প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৪
রাজিয়া রহমান
শেখ ভিলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে আছে।অথচ এই বাসাতে আজকে সানাই বাজার কথা ছিলো। কথা ছিলো আলোকসজ্জা হওয়ার।
অথচ এই বাসাতেই দুটো নিথর দেহ পড়ে আছে। চিরদিনের মতো তারা থেমে গেছে।
আর কখনো এই পৃথিবীর মাটিতে তাদের বিচরণ হবে না।
ইরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।ভীষণ ভয় পেয়েছে ইরা।এখনো শক্ত করে ইশতিয়াককে ধরে আছে।ইশতিয়াকের কোনো রকম অনুভূতি হচ্ছে না।
বরং মনে হচ্ছে ইকবাল বোধহয় জীবনে শেষ বার কোনো একটা ভালো কাজ করে গেছে। তা না হলে ইরার দিকে যেই নোংরা দৃষ্টি ইকবাল দিয়েছে তাতে আজ বা কাল,ইশতিয়াকের হাতেই ইকবালকে শেষ হতে হতো।
হাসিব শেখ শায়লার মরদেহের দিকে তাকিয়ে আছেন।ইকবালের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা অনেক।
ইকবাল তার একটা দরকারি কাজ শেষ করে দিছে।হাসিব শেখ নিজের পকেটে রাখা ইনজেকশটার ওপর হাত বুলালেন প্যান্টের ওপর দিয়ে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আজকে যদি ইকবাল এই কাজটা না করতো তবে হাসিব শেখ নিজেই শায়লাকে এই ইনজেকশন পুশ করে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিতেন।দুনিয়ার সব কিছু তিনি মেনে নিয়েছেন।
ইশতিয়াক কখনো তাকে ঘৃণা করবে এটা মানতে পারবেন না।শায়লার চোখে নিজের জন্য যে ঘৃণা তিনি দেখেছেন সেই একই ঘৃণা ইকবালের চোখে ও দেখেছেন।
ভালোবাসা দেখেছেন যার চোখে তার চোখে ঘৃণার আগুন হাসিব শেখ কখনোই মানতে পারবে না।
শায়লা,ইকবালের বডি তল্লাশির সময় ইকবালের পাঞ্জাবির পকেটে একটা লেটার পাওয়া গেলো।
পুলিশ সবার সামনেই সেটা পড়ে শোনালো।
“প্রিয় ইরা,
ফুলের মতো নরম, কোমল, আদুরে মেয়ে ইরা।
এই চিঠিটা যখন আমি লিখছি তখন তুমি আমার হাতে বন্দী। আর আমি বন্দী তোমার হাতে।পার্থক্য কী জানো?তোমাকে বন্দী করতে আমাকে অনেক কারসাজি করতে হয়েছে আর আমাকে বন্দী করতে!
সেই সুযোগ আমি নিজেই তোমাকে করে দিয়েছি ইরা।
ইরা,তোমার প্রতি আমার খুবই নোংরা একটা লালসা ছিলো ইরা।প্রতিরাতে আমি জ্বলেপুড়ে যেতাম তোমাকে কল্পনা করে। ইশতিয়াক তোমাকে আদর করছে এটা ভাবলেই আমার মাথায় আগুন ধরে উঠে।
ইরা,তুমি কেনো আমার জীবনে এলে না বলো তো?
অবশ্য আমার জীবনে না আসাই ভালো হয়েছে। আমি বড় পাপী ইরা।এই যে তোমাকে সুযোগ দিয়ে আমি ওয়াশরুমে দাঁড়িয়ে আছি কেনো জানো?
