কাজলরেখা পর্ব ৪০ (৩)
তানজিনা ইসলাম
আজ জুম্মাবার। শিকদার বাড়িতে এই দিনে মোটামুটি একটু ভালোই ব্যস্ততা থাকে। বাড়ির ছেলেরা দুপুর দেড়টার মধ্যেই রেডি হয়ে বেরিয়ে যায় মসজিদের উদ্দেশ্যে। সাথে জুম্মা উপলক্ষে বাড়িতে স্পেশাল কিছু রান্না হয়। তবে সব খাটুনিই যায় বর্ষা বেগমের উপর দিয়ে। আজও তার ব্যাতিক্রম নয়। সকাল থেকেই তিনি রান্নায় ব্যস্ত। আজ বিরিয়ানি রান্না হবে। আঁধারের ফেবারিট। যতবারই আঁধার বাড়িতে আসে, বর্ষা বেগম রান্না করেন ওর জন্য। আবার আরমান শিকদার বলেছে নতুন জামাই আছে তাই পাঁচ ছয়রকমের তরকারি রান্না করতে হবে।সেই নিয়ে তোড়জোড় চলছে সকাল থেকে।
অথচ জবা বেগম একবারও আসলেন না কিচেনে। নিজের মেয়ের জামাইয়ের খাবারের দায়িত্ব আরেকজনের উপর দিয়ে দিয়েছেন। চাদনী কাটারে ফল, পেয়াজ, টমেটো কাটছিলো। এসব দিয়ে সালাদ বানানো হবে। ও রান্নার চেয়ে চপিং,কাটিং ভালো পারে। মাঝে মাঝে আবার বর্ষা বেগমের কাছে জবা বেগমের নামে বদনামও করছিলো। ওনি মৃদু হাসছেন। আবার মানা করছেন এসব বলতে। সার্ভেন্টরাও জবা বেগম কে অতোটা দেখতে পারে না। কেমন অ্যারোগেন্ট একটা মানুষ। অহংকারে বুদ হয়ে থাকে সবসময়।যে নিজের বড় জা কে কথা শোনায় সে কাজের লোকদের সাথে আর কি ভালো ব্যবহার করবে।
দুপুর বাজে বারোটা। বর্ষা বেগম সময় দেখে চাদনীর উদ্দেশ্যে বললেন
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“চাঁদ, আঁধার নামাজ পড়তে যাবে?”
-“তোমার ছেলে নামাজ পড়ে? নামাজের নিয়ম মনে আছে কি-না সেটা জিজ্ঞেস করো আগে।”
বর্ষা বেগম বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকালেন। ওর কাছে এসে বললেন
-“তুমি একটু বলতে পারো না ওঁকে নামাজ পড়তে! ঢাকায় যাওয়ার পর এমন বরবাদ হয়েছে ও! জুম্মার নামাজ পর্যন্ত কী করে পড়ে না একটা মানুষ!”
-“এমনভাবে বলছো যেন আমি বললে শুনবে। আমাকেই কথা শোনাতে ছাড়ে না।”
-“আজকে বলো না যেতে।”
-“ঝাড়ি দিবে।”
-“মনে হয় না। নামাজ পড়তে বললে বকা কেন দিবে?”
-“তারপরও আমি পারবো না।”
-“স্বামীর ভালো দেখা একজন স্ত্রীর দায়িত্ব। তোমার একবার ওঁকে বলে দেখা উচিত। শোনো না বড় মা’র কথা। যাও না একটু বলো।”
চাদনী হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ালো। বর্ষা বেগম হাসিমুখে তাকালেন।চাদনী আইঢাই করে বেরিয়ে গেলো। খুঁজতে খুঁজতে আঁধার কে গিয়ে পেলো ছাঁদে। রেলিঙের উপর বসে পেয়ারা খাচ্ছে। ওঁদের ছাদের পাশে একটা পেয়ারা গাছ আছে। ছাদ থেকেই হাত বাড়িয়ে পেয়ারা পারা যায়।পরণে একটা হাটু পর্যন্ত হাফ জিন্স আর টিশার্ট। একটার উপর আরেকটা পা তুলে দিয়ে উদাস হয়ে বসে আছে।
চাদনী এগিয়ে গেলো।
-“আঁধার ভাই এখানে বসে আছো কেন?”
আঁধার তাকালো ওর দিকে। মুখ নাড়িয়ে বললো
-“কিছু বলবি?”
-“নামাজ পড়বা না?”
-“কীসের নামাজ?”
