Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৯

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৯

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৯
আরাফাত আদনান সামি

কৌশিকের এমন লাগামহীন কথাবার্তা শুনে মায়ার মুখের রঙ লালচে হয়ে উঠল। বিরক্তি আর লজ্জার মিশ্র ছাপ যেন চোখেমুখে ফুটে উঠল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে চুলগুলো সামনের দিক থেকে পিছনে ঠেলে দিয়ে সে কাঁপা গলায় বলল,

“ক..কীসব উল্টো পাল্টা বলছেন আপনি? আপনার মাথা ঠিক আছে?”
কৌশিক কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই শান্ত অথচ অদ্ভুত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“আছে জান, আগে দেনা তোর ওইটার ফিতাটা খুলে হাতে পরিয়ে।”
মায়ার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। বিরক্তি আরও গাঢ় হলো তার কণ্ঠে,
“কীসব লাগাম ছাড়া কথা-বার্তা বলছেন আপনি? আগে মুখে একটা লাগাম লাগান।”
কৌশিক এবার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে একেবারে নির্লজ্জ স্বরে বলল,
“লাগাম নাই তো… লাগাম বিক্রি করে খেয়ে ফেলছি। এখন দেনা জান।”
এমন উত্তর শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা যেন ক্ষোভে জ্বলে উঠল। দাঁত কিঁচিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“অসভ্য! লম্পট লোক একটা!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মায়া কথাটা শেষ করতেই আচমকা কৌশিক বালিশটা সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃষ্টি। আস্তে আস্তে এক পা, দু’পা করে মায়ার দিকে এগোতে লাগল। কৌশিককে কাছে আসতে দেখে মায়ার বুক কেঁপে উঠল, ভয় আর অজানা এক কাঁপুনি তাকে আচ্ছন্ন করে নিল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“এ..এই ভাবে আ..আ.. আমার ক..কাছে আসছেন কেনো?”
কৌশিক কোনো উত্তর দিল না। তার পদক্ষেপ থামল না। মায়া আরও ভীতস্বরে বলল,
“এবার কিন্তু বেশি হচ্ছে, কৌশিক ভাই একদম আমার কাছে আসবেন না।”
কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই কৌশিক একেবারে তার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে সেই অচেনা গাম্ভীর্য, অথচ ঠোঁটে একরাশ নিরাবেগ ছাপ। ধীরে ধীরে সে হাত বাড়াল মায়ার দিকে। নিজের দিকে কৌশিকের হাত আসতে দেখে মায়া আর সামলাতে পারল না। লজ্জার আবেশে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কাপো কাপো ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে বলল,

“ক..ক..কী…..”
কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই কৌশিকের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
“কী, ক’ক’কী করছিস? চিরনিটা দে তো! আমার এই ছোট ছোট চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছিস না?”
কৌশিকে এমন কথাতে মুহূর্তের মধ্যে মায়ার সমস্ত লজ্জার আবেশ মিলিয়ে গেল। অবাক দৃষ্টিতে সে চোখ মেলে তাকাল কৌশিকের দিকে। থ হয়ে যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
কৌশিক কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। চিরনি হাতে নিয়ে ছোট ছোট চুলগুলো আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“এইভাবে কী দেখছিস?”
মায়া তবু নির্বাক। কোনো নড়াচড়া নেই, কোনো উত্তর নেই। অবশেষে বিরক্ত হয়ে কৌশিক ডান হাত মায়ার চোখের সামনে এনে হঠাৎ জোরে একটা তুরি বাজাল।

“ফুঁউউঁ…”
চমকে উঠল মায়া। মুহূর্তেই সে ছিটকে একটু দূরে সরে গেল। বুক ধড়ফড় করছে তার। কৌশিক ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। গলায় বিরক্তি আর বিস্ময়ের সুর,
“এই যে, হ্যালো! কী হয়েছে?”
মায়া নরম স্বরে বলল,
“কই?কিছু না তো।”
কৌশিক একটু ঝুঁকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“সত্যিই কিছু না?”
মায়া বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“কেনো কিছু হবার কথা ছিলো নাকি?”
কৌশিকের ঠোঁটের কোণে ম্লান এক হাসি খেলে গেল। গলায় রহস্যমাখা স্বরে বলল,
“ছিলো তো অনেক কিছুই।”
ভ্রুকুঁচকে উঠল মায়ার। চোখে প্রশ্নের ছাপ।বলল,