সত্যিটা জানিয়ে দিই তোমাকে।
প্রায় সময়ই আমি তোমাদের বেডরুমের দরজার সামনে গিয়ে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকি।
কামনায়,হিংসায় জ্বলেপুড়ে যাই।
আজকে সকালে আমার ঘুম ভেঙে যায় একটু তাড়াতাড়ি। অভ্যাসমতো আবারও যাই তোমাদের বেডরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কান পাতি।
ভেতর থেকে একটা মধুর সুর ভেসে আসে। আমি জানি না আমার কী হয়েছে সেই মুহূর্তে। তোমার গলার আওয়াজ পর্যন্ত ঠিক ছিলাম আমি ইরা কিন্তু যখন সেই সুর ইশতিয়াকের গলাতেও শুনলাম আমার সব এলোমেলো হয়ে গেলো। বহু বছর পর আমি কুরআন তিলাওয়াত শুনলাম। আরবিটা পর্যন্ত ঠিক ছিলাম ইরা,যখনই ইশতিয়াক বাংলা অর্থ বলতে শুরু করলো আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। আমার হাত পা অসাড় হয়ে আসতে শুরু করে।
আমার যে ভাই সারাদিন সিগারেটের ধোঁয়ায় ডুবে থাকতো, সে কিনা কুরআন পড়ছে।এই পরিবর্তন খুব সহজ নয় ইরা।আর যে তাকে এই পথে এনেছে তাকে আমি অপবিত্র করবো কীভাবে?
কতো বছর হয়ে গেছে আমি কুরআন তিলাওয়াত শুনি নি।
আমার বুকের ভেতর ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করে। আমি ভয়ে পালিয়ে আসি নিজের রুমে।
রুমে এসে খানিক পরে আমি নিজেকে নিজে অনেক বুঝাই।আমার মন আর বিবেক উভয়েই বিভক্ত হয়ে যায় মুহূর্তে।
বিবেক বলে আমি যা করছি সব অন্যায়,সব ভুল।
কিন্তু আমার নোংরা মন বলে দুনিয়া আনন্দময়।
মন আর বিবেকের লড়াইয়ে আমি মনকে সাপোর্ট করি।
তোমাকে তুলে ও আনি।
অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকা তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আমার মন আমাকে বারবার প্ররোচনা যোগাতে থাকে।
আমার মনে পড়ে ইশতিয়াকের পড়া আল কুরআনের অর্থ। “অবশ্যই, যে ব্যক্তি পাপ করেছে এবং যার পাপরাশি তাকে পরিবেষ্টন করেছে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।”-সুরা আল বাকারা৮১
আমার রাগ,ক্ষোভ,ক্রোধ হতে থাকে ইরা।সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে আমার মা’য়ের উপর। সেই একটা মানুষ যদি নোংরা পথে না যেতো তাহলে আমার জীবন এতটা নষ্ট হতো না।
আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি ইরা।আমি কী লিখতে নিয়েছি আর কী সব লিখছি।তুমি হয়তো ভাবছো টয়লেটে খাতা কলম পেলাম কীভাবে? আগেই এনে রেখেছি।তোমার ব্যাগে পিপার স্প্রে দেখেই বুঝেছি তুমি আসলে এই অস্ত্রটাই চালাবে।তবে একটা গোপন সত্যি কথা তোমাদের জানাতে চাই ইরা।আমার মা ভীষণ খারাপ একজন মানুষ। নোংরা চরিত্র তার।
কিন্তু কেউ জানে না তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে শুদ্ধ পুরুষ আমার বাবা হাসিব শেখ।
শুরুটা বাবা করেছেন যার জন্য আমার মা আর সেই পথ থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি।
ইরা আমি যা লিখতে চাচ্ছি তা লিখতে পারছি না আর যা লিখছি কেনো লিখছি তা ও বুঝতে পারছি না।
এলোমেলো অনেক কিছু লিখেছি যেসবের কোনো দরকার ছিলো না। লিখতে ভালো লাগছে তাই লিখছি।তোমার সাথে কথা বলতে ভীষণ ভালো লাগছে ইরা।এই চিঠিটা যখন তুমি পাবে ধরে নিচ্ছি তখন আমি আর এই দুনিয়ায় নেই।আমি এই দুনিয়ায় নেই ইরা।তোমার জীবনের একটা অভিশাপ হারিয়ে গেছে।খুশি হয়েছো নিশ্চয়?
