Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩১+৩২

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩১+৩২

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩১+৩২
সাইয়্যারা খান

সকাল সকাল নিজেকে একা খুঁজে পেলো পূর্ণ। এদিক ওদিক তাকাতেও হদিস মিললো না মৃত্তিকা’র। সবে ঘুম ভাঙা গলায় ডাকলো,
— মৃত্ত!
জবাব নেই তার পূর্ণ্যময়ীর। পুণরায় বালিশে মুখ গুজে দিলো পূর্ণ। ঘুম হলো না। অলস ভঙ্গিতে উঠে সোজা হেটে ওয়াসরুমে ঢুকে পরলো। সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েও পরক্ষণেই সরে গেলো। পিঠ, বুক সমান তালে জ্বলে যাচ্ছে। নখ এখন বড় নেই মৃত্তিকা’র। পূর্ণ রাখতে দেয় না। যা ছিলো তা দিয়েই গতরাতে মৃত্তিকা যুদ্ধ চালিয়েছিলো। সুখের মুহূর্ত শেষ হতেই পূর্ণ’র উপর চড়াও হয়েছিলো। হুমকি ধামকি ও দিলো পূর্ণ ‘কে যে চলে যাবে সে। সারারাত হাজার চেষ্টা করেও লাভ হয় নি। কথা বলা যায় নি মৃত্তিকা’র সাথে। মেয়েটা’কে যদিও সে বুকে চেপে ধরে ছিলো কিন্তু ঘুমানোর আগ মুহূর্তেও মৃত্তিকা শক্ত এক খন্ড হয়ে ছিলো। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে গোসল সেরে নিলো পূর্ণ। এই ডিসেম্বর মাসের শুরুতে যদিও বেশি ঠান্ডা নেই তবে যা আছে সকাল সকাল তাতে এই ঠান্ডা পানিতে গোসল করাটা কম কিছু না। পূর্ণ’র মুখে তখনও একটা বাকা হাসি খেলে যাচ্ছে। তার পূর্ণ্যময়ীর রাগ উঠেছে যা পূর্ণ এখনও সারাতে পারে নি। নিশ্চিত পূর্ণ সেই রাগকে পুষে রাখতে দিবে না। বাইরে যাওয়ার আগে তা শুষে নিবে নিজের মাঝে।

কিচেনে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। পূর্ণ জানে ওর মা এখনও উঠে নি৷ তার বউ তাহলে কিচেনে৷ ঠান্ডা শরীরটাতে আর টিশার্ট জড়ালো না। উন্মুক্ত বক্ষে এগিয়ে এলো কিচেনের দরজায়। হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করে তার একান্ত নারীকে। বড্ড সখের এই নারী। কোমড়ে আঁচল গুঁজে হাত নাড়িয়ে কিছু নাড়া দিচ্ছে। ভেজা চুলগুলো তার পিঠে লেপ্টে। যদিও ভেজা তবুও তা সোজা নেই, ঢেউ খেলানো। হাজার হাজার সিল্কি নারীর চুলের মধ্যে পূর্ণ’র কেন জানি আসক্তি জন্মায় এই কোঁকড়ানো চুলের ভাজে। পূর্ণ’র বুঝি আর তর সয়? বিড়াল পায়ে হেটে একদম মৃত্তিকা’র পেছনে এসে হাত গলিয়ে দিলো কোমড়ের কাছে। ঠান্ডা, শক্ত পুরুষালী স্পর্শে কেঁপে উঠে ছোট্ট নারীটির বদন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

পূর্ণ চড়াও হয়। জড়িয়ে নেয় অতি আদরের সহিত। কাঁধে মুখ গুজে অস্পষ্ট স্বরে কিছু জানায়। বুঝে মৃত্তিকা কিছুটা তবে প্রতিক্রিয়া দেয়ায় না। পূর্ণ অভিযোগ জানাচ্ছে কেন মৃত্তিকা তাকে একা বিছানায় রেখে এসেছে। মৃত্তিকা যেন আজ শক্ত হয়ে রইলো। এই অস্পষ্টতা, জোড়ালো কন্ঠ সাথে অবাধ্যকর সকল ছোঁয়া তাকে বারবার ভুলাতে চায় গতরাতের কথা। পূর্ণ’র ঐ ব্যাবহার সে ভুলে নি। আর না ই পেয়েছে কাঙ্খিত উত্তর। পূর্ণ তাকে ইশারা ইঙ্গিতে অনেককিছুই বুঝিয়েছে কিন্তু সোজা মস্তিষ্কের মৃত্তিকা’র মগজে অত কঠিন কথাগুলো ঢুকে নি।
মৃত্তিকা থেকে সাড়া শব্দ না পেয়ে পূর্ণ তাকে ছেড়ে দাঁড়ালো। দুই হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আঁজলায় ভরে নিলো তার ছোট্ট মুখটা। মৃত্তিকা এবার চোখ তুলে একটু তাকিয়ে তা আবার সরিয়ে নিলো। পূর্ণ ওর উঁচু নাকটায় চুমু খেয়ে বললো,

