Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮
রানী আমিনা

—— TWO YEARS LATER ——
​কুরো আহমারের জনবহুল কাঁচাবাজার তখন কর্মব্যস্ততার চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফলের ঝুড়ির ভিড়, মসলার তীব্র ঝাঝালো সুবাস, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক আর সাধারণ মানুষের কোলাহলে আকাশ-বাতাস সরগরম। বাজারের প্রবেশপথের যেখানে ভিড় সবচেয়ে ঘন, লোকজনের যাতায়াতের ভিড়ে পিপড়া প্রবেশের স্থান টুকু নেই, সেখানে হঠাৎই এক অপ্রত্যাশিত নীরবতা কোনো অদৃশ্য দেয়ালের মতো নেমে এলো।

​ক্ষণিক পূর্বেও যেসব ক্রেতা, বিক্রেতা, খরিদ্দার নিজেদের ভেতর বাকবিতন্ডা, কেনাকাটা আর খোশগল্পে মগ্ন ছিলো তারা প্রবেশপথের এই হঠাৎ নিরবতায় থমকে দাঁড়াল। উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখতে রইলো কোন গুরুতর কারণে এমন সরগরম বাজার হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে উঠলো!
তখুনি হঠাৎ ফাঁকা হতে শুরু করলো প্রবেশ পথ! কোনো শব্দ ছাড়াই সকলে একে একে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে রইলো তটস্থ হয়ে। তাদের চোখে এখন আর কেনাকাটার ব্যস্ততার লেশমাত্র নেই, আছে শ্রদ্ধা, ভয় এবং আনুগত্যের দৃষ্টি।
সেই মুহুর্তে বাজারে প্রবেশ করলো সুউচ্চ এক শ্যামরঙা ব্যাক্তি। স্বর্ণাভ চোখের প্রখর দৃষ্টি ফেলে সে মুহুর্তেই পর্যবেক্ষণ করে নিলো বাজারের প্রতিটি কোণ। বা চোখের ওপর দিয়ে হওয়া উলম্ব ক্ষতটি যেন বলে গেলো তার জীবনে পাওয়া শত সহস্র আঘাতের গল্প।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

​তাঁর দীর্ঘ, সুগঠিত দেহের সম্মুখে আনুগত্যে নুইয়ে পড়লো প্রতিটি প্রজা। সুদর্শন শ্যাম মুখমণ্ডলের স্বর্ণাভ, শীতল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সহস্র বছরের শাসনের ঔদ্ধত্য যেন বাধ্য করলো তাদের আনুগত্য প্রদর্শনে।
বাজারের ভেতর এগিয়ে গেলো মীর। তার পেছনে স্যুট বুটে মোড়া লিও এবং কাঞ্জি। পীচ ব্লাক সানগ্লাসের কারণে তাদের দৃষ্টি সম্পুর্ন লোকচক্ষুর অগোচরে। তাদের বিশাল দেহই জনমনে ভীতি সৃষ্টি করার জন্য যেন যথেষ্ট! দুজনে এগিয়ে যেতেই রাস্তার দুপাশে থাকা সাধারণ জনতা পিছিয়ে গেলো আরও। তাদের পেছন পেছন এলো অস্ত্রধারী জনা দশেক গার্ড।
মীর এগিয়ে এসে একটি মুদি খানার দোকানে ঢুকলো। এক অশীতিপর বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে, দাঁত না থাকায় কুচকানো ঠোঁট জোড়া মুখের ভেতর ঢুকে আছে। পাশেই একটি বছর চারের পিচ্চি মেয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে মীরের দিকে। মুখখানা কিঞ্চিৎ হা হয়ে আছে তার। মীর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

“আমাকে কিছু লবঙ্গ দিন চাচি৷”
বৃদ্ধা কে চাচি ডেকে মীর ঠোঁট টিপে হাসলো, সে হয়তো বৃদ্ধার পরদাদার বয়সী হবে৷ বৃদ্ধা ঘোলাটে চোখে কিছুক্ষণ অবুঝের মতোন চেয়ে থেকে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“তি দিবো?”
“ল…ব…ঙ্গ…!”
মীর নিজেও বৃদ্ধার মতো করেই জোর গলায় বলল, তা দেখে পিচ্চিটা ফিক করে হেসে দিলো। মীর হাত বাড়িয়ে গাল টিপে দিলো মেয়েটির।
বৃদ্ধা ধীর, দুর্বল হাতে গোটা পনেরো লবঙ্গ একটি কাগজে মুড়িয়ে বাড়িয়ে দিলো মীরের দিকে। মীর সেটা নিতে নিতে শুধোলো,

