Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

তাদের বিশ্বজয়ের উল্লাসে বাড়ির সব লোক বাগানে বেরিয়ে এলো। লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির আর লামহা চিৎকার চেঁচামেচি করছে, হাসাহাসি করছে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ঝাটা হাতে হাজির হলেন লতিফা বেগম। সবার আগে গিয়ে রাশেদ, হামিদা আর আরিফের পিঠে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা বারি বসালেন।
বারি খেয়ে হাসতে থাকা তিনজনের মুখ হঠাৎ থমকে গেল। তারা দাঁড়িয়ে রইল গম্ভীর মুখে।
এমন দৃশ্য দেখে লামিয়া, লামহা, তায়েব, তায়েবা আর মাহির একসাথে চিৎকার করে দৌড় দিল। লামিয়া বলল –
“পালা সবাই! নয়তো এই ঝাটাওয়ালী আমাদের ভর্তা বানিয়ে ফেলবে আজকে!”
লতিফা বেগম রাগে গর্জে উঠলেন –

“আল্লার সকালে উঠেই সব শুরু করছিস! আজকে তোদের একদিন, কী আমার একদিন!”
বলেই তিনি তাদের পিছু নিয়ে দৌড়াতে লাগলেন।
পিছন থেকে রাশেদ মুখ গম্ভীর করে বলল –
“মেজোমা, তাহলে আমাদেরই বা মারলেন কেনো?”
শাড়ির আঁচল কামড়ে টেনে নিয়ে লতিফা বেগম বললেন –
“ছোট্টরা ঝগড়া করছিলো, আর তোরা তাদের উস্কে দিচ্ছিলি তাই!”
তাদের এই কাণ্ড দেখে খান পরিবারের সবাই হেসে উঠল। রাশেদ, হামিদা আর আরিফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল পিছনের দিকে।
এইবার হামিদা খেয়াল করল সাফওয়ানকে। কত বছর পর প্রিয় মানুষটিকে সামনে দেখছে সে! আগের চেয়ে আরও সুন্দর হয়েছে সাফওয়ান। বাদামী চোখ, কুচকুচে কালো চুল, পরনে কালো টিশার্ট আর ট্রাউজার। হেসে হেসে সবার সঙ্গে কথা বলছে।
সাফওয়ানও তাকাল হামিদার দিকে। চোখাচোখি হতেই হামিদা লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিল।
পাশ থেকে শারমিন হেসে বলল –

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ওগড! খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! আমার ভীষণ দারুণ লাগছে।”
বলেই সে হাসতে লাগল।
তার কথা শুনে রাশেদ চোখ তুলে তাকাল। দেখল শারমিনের হাসিমুখ। চোখাচোখি হতেই শারমিন হালকা একটা হাসি দিল।
কিন্তু রাশেদ তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিল। শারমিন সেটা দেখে মন খারাপ করল।
ওদিকে এখনো লতিফা বেগম ঝাটা হাতে দৌড়াচ্ছেন লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা আর লামহার পেছনে।
আনিসুল সাহেব হেসে শফিকুল খান কে বললেন –
“চল আমরা সবাই একটু বাইরে ঘুরে আসি।”
শফিউর সাহেব একটু দ্বিধা করে বললেন –

“কিন্তু”
তখনই হামিদ সাহেব বললেন –
“আরে, এসব কোনো ব্যাপার না। মাঝেমধ্যে এমন হয়।”
বলেই বাড়ির সব কর্তারা বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
এদিকে তায়েব, তায়েবা আর লামহা দৌড়ে বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ল। লামিয়া ছুটে গিয়ে লুবনা বেগমের পিছনে দাঁড়াল।
লুবনা বেগম হেসে বললেন –

“আহা ভাবি, ছোট্ট মানুষ! তাই এমন করেছে। আর করবে না।”
পিছন থেকে আজমেরী বেগম হাঁক ছাড়লেন –
“খবরদার মেজো বউ! আমার নাতনির গায়ে হাত দিবা না কইলাম। যদি হাত দিস, তাইলে আজকেই একখান বিরাট বড় ফাটাফাটি হইবো!”
লতিফা বেগম থেমে গেলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন –
“আম্মা, আপনি সবসময় বাচ্চাদের মতো করেন কেনো? আর এগুলো কী পরেছেন! আপনার জন্যই সব কয়টা বান্দর মাথায় উঠেছে!”
আজমেরী বেগম গম্ভীর হয়ে বললেন –

