Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৭

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৭

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৭
নুরিয়া ইসলাম

সান ফ্রান্সিসকোর পাহাড় ঘেরা দোতলা বাড়িগুলোর মাঝে রাতটা ছিল পুরো নিস্তব্ধ।
চারপাশে হালকা কুয়াশা, ঠাণ্ডা হাওয়া, আর দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বাড়িগুলো হালকা কুয়াশায় ঢাকা পড়ে ছিল।শহরটা ছিল একদম শান্ত, শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে সাইকেলের চেনের হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
এই নিস্তব্ধতার মাঝে , এরিকের শেডো রাইডারটা গর্জন তুলে সেই পাহাড়ঘেঁষা দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল।এরিক বাইক থেকে নেমে ঠাণ্ডা, নির্লিপ্ত চোখে চারপাশটা স্ক্যান করল।

ভয়, দ্বিধা কিংবা উত্তেজনার কোনো ছায়া তার চোখে নেই।সে জানালার নিচে এসে দাঁড়াল, মুখে ফুটে উঠল এক কুটিল হাসি। গ্রিল ধরে আস্তে আস্তে ওপরে উঠল, কুয়াশায় ভেজা জানালার কাঁচে তার হাতের ছাপ পড়ে গেল।
জানালার ফাঁক দিয়ে সে ভেতরে তাকাল, ঘরটা আলোয় ঝলমল করছে, সে ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। হঠাৎ, কোরো পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। ইনায়া সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো, মাথায় সাদা টাওয়াল জড়ানো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাওয়ালটা খুলে ফেলতেই তার লম্বা, রেশমি কালো চুলগুলো ঢলঢল করে পিঠ বেয়ে কোমর ছুঁয়ে ঝরে পড়ল। চুলের ডগা থেকে টুপটাপ পানি মেঝেতে পড়ছে।
এরিক পর্দার ফাঁক দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এই প্রথম সে ইনায়ার হিজাবের আড়ালে লুকানো চুল দেখতে পেল। এখনকার মডার্ন মেয়েদের মাঝে এমন ঘন, লম্বা চুল খুব একটা দেখা যায় না। মেয়েদের লম্বা চুলের প্রতি এরিকের দুর্বলতা চিরকালীন, আর ইনায়ার চুল যেন সেই দুর্বলতা আরও গভীর করে তুলল। সে অবাক হয়ে ভাবল, “সব মেয়েই তো তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে ভালোবাসে, তাহলে এই মেয়ে কেন নিজের সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখে?” আই এ্যাম ড্যাম সিউর, আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই এই চুলের প্রেমে পড়ে যেত!”

হঠাৎ ইনায়ার মনে হলো, অদৃশ্য কোনো দৃষ্টি তাকে ঘিরে রেখেছে। অস্বস্তি নিয়ে সে এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু তেমন কিছুই দেখতে পেলো না, তাই বুকের ভেতর জমে থাকা অজানা ভয়টা একটু হালকা হয়ে এলো।
সে দ্রুত বেডসাইডে রাখা লাইটটা নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে গেল। ইনায়া ঘুমিয়ে পড়তেই এরিক নিঃশব্দে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো।সে আস্তে আস্তে ইনায়ার দিকে এগিয়ে গেল। ইনায়ার বিছানার এক পাশে বসে, নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল।হঠাৎই, তার মনে গভীর একটা ইচ্ছে জাগে ইনায়াকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখার। অনেকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার পর, সে ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় ইনায়ার দিকে।

কিন্তু ছোঁয়ার আগে ,কোন দ্বিধা আর অজানা অনুভূতিতে থমকে যায় তার হাতটা আবার নিঃশব্দে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।
এইবার এরিক নিজের আচরণে নিজেই বিরক্ত হয়ে পড়লো। নিজের ওপর এতটাই বিরক্তি জমে গেল যে, সে নিজেকেই গালাগাল করতে শুরু করলো,
আহ্, ফাক… ইউ আর প্যাথেটিক, এরিক। উইকনেস শো করছিস? শিট।