তোমাকে খুশি করতেই আমি আরেকজনকে ও নিয়ে যাবো এই দুনিয়া থেকে ইরা।তুমি যাতে এই দুনিয়ায় আমার ভাইয়ের সাথে সুখে থাকতে পারো বাকী জীবন। সেই সাথে বাকী জীবন যাতে আমাকে ভুলতে না পারো ইরা।
ভালো থেকো আমার ভাইকে নিয়ে। ও জীবনে কারো ভালোবাসা পায় নি,চায় ও নি।
তোমার ভালোবাসা চেয়েছে, সেই ভালোবাসায় আমি ভাগ বসাতে চেয়েও বসাই নি।”
দুজনের লাশই ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসিব শেখের মনে হচ্ছে ইকবাল নিজের আর শায়লার সাথে তার ও কবর খুঁড়ে রেখে গেছে।
হতবিহ্বল ইশতিয়াক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে গেছে। একের পর এক যা ঘটে যাচ্ছে তাতে ইশতিয়াক আর নিতে পারছে।
বিশ্বাস, ভরসার শেষ আশ্রয় যখন নড়ে যায় তখন বাক শক্তি হারিয়ে যায় অজানায়।
এক হাতে ইরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে ইশতিয়াক।
বাবার মুখোশের আড়ালে এতো নোংরা একটা চেহারা ছিলো?
অথচ ইশতিয়াক কি-না আজীবন নিজের বাবাকে অসহায় ভেবে গেছে।
জীবনে প্রথম বারের মতো ইশতিয়াকের মায়া হচ্ছে শায়লার জন্য।
আহা বেচারা!
এতো ঘৃণা, এতো অপমান পেয়েও কখনো ইশতিয়াকের সামনে হাসিব শেখের কুকীর্তি ফাঁস করেন নি।
হয়তো কোথাও মনের কোনো এক কোণে হাসিব শেখ নামক মানুষটার জন্য একটু মায়া তার ছিলো।
তা না হলে কেনো জানালো না তাকে, যাকে সে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রেখেছে সে আসলে নিজেও একটা শয়তান।
ইশতিয়াক চুপচাপ ইরাকে নিয়ে নিজেদের রুমে চলে এলো। ভেতরে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে ইশতিয়াকের।
হাসিব শেখ হনুফার সাহায্যে নিচে নেমে গেলেন।ইশতিয়াক কী করবে এখন ভেবেই তার গলা শুকিয়ে আসে।
জীবনে তো কেউ-ই রইলো না তার।
এই পরিবারের ভেতরের এসব কেচ্ছা শুনে ইশতিয়াকের ফুফুরা ও নিজেদের বাড়িতে চলে গেলেন।
এতো দিন সবার মনেই কিছুটা হিংসা ছিলো এদের এতো অর্থকড়ি দেখে।অথচ ভেতরে ভেতরে যে এদের নীতি-নৈতিকতাতে ঘুণে ধরেছে,মানুষের চেহারার আড়ালে সবাই অমানুষ হয়ে আছে তা কেউ জানতো না।
এতো অর্থকড়ি যদি মানুষকে হেদায়েতের পথ থেকে এতো দূরে নিয়ে যায় যেখানে গেলে আর ফিরে আসার রাস্তা থাকে না।
যেখানে গেলে চারদিকে শুধু পাপ থাকে সেই অর্থকড়ি না হোক।
ইরার হাত ধরে ইশতিয়াক বললো, “আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ইরা।এতো যন্ত্রণা আমি নিতে পারছি না।এতো সত্যি আমি মানতে পারছি না।”
ইরা ইশতিয়াকের কষ্ট বুঝতে পারছে।ইশতিয়াকের বুকে মাথা রেখে ইরা বললো, “নিজেকে শান্ত করুন।জীবন এমনই। কখন কোন সত্যির মুখোমুখি করে দেয় কেউ জানে না।তবুও আমাদের বেঁচে থাকতে হয় আল্লাহর উপর ভরসা আর বিশ্বাস নিয়ে। অন্ধকার কেটেই আলো আসে।”
“ইরা,আমি যদি তোমাকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে, সবাইকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাই তুমি কী যাবে আমার সাথে?”