— একটা মানুষ এতটা আদুরে কিভাবে হয় মৃত্ত? আপনাকে নিয়ে কোথায় যাব আমি বলুন? রাত থেকে এমন করছেন। আমি কি উত্তর গুলো দেই নি?
— আমি বুঝতে পারছি না। ঠিক করে বলুন।
পূর্ণ কাছাকাছি এলো। ঘনিষ্ঠ হয়ে মৃত্তিকা’র মুখটা একটু উঁচুতে উঠিয়ে নিয়ে বললো,
— সহজ করে দিচ্ছি মৃত্ত। শুধু জানুন এই বিষয়টা আমাকে কষ্ট দেয়। ভীষণ ভাবে কষ্ট দেয়। আর আপনার এই আচরণ তাতে লবন ছেঁটানোর কাজ করে। আমি জানি আপনি জানেন, আপনি আমার প্রথম নারী। তাহলে কেন ঐ বিষয়টা টেনে আনার চেষ্টা করছেন? আপনাকে বুঝাতে পারলাম কি না জানি না তবুও বলছি আমার জীবনের জঘন্যতম অধ্যায় সেটা মৃত্ত। উপন্যাস শেষ নয় বরং শুরুর পথে।
একনাগারে কথাগুলো বলতেই পূর্ণ টের পেলো মৃত্তিকা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। না চাইতেও অনেকটা বলেছে সে। বিষয়টা থেকে বের হওয়ার জন্য পূর্ণ কথা ঘোরালো,

— আমার বুকে,পিঠে দেখুন মৃত্ত। মৃত্ত না জংলী বিল্লি আমার আপনি।
ছিটকে সরলো মৃত্তিকা। পূর্ণ’র বুক,পিঠ দেখতেই চমকে তাকালো। পূর্ণ ভাবলো বউ’কে এবার বাগে আনবে কিন্তু তার বউ আজ এক কাঠি উপরে খেললো। কলার দেয়া ব্লাউজটা একটু সরিয়ে নিজের গলা’র জখম আর ঠোঁট’টা দেখালো। জিভ কাটে পূর্ণ যা ছিলো সম্পূর্ণ আড়ালে। গলার অবস্থা দেখে নিজেরই খারাপ লাগলো। কিছুটা দ্রুত পায়ে রুমে ছুটে হাতে একটা এনটিসেপটিক মলম নিয়ে এসে আঙুলে নিয়ে অল্প করে লাগিয়ে দিল গলার জখমে পরপর ঠোঁটে একটা মিষ্টি চুমু খেয়ে বললো,
— এটার জন্য এই মেডিসিন। এবার আমাকে মেডিসিন দিন।
মৃত্তিকা এগিয়ে এসে শুধু বুকের মাঝখানে একটা চুমু খেয়ে বললো,

— আমার সাথে ওভাবে আর কখনো কথা বলবেন না। আমার কষ্ট হয়।
— আর হবে না।
মৃত্তিকা এবার নজর দিলো তার রান্নার দিকে। পূর্ণ নিজেও কিছু কাজে হাত দিলো। সেগুলো করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,
— আজ এত কিছু একা কেন করছেন? শাশুড়ী কোথায় আপনার?
— আজকে না আব্বু-আম্মু’র বিবাহবার্ষিকী। ভুলে গিয়েছেন? তাদের জন্যই তো সারপ্রাইজ ব্রেকফাস্ট।
— ভুলি নি। তবে এদের আজ উঠতে লেট হবে। নিশ্চিত সারারাত…
পূর্ণ’কে আর শেষ করতে দিলো না। বিরবির করে বললো,