-“জুমার নামাজ। আজকে শুক্রবার। এমনিতে তো নামাজ পড়ো না তুমি, অন্তত জুমার নামাজ টা আদায় করো।”
আঁধার ভ্রু উচিয়ে তাকালো। চাদনীর অদৃষ্টে দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো। ইশ! কালকে কতোবার করে হুজুর বলে গেলো নামাজ পড়তে, আঁধার এশারের নামাজ পড়তে ভুলে গেলো। এখন আবার ভুলেই গেছে আজ যে শুক্রবার।তবুও নিজের কথা উপরে রাখতে বললো
-“তুই পড়িস নামাজ? আরেকজনকে যে বলছিস।ফজরের নামাজ পড়েছিস!”
-“হ্যাঁ।”
-“মিথ্যা। ঢাকায় তো একদিনও দেখলাম না তোকে নামাজ পড়তে।”
-“নামাজ নিয়ে কেও মিথ্যা বলে! আর ইবাদত দেখিয়ে করার জিনিস না। যারা মানুষ কে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে তাদের দোয়া কবুল হয় না!”
আঁধার কপালে পুরু ভাজ ফেলে তাকালো চাদনীর দিকে৷ যেতার মতো কোনো উত্তর তৈরি করতে পারলো না।পাংশুটে মুখ করে বললো
-“নামাজ কয়টায়?”
-“দেড়টা!গোসলে যাও।”
আঁধার রেলিং থেকে লাফ দিয়ে নামলো। হাতের আধখাওয়া পেয়ারাটা এগিয়ে দিলো চাদনীর দিকে। চাদনী চোখমুখ কুঁচকে হাতে নিলো। আঁধার চলে গেলো ছাদ থেকে। চাদনী রেলিং ধরে দাঁড়ালো, ছাঁদের কার্ণিশে। পেয়ারাটা ফেলতে গিয়েও একটা কামড় বসালো। কখন যে পেয়ারাটা পুরো খেয়ে ফেললো টেরই পেলো না!
আকিব শিকদার, আরমান শিকদার, অপূর্ব শিকদার সবাই নামাজের জন্য বেরোচ্ছে। অর্পিতার হাসবেন্ডও যাচ্ছে তাদের সাথে। ওরা সবাই রাফিয়া বেগম থেকে বিদায় নিয়ে বেরোতে যাবে, তার আগেই চাদনী থামিয়ে বললো
-“আঁধার ভাই যাবে তো। একটু দাঁড়াও তোমরা!”
-“আঁধার নামাজে যাবে? ওকে তো ঠেলেও নামাজে নিয়ে যাওয়া যায় না!”
অবাক হয়ে বললেন অপূর্ব শিকদার। চাদনী বললো
-“যাবে বলেছে আজকে। নিজেই বলেছে। আমি ডেকে আনছি। তোমরা একটু অপেক্ষা করো।”
চাদনী আঁধার কে ডাকতে গেলো। জুমার নামাজ দেড়টায় শুরু হয়ে যায়। এখন বাজে একটা দশ। অথচ আঁধারের গোসল সেড়ে বেরোনোর নাম গন্ধ নেই। একটা ছেলে হয়েও মেয়েদের মতো দু’ঘন্টা সময় লাগে ওর গোসল করতে। চাদনী কক্ষে ওঁকে দেখতে না পেয়ে বিছানায় বসলো। তাড়া দিয়ে, চিল্লিয়ে বললো
-“আঁধার ভাই,তাড়াতাড়ি বের হও। সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। তুমি বেরোতে বেরোতে নামাজ সহ শেষ হয়ে যাবে।”
আঁধার ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরোলো। চাদনী মাথা নিচু করে, মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলো। দরজা খোলার শব্দ শুনে মাথা তুলে তাকালো। আঁধারের তোয়ালে কোমড় পর্যন্ত পেঁচিয়ে বেরিয়ে গেছে। ওর গায়ে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা। কপালের বেবিহেয়ারগুলো থেকে টুপটুপ করে পানি ঝড়ছে। চাদনী উঠে দাঁড়িয়ে, চেঁচিয়ে বললো
-“একি, এভাবে কেন আসছো তুমি? পাঞ্জাবি পরে আসবা না?”
-“পরবো এখন।”
-“তাই বলে তোয়ালে পরে চলে আসবা।কেমন দেখা যায়!”