“খবরদার! আমার ক্যাশন নিয়ে কিছু বলবি না কইলাম।”
লুবনা বেগমের পিছন থেকে লামিয়া মাথা বের করে বলল –
“আহা দাদী! ওইটা ক্যাশন না, ফ্যাশন হবে।”
আজমেরী বেগম দাঁত কেলিয়ে হেসে বললেন –
“ওই একই!”
এবার লতিফা বেগম বিরক্ত হয়ে থেমে গেলেন। লামিয়া সুযোগ বুঝে দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল, তার পিছন পিছন হামিদাও।
মনেরা বেগম এসে বললেন –
“মেজো ভাবী, জানেন তো লামিয়া কেমন। থাক, আর রাগ করবেন না। চলুন সকালের খাবারের আয়োজন করি।”
বলেই বাড়ির সব কর্তিরা রান্নার আয়োজন শুরু করলেন।
এক এক করে সবাই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
এদিকে রাশেদ বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎই টের পেল তার হাতে কেউ টান দিল। পিছনে ফিরে দেখল শারমিন তার হাত ধরে আছে।
রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বলল –

“হাত ধরেছেন কেনো? হাত ছাড়ুন।
অবাক হয়ে শারমিন বলল –
“আপনি আগে আমায় তুই করে বলতেন। আর এখন হঠাৎ আপনি করে বলছেন কেনো?”
রাশেদ হাত ঝাড়া দিয়ে কাছে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলল –
“আমি তাকেই তুই করে বলি, যাদের আমি ভালোবাসি। যারা আমার আপন আর সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
শারমিন থমকে গেল। বলল –
“তাহলে আমি কী?”
রাশেদ তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উত্তর দিল –
“আপনি আমার কেউ নন।”
বলেই বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
রাশেদের এমন কথায় শারমিনের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কষ্টে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। সে আস্তে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করলো।
লামিয়ার রুমে বসে আছে তায়েব, তায়েবা, লামহা, মাহির আর হামিদা। সকালের ঘটনাগুলো নিয়েই তারা হাসাহাসি করছে।
হঠাৎ তায়েবা বলে উঠল –

“বড় আপা, ওই যে খান বাড়ির ছেলে-মেয়েরা আসছে, দেখেছো তুমি?”
হামিদা উদাস মনে উত্তর দিল –
“হ্যাঁ, দেখেছি।”
সবারই বুঝতে বাকি রইল না, হামিদার মনটা খারাপ।
খাটে আধশোয়া অবস্থায় মাহিরের গায়ে পা দিয়ে হেলান দিয়ে বসেছিল লামিয়া। হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে বলল –
“এই, হাত বাড়িয়ে আমার আবেগটা দে।”
মাহির হাত বাড়িয়ে বাদামী রঙের গিটারটা লামিয়ার হাতে দিল। গিটার নিয়ে লামিয়া উড়না দিয়ে তারগুলো মুছতে লাগল।
মাহির প্রশ্ন করল –
“তুই দেখিছিস সবাইকে?”
গিটার মুছতে মুছতে লামিয়া বলল –

“না।”
এরপর টুং টাং করে বাজাতে শুরু করল।
বই থেকে চোখ তুলে লামিয়ার দিকে তাকাল লামহা। তারপর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এনে বলল –
“সুন্দর একটা গান ধর।”
লামিয়া বাঁকা হেসে বলল –
“ওকে।”
তারপর গিটারে সুর তুলে গাইতে শুরু করল –
“আমার মা বলেছিলো, খুকি তুই প্রেম করিস না,
ভালো মেয়েদের কপালে ভালো ছেলে জোটে না।”
বিরক্ত হয়ে লামহা বলল –
“আরে, অন্যরকম গান ধর! পরিস্থিতি বুঝে গান গা!”
বলেই চোখ টিপল।
লামিয়া বুঝতে পেরে আবার সুর তুলল –