— অসভ্য লোক।
পূর্ণ হাসলো। বললো,
— শুধু মাত্র আপনার জন্য।
দুইজন মিলে ব্রেকফাস্ট টেবিল গুছিয়ে নিলো। চুল বাঁধতে মৃত্তিকা গিয়েছে রুমে তখনই পূর্ণ’র বাবা বের হয়। পূর্ণ আড় চোখে একবার তাকিয়ে বললো,
— কততম বিবাহ বার্ষিক বলো তো আব্বু্?
— কেন জানো না তুমি?
— জানি তো। এত বছরেও তোমার স্টেমিনা কমলো না। সারারাত নিশ্চিত ব্যাটমিন্টন খেলো নি?
— পূর্ণ! বাবা হই তোর!
— আমি কি চাচা ডেকেছি?
কথা বাড়ালেন না তিনি। টেবিলে তাকিয়েই কিছুটা খুশি হয়ে মৃত্তিকা’কে ডাকলেন। পূর্ণ তখনই বলে উঠলো,
— আমার বউ দিয়ে তোমার এত কি কাজ আব্বু? যাও নিজের বউ’কে ডাকো। বুঝি না নিজের বউ ছেড়ে সারাক্ষণ আমার বউ’কে ডাকাডাকি। আ’ম ফেড আপ আব্বু।

— চুপ থাক বেয়াদপ ছেলে।
কথাটা বলতে গিয়েই নজর গেলো তার ছেলের খালি গায়ে। ওমনি কেঁশে উঠলেন তিনি। এদিক ওদিক তাকিয়ে রয়েসয়ে বললেন,
— শীতের সকালে খালি গায়ে কি? যাও কিছু পড়ে আস।
পূর্ণ বাঁকা চোখে তাকালো। সরস গলায় নিজের কথা বলে উঠলো,
— ঢং করো না আব্বু। বুঝি না আমি? ছেলের জন্য অতটাও কনসার্ন না তুমি যে ঠান্ডা’র জন্য টিশার্ট পড়তে বলবে। বুকে আমার বউয়ের দেয়া ভালোবাসা। এটা দেখে লজ্জা পাবে আমার বউ কিন্তু না, লজ্জা পাচ্ছো তুমি? সিরিয়াসলি? ছোট বেলায় কত দেখলাম তোমার বুকে দাগ। কোই আমি তো লজ্জা পেতাম না। তুমি তো…
এবার পানি মাথার উপর উঠতে নিলো। মান ইজ্জত তার ভেস্তে দেয়ার আগেই চেঁচালেন তিনি। পূর্ণ দুই হাত তুলে সেরেন্ডার করার ভঙ্গিতে বললো,
— কুল কুল আব্বু। যাচ্ছি আমি। আম্মু’কে ডেকে আনি। এমনিতেই রেগে আছে আমার সাথে।

নাস্তার টেবিলে সবার সাথে কথা বললেও পূর্ণ’র মা ছেলের সাথে একটা শব্দ ও বিনিময় করলেন না। রাজনীতি তার পছন্দ না কোনকালেই। যেখানে বারংবার তিনি ছেলেকে এই নোংরা থেকে সরে আসতে বলছেন সেখানে ছেলে তার নাকি এমপি পদে লড়বে? কিছুতেই মানতে সায় দিচ্ছে না তার মন। না জানি কোন মরণ খেলা শুরু হয় পূর্ণ’র এই জেদ’কে ঘিরে?
কফির মগটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে পাশে বসলো পূর্ণ। ওর মা সেটা না ধরে মৃত্তিকা’র কাছে কফি চাইতেই মৃত্তিকা তাকালো। কি করবে না করবে ভাবতেই পূর্ণ ব্যাপার টা সহজ করে দিলো। নিজে মায়ের হাতে তুলে দিলো মগ। হাতে নিলেও তা মুখে দিলেন না তিনি। পূর্ণ’র বাবা গলা ঝেড়ে বললেন,