-“তুই চাইলে তোকে তোয়ালে খুলেও দেখাতে পারি, সমস্যা নাই।”
চাদনী আরো দ্বিগুণ স্বরে চেচালো
-“ছি! আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই।”
-“তোয়ালে খুলে দেখালেই ইন্টারেস্ট জাগবে।”
চাদনী চেঁচামেচি করে,ছি ছিকারি করতে করতে বেরিয়ে গেলো। আঁধার অট্ট হাসলো ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে।
আঁধার সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরে নিচে নামলো। সবাই অবাক হয়ে দেখলো ওঁকে! এই ছেলে এতো ভালো হয়ে গেছে কী করে! অপূর্ব শিকদার হা করে দেখলেন ওঁকে। আঁধার ওনার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো
-“কী? এভাবে কী দেখছো?”
-“আঁধার, বাবা তুই ঠিক আছিস? তোকে মেরে ধরে নামাজ পড়াতে নিয়ে যেতে পারতাম না আমি।”
আঁধার বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালো। অপূর্ব শিকদার আবেগে আপ্লূত হয়ে ওনার হাত ধরলেন। সবার অগোচরে ফিসফিস করে বললেন
-“তুই জানিস, আমি চাঁদের সাথেই কেন তোর বিয়ে করালাম? তোর তো অনেক অভিযোগ ছিলো আমার প্রতি। তুই আস্তে আস্তে বুঝতে পারবি রে বাবা।”
-“ওর কথায় যাচ্ছি না।”
-“তোর মনের কথা, তুই বলা ছাড়া আমি বুঝবো না! তুই আমার থেকে কিছু লুকাতে পারবি? তোর চোখ দেখেই তো আমি সব বুঝে যাই।”
আঁধার মুখ বাকালো।বললো
-“সারাজীবন সবকিছু চাপিয়ে দিয়ে বলছো, বোঝো আমাকে।”
-“সব তোর ভালোর জন্যই।”
-“আরেকটা ভালো করো। ওই অর্পিতাটা কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করো এখান থেকে। আমি নিতে পারছি না ওঁকে নিজের সামনে। এখন আবার ওর জামাইয়ের সাথে বাইরে যেতে হচ্ছে। ধুর!”
অপূর্ব শিকদার উত্তর দিলেন না। সবাইকে তাড়া দিয়ে বললেন
-“চলো সবাই। নামাজের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
আঁধার বাঁকা দৃষ্টিতে দেখলো অর্পিতার হাসবেন্ড কে।হেঁসে হেঁসে শ্বশুরের সাথে কথা বলছে। আঁধারের এটা রেস্পেক্ট দেখানো না, চামচামি মনে হলো। শ্বশুরের টাকায় থাকছে, খাচ্ছে। একটু চামচামি তো করায় যায়। আবার বাবা বলে গলা শুকিয়ে ফেলছে। আঁধার নিজের বাবাকেও দিনে এতোবার বাবা ডাকে কিনা সন্দেহ। এই ছেলে নিজের শ্বশুর কে যতোবার বাবা বলছে।
আঁধারের মনে একটু অহংকার কাজ করলো ছেলেটাকে দেখে। এই ছেলের মধ্যে কী পেয়ে অর্পিতা ওঁকে রেখে পালিয়ে ছিলো।এতো আঁধারের নখের যোগ্যও না। ওর চেয়ে হাইটে কম।গায়ের রং তো ওর ধারের কাছেও না। ফেইস দেখতেই কেমন গাঞ্জাখোরের মতো!অর্পিতা এজন্যই আফসোস করছে আসলে। বেচারি! একদম ঠিক হয়েছে। ওর ইগো হার্ট করে, এই গাঞ্জাখোর পেয়েছিলো পালানোর জন্য। আসলেই ভালোবাসা অন্ধ!