“তুমি দেখিয়াও দেখলা না, তুমি শুনিয়াও শুনলা না,
ও তুমি জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন, নিভাইয়া গেলা না।”
গান শুনে হামিদা আঁচ করতে দেরি করল না, ওর দিকে খোঁচা দিয়েই গাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পা থেকে জুতো খুলে লামিয়ার দিকে ছুঁড়ে মারল।
গান থামিয়ে লামিয়া কপাল কুঁচকে বলল –
“মারলি কেন?”
হামিদা তেড়ে উঠে বলল –

“তুই এই গান গাচ্ছিস কেন?”
লামিয়া দুষ্টুমি ভরা স্বরে বলল –
“তোর কি সমস্যা আমি এই গান গাইলে?”
হামিদা রেগে বলল –
“অনেক সমস্যা!”
লামিয়া মুখ টিপে হেসে খোঁচা দিল –
“তোর মনের আগুন কেউ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে নাকি?”
হামিদা কিছু বলতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো –
“আসতে পারি?”
সবাই দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ, সাথে খান পরিবারের সব ছেলে-মেয়ে। শুধু লাবিব নেই।

তাদের দেখে লামিয়া হ
গিটার পাশে রেখে মাহিরের কোলে শুয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো।
হামিদা খুশি হয়ে বলল –
“ভাইয়া, আসো!”
এক এক করে সবাই রুমে ঢুকল। শারমিন এগিয়ে গিয়ে হামিদাকে জড়িয়ে ধরে বলল –
“কেমন আছিস?”
হামিদা মিষ্টি হেসে বলল –
“ভালো। তুই?”
শারমিন বলল –
“ভালো।”
রাশেদ চারপাশে তাকিয়ে বলল –
“সবাই চিনে ফেলেছিস নাকি আবার পরিচয় করিয়ে দিতে হবে?”
ফাহিম বলল –
“ভাইয়া, পরিচয় করিয়ে দিলে ভালো হয়।”
রাশেদ মাথা নেড়ে বলল –
“ঠিক আছে।”
তারপর সবাইকে দেখিয়ে বলল –

“ও তো হামিদা, সবাই চিনিস। আর ওই যে চশমাওয়ালা, ও লামহা। আর ওই যে মাহিরের কোলে আধশোয়া অবস্থায় আছে, ও হলো লামিয়া।”
আবির বলল –
“ওইটাই লামিয়া?”
রাশেদ উত্তর দিল –
“হ্যাঁ।”
ঠিক তখনই পিছন থেকে লাবিব এসে ঢুকল। মুখে চওড়া হাসি। বলল –
“ছোটবেলায় শরীরের ভারে হাঁটতেই পারতো না, এখন এমন শুঁটকি হলো কীভাবে?
লাবিবের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা লামিয়া এবার চোখ মেলে তাকাল। প্রথমবারের মতো লাবিবের দিকে তাকাল সে। দুজনের চোখাচোখি হলো। মনে হলো চোখ দিয়েই যেন দুজন দুজনকে পুড়িয়ে ফেলবে।
পাশ থেকে আবির বলল –

“আহা লাবিব, তুই থামবি না?”
কিন্তু লাবিব কেয়ারলেস ভঙ্গিতে বলল –
“সত্যিটাই বলেছি।”
লামিয়া বাঁকা হেসে উত্তর দিল –
“মানে আপনি এখন কী বলতে চান? সবাই আপনার মতো কেঁচো হয়ে জন্মগ্রহণ করবে?
এই কথায় লাবিবের মুখ চুপসে গেল।
সবার হাসিতে ফেটে পড়ল আবার।
তায়েব হাসতে হাসতে বলল –
“সত্যি কথা বলিস না, সত্যি কথার ভাত নাই।”
নিজের সামনে ঝুলে থাকা চুলগুলো সরিয়ে লামিয়া গম্ভীর গলায় বলল –
“সত্যি কথা দিনে চৌদ্দবার বলা যায়।
লাবিব চোখ কুঁচকে বলল –