— খাও কারণ নাস্তায় ও তোমার গুণধর ছেলের হাত আছে।
ওর মা চোখ রাঙালেন স্বামী’কে। তিনি ভয় পেলেন কিছুটা। মুখটা ছোট্ট করে খেতে মনোযোগ দিলেন৷ পূর্ণ এবার হাটু গেড়ে মায়ের কাছে বসলো। মাথাটা সযত্নে রেখে দিলো তার কোলে। না চাইতেও ছেলের দিকে তাকান ওর মা। রুষ্ট কন্ঠে বলে উঠলেন,
— কি চাই? সরো। যাও আজ না তোমার প্রচারণা? সেখানে যাও। মা মরলেই কি বা বাঁচলেই…
— প্লিজ আম্মু।
মা’কে কথাটা শেষ করতে দিলো না পূর্ণ। ওর মা’য়ের চোখটা ভিজে উঠলো। না চাইতেও তিক্ত কিছু কথা মনে পরলো তার। ভেজা চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। পূর্ণ মা’য়ের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। তাতে চুমু খেয়ে নরম গলায় বললো,

— বুঝার চেষ্টা করো আম্মু। আমি সরে আসতে পারব না। তোমার ইচ্ছে ছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি কি তা পূরণ করি নি? তাহলে আমার দেখা স্বপ্নটা কেন ভাঙতে চাইছো। রাজনীতি আমি ছাড়তে পারবো না আম্মু। আই জাস্ট কান্ট। তুমি জানো সব আমি কতটা ডেস্পারেট ছিলাম। প্লিজ আম্মু, সত্যি বলছি কিছু হবে না আমার।
কন্ঠ ভেঙে আসছে ওর মা’য়ের। হাতটা ছাড়িয়ে ছেলের গালে রাখলেন। চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
— না জানি আমাদের জীবনটা কে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় তোমার এই রাজনীতি পূর্ণ।
— কিচ্ছু হবে না। ভরসা রাখ।
— আছে।
মা ছেলের দিকে অবুঝ চোখে তাকিয়ে রইলো মৃত্তিকা। তাদের কথা ওর মস্তিস্ক বুঝে না। কঠিন কঠিন সব শব্দ তাদের। নিজ উদ্যোগে টেবিল গুছানো শুরু করতেই হাতে হাতে পূর্ণ’র বাবা ও সাহায্য করলো। মৃত্তিকা হেসে উঠলো। তার ভীষণ ভালোলাগা কাজ করে যখন ভাবে তার দুটো বাবা।

আজ থেকে পূর্ণ’র প্রচারণা শুরু হবে। আশে পাশে বেশ বড়সড় করে আয়োজন শুরু হয়েছে। এলাকার মাথায় মাথায় বড় বড় ব্যানার টানানো হয়েছে।
এরমধ্যে তার জন্য বেনিফিট হিসেবে এলো ছাত্র দল। ভার্সিটি থেকে তাকে না জানিয়ে দুপুর নাগাদ বিশাল এক মিছিল বের হয় যা পুরো বড় বাজার হয়ে মিলিত হয় পূর্ণ’র দলের বের করা মিছিলের সাথে। পূর্ণ বেশ অবাক হয়। পরক্ষণেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠে৷ আজ তারা গিয়েছে আশেপাশে এলাকায় ভোট চাইতে৷ এগুলো সব পূর্ণ’র লোকজন। বৃদ্ধ, জোয়ান সবটাই পূর্ণ’র হাত করা। এই পাশের বস্তিটা তেও তার বেশ দাপট। সবটাই ছাত্ররাজনীতির ফলাফল। বিভিন্ন সাহায্য করা হয় এদের পূর্ণ’র এনজিও থেকে।
বড় বাজারে পৌঁছাতেই মুখোমুখি হলো দুইদল। সাফারাত দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা’র দলের সাথে। শোয়েব মির্জা পূর্ণ’কে দেখেই লাল চোখ করে তাকান৷ সাফারাত হাসি মুখেই জিজ্ঞেস করে,

— কেমন চলছে প্রচারণা?
— যেমনটা তোরা আশা করিস নি।
পূর্ণ’র কথায় কিছুটা আহত হয় সাফারাত কিন্তু প্রকাশ করে না। শোয়েব মির্জা খেঁকিয়ে উঠে বলেন,
— এইখানে এখন আমাদের প্রচারণা চলবে।
ক্ষেপে উঠে পূর্ণ’র দলের লোক। কয়েকজন তো হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এলো। পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— ওনাদের যেতে দে।
পাশ থেকে সাইদ বলে উঠলো,
— ভাই এটা আমাদের এরিয়া।
— উম।কথা না যেতে দে।
ওরা সাইড দিতেই শোয়েব মির্জা’র দল এগিয়ে গেলো। পেছন থেকে স্পষ্ট শুনলো সাফারাত পূর্ণ’র গলা,
— নিজে খাওয়ার আগে পূর্ণ কুকুর খাওয়াতে পছন্দ করে। নাহলে কুকুরের লালা পরবে।