আঁধার থেমে গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে মনে মনে তওবা করলো। ইশ!এটা কী করে ফেলেছে ও? আবার রেসিসম করেছে। আরেকটা মানুষের শারীরিক গঠন নিয়ে মনে মনে হেঁসেছে। ও না সূরা মুখস্থ করার সময় মনে মনো তওবা করেছে। ও আর মানুষের কমতি, খামতি নিয়ে হাসাহাসি করবে না। এ দুনিয়ায় কেউই পার্ফেক্ট না। ও আরেকজনের উপর হাসলে সেটা চাদনীর উপর গিয়ে বর্তাবে। চাদনী আবার কষ্ট পাবে! ও তো চাদনীর অগোচরে ওঁকে কথা দিয়েছে ও আর কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না। দৃষ্টিভঙ্গি শুধু চাদনীর জন্য পাল্টালে হবে? না তো। আল্লাহর সব সৃষ্টিই সুন্দর।তারউপর ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ কে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়েছে।এটা ও কালকে বারবার নিজেকে বুঝিয়েছে। আজ আবার কেন এসব বলে ফেললো! আঁধার অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে হাঁটতে থাকলো মসজিদের উদ্দেশ্যে।
দুপুরের খাবারটা সচরাচর বাড়ির সবার একসাথে খাওয়া হয় না।তবে শুক্রবারের দিনটা আলাদা। মনে মনে যায়ই বিদ্বেষ থাকুক না কেন একে অপরের সবাই এক টেবিলে এক সাথে বসে খায়। বর্ষা বেগম টেবিলে প্লেট সাজাচ্ছেন।
চাদনী হাতে হাতে কিচেন থেকে তরকারির বাটি নিয়ে এসে টেবিলে রাখছে সবকিছু। শুক্রবারে দুপুরের পর সার্ভেন্টদের ছুটি দিতে হয়। এ সময়টা বর্ষাবেগমের খুব চাপ পরে যায়। বাড়ির একটা মানুষ ওনাকে সাহায্য করে না। তবে এবারে চাদনী থাকায় ওনার কাজটা সামান্য কমলো।
সময়ানুযায়ী বাড়ির সবাই একে একে এলো ড্রইংরুমে। আকিব শিকদার আর অপূর্ব শিকদার একসাথে এলেন। আরমান শিকদার মেয়ে আর মেয়ের জামাই নিয়ে সাথে এলেন। পিছু পিছু জবা বেগম আর রাফিয়া বেগমও এলেন।
সবার শেষে নামলো আঁধার। ওর গায়ে এখনো পাঞ্জাবি। হাতা দু’টো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রেখেছে। কিন্তু পাজামা বদলে অফ হেয়াইট জিন্স পরেছে।
টেবিলে বসতেই বিরিয়ানির গন্ধ নাকে এলো ওর।দেখা ছাড়াই চট করে বুঝে ফেললো আজ বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। ও বিরিয়ানির বড্ড পাগল। পাশের বাড়িতে রান্না হলেও গন্ধ শুঁকে বুঝে যায়। তখন ওর খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বানানোর জ্বালায় আর খাওয়া হয়না।কিন্তু বাড়িতে থাকলে বিষয়টা আলাদা। মন চায়লেই মায়ের কাছে যখন তখন আবদার করা যায়। আর আবদার করতেও হয় না।বলা ছাড়াই মা কেমন করে জানি বুঝে যায় সবকিছু।
বর্ষা বেগমের দিকে চকচকে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
-“আম্মু বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। তুমি আমাকে আগে বললে না কেন, আরেকটু আগে নামতাম।”
বর্ষা বেগম হাসলেন।আঁধার হাত ধুয়ে বললো
-“সবার আগে আমাকে দাও। পরে দিও ওঁদের। আই কান্ট ওয়েট।সুগন্ধ পেয়েই খিদে বেড়ে গেছে।”
বর্ষা বেগম আঁধারের প্লেটে বিরিয়ানি বেড়ে দিলেন। মুরগির রোস্ট, গরুর কালাভুনা আল সালাদও দিয়ে দিলেন। তারপর অন্যদের প্লেটে বাড়তে থাকলেন। আঁধার লেবু চিপড়ে খাওয়া শুরু করলো। বর্ষা বেগম, জবা বেগম আর চাদনী ছাড়া মোটামুটি বাকি সবাই বসেছে খেতে। জবা বেগম মেয়ের জামাইকে আপ্যায়ন করতে বসেননি। নয়তো উনি পারলে সবার আগেই খেয়ে উঠে যান। আঁধার সবার মাঝে চাদনীকে খুঁজলো। ও সোফায় বসে রিলস দেখছিলো। ডেকে বললো
-“চাদ তুই খেতে বসবি না?”
-“বড় আম্মুর সাথে খাবো।”
আঁধার বর্ষা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো
-“সবাই একসাথে বসলে সমস্যা কি! বেড়ে দিতে হবে না, আমরা বেড়ে খেতে পারবো। মেঝোমা, আম্মু বসে যাও।”
বর্ষা বেগম বললেন
-“তোরা খেয়ে উঠে যা, আমরা বসবো। সমস্যা নেই।
চাঁদ তুমি ওখানে বসে আছো কেন?একটা চেয়ার খালি আছে, বসো।”
-“তোমার সাথে খাবো।”
আঁধার বিরক্তিতে ওর দিকে তাকিয়ে বললো
-“একটু আগেই না তুই খিদেয় মরে যাচ্ছিলি।এখন আবার বলছিস পরে খাবি।তোরে বলেছি না এখানে এসে বসতে। নাটক কেন করছিস! বলছি না খেয়ে নিতে।”
চাদনী এসে আঁধারের পাশের চেয়ারে বসলো। বর্ষা বেগম ওর প্লেটেও খাবার বেড়ে দিলেন। এক চামচ দিতেই চাদনী প্লেট কেঁড়ে নিয়ে বললো
-“হয়েছে। এনাফ,আর লাগবে না।”
ও শুধু আর একটা মুরগির রোস্ট নেবে। আর কিচ্ছু না। পানিও খাবে না খাওয়ার পর। এটুকুই ওর খাওয়া। চাদনী আবদার করে বললো
-“বড় আম্মু,আমাকে লেগপিস দিবা।”
-“লেগপিস তো আর নেই।”
-“শেষ?”