“নিশ্চিন্তে যাবো।”
“তবে চলো ইরা।এক্ষুনি বেরিয়ে যাই।আমার যে আর এতো যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। এই পাপের সাম্রাজ্যে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ইরা।”
“চলুন।”
হাসিব শেখ নিজের রুমের বারান্দায় বসে দেখতে পেলেন একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে ইশতিয়াক ইরার হাত ধরে বের হয়ে যাচ্ছে।
আচমকা চিৎকার করে উঠলেন তিনি ইশতিয়াকের নাম ধরে ডেকে।
হাসিব শেখের চিৎকার শুনে ইরা থমকে দাঁড়ায়। ইশতিয়াক ইরার দিকে তাকিয়ে বললো, “দাঁড়াবে না ইরা।চলো।”
“বাবা ডাকছেন।”
“আমি আসতে বলেছি তো!”
ইশতিয়াকের কন্ঠস্বর কঠোর হয়ে উঠলো।
হাসিব শেখ পেছন থেকে আকুল গলায় ডেকে বললেন, “ইশতিয়াক, বাবা আমার। আমাকে এতো বড় শাস্তি দিস না বাপ।তুই আমাকে এভাবে ফেলে দিয়ে চলে গেলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো।আমাকে বাবা বলে ডাকতে হবে না তবুও তুই এখানে থাক।আমি অন্তত দূর থেকে তোকে দেখবো।যাস না বাপ।”
“আমার ছায়া দেখার অধিকার ও আপনি হারিয়ে ফেলেছেন।আমি জেনে গেলাম আমি এতিম এই দুনিয়ায়। বাবা মা কেউ-ই নেই আমার।”
“আমাকে এই কঠিন শাস্তি দিস না ইশু।তার চেয়ে ভালো তুই নিজের হাতে আমাকে গু লি করে শেষ করে দিয়ে যা।আমাকে যেকোনো শাস্তি দে।”
“তোমার জন্য এটাই শাস্তি। এর চাইতে বড় কঠিন কোনো শাস্তি তোমার জন্য মানানসই হবে না।ইরা চলো।আমার লাশ ও কখনো এই অভিশপ্ত শেখ ভিলায় আসবে না।আমার আসা তো পরের কথা।”
ইশতিয়াক চলে গেলো। পেছনে রয়ে গেলেন বুক ভরা আর্তনাদ নিয়ে হাসিব শেখ।
বাহিরে বের হয়ে ইরা নিজের মা’কে কল দিলো।
শারমিন ইরার কল রিসিভ করলেন আজকে।সালাম দিতেই শারমিন জিজ্ঞেস করলো, “কেনো কল করেছিস?”
“মা,আমি একটু বাসায় আসি আজকে রাতটার জন্য?”
শারমিন বিরক্ত হয়ে উঠেন ইরার আসার কথা শুনে। এই বাসা তিনি সাবলেট ভাড়া দিয়েছেন। ছেলে মেয়ে দুটোর কাউকেই শারমিনের এখন আর দরকার নেই। উটকো ঝামেলা এরা আরো।
এই মেয়েটা বড় বেয়াদব। কোথায় তিনি ভেবেছেন বড়লোক মেয়ের জামাই পেয়ে তিনি ভালো অর্থকড়ি কামাতে পারবেন এই মেয়ের জন্য সেসব কিছুই হয় নি।তার মুখের সামনে থেকে এই মেয়ে খাবার কেড়ে নিয়ে গেছে।আজকে বাসায় আসতে চাচ্ছে!
তিরিক্ষি গলায় শারমিন বললো, “কেনো?এই বাসায় তোর কী এখন আর?বাসায় আসা যাবে না।আমি বাসা সাবলেট দিয়েছি।এখানে তোদের দুই ভাই বোনের কারো জায়গা নেই।”
ইরা আশাহত হয়ে গেলো মা’য়ের কথা শুনে। হায়রে মা রে!
কতো রূপ এই নারী জাতির!
ইরা ভাবে ইশতিয়াকের মা খারাপ হওয়ার পেছনে না হয় একটা কারণ ছিলো কিন্তু তার মা কেনো এমন?
ইশতিয়াক ইরার দিকে তাকিয়ে বললো, “মন খারাপ হয়ে গেছে ইরা?”