পূর্ণ’র প্রচারণা বেশ জমকালো ভাবেই চলছে। উপরন্তু তার ভালো হচ্ছে কারণ তার উপর রয়েছে বড় বড় নেতাদের হাত। সাথে জনগণ তাকে চায়। সব মিলিয়ে পূর্ণ এবার টিকে যেতেও পারে। ভাসা ভাসা খবর ভেসে আছে কানে। শোয়েব মির্জা শুধু রাগে ফুঁসছেন। টাকা ঢেলে এই পর্যন্ত অনেক করেছেন কিন্তু না, বিশ্বাস পাচ্ছেন না তিনি। আদৌও কি টিকতে পারবেন কি না বুঝা যাচ্ছে না। আজ অবশ্য তাদের এক বিপক্ষ প্রতিনিধি’কে তিনি বসিয়ে দিবেন। এই লোক আবার আগে কখনো নির্বাচনে দাঁড়ায় নি। সরকারি কলেজের ভিসি। লোভে পড়েই মূলত তিনি নির্বাচন করছেন। শোয়েব মির্জা তাকে বসাতেই টাকা ঢালছেন। না জানি তার পক্ষের ভোট না আবার ঐ ভিসি’র পক্ষে পড়ে। এমনিতেই পূর্ণ তার ঘাড়ে চড়ে আছে তারমধ্য ভিসি যেন মরার উপর খাড়া! রাগে দপদপিয়ে উঠে শোয়েব মির্জা। মাহিন মিয়া শুধু তার স্যার’কে দেখেন। লোকটার মাথার চুল আসলেই রোদে সাদা হয় নি। পান খাওয়া দাঁত বের করে মাহিন মিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। সাহস জুগিয়ে উগলে দিলেন,

— স্যার ভিসিকে টাকা পাঠানোর কথা ছিলো আজ।
শোয়েব মির্জা একঝলক তাকালেন মাহিন মিয়া’র দিকে। পরপর মাথাটা ইজি চেয়ারটাতে এলিয়ে দিয়ে আফসোসের সুরে বললেন,

— সাফারাত টা হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
— ছোট বাবা তো এখন অনেকটাই স্বাভাবিক স্যার।
— ওর এই স্বাভাবিক ভাবটাই আমি নিতে পারছি না মাহিন। ভয় হয় আমার। এই রাজনীতিতে আমি আমার জীবন দিয়েছি। শেষ বয়সে এসে সুযোগ খোয়াতে চাইছি না।
— ভিসি টাকা’র জন্যই দাঁড়িয়েছে স্যার। জানে আপনি নয়তো অন্য পার্টি তাকে বসাতে সুপারি ছাড়বে।
— আজ রাতেই টাকা পাঠানো হবে। ভিসি’কে পথ থেকে সরাও।
— জ্বি স্যার।
মাহিন মিয়া চলে গেলেন। মেলা কাজ এখন। রাতের আঁধারে টাকা পাচার হলো ভিসি’র অফিসে। ছয়টি সাবানের কেস ভর্তি টাকা পাঠানো হলো লোকচক্ষু’র সামনে সাথে এক মুন মিষ্টির বাক্স। শোয়েব মির্জা জানেন ঠিক সকালেই খবর পাওয়া যাবে যে ভিসি নির্বাচন থেকে পিছিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তবুও সমস্যা যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা। পূর্ণ নামক সমস্যা।

বাবা’র বুকে মাথা ঠেকিয়ে সোফায় পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে মৃত্তিকা। মাত্র গত দিনই বাবা’র কাছে আসতে পারে নি সে। এতেই তার রাজ্যের দুঃখ। পূর্ণ’র নামে বিচার দিলো বাবা’কে,
— উনি আমাকে গতকাল নিয়ে আসে নি আব্বু। আমি আজ যাব না৷ ওনাকে কল দিয়ে বলো যাতে আমাকে নিতে না আসে।
— আচ্ছা দিব।
— না না এখনি দাও। নাহলে আবার নিতে আসবে।
— এখন তো প্রচারণায় ব্যাস্ত আম্মা। একটু পর দেই?
— আচ্ছা।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মৃত্তিকা বাবা’র বুক থেকে মুখটা তুললো। চোখ পিটপিট করে বললো,
— বিরিয়ানি খাব।
চমৎকার হাসির দেখা মিললো মৃন্ময় হাওলাদারের মুখে। মেয়ের কোঁকড়ানো চুলে চুমু খেয়ে বললেন,
— চলুন। এখনই বানাব।