-“অর্পিতা আর আঁধার কে দিয়ে ফেলেছি। ওরা পছন্দ করে, তোমার কথা মনে ছিলো না আমার।”
বর্ষা বেগম মিনমিন করে বললেন। চাদনী মুখ কালো করে ফেললো। আকিব শিকদার ওঁকে দেখে বললেন
-“দু’টো মুরগি না রান্না হয়েছিলো।”
জবা বেগম তড়িঘড়ি করে বললেন
-“দুপিস জামাইকে দিয়েছি। জামাই মানুষ, এক পিস দেওয়া যায়!”
আকিব শিকদারের আর কিছু বলার থাকলো না। ওনি চাদনীকে কিছু বলতে যাবেন তার আগে রাফিয়া বেগম বললেন
-“একদিন রান না খায়লে কিছু হইবো না।দিয়ে দিছে, মনে ছিলো না ওর কথা। এখানে আর তো আর কিছু করার নাই।”
পরক্ষণে চাদনীর দিকে তাকিয়ে বললো
-“ওই ছেমড়ি, পরিবারের মান সম্মান বুঝোস না। জামাইকে একটা রান দেওয়া যায়! তোর সেটাই কেন খায়তে হইবো! নাই বলার পর আবার সবার সামনে খুজোসও!”
চাদনী বহু কষ্টে চোখের পানি আটকালো। ও তো এমনিতেই চেয়েছিলো। আকিব শিকদার রুষ্ট চোখে তাকালেন রাফিয় বেগমের দিকে। বললেন
-“বাড়ির দুই বাচ্চা খাচ্ছে, ওর খেতে ইচ্ছে করতে পারে না?”
-“একটা মুরগির কয়টা রান থাকে তুই ক, দেখছে দুই জনকে দিয়ে দিছে আবার খোঁজে কেমনে!”
চাদনী মাথা নিচু করে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো।আঁধার নিজের প্লেট থেকে লেগপিস তুলে দিলো ওর প্লেটে। চাদনী টলমলে দৃষ্টিতে চকিতে তাকালো।আঁধার বললো
-“খা।”
চাদনী মাথা নেড়ে বললো
-“আমার লাগবে না আঁধার ভাই।তুমি নাও।”
-“না। এটা আমি এমনিতেও আর খেতে পারবো না।”
রাফিয়া বেগম হুড়মুড়িয়ে বললো
-“তুই ওরে দিয়ে দিলি কেন? এখন তুই কী দিয়ে খাবি দাদুভাই?”
-“অনেক আইটেম আছে, খাওয়া হয়ে যাবে। তোমাকে মেকি চিন্তা করতে হবে না দাদিমা!”
আঁধার কিছুটা রুঢ স্বরে বললো। চাদনী খাবার নাড়াচাড়া করতে থাকলো।আজ এক চামচ ভাতগুলোও খেতে কষ্ট হচ্ছে ওর।
আঁধার কন্ঠ নিচু করে বললো
কাজলরেখা পর্ব ৪০ (২)
-“কাদের কে তুই ভালোবাসিস চাদনী! এঁদেরকে? এদের ভালোবেসে আমার সাথে ঝগড়া করে চলে এসেছিস! এবার বুঝেছিস কেন আমি তোকে সবসময় ঢাকায় চলে যেতে বলি!”
চাদনী উত্তর দিলো না। আঁধার বললো
-“খাচ্ছিস না কেন? খা। নিজের ভাগ টা নিজেকে বুঝে নিতে হয়। নয়তো ভাগও পাবি না আবার খোটাও শুনবি।”
চাদনী ভাত শেষ করলো ঠিকই। কিন্তু কোনো আইটেমই নিলো না। ওর আজ হঠাৎ করেই মনে হলো এভাবে ঘর ভর্তি মানুষের সামনে খাবারের খোঁটা পাওয়ার চেয়ে অন্তত ঢাকার বন্দি জীবনটা ওর জন্য অনেকাংশে ভালো ছিলো।