USC ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অলিভিয়া ও তার বান্ধবীরা, চোখেমুখে কঠোর সংকল্প, মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে । উদ্দেশ্য একটাই ইনায়াকে উচিত শিক্ষা দেওয়া। ওইদিন ক্যান্টিনে এরিকের সাথে যা ঘটেছিল, তা অলিভিয়া নিজের চোখে দেখেনি, কিন্তু তার বন্ধুদের মুখে সব শুনেছে। বান্ধবীদের উত্তেজিত বর্ণনায় অলিভিয়ার মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
ইনায়া ক্যাম্পাসে পা রাখতেই, অলিভিয়া ও তার বান্ধবীরা তাকে সবার থেকে আড়াল করে এক ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গেল।

অলিভিয়া বিষাক্ত কণ্ঠে বলল, “ফকিন্নির বাচ্ছা, তোর এতো বড় সাহস! তুই আমার এরিকের গায়ে হাত তুলেছিস।”
এই বলে অলিভিয়া ইনায়ার গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারে।
ইনায়া ভাবতেই পারেনি, অলিভিয়া তার সাথে এমনটা করবে। প্রথমত, তার কোনো দোষ নেই। বিনা দোষে কেন সে শাস্তি পাবে? কেউ তাকে বিনা দোষে মেরে যাবে, আর সে চুপচাপ সহ্য করবে এতটা দুর্বল সে নয়। কেন সে অন্যায় সহ্য করবে? তাই নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে সেও অলিভিয়ার গালে এক চড় বসিয়ে দেয়।
ইনায়া দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “তুমি কী ভেবেছো, তুমি আমাকে মারবে আর আমি চুপচাপ সব সহ্য করবো? না, আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানি!”

ক্যাম্পাসের আকাশটা যেন হঠাৎই মেঘলা হয়ে উঠেছে, বাতাসে অজানা অশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে । ইনায়ার বুকের ভেতর কাঁপুনি, তবুও চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠে । অলিভিয়ার থাপ্পড়ে মুখটা ঘুরে গেলেও, ইনায়ার আত্মসম্মান টললো না। সে চড়টা ফিরিয়ে দিয়ে নিজের ভেতরের সাহসটাকে জাগিয়ে তুলল।
অলিভিয়া রেগে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো, “How dare you?”
তার বান্ধবীরা ইনায়ার হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখে, যাতে সে আর নড়তে না পারে। কারও হাত ইনায়ার হিজাবের ওপর, ইনায়ার চোখে আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে।
ইনায়া কাঁপা গলায় বলে, “অলিভিয়া, তুমি এটা ঠিক করছো না।”
তার কথা শুনে অলিভিয়া পাগলের মতো হাসতে থাকে। এরপর ইনায়ার গালে পরপর তিনটা সজোরে থাপ্পড় মারে। ইনায়ার ঠোঁট ফেটে হালকা রক্ত বেরিয়ে আসে, গালে পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ বসে যায়। তা দেখে অলিভিয়ার মনে শান্তি অনুভব হয়।

এরপর অলিভিয়া ইনায়ার ব্যাগ থেকে বই-খাতা বের করে ছিঁড়তে থাকে, আর হাসতে থাকে।
ইনায়াঃ “অলিভিয়া, এমনটা করো না, ওগুলো আমার বই।”
কিন্তু অলিভিয়া কোনো কথা শোনে না। এবার সে ইনায়ার গলার লকেটটা টান দিয়ে খুলে ফেলে।
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে, “অলিভিয়া, প্লিজ, লকেটটা আমায় ফিরিয়ে দাও, এটা আমার বাবার শেষ স্মৃতি। প্লিজ অলিভিয়া।”
কিন্তু অলিভিয়ার অহংকারী মন ইনায়ার কষ্টটা অনুভব করে না। সে লকেটটা ছুড়ে ফেলে দেয় দূরে।
ইনায়া শুধু চোখের জল ফেলতে থাকে। অলিভিয়া চলে যেতেই ইনায়া নিঃশব্দে মাথায় হিজাবটা আবার ঠিকভাবে বেঁধে নেয়, গায়ে চাদর জড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায় লকেটটা খুঁজতে। অনেক খুঁজেও সে লকেটটা পায় না। তাই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে থাকে, বুকের ভেতর বাবার স্মৃতির শূন্যতা আর চোখে কান্নার জল নিয়ে।