ইরা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
“তুমি কেনো ওখানে থাকতে চাইলে বলো?তোমার হাজব্যান্ড কোনো বেকার পুরুষ না।তার অ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ অর্থ আছে তা দিয়ে তুমি ইরা আজীবন রানীর মতো থাকতে পারবে।আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার ইরার কিছুর অভাব হবে না।খুব শীঘ্রই আমরা এই দেশ ছেড়ে চলে যাবো।সবকিছু থেকে অনেক দূরে চলে যাবো।”
ইরার কিছুতেই ইচ্ছে করে নি আজকের রাতটা হোটেলে থাকতে। এই ভাঙাচোরা মানুষটার এতো যন্ত্রণা নিয়ে ইরার মনে হয়েছিলো মা’য়ের কাছে গেলে বোধহয় একটু স্বস্তি পাবে।
তা আর হলো না।
বাচ্চাদের স্কুলে অভিভাবক সমাবেশ ডেকেছে।রুমা মনিরকে যেতে বললো। মনির খুব একটা আগ্রহী হলো না।অগত্যা রুমাকেই বাচ্চাদের নিয়ে যেতে হলো।
উপমা এই সুযোগটার অপেক্ষায় ছিলো।বোনের উপর উপমার ক্ষোভ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে দিনদিন।
রুমা যেতেই উপমা রুমার রুমে আসে।মনির উপুড় হয়ে শুয়ে ফোন টিপতেছে।
উপমা এসে মনিরের পাশে বসে কাঁধে হাত রাখে।মনির ফিরে তাকালে মুচকি হেসে উপমা বললো, “আপা বলে গেছে আপনার খেয়াল রাখতে। আপনার কিছু লাগলে দেখতে।”
মনির উপমার দিকে তাকিয়ে থাকে এক মুহূর্ত।হাতের ফোনটা বালিশের উপর উপুড় করে রেখে উপমাকে জিজ্ঞেস করে, “আমার তো অনেক কিছু লাগবে উপমা।সেসব তো তুমি দিতে পারবে না।”
উপমা আরেকটু মনিরের গা ঘেঁষে বসলো। লাজুক হেসে বললো, “কি এমন লাগবে আপনার বলেন দুলাভাই? শালী থাকতে আপনি এতো পেরেশান হচ্ছেন কেনো?”
মনির উঠে বসে উপমার হাতে আলতো করে চাপ দিয়ে বললো, “যা চাই তা তুমি দিতে পারবে না।তা শুধু তোমার বোনই দিতে পারবে।”
“আমাকে কী দেখতে এতটাই খারাপ লাগে?না-কি কোনো কিছুর কমতি আছে?”
মনির গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “তুমি ভেবে বলছো তো উপমা।পরে নিশ্চয় বলবে না আমি তোমাকে জোর করেছি।”
“এসব বলতে যাবো কেনো?আমি নিজেই তো এসেছি আপনার কাছে। তাছাড়া আমি নিজেই বুঝতে পারি আপনি আসলে আপার সাথে খুশি হতে পারেন না।কেনো যেনো মনে হয় আপা আপনাকে সর্বোচ্চ আনন্দ দিতে পারে না। ওর শরীরের যেই বেঢপ আকৃতি।আমার মাথায় ঢুকে না আপনি কীভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকান?”
মনির জোরে হেসে উঠে বলে, “তুমি ওর বোন হয়ে একথা বললে আমি আর কি বলবো।তুমি তো বুঝতেছো।”
“এট কোনো স্বাভাবিক জীবন না দুলাভাই। তাছাড়া আপনি এতো পরিশ্রম করে উপার্জন করেন সেখানে ঘরের বউয়ের কাছে যদি সুখ না পান তাহলে কী লাভ এতো কষ্টের।পুরুষের সব সুখ তো তার বউয়ের কাছেই।সেটা যদি বউ না বুঝে!”
আচমকা মনির বললো, “তুমি অনেক বুদ্ধিমতী উপমা।কি সুন্দর করে বুঝে গেছো স্বামীর সংসার কীভাবে করা লাগে সেসব।কিন্তু সাগরের সাথে কেনো টিকে নি তোমার সংসার? সাগরকে যতদূর চিনেছি সাগর খারাপ ছেলে না।”
উপমার মুখ কালো হয়ে যায় মুহূর্তে। মনির কোনখানের কথা কোনখানে নিয়ে গেছে!