“মানে?”
কৌশিক এক মুহূর্ত তার দিকে চেয়ে থেকে হালকা কাঁধ ঝাঁকালো। গলাটা যেন নিস্পৃহ হয়ে উঠল,
“কিছু না।”
কিছুক্ষণ নিরবতা..
হঠাৎ নিরবতা ভেঙে কৌশিক মায়ার দিকে একপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দুষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা জান তুই এত চিকন কেন খাস না,নাকি?”
মায়া কৌশিকের কথা শুনে কৌশিকের দিকে তাকায়। ভ্রুকুচকে বলে,
“না খেয়ে আছি নাকি? মোটা না হলে আমি কী করবো।”
“কী করবি মানে? এটা তো অনেক বড় সমস্যা তাহলে। তবে এই বড় সম্যার সমাধান একমাত্র আমার কাছেই আছে।”
মায়ার কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কী?”
কৌশিক মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“আমাকে বিয়ে করে নে। কয়েকদিন জামাইয়ের পানি পেটে পড়লে এমনেই মুটু হয়ে যাবি।”
“কী হলো কৌশিক ভাই মনে-মনে কী বিড়বিড় করছেন?”
“না,কিছু না।”
“আচ্ছা,তাহলে তারাতারি বলেন কীভাবে মোটা হবো।”
“না থাক তোকে মোটা হতে হবে না তুই এমনই ঠিক আছিস।”
“এই না আপনি বললেন আমি চিকন।”
“হ্যাঁ তবে বেশি না পারফেক্ট আছিস।”
“ও আচ্ছা তাই বলেন।”
“হুম।”

এরপর দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। ঘরের বাতাস হঠাৎ যেন ভারী হয়ে উঠল। কৌশিক গিয়ে বিছানায় উঠে সাইট থেকে একটা বালিশ টেনে নিল। পিঠের নিচে রেখে হেলান দিয়ে বসল সে। চুপচাপ, কোনো শব্দ নেই শুধু নীরবতার ভেতর টিকটিক ঘড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সময় কেটে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। রাত তখন প্রায় পাঁচটা ছুঁই ছুঁই। অথচ পাটোয়ারী বাড়িতে কৌশিক ঢুকেছিল রাত একটা বাজে। এখনও সে যায়নি। মায়া বেশ কিছুক্ষণ ধরে খেয়াল করছে কৌশিক বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে। চোখে সেই দুষ্টুমি-ভরা দৃষ্টি, আর ঠোঁটে মিটি মিটি হাসি। প্রতিবারের মতো এবারও মায়ার গা জ্বালা করে উঠল। হঠাৎ করেই সে নীরবতা ভেঙে মায়া বলল,

“আপনি আমাকে দেখে এইভাবে মিটি মিটি করে হাঁসছেন কেনো?”
কৌশিক নির্লিপ্ত অথচ ব্যঙ্গমাখা কণ্ঠে উত্তর দিল,
“তোর কী সমস্যা,শুনি?”
“তো আমার সমস্যা না? আপনি আমাকে দেখে হাঁসবেন কেনো?”
“এমনি।”
“আর রাত কয়টা বাজে?”
“তিনটা, চারটা হবে হয়তো কেনো?”
“অলরেডি পাঁচটা বেজে গেছে। আপনি এখনো আপনার বাসায় যান না কোনো? আপনার জন্য কী শান্তিতে আমি একটু ঘুমাতেও পারবো না,নাকি?”

“আমাকে অশান্তিতে রেখে দিবি আর আমি তোকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবো? এটা ভাবলি কী করে?”
“প্লিজ এখন চলে যান একটু পরে সকাল হয়ে যাবে তো।”
“হ্যাঁ সকাল হবে ভালো কথা তো, তবে আমি যাচ্ছি না কোথাও।”
“প্লিজ চলে যান না আমাদের এইভাবে একই রুমে একসাথে কেউ দেখে নিলে অনেক বড় একটা সমস্যা হবে প্লিজ এখন চলে যান কৌশিক ভাই।”
“আচ্ছা যাবো তবে একটা শর্তে।”
“কী?”
“আগে বল তুই আমাকে ভালোবাসিস তার পর যাবো।”
“না, না, না আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”
“কী বললি তুই?”

