ভুল ভাবছেন। কেন যেন মনে হচ্ছে আপুও আপনাকে চায়।”
ঝুম উত্তেজিত হয়ে পরলো। তার কন্ঠস্বর কাপছিলো। ওর এভাবে বারবার জোর করায় শাইয়ান রেগে গেলো। মেয়েটা একবার গোলমাল করে শান্তি পায়নি নাকি? আবার শুরু করেছে। সে এবার কিছুটা রাগ নিয়েই বলল –
” অনেক হয়েছে আরীবা। আপনি এবার থামুন। আহিরের ব্যাপার আহিরকেই বুঝতে দিন। আপনি আর এই ব্যাপারে একটি কথাও বলবেন না।”
” কিন্তু ডক্টর আমার কথা বোঝার চেষ্টা…।”
ঝুমকে স্বপূর্ণ বাক্য শেষ করতে না দিয়েই শাইয়ান ধমকে বলল –
” ইনাফ ইজ ইনাফ আরীবা। আর কোনো কথা না।”
ঝুম পাথর নয়নে তাকিয়েই রইলো, একটি কথাও বলল না। শুধু তাকিয়ে আগুন চোখের সেই শাইয়ানকে দেখে নীরবে চলে গেলো বাচ্চাদের কাছে।”
” সমস্যা কি তোমার শাইয়ান। হুটহাট রেগে যাও কেনো? ওনার ওপর এভাবে চেঁচানোর কোনো মানে আছে? বেশি বেশি করলে না?”
শাইয়ান উত্তর করলো না। বরং টেবিলের ওপর দুহাতের কনুই রেখে মাথা চেপে ধরলো। কয়েকদিনে কাজের চাপ বাড়ির অশান্তি সব মিলিয়ে শাইয়ান ডিস্টার্বড ছিল খুব। যার ফলস্বরূপ মাত্র হওয়া ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল।
” পরে কথা বলবো তোমার সাথে। রাখছি।”
ওপর পাশের মানুষটির কথা শোনার প্রয়োজনবোধও করলো না শাইয়ান। তার আগেই খট করে কল কেটে দিল। অতঃপর ওভাবেই বসে রইলো বেশ কিছুক্ষন। মনে মনে সে অনুতপ্ত হলেও যা করার করে ফেলেছে। ঝুমকে সে না চাইতেও কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। এখন কি করবে মাথায় আসছে না। বসে বসে নানান রকম চিন্তা ভাবনার পর উঠে দাড়ালো শাইয়ান। ঝুমের কাছে ক্ষমা চেয়ে শাস্তি চেয়ে নিবে, তাও ঝুমকে কষ্ট পেতে দিতে সে নারাজ। কিন্তু তার চিন্তায় এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে ঝুম ঘুমিয়ে গেলো। শাইয়ান ভীষণ হতাশ। আরো একটু আগে এলে কি ঝুমকে পেতো? ঝুম রোজকার মতো শুয়ে নেই। বরং বেডের এক সাইডে গিয়ে শুয়ে আছে। তারপর তাদের তিন বাচ্চা, এবং এরপর শাইয়ানের জন্য জায়গা রাখা। কিন্তু অন্যান্য দিন দৃশ্য ভিন্ন থাকে। বাচ্চাদের জন্মের পর তাদের বেড বদলে আকারে বড় ও পাঁচজন আরামে ঘুমাতে পারবে এমন বেড নিয়ে আসে শাইয়ান। এবং তখন থেকে শাইয়ান ঝুমের ডান পাশে ঘুমায় আর বাচ্চারা ঝুমের বাম পাশে। বেডের তিন পাশে উচুঁ করে বাউন্ডারি টানা বলে বাচ্চাদের পরে যাওয়ারও ভয় থাকে না। এতদিন নিজের সাথে রেখে অভ্যাস করে আজ কিনা এতো দূরে গিয়ে ঘুমিয়েছে? সবটাই কি তখনকার আচরণের জন্য? এসব কি মানা যায়? শাইয়ান ভারী বিরক্ত। এখন বাচ্চাদের নাড়ালে ওরা উঠে যাবে। আর একবার ওরা উঠে গেলে ঝুমের আর ঘুম হবে না। তখন না আবার আরো বেশি রেগে যায় মেয়েটা। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে আজকের রাত্রিটি সে ঝুম বিহীন ছটফটিয়ে কাটালো।
” আমার আপনাদের কিছু বলার ছিল।”
সকলে রাতের খাবার খেতে টেবিলে উপস্থিত হলে শ্রাবণী ধীর ও নরম স্বরে কথাটি বলল।
শাইয়ানের দাদাজানের মুখভঙ্গি গম্ভীর। আশি বছরের মুরব্বি গোছের লোকটির নূরানী মুখোয়াবের দিকে তাকালে মন থেকে সন্মান করতে ইচ্ছে করে। শ্রাবণী সকলের ওপর কথা বলতে পারলেও এই লোকটির সামনে তাকে অসন্মান করার মতো কোনো কথা বলতে পারবে না। কিন্তু এছাড়া যে এই মুহূর্তে কিছু করারও নেই তার।