“ব্যাবসা কেমন চলে চাচি? আর আপনি এই বয়সে এখানে কেন? আপনার ছেলে মেয়ে কোথায়?”
“আর কইয়োনা বাদান! পোলা মানুস কচ্চিলাম, দুইতা মেয়ে বিয়া দিছি। তাদের সামি দেকেনা, বলো মেয়েতা গতবছল গলায় দলি দিলো যে, ছোত মেয়েতা পাগল। ছেলে আমাদেল খলস দেয়না। তাই তোমাল চাচাল দোকানে আমিই বসি। মানুসতা আজ পাঁচ বসল নেই, তাল সাতে সাতে আমালও কপালেল ভাত উথে গেছে গো বাদান!”
বলতে বলতে চোখ মুছলো বৃদ্ধা। মীর বলল,
“দোকান টা আমার কাছে বিক্রি করবেন চাচি? ভালো দাম দিবো।”
“না গো বাদান, মাফ কলো আমালে। দোকানতা তোমাল চাচাল বদ্দ সকের দোকান থিলো। এ আমি দিবোনা বাদান।”
“তাহলে দোকান আমাকে ধারে দিন চাচি। প্রতিমাসে যে লাভ আসবে সেটার নব্বই শতাংশ আমি নিজ দায়িত্বে আপনার বাড়িতে পৌছে দিবো।”
“নব-বই? এতে তো তোমাল ক্ষতি হইবে বাদান!”

“কিছুই হবে না চাচি, আপনি শুধু দিয়েই দেখেন না, আপনার ব্যাবসা আমি আকাশে তুলে দিবো।”
বৃদ্ধা ফোকলা দাঁতে হাসলো। বুড়ি রাজি হয়েছে বুঝতেই মীর কাঞ্জিকে ইশারা করলো। কাঞ্জি এগিয়ে এসে একটি ব্রিফকেস ভর্তি টাকা বৃদ্ধার সামনে রাখতেই মীর বলল,
“এটা আপনার এ মাসের লভ্যংশ। আগামী মাসের শুরুতেই আবার পেয়ে যাবেন চাচি। আপনি এখন বাসায় চলে যান৷ নিজে যেতে পারবেন, নাকি কাউকে সাথে পাঠাবো?”
বৃদ্ধার দৃষ্টি অপরিষ্কার সত্ত্বেও টের পেলো ব্রিফকেস ভর্তি টাকা। এত গুলো টাকা একসাথে দেখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে, মনে একবার ভয়ের উদয়ও হলো। মীর সেটা টের পেয়ে অভয় দিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না চাচি, ভয়ের কিছু নেই। এখানের সবাই সাক্ষী।”
কাঞ্জি লিও সহ সকলেই তড়িতে মাথা নেড়ে আস্বস্ত করলো বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা এবার সত্যি সত্যি আস্বস্ত হলো। খুশি মনে নাতনিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলো সে৷
মীর একটি লবঙ্গ মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে লিওকে বলল,

“ওই বৃদ্ধার দুই মেয়ের জামাই আর ছেলের খোঁজ নাও। ভালোভাবে বলবে, কাজ না হলে জবাই করে বাসার সামনে গলায় দড়ি বেধে ঝুলিয়ে রেখে আসবে। পাশে বড় বড় করে তাদের অপরাধ লিখে রেখে আসবে। এসব জঞ্জাল আমার পঞ্চদ্বীপের কোনো কাজে আসবে না।”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
বাজার ছেড়ে রাস্তায় এসে নিজের গাড়িতে চড়লো মীর। লিও এসে দখল করলো ড্রাইভিং সিট। পাশের সিটে বসা একটি পাতলা শরীরের লম্বা ছেলে, চোখে চশমা, গোবেচারা চেহারা তার। মীর সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে তাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল,