“তুই সত্যি কথা বলিস? তা শুনি দেখি, কী কী সত্যি কথা বলিস?”
ভাব নিয়ে লামিয়া উত্তর দিল –
“এই যে একটু আগে বললাম আপনি ছোটবেলায় দেখতে কেঁচোর মতো ছিলেন, একে-বেঁকে হাঁটতেন, এটাও কিন্তু সত্যি। সবাই জানে।”
লাবিব কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আবির হাত তুলে বলল –
“হয়ে গেছে, থাম তোরা! ছোটবেলা থেকে একজন আরেকজনের পিছনে লেগে থাকতিস, এখনও সেই অবস্থা!”
লাবিব চোখ দিয়ে শাসিয়ে চলে গেলো। লামিয়া কেয়ারলেস ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে রাখল।
তারপর সবাই টুকটাক গল্প করতে করতে নিচে খাবারের জন্য নামতে লাগল। লামহা বইটা সেলফে রেখে সবার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
পিছন থেকে আবির হেসে ফিসফিস করে বলল –
“এখনো আগের মতো বই পড়িস?”

কণ্ঠস্বর শুনেই লামহার গা কেঁপে উঠল। পাশ ফিরে আবিরকে দেখে বিরক্ত হলো। এই ছেলেটা ছোটবেলা থেকে তাকে জ্বালিয়ে মারতো।
চুপ করে হাঁটতে লাগল লামহা। আবির আবার বলল –
“এই কানি, শোন!”
কানি ডাক শুনেই লামহার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। গটগট করে আবিরের সামনে গিয়ে বলল –
“দেখেন মিঃ আবির, I’m not blind, ok? Next এ কানি বললে আমি আপনাকে কানা বানাইয়া দিমু!”
বলেই সোজা হেঁটে চলে গেল।
আবির হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর বিরবির করে বলল –
“ও গড! এই মেয়ের এতো রাগ কোথা থেকে আসে?”
তবুও হাসতে হাসতে লামহার পেছন পেছন হাঁটল।
খাবারের টেবিলে মুখ ফুলিয়ে বসে আছেন শফিকুল খান।

তার পাশেই টিয়া রঙের শাড়ি পরে, ভারি মেকআপে ঝলমল করছেন আজমেরী বেগম।
হঠাৎ শফিকুল খান তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। তারপর আনিসুল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন –
“আনিসুল! তোমাদের বাড়িতে কি শাকচুন্নী–পেত্নিও থাকে নাকি?”
আনিসুল সাহেব হতভম্ব।
শফিকুল খান এবার সরাসরি পাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন –
“এই বুড়ি মহিলাটা কে? ভূত হয়ে আমার পাশেই বসেছে কেন?”
আজমেরী বেগম ফোনে ডুবে আছেন, কিছুই শোনেননি।
আনিসুল সাহেব বুঝে গেলেন ব্যাপারটা। মুচকি হেসে বললেন –
“আম্মা, আপনি আবার এভাবে সেজেছেন কেন?”
আজমেরী বেগম সঙ্গে সঙ্গে ফোন নামিয়ে রেগে উঠলেন –
“বড় খোকা! আমার মেকআপ নিয়ে একটা কথাও বলবি না। এটা ক্যাশন, তুই বুঝবি না!”
শফিকুল খান মুখ ভোঁতা করে বসে রইলেন।
এদিকে সবাই এসে টেবিলে বসল

লামিয়া আসতেই দেখল, লাবিব তার চেয়ার দখল করে বসে আছে। বাধ্য হয়ে পাশে বসলো লামিয়া , বসে কটমট চোখে তাকাল। লাবিবের দিকে।
তা দেখে লাবিব হেঁসে বললো –
“চোখ দিয়ে আমাকে না গিলে, খাবার গিলে আগের মতো হাতি হ। শুকনা মরিচ!”
রাগে লাল হয়ে গেল লামিয়া। উপায় না পেয়ে নিজের পা দিয়ে লাবিবের পা জোরে চেপে ধরল।
লাবিব হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল –
“আউ!”
সবাই ভয় পেয়ে তাকাল। লাবিব হেসে বলল –
“না না, তেমন কিছু না।”