” দাদাজান আমি দুঃখিত।”
শাইয়ানের দাদাজান নরম চোখে চাইলো শ্রাবণীর দিকে।
” আপনি দুঃখিত বলছেন কেন শ্রাবণী? বরং আমাদের আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। যা কিছু হয়েছে এতে আপনার কোনো দোষ নেই। আমাদের আরো ভালোভাবে জেনে বুঝে আপনাদের সামনে প্রস্তাব রাখা উচিত ছিল।”
” দাদাজান দয়া করে এভাবে বলবেন না। আমি লজ্জিত সব কিছুর জন্য। তাছাড়া আমি অন্য ব্যাপারে কথা বলতে চেয়ে ছিলাম।”
সকলে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলো কি ব্যাপারে। মিসেস বিথী থমথমে চেহারায় বসে আছেন। সে এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে রাজি নয়। তার মেয়েকে অপমান? আহির ছেলেটিকে সে যতটা ভালো ভেবে ছিল, ততটা ভালো নয়। আস্তো বজ্জাত। শ্রাবণী মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবারও দাদাজানের দিকে তাকিয়ে বলল –
” আমরা বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছি। টিকেট কেটে ফেলেছি। আগামী পরশু রাত ৮ টায় ফ্লাইট।”
” কিহ!”
ঝুম খাবার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। তার বিশ্বাস হচ্ছে না শ্রাবণী তাকে না জানিয়ে এতবড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সেখানে বসা প্রত্যেকে ভারি অবাক। এতো দ্রুত? তাও কাউকে কিছু না বলে? এর পিছনের কারণটি সবারই জানা, তবুও মানতে নারাজ। শ্রাবণী ঝুমের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে। সে বলতে পারলো না, এই সিদ্ধান্ত তার মায়ের। সেতো আরো কিছুটা অপেক্ষা করতে চেয়েছিল। দাদাজান নিশ্বাস ছেড়ে বলল –
” আপনাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে কিছু বলার মুখ আমার নেই। যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন তখন তো আর কিছু করার নেই। তবে আরো কিছুদিন থেকে গেলে খুশি হতাম আমরা।”
শ্রাবণী মাথা নিচু করে বলল –
” আমার আচরণের জন্য আমি দুঃখিত।”
” কোনো ব্যাপার না। নিন খাবার শুরু করুন।”
” এসব হচ্ছে কি আপু? তোমরা চলে যাবে? আমাকে আগে বললে না কেন?”
খাবার শেষে যে যার রুমে চলে গেলে ঝুম নিজের ঘরে না গিয়ে শ্রাবণীদের সাথে তাদের ঘরে চলে আসে। এসেই অস্থির ভাবে কথাগুলো বলে ওঠে। ঝুমের মনে হচ্ছে তার একটা সিদ্ধান্ত সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তার জন্য এসব কিছু হচ্ছে।
” ঝুমি শান্ত থাক।”
” শান্ত? আন্টি তুমি তো কিছু বলো আপুকে।”
মিসেস বিথী ঝুমের অস্থিরতা দেখলেন। মেয়েটা পারলে কেঁদে দিতো এখনই। তিনি ঝুমকে হাত ধরে পাশে বসিয়ে বললেন –
” আমিই বলেছি যাওয়ার কথা।”
ঝুম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো –
” তুমি? কিন্তু কেন আণ্টি?”
” দেখ মা, এটা তোর শশুরবাড়ি। আমরা কতদিনই বা এখানে আর থাকবো? তাছাড়া যা হয়েছে তুই তো বুঝতেই পারছিস। আমাদের এখানে আর থাকা ঠিক হবে না।”
ঝুম এবার কেঁদে দিলো।
” কিন্তু আণ্টি আমাকে একবার বলতে পারতে। এভাবে সবাই কেন পর করে দিচ্ছ আমাকে?”