“লেখো আরমান, যে সমস্ত সামর্থ্যবান পুরুষ তার মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানের খোঁজ নিবে না বা মৌলিক চাহিদা মেটাবে না তাদেরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এবং যদি কোনো নারী ভরণপোষণের ক্ষেত্রে কোনো পুরুষের ওপর মিথ্যা দোষারোপ করে তবে তাকে জনসম্মুখে জবাই দেওয়া হবে। নো মার্সি।”
আরমান খসখস করে লিখে ফেললো সমস্তটা। এই নিয়ে কত মৃত্যুদণ্ড যে সে লিখলো! আরমান আড়চোখে একবার লিওর দিকে দেখলো। লিও নিজেও তার দিকে তাকালো। লিও নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
“অপরাধের আর নামও নিবেনা পঞ্চদ্বীপ বাসি।”
আরমান ফিক করে হেসে বিগত লেখা নতুন আইন গুলোতে চোখ বুলোতে শুরু করলো।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর লিও জিজ্ঞেস করলো,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি কি প্রাসাদে ফিরবেন?”
“না, আমার ঘুম পাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও কোনো রুম বুক করো।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, তবে ডাস্কমায়ারের রাজমহলের দিকে এগোই?”
বলেই জিভ কাটলো লিও। মীর চোখ মেলে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ডাস্কমায়ারে আমার রাজমহল আছে?”
লিও গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“জ্‌-জ্বি….. মানে……. ছিলো আর কি….!
মীর ভ্রু কুচকে ভাবতে রইলো তার ডাস্কমায়ারে ওই বদ্ধ জঙ্গলে রাজমহল তৈরির কি এমন দরকার পড়েছিলো? তবুও বেশি কিছু না ভেবে সে বলে উঠলো,
“তবে সেখানেই চলো।”
লিও তৎক্ষনাৎ কাঞ্জির মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়ে দিলো ডাস্কমায়ারের রাজমহলে।

পড়ন্ত বিকেলে কার্পাস তুলার বিরাট, বিশাল, বিস্তৃত খেতের পাশের খোলা জায়গায় ফুটবল খেলায় মত্ত আনাবিয়া। বল তার পায়ে, দ্রুত বেগে বলটিকে পায়ে ঠেলে বিরোধী দলের গোলপোস্টের দিকে নিতে রইলো সে।
আনাবিয়াকে গোলপোস্টের দিকে যেতে দেখে আর্তনাদ করে উঠলো জাভেদ, জেসার আর জুনায়েদ। বর্তমানে তারা আনাবিয়ার বিরোধী পক্ষ, আনাবিয়ার দলটিকে তাদের বড্ড ভয়। সেই ভয়ানক দলে আছে ইলহান আর ফ্যালকন।
তিন ভাই আনাবিয়ার থেকে বল কেড়ে নিতে ছুটলো তার পিছে। জেসার আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে এগোচ্ছে দেখে ওপাশ থেকে ইলহান আনাবিয়ার পা থেকে বল নিতে নিতে জেসারের উদ্দ্যেশ্যে বিধ্বংসী স্বরে বলে উঠলো,
“একদম আমার মেয়ের ধারে কাছে আসবিনা জেসার, ওর গায়ে যদি বল লেগেছে তবে তোকে একদম পুতে ফেলবো!”

জেসার ভয় পেয়ে পেছনে সরে গিয়ে জুনায়েদকে টেনে এগিয়ে দিলো সামনে। সেই মুহুর্তেই ইলহানের পায়ের আঘাতে বল এসে জুনায়েদের গায়ে সজোরে পড়তে নিলে সে নিজের অজান্তেই হাত দিয়ে ঠেকিয়ে ফেললো। ফ্যালকন তৎক্ষনাৎ চিক্কুর পাড়লো,
“হাতে লাগছে, হাতে লাগছে!”
জুনায়েদ ক্ষেপে গেলো, ক্ষ্যাপা গলায় বলল,
“একদম হাতে লাগেনাই, আমার জামায় লাগছে।”
“আমাকে কি আপনার কানা মনে হচ্ছে? স্পষ্ট দেখেছি হাতে লাগছে।”
“মিথ্যা কথা। আমার জামার হাতায় লাগছে, ওইটা মোটেও হাত না।”