এরিক মুখে গাম্ভীর্যতা নিয়ে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। সামনে ইনায়া, দুর্বল পায়ে এগিয়ে আসছে। গাল দুটো ফোলা, চোখ লাল স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে কেঁদেছে। ইনায়া এরিককে দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই এরিকের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
“স্টপ।”
ইনায়া থামে না, বরং আরও দ্রুত এগোয়। এরিক এবার ঠান্ডা, রাগী গলায় বলে উঠে,

“ডিড ইউ নট হিয়ার মি? আই সেড, স্টপ।
স্টে রাইট দেয়ার।
ডোন্ট মেক মি রিপিট মাইসেলফ।”
ইনায়া বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এরিক এবার ইনায়ার সামনে এগিয়ে আসে।ইনায়ার গালে পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট ছাপ দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ঠান্ডা, অথচ হুমকিস্বরূপ কণ্ঠে সে বলে,
“হু দ্য ফাক ডিড দিস টু ইউ?
টক। নাও।
হুয়েভার ইট ওয়াজ, দে জাস্ট মেড দ্য ওয়ার্স্ট মিস্টেক অফ দেয়ার লাইফ।
ওনলি আই ক্যান হার্ট ইউ।”
ইনায়া একটু থমকে যায়, এরিকের চোখে চোখ রাখে। ঠোঁট কামড়ে ধরে, দ্বিধায় পড়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
“আপনাকে কিছুই বলার নেই আমার,” ফিসফিস করে বলে সে, গলা কেঁপে উঠে।
এরিকঃ “আই ওয়ান্ট আন আন্সার, ড্যামেট।”
ইনায়া ধীর গলায় বলে,

“ফাইন, তার আগে বলুন আপনি আমায় এত ঘৃণা করেন কেন? আপনার সাথে তো আমার কোন ঝামেলা ছিল না।শুধুমাএ আমি মুসলিম বলে? ইসলামকে এতো ঘৃণা করার কারণ?
এরিক চোখ সরু করে ইনায়ার দিকে তাকায় তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে,
“ইউ নো অ্যাবাউট ভায়োলেন্স, টেরোরিজম।ফর এক্স্যাম্পল, ইসলাম ফোর্স ইউ টু হাইড ইয়োর বিউটি, টেইকেন অ্যাওয়ে ইয়োর ফ্রিডম।”
ইনায়াঃ “স্টপ! ইসলাম মেইকস মে কুইন উইথ হিজাব। ইট মেইকস মি সো প্রেশাস, কনফিডেন্ট অ্যান্ড স্ট্রেংথ। আই অ্যাম কমফর্টেবল উইথ হিজাব।”

এরিক ঠোঁট চেপে ধরে, ইনায়ার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে তারপর বলে উঠে,
“ওকে, এনাফ। এখন চলো আমার সাথে মেডিক্যাল সেন্টারে।”
ইনায়াঃ “আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না।”
এরিকঃ “লিসেন, আমি জানি তুমি রাগান্বিত। কিন্তু তুমি আঘাত পেয়েছো, আর এটা আমার চোখের সামনে এভাবে দেখে চুপ থাকতে পারবো না।”
ইনায়াঃ এইগুলো তো আপনার জন্যই হয়েছে।
এরিক হাস্কিস্বরে বলে উঠে ,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৬

“এইগুলো তো আমার জন্যই হয়েছে, তাই না? তাহলে, মলমও আমাকে লাগাতে দাও।”
এই বলে এরিক ইনায়ার চাদরটা টেনে, হাতের সাথে পেঁচিয়ে ধরে, ইনায়াকে টেনে নিয়ে যায় আর বলতে থাকে,
“ডোন্ট ফাইট ইট, বেবিগার্ল । আই অলরেডি টোল্ড ইউ ওনলি আই ক্যান হার্ট ইউ।”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৮