তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২১
নওরিন মুনতাহা হিয়া
আদ্রিয়ান তার হাতে থাকা পোড়া সিগারেটের অর্ধেক খাওয়া শেষ করে ছু’ড়েঁ মারে। অর্ধ জ্ব’ল’ন্ত সিগারেটের ঠাঁই হয়, টেবিলের এক কোণায়। আদ্রিয়ান বেশ কয়েক মিনিট, বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে থাকে। চোখ জুড়া বন্ধ করে, জীবনের সকল হতাশা আর কষ্ট মনের গহীনে লুকিয়ে রাখার ক্ষুদ্র চেষ্টা করে।
রাত প্রায় সাড়ে ছয়টার সময়, মিরাজ সাহেব, ফারহানা বেগম, কারান, আর আবিহা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য রওনা দেয়। তারা এয়ারপোর্টে অবধি একসাথে যাবে, এরপর আলাদা বিমানে উঠে ভিন্ন দেশে চলে যাবে। আবিহা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়, মেঘ তার রুম থেকে বের হয়ে আসে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে, এরপর আবিহার কাছে যায়। আবিহা মেঘকে দেখে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মেঘকে বাসায় একা রেখে যাওয়ার বিন্দুমাএ ইচ্ছা আবিহার ছিল না, কিন্তু সে বাধ্য।
মেঘ একা এই বিশাল বড়ো বাড়িতে থাকতে নিশ্চয়ই ভয় পাবে। আবিহার চোখ মুখ দেখে, মেঘ বুঝে সে তার জন্য চিন্তিত। যা দেখে মেঘ মুচকি হাসে। মেঘ আবিহাকে বুঝায় সে ভয় পাবে না, একা থাকার অভ্যাস তার আছে। আবিহা হয়ত বুঝল, কিন্তু তার চোখ দেখে মনে হচ্ছে সে এখন মেঘের জন্য টেনশন করছে। আবিহা যখন গাড়িতে উঠে বসে, তখন মেঘ হাত নাড়িয়ে বিদায় দেয়।এরপর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে।
পরিবারের সকলকে বিদায় দেওয়ার জন্য, আদ্রিয়ান নিচে আসেনি। সে আজ সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি। মেঘ আর তার খুঁজ নিতে যায় না, সে বড় বড় পা ফেলে তার রুমে চলে যায়। পড়াশোনা তার নিজ জীবন নিয়ে মেঘ এখন ব্যস্ত থাকে। মেডিক্যাল পড়ার বই ইতিমধ্যে কিছু কিনা হয়েছে, কিন্তু এখন অধিকাংশ বই তার কিনা বাকি। কাল কলেজ থেকে ফিরে আসার সময়, লাইব্রেরি থেকে কিনে নিয়ে
আসে। এখন মেঘের জীবনে পড়াশোনা আর কেরিয়ার সফলতার চিন্তা রয়েছে, প্রেম ভালোবাসা, আর আদ্রিয়ানের নয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
রাতে মেঘ যখন মেঘ মাএ বই বের করে, পড়তে যাবে। তখন হঠাৎ তার ফোন শব্দ করে বেজে উঠে, টেবিলের পাশে রাখা ফোনের স্কিনের দিকে তাকায়। জামান সাহেব কল করেছে, মেঘ দ্রুত বই বন্ধ করে ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করে। এরপর বলে __
“- আসসালামু আলাইকুম বড় আব্বু। আপনি কেমন আছেন?
মেঘের উৎফুল্ল কণ্ঠে শুনে, জামান সাহেব খুশি হন না।কারণ ওনি যানেন, মেঘ যখন আদ্রিয়ান আর তার ডিভোর্সের কথা শুনবে। তখন ভীষণ কষ্ট পাবে। জামান সাহেব চাই না, মেঘকে নতুন করে সব সত্য ঘটনা যানাতে। কিন্তু ওনি বাধ্য, যদি একমাস পর ডিভোর্স পেপার রেডি করা হয়। তবে মেঘকে সাইন করতে হবে, তখন মেঘ যেনে যাবে,যে আদ্রিয়ান আর তার ডিভোর্স কখন হয়নি। জামান সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে —
“- মেঘ তোমার সাথে আমার কিছু, জরুরি কথা আছে?