রুমা আসার আগেই মনিরকে বশ করতে হবে।রুমা তার সংসার ভেঙেছে সে ও রুমাকে সংসার করতে দিবে না।
“সেসব বাদ দিন দুলাভাই।”
“না উপমা। বাদ দেওয়া সম্ভব না। তোমার কেনো মনে হলো আমি একা বাসায় তুমি সুযোগ দিলেই তোমাকে কাছে টেনে নিবো?আমি কী কখনো তোমাকে এরকম সিগনাল দিয়েছি?না-কি কখনো কিছু বলেছি?
তোমাকে আমি নিজের ছোট বোন ভাবতাম উপমা।”
উপমা চমকে উঠে। সর্বনাশ!
মনির পল্টি নিলো কেনো এভাবে?
উপমার গলা শুকিয়ে আসে।
রুমার আসার সময় হয়ে এসেছে।
মনির নিজেই বললো, “রুমা ভীষণ বোকা।সে নিজের সংসারে কালসাপ পুষতে শুরু করেছে।আজ আসুক।”
উপমা উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোনো কথা না বলে মনিরকে বাহিরে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
মনির ভেতর থেকে চিৎকার করে দরজা খোলার জন্য। দ্রুত ঘটনা সাজিয়ে নেয় উপমা।
রুমা আসলে যা যা বলবে সব সাজিয়ে নেয়।
রুমা আসতেই উপমা কান্নাকাটি শুরু করে দেয় বোনকে ধরে।মনির ভেতর থেকে সব শুনতে পায়।উপ্পমা কেঁদে বললো , “আপা,দুলাভাই আমাকে…!”
রুমার বুক কেঁপে উঠে। মনির শেষ পর্যন্ত!
রাগে রুমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে।মনির এতটা দুশ্চরিত্র!
রুমা বাহিরে থেকে দরজা খুলতেই মনির হেসে বললো, “উপমার কথা শুনেছো?বিশ্বাস করো নি আশা করছি রুমা।”
“আমার বোনকে অবিশ্বাস করে তোমার কথা বিশ্বাস করবো আমি? তুমি এতো নোংরা মনির?তুমি তাহলে আমার অবর্তমানে চিটাগং কী করে বেড়াও?আমি কার সাথে সংসার করছি!”
মনির হেসে বললো, “আমাকে অবিশ্বাস করো না রুমা।যা ভাবছো সেসব কিছুই হয় নি।দাঁড়াও,দেখাচ্ছি।”
উপমা রুমে এসে কথা বলতে শুরু করতেই যখনই মনিরের মনে হলো উপমার কথাগুলো অন্যদিকে যাচ্ছে তখনই ভিডিও ক্যামেরা অন করে বালিশের উপর রাখলো মনির উপমার অজান্তে।
রুমা ভিডিওটা দেখে লাফিয়ে উঠে রান্নাঘরে যায়।উপমা সোফায় বসে মুচকি হাসছে।আজকে থেকে রুমার অশান্তি শুরু।
কিচেন থেকে ব টি নিয়ে এসে উপমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “আজকে এখানেই তোকে আমি জ বা ই করে দিবো হারামজাদি। তুই আমার সংসারে আগুন লাগাতে চাস?আমি মোটা?আমি বেঢপ আকৃতির? আমি আমার জামাইরে খুশি করতে পারি না?
তুই পারস না?খুব পারস জামাই খুশি করতে?এজন্য তোর জামাই তোরে ছাইড়া দিছে?না-কি বাহিরের পুরুষ ও খুশি করার অভিজ্ঞতা আছে তোর?”
উপমা কেঁপে উঠে।
মুহূর্তেই উপমার চুলের মুঠি চেপে ধরে রুমা সোফা থেকে ফ্লোরে ফেলে দেয়।উপমা কান্না করতে ও ভুলে যায়।
তার ভাগ্য সবসময় তার সাথে প্রতারণা করে। যতবার সে অন্যকে ফাঁসাতে চেয়েছে ততবারই নিজে ফেঁসে গেছে।
রুমার এলোপাথাড়ি থাপ্পড় খেতে খেতে উপমার ঠোঁটের কোণ কেটে গেলো।
উপমা উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোনোকিছু না ভেবেই রুমার নাকে একটা ঘুষি মারে।
রুমার নাক দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে।রুমা চিৎকার করে মনিরকে ডাকে।
মনির বাহিরে এসে দেখে দুই বোনই একে অন্যের চুল ধরে টানাটানি করছে।
ছুটে এসে মনির দু’জনকে ছাড়ায়।রুমার দিকে তাকিয়ে বললো, “পাগল হয়ে গেছো না-কি? কী শুরু করেছো?”