মৃত্তিকা উঠতে উঠতে চুলে হাত খোঁপা বেঁধে নিলো। একসাথে বাবা মেয়ে রান্না বসালো। সময়টা তাদের বেশ কাটলো। মৃত্তিকা যেন ভুলেই বসলো পূর্ণ নামের কেউ যে আছে তার জীবনে।
রান্না হতেই মৃন্ময় হাওলাদার চা বসালেন। বাবা-মে একসাথে বারান্দায় খাবে। পাশেই অন্য চুলায় মৃত্তিকা পাকোড়া ভাঁজছে। মৃন্ময় হাওলাদার মৃত্তিকা’কে ফ্রেশ হতে পাঠাতেই পেয়ালাতে তেল গরম দিলেন। মেয়েটা তার তেল দেখতেই পারে না। কত সুন্দর কোঁকড়ানো চুল গুলোতে তেল লাগাতে দিবে না। আজ একদম বেশি করে তেল লাগাবেন তিনি এতে যদি তেঁতে উঠে তো উঠবে। মেয়ের এই কোঁকড়ানো চুলগুলো তার বড্ড সখের।

বাবা’র হাতে চায়ের ট্রে দেখেই মৃত্তিকা আগে আগে বারান্দায় চলে গেল। এটা তার বাবা’র রুমের বারান্দা। অবশ্য অন্যান্য পরিবারের ন্যায় মৃত্তিকা’র পরিবার না। প্রায় সময় মৃত্তিকা এসে বাবা’র রুমে শুয়ে বসে থাকে। বাবা’র আলমারি খুললেও দেখা যাবে দুই একটা মৃত্তিকা’র কাপড় বা ড্রেসিং টেবিলে তার ক্লিপ পড়ে আছে। চা খেতেও বাবা’কে শান্তি দিবে না মৃত্তিকা। মৃন্ময় হাওলাদার বরাবরই একটু লিকার বেশি পছন্দ করেন। মৃত্তিকা নিজের টা তো খাবেই সাথে বাবা’র কাপে ও তার একচুমুক দিতেই হবে। নাহলে শান্তি নেই।

চা শেষ হতেই মৃন্ময় হাওলাদার মেয়েকে জোড় করে বসালেন। মৃত্তিকা আগেই বলেছে তেল অল্প দিতে। কিন্তু না মৃন্ময় হাওলাদার আজ মানেন নি। কথায় কথায় চুল ভর্তি তেল দিলো। ততক্ষণে মিঠি এসেছে। আসন পেতে বসেছে মৃত্তিকা’র বরাবর বারান্দার ফ্লোরে। এশারের আজান পড়তেই মৃন্ময় হাওলাদার মেয়েকে নিয়ে উঠলেন। চুলে একটা বেণী করে দিয়েছেন।
বাবা’র হাতেই আজ মৃত্তিকা খেয়েছে। গল্প করতে করতে একসময় বাবা’র আদরের কন্যা বাবা’র বুকে ঘুমিয়ে গেলো। কলিং বেলের শব্দ শুনে মিঠি বললো,

— আমি দেখে আসি মামা।
বলেই দৌড়ে গেলো। পূর্ণ দাঁড়িয়ে ক্লান্ত শরীরে। বউ নিতে এসেছে সে। মিঠি চওড়া হেসে সালাম জানিয়ে ওকে ভেতরে ঢুকাতেই পূর্ণ বললো,
— মৃত্ত কোথায়?
— মামা’র রুমে।
— ওহ।
বলেই পূর্ণ মৃন্ময় হাওলাদারের রুমের কাছে এলো। মৃন্ময় হাওলাদার ওকে আসতে দেখেই বুক থেকে মেয়েকে বালিশে রাখলেন সযত্নে। আলতো হাতে। কাঁচের পুতুল এটা তার যদি আঁচ লেগে যায়?
পূর্ণ অলস ভঙ্গিতে সোফায় বসতেই সালাম জানিয়ে বললো,