“আপনার জামার হাতার তো ম্যালা শক্তি, হাতায় লেগে বল বাউন্স করে চলে আসলো! আপনার জামা তো জামা না, সুপার জামা। বাদশাহকে বলে আপনার জামার জন্য একটা ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ অ্যাওয়ার্ডের ব্যাবস্থা করা দরকার।”
“বল আমার হাতায়ই লাগছে, বাউন্স তো….. ওপাশ থেকে বাতাস আসছে তাই বল উড়ে গেছে!”
ফ্যালকন নাকের পাটা ফুলিয়ে— ‘এর একটা বিচার করেন’ ভঙ্গিতে ইলহানের দিকে তাকালো। ইলহান বলল,
“আমিও দেখেছি, হাতে লাগছে। বল ওড়ার মতো বাতাস হলে সবার আগে ফ্যালকন উড়ে যেতো। ওয় যেহেতু উড়েনাই, তাহলে বল হাতেই লাগছে৷”
“একদম লাগেনাই, ফ্যালকন নাটক করছে। পেনাল্টি পাওয়ার ওর ম্যালা লোভ।”
জেসার এগিয়ে এসে বলল। তৎক্ষনাৎ দুই দলের ভেতর ঝগড়া লেগে গেলো।
আনাবিয়া আর জাভেদ দুজন এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হতাশ ভঙ্গিতে তাদের ঝগড়া দেখতে রইলো। এসব রোজকার ঘটনা। রোজ এরা চারজন কোনো একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে সেই আকারের হাঙ্গামা বাঁধাবে তারপর খেলায় ভঙ্গ দিবে।

ছোট খাটো মাঠটির চতুর্দিকে বাধানো শক্ত তারের বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছোট বাচ্চারা খেলা দেখতে দেখতে হৈ-হুল্লোড় করছিলো। এই দুই দলের ঝগড়া দেখা তাদের রোজকার বিনোদন। ক্ষেতে তুলা সংগ্রহের কাজ করতে থাকা নারী পুরুষেরা মুচকি হেসে দেখতে ব্যাস্ত রইলো তাদের কান্ডকারখানা।
কিন্তু আজ আর খেলা ভঙ্গ হলোনা, কয়েক মিনিট বাদেই মামলা নিষ্পত্তি হয়ে আবার খেলা শুরু হতেই বল চলে এলো আনাবিয়ার পায়ে। এবার সে গোল দিবেই দিবে।
জেসার জুনায়েদরা তাকে এবার কোনো মতেই আঁটকাতে পারলোনা।
ঝড়ের বেগে বল ঠেলে আনাবিয়া এক লাথিতে বলটি গোলপোস্টে ঢুকিয়ে দিতেই ইলহান আর ফ্যালকন মিলে আনন্দে ‘গোওওওওওল’ বলে চিৎকার পাড়লো।
ফ্যালকন ছুটে জুনায়েদের সামনে গিয়ে মুখ ভেঙচিয়ে দুহাত দুদিকে দিয়ে কাকতাড়ুয়ার সেজে নাচতে শুরু করলো, জুনায়েদ ওকে এভাবে নাচতে দেখে দাঁত মুখ খিচে নিচ থেকে একটা গাছের ডাল কুড়িয়ে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ালো সারা মাঠ।

রাতের খাবারের পর ফ্যালকন ইলহান আর আনাবিয়া হাসি তামাসায় বুদ হয়ে বেরিয়ে এলো জায়ান সাদির বাসা থেকে। এখন যার যার ঘরে ফেরার পালা। নির্জন রাস্তা দিয়ে তিনজনে গল্প করতে করতে হেটে চলল সামনে। ইলহানকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে ওরা দুজন মুনহল্যোতে ফিরবে।
গল্পের এক পর্যায়ে ইলহান হঠাৎ বলল,
“আনাবিয়া, আজ আমার এখানেই থেকে যাও৷ আগামী কাল নতুন বছর, রাতের বারোটায় আতসবাজি ফোটা দেখা যাবে একসাথে৷
“না চাচাজি, লায়রা ফক্সি একা আছে। আমরা না ফিরলে চিন্তা করবে। জানেন তো, আমি যেখানে থাকি সেখানে নেটওয়ার্কের অবস্থা বেহাল। যোগাযোগেরও কোনো উপায় থাকবে না।”

“ফ্যালকন ফিরে যাক, তুমি থাকো।”
“ও যে ভীতু! যাওয়ার পথে একটা বটগাছ আছে, তার তলা দিয়ে যেতে গেলে ওর হার্টফেল হয় প্রতিবার৷”
ফ্যালকন লজ্জা পেলো। ইলহান হাসলো তা দেখে, বলল,
“তাহলে আগামী সক্কাল সক্কাল সবগুলোকে নিয়ে চলে আসবে। মেলাতে ঘুরবো।”
“ঠিক আছে, কাল সক্কাল সক্কাল চলে আসবো।”
ক্ষণিক চুপ থেকে আনাবিয়া আবার বলে উঠলো,
“চাচাজি, আমার না এভাবে সারাদিন নাচা গাওয়া করতে একদম ভালো লাগছে না। কি করা যায় বলুনতো!”
“কি করতে চাও তুমি?”
“নতুন কিছু একটা, যাতে আমার সুন্দর সময় কাটবে। কোনো বিজনেস স্টার্ট করলে কেমন হয় বলুনতো?”
“কিসের বিজনেস?”
“রেস্টুরেন্ট?”