কিন্তু পাশে লামিয়া নিশ্চিন্তে খাওয়া শুরু করে দিল, যেন কিছুই ঘটেনি।
শফিকুল খান এখনো মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন।
জায়েদ এগিয়ে বলল –
“বাবা, খাবার খান না কেন? অনেক মজার রান্না হয়েছে, টেস্ট করেন।”
শফিকুল খান রেগে বললেন –
“তুমি খাও তোমার মজার খাবার! আমি খাবো না।”
শফিউর খান বললেন –
“বাবা, কেন এমন করছেন? কী হয়েছে?”
শফিকুল খান ধমক দিয়ে বললেন –
“কেউ আমাকে সময় দেয় না। নাতি–নাতনিরাও না! একটুও কথা বলে না। সব সময় ব্যস্ত!”
আমির সাহেব বললেন –
“তাহলে এখন কী বলতে চান বাবা?”
শফিকুল খান গম্ভীর হয়ে বললেন–
“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি বিয়ে করবো!”
ঠিক তখনই লামিয়া পানি খাচ্ছিল। কথা শুনে পুরো পানি ছিটকে গেল লাবিবের মুখে!
লাবিব রেগে লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া পাত্তা দিলো না।
সবাই স্তব্ধ।

লামিয়ার হাসি উচ্চশব্দে হেঁসে উঠলো।
লতিফা বেগম লামিয়া কে ধমক দিতেই লামিয়া বললো
“হাহাহা! দাঁড়াও দাঁড়াও একটু হেঁসে নেই। অনেক দিন পর এমন হাসির কথা শুনলাম!”
লতিফা বেগম ধমক দিলেন –
“চুপ করো!”
শফিকুল খান রেগে বললো- এই মেয়ে এইভাবে হাসছো কেন দেখো না এইখানে বড় রা কথা বলছে।
কিন্তু লামিয়া হেসেই বলল –
“আমরা হাসলে দোষ, আর আপনি বুড়ো বয়সে এসে ছোট্ট দের সামনে বিয়ে করবেন বললেন এটাতে দোষ নেই? একটু থেমে আবার বলল –
আচ্ছা দাদা, চাইলে আপনার জন্য আমি একটা মেয়ের সন্ধান দিতে পারি।”
শফিকুল খান শান্ত স্বরে বললেন –
“কে সেই মেয়ে?”
লামিয়া মুখ টিপে হাসল –

“আপনার পাশে বসা আজমেরী বেগম।”
সবাই হকচকিয়ে তাকাল।
আজমেরী বেগম ক্ষেপে উঠলেন –
“মেজো খোকা! তোর ছুড়ি আমারে কি কইলো শুনলি?”
শফিকুল খান তেড়ে বললেন –
“এই বুড়িকে আমি বিয়ে করবো? মাথা খারাপ নাকি?”
আজমেরী বেগম ধমক দিয়ে বললেন –
“ওই বুইড়া ব্যাটা! কারে বুড়ি বলো? তুমি নিজেই বুইড়া!”
শুরু হলো বুড়ো–বুড়ির ঝগড়া।
সবাই হাঁসফাঁস করছে হাসি আটকাতে। এ সুযোগে লামিয়া আস্তে আস্তে সরে গেল।
লাবিব চুপচাপ তাকিয়ে বলল –

“অনেক বেশি উড়ছিস। দাঁড়া, দেখি!”
আজমেরী বেগমের সাথে ঝগড়ায় না পেরে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শফিকুল খান চেয়ার ঠেলে উঠে গেলেন।
“হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গেছি! থাকো তোমরা, আমি চললাম!”
বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ল।
আমির সাহেব সবাইকে শান্ত করে বললেন –
“চিন্তা করবেন না, বাবা সব সময় এরকম করেন। একটু পরই শান্ত হলে ফিরে আসবেন।”
বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে শফিকুল খান রিকশায় উঠলেন।
রিকশাওয়ালা বলল –