জামান সাহেবের কণ্ঠের গম্ভীরতা হয়ত, মেঘ উপলব্ধি করতে পারে। হঠাৎ করে জামান সাহেবের কি হলো? আর কি এমন কথা আছে, যা ওনি এমন গম্ভীর কণ্ঠে বলবেন। মেঘ আগ্রহ নিয়ে, জামান সাহেবকে কথা বলার অনুমতি দিয়ে বলে —–
“- হুম বলেন বড় আব্বু কি কথা?
জামান সাহেব মেঘের কথা শুনার আগ্রহ দেখে, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এরপর শান্ত গলায় স্বরে বলে উঠে —-
“- দেড় বছর আগে আদ্রিয়ান আর তোমার ডিভোর্স হয়নি। তুমি যখন ডিভোর্স পেপারে সাইন করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, তখন আদ্রিয়ান বিদেশ থেকে ফিরে আসে। ও তখন ডিভোর্স পেপারে সাইন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, যার জন্য আমি ডিভোর্সের কাগজ ওর হাতে দেয়। আদ্রিয়ান যখন টেবিলের উপর কাগজ রেখে, সাইন করতে যাবে। তখন ভুলবশত শার্লিনের হাত লেগে, এক গ্লাস পানি কাগজের উপর পড়ে যায়। যার কারণে কাগজ সম্পূর্ণ ভিজে ছিঁড়ে যায়, এমন কাগজ দিয়ে আদালতে ডিভোর্সর জন্য আপিল করা যেতো না।
“- তাছাড়া আদ্রিয়ান মাএ সাত দিনের জন্য, বাংলাদেশে এসেছিল। এরপর সে চলে যায়, এতো অল্প সময়ের মধ্যে নতুন করে ডিভোর্স পেপার রেডি করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন আদ্রিয়ান নতুন করে চাই, তোমার আর তার ডিভোর্স হােক। তুমি কি আদ্রিয়ানকে ডিভোর্স দিতে চাও?
জামান সাহেবের এক দমে বলা কথাটা, শুনার বা বুঝার জন্য মেঘের কিছুক্ষণ সময় লাগে। তবে সকল কথার মধ্যে, মেঘের কানে বা মনে শুধু একটা কথায় প্রাধান্য পায় ” আদ্রিয়ান মেঘকে ডিভোর্স দিতে চাই “।মেঘের মুখের অঙ্গ ভঙ্গি এখন শান্ত, তার কি বলা বা করা উচিত তা সে যানে না। মেঘ ধীর স্বরে জামান সাহেবকে প্রশ্ন করে ——
“- দেড় বছর পর হঠাৎ করে আদ্রিয়ানের নতুন করে ডিভোর্স চাওয়ার কারণ কি? বড় আব্বু?
জামান সাহেব হয়ত যানত, মেঘ তাকে এই প্রশ্ন অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে। তবে জামান সাহেব আর দ্বিধা করল না,ছেলের অন্যায় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল না। জামান সাহেব বলেন ——
“- আমেরিকায় আদ্রিয়ান অন্য একজনকে ভালোবাসে। একমাস পর তাকে বিয়ে করবে, যার জন্য নতুন করে তোমার থেকে ডিভোর্স চাই ওর —-.
জামান সাহেবের কথা শুনে, মেঘ শান্ত হয়ে যায়। আদ্রিয়ান অন্য একজনকে ভালোবাসে? কিন্তু সে কে? সে কি জিয়া? আদ্রিয়ান জিয়াকে ভালোবাসে? গায়ে হলুদের দিন ছাদে দেখা ঘটনা কি তবে সত্যি ছিল? কিন্তু এই কথা শুনে, মেঘের কষ্ট হয় না। বরং তার মনে আদ্রিয়ানের প্রতি, ঘৃণা জন্ম দেয়। কারণ মেঘ হয়ত যানত যে, আদ্রিয়ান আর তার ডিভোর্স হয়ে গেছে? কিন্তু আদ্রিয়ান সে সত্যি কথা যানত, যে মেঘ এখন তার বৈধ স্ত্রী। তবুও কি করে সে জিয়াকে ভালোবাসল, বউ রেখে অন্য নারীর সাথে পরকীয়া জড়াল?