— আজ দেড়ী হলো বাবা।
— আগে ফ্রেশ হও। পরে কথা হবে।
পূর্ণ ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখলো মৃন্ময় হাওলাদার খাবার হাতে দাঁড়িয়ে। অল্প হেসে পুণরায় সোফায় বসলো ও। মৃন্ময় হাওলাদার নিজে সার্ভ করতে করতে বললেন,
— নিশ্চিত ক্লান্ত। ডাইনিং পর্যন্ত যেতে হবে না।
— মৃত্ত খেয়েছেন?
— হ্যাঁ। তার ফরমাইশেই বিরিয়ানির আয়োজন।
পূর্ণ মুখে দিয়েই প্রশংসা করলো। মৃন্ময় হাওলাদার জানালেন তার মেয়েও সাহায্য করেছে। পূর্ণ খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলো,

— বিচার দেয় নি আমার নামে?
— দিলো তো। শুনলাম।
— বিচার করবেন না?
— ছেড়ে দিতাম না আমার আম্মা’র বিচরটা নিছক না হলে।
— জানি। ঘুমালো যে?
— যাবেন না আজ। আমাকে বলেছিলো তোমাকে জানাতে। ব্যাস্ত ভেবে কল দেই নি।
— ওনার জন্য আমি কখনোই ব্যাস্ত না আব্বু। ইউ ক্যান কল মি এ্যাট এনি টাইম।
— আগামীর এমপি এই কথা বলছো।
— ভালো কথা আব্বু। কিছু কথা ছিলো।

অতঃপর তাদের রাজনৈতিক আলাপ হলো। মাঝে খাওয়া শেষ হতেই মিঠি’র মা সব নিয়ে গেলেন। মিঠি এগিয়ে কফি দিয়ে গেলো পূর্ণ’কে। এটা অবশ্য মৃন্ময় হাওলাদার ই বলেছিলেন। কথা পূর্ণ’র সাথে বললেও হাত তার অনবরত চলছে মৃত্তিকা’র চুলে। পূর্ণ শশুড় থেকে রাজনীতি’র জ্ঞান নেয়। তার পরামর্শ কাজে লাগে তার। এককথায় চমৎকার ভাবে তিনি ওকে উপদেশ দেন। যদিও আগে পূর্ণ বিভিন্ন ভাবে নিজের ক্ষতি করে বিভিন্ন কাজ হাশিল করেছে তবে মৃন্ময় হাওলাদার তাকে ভিন্ন পথ শিখিয়েন।
তাদের আলাপ শেষ হতে হতে রাত ১২ টার উপর বেজে গেলো। পূর্ণ মৃন্ময় হাওলাদারের দিকে তাকিয়ে বললো,
— বউ নিয়ে যাই তাহলে।

হাসলেন মৃন্ময় হাওলাদার। অনুমতি দিলেন চোখের পলক ফেলে। একবার তার মনটা বললো যাতে বলেন পূর্ণ ও যাতে থেকে যায় কিন্তু তা করলেন না তিনি। ঘুমন্ত রাজকন্যা কোলে তুলে নিজের পাজা করে। গাড়ির ভেতরে ঠিক পূর্ণ’র কোলে মাথাটা দিয়ে পা দুটো সিটে গুছিয়ে রেখে বললেন,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৯+৩০

— মাথাটা ধরো। আর কাল চুল ধুয়ে নিতে বলো। রেগে ছিলো এত তেল দিয়েছি বলে।
সম্মতি জানিয়ে পূর্ণ বিদায় নিলো। রোজ আসা হয় মৃত্তিকা’র এখানে তবুও প্রতিবার মৃন্ময় হাওলাদারের চোখে কাতরতা দেখে পূর্ণ। মধ্যবয়স্ক শক্ত পুরুষটা অশ্রু লুকাতে প্রতিবারই মাথা নামাবে অথবা এমন ভাব ধরবে যেন চোখে কিছু পড়েছে।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পূর্ণ তাকালো তার মৃত্ত’র দিকে। আলগোছে চুমু খেয়ে নিলো তার নাকে। নিশ্চিত ঘুম থেকে উঠলেই তার রাগ হবে। তখন মিষ্টি মিষ্টি আদরে পূর্ণ্যময়ীর অভিমান ভাঙাবে পূর্ণ।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৩+৩৪