“কোথায় যাবেন স্যার?”
শফিকুল খান রাগে বললেন –
“জাহান্নামে!”
রিকশাওয়ালা হেসে উঠল –
“স্যার, এতো দূরে রিকশায় যাওয়া সম্ভব হবে না।”
শফিকুল খান –
“স্টুপিট!”
রিকশাওয়ালা চোখ বড় বড় করে বলল –
“স্যার, ইংরেজিতে গালি দিলেন আমাকে?”
শফিকুল খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন –
“না, তোমাকে না। আমাকে বলেছি। আমি-ই স্টুপিট।”
রিকশাওয়ালা এবার রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল –
“স্যার বাসা থেইকা ঝগড়া করে এসেছেন নাকি? আমিও ঝগড়া কইরাই আইছি। এতো কষ্ট করি তারপর ও কারোর মন যোগায় চলবার পারি না।

তাই আমি আজকে রিকশা নিয়া মরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সামনে বাস বা ট্রাক আইলেই সোজা ঝাঁপ দিমু। আপনে যেহেতু জাহান্নামে যাইতে চান, চলেন, এক লগে যাই!”
শফিকুল খান ভয় পেয়ে বললেন – এই রিকশা থামাও কি করছো। আমি মরতে চাই না রিকশা থামাও বলছি।
ঠিক তখনই সামনে একটা বড় ট্রাক আসছে। রিকশাওয়ালা পাগলের মতো প্যাডেল মারছে।
শফিকুল খান আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠলেন –
“দাঁড়া দাঁড়া! আমি মরতে চাই না!”
রিকশা কাত হয়ে ধাম করে পাশে পড়ে গেল। ধুলোয় ভরা শফিকুল খান চিৎকার করতে লাগলেন –
“ও বাবাগো! আমি মরতে চাই না!”
রিকশাওয়ালা হেসে তাকে উঠাতে উঠাতে বলল –

“স্যার, আমি তো মজা করছিলাম। আপনে কিন্তু আমার কথা সিরিয়াস নিয়া নিলেন!”
শফিকুল খান হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন।
নিজের রুমে এসে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে লামিয়া। মনটা একদম ভালো নেই। মনে হচ্ছে কোনো অকাজে যদি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারতো তবে হয়তো একটু ভালো লাগতো। কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে শুয়ে থেকে ভাবলো কি করা যায়। হঠাৎই এক ধাক্কায় উঠে দাঁড়ালো।
আয়নার সামনে গিয়ে এলোমেলো চুলগুলো আঁচড়ে বেঁধে নিতে শুরু করলো। তখনই দরজায় টোকার শব্দ হলো। লামিয়া ভেবেই নিলো মাহির এসেছে। তাই কোনো কিছু না ভেবে চুলে ফিতা লাগাতে লাগাতে বললো—
“মাহির? দরজা খোলা আছে, ভিতরে আয়।”
কথা শেষ হতে না হতেই ভিতরে ঢুকলো লাবিব। কিন্তু লামিয়ার তা খেয়াল হলো না। সে ভেবেছিলো মাহির কিংবা তায়েব-তায়েবা এসেছে। তাই পিছনে না তাকিয়ে বলতে লাগলো—
“শোন, আজ কিন্তু একদম দারুণ একটা প্ল্যান আছে…”
কথা শেষ করতে না করতেই হঠাৎ পিছনে তাকালো। তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে বললো—
“কী চাই?”

কোনো উত্তর না দিয়ে লাবিব ঝড়ের গতিতে এসে খপ করে লামিয়ার লম্বা বেণি টেনে ধরলো। আচমকা এমন আঘাত পেয়ে লামিয়া একটু পিছিয়ে গেলো। লাবিব শক্ত করে চুল ধরে বললো—
“সাহস খুব বেরিয়েছে তাই না!”
রাগে গলা কাঁপতে লাগলো লামিয়ার।
“চুল ছাড়ুন, না হলে খুব খারাপ হবে।
কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে লাবিব আরো জোরে চুল টেনে ধরলো। তারপর বললো—
“কি করবি? আর আমাকে পা দিয়ে চেপেছিলি কেনো?”
এইবার সত্যিই সাংঘাতিক রেগে গেলো লামিয়া। কেউ তার চুলে হাত দেবে, এটা সে সহ্য করতে পারে না। দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠলো—