আদ্রিয়ানের প্রতি মেঘের ভালোবাসা, মায়া, সব ঘৃণায় পরিণত হয়। তার সাত বছরের অপেক্ষা কোন মূল্য ছিল না আদ্রিয়ানের কাছে, মেঘ স্বামী নামক এক চরিত্রহীন পুরুষকে ভালোবেসে এসেছে? মেঘের রাগে ঘৃণায়,আদ্রিয়ানের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফোনের অপর পাশ থেকে কোনো কথা শুনা যায় না দেখে, জামান সাহেব বলে উঠে —-
“- মেঘ তুমি কি ঠিক আছো?
জামান সাহেবের কথা শুনে, মেঘ বলে —
“- হুম বড় আব্বু —.
জামান সাহেব মেঘের কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারে, মেঘের মনের অবস্থা কেমন। তবে যা সত্যি তা মেঘকে যানতে হবে, জামান সাহেব এইবার মেঘের থেকে কথা বলার, অনুমতি চেয়ে বলে উঠে —-
“- মেঘ তোমার বিষয়ে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই, তুমি কি অনুমতি দিবে আমায়?
জামান সাহেবের কথা শুনে, আবার মেঘ বলে —
“- হুম —.
জামান সাহেব কিছুটা সাহস আর হতাশা নিয়ে বলে উঠে —
“- মেঘ তোমার বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন, তোমার বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তার ছিল। কিন্তু এখন সে আর বেঁচে নেই, তবে তার সকল দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। একমাস পর আদ্রিয়ান আর তোমার ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর, তোমার সাথে আমার বন্ধুর ছেলের বিয়ে দিতে চাই আমি। তবে যতদিন না তোমার পড়াশোনা শেষ হবে, ততদিন বিয়ে হবে না। কিন্তু একমাস পর, কাবিন করে রাখব। বিয়ে না হয়, আরো এক দুইবছর পরে হবে।
জামান সাহেবের কথার উত্তর মেঘ কি বলবে সে যানে না, বিয়ে আবার নতুন করে? মেঘ কি সত্যি পারবে নতুন করে আবার বিয়ে করবে? সাত বছর ধরে ভালোবেসে যাওয়া মানুষটা কে, রেখে অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে? তার শরীর স্পর্শ করার বৈধতা পরপুরুষকে দিতে? মেঘের দ্বারা কি তা সম্ভব? কিন্তু আদ্রিয়ান যদি জিয়াকে ভালোবাসতে পারে, তার সাথে পরকীয়া জড়াতে পারে। তবে মেঘ কেনো পারবে না? মেঘ আদ্রিয়ান আর জিয়াকে হিংসা করছে না, বা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে কিছু বলছে না।
কিন্তু মেঘ সত্যি আর কতো আদ্রিয়ানের অপেক্ষা করে যাবে? নয় বছর ধরে একতরফা তাকে ভালোবেসে যাবে? ভবিষ্যতে হয়ত মেঘকে, তার জীবন সঙ্গী রূপে অন্য পুরুষের আগমন মেনে নিতে হবে। তখন যদি সব সয্য করে নিতে পারে, তবে এখন ও পারবে। মেঘ নিজের মনকে ধাতস্থ করে, শান্ত গলায় ধীর চেতা মনোভাব নিয়ে বলে —
“- বড় আব্বু তুমি ডিভোর্স পেপার রেডি করো। আমি এক মাসের আদ্রিয়ানকে ডিভোর্স দিতে চাই। আর তোমার বন্ধুর ছেলেকে বিয়ে করতে আমি রাজি। কাবিন নয় বরং তুমি বিয়ের আয়োজন কর।
জামান সাহেব যানে, মেঘ রাগ, আর অভিমান থেকে বিয়ের কথা বলছে। কারণ মেঘের দ্বারা হয়ত, আদ্রিয়ানকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য কোন পুরুষকে বিয়ে করা কখন সম্ভব না। মেঘ আদ্রিয়ানকে কি পরিমাণ ভালোবাসে, তা ওনি যানেন। তবে জামান সাহেব আজ অপারগ, নিজের সন্তানের খুশির জন্য সে অন্য মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চাই না। আর যে চিন্তার নিজের বাবার সম্মান, আর কথার মান রাখে যানে না, তার কথার চিন্তা করার প্রয়োজন বোধ জামান সাহেব করেন না। কিন্তু মেঘের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা শুনে, জামান সাহেব বলে —–
“- মেঘ এক মাস পর বিয়ে করলে? তোমার পড়াশোনার কি হবে?