সঙ্গে সঙ্গে এমন প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করে ফ্যালকন বলে উঠলো,
“একদমই না শেহজাদী। সবাই যদি আপনার হাতের খাবারের স্বাদ পেয়ে যায় সেটা আমাদের প্রতি অন্যায় হবে। আপনার হাতের খাবার শুদু আমাদের আর হিজ ম্যাজ…..”
শেষোক্ত শব্দটা উচ্চারণ করার মধ্যিখানেই থেমে গেলো ফ্যালকন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটলো। অপরাধবোধে মাথাটা নিচে নেমে গেলো ওর। আনাবিয়া সেটা টের পেয়ে মিষ্টি করে হেসে ফ্যালকনের মাথার সামনের দিকের চুল মুঠি করে ধরে মাথা উঁচু করে দিয়ে বলল,
“থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। আর তোকে কতবার বলেছি, আমাকে কখনো শেহজাদী ডাকবিনা? আমি এখন আর কোনো শেহজাদী নই, আমি আমার দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করেছি। আমি আর কোনো রয়্যাল মেম্বার নই। আ’ম জাস্ট অ্যা কমোনার৷”

রাতের খাবার শেষে ঘুমানোর আগে মীর নিজের কামরাটা ঘুরেফিরে দেখছিলো। তার স্মরণে নেই কবে, কেন সে এই রাজমহল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। কিন্তু যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এদিকে একটা প্রাসাদসম বসত থাকলে ক্ষতি কি?
ঘুরতে ফিরতে একটি দরজার সামনে এসে উপস্থিত হলো সে। ওয়াশরুম ভেবে ভেতরে ঢুকতেই বিস্ময় সপ্তমে পৌছলো তার। চতুর্দিকে এত্ত এত্ত অভিজাত মেয়েলি পোশাকের সমাহার দেখে সে যারপরনাই অবাক হলো। এ রাজমহল সে কার জন্য তৈরি করেছিলো? এত পোশাক কোন মেয়ের? কে ছিলো তার জীবনে?
এগিয়ে যেতেই মীরের চোখে পড়লো একটা নীল রঙা স্যাফ্যার ড্রেস। ফ্লাপি গাউনটা থেকে নজর সরানো যাচ্ছে না। কার রূপকে বাড়িয়ে তুলেছিলো সে? নিশ্চয় তাকে দেখে যে কেউ থমকে গিয়েছিলো সেসিন!
এগিয়ে গিয়ে মীর সেটি ধরে দেখলো। প্রাসাদের বিশেষ কারিগরের কাজ এগুলো, সে ছাড়া এমন পোশাক তৈরির সাধ্য কারো নেই। এই ক্রিস্টাল পাথর গুলো যে মীরের সংগ্রহশালার পাথর! এত মূল্যবান পাথরের সমাহারে এমন পোশাক সে কার জন্য তৈরি করিয়েছিলো?

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

ড্রেসটিকে হাতে তুলে ঘ্রাণ নিলো মীর, একটা আবছা মিষ্টি ঘ্রাণ মুহুর্তেই মাতোয়ারা করে তুললো তাকে। মনে হলো এই ঘ্রাণ সে আগেও পেয়েছে, বহুবার৷ নিজেকে হঠাৎ মাতাল মাতাল মনে হলো তার, যেন কোনো এক ঘোরের ভেতর ডুবে গেছে সে। এক ঝাক অচেনা অজানা স্মৃতি যেন মস্তিষ্কের কোনো কোণা থেকে জেগে উঠতে চাইছে।
মীর চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো হঠাৎ। হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো সে, এই কামরা যেন তার দম বন্ধ করে দিতে চাইছে! ড্রেসটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে আসতে চাইলো। সেই মুহুর্তেই তার হাতের আঘাতে খুলে এলো পাশে থাকা আলমিরার একটি ছোট্ট দরজা।
মীর তাকালো সেদিকে। একটা ছোট্ট ফটোগ্রাফ নজরে এলো তার। হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে চোখের সামনে ধরতেই মীরের বিস্ময় রূপ নিলো হতভম্বতায়!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