” লাবিব ভাই প্লিজ চুল ছাড়ুন প্লিজ, কেউ আমার চুলে হাত দেক সেটা আমার পছন্দ নয়, প্লিজ ছাড়ুন।
লাবিব আস্তে করে চুল ছেঁড়ে দিলো।
লামিয়া চুল ছাড়া পেয়ে লাবিবের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বললো
” দ্বিতীয়বার এমন সাহস দেখাতে আসবেন না। আমি সে নই এটা ভুলে যাবেন না। ”
বলেই চলে গেলো লামিয়া।

লাবিব বেশ শান্ত দৃষ্টিতে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলো নিজের রুমে।
লামিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে মাহির কে ডেকে বললো
– তোর বাইক বাহির কর আজ ভার্সিটিতে যাবো।
মাহির বাইক আনতে এগিয়ে যেতেই ঘড়ির দিকে তাকালো লামিয়া। আশেপাশে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো তিনতলার বারান্দায়। লাবিব দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়া আড়চোখে তাকিয়ে লাবিব কে দেখে অন্যদিকে তাকালো।
এদিকে মাহির বাইক নিয়ে আসতেই লামিয়া উঠে বসলো। দুজনে চলে গেলো। লাবিব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রুমে ঢুকে গেলো।

বাগানে চেয়ারে বসে গল্প করছিলেন শফিউর, আমির, জায়েদ, আনিসুল, হামিদ, হাশিম আর আজমির সাহেব। তখনই ময়লা কাপড়ে কোমরে হাত দিয়ে “ও বাবাগো, ও মাগো” করতে করতে গেটে প্রবেশ করলো শফিকুল খান।
আজমেরী বেগম সাজগোজ করে বের হচ্ছিলেন। গেটেই চোখ ছোট করে শফিকুলের দিকে তাকালেন।
“ইউ ভিক্ষুক! অন্য বাড়ি গোয়িং। এ বাড়িতে নট এলাউ ভিক্ষুক।”
কথার মানে না বুঝলেও ভিক্ষুক বলেছে—এটা ঠিকই বুঝলো শফিকুল। রেগে উঠলো।
“ওই বুড়ি চুপ! তুই ভিক্ষুক, শাকচুন্নী মহিলা!”
আজমেরী বেগম ক্ষেপে বললেন—

“ওই বুইড়ার ঘরে বুইড়া! আমারে বুড়ি কইলি? ইউ বুইড়া, মি নট!”
শফিকুল বিরক্ত হলো। এই মহিলার সাথে তর্ক করে লাভ নেই। ঠিক করলো নিজের রুমে যাবে। হাঁটতেই আজমেরী বেগম রাস্তা আটকে দাঁড়ালেন।
“এই বাড়িতে ভিক্ষুক নট এলাউ। ইউ গেট আউট!”
শফিকুল রেগে বললো—
“আমাকে দেখে ভিক্ষুক মনে হচ্ছে?”
আজমেরী ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন—
“না, জমিদার লাগছে।”
চেঁচামেচি শুনে আনিসুল সাহেবরা এগিয়ে এলেন।
“কি হয়েছে আম্মা?”

আজমেরী দেখিয়ে বললেন—
“বড় খোকা, একটা ভিক্ষুক এসেছে।”
সবাই শফিকুলের দিকে তাকিয়ে হা হয়ে গেলো।
আমির সাহেব অবাক হয়ে বললেন—
“বাবা আপনি? এই অবস্থা কেনো?”
বাবা ডাক শুনতেই আজমেরী চোখ কুঁচকে তাকালো।
শফিকুল খান ধমকে বললো –
“এতো প্রশ্ন না করে ধরো, কোমরটা ব্যথায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
আজমেরী খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
“সকালে না বললেন ইউ ইসটং? এখন ইসটংগিরি কই গেলো এখন?”
রেগে শফিকুল বললো—
“আনিসুল, এই শাকচুন্নী বুড়ি কে চুপ থাকতে বলো! নাহলে অনেক খারাপ হবে।
আজমেরী ব্যঙ্গ করে বললেন—
“ইহ, কোমর ভাঙা বুড়া খারাপ করতে আসছে! আগে কোমর ঠিক করো।”
বলেই হেঁসে চলে গেলো।