মেঘ জোড়ালো কণ্ঠে বলে —
“- পড়াশোনা বিয়ের পর ও করা যায় বড় আব্বু।আপনি ডিভোর্স আর বিয়ের ব্যবস্থা কর ——.
জামান সাহেব মেঘের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়ে বলেন
“- ওকে আমি এক মাসের মধ্যে সব রেডি করে রাখব -.
মেঘ ফোন রেখে দেয়, তার আর কথা বলার ইচ্ছা করছে না এখন। টেবিলের কোণায় ফোন রেখে, মেঘ ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মেঘ চোখ খুলে, সিলিং দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে অদ্ভুত বিষয়, তার চোখ বেয়ে আজ টপটপ করে পানি পড়িয়ে পড়ছে না। তার চোখ জুড়া যেনো শুষ্ক মরুভূমির ন্যায়, পানি শূন্য হয়ে গেছে। অন্তরে কষ্ট অনুভব হলে ও, মেঘকে ভেঙে চুরে দেওয়ার শক্তি সেই কষ্টের নেই। মেঘ মনে মনে বলে উঠে ___
“- ডক্টর : আদ্রিয়ান রোদায়ান। গত নয়টা বছর ধরে আপনাকে ভালোবেসে এসেছি। কিন্তু আজ আমি ভীষণ ক্লান্তি। আপনাকে ভালোবাসার বিন্দুমাএ শক্তি বা ইচ্ছা আমার আর নেই, ধীরে ধীরে আমার মন অন্তর জুড়ে শুধু ঘৃণা ঘৃণার জন্ম নিচ্ছে। এই ঘৃণার পরিমাণ দিগুণ বৃদ্ধির আগেই, আপনি বরং আমার জীবন থেকে চলে যান। মুক্তি দেন আমায়, এই ভালোবাসা আর অপেক্ষা নামক এক অসহ্য যন্ত্রণা থেকে।
“- আমি সত্যি জানি না আপনি জিয়াকে ভালোবাসেন কি না? তবে আপনার চোখে, আমি আমার জন্য এক মায়া, বা মোহ দেখেছি৷ তবে তা ভালোবাসা কি না তা জানি না। কিন্তু কিছু একটা হয়ত আছে, আমার প্রতি। আর এই মায়ায়, আপনার যন্ত্রণার কারণ হবে। অনেক কষ্ট আমি সয্য করেছি, এইবার না হয় আপনি করেন। একমাস পর ঠিক আপনার সামনে, আমি অন্য কারোর বউ হব তার জন্য কবুল বলব। তখন কি আপনি পারবেন, আমায় অন্য পুরুষের সাথে সয্য করতে। না পারবেন না, তার কারণ আপনার মনে জন্মান আমার প্রতি মায়া।
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২০
“- যখন আপনি দেখবেন, যে আমি অন্য কারোর হয়ে যাচ্ছি। তখন অনুভব করবেন, ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারোর সাথে দেখার অনুভূতি কেমন হয়? কি অসহ্য যন্ত্রণা হয়, বুকের ভিতর। ভালোবেসে শুধু ধ্বংস আমি একাই হব না, আপনি ও হবেন। আপনার শাস্তি স্বরূপ, আমার ধ্বংস আপনাকে উপহার দিব আমি। এমন যন্ত্রণা আপনাকে দিব আমি, যা আপনাকে জ্বলিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে। গত নয় বছর আপনি শুধু আমার ভালোবাসা দেখেছেন, আর এখন এই একমাস আমার ঘৃণা দেখবেন।