“আমি পাগল হয়ে গেছি মনির।ও আমার বোন হয়ে কীভাবে আমার সংসার ভাঙতে চাইলো তুমি বলো তাহলে।”
উপমা হিসহিসিয়ে বললো, “তুই?তুই কীভাবে আমার সংসার ভেঙে দিলি?কীভাবে বল?আমি যখনই কোনো কিছু বলতাম তুই আমাকে কখনোই একটা ভালো পরামর্শ দেস নাই।তোর বুদ্ধিতে আমি আমার স্বামী,ননদের সাথে দিনের পর দিন অন্যায় করে গেছি।আমার কিছুই রইলো না।আমার সন্তান ও হারিয়ে গেলো।
আমার সংসার ভেঙে দিয়ে তুই নিজের সংসার সাজিয়ে বসেছিস?আমি আগুনে জ্বলেপুড়ে যাবো আর তুই সুখে সংসার করবি?আমি কীভাবে সেটা হতে দিবো?”
মনির রুমার দিকে তাকায়। রুমা কেঁপে উঠে বললো, “ও মিথ্যা কথা বলছে।আমি কখনোই ওকে কিছু বলি নি।ও তোমার সামনে আমাকে খারাপ বানাতে চাইছে।”
“ও যে মিথ্যা কথা বলে নি সেটা আমি জানি রুমা।সংসার একটা সমঝোতার জায়গা। সেখানে সবসময় জিততে চাওয়া বোকামি। উপমা তোমার ছোট বোন ছিলো। তোমরা আপন বোন।একই মা’য়ের পেটে তোমাদের জন্ম।তুমি বড় ছিলে, তোমার উচিত ছিলো উপমা কোনো কথা বললে ওকে বুঝিয়ে বলা।ওকে উল্টো উস্কে দেওয়া না।তুমি আগুনে ঘি ঢেলে গেছো কেনো?”
রুমা জবাব দেয় না। রুমার নিজের ও জানা নেই এই প্রশ্নের উত্তর। কেনো উপমাকে সে সবসময় উস্কানি দিয়েছে?
মনির উপমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি কী চাও উপমা?”
উপমা আনমনা হয়ে যায়। দুই চোখ ভরে যায় জলে।
ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে, “আমার এই উদবাস্তু জীবন ভালো লাগছে না।আমি আমার সংসার চাই।আমার বাচ্চাটাকে চাই।আমি আমার বাচ্চার কাছে ক্ষমা চাইতে চাই।আমি অনেকের সাথে অনেক অন্যায় করেছি।কিছু সবচেয়ে বড় জুলুম করেছি নিজের সন্তানের সাথে। আমি আমার হারানো মেয়েটাকে ফিরে পেতে চাই।”
মনির কোমল গলায় বললো, “তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও।আপাতত তোমাকে আমি একটা মহিলা হোস্টেলে উঠিয়ে দিয়ে আসবো।তোমার জন্য আমি পাত্র দেখবো।তোমার নতুন একটা সংসার হবে। আমি নিজে দাঁড়িয়ে তোমার বিয়ে দিবো।”
প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৩
উপমা সত্যি সত্যি তৈরি হয়ে নিলো।মাত্র কয়েকদিনেই এই জীবনের উপর উপমার ঘেন্না এসে গেছে।
মনে হচ্ছে এর চেয়ে শান্তি ছিলো শারমিনের গালাগালিতে বোধহয়।
মনে মনে শপথ করে উপমা।এরপর যদি আল্লাহ তার কপালে সংসার জুটিয়ে দেয় সেই সংসারে উপমা মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে প্রয়োজন হলে।শারীরিক, মানসিক সব যন্ত্রণা সহ্য করে যাবে।কিন্তু সংসার ছেড়ে আসবে না কখনোই।