মিসেস বিথী বেশি কিছু বললেন না, বরং ঝুমকে বুকে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মেয়েটি তার প্রিয় বান্ধবীর শেষ চিহ্ন। কতগুলো দিন তাদের সাথে থেকেছে। কখনো সে নিজের ছেলে-মেয়ের থেকে কম মনে করেননি। অথচ সেই মেয়েটিকে মন চাইলেই তারা দেখতে পারবে না। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!
মিসেস বিথীকে ছেড়ে ঝুম শ্রাবণীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে শ্রাবণীর দুহাত ধরে বলল –
” আপু তুমিও কি যেতে চাও?”
শ্রাবণী মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা উপর-নিচ নাড়িয়ে উত্তর দিল। ঝুম নিজের হতাশা ভরা মন নিয়ে আর দাড়ালো না সেখানে। পা বাড়ালো নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে। তার শেষ আশাটিও নিভে গেল। তবে কি আহিরই ঠিক? শ্রাবণীর মনে সত্যিই আহিরের জন্য কোনো অনুভূতি নেই? অন্যমনস্ক হয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই কিছু একটার সাথে ধাক্কা লেগে ঝুম সোজা মেঝেতে পরতে পরতে বাঁচলো। চোখ তুলে দেখলো একহাত শাইয়ান আঁকড়ে ধরে আছে। কিছুদিন পূর্বেই তার অপারেশন হয়েছে। এখন যদি পরে যেতো তাহলে কি হতো? ভেবেই ঝুমের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
” অদ্ভুত! আপনি এতো অন্যমনস্ক কেন? পরে গেলে কি হতো জানেন?”
ঝুম খুব নিখুঁত ভাবে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শাইয়ানকে পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। শাইয়ান বুঝলো রাগ এখনো পরেনি। আজ সারাদিনই এসব চলেছে। মানে শাইয়ানকে এড়িয়ে চলা আর কি। শাইয়ান যে চেষ্টা করেনি তা নয় কিন্তু ফলাফল শূন্য। শাইয়ান এক পলক বাচ্চাদের দিকে তাকালো। যারা এখন গভীর ঘুমে। খাওয়ার কিছুক্ষন আগেই সবগুলো ঘুমিয়েছে। শাইয়ান বুঝতে পারল ঝুমের আজকে রাতের ঘুমও হারাম হতে চলেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঝুম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। শাইয়ান এবার কোনো রিস্ক নিলো না। সোজা ঝুমকে কোলে তুলে বেলকনিতে নিয়ে চলল। ঝুম যদিও প্রতিক্রিয়া করলো না। এতে শাইয়ান ভালই অবাক হয়েছে। এতক্ষনে তো ঝুমের রেগে চিৎকার করা উচিত ছিল। কিন্তু না ঝুম শান্ত। শাইয়ান তাকে বেলকনিতে নামিয়ে দিয়ে বসলো মেঝেতে। পরপর ঝুমকেও টেনে তার কোলে বসিয়ে দিয়ে বলল –
” জানি খুব রেগে আছেন। সরি বললেই মাফ হবে না তাও জানি। তবুও ভীষণ দুঃখিত। আমার ওভাবে কথা বলা উচিৎ হয়নি।”
ঝুম তেমন কোনো ভাব প্রকাশ করল না। শুধু ছোট্ট করে বলল –
” আচ্ছা।”
শাইয়ান বিচলিত হলো। ঝুম এমন না। তার রাগ করা উচিত, কান্না করা উচিত ছিল, শাইয়ানকে বকা দিলেও ঠিক ছিল। কিন্তু তেমন কিছুই করছে না। কেন করছে না?