“কেনো শুনতে পান নি? তাহলে আবার বলছি আমি আপনাকে ভালোবাসি না’না’না।”
মায়া কথাটা শেষ করতে না করতেই কৌশিক এক লাফে বিছানা থেকে নেমে মায়ার কাছে গিয়ে মায়াকে কোলে তুলে নিল। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“বুঝেছি তুই এক কথার মানুষ না। কীভাবে ভালোবাসা আদায় করে নিতে হয় এই কৌশিক নীর চৌধুরী তা ভালো করেই জানে। সুইটহার্ট রেডি হো আজ তোকে এই কৌশিক, মিস মায়া পাটোয়ারী থেকে মিসেস মায়া নীর চৌধুরী বানাবে।”

ঝড়েরবেগে কোলে তুলে নেওয়া আর সাথে সাথে সাথে এমন গম্ভীর কণ্ঠে এমন কথা কানে আসতেই মায়ার পুরো শরীর ভয়ে থরথর করে কেপে উঠল। মায়া ভয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
“ক.কী ক..করছেন ক…কৌশিক ভাই আমায় নিচে নামান আমায় প্লিজ।”
কৌশিক মায়ার দিকে হালকা ঝুকে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“জান আজকে আর আমাকে বাধা দিস না।”
বলেই মায়াকে নিয়ে বিছানার দিকে এগোতে লাগল। এদিকে মায়া থরথর করে কাপছে। বলল,
“প্লিজ কৌশিক ভাই এমন কিছু করবেন না আমাকে নিচে নামান।”
মায়ার কোন কথা কৌশিক শুনছেন না মায়া অনেক ভাবে কৌশিকের হাত থেকে ছুটার চেষ্টা করল কিন্তু কোলে থাকার কারণে কিছুই করতে পারল না। মায়া কাঁদো কাঁদো ভাঙা স্বরে বলল,

“কৌ..কৌশিক ভাই প্লিজ এমন কিছু করবেন না। এগুলো শুধুই আপনার পাগলামো আর কিছুই নয়। আপনি যেটা করে ভালোবাসা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন সেটাকে ভালোবাসা বলে না জোর জবরদস্তি বলে। আপনার এই পাগলামো গুলোকে ভালোলাগা বলে ভালোবাসা না। ভালো লাগা আর ভালোবাসা এক না কৌশিক ভাই প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন।”
বলেই মায়া কাঁদতে শুরু করে দিল। মায়ার এই কথা গুলো শুনে কৌশিক থমকে গেলো।সাথে সাথেই মায়াকে নিচে নামিয়ে দিল। মায়া নিচে নেমে কাঁদতে কাঁদতে কৌশিকের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মায়ার মাত্র বলা কথা শুনে কৌশিকের বুক চিরে যাচ্ছিল। কী বলল ও? আমার এইগুলোকে ভালোবাসা বলে না পাগলামো বলে? কৌশিক নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মায়ার দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। মায়ার সামনে এসে হালকা ঝুঁকে তাচ্ছিল্যের একটা হাঁসি দিয়ে বলল,

“আচ্ছা মানলাম আমার এগুলোকে ভালোবাসা না ভালোলাগা বলে। কিন্তু তুই আগে ভালোলাগা অবদ্ধি তো আয়। তারপর আমরা না হয় এক সাথে হাতে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার দোয়ার অবদ্ধি পৌছে যাবো। চলনা দুইজনে মিলে ভালোগার ব্যাপারটাকে ভালোবাসায় পরিনত করি।”
মায়া চোখ মুছে কৌশিকের দিকে তাকাল। মায়া কিছু বলছে না দেখে কৌশিক আবার বলল,
“প্লিজ জান রাজি হয়ে যা। একটা সুযোগ দে আমাকে না হলে আমি যে তোকে ছাড়া মরেই যাবো।”
মায়া কোন কথা বলল না। কৌশিক আবার বলল,

“প্লিজ জান রাজি হয়ে যা।”
এবার মায়া বড় করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মিটি মিটি হাঁসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ আমি রাজি।”
মায়ার উত্তরটা শুনে কৌশিক কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো। পরমূহুর্তেই কৌশিক খুশিতে লাফিয়ে উঠল। কৌশিকের এমন কান্ড দেখে মায়া বলল,
“এই, এই কী করছেন সবাই জেগে যাবে তো চুপ করুন।”
“আজ আমাকে চুপ করাস না জান আজ আমাকে মন খুলে হাঁসতে দে জান মন খুলে হাঁসতে দে।”
“আপনার এই হাঁসিই না আমাদের দুইজনের গলার ফাসি হয়ে যায়।”
মায়া এবার একটু ধমকের স্বরেই বলল,

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৮

“এবার চুপ করুন আপনি।”
মায়া কথাটা শেষ করতেই কৌশিক খুশিতে মায়াকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জাপ্টে জরিয়ে ধরল। মায়া কী করবে কী করবে বুঝে উঠার আগেই সেও কৌশিক কে তার বুকের মাঝে আগলে নিল।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১০