সবাই হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। শফিকুল বিরক্ত হয়ে বললো—
“কি দেখছো? ধরো আমাকে, ঘরে নিয়ে যাও।”
আস্তে ধীরে সবাই তাকে বাসায় নিয়ে গেলো।
দুপুর বারোটা ত্রিশ মিনিট। গরমে পুড়ে যাচ্ছে চারপাশ। ঘেমে নেয়ে ক্লাস শেষে রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে হামিদা। এক রিকশা ঠিক করতেই দৌড়ে এসে উঠে বসলো সাফওয়ান।
“আপনি?” বিস্ময়ে বললো হামিদা।
কোনো পাত্তা না দিয়ে সাফওয়ান বললো—

“মামা, সোজা লেকের পাড়ে যান।”
হামিদা তাড়াতাড়ি বললো—
“না, আমি বাসায় যাবো।”
সাফওয়ান চোখ রাঙিয়ে বললো—
“বেশি কথা বললে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো তোকে।”
চুপ করে বসলো হামিদা। সাফওয়ান তাকিয়ে বললো—
“আসার পর তোকে সময় দিতে পারি নি। কেমন আছিস?”
“যেমন দেখছেন।” গম্ভীর উত্তর দিলো হামিদা।
“আমাকে জিজ্ঞেস করবি না আমি কেমন আছি?”
হালকা হেসে হামিদা বললো—
“অবশ্যই ভালো। জিজ্ঞেস করে লাভ নেই।”

সাফওয়ান হাঁসলো। রিকশা লেকের পাড়ে থামলো। হামিদা নামলো না দেখে ধমক দিলো সাফওয়ান। ভয়ে নেমে এলো সে। সাফওয়ান হাত ধরে সামনে টেনে নিলো। হামিদা মোচড়া মুচড়ি করলো কিন্তু পারলো না হাত ছাড়াতে।
নদীর ধারে এসে হাত ছেড়ে দিয়ে বললো—
“আমার বাইরের খবর জানলি, ভেতরের খবর জানলি না।”
হামিদা চুপ করে বসে আছে। তা দেখে সাফওয়ান হামিদার পাশে বসে মাথা রাখলো তার কোলে।
হামিদা চমকে উঠে, তাকিয়ে আছে সাফওয়ানের দিকে।
তা দেখে সাফওয়ান বললো –

“এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? আগে তো আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতি। আজও কী দিবি ?”
চোখ বেয়ে নেমে এলো জল। সেটা মুছে দিলো সাফওয়ান। হঠাৎ হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো হামিদা।
সাফওয়ান হাঁসি দিয়ে বললো—
“আগে নাক ছিটকিয়ে কাঁদতি। দেখি এখনো কি তেমনই?”
হামিদা ছোট ছোট ঘুষি মারতে লাগলো তার বুকে। সাফওয়ান জড়িয়ে ধরতেই হামিদা ছটফট করলো
তা দেখে সাফওয়ান ধমক দিলো—

“আবার ছটফট করলে পানিতে চুবাবো।”
শান্ত হলো হামিদা। সাফওয়ান তার মাথায় চুমু দিলো।
“তুই জানিস, তোকে দেখার জন্য আমি কতটা ছটফট করেছি।”
অভিমানী সুরে বললো হামিদা—
“আমিও কি মিস করি নি? জানেন আমি কতো কষ্টে ছিলাম? ভাবতাম আপনি হয়তো অন্য কাউকে বিয়ে করেছেন।”
সাফওয়ান জবাব দিলো—

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩

“তুই ছাড়া আমার হৃদয়ে আর কেউ জায়গা পাবে?”
হামিদা উঠে বসতে চাইলো। কিন্তু সাফওয়ান আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বললো – এইভাবে থাক ভালো লাগছে। হামিদা হালকা হেসে সাফওয়ান কে জড়িয়ে ধরলো।
সকল রাগ অভিমান ভেঙে গেলো হামিদার। সে তো এটাই চেয়েছিলো। প্রিয় মানুষের ভালোবাসা, একটু বুকে জড়িয়ে রাখা। এতো বছর পর সাফওয়ানের ভালোবাসা পেয়ে হামিদার সব রাগ অভিমান পানি হয়ে গেলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