” পাখি তাকান আমার দিকে। দেখুন আমি দুঃখিত। আর কখনো এমন আচরণ করবো না। আপনি আমাকে মারুন, বকা দিন, যা ইচ্ছা তাই করুন। তাও দয়া করে আমার সাথে আগের মতো আচরণ করুন প্লিজ।”
ঝুম জড় বস্তুর মতো স্থির হয়ে রইলো। ঠাণ্ডা শীতল বরফের ন্যায় গলায় বলল –
” আগের মতো? কিন্তু আমি কি আগের মতো আছি শাইয়ান? দেখুন মোটা হয়ে গিয়েছি। দেখতেও আগের মতো নেই। না উজ্জ্বলতা আছে আর না লাবণ্যতা। বাচ্চারা হওয়ার পর পেটে অনেক দাগও হয়েছে। চুলগুলোও কেমন রুক্ষ, অগোছালো। আমি যে আগের মতো নেই।”
শাইয়ানের হঠাৎ করেই বুক কেঁপে উঠল। সে যে কতবড় ভুল করে ফেলেছে তা বুঝতে দেরি করে ফেলল। অনেকগুলো দিন পর আবারো তার বুকে ব্যাথা করছে।
” পাখি এসব কি বলছেন? আপনি আগের মতোই আছেন। সেই এখনই রকম।”
” নেই। আমি অসুন্দর হয়ে গিয়েছি। তাই তো আপনার আজকাল আমাকে ভালো লাগছে না।”
শাইয়ান নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ঝুমকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। তবুও ঝুম একটুও নড়লো না। এমনকি প্রতিক্রিয়াও করলো না। শাইয়ান ঝুমকে দুহাতের সাহায্যে শক্ত করে ধরে বলল –
” আমার আপনাকেই পছন্দ। খুব খুব পছন্দ। আমার দেখা সব থেকে সুন্দর মেয়ে আপনি। আমার ভালবাসা আপনি। আপনি ছাড়া আমি কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি না বিশ্বাস করুন পাখি। আমার কিছু চাই না। আপনি দয়া করে আগের মতো হয়ে যান। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে কখনো বকা দিবো না। আমার আরীবাকে ফিরিয়ে দিন।”
ঝুম ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে হাত বাড়িয়ে শাইয়ানকে জড়িয়ে নিল নিজের সাথে।
” শান্ত হন। তিন বাচ্চা বাবা হয়েও এমন আচরণ করলে হয়?”
শাইয়ান কিছুই বলল না। বরং ঝুমকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। হারানোর ভয়। এই ভয়ের কথা মনে থাকলে আর জীবনে বউকে বকবে না। ভালো শিক্ষা হয়েছে।
” ভাইয়া।”
” ভালো আছেন ভাবি?”
” জানি না ভাইয়া।”
আহির চিন্তিত স্বরে বলল –
” কিছু কি হয়েছে ভাবি?”
” ভাইয়া আপুরা বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছে।”
শ্রাবণী চলে যাচ্ছে? কই তাকে তো একবার বলল না। একবার ফোনও দিলো না। আহির একবুক কষ্ট নিয়ে হাসলো। নিজের ওপর নিজেই তাচ্ছিল্য করলো। সে শ্রাবণীর কি হয় যে তাকে জানাবে?
” ওহ্।”
” ভাইয়া এখনো সময় আছে, আপুকে একবার বলুন। আপনি না পারলে আমি বলি? অন্তত মনে আফসোস তো থাকবে না। আমার এখনো কেন যেন মনে হয় আপু আপনার অপেক্ষায় আছে।”
আহির প্রতিউত্তর করলো না। উল্টো ব্যস্ততা দেখিয়ে কল কেটে দিল। ঝুম ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে দুফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিলো। ভালো মানুষগুলোই কেন সর্বদা কষ্টের ভাগিদার হয়? কেন তার আপু – ভাইয়া এতো কষ্ট পাচ্ছে?
সময় তার নিজের গতিতে চলতে থাকে। তাকে ধরে রাখার ক্ষমতা কারো নেই। যতই মানুষ টাকা – ক্ষমতার বড়াই দেখাক না কেন সময়ের চক্রে সবাই আবদ্ধ। দেখতে দেখতে শ্রাবণীদের যাওয়ার দিন চলে এলো। আহির ফোন দিয়ে তার মায়ের সাথে কথা বলেছে। সকলে তার ওপর রেগে থাকলেও এখন আর রাগ নেই। সে জানিয়েছে কিছু দিনের মাঝে ফিরে আসবে। মূলত সে শ্রাবনীর মুখোমুখি হতে চাইছে না। নয়ত দেখা যাবে কিছু একটা করে বসলো। তখন সব ভেস্তে যাবে। শ্রাবণীদের এয়ারপোর্টে দিতে শাইয়ান, মেহেরুন্নেসা ও আহিরের দাদাজান এসেছেন। একে একে বিদায় পর্ব শেষে শ্রাবণীরা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ঘণ্টা একের মাঝে শ্রাবণীদের প্লেনটি উড়াল দিলো আকাশের বুকে। এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে আহির সেই উড়ে যাওয়া প্লেনটিকে দেখতে দেখতে উদাস কন্ঠে বলল –
Remedy part 34
” কখনো কখনো পাখিকে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিতে হয়। আমিও তোমাকে ছেড়ে দিলাম শ্রাবণী। কিন্তু ভেবো না আমাদের আর দেখা হবে না। অবশ্যই হবে এবং খুব শীঘ্রই হবে।”
ঠিক সে সময় তার ফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো। আহির ফোন চোখের সামনে তুলে দেখলো শ্রাবণীর টেক্সট।
” অপেক্ষায় থাকবো।
